Golpo romantic golpo মেঘের ওপারে আলো গল্পের লিংক

মেঘের ওপারে আলো পর্ব ২২


#মেঘের_ওপারে_আলো

#পর্ব_২২

#Tahmina_Akhter

ড্রইংরুমে মাহরীন এবং মাশফি বসে ছিল।মেঘালয় আলোর হাত ছেড়ে দিয়ে তাদের দিকে এগিয়ে যায়। আলো মাথা নীচু করে মেঘালয়ের পেছনে পেছনে যায়।

মাহরীন মেঘালয়ের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা আলোকে উঁকি দিয়ে দেখলেন। মাহরীনের ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটে উঠে। মাশফি মেঘালয়কে জিজ্ঞেস করল,

— কোথাও বের হবি?

— আমার কলিগ রেদোয়ানের বার্থডে পার্টি। আলোকে এবং আমাকে যেতেই হবে। রেদওয়ান এতবার করে বলল যে বারণ করতে পারলাম না। তুমি বাড়িতে থেকো, ভাই। আমরা তাড়াতাড়ি ফিরে আসব।

মেঘালয় কথাগুলো বলে এগিয়ে যায় মাহরীনের সামনে। খানিকটা ঝুঁকে মাহরীনের হাত ধরে বলল,

— রাত জাগবে না কিন্তু। আমি এসে যেন দেখতে পাই তুমি ঘুমিয়ে গেছো।

মাহরীনের মেঘালয়ের থুতনিতে হাত রেখে

হাসিমুখে বলল,

— ফিরে আসার সময় আমার জন্য রসমালাই নিয়ে আসিস তো। খুব খেতে ইচ্ছে করছে।

— নিয়ে আসব।

মেঘালয় বাইরের দিকে রওনা হলো। আলো মাহরীনের দিকে তাকাতেই মাহরীন চোখ রাঙানি দিয়ে বলল,

— সামনে যার পরীক্ষা সে এত ঘনঘন ঘুরতে যাচ্ছে কেন?

মাহরীনের কথা শুনে আলো মাথা নীচু করে ফেলল। অভিমানে তার চোখ ভিজে আসছে। পরক্ষনেই মাহরীনের হাসির শব্দ শুনে মাথা উঁচু করে তাকালো আলো। মাহরীন হাসি মুখে বলল,

— মজা করছিলাম, পাগল। এখন যা তাড়াতাড়ি।

আলো ফিক করে হেসে ফেলল মাহরীনের কথা শুনে। মাশফি এবং মাহরীনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আলো বের হয়ে আসে।

দক্ষিণ খুলশির আকাশে তখন রাতের মেঘেরা ছুটাছুটি করছে। পরিবেশটাতে যেন এক শান্ত মুহূর্ত বিরাজ করছে।

আলোকে দেখেই মেঘালয় গাড়ির দরজা খুলে আলোকে বসতে ইশারা করল। আলো গাড়িতে উঠে বসল। মেঘালয় গাড়িতে উঠে বসল। আলো সিটবেল্ট বাঁধতেই গাড়ি ধীরে ধীরে নেমে এলো জাকির হোসেন রোডের দিকে।

রাস্তার দু’পাশে হাওয়ার সঙ্গে দুলছে গাছের সারি। শহরের রাতটা যেন একটু বেশি রঙিন, একটু বেশি ব্যস্ত আজ।

গাড়িটা এগোতেই সামনে দেখা দিল টাইগার পাস।

বিশাল রাজকীয় ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা রয়েল বেঙ্গল টাইগারের মূর্তি যেন বাতাসে গর্জে উঠছে। তার পেছনে সবুজ পাহাড় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে, যেন পাহাড়ের বুক চিরে রাস্তা চলে গেছে।

আলো মুগ্ধ হয়ে তাকাল,

— এটা যতবার দেখি, ততবারই নতুন লাগে।

—চট্টগ্রামের লাইফটাইম ব্র্যান্ডিং হলো এই জায়গাটা।

মেঘালয় হেসে বলল। আলো ব্যস্ত শহরের ব্যস্ত রাস্তার দৃশ্য দেখছে। ঢালুপথ ধরে গাড়ি নামতে লাগল।

কয়েক মিনিট পরেই তারা চলে এল কাজির দেউড়ির ব্যস্ত এলাকায়।

ডান পাশে ঝলমল করছে চট্টগ্রাম শিশুপার্কের নাম প্লেট। রঙিন লাইট, রাইডের ঘূর্ণন, বাচ্চাদের হাসির শব্দ।

