ভালোবাসার_সমরাঙ্গন ||২৯||
“মৌনতা আর আমি আমরা দুজন দুজনকে ভালোবাসি দাদা ভাই।দু বছরের জন্য আমাকে কঙ্গোতে মিশনে যেতে হচ্ছে।তাই আমি চাচ্ছি যাবার আগে মৌনতা কে বিয়ে করে রেখে যেতে।আমি ফিরতে ফিরতে ও কলেজের গন্ডি প্রায় শেষের দিকে মাড়াবে।আর এই বিয়েতে আমার মনে ময়না কারোর অমত থাকবে।যেখানে মৌনতা কে আমি পছন্দ করেছি সেখানে আমার পরিবারের কারোরও কোনো কথা বলার স্কোপ নেই।
কথা গুলো বলে জুসের গ্লাস হাতে তুললো রণ।কথা বলতে বলতে গলাতে রুটি আটকে যাচ্চে।গলাটা একটু ভেজানো দরকার।রণ’র কথা শুনে দেওয়ান মির্জা বেশ খুশি হলেন।মাথার সমস্ত বোঝা যেনো এক নিমিষেই নেমে গেলো।দেওয়ান মির্জা মাথা ঝাকিয়ে হাসলেন মৃদু।অতঃপর হাসিমাখা গলায় বললেন
“এতো ভালো প্রস্তাবে কেউ কি করে অমত করতে পারে?
এমন সময় বাইরে থেকে ঘরে ফিরলেন সাদনান মির্জা।রণ আর দেওয়ান মির্জার প্রত্যেকটা কথা শুনে তিনি কিছুক্ষণ স্তব্ধ রইলেন ।এরপর গর্জে কিছু বলার চেষ্টা করলেন।মনে হচ্ছে ভেতর থেকে কেউ জবরদস্তি চালাচ্ছে পশু সত্ত্বা জাগ্রত করার জন্য।সাদনান মির্জা নিজের খুশি মুখের স্ত্রী আর মেয়ের পানে তাকালেন।ইচ্ছে করেই চোখ মুখে কাঠিন্য ফুটিয়ে বললেন
“অবশ্যই অমত আছে।এই বিয়েতে আমার অমত রয়েছে।আমি রণ’র কাছে মৌনতা কে বিয়ে দেব না আব্বা।
কথাটা বলে মুখ লুকালেন সাদনান মির্জা।ছোট ছেলের এমন ঐদ্ধত্বে দেওয়ান মির্জার মুখ হা হলো চোখ বিস্ফারিত হলো।শায়লা র পুরো পৃথিবী দোলে উঠলো।মৌনতা স্তব্ধ হয়ে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।মনে হলো ফাঁসির কাষ্ঠের আসামি সে ।এখনই তার মৃত্যুর ঘোষণা আসবে।
রণ মৌনতা কে এক পলক দেখে শক্ত গলায় বলল
“কেনো দেবে না?কি কমতি আছে আমার মধ্যে?আমি কি মৌনতা কে সুখে রাখতে পারবো না?তুমি নিজেও জানো ছোট আব্বু মৌনতা আমার কাছে ভালো থাকবে ।তার পরেও কেনো অহেতুক ঝামেলা পাকাচ্ছ?
দেওয়ান মির্জা দাঁত পিষে ধমকে শুধালেন
“এতো বেয়াদবি কেন করছো সাদনান?তুমি তো এমন ছিলে না?হঠাৎ কি এমন হলো?আর রণ’র সাথে মৌনতার বিয়ে না দিলে কার কাছে দিবে তুমি?বেশি বাড়াবাড়ি করো না।আমি যখন বলেছি রণ’র সাথে মৌনতার বিয়ে হবে তার মানে হবেই।কেউ উল্টাতে পারবে না আমার এই ওয়াদা।দেওয়ান মির্জা একবার যাকে কথা দেয় দ্বিতীয়বার সেই কথা আর তুলে নেয় না ।বেশি বাড়াবাড়ি করে মূর্খতার পরিচয় দিও না।
এবার সাদনান মির্জা তেঁতে উঠলেন।তিনি চিৎকার করে বলে উঠলেন
“অনেক হইছে আব্বা ।এবার চুপ থাকেন।জীবনে বহু সিদ্ধান্ত আপনি একাই নিছেন।কোনো দিন কিছুই বলি নাই।এবার একটু থামেন।বয়স হয়েছে আপনার ।আল্লাহর নাম নেন কবরে যাবার প্রস্তুতি নিন।আর আমার মেয়ের বিয়ে নিয়ে কারোর মাথা ঘামানোর প্রয়োজন নেই।আমি ওর অন্যত্র বিয়ে ঠিক করে ফেলেছি।আমার পছন্দ করা পাত্রের সাথেই মৌনতার বিয়ে হবে।আমি তাকে পাকা কথা দিয়ে ফেলেছি।
কথা খানা শোনার সাথে সাথেই রণ’র হাত থেকে খসে পড়লো জুসের গ্লাস।শক্ত টাইলসে বাড়ি খেয়ে চূর্ণবিচূর্ণ হলো নিমিষেই।রণ’র চোয়াল কেঁপে উঠলো সেই সাথে টানটান হলো নাকের পাতা।স্বচ্ছ দুচোখে রক্ত জমলো।এই বুঝি কোল ছাপিয়ে গড়িয়ে পড়ে।দেওয়ান মির্জা চেয়ার ঠেলে উঠে বেরিয়ে এলেন।হাতের লাঠিটা শক্ত করে উঁচিয়ে তেজী কন্ঠে বলে উঠলেন
“চুপ করো বেয়াদব কোথাকার!নিজের বাপের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় তাও ভুলে গেছো?জানোয়ার!এক চড়ে সব কটা দাঁত ফেলে দেব।আমি এখনো আমার আধিপত্য ছাড়িনি।তোমাদের হাতে ক্ষমতাও সোপর্দও করিনি।এখনো আমি সিদ্ধান্ত নেবার জন্য এই বাড়িতে বহাল আছি।
বলেই লাঠি তুললেন ছেলের পানে।বসালেন শক্ত এক বাড়ি।বাড়ি খেয়ে খেঁকিয়ে উঠলেন সাদনান মির্জা।দেওয়ান মির্জার লাঠি টেনে ধরলেন।ছেলের শক্তির সাথে কুলালেন না দেওয়ান মির্জা।তিনি হ্যাচকা টান খেলেন।রণ দৌড়ে এসে বৃদ্ধকে ধরে গর্জে উঠলো
“সাবধান হয়ে যাও ছোট আব্বু।দাদু শারীরিক ভাবে দুর্বল হলেও আমি কিন্তু নই।তোমার এসব কুৎসিত আচরণের জন্য আমি কতোটা নীচে নামবো তুমি চিন্তাও করতে পারবে না।
সাদনান মির্জা রণ’র গালে সপাটে চড় মেরে ধমকে বললো
“কি করবি তুই?আজই চাচার সাথে এতো বড় গলায় কথা বলা?তুই আমাকে মরবি?আমার গায়ে হাত তুলবি?মার দেখি ,আমিও দেখতে চাই কত বড় লায়েক তুই।
শায়লা রেহনুমা দৌড়ে এলো সকলের মাঝে।এসে সাদনান মির্জার হাতে হ্যাচকা টান মেরে গর্জে বলে উঠলো
“আপনি কোন সাহসে রণ’র গায়ে হাত তুললেন মাহিরের আব্বু?আর বাবার সাথে এসব কি করছেন আপনি?পাগল হয়ে গেছেন?এতো অধঃপতন কবে কবে হলো?লজ্জা থাকলে আব্বার কাছে এখনই ক্ষমা চান।
আদনান মির্জা দৌড়ে এসে ধমকে উঠলো সাদনান মির্জাকে।আদনান মির্জা হম্বি তম্বি করে বলে উঠলো
“তোর হাত আমি কে টে নেব ছোট।তুই যেই অপরাধ করেছিস তার শাস্তি হিসেবে তোকে তো জ্যান্ত পুঁতে ফেলতে ইচ্ছে করছে।
রেহনুমা রণকে টেনে নিজের পাশে দাঁড় করিয়ে বলে উঠলো
“আপনাকে অনেক সম্মানের চোখে দেখতাম ছোট মির্জা।আজকের পর থেকে ঘৃণা ছাড়া আর কিছু করতে পারবো না আপনাকে।
সাদনান মির্জা ক্ষেপে বলে উঠলেন
“কে চেয়েছে সম্মান হ্যা?কে চেয়েছে,?বলেছি আমায় সম্মান করতে,?ছেলের হাতে পায়ে বেড়ি পরাও বড় ভাবি।আমার মেয়ের দিকে চোখ মেলে তাকালে ও চোখ আমি তুলে নেব।
রণ চিৎকার করে বলে উঠলো।
“একশো বার তাকাবো।পারলে চোখ তুলে দেখাও।
বলেই মৌনতা কে টেনে নিজের সামনে দাঁড় করিয়ে রণ বলে উঠলো
“বল তোর বাপকে ছেড়ে যাবি আমার সাথে,?বল!বাপের সাথে হা মিলালে গলা টিপে এখনই মেরে ফেলবো।
মৌনতা যেনো ঘোরের মধ্যে আছে।তার বাবা এসব কি বলছে কি করছে সে কিচ্ছুটি যেনো বুঝতে পারছে না।মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করেছে আরো অনেক আগেই।
রণ মৌনতার বাহু ঝাকিয়ে ধমকে উঠলো
“উত্তর দিচ্ছিস না কেনো?জবাব দে হারামজাদী!
মৌনতা ধমকে কেঁপে উঠলো।অতঃপর সাদনান মির্জার পানে ঘৃণিত নজর দিয়ে কেঁদে বলে উঠলো
“আমি তোমার জন্য আমার বাপ মা ,ঘর সব ছাড়তে রাজি আছি রণ ভাই।
সাদনান মির্জা কথাটা শুনে তেড়ে এসে মৌনতার গালে ঠাস করে এক চড় বসালেন এরপর গলা টিপে ধরে বলে উঠলেন
“তার আগেই তোকে মেরে ফেলবো আমি।বাপকে মেরে সুখী হতে চাস?
শায়লা রেহনুমা চিৎকার শুরু করলো।দেওয়ান মির্জা বুক চেপে বসে গেলেন চেয়ারে।রণ দাঁত পিষে ঝটকা টানে সাদনান মির্জার হাত ছাড়িয়ে মুচড়ে ধরে বলে উঠলো
“এবারের অন্যায় ক্ষমার অযোগ্য।বিধাতা যেমন শিরকী গুনাহ ক্ষমা করে না আমিও তেমন এই ঐদ্ধত্ব মেনে নেব না।
বলেই কট করে ভেঙে দিলো সাদনান মির্জার হাত।মৌনতা হাউমাউ করে চিৎকার জুড়লো।সাদনান মির্জা ব্যথায় চিৎকার করে উঠলেন।রেহনুমা আর আদনান মির্জা ছেলেকে ছুটিয়ে আনার চেষ্টা করলেন ।রণ’র শরীরে অসুরের শক্তি।রণ’র হাতে বন্দি হয়েও সাদনান মির্জা বলে উঠলেন
“আমার মেয়েকে আমি মেরে কেটে নদীতে ভাসিয়ে দেব।তবুও তোর কাছে বিয়ে দেবো না।যদি বিয়ে করতেই হয় তবে আমার লাশের উপর দিয়ে বিয়ে করতে হবে।বাপের লাশ সামনে রেখে মেয়ে কি করে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে পারে সেটা আমিও দেখতে চাই।
বলেই মেয়ের পানে তাকিয়ে সাদনান মির্জা বলে উঠলো
“যদি রণকে বিয়ে করিস তবে আমার মরা মুখ দেখবি তুই।সেই সাথে তোর মাকেও ঝুলিয়ে দেবো।
আকস্মিক অনাচারে বাড়ির সকলেই স্তব্ধ হলো।কারো মুখে রা উচ্চারিত হলো না।অনুভূতি হীন হয়ে রণ সাদনান মির্জার হাত ছেড়ে দিলো।দেওয়ান মির্জা হাউমাউ করে কেঁদে বলে উঠলো
“ওরে আমার আল্লাহ!এই দিন দেখানোর জন্য আমাকে বুঝি বাঁচিয়ে রেখেছ তুমি?আমাকে এখনই উঠিয়ে নাও।
বলেই সাদনান মির্জাকে বলে উঠলো
“আমার চোখের সামনে থেকে তুমি দূর হয়ে যাও।তোমার মতো কুলাঙ্গার সন্তান আমি আর দেখতে চাই না।আমি মরলেও আমার কবরে এক মুঠো মাটি দিও না তুমি।
শায়লা স্বামীর পানে ঘৃণিত নজর ফেলে আচঁলে মুখ গুজে কেঁদে বলে উঠলেন
“আপনি মরেই যান মাহিরের আব্বু।আমি সচ্চক্ষে দেখতে পাচ্ছি আপনি মানুষ থেকে অমানুসে পরিণত হয়েছেন।কোনো অমানুষ নিশ্চয় পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে পারে না ।আমি আর আপনার চেহারা দেখতে চাই না।আমাদের সবার দুর্ভাগ্য যে ,এতদিন একই ছাদের নিচে আপনার মত মানুষ রুপি একটা জানোয়ারের সাথে আমাদের বসবাস করতে হয়েছে।আপনি গলায় দড়ি দিন।
বলেই দৌড়ে উপরের ঘরে চলে গেলেন শায়লা।দেওয়ান মির্জার বুকের ব্যথাটা ক্রমশ বাড়লো।সে চোখ মুখ খিচে চিৎকার করে বলে উঠলো
“দাদাভাই আমাকে হাসপাতালে নাও।
বলেই জ্ঞান হারালেন বৃদ্ধ।মুহূর্তেই পাল্টে গেলো পরিস্থিতি।বাপের এহেন অবস্থায় জোরে কেঁদে উঠলেন সাদনান মির্জা।ভাঙা হাত নিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরতে এগিয়ে এলেন।কিন্তু কেউ তাকে ধরতে দিলো না।নিয়ে চললো হস্পিটসলে।
বন্ধ অন্ধকার কক্ষে বসে বসে পাজেল নিয়ে নাড়াচাড়া করছে যুবক।যত কঠিন পাজেলই হোক সেকেন্ডের ব্যবধানে সলভড করে ফেলার অদ্ভুত ক্ষমতা আছে এই যুবকের।পেশায় একজন বিজনেস ম্যান সে।ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে বেশ ধুরন্দ্রর সে।বিধাতা মানুষটাকে সুন্দর চেহারা দিয়েছেন বটে তবে মনটা বড্ড কুৎসিত।চেহারা দেখে বোঝার উপায় নেই মানুষটার ভেতর কতটা ভয়ানক।দিনের বেলা সাধারণের মধ্যে ভোলাভালা সেজে মিশে থাকে রাত হলেই রূপ পাল্টে যায় পুরোপুরি।আন্ডার গ্রাউন্ডে নাম তার “ডার্ক”!
বিভিন্ন চোরাচালান আর ড্রাগ কারবারিতে নিদেশীদের কাছে বেশ সুনাম তার।সকল অথেন্টিক কাজকারবার মিলে তার কাছে।কিন্তু ইদানিং তার সেই সুনাম হারাতে বসেছে।ট্রেনিং প্রাপ্ত আর্মি অফিসার গুলো তার সমস্ত প্ল্যান বানচাল করে তাকে পথে বসিয়েছে।ধীরে ধীরে সমস্ত লিংক লাগিয়ে সেই আর্মি অফিসারের খোঁজ পেয়ে গেছে সে।এবার মূল সমেত তাকে উৎপাটনের পালা।
হাতের পাজেল অন্ধকারে ছুড়ে অদ্ভুত হাসলো যুবক।এরপর হাতের ফোন বের করে কল করলো কাঙ্খিত নম্বরে।ফোন রিসিভ করে ওপাশের ব্যক্তি বললো
“অফিসার বাড়িতেই ভাই।সাদনান মির্জার হাত ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে।বাড়ির সবাই ওই অফিসারের পক্ষে।মনে হচ্ছে পরিবারের সকলের জীবন কেড়ে নিবেন এই ভয়ে ছোট মির্জাকে বেশিদিন ভয় দেখিয়ে রাখা যাবে না।যখন তখন মুখ খুলে দিতে পারে।
ওপাশের কথা শুনে যুবকের ঠোঁটে হিংস্রতা ফুটে উঠলো।সে দাঁত পিষে শীতল গলায় বলল
“নোমান শাহরিয়ার কি কখনো কাঁচা কাজ করেছে?তুলে আনার ব্যবস্থা করো ওই মৌনতা সাবেরিকে।মেজর আমাকে অনেক দৌঁড় করিয়েছে।নেহাত বোনের দেবর বলে এতোদিন ছাড় দিয়েছি।আরে ভাই আমিও মানুষ।দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে চুপ কি করে থাকবো?কিন্তু খবরদার, আমার পাখি যেনো কোনো কষ্ট না পায়।নয়তো সব কটার প্রাণ নেবো।
চলবে
সারিকা_হোসাইন
Share On:
TAGS: ভালোবাসার সমরাঙ্গন, সারিকা হোসাইন
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ৩০
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ১১
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ৪
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ২৪
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ১৭
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ৬
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ২৩
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ১৫
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ৭
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ২৭