ভালোবাসার_সমরাঙ্গন || ৪ ||
সারিকা_হোসাইন
মির্জা বাড়ির প্রধান বড় বসার ঘরে বসে বসে এক মনে পত্রিকা পড়ছেন দেওয়ান মির্জা।পাশেই আদনান মির্জা ব্যাবসায়িক খাতা খুলে টাকা পয়সার হিসেব মিলাচ্ছেন।রেহনুমা ধীরগতিতে এক কাপ চা এগিয়ে শুধালো
“নাস্তা দেবো?
আদনান মির্জা না বোধক মাথা নাড়িয়ে পুনরায় কাজে মন দিলেন।কাজের ছেলে আক্কাস অতন্দ্র প্রহরীর ন্যয় দেওয়ান সাহেবের মাথার কাছে দাঁড়িয়ে এদিক সেদিক নজর বুলিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠলো
“চামেলি আজ সকালে জ্যন্ত পিঁপড়া খায়নাই নানা জান।ওরে শাস্তি দিমু?হাত পা বাইন্ধা ফালায় রাখমু?
আক্কাসের অহেতুক কথায় চোখ গরম করে একবার উপরে তাকালেন দেওয়ান মির্জা এরপর পুনরায় পত্রিকায় পড়ায় মন দিলেন।রান্না ঘর থেকে আচঁলে হাত মুছতে মুছতে বেরিয়ে এলেন শায়লা।মৌনতা কে কোত্থাও দেখা যাচ্ছে না।কোথায় কোন অকাজে যোগ দান করেছে কে জানে?মনে ভয়ার্ত সংকোচ নিয়ে দরজার কাছে আসতেই লম্বা লম্বা পা ফেলে ভেতরে ঢুকলো রণ।রণকে দেখে শায়লা বিস্ফারিত নেত্রে তাকিয়ে বড় গলায় বললেন
“রণ!সেকি রে বাবা?তোর কপাল কাটলো কি করে?
শায়লার মুখে রণ নাম শুনে সকলেই উঠে দাঁড়িয়ে দরজায় তাকালো।রেহনুমা কেবলই নিজের ঘরে পা বাড়িয়েছিলেন।ছেলে এসেছে শুনে দ্রুত পায়ে নামলেন।আদনান মির্জা রণ’র সম্মুখে দাঁড়িয়ে ব্যস্ত গলায় শুধালেন
“একটা ফোন করে আসবে না?আর এমন অঘটন কিভাবে হলো?
একে একে সকলেই ব্যস্ত হলো সেই সাথে রণ’কে জড়িয়ে কেঁদে উঠলেন রেহনুমা।ছেলে জতখন বাড়ির বাইরে থাকে তিনি মনে শান্তি পান না।সারাক্ষন মনটা কু গায়।এই বুঝি কোনো খারাপ খবর আসে।দেহে প্রাণ থাকে না।ছেলের আগত বিপদ চিন্তা করে কাঁদতে কাঁদতে তিনি সারা বছরের অসুস্থ রোগী।বছরে এক,দুবার সাক্ষাৎ পাওয়া যায় ছেলের।তন্মধ্যে ছেলে এমন আহত হয়ে ফিরলে মাতৃহৃদয়ে কিরূপে সয়?
মৌনতা দূর থেকে দাঁড়িয়ে সবটা দেখে ভয়ে ঘাবড়ে উঠলো।যদি রণ মুখ খোলে তবে শায়লা বাড়িতে নাচন কোদন করে বিচ্ছিরি অবস্থা তৈরি করবে।পিঠেও পড়বে কয়েক ঘা।আদরের ছেলের এহেন আঘাত রেহনুমা বা আদনান মির্জা কেউই মানবে না।নিজের কপালে শনি লেগে গেছে ভেবে আলগোছে পালাতে চাইলো মৌন।কিন্তু শায়লা গলা বাড়িয়ে ডাকলো
“এখানে আয় মৌন।
মায়ের গম্ভীর ভারী ডাকে মৌনতার শরীর ঝাকুনি দিয়ে উঠলো।সে গাছের পেছনে লুকিয়ে পড়তে চাইলো।কিন্তু পারলো না। মনে মনে উপর ওয়ালাকে ডাকতে ডাকতে কম্পিত ত্রস্ত পায়ে বসার ঘরে উপস্থিত হলো।ভীরু চোখে একবার মিলিটারি পুরুষটাকে দেখলো।এখনো কপাল থেকে বিন্দু বিন্দু রক্ত ঝরছে।শায়লা মৌনতার বাহু খামচে ধরে সন্দিহান চোখে সকলের সামনে শুধালো
“রণ’র সাথে তোর দেখা হয়েছে সবার আগে?