আর বাম পাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে এম এ আজিজ স্টেডিয়াম। শহরের স্পোর্টস হৃদয়।

তারা স্টেডিয়ামের ইস্ট গ্যালারির সামনে এসে গাড়ি থামাল। মাথা উঁচু করে তাকাতেই কাচের দেয়ালের ভেতর হালকা আলোর নিচে লেখা নামটা দেখা দিল

Restaurant Saki

মেঘালয় গাড়ি থামিয়ে আলোকে বলল,

— পার্টি এখানেই হবে।

আলো একটু অবাক হয়ে তাকাল। মেঘালয় আলোকে অপেক্ষা করতে বলে গাড়ি পার্কিং এরিয়ায় রেখে কিছুক্ষণের মধ্যে ফিরে এলো। এসেই আলোকে সঙ্গে নিয়ে রেস্টুরেন্টের ভেতরে প্রবেশ করল।

তারা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠল। সিঁড়ির নিচে ব্যস্ত শহর, আর ওপরে উঠতে উঠতেই যেন আলাদা এক জগতে প্রবেশ করছে।

Saki-র দরজা খুলতেই চোখ ধরানো আলো, ভেতরের সাজসজ্জা আর জাপানি স্টাইলে সুরেলা মিউজিক তাদের স্বাগত জানাল। ভেতরে বেশ কিছু মানুষ জড়ো হয়ে আছে, টেবিলগুলো সাজানো, মাঝের একটি টেবিলে বড় কেক রাখা।

মেঘালয়ের পরিচিত কলিগ, ফ্রেন্ডরা সবাই মেঘালয়কে দেখে হাসিমুখে এগিয়ে আসে। মেঘালয় তাদের সঙ্গে কুশলাদি বিনিময় করে। মেঘালয়ের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আলোর দিকে অনেকেই ভ্রু কুঁচকে তাকায়। আলো সেই সব দৃষ্টির মানে বুঝতে পারে। নিজের কাছে নিজেকে ছোট মনে হয়।

ভিড়ের মাঝে রিদওয়ান এগিয়ে এলো হাসিমুখে,

—ভাই! তুমি এলেই পার্টির মান বাড়ে।

আলোকে দেখে বলল,

— ভাবিনি আপনি আসবেন! এসে পুরো রাতটাই বিশেষ করে দিলেন।

আলো হেসে মাথ নীচু করে ফেলে।

মেঘালয় আলোকে পাশে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। টেবিলে রাখা লাইটগুলো তাদের মুখের নানা রঙের ছায়া ফেলছে। রিদওয়ানের বন্ধুরা গান ধরল, কেউ কেউ ছবি তুলছে, কেউ আবার কেক কাটার অপেক্ষায়।

একসময় কেক কাটার সময় হলো। চারপাশে হাততালি, হালকা চিয়ার, আর খুশির শব্দে চারদিকে আনন্দমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হলো।

মেঘালয় আলোর দিকে একটু ঝুঁকে বলল,

— কিছু লাগবে, তোমার?

আলো মেঘালয়ের কানের কাছে মুখ বাড়িয়ে বলল,

— আমি ওয়াশরুমে যাব।

— চলো, আমার সঙ্গে।

মেঘালয় আলোকে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছিল এমন সময় কেউ মেঘালয়ের নাম ধরে ডাক দেয়। মেঘালয় এবং আলো দুজনেই পেছনে ফিরে দেখল। একটা সুন্দরী মেয়ে এগিয়ে আসছে তাদের দিকে ।

— কেমন আছো, মেঘালয়?

— এই তো ভালো।

— ও কে? মিসেস মেঘালয়?

প্রশ্নটি শুনে হেসে মাথা নাড়িয়ে হা বোঝালো। মেয়েটা মুখ করে কালো ফেলল। আলো মেঘালয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে, একাই ওয়াশরুমের দিকে চলে যাচ্ছে।

আলো চোখের সামনে থেকে আড়াল হলে মেয়েটা মেঘালয়কে উদ্দেশ্য করে বলল,

— মেঘালয়, আর ইউ আউট অফ ইউর মাইন্ড! তোমার মত একজন ব্রাইট স্টুডেন্ট, হ্যান্ডসেম ছেলে কিনা এমন একটা মেয়েকে বিয়ে করেছো। যার কিনা তোমার পাশে দাঁড়ানোর মত যোগ্যতা নেই! কি দেখে বিয়ে করলে তাকে? এমন তো নয় শ্বশুরবাড়ি থেকে লাখ টাকার যৌতুক নিয়ে বিয়ে করেছো?

সূচনার কথাগুলো শুনে মেঘালয় ভ্রু কুঁচকে তাকালো। সূচনা মেঘালয়ের সঙ্গে একই হসপিটাল থেকে ইন্টার্ণ করছে। মেঘালয় সূচনার দিকে আঙুল উঁচু করে বলল,

— ডোন্ট ক্রস ইউর লিমিট, সূচনা। সি ইজ মাই ওয়াইফ। সে কালো হতে পারে। কিন্তু তার মধ্যে বিশেষ কিছু হয়তো আছে! নয়ত আমার মা কেন আমার জন্য তাকেই পছন্দ করল?

— নতুন নতুন বিয়ে করেছো তো, বউকে এখন এমনিতেই ভালো লাগবে। কয়েকদিন গেলেই দেখবে মেয়েটাকে তোমার ভালো লাগছে না। তোমার বউকে ভালোবাসো না, নিশ্চয়ই? ভালোবাসা ছাড়া কতদিন সংসার করবে? এখন সংসার করছো কারণ হয়ত তোমার বউয়ের প্রতি এট্রাকশন তৈরি হয়েছে। এট্রাকশন শেষ গেলে দেখবে বিয়ের মত একটা ব্যাপারকে তুমি বয়ে বেড়াতে পারবে না। হাসফাস লাগবে। মুক্ত হতে চাইবে।

সূচনার কথা এবং সাহস দেখে মেঘালয়ের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়৷ সূচনা হয়তো মেয়ে বলে মেঘালয় কিছু বলতে পারল না। পার্টি এরিয়া ছেড়ে সে সোজা চলে যায় ওয়াশরুমের দিকে। যেখানে কিছুক্ষণ আগে আলো গিয়েছে। আলো ওয়াশরুম থেকে বের হতেই মেঘালয়কে দেখে মুচকি হেসে ফেলল। মেঘালয় আলোর হাসিমুখের দিকে কিছু একটা খুঁজে বেড়াচ্ছে। মেঘালয়ের কুঁচকে রাখা কপালের দিকে তাকাতেই আলোর হাসি উবে গেল। আলো সামান্য সাহস সঞ্চয় করে মেঘালয়ের হাতটা ধরে বলল,

— কি হয়েছে, আপনার?

মেঘালয় আলোর হাতের দিকে একপলক তাকিয়ে বলল,

— কি জানি? মনে হচ্ছে, হৃদয়ে কিছু একটা হচ্ছে!

আলোর মাথায় দুশ্চিন্তা ভর করল। আলো মেঘালয়ের হাতটা ছেড়ে দেয়। মেঘালয় আলোর ছেড়ে দেয়া হাতের দিকে তাকিয়ে রইল। পরক্ষণেই মনে কি যেন উদায় হলো? আলোর হাতটা ধরে কাছে টেনে বুকের মাঝে শক্ত করে চেপে ধরল। আলো ভীষণ অবাক হয়ে মেঘালয়ের বুকের মাঝে ঘাপটি মেরে রইল। মেঘালয়ের হৃদয়ের দ্রুতগতিতে চলা হৃদস্পন্দন শুনছে কেবল।

—ভালোবাসা ছাড়া কি সংসার করা যায় না, আলো?

মেঘালয়ের মুখ থেকে এহেন প্রশ্ন শুনে আলো বিস্মিত হয়ে যায়। মেঘালয়ের বুক থেকে মাথা তুলে মেঘালয়ের মুখের দিকে তাকালো। মেঘালয়ের বিষাদমাখা চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে আলোর বুকটা কেঁপে উঠল। “ভালোবাসা” শব্দটা ছাড়া আদৌও কি সংসার চলবে? আলো কি মেঘালয়কে ভালোবাসতে পেরেছে? তিনমাসের সংসারে মেঘালয়কে সে ভালোবাসতে পেরেছে কি?

মেঘালয় কথাগুলো বলার পর আলোর মুখের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করছিল, যেন আলোর মুখ থেকে একটিবার শুনতে পায়,

“ডাক্তার সাহেব আমি আপনাকে খুব বেশী নয়, সামান্য ভালোবাসতে পেরেছি। এতটুকুতে চলবে তো আপনার?”।

কিন্তু, বোকা আলো যেন মেঘালয়ের হৃদয়ের আকুতি শুনতে পেলো না।

—আপনাকে অনেক অনেক ভালোবাসি, মেঘ। কিন্তু, মুখে বলার সাহস যে আমার নেই। পৃথিবীর সবচেয়ে বোকা প্রেমিকা বুঝি আমি নিজেই। যে কিনা বুকভর্তি ভালোবাসা বয়ে নিতে পারছি। অথচ, বলতে পারছি না। কারণ, আমার যোগ্যতা কই? আপনাকে ভালোবাসি বলার মত একটা মূল্যবান শব্দকে খরচ করব।

আলোর মনের কথা মনে রয়ে যায়। আলোর বুকের মাঝে চিনচিন ব্যাথা অনুভব হয়৷ মেঘালয়কে না বলা অনুভূতিগুলো বলতে না পারার কষ্ট তাকে কাবু করে ফেলেছে। মেঘালয় তো কেবল তার মায়ের ইচ্ছাপূরনের জন্য বিয়ে করেছে তাকে৷ এই যে বিয়ে ঠিক হবার পর থেকে মানুষটাকে তাকে স্পেশাল ফিল করায়। হয়ত, কৃতজ্ঞতাবোধ থেকে। মেঘালয় হচ্ছে তার মায়ের নেওটা। যেই সন্তানেরা মায়ের নেওটা হয়, সেইসব সন্তানেরা সবসময় মায়ের পছন্দের মানুষদের নিজেদের পছন্দের মানুষ হিসেবে মেনে নেয়। মেঘালয়ের বেলায় হয়ত তাই ঘটেছে।

মেঘালয়কে বলা হয় না তার হৃদয়ের কথাগুলো। হয়তো কোনোদিন বলা হয়ে উঠবে না । কি বলবে সে, মেঘালয়কে? “আমাকে সবই তো দিলেন এবার আমার ভালোবাসার দায়ভার গ্রহণ করুন”। মানুষটা তাকে ভালোবাসে সেরকম কিছু কখনোই তো বলেনি। এখন সে কিভাবে বেশরমের মত ভালোবাসার দাবি নিয়ে দাঁড়াবে মেঘালয়ের সামনে?

মেঘালয়ের কেন জানি আজ মনে হচ্ছে আলোকে জোর করে বিয়েতে রাজি হবার প্রেশার ক্রিয়েট করা উচিত হয়নি। মেয়েটা তো শুরু থেকে তাকে বিয়ে করতে চায়নি। শুধুমাত্র মাহরীনের ইচ্ছাপূরণ করতে গিয়ে মেঘালয় কেবল স্বার্থপরের মত নিজের দিকটা ভেবেছিল। আলোর দিকটা ভাবেনি। কিন্তু, গত তিনমাসে মেঘালয় একটু একটু করে আলোর প্রতি দূর্বল হচ্ছে ? বিরক্তি চোখে তাকিয়ে থাকা আলোকে দেখে মেঘালয়ের মনে সেই যে ভালোলাগার ক্ষত সৃষ্টি হলো। সেই থেকে ক্ষতের পরিমান বাড়ছে। বিয়েটা হয়ত মাহরীনের চাওয়ার কারণে হয়েছে। কিন্তু, আলোকে ভালোবেসে ফেলা, আলোকে নিয়ে সংসার করা এইসব মেঘালয়ের হৃদয়ের চাওয়া। আলোকে ছাড়া তার যে চলবে না। আলোকে ছাড়া নিজেকে ইদানিং শূণ্য অনুভব করে মেঘালয়। সারাদিনের ব্যস্ততা কাটিয়ে বাড়িতে ফিরে মিথ্যাবতীর শ্যামা দেহটাকে বুকে আগলে না ধরা পর্যন্ত সে তো শান্তি অনুভব করতে পারে না। অথচ, লোকমুখে প্রচলিত হয়ে গেছে, মেঘালয় নাকি আলোকে কোনো একদিন ভুলে যাবে। সেই কোনো একদিনটা হয়ত মেঘালয়ের মৃত্যুরদিন হতে পারে। এরআগে মেঘালয় কোনোদিনও ভুলতে পারবে না, তার মিথ্যাবতীকে।

দুজনের না বলা কথাগুলো হৃদয়ের অতলে গহ্বরে হারিয়ে গেলো। সৎ সাহসের অভাবে বলা হয়ে উঠলো না। ভুল চিন্তাধারার কারনে দু’জনের হৃদয়ের কথা চাপা পরে গেল। অথচ, চাইলেই দুজনেই মনের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারত।

চলবে….

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply