ভবঘুরে_সমরাঙ্গন
পর্ব_৫৭
তাজরীন ফাতিহা
নিশাত শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছে। দুইদিন হলো ঘরে চুলা জ্বলেনি। পুরো ঘরটা মৃত বলা যায়। গতকাল স্বামী, স্ত্রী দুজন না খেয়ে থাকলেও আজ মারওয়ান বাইরে থেকে নাস্তা নিয়ে এসেছে। বিড়ালের বাচ্চাটাকে ঝুড়ির ভেতর খাবার দিয়ে নাস্তা নিয়ে রুমে ঢুকে নিশাতকে এলোমেলো অবস্থায় শায়িত দেখল। দুইদিনে শরীর একেবারেই ভেঙে গেছে নিশাতের। ঘুমিয়ে থাকলে একটু শান্ত থাকে বাকি সময় পাগলামি করে। মারওয়ান এগিয়ে এসে তাকে তুলে বসালো। নিশাত শরীর ছেড়ে দিয়েছে মারওয়ানের গায়ে। লম্বা চুলগুলো খুলে ঝট পাকিয়ে গেছে। চোখ লাল হয়ে ফুলে গেছে। গলা বসে গেছে কাঁদতে কাঁদতে। সন্তান হারানো মায়ের হাল এর থেকে ভালো আর কি হবে? মারওয়ানকে দেখে ভাঙা গলায় বলল,
“আমার সন্তানকে এনেছেন?”
মারওয়ান নিজেও বিধ্বস্ত। পুরুষরা নিজেদের ভাঙা রূপ কাউকে দেখাতে পারেনা। এজন্যই তারা পুরুষ। মন, মস্তিষ্কে তুফান বয়ে গেলেও বাইরে একেবারে শান্ত, শক্ত, স্থির। নিশাতের মুখের সামনে রুটি এগিয়ে বলল,
“তুমি খেলেই এসে যাবে, হা করো।”
নিশাতের কান্নার শক্তি ফুরিয়েছে। মুখ ঘুরিয়ে অনুভূতিহীন গলায় বলল,
“আমার সন্তানটা খেয়ে নাকি না খেয়ে আছে আমি জানি না। আর আপনি আমাকে খাবার সাধছেন? নাহওয়ানকে না পাওয়া অবধি একটা দানাও আমার গলা দিয়ে নামবে না।”
মারওয়ান নির্জীব গলায় বলল,
“তুমি অসুস্থ হয়ে পড়েছ। একটু খাও।”
“আল্লাহ আপনাকে কি দিয়ে বানিয়েছে? ছেলের জন্য আপনার এক ফোঁটা কষ্টও হয়না? দিব্বি খাচ্ছেন, ঘুমাচ্ছেন।”
“তো সব কিছু বন্ধ করে দেব?”
মারওয়ানের সোজাসাপ্টা প্রশ্ন। নিশাত তার শরীর থেকে নিজেকে আলাদা করে বলল,
“বন্ধ করবেন কেন? আমার বাচ্চাকে খুঁজে এনে খান নয়তো ঘুমান আমি সেসব দেখতে যাব না। আপনি যেভাবে রিল্যাক্সে আছেন দেখে মনে হচ্ছে ওকে নিজ হাতে তুলে দিয়ে এসেছেন। সত্যি করে বলুন, এসব আপনার কোনো পরিকল্পনা নয় তো?”
“এই পরিকল্পনা করে আমার লাভ?”
মারওয়ানের জিজ্ঞাসু কণ্ঠ। নিশাত মুখ ঘুরিয়ে রেখেই উত্তর দিল,
“সেটার আমি কি জানি? আপনার সম্মন্ধে আমি সঠিক জেনেছি কবে যে বলব এতে আপনার লাভ ক্ষতি কি?
কথাটায় তীব্র অভিমান স্পষ্ট। জীবনসঙ্গী সম্পর্কে না জানা এক নারীর অভিমান, অভিযোগ মিশ্রিত বাক্য। মারওয়ান না হাসল না রাগল। হাতের রুটির টুকরো এগিয়ে দিয়ে বলল,
“তোমার সন্তান খেয়েছে। এইটুকু বিশ্বাস করে খাও।”
নিশাত তার দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল,
“ও খেয়েছে আপনি কী করে জানলেন? ওর খবর জানেন আপনি?”
“না। ওকে না খাইয়ে রাখবে না ওরা। আমাকে ওদের ডেরায় নিতে হবে তো নাকি? ফাইয়াজের ক্ষতি করবে না।”
নিশাতের চোখে মুখে আশার আলো জ্বলেছিল। এক লহমায় তা নিভে গেল। খাটের সঙ্গে হেলান দিয়ে চোখ বুজলো। এই লোকটার সঙ্গে কথা বলা মানে নিজের বেকার খাটনি। কোনো কথার সহজ উত্তর জানা নেই তার। নিশাতকে না খেতে দেখে বলল,
“খাবে না?”
নিশাত চোখ বুজে রেখেই অস্বীকৃতি জানাল,
“না। যতই জোর করেন আমাকে একটা কণাও খাওয়াতে পারবেন না আপনি।”
মারওয়ান তপ্ত শ্বাস ফেলল। খাটে উঠে নিশাতের গা ঘেঁষে বসে বলল,
“ছোটবেলায় আমিও একবার হারিয়ে গিয়েছিলাম।”
নিশাত আগের অবস্থায় পড়ে রইল। কোনো কৌতূহল দেখাল না। মারওয়ানের নজর প্লেটে। সে এক মনে রুটি ছিঁড়তে ব্যস্ত। মারওয়ান বলে যেতে লাগল,
“তখন মাহদী, মাহফুজ, মানহা কেউ ছিল না। সম্পূর্ণ বংশে আমিই প্রথম সন্তান। স্বাভাবিক ভাবে আমার প্রতি সবারই আদর, ভালোবাসা বেশি। দাদাজান পুরো গ্রাম সয়লাব করে ফেলেছেন। মসজিদে মাইকিং করে একেবারে হুলস্থূল কারবার। আব্বাও সাথে সাথেই ছিলেন। চিন্তায় অস্থির হয়ে আমার দুই চাচাও পেরেশান। আম্মার অবস্থা একেবারে শোচনীয়। সেইরকম কান্নাকাটি। কিছুই মুখে নেবে না। কেউ জোর করেও এক ফোঁটা পানি তাকে খাওয়াতে পারেনি। তোমার মতোই অনশনে বসেছিল। হঠাৎ করে মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন। দাদী আম্মার এহেন বেহাল দশায় চিন্তিত হয়ে পড়লেন। কি করবেন বুঝতে না পেরে আব্বাকে খবর পাঠালেন।অনেক্ষণ পর আব্বা ছুটে এসে মাকে অর্ধচেতন অবস্থায় পেলেন। ধমকে টমকে খাবার খাওয়ালেন। আব্বার সীমাহীন রাগ দেখে আম্মা ভয়ে চুপচাপ খেলেন। তার অনশন কর্মসূচির নিপাত হলো। এরমধ্যে ঘটে গেল আরেক লোমহর্ষক ঘটনা।”
এটুকু আস্তে ধীরে বলে মারওয়ান থামল। নিশাত বেশ মনোযোগী শ্রোতার মতো শুনছিল। আগ্রহী গলায় বলল,
“কী সেই লোমহর্ষক ঘটনা?”
রুটির শেষ টুকরোটা নিশাতের মুখে ঢুকিয়ে পানির গ্লাস এগিয়ে দিল। নিশাত চটপট পানি পান করে উন্মত্ত হয়ে চেয়ে রইল। মারওয়ানকে দাঁড়িয়ে পড়তে দেখে বলল,
“কি হলো দাঁড়ালেন কেন? কী ঘটেছিল? আপনাকে কোথায় পেয়েছিল?”
মারওয়ান প্লেট হাতে দাঁড়িয়ে পড়ে বলল,
“পায়নি আর।”
নিশাত ভ্রু কুঁচকে বলল,
“না পেলে আপনি কে?”
“মারওয়ান কেমন রহস্যময় গলায় বলল,
“ওর ছায়া।”
নিশাতের গায়ে কেমন কাঁটা দিয়ে উঠল। পরক্ষনেই নিজেকে সামলে বলল,
“মশকরা করছেন কেন? লোমহর্ষক ঘটনাটা কী বলুন? আর আপনি কোথায় ছিলেন?”
মারওয়ান এবার স্বাভাবিক গলায় বলল,
“লোমহর্ষক ঘটনাটা হলো তুমি পুরো নাস্তা খেয়ে ফেলেছ। আর আমি তোমার কাছে ছিলাম। এইযে এখন দাঁড়িয়ে আছি।”
মারওয়ানের কৌতুকপূর্ণ জবাব। নিশাত বেক্কলের মতো প্লেটের দিকে চাইল। আসলেই প্লেটে কিছুই অবশিষ্ট নেই। দুটো ডিম, কতগুলো ডাল-ভাজি, রুটি পুরো ফিনিশ। সে এতগুলো নাস্তা একা খেয়েছে? কখন? কোন সময়? তার খেয়াল নেই কেন? লোকটা কথার ফাঁদে ফেলে পুরো নাস্তা খাইয়ে দিয়েছে অথচ তার সে খেয়াল নেই। রাগ লাগল নিজের উপর। এটা কেন বুঝল না যে নিজে কখনো আগ বাড়িয়ে কিছু বলেনা সে হঠাৎ খেজুরে আলাপ করছে ব্যাপারটা নিশ্চয়ই ঘাপলার। একটু আগে বড় মুখ করে বলেছিল জোর করেও কিছু খাওয়াতে পারবে না। অথচ পুরো নাস্তা এদিকে সাবাড় করে ফেলেছে। নিজের কথার খেলাপ হওয়ায় কেমন লজ্জা, জিদ দুটোই হচ্ছে।
মারওয়ান নিশাতের পরিস্থিতি বুঝতে পেরে ঠোঁট বাঁকালো। রুম থেকে বেরিয়ে যেতে নিলে হঠাৎ দাঁড়িয়ে গিয়ে বলল,
“আব্বা তার বউকে ধমকে খাইয়েছিলেন আর আমি ধমক কেন কোনো টু শব্দ, কসরত ছাড়াই পুরো খাবার খাইয়েছি। এখন বলো বিবাহিত জীবনে কে বেশি সফল?”
_
নকল মারওয়ান সবাইকে নিয়ে গোল টেবিল বৈঠকে বসেছে। হাতে অ্যালকোহলবিহীন রেড ওয়াইনের গ্লাস। কথা বলছে আর খানিক পর পর তাতে চুমুক দিচ্ছে। এরমধ্যে বডিগার্ড পিছন থেকে সটান এসে বলল,
“স্যার, আর্জেন্ট কথা ছিল।”
লোকটা চেয়ার দুলিয়ে আয়েশ করে গ্লাসে ঠোঁট চেপে চুমুক দিয়ে বলল,
“বলে ফেল।”
“এখানে? যদি একটু চিপায় আসতেন ভালো হতো।”
লোকটা হুংকার দিয়ে বলল,
“চিপায় আসব, হোয়াই? তুমি না আমার বডিগার্ড? একটা কথা বলতে মিউ মিউ করছ কেন? স্পষ্টভাষী হও। মনে রাখবে তুমি বাঘের বডিগার্ড।”
বডিগার্ড এবার কথার রাখঢাক না রেখে সিনা টানটান করে বলে উঠল,
“স্যার আপনার পুত্র পায়খানা করে দাঁড়িয়ে আছে। অনুগ্রহ করে যদি এসে পরিষ্কার করতেন বড় উপকার হতো।”
নকল মারওয়ানের মুখ ফসকে ওয়াইন বেরিয়ে সামনে বসা একজনের শরীরে পড়ল। সকলে হতভম্ব এই ঘটনায়। টিস্যু পেপারে নিজেকে পরিস্কার করে লোকটা রাগান্বিত কণ্ঠে বলল,
“হোয়াট রাবিশ! কোথায় কি বলতে হয় এখনো শেখনি? তোমার থেকে রবিসনও ভালো সামাজদার।”
বডিগার্ড অপমানিতবোধ করল। সামান্য একটা কুকুরের সঙ্গে তার তুলনা! দিস ইজ ঠু মাচ! রোবটিক গলায় বলল,
“স্যার একটু আগে আপনি বলেছেন স্পষ্টভাষী হতে।”
“তো? এজন্য এসব চিপমার্কা কথা বলবে?”
“স্যার এখানে চিপের কি দেখলেন? আপনার ছেলে পায়খানা করেছে তো এখানে আমি স্পষ্ট করে আর কি বলতাম?”
লোকটা টেবিলে থাবা মেরে বলল,
“হোয়াট ইজ পায়***? আর ইউ আউট অফ ইওর সেন্স? কথা বলার একটা ক্লাস আছে, রাবিশ!”
বডিগার্ড ধাতস্ত হয়ে বলল,
“স্যরি স্যার। আপনার ছেলে মল ত্যাগ করে দাঁড়িয়ে আছে কাইন্ডলি দ্রুত পরিষ্কার করতে আসুন।”
নকল মারওয়ান রাগে ক্ষোভে কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। কোনরকমে বলল,
“লোকের অভাব পড়েছে যে এসব কাজ আমাকে করতে হবে? আর আপনার ছেলে আপনার ছেলে বলা বন্ধ করো। ও আমার ছেলে নয়।”
শেষের কথাগুলো শক্ত শোনালো। বডিগার্ড ঘাড় নাড়িয়ে বলল,
“স্যার লোকের অভাব পড়েনি তবে আপনার ছেলে থুক্কু নকল ছেলে আপনার হাতে পরিষ্কার হবে। অন্য কারো হাতে হবে না। অনেকক্ষণ বুঝিয়েও লাভ হয়নি। জোর করলে কামড় মারে। এখানে আমাদের কি করার আছে?”
লোকটা শক্ত কণ্ঠে বলল,
“যা মন চায় করো। খবরদার আমার কানে এসব ফালতু কথা আনবে না। নিজেরটাই পরিষ্কার করি ফ্লাশ দিয়ে আসছে অন্যকে পরিষ্কার করব, আমার ঠেকা পড়ছে। যাও ওকে ফ্লাশ দিয়ে পরিষ্কার করিয়ে ফেল। জোর করেই করো।”
কথাটা শেষ করে আবার নিজ কাজে মনোযোগী হলো। বডিগার্ড নিরুপায় হয়ে চলে গেল। খানিক পর আতঙ্কিত চেহারা নিয়ে নাহওয়ানের পিছু পিছু ঢুকল। নাহওয়ান গেঞ্জি মুখের উপর তুলে ধরে দৌঁড়ে এসে নকল মারওয়ানের পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
“বাবা আকু কচ্চি, ডুয়ে ডাও। আংটেল বিশি বিশি কলে টুমাকে বলেনি আমি আকু ডিচি।”
নিজের কথায় বাধা পড়ায় ঘাড় ঘুরিয়ে নাহওয়ানকে এমতাবস্থায় দেখে মাথা চক্কর দিয়ে উঠল নকল মারওয়ানের। এ কেমন বাচ্চা! সাংঘাতিক জ্বালাচ্ছে তো দুইদিন ধরে। কিছু বলতেও পারছে না আবার না বলে থাকতেও পারছে না। উভয় সংকটে পড়েছে সে। এটাকে এনে মনে হচ্ছে খাল কেটে আস্ত একটা কুমিরের বাচ্চা তুলে এনেছে। নাহওয়ানের থেকে চোখ সরিয়ে বডিগার্ডের দিকে তাকাতেই সে ইনোসেন্ট গলায় বলে উঠল,
“স্যার আপনার বাচ্চা আপনার মতো স্পষ্টভাষী। এখানে আমার কি করার আছে?”
লোকটা ক্ষোভে চেঁচিয়ে উঠল,
“সাইফারের বাচ্চা!!”
বডিগার্ড স্যারের চিৎকারে রুমের এক কোণায় গিয়ে দাঁড়ালো। নকল মারওয়ান দাঁতে দাঁত চেপে সংযত হয়ে বলল,
“আংকেলের সাথে যাও, সে পরিষ্কার করিয়ে দেবে।”
নাহওয়ান গোল গোল চাহনিতে চেয়ে বলল,
“টুমি ডাও।”
“আমি কিভাবে দেব? আমি তো কাজ করছি।”
নাহওয়ান মানতে চাইল না। বডিগার্ড চিপা থেকে মিনমিন গলায় বলল,
“স্যার করে দিন। এক ঘন্টা বোধহয় হয়ে গেছে পায়খানা আই মিন মল ত্যাগ করেছে। এখনো অপরিষ্কার। জিনিসটা ভাবলেও তো গা ঘিনঘিন করছে।”
আশেপাশের লোকরাও সায় জানাল। নকল মারওয়ান নিজের রাগ বহু কষ্টে নিয়ন্ত্রণ করছে। দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
“তোমাদের জিনিসটা ভাবলেই গা ঘিনঘিন করছে আর আমি সেখানে ওকে পরিষ্কার করব। ভাবতে পারছ আমার পরিস্থিতিটা?”
কথা শেষ করে কয়েকটা টিস্যু দিয়ে মুখ চেপে নাহওয়ানের হাত ধরে হনহন করে রুম থেকে বেরিয়ে যেতে লাগল। নাহওয়ান তার হাঁটার তালে তাল মিলাতে পারছে না। বডিগার্ড পিছুপিছু এল। লোকটা নাহওয়ানকে বাথরুমে ঢুকিয়ে ফ্লাশ উঠিয়ে পশ্চাৎ বরাবর ধরল। নিজে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে মুখে টিস্যু চেপে চোখ বন্ধ করে রেখেছে। অনেকক্ষণ ফ্লাশ করার পর বের হতে নিলে নাহওয়ান অর্ধ ন্যাংটা থেকেই বলল,
“পুক্কি ডুচ্চ না কেনু?”
নকল মারওয়ান বহু কষ্টে নিজেকে সংবরণ করলেও এবার উত্তেজিত গলায় বলল,
“ধুয়ে দিলাম তো মাত্র।”
নাহওয়ান নিজের গুলুমুলু হাত দুটো দেখিয়ে বলল,
“হাতু ডিয়ে ডোয়। ভুলি গেচ?”
লোকটা নাক সিটকে বলল,
“ফ্লাশ করলে আর হাত দিয়ে ধোয়া লাগেনা।
নাহওয়ান নাছোড়বান্দার মতো ছলছল চোখে চেয়ে বলল,
“ডুটে হয়। মা কুতায়?”
লোকটা কিছু বলতে চাইলে বডিগার্ড পিছন থেকে বাঁধা দিয়ে বলল,
“স্যার রাগারাগি করবেন না। পরে বাচ্চাটা আপনাকে ভয় পাবে।”
“জ্ঞান দিও না। তোমার কাছে আলগা জ্ঞান চাইনি। এখানে আর এক মিনিট থাকলে আমি বমি করে ফেলব।”
“স্যার আপনি বাড়াবাড়ি করলে ওর মাকে চাইবে বারবার। ব্যাপারটা বুঝতে পারছেন না কেন? আর তাছাড়া ফ্লাশে গু আই মিন সকল মল ধৌত হয়ে গেছে। আপনি জাস্ট হাত দিয়ে ফর্মালিটি পালন করবেন।”
লোকটা দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
“আসো সেই ফর্মালিটি তুমি পালন করো।”
বডিগার্ড ঠোঁট উল্টে বলল,
“আমার হাতে তো ফর্মালিটি পূরণ করবে না আপনার নকল পুত্র। এতে আমার কী করার আছে?”
নকল মারওয়ান চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
“তোমার করার আছে টা কী? বারবার কি করার আছে এই ডায়ালগটা না মেরে তোমার আসলেই কী করার আছে সেটা বলো?”
বডিগার্ড নিষ্পাপ গলায় প্রত্যুত্তর করল,
“নাথিং স্যার।”
লোকটা হম্বিতম্বি করে বলল,
“তোমাকে এবার চাকরি থেকেই বহিষ্কৃত করব। অন্যের বেলায় মাতব্বরি করতে পারো আমার বেলায় একটা সুবুদ্ধিও দিতে পারো না। আদতে তুমি একটা ঘোড়ার ডিম। ইউজলেস পিপল!”
ওদিকে নাহওয়ান কান্না শুরু করায় বডিগার্ড নিজের অপমান সাইডে রেখে নতুন উদ্যমে নকল মারওয়ানকে বোঝানোর কাজে লেগে পড়ল। লোকটা এবার নিজেকে শক্ত রেখে চোখ বন্ধ করে বাচ্চাটার পাছায় হাত দিয়ে ধুয়ে দিল। এতে কয়েকবার বমি করতে চেয়েও গলা পর্যন্ত বমি এসে আর এল না। হাত ধুতে ধুতে একটা হ্যান্ডওয়াশের বোতল খালি করে ফেলেছে সে। পরবর্তীতে গোসল করে পরিপাটি হয়ে তবেই নিজ কাজে বসল।
চায়ের কাপ হতে ধোঁয়া গুলো কুণ্ডলী পাকিয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। নকল মারওয়ান গুরুগম্ভীর চেহারায় সেই গরম চা সুরুৎ সুরুৎ করে পান করছে। নাহওয়ান টেবিলের উপর বসে হাত পা ছড়িয়ে তার চা খাওয়া দেখছে। নিজের দিকে এভাবে গোলগোল চোখে নাহওয়ানকে চেয়ে থাকতে দেখে লোকটা বলল,
“কি?”
নাহওয়ান ফোকলা হেঁসে বলল,
“ইটা কি কাও?”
হাতের কাগজে চোখ বোলাতে বোলাতে জবাব এল,
“চা খাই, খাবি?”
নাহওয়ান বসা অবস্থায় নিজের পা দুটো ধরে বলল,
“না, ডুডু কাব।”
লোকটার এদিকে মনোযোগ নেই। সে ব্যস্ত নিজের কাজে। নাহওয়ানের কথা বুঝতে না পেরে বলল,
“ডুডু আবার কী?”
“ঐযে সাডা সাডা। আমি কাই, বিল্লু চানা কায়।”
নিজের কাজে ব্যাঘাত ঘটায় লোকটা বেশ বিরক্ত হলো। হাঁক ছেড়ে বডিগার্ডকে ডাকতেই সে হাজির হলো।
“জ্বি স্যার?”
নাহওয়ানকে দেখিয়ে বলল,
“কোথায় থাক তুমি? ওকে এখানে রেখেছ কেন? কাজে ডিস্টার্ব করছে।”
বডিগার্ড শান্ত গলায় বলল,
“স্যার আমাদের সঙ্গে থাকে না। চিল্লাপাল্লা করে। তাই এখানে বসিয়ে রেখে গেছি। আপনাকে দেখলে চিল্লায় না।”
লোকটা নিজের কাজ স্থগিত রেখে ঘুরে বলল,
“চিল্লায় না তবে ডিস্টার্ব করে। ওকে নিয়ে তুনো মুনো করার টাইম আছে আমার? এমনিতেই এটাকে এনে বিশেষ কি ফায়দা হলো? এর বাপ তো এখনো এলো না। ছেলের জন্য চিন্তা টিন্তা নেই নাকি?”
“কি জানি স্যার? আজারাক সাইফার বহুত সেয়ানা। কোথায় কি পাকাচ্ছে কে জানে?”
নকল মারওয়ান চেয়ার ঘুরাতে ঘুরাতে বলল,
“পাকিয়েও কোনো লাভ হবে না। যতদূর জানি এখনো কোনো স্টেপ নেয়নি। পুলিশদেরও কানেও খবরটা তোলেনি। গোয়েন্দা সংস্থার কারো সাথেও কোনো যোগাযোগ করেনি। কি করতে চাইছে কে জানে? হারামীটার বউ তো বাচ্চা হারিয়ে অর্ধ মৃত কিন্তু ও এরকম নির্লিপ্ত কেন? কি করতে চাইছে? আমরা কিছু মিস করে যাইনি তো আবার?
শেষ কথাটা চিন্তিত স্বরে বলল। বডিগার্ড নিজেও কনফিউজড সাইফারের নির্লিপ্ততায়। উভয়ই জটিল ভাবনায় মগ্ন সেই মুহূর্তে নাহওয়ানের কথায় চিন্তায় ভাটা পড়ল।
“মায়েল কাচে যাব। ডুডু কাব।”
নাহওয়ান বসা অবস্থায় দুলতে দুলতে বলল। লোকটা বেশ বিরক্ত হয়ে বলল,
“কী চাইছে দেখ তো? কুমিরের বাচ্চার দুই মিনিট পর পর এটা লাগে ওটা লাগে। প্রথম দিনের মতো মেরে শুইয়ে রাখলে আর এত আবদার করত না। বসের যত নখরামি। শত্রুর বাচ্চাকে এত লাই দিয়ে মাথায় ওঠাতে হবে কেন? একে যত্ন করে আমাদের লাভ কি? আনার পর থেকে ঘুম হারাম করে ফেলেছে। মনে হচ্ছে মেহমানদারীর জন্য এনেছি এটাকে। যত্তসব উটকো ঝামেলা আমার ঘাড়ে ফেলে রেখেছে।”
বডিগার্ড নিজের স্যারকে রেগে যেতে দেখে নাহওয়ানকে উদ্দেশ্যে করে বলল,
“বাবু কী চাই?”
নাহওয়ান বাবাকে রেগে যেতে দেখে ভয়ে কুঁকড়ে গেল। পরক্ষণে বডিগার্ডের প্রশ্নে ফোকলা দাঁতে হেঁসে বলল,
“ডুডু।”
বডিগার্ড নিজেও ডুডুর অর্থ বুঝল না। চায়ের কাপ এগিয়ে বলল,
“এটা খাবে?”
নাহওয়ান নাকচ করে বলল,
“না, ডুডু কাব।”
“ডুডুটা কী?”
নকল মারওয়ান এবার গম্ভীর স্বরে বলল,
“লুডুর কথা বলছে নাকি?”
“স্যার কোথায় লুডু আর কোথায় ডুডু? এটা খাওয়ার জিনিস মনে হচ্ছে।”
“কে জানে? এই দুই ইঞ্চি কোনটাকে কি বলে আমি কিভাবে বলব? হাত দিয়ে দেখিয়ে দিতে বলো কি চায়। আর একে নিয়ে আমার সামনে থেকে দ্রুত বিদায় হও তো। ইম্পর্ট্যান্ট কাজ করছি।”
স্যারের কথা শুনে বডিগার্ড নাহওয়ানকে টেবিলের উপরে রাখা সবগুলো জিনিস দেখিয়ে বলল,
“কোনটা চাও? হাত দিয়ে দেখাও।”
নাহওয়ান বেশ বিরক্ত এতক্ষণেও তার দুধ না আসায়। ফট করে টেবিলের উপর দাঁড়িয়ে গেল। গুলুমুলু শরীরটা দুলিয়ে হেঁটে এসে নকল মারওয়ানের সামনে দাঁড়ালো। তারপর ঝুঁকে এক আঙ্গুল তার বুক বরাবর তাক করে বলল,
“ইকান তেকে বাটিতে ডেও। মুজা মুজা কলে কাই।”
লোকটা তব্দা খেয়ে নিজের বুকের দিকে তাকালো। ভাবল পকেটে কিছু দেখেছে সম্ভবত। অবুঝের মতো তার কোটের বুকপকেট হাতড়ালো। বডিগার্ড নাহওয়ানের কথার মানে বুঝতে পেরে বলল,
“তুমি দুধের কথা বলছ নাকি?”
নাহওয়ান ঘাড় নাড়িয়ে সম্মতি জানাল। নকল মারওয়ান ফট করে দাঁড়িয়ে বলল,
“একে আমার সামনে থেকে সরাবে? কত বড় স্টুপিড কথা ভাবতে পারছ? এটা ওর বাবার থেকেও বেশি সেয়ানা। কোথায় হাত দিয়ে ইঙ্গিত করেছে দেখেছ? আমি ভাবলাম কি না কি। সাইফার ছেলেকে ট্রেনিং দিয়ে এখানে পাঠিয়েছে আমি শিওর।”
নাহওয়ান হুট করে বাবাকে দাঁড়াতে দেখে ভয় পেল। বডিগার্ড হাসি চেপে রেখে কোনো মতে বলল,
“স্যার আপনিই তো হাত দিয়ে দেখাতে বললেন।”
লোকটা উত্তেজিত কণ্ঠে বলল,
“হ্যাঁ তো? ও যে এটার কথা বলবে আমি জানতাম নাকি?”
“উত্তেজিত হবেন না স্যার। এখনকার বাচ্চারা একটু আপডেটই হয়।”
লোকটা রাগান্বিত গলায় বলল,
“বাচ্চা নিয়ে পিএইচডি করেছ নাকি?”
“নো স্যার। তবে ফোনে দেখি তো তাই বললাম। ওর থেকেও আপডেটেড বেবি আছে। আর এটায় এত রিয়েক্ট করার কিছু হয়নি। ইটস নরমাল। বাচ্চারা অবুঝ, নাদান। তারা মা, বাবার কাছে এভাবেই আবদার করে। এইটুকু বাচ্চা দুধ চাইতেই পারে কিডন্যাপ করার আগে এটা অন্তত মাথায় রাখা উচিত ছিল স্যার।”
লোকটা রাগে ক্ষিপ্ত হয়ে বলল,
“জাস্ট শাট আপ। মনে হচ্ছে দরদ একেবারে উতলে উঠছে তোমার?”
বডিগার্ড মিনমিন গলায় বলল,
“নো স্যার, রিয়েলিটি বললাম।”
“রাখো তোমার রিয়েলিটি। কাজের বেলায় লবডঙ্কা অকাজে পোদ্দারি। ইডিয়ট কোথাকার।”
অপমানিত হয়ে বডিগার্ড চুপ মেরে গেল। এরপর থেকে দুনিয়া ওলট পালট হয়ে গেলেও আর আগ বাড়িয়ে মাতব্বরি করতে যাবে না সে। বারবার অপমানিত হতে কার ভালো লাগে? সে তো একটা মানুষ নাকি?
নাহওয়ান এত বাকবিতণ্ডায় কখনো ভয় পাচ্ছে আবার কখনো বিরক্ত হচ্ছে। বাবা কেমন অদ্ভুত আচরণ করছে দুদিন ধরে। যদিও তার ছোট্ট মাথায় এসব ঢুকছেও না, ক্যাপচারও হচ্ছে না। তাই চুপচাপ পা দুলিয়ে যাচ্ছে। নকল মারওয়ান বিক্ষিপ্ত স্বরে বলল,
“একে নিয়ে ভাগো। গেট লস্ট উইথ দিস ক্রোকোডাইল’স চাইল্ড!”
বডিগার্ড নাহওয়ানকে জোর করে কোলে নিতে গিয়ে কামড় খেল। বাচ্চাটা টেবিল থেকে এক লাফে নকল মারওয়ানের কোলে গিয়ে শক্ত করে গলা জড়িয়ে ধরে বলল,
“বাবা বাবা।”
লোকটার এবার সত্যি সত্যি নাহওয়ানকে আছাড় মারতে মন চাইল। বহু কষ্টে রাগ নিয়ন্ত্রণ করে বলল,
“আংকেল দুধ দেবে যাও।”
নাহওয়ান আরও শক্ত করে বাবাকে চেপে ধরে বলল,
“না, টুমি ডাও।”
দাঁতে দাঁত পিষে উত্তর এল,
“কাজ করছি আমি।”
“না, টুমি টুমি।”
সাংঘাতিক বিরক্ত হলো লোকটা। কোনো বাচ্চাকে বাপের সঙ্গে এরকম চিপকে থাকতে এই প্রথম দেখল। উঠতে বাবা, বসতে বাবা, খেতে বাবা, ঘুমাতে বাবা, হাগতে বাবা। উফ তার মাথাটা না খেয়ে এই কুমিরের বাচ্চাটা বিদেয় হবে না। মনে হচ্ছে সাইফারের বাচ্চাটাকে না এনে বউটাকে তুলে আনলে ভালো হতো। এমন বিরক্ত তো করত না। বউয়ের প্রতি তো বিন্দু পরিমাণ দরদও নেই হারামীটার। উঠিয়ে আনলে এক আনার ফায়দাও হতো না। ছেলেটাকে এনেছে দুইদিন হয় এতেই কোনো হদিশ নেই সেখানে বউ তুলে আনলে ঘোড়ার আন্ডা হতো। বিরক্তি সীমাহীন পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ায় নিজের খাওয়া চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে বলল,
“নে খা।”
“ইটা কী?”
“দুধ।”
নাহওয়ানের প্রশ্নাত্মক কণ্ঠ,
“ডুডু?”
“হ্যাঁ।”
বাচ্চাটা অবুঝ গলায় বলল,
“ডুডু টো সাডা। ইটা লাল ডেকায় কেনু?”
লোকটা তীব্র বিরক্তি চেপে বলল,
“আগে সাদা ছিল এখন লাল হয়ে গেছে। এটাকে রেড মিল্ক বলে।”
নাহওয়ান শেষের বাক্যটা বুঝতে না পেরে মূঢ় দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। বডিগার্ড সেটা বুঝতে পেরে হুট করে বলল,
“রেড মিল্ক মিনস লাল দুধ।”
“লাল ডুডু?”
নাহওয়ানের উচ্ছ্বাসিত গলা। নকল মারওয়ান চোখ রাঙিয়ে বলল,
“তোমাকে এত পাকামো করতে কে বলেছে?”
বডিগার্ড চুপ হয়ে গেল। লোকটা এবার নাহওয়ানকে খেতে ইশারা করল। নাহওয়ান বাবার কথা বিশ্বাস করে চায়ে চুমুক দিল। প্রথমে মুখ কুঁচকে নিলেও পরে ভালো লাগায় পুরো চা ফিনিশ করে ফেলল। খেয়ে ডান হাত দিয়ে মুখ মুছে বাবার দিকে ফিচফিচ করে হেঁসে বলল,
“মুজা মুজা।”
_
মুখ, হাত বাধা অবস্থায় অচেতন অবস্থায় পড়ে আছে একজন যুবতী। বুটের খটখট আওয়াজ ফাঁকা রুমটায় প্রতিধ্বনিত হলো। চেয়ারে বসা লোকটা চোখ দিয়ে ইশারা করল মেয়েটার জ্ঞান ফেরাতে। একজন মুখের উপর পানি ফেলতেই আস্তে আস্তে চোখ খুলল মেয়েটি। ঝাপসা চোখে সামনে তাকাতেই একটা অবয়বকে দেখতে পেল। অপরিচিত একটা রুমে নিজেকে বাধা অবস্থায় দেখে মেয়েটা পাগলের মতো ছটফট করল। বসারত লোকটি এগিয়ে এসে হাঁটু গেড়ে মুখের কাপড় খুলে দিতেই মেয়েটি চেঁচিয়ে উঠল,
“আমাকে এখানে তুলে আনার কারণ কী? হাউ ডেয়ার ইয়্যু টেক মি?”
লোকটা মেয়েটার চুল মুঠ করে ধরে বলল,
“মাই উইশ। বেশি কথা বললে জিভ কেটে ফেলব।”
মেয়েটা ছটফট করল সামনে পুরুষটির হাত থেকে ছাড়া পেতে। লোকটা ছেড়ে দিতেই মেয়েটা রাগে জিদে কামড় দিয়ে বসল তার হাতে। পুরুষটি কঁকিয়ে উঠে ছাড়িয়ে নিয়ে কয়েকটা থাপ্পড় বসিয়ে দিল গালে। গলা চিপে ধরে বলল,
“ইনাবা ভুঁইয়া, রাইট?”
মেয়েটার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। লোকটা আবারও বলতে লাগল,
“বেশি বেড়ো না। পুতে ফেলতে দুই মিনিট সময়ও লাগবে না। যা যা বলব মনোযোগ দিয়ে করবে। যদিও তোমাকে মারার নির্দেশ ছিল না তবে এটা তোমার প্রাপ্য।”
ইনাবা ছটফটিয়ে উঠে বলল,
“ছাড় অসভ্য।”
লোকটা ছেড়ে দিতেই ইনাবা কাশতে কাশতে অস্থির হয়ে উঠল। বডিগার্ডকে ইশারা করে হাত খুলে দিতে বলল পুরুষটি। বডিগার্ড নির্দেশ মতো হাত খুলতে দেরি ইনাবার আক্রমণ করতে দেরি হয়নি। লোকটা বডিগার্ডকে ছাড়াতে চাইলে পারল না। পিছন থেকে ইনাবাকে ঝাপটে ধরে সরাতে সরাতে বলল,
“থামো। আই সেয় স্টপ”
ইনাবা ফুঁসে উঠল তাকে ঝাপটে ধরায়। কুনুই দিয়ে গুতা মেরে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। লোকটা পেটে হাত চেপে ধরে কষে চড় বসিয়ে দিল ইনাবার গালে। গালে পাঁচ আঙুলের দাগ বসে গেছে তার। এত জোরে থাপ্পড় খেয়ে ফুঁপিয়ে উঠল সে। জীবনে এই প্রথম এত শক্ত মার খেল কারো হাতে। ছোটবেলা থেকে ভীষণ আহ্লাদে বড় হয়েছে সে হঠাৎ এমন চড় খেলে স্বাভাবিক ভাবেই খারাপ লাগবে। লোকটা রাগান্বিত স্বরে বলল,
“মানা করার পরেও তেজ দেখালে কেন? মেয়ে মানুষ মেয়ে মানুষের মতো থাকবে। অহেতুক বাড়াবাড়ি করবে না। তোমাকে মোটেও টর্চার করার উদ্দেশ্যে তুলে আনা হয়নি। কয়েকদিন থাকবে ব্যাস তারপর ছেড়ে দেব।”
বলেই গটগট পায়ে প্রস্থান করল। পিছন পিছন বডিগার্ড নিজেও দরজা আটকে বেরিয়ে এল। লোকটার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,
“স্যার এটা কেমন অবিচার? বাচ্চার কামড়, আপনার বকা এখন আবার ম্যাডামের গলা চিপা। আমার কি কোথাও শান্তি নেই? আমাকে কি আপনাদের ‘মাইর খাওয়ার বডিগার্ড’ হিসেবে নিয়োগ করেছেন?”
চলবে….
(আসসালামু আলাইকুম।)
ভবঘুরে_সমরাঙ্গন
বোনাস_পর্ব
তাজরীন ফাতিহা
ইনাবা টেবিলে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বুজে পড়েছিল। এরমধ্যে দরজা খোলার শব্দে চোখ মেলে চাইল। মুখ ঢাকা সম্পূর্ণ শরীর আবৃত একজন লোক খাবার নিয়ে এসেছে। টেবিলে প্লেট এগিয়ে দিতেই সজোরে ধাক্কা দিয়ে প্লেট উল্টে ফেলে দিল ইনাবা। জিদে ঠোঁট ক্রমশ কাঁপছে। রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে বসেছে। লোকগুলোকে মেরে তবেই ক্ষান্ত হবে সে। তাকে হোস্টেল থেকে তুলে এনেছে এই জালিম গুলো। কত বড় সাহস! লোকটা কঠোর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তৎক্ষনাৎ বাইরে চলে গেল। ইনাবা আগের ন্যায় পড়ে রইল। বাবা, ভাইয়া কাউকে কিভাবে জানাবে যে সে এই মহা সংকটে পড়েছে? ফোনটাও হাতের কাছে নেই। ওই থাপ্পড় দেয়া লোকটা ছিনিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। রাগে, জিদে একাকার হয়ে মুখশ্রী কান্নায় রূপ নিল।
আবারও দরজা খোলার আওয়াজে মাথা উঁচিয়ে চাইতে না চাইতেই তাকে আচমকা উঠিয়ে ঠাস করে সপাটে চড় বসানো হলো। ইনাবা হতভম্ব হয়ে সামনে তাকাতেই থাপ্পড় দেয়া সেই লোকটার মুখাবয়ব দৃশ্যমান হলো। ক্রোধে ধরণী যেন ভুলন্ঠিত হলো। থরথর করে কেঁপে উঠে বিগলিত হয়ে উঠল সমস্ত তরুণী কায়াটি। সীমাহীন রাগে পরিবেশ পরিস্থিতি ভুলে সপাং করে পাল্টা চড় বসিয়ে দিল ইনাবা। তীব্র আক্রোশে উন্মাদ হয়ে উঠল যেন। নয়নপক্ষ্ম কাঁপছে বিরতি নিয়ে। লোকটা নিজের জ্বলন্ত চক্ষু জোড়া সুচারু করে ইনাবের দিকে দৃষ্টিপাত করল। তীব্র অপমান, রাগে শরীর উত্তপ্ত হয়ে উঠল। মারাত্মক মাথা পাগল লোক নামেই খ্যাত সে। একবার রাগ উঠলে থামানো মুশকিল। সামনাসামনি দুটো আগ্রাসী চক্ষু। লোকটা হঠাৎ ঠোঁট বাঁকিয়ে নিজের গালে হাত বুলিয়ে বলল,
“এখন তোমাকে বেশ সময় নিয়ে ছুঁবো। আর ইউ রেডী?”
বডিগার্ড নাহওয়ানকে সুজি খাওয়ানোর চেষ্টা করছে। বাচ্চাটা কিছুতেই সেসব মুখে তুলছে না। আধা ঘন্টা যুদ্ধ করেও যখন এক চামচও খাওয়ানো গেল না বডিগার্ড হতাশ হয়ে বলল,
“একটু খা রে। এমন বাপ ভক্ত বাচ্চা জীবনে প্রথম দেখলাম। বাপরে ছাড়া একবিন্দুও নাড়ানো যায়না। তোমার বাবা এখন গুরুত্বপূর্ণ কাজে বিজি। খেয়ে নাও বাবু।”
নাহওয়ান বডিগার্ডের কথাকে পাত্তাই দিল না। সে নিজ মনে গাড়ি নিয়ে খেলছে। আশেপাশে অসংখ্য গাড়ির স্তূপ। তাকে শান্ত রাখতে নকল মারওয়ানই এসব আনিয়েছে। অবশ্য পরিকল্পনাটা বডিগার্ডের ছিল। বডিগার্ড ক্লান্ত হয়ে ফ্লোরে বসে পড়ল। নাহওয়ানের জিদ্দি আচরণ পরখ করতে লাগল। একটু পরে নকল মারওয়ান ধুপ ধাপ পা ফেলে রুমে ঢুকল। নাহওয়ানের চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
“বাবা বাবা।”
নকল মারওয়ানের মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে আছে। বোঝাই যাচ্ছে চোটপাট করে এসেছে কারো সাথে। রাগে শরীর কাঁপছেও। স্যারের মেজাজ গরম বুঝতে পেরে বডিগার্ড ভয়ে ভয়ে বলল,
“অ্যানিথিং রং স্যার?”
লোকটার কর্কশ স্বরে প্রত্যুত্তর,
“নো।”
আমতা আমতা জবাব এল,
“আপনার ছেলে কিছুই খাচ্ছে না। খাচ্ছে না বলতে খাওয়াতে পারিনি এক চামচও। আপনি কি একবার চেষ্টা করবেন স্যার?”
“জাস্ট শাট ইওর মাউথ।”
ধমক শুনে বডিগার্ড চুপ করে গেল। লোকটা এবার তীব্র বিরক্তি নিয়ে বলল,
“বারবার ফেইস মাস্ক পড়, খোলো। ত্বকটা নষ্টই হয়ে যাবে। নিজের চেহারার গ্ল্যামার হারিয়ে ফেলব এই নাটকে। তামাশা লাগিয়ে রেখেছে আমার সাথে। কাজটা তাড়াতাড়ি করবে তা নয় কয়েকটা ঝামেলা আমার কাঁধের উপর উঠিয়ে দিয়েছে। যেন সাইফারের না আমারই পানিশমেন্ট। ওই মেয়েকে কেন এখানে আনতে বলল তোমার কোনো আইডিয়া আছে?”
বডিগার্ড মাথা নাড়িয়ে অসম্মতি জানালো। অর্থাৎ এবিষয়ে তার মোটেও ধারণা নেই। লোকটা দাঁতে দাঁত ঘষল। চোখ মুখ লালিমা বর্ণ ধারণ করেছে। সম্ভবত মুখে র্যাশ উঠেছে। লালচে লালচে দাগ দেখা দিয়েছে। এসব রিয়ালিস্টিক থ্রি-ডি সিলিকন ফেইস মাস্ক আধা ঘন্টার বেশি ব্যবহার করা ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক। খোলার পর ত্বক চুলকায়, ঘামে। অস্বস্তিবোধ হয়। এই মাস্কগুলি সাধারণত উচ্চমানের সিলিকন দিয়ে তৈরি হয়, যা ত্বকের মতো নমনীয় এবং বাস্তবসম্মত চেহারা প্রদান করে। মাস্কের ডিজাইন থ্রি-ডি প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়, যা মুখের প্রতিটি অংশের বিস্তারিত প্রতিলিপি তৈরি করে। হুবহু অন্যজনের চেহারা নকল করতে এই মাস্কের জুড়ি মেলা ভার। যদিও একেবারে নিখুঁত চেহারা তৈরি করতে পারেনা তবুও এটি মানুষকে বিভ্রান্তিতে ফেলতে সর্বোচ্চ ভূমিকা পালন করে।
নাহওয়ান নিজের ছোট্ট শরীরটা নিয়ে জড়িয়ে ধরল নকল মারওয়ানকে। বডিগার্ড সুজির বাটি এগিয়ে দিয়ে বলল,
“স্যার একবার চেষ্টা করে দেখুন খাওয়াতে পারেন কিনা।”
ভারী গলায় উত্তর এল,
“খেতে না চাইলে চেপে ধরে খাওয়াও। মারার দরকার হলে মারো তবুও একে নিয়ে আমার সামনে থেকে যাও। এখন মেজাজ ঠিক নেই মেরে টেরে বসতে পারি তখন কান্নাকাটি করলে থামাবে কে? এই কুমিরের বাচ্চাকে এখন আমার অসহ্য লাগে। জাস্ট লিভ মি।”
স্যারের কড়া কণ্ঠ শুনে বডিগার্ড নাহওয়ানকে তার থেকে ছাড়িয়ে কোলে তুলে নিতে চাইলে খামচি, কামড় খেল। নাহওয়ানকে জিদ করতে দেখে লোকটা রাগান্বিত হয়ে নাহওয়ানের দুই হাত নিজের পা দিয়ে চেপে হাতে সুজির বাটি নিয়ে জোর করে খাওয়াতে লাগল। নাহওয়ান বাচ্ছাসুলভ ভঙ্গিতে কেঁদে উঠল। কান্নার জন্য হা করতেই সুজির চামচ মুখে ঢুকিয়ে মুখ চেপে ধরে লোকটা। বাচ্চাটা কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি তুলে ফেলেছে। বডিগার্ড বলল,
“স্যার বাচ্চা মানুষ, গলায় খাবার আটকাতে পারে। এভাবে রেগে খাওয়ালে শ্বাসনালীতে খাবার আটকাবে।”
“কথা বলবে না। এইটুকু শরীরের তেজ আজ ছুটিয়ে দেব। বারবার জেদ ধরে কেন? পরশু থেকে অশান্তিতে রাখছে। এরজন্য ঠিকমতো ঘুমাতে পারিনা, খেতে পারিনা, কাজ করতে পারিনা। অসহ্য!”
বিরক্তি উপচে পড়ছে মুখ হতে নিঃসৃত বাক্যে। নাহওয়ান গাল ফুলিয়ে গুনগুন করে কাঁদছে। দুইপাশের ফুলো গাল আরও উঁচু হয়ে আছে গাল ভর্তি খাবারে। নিজের হাত, পা বাঁধা থাকায় নিরুপায় হয়ে প্রথম দুই চামচ গিললেও পরের চামচ মুখে ঢুকানোর সাথে সাথে লোকটার কোলের উপর ফেলে দিল। পুরো জামা মুখের উদগিরিত খাবারে নষ্ট করে ফেলল। নকল মারওয়ান দ্রুততার ভঙ্গিতে নাহওয়ানকে ছেড়ে টিস্যু দিয়ে মুছে নাহওয়ানকে মারতে হাত উঠাতেই ইনাবা সেই হাত ধরে ফেলল। লোকটা ক্রোধে ফুঁসতে ফুঁসতে এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,
“তোমাকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে বলে যেখানে সেখানে চলে আসার অধিকার নিশ্চয়ই দেয়া হয়নি? হুটহাট অনুমতি ছাড়া ঢুকে পড়া কেমন ম্যানার্স?”
ইনাবা নির্ভয়ে প্রত্যুত্তর করল,
“একজন যুবতী মেয়েকে তার অনুমতি ব্যতীত জোর করে তুলে এনে পৌরুষ দেখিয়ে চড় থাপ্পড় মারা কেমন ম্যানার্স?”
“তুমিও কিন্তু পাল্টা প্রতিঘাত করেছ। ওটার হিসেবে সেখানেই হয়ে গেছে। এখানে অযথা সেসব ইললজিক্যাল কথা টেনে পাশ কাটানোর চেষ্টা করবে না মিস ভুঁইয়া।”
নাহওয়ান তাদের কথার মাঝেই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ইনাবার পা আঁকড়ে ধরেছে। বাচ্চাটা বেশ ভয় পেয়ে আছে। চোখ দুটোতে স্পষ্ট তা ফুটে আছে। ইনাবা মুহূর্তের মাঝে বাচ্চাটার ওই গোল গোল অশ্রু ভেজা টুইটুম্বর আঁখি জোড়ার মায়ায় পড়ে গেল। চোখে মুখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট। নিচে বসে চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল,
“কাঁদে না বাচ্চা। কে মেরেছে তোমায়?”
নাহওয়ান হাত উঁচিয়ে নকল মারওয়ান আর বডিগার্ডকে দেখিয়ে দিল। বডিগার্ড ভ্যাবাচেকা খেয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে কখন, কোন সময় আবার মারল? ইনাবা কপাল কুঁচকে বলল,
“এইটুকু মাসুম বাচ্চাকে মারতে আপনাদের হাত কাঁপলো না? কোন মায়ের বুক খালি করে এনেছেন ওকে? কার নাড়িতে টান দিয়েছে আপনার জঘন্য পৌরুষত্ব? এইটুকু অবুঝ বাচ্চার সঙ্গে আপনাদের কীসের শত্রুতা?”
শেষের কথাগুলো নকল মারওয়ানের উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে দিল ইনাবা। লোকটা নিজেকে কন্ট্রোল করে বলল,
“আগেও বলেছি আমার কোনো বিষয়ে ইন্টারফেয়ার করবে না। তোমাকে কৈফিয়ত দিতে বাধ্য নই আমি। নিজের সীমার মধ্যে থাক নয়তো বসের আদেশ অমান্য করেই নিজের রূপে ফিরে যেতে বাধ্য হব। আমাকে ঠান্ডা থাকতে দাও নয়তো পস্তাবে।”
ইনাবা হাসতে হাসতে বলল,
“তা কি পস্তাবো একটু শুনি? একটু আগের ক্যারাটের কথা ভুলে গেছেন?”
লোকটা রহস্যময় হেঁসে বলল,
“অবশ্যই না। খুব ভালোভাবেই মনে রেখেছি। একেবারে কলিজার ভেতরে সযত্নে তুলে রেখেছি। সময় হলে অবশ্যই সেটা ফেরত পাঠানো হবে।”
ইনাবা তার কথায় বিশেষ পাত্তা দিল না। নাহওয়ানকে কোলে তুলে বলল,
“এরা তোমার কি হয়?”
নাহওয়ান নকল মারওয়ানের দিকে হাত উঁচিয়ে বলল,
“বাবা মাচ্চে। বিশি বিশি মাচ্চে।”
ইনাবা এবার হতবাক হয়ে লোকটার দিকে চেয়ে বলল,
“আপনার ছেলে! নিজের সন্তানকে কোন পিতা এভাবে মারে?”
লোকটা কিড়মিড় করে জবাব দিল,
“ওকে মেরেছি কোথায়? জোর করে খাওয়াতে গেছি এখন সেটার নাম হয়েছে মারা। অসহ্য!”
“এত বিরক্তি কেন এতটুকু বাচ্চার প্রতি? ওর মা কোথায়?”
লোকটার কঠিন ও দৃঢ় গলা,
“জাহান্নামে। যাবে?”
ইনাবা রূঢ় গলায় বলল,
“ওটায় আপনি যাবেন দুইদিন পর। আমাকে সাধছেন কেন? নিজের স্ত্রী, সন্তানের প্রতি এত বিতৃষ্ণা? আপনাকে যে বিয়ে করেছে এবং সন্তান দিয়েছে তার প্রতি এই অসম্মানজনক আচরণ কতটুকু যৌক্তিক? নিজের বিবেককে প্রশ্ন করেছেন কখনো?”
লোকটা এবার ইনাবার দিকে দুই কদম এগিয়ে এসে বলল,
“আমি করিনি। নাও তুমি এবার প্রশ্ন করে দেখ কি বলে।”
ইনাবা ঘৃণার সহিত পিছিয়ে গিয়ে বলল,
“দূরে থাকুন। নয়তো আবারও আমার হাত চলবে।”
” হ্যাঁ আর আমি তোমার সেই চলন্ত হাতে বসে বসে চুমু খাব।”
কর্কশ ও কৌতুক মিশ্রিত প্রত্যুত্তর। ইনাবা আর কথা বাড়াল না। কথার পৃষ্ঠে কথা। এর চেয়ে থেমে যাওয়াই শ্রেয়। নাহওয়ানকে কোলে নিয়ে বেরোতে নিলে লোকটা বলল,
“এই বাটি নিয়ে যাও। দেখ এই কুমিরের বাচ্চাকে খাওয়াতে পারো কিনা?”
ইনাবা সেই বাটির দিকে তাকালোই না। বডিগার্ডকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ভাত, সবজি, চিকেন, ডিম সেদ্ধ আর এক গ্লাস দুধ দিয়ে যাবেন।”
তারপর বেরিয়ে যেতে যেতে বলল,
“এইটুকু বাচ্চাকে পালার মুরোদ নেই এসেছে বাপ হতে। বাপ না সাক্ষাৎ আজরাইল।”
ইনাবা ছোট ছোট লোকমা তুলে নাহওয়ানকে খাইয়ে দিচ্ছে। বাচ্চাটা বিনা জ্বালাতনে আরাম করে খাচ্ছে। প্রত্যেক নারীর গায়েই বোধহয় একটা মা মা ঘ্রাণ পাওয়া যায়। মেয়েরা যেমন মায়ের আহ্লাদ দিয়ে খাওয়াতে পারে পুরুষরা সেটা পারে না। তাদের ন্যাচার কাঠখোট্টা টাইপ। বাচ্চারা সেখানে কমফোর্ট ফিল করেনা। তারা নমনীয় ভালোবাসা, আদর বেশি উপভোগ করে। ইনাবা কোমল গলায় জিজ্ঞেস করল,
“আরেকটু খাবে?”
নাহওয়ান মাথা নাড়িয়ে বলল,
“কাব না।”
ইনাবা বলল,
“আরেকটু খাইয়ে দেই?”
নাহওয়ান ঘাড় নাড়িয়ে না বোঝাল। ইনাবা আর জোর করল না। যা খেয়েছে এটাই যথেষ্ট। মুখ ধুইয়ে দিল। দুধ ঢাকা দিয়ে রাখল এক পাশে। পেটটা খালি হলে খাইয়ে দেবে। ওকে দাড় করিয়ে প্লেট রাখতে আর হাত ধুতে গেল। হাত ধুয়ে রুমে ঢুকে দেখল নাহওয়ান খাটের উপর দাঁড়িয়ে রুমের সব স্যুইচ টিপছে। লাইনটা একবার জ্বালাচ্ছে আবার নিভাচ্ছে। জিনিসটা তার কাছে একপ্রকার খেলা। ইনাবা আঁতকে উঠে ওকে সেখান থেকে কোলে তুলে সরিয়ে নিল। নাহওয়ান কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,
“মায়েল কাচে যাব।”
ইনাবার বেশ মায়া হলো ওইটুকু বাচ্চার অবুঝ আবদারে। আহারে এই মাসুম বাচ্চাটার মা নেই! ভাবলেই কেমন মন খারাপ হচ্ছে। হৃদয়ে যাতনা অনুভূত হয়। সে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে সম্মুখে উত্থিত আলো আঁধারির ওই দেয়ালটার দিকে দৃষ্টিপাত করল। তার আর বাচ্চাটার প্রতিচ্ছায়া ফুটে উঠেছে। মনে হচ্ছে মা, ছেলে। ইনাবা ওই মুহূর্তে একটা সুন্দর দৃশ্য কল্পনা করে ফেলল। নিজের ছেলেকে নিয়ে পুরো দেশ, বিদেশ চষে বেড়াচ্ছে সে। ইশ কি আদুরে আর মায়াময় দৃশ্যটা!
সে মনে মনে একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিল। বাচ্চাটার যেহেতু মা নেই। বাবা থেকেও নেই সেহেতু সে এই শিশুটিকে নিজের সাথে নিয়ে যাবে। এই আদুরে গোলগাল বাচ্চাটা কিছুতেই অনাদরে মানুষ হতে পারেনা। এমন পাষাণ বাপের ছায়াতলে থাকলে অচিরেই বাচ্চাটার কোমলতা খসে পড়ে বিষন্নতা ও কঠোরতার ছাপ ফুটে উঠবে। না এ কিছুতেই হতে দেয়া যায় না। দরকার হলে পুরো পৃথিবীর সাথে লড়বে সে। এ লড়াই মাতৃত্বের লড়াই। এক না হওয়া মায়ের লড়াই। ছোট্ট এই মাসুম শিশুকে সুন্দর জীবন দেয়ার লড়াই। এতে তাকে জিততেই হবে। কোনো বাঁধার পরোয়া ইনাবা ভুঁইয়া করে না।
চলবে…
(আসসালামু আলাইকুম।)
Share On:
TAGS: তাজরীন ফাতিহা, ভবঘুরে সমরাঙ্গন
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন ১৯+২০
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৬
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৩
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ১৭+১৮
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৪৩+৪৪
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৫৩+৫৪
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন ১৫+১৬
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৬২
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৩৭+৩৮
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৬৩