শায়লা যথেষ্ট বুদ্ধিমতী রমণী।মানুষের চোখ মুখ দেখে মনের ভেতরে লেখা পড়ে ফেলার অদ্ভুত ক্ষমতা আছে এই চতুর মহিলার।রণ ঘটনা পাল্টে দিতে মৌনতার পাংশু মুখের পানে তাকীয়ে ফট করে বলে উঠলো―
“ওর সাথে আমার দেখা হয়নি ছোট মা।গ্রামের কোনো বাচ্চা ভুলে বল মেরেছে আমার চলতি গাড়িতে।কাঁচ ভেঙে আমার কপাল কেটে গেছে।আর আমি এমন হুট করেই চলে আসি তা তো তোমরা সকলেই জানো।
রণ’র উত্তরে শায়লা নিঃশব্দে মৌনতার বাহু ছেড়ে দিয়ে দিলো।কারন মৌনতা আর রণ’র সম্পর্ক এতোটাও আমে দুধে নয় যে,মৌনতা কে সে বাঁচাতে চাইবে মিথ্যে বলে।বরং এমন কান্ড মৌনতা ঘটালে রণ নিজেই তাকে টেনে হিচড়ে নিয়ে এসে বিচার বসাতো সকলের সামনে। শায়লা তপ্ত শ্বাস ছেড়ে বলে উঠলো
“ঘর থেকে স্যাভলন তুলার বাক্স টা নিয়ে আয় মৌন।
মৌনতা যেনো হাফ ছেড়ে বাঁচলো।সে পড়িমরি করে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলো।
রণ কে জোর করে একটা সোফায় বসানো হলো।এরপর তার যত্ন আত্মির ব্যবস্থা করা হলো।মৌনতা জরুরি মেডিসিন বাক্স নিয়ে শায়লার হাতে দিলো।রেহনুমা ছেলের শঙ্কায় কেঁদেই চলছেন।কোন বাচ্চা এই বে টাইমে বল খেলছিলো তা নিয়ে হম্ভীতম্ভী শুরু করলো আক্কাস।সেই বাচ্চাকে খোঁজে বের করার প্রতিশ্রুতি জারি করে রণ’র উদ্দেশ্যে আক্কাস বললো
“ওই বজ্জাত বাচ্চা গুলারে যদি বাড়ির পুষ্কর্নীর মধ্যে না চুবাইছি তাইলে নাম বদলায় ফালামু মিলিটারি ভাইজান।আফনে খালি কন কোন জায়গায় এই ঘটনা ডা ঘটছে।
আদনান মির্জা হাত উঁচিয়ে বলে উঠলেন
“আহ হা আক্কাস এসব চিৎকার চ্যাচামেচি এখন করিস না তো।তুই বাইরে যা।ছেলেটা এতো দূর থেকে এসেছে।ওকে একটু শান্ত থাকতে দে।
আক্কাস আদেশ মেনে বাইরে গিয়ে দাঁড়ালো।রণ শায়লাকে অনুরোধ এর স্বরে বলে উঠলো―
“ছোট মা!কি রান্না করেছো?আমাকে ভাত দাও।খুব খিদে পেয়েছে।খুব ভোরে বেরিয়েছি ।এখন প্রায় সন্ধ্যা।
বলেই শায়লার হাত থেকে বাক্স কেঁড়ে মৌনতার উদ্দেশ্যে বললো
“মৌন তুই বরং আমার ক্ষত টা পরিস্কার কর।সারাদিন বসে বসে খেয়ে গায়ে ম্যালা চর্বি জমিয়েছিস।দেখি একটু কাজ করতো।
শায়লা মাথা ঝাকিয়ে উঠে গেলেন খাবার আনতে।মৌনতা কাঁপা হাতে তুলো নিয়ে জলে স্যাভলন মিশিয়ে ভয়ে ভয়ে কপালের কাছে হাত নিলো।এরপর চোখ খিচে বন্ধ করে কপালে তুলো ছোয়ালো।মৌনতার এমন নড়ন চড়ন হীন কাজে রণ দাঁত চিবিয়ে বললো
“ব্যথা আমি পেয়েছি মৌন।তুই না।তাই নড়বড়ে কাজ বাদ দিয়ে তাড়াতাড়ি কর।আমার ফ্রেস হতে হবে।অনেকটা পথ জার্নি করে এসেছি।চোখে বড্ড ঘুম আমার।
রণ’র ধমকে চোখ খোলে হাত চালালো মৌনতা।মাঝে মাঝে ক্ষততে জোরে ব্যথা দিয়ে ফেললো সে।কিন্তু রণ দাঁত চেপে সব সয়ে নিলো।
যখন পরিস্কার এর কাজ শেষ করে ক্রিম মাখিয়ে ব্যন্ডেজ করতে উদ্যত হলো মৌনতা ঠিক সেই সময় কালো মণি দ্বয়ের সাথে সাক্ষাৎ হলো মৌনতার।রণ’র চোখ দুটোর ভাষা বড্ড কঠিন।মনে হচ্ছে চোখের মাধ্যমে মৌনকে অনেক কিছু বোঝাতে চাইছে সে।কিন্তু ঘিলুহীন মৌনতা একটা কথাও বুঝতে পারছে না।হঠাৎ কি হলো কে জানে?
ছো মেরে মৌনতার হাত থেকে ব্যন্ডেজ কেঁড়ে নিয়ে রণ বলে উঠলো
“সরে যা সামনে থেকে।তোকে দেখলেই চরম মেজাজ চটে যায়।
রণ’র শীতল ঠান্ডা হুমকিতে মৌন ভয়ে ভয়ে সটকে পড়লো।দেওয়ান মির্জা এতক্ষন পর মুখ খোলে শুধালেন―
“এতদিন কোথায় ছিলে?একটা ফোন ও তো দাওনা কোনো দিন।বেঁচে আছো নাকি মরে গেছো সেটাও খবর পাই না।তোমার মা তোমার চিন্তায় কাঁদতে কাঁদতে আধমরা হয়ে বেঁচে আছে।এমন চাকরির কি খুব দরকার ছিলো তোমার?
রণ নিজের কপালে ব্যান্ডেজ লাগাতে লাগাতে বলে উঠলো
“দেশকে আমি বড্ড ভালোবাসি দাদা ভাই।সব জেনে শুনেই আমি এই পেশায় হাত বাড়িয়েছি।দেশের মানুষের সুরক্ষায় মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতেও ভয় নেই আমার।আর কারো সাথে চাইলেই আমি যোগাযোগ করতে পারিনা।যেসব জায়গায় আমি থাকি ওখানে নেটওয়ার্ক ও খুব একটা নেই বললেই চলে।কোথায় ছিলাম?কি করছিলাম এসব আমায় জিজ্ঞেস করো না।এসব বলা নিষেধ আছে দাদু।
দেওয়ান মির্জা মাথা চুলকে হাত ইশারায় বলে উঠলেন
“ঠিক আছে জিজ্ঞেস করবো না।তোমার জন্য তোমার বড় ভাইয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান সাত মাস ধরে ঝুলে আছে।তুমি চাইলে আগামী সপ্তাহে ওদের বিয়ের ব্যবস্থা করতে চাই।আছো তো নাকি?
রণ মাথা ঝাকিয়ে বললো
“আমি অনেক দিন আছি।আমার জন্য যেসব কাজ ঝুলে আছে তা একটা একটা করে শুরু করো।
শায়লা হাসিমুখে টেবিলে গরম গরম খাবার সাজিয়ে বলে উঠলো
“ফ্রেস হয়ে খেতে আয়।তোর পছন্দের ছোট মাছের চচ্চড়ি আছে পাতে।আর মহিষের ঘন দুধের টক দই।
রণ চারপাশের উৎসুক চোখ মুখ ছাপিয়ে নিজের ঘরে গিয়ে ফ্রেশ হলো।এরপর ফিরে এসে টেবিলে বসলো।খেতে খেতে গলা উঁচিয়ে রণ ডাকলো
“একটু লেবু দিয়ে যা মৌন।অনেক আরাম করেছিস।এবার আমার একটু সেবা যত্ন কর।বহুদিন বাদে তোদের বাড়িতে বেড়াতে এলাম।
মৌন দৌড়ে রান্না ঘরে গিয়ে লেবু কেটে এনে রণ’র পাতে তুলে মিনমিন করে শুধালো
“কতো দিন থাকবে?
আয়েশ করে ভাত চিবুতে চিবুতে রণ জবাব দিলো
“যতদিন তোর ঘিলুতে অংক ইংরেজি না ঢুকছে তত দিন।আর কত ফেল করবি?ফেইল নামক জিনিস টাও আজকাল তোকে দেখে লজ্জা পাচ্ছে।তাই বাধ্য হয়ে তোকে পাশ করানোর দায়িত্ব নিতে হচ্ছে।
বলেই পুনরায় খাওয়ায় মন দিলো।এরপর আবারো বলে উঠলো
“বই নিয়ে আমার ঘরে আয়।দেখি কি সমস্যা তোর।
রণ’র রুমে গিয়ে অংক ইংরেজী পড়তে হবে ভাবতেই মৌনতার চোখ গোল হলো সেই সাথে ভয়ে রক্তিম গাল ফ্যাকাসে হলো।সে বাঁচার তাগিদে শায়লার পানে তাকালো।শায়লা একবার দেওয়ান মির্জার পানে তাকালো এরপর মৌনতার পানে।দুজনের চেহারাই বাংলার পাঁচের মতো।শায়লার জলন্ত অঙ্গারের ন্যয় মনটা এবার বোধ হয় একটু আরাম পেলো।মনে মনে পৈশাচিক হাসলো সে।দাদা নাতনি কে আচ্ছা শায়েস্তা করা গেলো এবার।মনের ভাবনা মনে ফেলে দাঁত কড়মড় করে শায়লা বলে উঠলো
“মাথার গোবর গুলো পারলে সাফ করে দিস বাবা।গোবরের গন্ধে সমাজে টিকতে পারছি না।এবারও ফেল মারলে তোর চাচা আর আমি গলায় দড়ি দেবো।এই বাড়িতে এই মেয়েকে কেউ শাসন করতে পারে না।বেশি আদরে লাফিয়ে চলা বান্দরে পরিণত হয়েছে।পারলে একটু বোঝদার আর স্থির বানাস।প্রয়োজনে কাঁচা কঞ্চি দিয়ে পিঠ ফাটিয়ে দে।আমি বিন্দুমাত্র অভিযোগ করবো না।আমি তো আর শাসন করতে পারছি না।তাই তোর হাতে সমস্ত দায়িত্ব তুলে দিলাম।যদি চাস ছোট মা বেঁচে থাকুক তবে যা যা বললাম সব অক্ষরে অক্ষরে পালন করিস।
বলেই টক দই তুলে দিলো রণ’র পাতে।
এদিকে মায়ের এহেন আস্কারায় মৌনতার শরীর থর থর করে কাঁপলো।সে বাঁচতে চাইলো এই হিংস্র পুরুষের খপ্পর থেকে।সে অনুনয় করে দেওয়ান মির্জাকে বলে উঠলো
“দাদু তুমিও চলো ও ঘরে।
দেওয়ান মির্জা উত্তর করবার আগেই খাওয়া শেষ করে রণ বলে উঠলো
“পরীক্ষা তুই দিবি।তোর দাদু ভাই না।চল আমার সাথে।দাদু নাতনীর বহু ভালোবাসা হয়েছে।এবার আমার সঙ্গে ভালোবাসা হোক তোর।
রণ’র এহেন কথায় সকলের চোখ কপালে উঠলো।পরিস্থিতি বাগে আনতে চোখ মুখ কঠিন করে রণ বলে উঠলো
“উপমা হিসেবে ব্যবহার করেছি।চোখ উল্টানোর কিছুই নেই।
বলেই বড় বড় কদম ফেলে নিজের ঘরে গিয়ে ঢুকলো।
রণ’র কক্ষের দরজার সামনে বুকে বই চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছে মৌন।বাড়ির সকল মানুষ আজ কেমন নির্দয় তার প্রতি।রেহনুমা পর্যন্ত তাকে বাঁচাতে আসছে না।বিগত দিনে পিয়াল যা পড়িয়েছে সব ভুলে গেছে সে।বীজ গণিতের সূত্র গুলো পর্যন্ত মনে নেই।বিজ্ঞ শিক্ষকের ন্যয় রণ শুরুতেই তাকে সূত্র গুলো ধরবে এটা মৌনতা জানে।কিন্তু সেসব তো তার ঘিলুতে নেই।এবার তবে উপায় কি?
মৌনতার ভাবনার মাঝেই রমরমে আওয়াজ ভেসে এলো
“অযথা সময় অপচয় করছিস তুই।ভেতরে আয়।
রণ’র গলায় চমকে উঠলো মৌন।ভেতর থেকে দরজা লাগানো অথচ মানুষটা কি করে তার উপস্থিতি টের পেলো?ভেবেই ঘেমে উঠলো মৌন।।।
“ভাইয়া কি জাদু জানে?নাকি ঘরের বাইরেও তার চোখ ঘুরে বেড়ায়?
মনের ভাবনা ফেলে গুটিগুটি পায়ে মাথা নিচু করে ভেতরে ঢুকলো মৌন।রণ’র ঘরের কোণায় একটা রিডিং টেবিল আছে।সেই টেবিলে এর আগেও পড়তে বসেছে মৌন।পড়ার চাইতে মার চলে বেশি এখানে।বিগত স্মৃতি মনে পড়তেই বুক দুরুদুরু করে উঠলো তার।এরপর সন্তপর্নে নিঃশব্দে চেয়ার টেনে বসে বইয়ের প্রথম অনুশীলন খুললো।রণ গলা ঝেড়েঝুরে পাশের চেয়ারে বসতেই দরজায় কেউ নক করলো।
“এসো ছোট মা।
এবারও মৌনতার চোখ বিস্ফারিত হলো।কারো অবয়ব না দেখে কিভাবে এই মানুষটা সকলের উপস্থিতি নাম সহ টের পাচ্ছে তা জানার জন্য তার মন আকুপাকু করলো।এই গুণ তার মধ্যে যদি কোনো ভাবে ট্রান্সফার করা যায় তবে পাড়ায় বেশ সুনাম অর্জন করবে সে।সকলের কাছে মৌনতা জাদু জানে বলে ঢাক ঢোল পিটিয়ে সম্মানের চূড়ান্ত পর্যায়ে অবস্থান করতে পারবে।মৌনতার কল্পনার মাঝেই ঘরে ঢুকলো শায়লা।এরপর আচঁলের তলা থেকে একটা টনটনে শক্ত কঞ্চি বের করে টেবিলের উপর আলগোছে রেখে চোখে মুখে প্রতিশোধ পরায়ণতার ভাব নিয়ে বলে উঠলো
“যখন প্রথম বার ফেল মেরেছিলো তখনই এটা বানিয়েছিলাম।কিন্তু তোর দাদূর কারনে কোনো দিনও ওর পিঠে চালাতে পারিনি।আদর ভালো।কিন্তু অতিরিক্ত আদরে মানুষ বাদর হয়।মানুষ তোর দাদুর ভয়ে কিছু বলতে না পারলেও আড়ালে ফিসফিস করে কটু কথা শোনায়।মা হয়ে এসব সহ্য করতে আমার কষ্ট হয়।ভিখারি যেভাবে মানুষের কাছে ভিক্ষা চায় সেভাবে তোর কাছে ভিক্ষা চাচ্ছি বাবা।একটু মানুষ করে দে ওকে।ম্যাট্রিক টা পাশ করলেই কারো হাতে তুলে দিয়ে শান্তির ঘুম ঘুমাবো।পাড়া পড়শীর দেয়া লজ্জা,অপমানে আমার ঘুম হয়না।
বলতে বলতে কেঁদে ফেললেন শায়লা।মেয়েটাকে নিয়ে বড্ড ভুগছেন তিনি।গুটি কয়েক ভালো সমন্ধ পর্যন্ত ভেস্তে গেছে মেয়ের দূরদর্শিতার কারনে।মেয়ের ছেলেমানুষি এখন সকলের কাছে মজা লাগলেও পরে এই মেয়েই সকলের চক্ষুশূল হবে।অতিরিক্ত বেয়াড়া মেয়েকে কে পছন্দ করবে?শায়লাকেই তো সব ভুগতে হবে তাই না?
শায়লার এহেন কঠিন কথা প্রথম বারের ন্যয় মৌনতার মাথায় দুশ্চিন্তার ঢেউ তুললো।নিজেকে কেমন অপরাধী আর অপদার্থ মনে হলো।তার ও কান্না পেলো।কিন্তু শক্ত হয়ে নিশ্চুপ বসে রইলো।চোখ মুছে বেরিয়ে গেলেন শায়লা।শায়লা যেতেই মৌনতাকে রণ শুধালো
” (a+b) হোল স্কয়ার এর সূত্র বল।
এবার ঘাবড়ালো না মৌন।সে সূত্র টা পারে না এটা তার ব্যর্থতা।ফর্সা গোলাপি হাত জোড়া নিঃশব্দে রণ’র পানে বাড়িয়ে মাথা নত করে বললো
“বারি মারো রণ ভাই।আমি এই সূত্র পারি না।
মৌনতার অপরাধী মুখের পানে তাকিয়ে তপ্ত শ্বাস ফেললো রণ।এরপর কঞ্চি ময়লার ঝুড়িতে ছুড়ে ফেলে বললো
“তুই অতিরিক্ত চঞ্চল মৌন।চঞ্চলতার জন্য তোর ব্রেন অশান্ত থাকে।যা তোকে ভুলো মনা করে ফেলে।এবার একটু স্থির হ।ছোট মা আর চাচ্চু তোর জন্য অনেক কষ্ট পাচ্ছে।এবারও ফেইল করলে তারা মানুষের সামনে মুখ দেখাতে লজ্জা পাবে।তুই কি তাদের মাথা সব সময় নিচু করেই রাখবি?বাবা মায়ের লজ্জানত মাথা দেখতে তোর ভারী আনন্দ হচ্ছে বুঝি?
মৌন চোখ তুলে অসহায়ের ন্যয় রণ’র পানে তাকালো।এরপর কম্পিত গলায় বললো
“এবার আমি পাশ করবো রণ ভাই।তুমি আমাকে বলো আমার কি কি পড়তে হবে।
আজ মৌনতা কে কোন ধমক,চোখ রাঙানি বা কটু কথা কিচ্ছুটি বললো না রণ।সে ধৈর্য্য বান শিক্ষকের ন্যয় মৌনতা কে বোঝাতে লাগলো।ধীরে ঘন্টা দেড় যেতেই কিছুটা ফ্রি হলো মৌন।এরপর সে সময় সুযোগ বুঝে আগ্রহ ভরা চোখ মুখে শুধালো
“কাউকে না দেখেই কিভাবে তার নাম বলে ফেললে তুমি রণ ভাই?
রণ স্বাভাবিক মুখে শুধালো
“তুই শিখতে চাস?
তাৎক্ষণিক মাথা নাড়ালো মৌন।রণ অল্প হেসে বললো
“এর জন্য চিকন বুদ্ধির দরকার।তোর বুদ্ধি তো মোটা।কিভাবে শিখবি?
“তাইলে বুদ্ধি চিকন করার টেকনিক শেখাও।
“শেখাবো যদি শরীরটা টিপে দিস।লম্বা সময় গাড়ি চালিয়ে শরীরে ব্যথা এসেছে।দিবি?
মৌন খুশিতে ডগমগ হয়ে বললো
“শুয়ে পড় এক্ষুনি দিচ্ছি।
সুযোগ লুফে নিয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে গেলো রণ।মৌনতা তার নরম হাতটা রণ’র কোমরে লাগিয়ে ধীরে ধীরে চাপ প্রয়োগ করলো।অজানা শিহরনে বালিশ খামচে ধরে রণ চোখ বুজে আনমনে বলে উঠলো
“শরীর জুড়ে যেই আগ্নেয়গিরি জ্বালিয়ে দিচ্ছিস তা তুই ছাড়া কে নেভাবে মৌন?তুই কি শীতল বর্ষণ হয়ে আমায় ভেজাতে পারবি?নাকি এই আগুনে দগ্ধ হয়ে আমার ভস্মীভূত ছাই দেখার জন্য অপেক্ষা করবি?
চলবে…
Share On:
TAGS: ভালোবাসার সমরাঙ্গন, সারিকা হোসাইন
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ১৫
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ১৬
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ১৭
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ১৯
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ১৩
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ৩১
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ২০
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ১১
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ২৯
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ১