মাই টক্সিক হাসব্যান্ড
পর্ব_৩৪
কলমেতাসনিমতালুকদার_বুশরা
হ্যাশট্যাগ ছাড়া কপি করা নিষিদ্ধ🚫
প্রায় বিশ মিনিট ধরে কুহেলি নিথর হয়ে পানি ভর্তি বাথটবে পড়ে ছিল।পানি ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে এলে আবরারের বুকের ভেতর আরও ভারী হয়ে উঠল।সে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে কুহেলির দু’হাত ধরে সাবধানে তাকে তুলে নিজের কোলে নিলো।
কোলেই নিতেই কুহেলি আচমকা চমকে উঠে আবার আগের মতো ছটফট করতে লাগল।
আমাকে ছাড়ুন! ছাড়ুন…! আমার মাথা জ্বালায় শরীরটাও জ্বলছে… পানি চাই… পানি….!
তার কণ্ঠে আতঙ্ক,ব্যথা আর অচেনা অসংলগ্নতা।
আবরার এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করল না।কোনো কথা না বলে দ্রুত কুহেলির পোশাক যতটা দ্রুত সম্ভব সাবধানে পরিবর্তন করিয়ে দিল।কুহেলি একটানা হাত-পা ছুটাছুটি করতে থাকে।
সব ঠিক করে আবরার কুহেলিকে কোলে নিয়েই রুমের বেডে এসে বসল।তার বুকের সঙ্গে লেপ্টে থাকা কুহেলি এখনও ছটফট করছে কখনো চোখ খুলছে,কখনো বন্ধ করছে,জ্বলন্ত ব্যথায় যেন দিশেহারা।
আবরার ওর মুখের দিকে তাকাতেই বুকটা হুহু করে উঠল।এটা সেই কুহেলি নয়—এ যেন অন্য কেউ।যে কুহেলিকে সে এত যত্নে, এত ভালোবেসে নিজের পৃথিবীর কেন্দ্রে রাখে তার আজ এমন অবস্থা দেখে সে একদম ভেঙে পড়ল।
তবুও কাঁপা হাতে কুহেলিকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে শান্ত কণ্ঠে বলল,
রোজ পাখি শান্ত হও।কিছু হবে না তোমার।একটু ধৈর্য্য ধরো, সব ঠিক হয়ে যাবে।আমি আছি তোমার পাশে—দেখবে,সব ঠিক করে দেবো।
কিন্তু আবরার জানেই না তার বলা কথাগুলো আদৌ কুহেলির কানে পৌঁছাচ্ছে কি না।কুহেলির চোখ দু’টো অন্ধকারে ডুবে থাকা মানুষের মতো অস্থির।তার নিঃশ্বাস দ্রুত,শরীর কাঁপছে।
হঠাৎই কুহেলি আর সহ্য করতে না পেরে আবরারের বুকের শক্ত করে কামড়ে ধরে চাপা একটা ব্যথা আবরারের বুক দিয়ে ছড়িয়ে পড়ে। তাও আবরার কিছু বলে না চোখ বন্ধ করে দাঁতে দাঁত চেপে তা সহ্য করে এটা ভেবে এতে যদি তার প্রেয়সীর একটু শান্তি লাগে।
কিছুক্ষণ পর কুহেলির সেই তীব্রতা নিজে থেকেই থেমে গেল।কুহেলি নিস্তেজ হয়ে আবরারের বুকে মুখ গুঁজে দিল।আর পরক্ষণেই কান্নায় ভেঙে পড়ে ফিসফিস করে বলতে লাগল,
আপনাকে ঠিক চিনতে পারছি না কিন্তু তাও বলছি আমার মাথাটা খুব জ্বলছে মনে হচ্ছে যেন খুব গরম কিছুতে ধরে রাখা হয়েছে আর শরীরটা খুব ব্যথা করছে যেন ভিতর থেকে কেউ আঘাত করছে বারবার।
কুহেলির কণ্ঠে এমন অসহায়তা যে আবরারের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।সে কুহেলি কে আরো শক্ত করে ধরলো তারপর বললো,
আবরার কুহেলিকে আরো শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে নরম স্বরে বলল,
কিচ্ছু হবে না তোমার আমি সব ঠিক করে দেবো। এখন একটু ঘুমানোর চেষ্টা করো, জান। ঘুমালে ভালো লাগবে।
কুহেলি কোনো উত্তর দিল না।চোখ বন্ধ করেই ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো।তার শরীরের প্রতিটা কাঁপুনি আবরারের বুকের ভেতর বিদ্ধ হচ্ছিল তীরের মতো ধারালো, যন্ত্রণাদায়ক।
বিশেষ করে সেই একটি বাক্য—আমি আপনাকে চিনতে পারছি না…!আবরারের মনে গেঁথে গেল যেন কারও ছোঁড়া শীতল ধাতব কিছু।
একসময় সে টের পেলো কুহেলির কান্না থেমে যাচ্ছে।শরীরটা আলতো হয়ে এসেছে।
নিঃশ্বাস একটু ভারি, ধীরে মানে ও ঘুমিয়ে পড়েছে।
আবরার খুব সাবধানে কুহেলিকে কোলে থেকে নামিয়ে বেডে শুইয়ে দিল।চাদর টেনে দিল তার গায়ের ওপর।কিছুক্ষণ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল শুধু কুহেলির কপালের কাছে দপ করে ওঠা নিঃশ্বাস দেখছিল।
তারপর সে ওর হাতটা নিজের হাতে নিলো।
ধীরে, খুব ধীরে আঙুলগুলো চাপ দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
পাখি যার কারণে তুমি এতোটা কষ্ট পাচ্ছো তাকে আমি ছাড়বো না।তার জীবন আমি শেষ করে দেবো।তোমাকে যে যন্ত্রণা দিয়েছে ঠিক সেই ব্যথা তাকে সহ্য করতে হবে।
শব্দগুলো ঠান্ডা।
অটল।
অবিচল প্রতিজ্ঞার মতো।
শেষবারের মতো কুহেলির চেহারার দিকে তাকিয়ে আবরার উঠে দাঁড়াল।তার চোখে এখন ভয় নেই
রাগ নেই—বরং একটি গভীর, হিসেবি।
রুমের দরজা আস্তে খুলে বেরিয়ে গেল সে।
কুহেলি ঘুমন্ত অবস্থায়ও যেন একটু কেঁপে উঠলো
আর রুমটিতে রয়ে গেল শুধু তার নিঃশ্বাসের শব্দ আর আবরারের রেখে যাওয়া প্রতিজ্ঞার ভারী ছায়া।
~~
গোডাউনের ভেতরে আলো কম।একটা মাত্র বাল্ব মাথার ওপরে দুলছে,যেন প্রতিটা দুলুনিতে পরিবেশটা আরও ভয়ংকর করে তুলছে।দেয়ালের কোনায় ছায়া জমে আছে,আর বাতাসে শুকনো ধুলোর গন্ধ।
ফাহিমকে মাঝখানে একটা কাঠের চেয়ারে বসানো হয়েছে।হাত-পা বাঁধা নয়, তবু যেন সে এখানকার রাজা—কোনো ভয় নেই,কোনো অস্থিরতা নেই।
মুখে এক অদ্ভুত,উদাসীন হাসি।
আবরার প্রবেশ করতেই ফাহিম চোখ তুলে তাকাল।তারপর খুব ধীরে—একটা বাঁকা হাসি দিল।অপরাধীর নয়, যেন কারও গোপন জয়ীর হাসি।
এই হাসি টাই আবরারের মাথায় আগুন ধরিয়ে দিল।
সে এক মুহূর্তও অপচয় করল না।দ্রুত এগিয়ে গিয়ে ফাহিমের সামনে দাঁড়াল—তারপর ঝটকা দিয়ে তার মুখ বরাবর একটা সজোরে আঘাত করল।
ফাহিমের মাথা একটু কেঁপে গেল।ঠোঁটের পাশে হালকা রক্তরেখা ফুটল—সামান্য, কোনো গ্রাফিক নয়।কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে ফাহিম আবারও হাসল।
আর সেই হাসিটা এবার যেন আবরারের বুকের মধ্যে কাঁটা বিঁধিয়ে দিল।
আবরার এবার ফাহিমের কলার চেপে ধরে দাঁড় করালো তার কণ্ঠ থরথর করছে রাগে, যন্ত্রণায়, অসহায়তায়।তারপর রাগি কন্ঠে বললো,
বল!আমার পাখিকে কী করেছিস তুই?ও ঐভাবে কাঁপছে কেন?কেন আমাকে চিনতে পারছে না? কী করেছিস বল!
ফাহিম কাঁধ ঝাঁকালো।
তার চোখে একটা অমানুষিক শান্তি।
আরে, শান্ত হ এত উত্তেজিত হয়ে যাচ্ছো কেন? এতো উত্তেজিত হওয়া শরীরের জন্য ভালো না।
আবরার আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল,তখনই ফাহিম হাত তুলে থামার ইশারা করল।
আবরার অনিচ্ছা সত্ত্বেও কলার ছেড়ে দিল।
সে একটু পিছিয়ে দাঁড়াল,কিন্তু তার চোখে যে আগুন জ্বলছে, সেটা দেখে যেকোনো মানুষ ভয় পেত।
ফাহিম পুনরায় চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল।
যেন সে আরাম করে গল্প করার সুযোগ পেয়েছে।
তারপর বলতে শুরু করলো,
আসলে আমি অনেক দিন ধরেই একটা জিনিস নিয়ে কাজ করছি। একটা মেডিসিন এমন একটা ফর্মুলা যা মানুষের স্মৃতি মুছে দিতে পারে।তবে হ্যাঁ অতীতের সব স্মৃতি মুছে দিবে।যেমন কুহেলি তোদের সবাই কে ভুলে গেছে অথচ আমাকে ভুলে নি কজ ঐ মেডিসিন শরীরে যাওয়ার পর সর্বপ্রথম আমাকে দেখেছিলো তাই ঐ মেডিসিন যখন কাজ শুরু করে শুধু আমার কথাই মনে করবে..! আর তোদের কাউকে চিনবে না।
তারপর ফাহিম একটু থেকে পুনরায় ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে তোলে বলতে লাগলো,
আমি প্রথমে এটা শুধু গবেষণা হিসেবেই করছিলাম।কিন্তু যেদিন শিশা এসে বলল,কুহেলি নাকি তর কাছে তুই বন্দি করে রেখেছিস পরে আমি খুঁজ লাগালাম কুহেলি কে তুই সত্যি বন্দি করেছিস নাকি ও নিজ ইচ্ছে তেই আছে।পরে জানতে পারলাম কুহেলি নিজ ইচ্ছে আছে বর্তমানে যদিও আগে তুই বন্দি করে রেখেছিলি!
ফাহিম এক পর্যায়ে কথা বলতে বলতে উঠে দাঁড়ায়। দু’হাত পকেটে ঢুকিয়ে বলতে লাগলো,
ঠিক সেই দিন থেকেই আমার কাজটা বদলে গেলো।গবেষণা আর গবেষণা রইলো না এটা পরিণত হলো মালিকানার অনুভূতিতে। আমি আরও মনোযোগ দিয়ে সেই মেডিসিন বানাতে লাগলাম।রাত জেগে, খাওয়া-দাওয়া বাদ দিয়ে শুধু একটাই ভাবনা কুহেলি যেন শুধু আমার হয়।
তার চোখে অদ্ভুত এক দীপ্তি।
ওকে আমি মাত্র তিনটি ডোজ দিলাম। হ্যাঁ,মাত্র তিনটা। আর এতেই কুহেলির মাথার ভেতরের পুরো দুনিয়া বদলে গেল। সে তার অতীতের মানুষদের চিনতে পারছে না কিন্তু আমাকে— শুধু আমাকেই মনে রাখছে।
ফাহিম একটু ঝুঁকে আবরারের চোখের দিকে তাকিয়ে বললো,
যখন কুহেলি শুধু আমাকে বাদে আর কাউকে না চিনে তখন আমার এক অদ্ভুত আনন্দ লাগে বলেই হাসতে লাগলো।
গোডাউনের অন্ধকারে বাতি মাত্র দু’টি জ্বলছিল। চারপাশে পুরনো কাঠের বাক্স,ধুলো আর বন্ধ হয়ে থাকা গন্ধে পুরো জায়গাটা যেন আরও ভারী লাগছিল।
আবরারের রাগ কমানোর বদলে আরও জ্বালিয়ে দিল।
হঠাৎই ধাক্কা।
ফাহিম ভারসাম্য হারিয়ে ফ্লোরে পড়ে গেল।পড়ে যেতেই আবরার ঝড়ের মতো এগিয়ে গিয়ে ফাহিমের বুক বরাবর দুইটা লাথি মারে। তারপর ফাহিমের কলার ধরে দাঁড় করিয়ে বলে,
তোর কাছে কুহেলিকে ঠিক করার মেডিসিন আছে,তাই না?
ফাহিম কষ্টে শ্বাস নিতে নিতে ফিসফিসিয়ে বললো,
অবশ্যই আছে…!
আবরারের চোখ জ্বলছিল। সে ফাহিমের শার্টের কলার ধরে তুলে দাঁড় করালো।
কিন্তু আবরার কিছু বলার আগেই ফাহিম এক অদ্ভুত শান্ত স্বরে বললো,
আমি দেবো কিন্তু একটা শর্ত আছে!
আবরার চোখ সরু করে তাকালো!
ফাহিম একটু এগিয়ে এসে আবরারের কানে খুব আস্তে করে কিছু একটা বললো।
ফিসফাসটা এত নিচু স্বরে ছিল যে গোডাউনের ভাঙা দেওয়ালও সেটা শোনেনি।কিন্তু আবরারের মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল মুহূর্তেই।চোখে বিরক্তি, ঠোঁটে হালকা তাচ্ছিল্য—
এই ইচ্ছে? কখনোই পূর্ণ হবে না।তারপর ধীরে ধীরে হাসলো সে—তবুও তোর শর্তটা মেনে নিলাম।
ফাহিম স্তম্ভিত।
শর্ত মেনে নেওয়ার কথা আশা করেনি।
আচ্ছা,শুধু এই কথাটাই বলতে পারলো সে।
আবরার তীক্ষ্ণ, কাঁপা কণ্ঠে বললো,তুই এখনই ডোজ দিবি কুহেলিকে।ওর এমন অবস্থায় দেখতে পারছি না আর।
ফাহিম মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।কিছুটা ভীত, কিছুটা অস্বস্তিতে যেন তার গলা শুকিয়ে যাচ্ছিল।
দু’জনেই দরজার দিকে এগিয়ে গেল।গোডাউনের লোহার দরজা ঠেলে খোলার সাথে সাথে একটা ঠাণ্ডা বাতাস ভেতরে ঢুকে আলোটাকে কাঁপিয়ে দিল।
আবরার দরজার বাইরে পা রাখলো।
ফাহিমও তার ঠিক পেছনে।
দু’জনের ছায়া বাইরে রাস্তার আলোয় লম্বা হয়ে পড়লো আর তাদের ছায়া যেন ইঙ্গিত দিচ্ছিল
এই গল্প এখনই বাঁক নিতে যাচ্ছে।
চলবে....!
Share On:
TAGS: তাসনিম তালুকদার বুশরা, মাই টক্সিক হাসব্যান্ড
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৩২
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৫
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ২০
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৪৪
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৩১
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৪
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ১৭
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ২২
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৪২
-
মাই টক্সিক হাসব্যান্ড পর্ব ৩০