ভবঘুরে_সমরাঙ্গন
পর্ব_৪৭
তাজরীন ফাতিহা
ফজরের আযানের ধ্বনি চারদিকে মুখরিত হচ্ছে। নিশাত ঘুম ঘুম চোখ মেলে ধীরে ধীরে চাইল। চোখ খুলেই মারওয়ানের পিঠ নজরে এল। যে তার উল্টো ফিরে শুয়ে আছে। নিশাত ঘাড় ঘুরিয়ে পাশ হাতড়াল। কাউকে পেল না। চমকে তাকিয়ে দেখল পাশটা খালি। তার ছানা কই? মুহুর্তের মাঝে উঠে বসে খাটের নিচে দেখল, আশপাশ দেখল। নেই, কোথাও নেই। মারওয়ানের দিকে দৃষ্টি ফেলে দেখল তার কনুইয়ের ফাঁক গলিয়ে গুলুমুলু মুঠকৃত একটি হাত বেরিয়ে আছে। নিশাত ফোঁস করে দম ছাড়ল। আরেকটু হলে তার দমটাই বেরিয়ে আসতো। ঘুম থেকে উঠে মানুষের মস্তিষ্ক কম কাজ করে। অন্যান্য সময় সবার আগে মারওয়ানের আশপাশ চেক করত আর আজ মারওয়ান বাদে সবকিছু তন্নতন্ন করে খুঁজে সারা। নিশাত কপালে হাত ঠেকিয়ে একটু ধাতস্থ হল। চুলগুলো হাত খোঁপা করে ওযু করে নামাজ আদায় করল।
নিশাতের আজ নাস্তা বানাতে ইচ্ছে করছে না। কেমন ব্যথা আর ম্যাজম্যাজ করছে শরীরটা। স্কুলে বলে ছুটি নিয়ে নেবে কিনা সেটাও বুঝতে পারছে না। আজকাল শরীরটা বড্ড খারাপ লাগে। একটু হলেই অসুস্থ হয়ে যাওয়ার এক বাতিক দেখা দিয়েছে। বিছানায় হেলান দিয়ে চোখ বুজে রইল। ভালো লাগলে স্কুলে যাবে নয়ত ফোনে না করে দেবে। কর্তৃপক্ষ ছুটি দেবে কিনা সেটাও বড় বিষয়। এমনিতেই গত কয়েকমাসে ছুটির সংখ্যা তার বেশি। আজকে ছুটির কথা বললে সোজা হাতে কাগজ ধরিয়ে আবার বের করে না দেয়। কাগজ ধরিয়ে দিলে কাগজ নিয়ে সোজা চলে আসবে। এত ক্লান্তি, অবসাদ, চাপ নিতে পারছে না সে।
নিশাতের মতো চাকরিজীবীরা কাজ থেকে ইস্তফা নিতে মাঝেমধ্যেই ভেবে থাকে। সামনাসামনি বলার সাহস, ক্ষমতা কোনোটাই তাদের থাকে না। কারণ মধ্যবিত্তরা কল্পনায় একটা প্রসাদের মালিক হলেও বাস্তবে পেটের দায়ে কামলা খাটতে দুবার ভাবে না। বাঁচতে তো হবে। লোকে কি বলবে তা দিয়ে তো আর পেটের ক্ষুধা নিবারণ হবে না। যদিও মধ্যবিত্তদের চক্ষু লজ্জাটা বেশি। দুনিয়াতে পেটটাই যত নষ্টের গোড়া, অশান্তির মূল। একে ভর্তি করতে মানুষের কত আয়োজন। এটা না থাকলে বিশাল পৃথিবীর এক কোণে পড়ে থাকত, এত ঝক্কি ঝামেলা পোহাতে হত না। এসব ভাবতে ভাবতে কখন তার চোখ লেগে এসেছে বলা মুশকিল।
মুখে সুড়সুড়ি লাগায় ঘুম হালকা হয়ে এল নিশাতের। আঁখি পল্লব জোর করে টেনে খুলে দেখল নাহওয়ান ছোট্ট ছোট্ট হাত দিয়ে তার মুখে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। নিশাতকে চোখ খুলতে দেখে হাসলো বাচ্চাটা।
“মা?”
নিশাত আওয়াজ দিল,
“হু।”
নাহওয়ান ঘাড় বেঁকিয়ে ফোকলা হেঁসে বলল,
“গুম বাংগিচে?”
নিশাত উঠে বসে চুলগুলো হাত খোঁপা করতে করতে বলল,
“এইতো ভাঙলো। আপনি উঠে পড়েছেন?”
“আমি উটচি, বাবা উটচে। কাবার নাই।”
নিশাত বুঝল, তার ছানার খিদে পেয়েছে। আজ তো সে নাস্তাও বানায়নি। ঘড়িতে তাকিয়ে দেখলো স্কুলের আর ত্রিশ মিনিট আছে। নিশাত বলল,
“তোমার বাবা কই?”
“বাবা কায়।”
নিশাতের কপাল কুঁচকে গেল,
“কি খায় তোমার বাবা?”
নাহওয়ান মায়ের পাশে তার ছোট্ট গুলুমুলু হাত পা মেলে বসে বলল,
“উইযে চিরে চিরে কায়।”
নিশাত বুঝল রুটির কথা বলছে নাহওয়ান। সে দ্রুত ছেলেকে কোলে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে পাশের রুমে গেল। পর্দা সরিয়ে দেখল মারওয়ান খাটে হেলান দিয়ে চা খাচ্ছে আর পেপার পড়ছে। পরনে শুধু লুঙ্গি আর ঘাড়ে দুই পাশ দিয়ে গামছা ঝুলছে। নিশাত হঠাৎ রেগে গেল। রান্নাঘরে গিয়ে জোরে জোরে বাসনকোসন রাখছে আর চিল্লিয়ে বলছে,
“একা একা পাশের রুমে নাস্তা এনে নিজের উদরপূর্তি করছে অথচ বাচ্চাটাকে না খাইয়ে রেখেছে এখনো। ও কি খুব বেশি খেত? সভ্যতার বলাই নাই, থার্ড ক্লাস লোক।”
নিশাত রাগে গজগজ করতে করতে চুলায় গতকাল রাতের দুধ জ্বাল করছে। কোলে নাহওয়ান মায়ের চিৎকারে ভয় পেয়ে গুটিয়ে আছে। মায়ের ঘাড়ে মুখ লুকিয়ে সামনে তাকিয়ে দেখল বাবা দাঁড়িয়ে। যার চোখ মুখ বর্তমানে কুঁচকে গম্ভীর হয়ে আছে। নাহওয়ান বাবার দিকে দুই হাত মেলে দিল। মারওয়ান নিশাতের পিছনে দাঁড়িয়ে বলল,
“সকাল সকাল গলা এত চড়া কেন? ঘরের মধ্যে প্রতিদিন অশান্তি করতে হবে কেন? সমস্যা কি?”
নিশাত কোনো কথার জবাব দিল না। নিজ মনে কাজ করতে লাগল। নাহওয়ানের হাত বাড়িয়ে ‘বাবা বাবা’ বলে ডাক দিতে দেরি কিন্তু নিশাতের ধমকে উঠতে দেরি হয়নি,
“চোপ!! থাপ্পড় মেরে বাবা বাবা করা ছুটিয়ে দেব। সেদিনের মাইরের কথা ভুলে যাওনি নিশ্চয়ই।”
মারওয়ানের রাগ আকাশ ছুঁলো। দোষ না করেও অযথা কথা আর চিল্লাচিল্লি কেইবা সহ্য করে? রান্নাঘরের সবগুলো বাসন রাগে জিদে এক ধাক্কায় ফেলে দিল। ঝনঝন শব্দে নিশাত কেঁপে উঠলো। নাহওয়ান বাবার অগ্নিমূর্তি দেখে কেঁদে দিল। বুঝ হওয়ার পর এই প্রথম বাবাকে এত রাগতে দেখল ভয় তো পাবেই। মারওয়ান দেয়ালে থাবা মেরে গর্জে উঠে বলল,
“প্রতিদিন নাটক মারায়। বালের সংসার করতে আসছি। এটারে বলে বালের সংসার। খালি সারাক্ষণ ঘ্যান ঘ্যান, প্যানপ্যান। কানটা আমার ঝালাপালা করে দিচ্ছে। শরীর খারাপ ভেবে নাস্তা আনলাম, ওর ছেলেকে খাওয়ালাম এটা দোষ হয়েছে আমার? সকাল সকাল তেজ দেখাচ্ছে, চিল্লানো শুরু করেছে যেন রেডিও শোনাচ্ছে। একটু কামাই করে খাওয়ায় এর দাপটে ঘরে টেকা যায়না। গুষ্ঠি কিলাই এই সংসারের।”
বলেই পায়ের কাছের এক বোতলে লাথি মেরে চলে গেল। বোতল ফেটে পানি বেরিয়ে এল। নিশাত লণ্ডভণ্ড রান্নাঘরে ছেলেকে চেপে ধরে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে। সংসারে একজন আগুন হলে আরেকজনকে পানি হতে হয়। তবে সেই পানি যদি পেট্রোলে রূপ নেয় সেখানে বিস্ফোরণ হওয়া স্বাভাবিক। নাহওয়ান হেঁচকি তুলে কাঁদছে। সম্ভবত এই সংসার যুদ্ধে বাচ্চা ও বাচ্চার মা উভয়ই বিধ্বস্ত। সম্পর্কের ছেঁড়া সুতোটা বোধহয় এবার পুরোপুরিই ছেঁড়ার বন্দোবস্ত হলো।
__
‘পদ্মালয়’ নামক চেয়ারম্যান বাড়িতে সকাল সকাল ভয়াবহ কাণ্ড ঘটে গিয়েছে। যেই সেই কাণ্ড না একেবারে খবরে ছাপানোর মতো কাণ্ড। শাশুড়ির হাতে পুত্রবধূ চড় খেয়ে বোবা হয়ে গেছে। উর্মি ভুঁইয়ার ভাষ্যমতে মানহা তাকে চায়ের সাথে কিছু মিক্স করে দিয়েছে। তার ধারণা সেটা বিষ। ভাগ্যিস সেইসময় সে ওখানে গিয়েছিল নয়তো এই মেয়ে তাকে যমের দুয়ারে পাঠিয়ে দিত। মানহাকে যত ভোলা ভেবেছিল আদতে মেয়েটা দুনিয়ার বাজে। সেই থেকেই ঘটনার সূত্রপাত। দিন দিন উর্মি ভুঁইয়ার আচরণ আক্রমনাত্মক হয়ে যাচ্ছে। স্বামী, কন্যা, পুত্র, পুত্রবধূ কাউকে দুই চোখে সহ্য করতে পারছেন না।
বিশাল হলরুমে বৈঠক বসেছে। উর্মি ভুঁইয়ার দুই ভাই উমায়ের ভুঁইয়া এবং উজান ভুঁইয়াও উপস্থিত। ইহাব সকলকে ডেকে হুলস্থূল ঘটিয়ে ফেলেছে। উপস্থিত সকলের মুখে চিন্তার রেখা ফুটে আছে। অথচ যাকে নিয়ে বৈঠক সে নির্বিকার চিত্তে চায়ে চুমুক দিচ্ছেন আর বই পড়ছেন। যেন এসব বৈঠকে তার কিছুই যায় আসেনা। ইমতিয়াজ ভুঁইয়া পড়েছেন গ্যারাকলে। এদিকেও যেতে পারছেন না ওদিকেও যেতে পারছেন না। দুদিকেই বিপদ। ইহাব মুখ শক্ত করে উমায়ের ভুঁইয়ার উদ্দেশ্যে বলল,
“মামু, তোমার আদরের বোনকে জিজ্ঞেস করো আমার বউয়ের সাথে তার কিসের শত্রুতা? প্রথম প্রথম তো মাথায় তুলে নাচত এখন মাথা থেকে ফেলে আছাড় দিচ্ছে কেন?”
উমায়ের ভুঁইয়া বললেন,
“একটু শান্ত হ।”
“কিসের শান্ত হব? মমের এমন গিরগিটির মতো রূপ বদলানো দেখে আমিই হতভম্ভ আর বেচারি তো পরের মেয়ে। সে তো বুঝে উঠতেই পারছে না কী ঘটছে আর কেন ঘটছে? আমি নাহয় ছেলে একটা কেন দশটা থাপ্পড় খেলেও প্রবলেম নেই কিন্তু আমার বউকে মারে, কথা শুনায় কোন যুক্তিতে? মানহা কি তার মেয়ে?”
“তোর মা তো বলল, চায়ের সাথে কিছু মিশাতে দেখেছে তাই এমন রিয়েক্ট করেছে।”
ইহাব কপালে হাত ঠেকিয়ে বলল,
“ওটা চিনি ছিল মামা। মমের কি হয়েছে বুঝতে পারছি না। সব কিছুতে অহেতুক সন্দেহ করা শুরু করেছে। মারতে হলে ছেলেকে মারতো পরের মেয়েকে মারার দরকারটা কি ছিল? মেয়েটার চোখে আমি কালার হলাম না? ওর মা, বাবা, ভাইয়েরা জানলে কি হবে বুঝতে পারছ?”
উমায়ের ভুঁইয়া বললেন,
“তোর বউ কি উচ্চবংশীয়? ধনী পরিবারের? তাহলে আমাকে ফোন নম্বর দে, আমি যোগাযোগ করব। অত টেনশন করতে হবে না। তোর মামু আছে কি করতে?”
ইহাব গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“প্রয়োজন নেই। আমি দেখব।”
উর্মি ভুঁইয়া এবার মুখ খুললেন,
“পুরোপুরি দেখি বউয়ের গোলাম হয়ে গেছিস, বাহ্! নিশ্চয়ই কান পড়া দিয়েছে। ওই মেয়ে একটা কূটনী। ঠিক ছেলেকে মায়ের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছে। একে কি দেখে ভালো ভাবতাম? ভাবলেই তো শরীর কুটকুট করছে।”
ইহাব দাঁড়িয়ে বলল,
“মম এবার কিন্তু বেশি বেশি হচ্ছে। কান পড়া দেয়ার কিছু নেই। সবকিছু আমার চোখের সামনেই ঘটেছে। তাই অযথা পরের মেয়েকে টেনো না এরমধ্যে। ভালো ফ্যামিলির মেয়ে দেখে এখনো চুপ করে আছে নয়তো অন্য মেয়ে হলে এই ঘটনার পর বাপের বাড়ি গিয়ে কেস করে দিত আমাদের নামে। তখন জেলে বসে সর্ষে ফুল দে…”
ঠাস শব্দে পুরো বসার ঘর স্তব্ধ। ইহাব ডান গালে হাত ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। উমায়ের ভুঁইয়া, উজান ভুঁইয়া, ইমতিয়াজ ভুঁইয়া, ইনাবা সকলে থাপ্পড়ের শব্দে দাঁড়িয়ে গেছে। উর্মি ভুঁইয়া ইহাবের দিকে তাকিয়ে বলল,
“মায়ের চোখে চোখ রেখে কথা বলা শিখেছ? যাও তোমাকে ও তোমার বউ দুজনকেই থাপ্পড় দিলাম। এবার জামাই বউ দুজনে যেয়ে আমার নামে কেস করে এসো, যাও। বেয়াদব পেটে ধরেছি। রক্ত কথা বলে। তোমার রক্তও কথা বলছে। হেডম দেখাচ্ছে আমাকে।”
ইমতিয়াজ ভুঁইয়া উর্মি ভুঁইয়াকে ধরতে এলে উর্মি ভুঁইয়া চোখ রাঙিয়ে বলল,
“দূরে থাকুন। ছেলেকে শাসন করতে পারেনা আসছে আমাকে শান্ত করতে।”
ইনাবা এগিয়ে আসতে আসতে বলল,
“আম্মু একটু ঠান্ডা হও। তোমার প্রেশার বাড়বে।”
“তোমারও ভাই, ভাবির সঙ্গে চড় খাওয়ার শখ জেগেছে? তোমার কাছে জ্ঞান চেয়েছি? দূরে থাকো।”
উর্মি ভুঁইয়ার কাঠিন্য স্বর। ইহাব আর এক মুহুর্ত না দাঁড়িয়ে গটগট পায়ে হেঁটে উপরে চলে গেল। পুরো হলরুমে নীরবতা নেমে আসলো। ইমতিয়াজ ভুঁইয়া চিন্তিত বদনে বসে রইলেন।
_
জিনানের আজকে ডিউটি নেই। বাকি চারজনেরও অফ ডে। কানে ব্লুটুথ। যেটা দিয়ে নেওয়াজ, মুনতাজির, মার্ভ, সাইফার সকলের সাথে কথা বলছে। ঘরে বসেই আর্জেন্ট ফাইল চেক করছে আর রেড মার্কার দিয়ে ক্রস চিহ্ন দিচ্ছে কিছু কাগজে। হঠাৎ তার পার্সোনাল ফোন ভাইব্রেট করতে লাগল। জিনান কেটে দিল। তবে অপরপক্ষ মারাত্মক অধৈর্য বোঝা যাচ্ছে। বার বার বিরতিহীন ভাবে কল দিয়েই যাচ্ছে। জিনান শেষে ফোন সুইচ অফ করে রাখল। জরুরি আলাপ, কাজ সেরে একটু রিল্যাক্স হয়ে বসতেই কলিং বেলের শব্দে টনক নড়ল। এই ফ্ল্যাটে সে একাই থাকে। এসময়ে আবার কে এল? কুঁচকানো গেঞ্জি টানটান করে টাউজারের পকেটে এক হাত ভরে দরজার পিপহোলে চোখ রাখল। আশপাশে কাউকে দেখল না।
জিনান কপাল ভাঁজ করে চলে যেতে নিলে আবারও অনবরত কলিং বেল বাজতেই থাকল। সে এবার ঘর থেকে পিস্তল নিয়ে এসে ধীরে ধীরে দরজা খুলে দিতেই কেউ যেন তার গায়ের উপর হামলে পড়ল। জিনান অতর্কিত হামলায় উল্টেপাল্টে পড়ে গেল। গায়ের উপরের ভারী বস্তুটার দিকে নজর দিয়ে বলল,
“এখানে কি?”
উপরের মানুষটা আরাম করে একপায়ের উপর আরেক পা ভাঁজ করে আসনের মতো বসে বলল,
“তুমি।”
জিনান দ্রুত উঠে দরজা বন্ধ করে বলল,
“তুমি পাগলামি বন্ধ কবে করবে ইরা?”
ইরা নামক মেয়েটি ছুটে এসে জিনানের গলা জড়িয়ে ধরে বলল,
“কোনোদিন না। তুমি তো আমাকে একটুও মনে করো না।”
জিনান মুখের অভিব্যক্তি পরিবর্তন না করেই বলল,
“আমার কাজ থাকে সেটা নিশ্চয়ই তোমার অজানা নয়। তুমি বাসার ঠিকানা পেয়েছ দেখে যখন তখন এখানে চলে আসবে এটার পারমিশন কিন্তু তোমায় দেয়া হয়নি।”
ইরা মুখ কালো করে বলল,
“তোমার বাসায় আসতে আমার পারমিশন লাগবে নীলাভ্র?
জিনান বিরক্তিসূচক শব্দ করে নিজের কপাল চুলকে বলল,
“অবিয়েসলি লাগবে। তোমার পাগলামি তুমি বাসা পর্যন্ত বজায় রাখো। আমার গুরুত্বপূর্ণ ফাইলের ভিতরে তোমার প্রেম কাহিনী শোনার জন্য নিশ্চয়ই কেউ বসে নেই। এইজন্যই এই পেশার কথা তোমাদের মতো মেয়েছেলেকে জানানো উচিত না। এরা কাজের কাজ তো কিছু করেইনা উল্টো অযথা প্যারা দেয়। পুরো অফিসরুমে আমার মান, ইজ্জত খেয়েছ তুমি। এখনো বাচ্চা নেই তুমি। অবুঝের মতো বিহেভ এবার অন্তত ছাড়ো।”
ইরা ছলছল চোখে তাকিয়ে আছে। এতদিন পর দেখা হয়েছে কোথায় জড়িয়ে ধরবে তা না করে কড়া কড়া কথা শুনিয়ে যাচ্ছে। ইরা কি এত কিছু বুঝে কাগজগুলো রেখেছিল? মনটা তার বিতৃষ্ণায় ভরে গেল। এসব পুরুষদের বিবাহ করাই ভুল। এদের কাছে নারীর প্রেমকে ঢং, ন্যাকামি লাগে। বাবার জোরাজুরিতে এই কাজিন নামক বাঁশটাকে বিবাহ করে তার জীবন যৌবন সব শেষ। সে ছাড়া এই কারেন্টের তারকে কেইবা বিয়ে করতো। একটু ধরলেই চিলিক মেরে ওঠে শালার বিদেশি মাল। এসব ভেবেই ইরা মুখ মোচড়ালো। জিনান তার মুখের সামনে তুড়ি বাজাতেই ইরা নিজের ব্যাগ নিয়ে সোজা শোবার ঘরে চলে এল। জিনান পিছু পিছু এসে বলল,
“তুমি কি এখানে থাকবে?”
ইরা না ঘুরেই নিজের হ্যান্ড ব্যাগ আলমারি খুলে রাখতে রাখতে বলল,
“না, আমার ভূত থাকবে।”
জিনান এক ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“তোমাকে এখানে আসতে বারণ করেছিলাম আমি।”
ইরা প্রতিউত্তর করল না। মনে মনে বলল, এ্যাহ উনি বারণ করলেই আমি শুনব। জিনান দরজায় হেলান দিয়ে বলল,
“জামাকাপড় তো আনোনি। কি পড়ে থাকবে?”
“দরকার হলে জামাকাপড় ছাড়াই থাকব। কোনো সমস্যা?”
জিনান হেলানরত অবস্থায় হাত ভাঁজ করে বলল,
“তোমার সমস্যা না হলে আমার সমস্যা হবে কেন? জামাকাপড় ছাড়া তো আর আমি থাকব না।”
ইরা জিনানের কথার মানে বুঝতে পেরে চোখ রাঙিয়ে বলল,
“অসভ্য।”
তারপর আলমারি খুলে জিনানের একটা সাদা গেঞ্জি আর টাউজার নিয়ে সোজা ওয়াশরুমে চলে গেল। জিনান দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছে। শুরু হয়েছে তার ব্র্যান্ডের গেঞ্জি, টাউজারে দখলদারিত্ব। এই মেয়ে এখানে আসলে তার আলমারি লণ্ডভণ্ড করে ফেলে। জিনান মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। সব গুরুত্বপূর্ণ ফাইল গুছিয়ে লকারে ঢুকিয়ে রাখল। কোথায় কোথায় হাত দেয় বলা যায়না। একটু সুস্থে থাকে না মেয়েটা। এত চঞ্চল আর অস্থির! উফ জিনান আর ভাবতে পারল না। ইরার বেরুনোর অপেক্ষা করতে লাগল। এসেছে যেহেতু বেশি বেশি খাটিয়ে নিতে হবে। তাহলে ঘন ঘন এখানে আসার স্বাদ মিটে যাবে।
ইহাব মানহার সাথে কথা বলার চেষ্টা করছে তবে মানহা তাকে এড়িয়ে যাচ্ছে। ফ্লাফিকে আদর করছে, খাবার দিচ্ছে। একদম চুপচাপ হয়ে আছে। ইহাবের মনে হচ্ছে ঝড় আসার পূর্বের লক্ষণ এটা। উর্মি ভুঁইয়ার চড় খেয়ে জবাব বন্ধ হয়ে গেছে নাকি। বেচারি ওই মুহুর্ত থেকেই বোধহয় এখনো বেরুতে পারেনি। ইহাব গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
“শোনো চড় তুমিও খেয়েছ, আমিও খেয়েছি। হয়ে গেল না শোধবোধ? কথা না বললে কি গাল থেকে চড়টা উঠে যাবে? আমার সাথে কথা না বলার কারণ কি? চড় কি আমি দিয়েছি? যে দিয়েছে তার সাথে কথা বলো না। আমি তো নিজেও ভুক্তভুগী। তাই আসো কোলাকুলি করে ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলি।”
মানহা প্রতিউত্তর করল না। মানহার উত্তর না পেয়ে ইহাব নিজ থেকেই এগিয়ে এসে মানহাকে পিছন থেকে ঝাপটে ধরল। অমনি মানহা চোখ ঘুরিয়ে ইহাবের দিকে চাইল। ইহাব বলল,
“রাগ করেনা রিন পাউডার
খুলে দেও মুখের লাউডার।”
মানহা ইহাবকে সরিয়ে বলল,
“উল্টাপাল্টা ছন্দ বলা বন্ধ করুন। আমার ভালো লাগছে না এসব।”
ইহাব এগিয়ে এসে বলল,
“যাক অবশেষে কথা বললে রিন পাউডার।”
মানহা বিরক্তি নিয়ে বলল,
“আশ্চর্য রিন পাউডার কে?”
“কে আবার তুমি।”
“আমার একটা সুন্দর নাম আছে। মানহা আফরিন। ডাকলে সেই নামেই ডাকবেন।”
“আমি তো সেই নামেই ডাকছি আফরিইইন ওরফে রিন পাউডার। কঠিন দাগ সরিয়ে কাপড়কে করে নিমেষেই পরিষ্কার।”
_
রাতে মারওয়ান দুটো ইলিশ মাছ এনেছে নিশাত ছুঁয়েও দেখেনি। নাহওয়ান বাবাকে দেখে প্রথমে ভয় পেলেও মারওয়ানের আদরে আবারও প্রাণবন্ত হয়ে গেছে। বেশি রাত হয়ে যাওয়ার পরেও যখন নিশাতকে মাছ ছুঁতেও দেখল না তখন ছেলেকে নিয়ে ইউটিউব দেখে কোনরকম ইলিশ মাছ কেটে ভেজে তুলে রাখল। ভাগ্যিস এটা ইলিশ মাছ ছিল নয়তো এই মাছ খাওয়ার উপযোগী আর হত না। বাসায় আসার পথে জ্যান্ত লাল টসটসে ইলিশ মাছ দুটো দেখে লোভ সামলাতে পারেনি। সকালের কথা এরমধ্যেই ভুলে গেছে নাহলে রাতে অন্তত ভুলেও ইলিশ নিয়ে বাসায় ঢুকতো না। পকেটে টাকা থাকলে খরচ করতে শরীর শিরশিরায় তার।
এসব ভাবতে ভাবতে গরম গরম মাছ দিয়ে ভাত খেতে বসল। মাছের পেটের একপিস নিল। যেই কামড় দিয়েছে তিতায় মুখ বিদঘুটে রূপ ধারণ করেছে। মাছের পেটে গুতাগুতি করতে গিয়ে নিশ্চয়ই ভিতরে পিত্ত গলিয়ে ফেলেছে। ভালো করে সাফ হয়নি। মারওয়ান কোনরকম ডাল দিয়ে খেয়ে উঠল। এত টাকার এত সাধের মাছ পুরোটাই জ্বলে গেল। নারীরা সংসার কিভাবে সামলায়? সে একটু মাছ কাটতে গিয়েই গড়মিল করে ফেলেছে বাকিগুলো করতে গেলে তো একদিনেই সবকিছু তছনছ করে ফেলত। এজন্যই গুরুজনেরা বলেন,
“সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে।”
এসব ভাবতে ভাবতে মারওয়ান ঘুমের দেশে পাড়ি জমাল। হয়তবা কাল আবারও রমণীর গুণের কথা ভুলে গিয়ে নতুন উদ্যমে তাদের ভেঙে দিতে মারওয়ানের মতো পুরুষরা জেগে উঠবে।
চলবে..
(আসসালামু আলাইকুম।)
ভবঘুরে_সমরাঙ্গন
পর্ব_৪৮
তাজরীন ফাতিহা
নিশাত মারওয়ানের আলাপ স্থগিত আজ তিনদিনে পড়েছে। শুধু আলাপ স্থগিত ব্যাপারটা সেখানেই সীমাবদ্ধ নেই একজন আরেকজনের মুখ দেখাদেখিও বন্ধ। বন্ধ অবশ্য হয়েছে নিশাতের পক্ষ থেকেই। মারওয়ান ঘরে থাকলে নিশাত অন্যরুমে দরজা আটকে রাখত আর বাইরে গেলে বের হয়ে রান্নাবান্না করত, ছেলেকে সময় দিত।
নিশাত সকাল আটটায় স্কুলের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। মারওয়ান তখন ঘুমে। নাহওয়ানকে নাস্তা খাইয়ে মারওয়ানকে জাগাতে বলে বেরিয়ে পড়েছে সে। আজকে স্কুলে গুরুত্বপূর্ণ একটা মিটিং আছে। ওটা শেষ করে বাসায় আসতে লেট হবে। এসব ভাবতে ভাবতে স্কুলে পৌঁছে গেছে সে। গেট দিয়ে ঢোকার সময় নাজমা ম্যাডাম ডেকে উঠলেন। নিশাত সেদিকে তাকিয়ে দেখল নাজমা ম্যাডাম তার হাজব্যান্ডের বাইক থেকে নামছেন। নিশাত তাকাতেই তিনি হাত নাড়িয়ে তাকে থামতে ইশারা করলেন। তারপর হেলমেট খুলে হাজব্যান্ডের পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে কিছু হাজার টাকার নোট গুণে নিজের পার্সে ঢুকালেন। মানিব্যাগ পকেটে রাখতে রাখতে স্বামীর গালে চুমু খেয়ে নিজের গাল এগিয়ে দিলেন। নিশাত এক নজর সেদিকে তাকিয়ে সৃষ্টি ঘুরিয়ে সামনে তাকিয়ে রইল। খানিক পর নাজমা ম্যাডাম এসেই বললেন,
“আজকে লেট হয়ে গেল। আর বলবেন না আপনাদের স্যার আমাকে ছাড়া একদমই কিছু বোঝে না। আমি বললাম আজ গাড়ি করে যেতে ইচ্ছে করছে না বাইকে যাব। অমনি নানা লেকচার শুরু করেছে। যদি দুর্ঘটনা হয় আমি পড়ে যাব, ব্যথা পাব হেন তেন। লোকটা এত্ত কেয়ারিং আমার নিজেরই মাঝে মধ্যে মনে হয় একটু কম কেয়ারিং হলে কী এমন ক্ষতি হতো? আপনিই বলুন।”
নিশাত নিশ্চুপ হাঁটছিল। নাজমা ম্যাডামের ছোড়া প্রশ্নে একটু ইতস্তত করে বলল,
“আমি কী বলব?”
প্রতিউত্তরে নাজমা ম্যাডাম বললেন,
“তাইতো আপনি কী বলবেন। আপনার তো এসব বিষয়ে অভিজ্ঞতা নেই।”
বলেই ঠোঁট বেকিয়ে হাসলো। কথাটায় নিশাত টিটকারীর আভাস পেল। তবে কিছুই বলল না। নাজমা ম্যাডাম যে তাকে কটাক্ষ করে কথাটা বলেছেন সেটা সে স্পষ্টতই বুঝতে পেরেছে। এরকম কটাক্ষ তিনি নিশাতকে প্রায়ই করেন। আগে একা করলেও এখন আরও কয়েকজন কলিগের সাথে মিলে জোট বেঁধে করেন। নিশাতের প্রথম প্রথম খারাপ লাগলেও এখন আর গায়ে লাগে না। যার স্বামীর ঠিক নেই তার স্ত্রী হয়ে এরকম দু’চারটা কটাক্ষ, টিটকারী হজম করতে না পারলে কেমন স্ত্রী সে।
অফিসকক্ষে প্রবেশ করা মাত্রই নাজমা ম্যাডাম তার সঙ্গী সাথীদের সাথে মিশে গেলেন। নিশাতের দিকে বিশেষ ভ্রুক্ষেপও করলেন না। এমনভাবে এড়িয়ে গেলেন যেন এখানে নিশাত নামের কারো কোনো অস্তিত্বই নেই। রুবি ম্যাডাম সবকিছু লক্ষ্য করে নিশাতের দিকে এগিয়ে গেলেন। এসেই নিশাতের পাশে চেয়ার টেনে বসলেন। নিশাত তাকে দেখে সালাম দিল। রুবি ম্যাডাম সালামের জবাব দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“কেমন আছেন?”
নিশাত মুচকি হেঁসে জবাব দিল,
“আলহামদুলিল্লাহ। আপনি কেমন আছেন?”
“আমি তো আলহামদুলিল্লাহ ভালোই থাকি। আচ্ছা আপনাকে একটা প্রশ্ন করি?”
নিশাত ঘড়িতে সময় দেখে বলল,
“জ্বি করুন।”
রুবি ম্যাডাম চেয়ারটা এগিয়ে নিশাতের পাশাপাশি আনল। তারপর খুব ধীরস্থির কণ্ঠে নমনীয় গলায় বলল,
“আপনার খারাপ লাগে না?”
“খারাপ লাগবে কেন?”
“এইযে আপনার হাজব্যান্ডকে নিয়ে এত গসিপ হয়, আপনাকে ঠাট্টা তামাশা করা হয় এজন্য?”
নিশাত শান্ত গলায় জবাব দিল,
“সত্যি বলতে মানুষের ন্যাচার অনুযায়ী প্রথম প্রথম খারাপ লাগলেও এখন আর লাগেনা। সবকিছু সয়ে গেছে। আলহামদুলিল্লাহ এভাবেই ভালো আছি। যত সইতে পারব জীবন ততই সুন্দর।”
“যদি কোনোদিন সহ্য শক্তি কমে যায়?”
“সেদিন নাহয় আবারও আল্লাহর সাথে বন্ধুত্ব করব।”
“ক্লান্ত হন না?”
“হই তবে রবের সঙ্গে কথা বললে ক্লান্তি দূর হয়ে যায়।”
“রবের সঙ্গে কথা বলা যায়?”
“যায়, আমি তো প্রতিদিন বলি।
“এতটা মানসিক শক্তি কিভাবে অর্জন করলেন?”
“আল্লাহর সাথে কথা বলে।”
নিশাতের প্রতিউত্তরে রুবি ম্যাডাম হতবাক হলেন। এরকম উত্তর তিনি আশা করেননি। এত ধৈর্য, এতটা! সে থাকলে নিশ্চয়ই এতটা দৃঢ় মনোবলের সহিত জবাব দিতে পারত না। আল্লাহর উপরে তার কত অগাধ বিশ্বাস, ভরসা! চেহারায় একবিন্দু অসন্তুষ্টির ছায়া নেই। শুধু ক্লান্তি রয়েছে। রুবি ম্যাডাম হৃদয়কুঞ্জে নীরবে আওড়ালেন,
“আল্লাহ তোমার এই ধৈর্যশীল বান্দাকে তুমি নিরাশ করো না। তাকে সুখে রেখ। তোমার উপরে ভরসার প্রতিদান হিসেবেও সে অনেক অনেক ভালো থাকা ডিজার্ভ করে।”
ঘণ্টার আওয়াজ পড়ায় যে যার ক্লাসে চলে গেল।
নাহওয়ান রান্নাঘরের ফ্লোরে বসে খুব আয়েশ করে চিনি খাচ্ছে। এসেছিল দুধ খেতে তবে দুধের বয়াম না পেয়ে চিনির বয়ামে হাত ঢুকিয়ে কব্জি, কুনুই, মুখ ভরিয়ে ফেলেছে। বাবাকে বারবার ডাকার পরেও বাবার পাত্তা না পেয়ে নিজে নিজেই নিজের কার্য হাসিল করছে। মারওয়ান ঘুম ঘুম চোখে রান্নাঘরে এসে নাহওয়ানের এই হাল দেখে চোখ কপালে তুলে দাঁড়িয়ে রইল। চিনি শুধু মুখেই ভরায়নি আশেপাশে ফেলে একেবারে বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা করে রেখেছে। মারওয়ানের রাগ উঠল। বাচ্চাটা এত জ্বালায়। নিজের কপাল ঘষে বিরক্তি নিয়ে বলল,
“কি করছিস পোটকার বাচ্চা?”
নাহওয়ান ঘাড় ঘুরিয়ে বাবাকে দেখে ফোকলা হেঁসে বলল,
“ইট্টু মুজা মুজা কাই।”
মারওয়ান দাঁত কিরমিরিয়ে বলল,
“তোর মুজা মুজা খাওয়া বের করছি, দাড়া। পুরো রান্নাঘরের অবস্থা বেহাল করে ফেলেছে পাজি, হতচ্ছাড়া পটলের বাচ্চাটা। ওর মা জ্বালাতে পারেনা দেখে এটাকে রেখে যায় আমার জীবন ভাজা ভাজা করতে। লিলিপুট, লিলিপুটের ছাও দুটোই সেয়ানা।”
কথাগুলো বলতে বলতে মারওয়ান এগিয়ে এসে নাহওয়ানের হাত ধরে টেনে তুলল। গেঞ্জি, প্যান্ট থেকে চিনি ঝেড়ে বয়াম উপরে উঠিয়ে রাখল। তারপর রান্নাঘর ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করল। নাহওয়ানকে নিয়ে বাথরুমে গেল গোসল করাবার উদ্দেশ্যে। বাচ্চাটা পানি নিয়ে দাপাদাপি করছে। মারওয়ান ঠোঁট চেপে বলল,
“এই চুপচাপ দাড়া লিলিপুটের ছাও। সেদিন তোর মা আমাকে বুড়ো বলেছে। বুড়ো তো তোর কারণে হচ্ছি ব্রিটিশের নাতি।”
নাহওয়ানের প্যান্ট খুলে দেয়ায় তার পরনে শুধু সেন্ডুগেঞ্জি। সে সেন্ডুগেঞ্জি তুলে ধরে বলল,
“টুমি বিটিস?”
মারওয়ান মুখ গম্ভীর করে বলল,
“আমি ব্রিটিশ হতে যাব কেন? তুই, তোর মা, তোর নানা ব্রিটিশ। বুঝেছিস?”
“বুজেচি। আমি, টুমি, মা, নানু বাই চবাই বিটিস।”
মারওয়ান হতভম্ব গলায় বলল,
“কত বড় বদ, ভাবা যায়!”
নাহওয়ান হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে বলল,
“বড নাই।”
“চোপ, লেংটু কোথাকার।”
নাহওয়ান গেঞ্জি ছেড়ে তার গুলুমুলু দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে বলল,
“লিংটু বলো কেনু? চলম চলম।”
মারওয়ান মগ হাতে নিয়ে বলল,
“ওরে কত শরম! শরম একেবারে বেয়ে বেয়ে পড়ছে। লজ্জা নাই বাপের সামনে উদোম হয়ে দাঁড়িয়ে আছিস?”
নাহওয়ান এবার চোখ থেকে হাত নামিয়ে নাড়িয়ে নাড়িয়ে বলল,
“নজজা নাই।”
মারওয়ান আর কথা না বাড়িয়ে পানি মগ ভর্তি করে নাহওয়ানের গায়ে ঢেলে দিল। গায়ে পানি পড়ায় নাহওয়ান মুখ হা করে ফেলল। মুখ দিয়ে বুদবুদ বের করতে লাগল। মারওয়ান ছেলের মাথা মেরিল বেবি শ্যাম্পু দিয়ে ধুইয়ে দিল। বেশ খানিক বাদে বাপ, ছেলে গোসল করে একেবারে পরিপাটি হয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলো। মারওয়ান নাস্তা খেয়ে ছেলেকে তৈরি করল। নিজেও তৈরি হলো। দুই বাপ, বেটা ফিটফাট হয়ে বাসা থেকে বেরুলো।
__
আকাশে আকাশচর মুক্ত বিহঙ্গের ন্যায় ডানা ঝাপটে বেড়াচ্ছে। মাঝে মধ্যে ‘পদ্মালয়’ কুঞ্জে এসে বসে কিচিরমিচির শব্দ করে চলছে। তাদের কলতানে প্রকৃতিতে সৃষ্টি হচ্ছে সুরের মূর্ছনা। ইমতিয়াজ ভুঁইয়া স্টাডি টেবিলে বসে কিছু লিখছিলেন। উর্মি ভুঁইয়া শুয়ে শুয়ে তাকে সূক্ষ্ম নজরে পর্যবেক্ষণ করছেন। বেশ খানিক পর এপাশ ওপাশ করে বললেন,
“শুনুন, আপনার ছেলে কি বাসায় আছে?”
ইমতিয়াজ ভুঁইয়া লিখতে লিখতেই জবাব দিলেন,
“থাকলেও তোমার কাছে আসবে না। তাই যা বলার আমাকে বলো, আমি বলে দেবো তাকে।”
“বউয়ের আঁচলের তলায় ঢুকে আছে?”
জবাব এলো,
“হ্যাঁ যেমন তোমার আঁচলের তলায় আমি ঢুকে আছি।”
উর্মি ভুঁইয়া রাগান্বিত স্বরে বললেন,
“মশকরা করবেন না আমার সাথে, বিরক্ত লাগে। আর আমার আশেপাশে কম থাকবেন। আপনাকে সহ্য হয়না।”
ইমতিয়াজ ভুঁইয়া কলম রেখে বললেন,
“সহ্য হয় কাকে?”
উর্মি ভুঁইয়ার খিটখিটে উত্তর,
“কাউকে না।”
ইমতিয়াজ ভুঁইয়া ফোঁস করে নিঃশ্বাস নিয়ে বললেন,
“তোমার মুড যেভাবে পরিবর্তিত হয় গিরগিটির রূপও এতো দ্রুত পরিবর্তন হয়না। এই বয়সে এসে আবারও পাগলামি শুরু হয়েছে।”
“কিসের পাগলামি? আমি একদম সুস্থ।”
“হ্যাঁ তার নমুনা তো দেখতেই পাচ্ছি।”
উর্মি ভুঁইয়া কপাল কুঁচকে বললেন,
“আপনি আমাকে ইনডাইরেক্টলি পাগল বলছেন?”
ইমতিয়াজ ভুঁইয়া কলম হাতে নিয়ে বললেন,
“ইনডাইরেক্টলি বলার কিছু নেই তুমি পাগলই।”
উর্মি ভুঁইয়া দাঁতে দাঁত পিষে চোখ মুখ কঠিন করে ইমতিয়াজ ভুঁইয়ার দিকে চেয়ে রইলেন। যেন এক্ষুনি ভস্ম করে দেবেন সামনের পাঞ্জাবি পরিহিত পুরুষটিকে।
মানহা সকালের নাস্তা বানিয়ে টেবিলে সাজিয়ে রাখছে। ইহাব জগিং করে এসে মানহার পিছুপিছু ঘুরছে। মানহা বিশেষ পাত্তা দিচ্ছে না। ইহাব সেসব দেখে মনের দুঃখে গাইল,
“ও টুনির মা, তোমার টুনি কথা শোনে না।
রান্নার সাথে ডেটিং করে আমায় চেনে না।”
মানহা চোখ রাঙিয়ে বলল,
“এসব কি?”
ইহাব ঠোঁট উল্টে বলল,
“দুক্কো।”
“উফ সব সময় আপনার ইতরামি না করলে চলে না?”
“কোথায় ইতরামি করলাম? শুধু গেয়েছি।”
মানহা কোমরে এক হাত রেখে ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“কি গেয়েছেন?”
ইহাব গলা খাঁকারি দিয়ে আবারও গেয়ে উঠল,
“ও টুনির মা, তোমার টুনি কথা শোনে…”
“থামুন থামুন।”
“কি হলো?”
“আপনার কাছে গান শুনতে চাইনি।”
“তোমাকে শোনাচ্ছিও না। জাস্ট কি গাচ্ছিলাম সেটা প্রাক্টিক্যালি দেখাচ্ছি।”
“উফ্ ভালো লাগছে না সরুন।”
“আমার ভালো লাগছে। খালি সরুন সরুন করো কেন? থাকুন থাকুন করতে পারো না?”
“না।”
ইহাব মানহার কাঁধে দুই হাত রেখে মাথা নাড়িয়ে নাড়িয়ে বলতে লাগল,
“করেছি একটা বিয়ে
এতগুলো টাকা দিয়ে
মেয়ে হলো আনরোমান্টিক
আমি হলাম রোমান্টিক।
কাজের বেলায় বুম্বাস্টিং
আমার বেলায় ডিজগাস্টিং।”
“ধ্যাত্তেরি।”
_
নিশাত ক্লাসরুমে ক্লাস করানো অবস্থায় খবর পেল স্কুলে নাকি আইনের লোক এসেছে। বেশ চিন্তিত হলো সে। উড়ো উড়ো খবর পেল নাজমা ম্যাডামের নিকট তাদের আগমন ঘটেছে। কোনরকম ক্লাস শেষ করে তড়িঘড়ি করে ছুটলো অফিসকক্ষের দিকে। সেখানে পৌঁছে দেখল অফিসরুমের সামনে অনেক ভিড় ও জটলা বেঁধে আছে। ভিতরে কাউকে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। সবাই বাইরে দাঁড়িয়ে উৎসুক ও উদগ্রীব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বেশিরভাগ মেয়ে কলিগরাই ভিড় করে রেখেছে। নিশাত আর গেল না সেদিকে। ভিড় না থাকলে একবার দেখার চেষ্টা করত। সে আর না দাঁড়িয়ে নিজের পরবর্তী ক্লাসে চলে গেল। এখানে দাঁড়িয়ে থেকে সময় নষ্ট করার মানে নেই। মানুষ একটা কিছু পেলেই হলো। যেন অমূল্য রত্ন পাবার আশায় এমন চাতক পাখির ন্যায় ক্লাস ট্লাস
ফেলে দাঁড়িয়ে আছে। নিশাত মনে মনে, “আল্লাহ সহজ করুন সব।” বলে প্রস্থান করল।
ক্লাসের মাঝেই পিয়ন এসে নিশাতকে জানাল অফিসকক্ষে যেতে। তাকে জরুরি ভিত্তিতে ডাকা হয়েছে। নিশাতের বুকে কামড় দিয়ে উঠল। তাকে আবার কেন ডাকা হয়েছে? এমনিতেই তার দুশ্চিন্তার কমতি নেই এখন আবার আইনের লোকেদের জবাবদিহিতা করা লাগবে। যতটুকু শুনেছে নাজমা ম্যাডামের স্বামীর ইনকাম সোর্স জানতে এই ভয়ংকর লোকদের আগমন ঘটেছে। নিশাতের কাছে আইনের লোক মানেই ভয়ংকর। ছোট থেকেই এদের ভীষণ ভয় পায় সে। আচ্ছা কোনোভাবে মারওয়ানকে নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করবে না তো? যদি সে বলে তার হাজব্যান্ড কিছু করেনা তখন সন্দেহ করবে না? তখন তো আরও বেশি সন্দেহ করবে। এরা সাধারণ মানুষদের সব তথ্য খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বের করে। নিশাতের হাত পা কেন যেন কাঁপছে। কোন বিপদ আবার তার ঘাড়ে আসতে চলেছে সে বুঝতে পারছে না। হার্টবিট ফাস্ট চলছে।
অফিসকক্ষের দরজার সামনে দুরুদুরু বুক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নিশাত। এখন আর ভিড় নেই। সে দরজা অল্প ঠেলে ভিতরে এক নজর চাইল। মুখে মাস্ক পরিহিত বেশ কয়েকজন লোক বসা। একজন সামনে পায়ের উপর পা তুলে বসে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। সামনেই নাজমা ম্যাডাম বসা। তার চোখ মুখ ফোলাফোলা। এতক্ষণ যে কান্না করেছে তা বোঝা যাচ্ছে। নিশাতের বুকে কে যেন হাতুড়ি পেটাচ্ছে। ম্যাডাম কান্না করছেন কেন? কি ঘটেছে ভিতরে? নাজমা ম্যাডামের সঙ্গী পারভিন ম্যাডাম, ফরিদা ম্যাডাম, খালেদ স্যার, ফয়সাল স্যার, আকরাম স্যার সকলেই মুখ কালো করে পিছনে দাঁড়িয়ে আছে। লামিয়া আর রুবি ম্যাডাম তাদের থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। নিশাত ভিতরে ঢুকবে কী ঢুকবে না এসব ভেবে দোনামোনা করছে। তার ভীষণ ভয় করছে। অফিসকক্ষে কেমন গুমোট পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। নিশাতকে দেখে রুবি ম্যাডাম বললেন,
“স্যার নিশাত ম্যাডাম এসেছেন।”
জিজ্ঞাসাবাদকৃত পুরুষটি থেমে গেলেন। হাত দিয়ে ঢোকার পারমিশন দিলেন। নিশাতের উল্টো দিকে বসা সে। নিশাত ঢোক গিলে ধীর পায়ে ঢুকলো। কয়েকজনের মধ্যে একজন উঠে এসে বললেন,
“ম্যাম আমরা আইন বিভাগের লোক। আপনার সম্পর্কে একটু তথ্য নেব তারপর ছেড়ে দেব। আশা করি আপনি কোঅপারেট করবেন?”
রুমের মধ্যে পিনপন নীরবতা। নিশাত ঢোক গিলে বলল,
“জ্বি বলুন।”
“স্যারের সামনে গিয়ে বসুন প্লিজ।”
নিশাতের বলতে ইচ্ছে করল, দাঁড়িয়েই প্রশ্ন করুন। কারো সামনে বসে উত্তর দিতে পারব না। কিন্তু গলা দিয়ে শব্দ বের করতে পারল না। ক্লান্ত ভঙ্গিমায় দুরুদুরু বুক নিয়ে নাজমা ম্যাডামের পাশের চেয়ারে বসল। চোখ নামিয়ে বারবার নিজের ঘেমে ওঠা হাতের তালু ঘষতে লাগল। যে লোকটি বসতে বলেছিল সে একটা বিরাট খাতা আর কলম এনে প্রশ্ন করল,
” আপনার এবং আপনার হাজব্যান্ডের নাম?”
নিশাত খুবই আস্তে বলল,
“জ্বি আমার নাম ফৌজিয়া নিশাত। হাসব্যান্ডের নাম মারওয়ান আজাদ।”
লোকটি খচখচ করে লিখে প্রশ্ন ছুড়লো,
“বাসা কোথায়?”
“উত্তরটেক।”
“গ্রামের বাড়ি?”
“চাঁদপুর।”
“আপনার হাজব্যান্ড কি করেন?”
নিশাত হাত ঘষতে ঘষতে বলল,
“তিনি কিছু করেন না।”
লোকটি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর জিজ্ঞেস করল,
“কিছু না করলে সংসার চলে কিভাবে?”
“শ্বশুর এবং আমার টাকায়।”
লোকটি কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বলল,
“সন্দেজনক স্যার। তাকে নজরে রাখতে হবে। তার নামের পাশে দাগ দেব?”
সামনের পুরুষটি এতক্ষণ পর মুখ খুলল,
“প্রয়োজন নেই। ছেড়ে দাও তাকে।”
“কিন্তু..”
“কোনো কিন্তু নয়। যা বলেছি করো।”
লোকটি নিশাতকে চলে যেতে বলল কিন্তু নিশাতের এদিকে মনোযোগ নেই। সে সামনের পুরুষটির দিকে তাকিয়ে আছে। মুখে মাস্ক আছে যদিও তবুও এই কণ্ঠ সে চেনে। খুব ভালো করে চেনে। ভুল শোনার প্রশ্নই আসেনা। এতদিনে এই কণ্ঠের মালিককে মুখস্ত হয়ে গিয়েছে তার। চোখ দুটোও ভীষণ পরিচিত ঠেকছে। নিশাত শক্ত হয়ে বসে রইল। কিছু হিসেব মিলাচ্ছে সে। নাজমা ম্যাডাম সম্ভবত কিছু বলার জন্য তক্কে তক্কে ছিলেন। তিনি বললেন,
“আমার হাজব্যান্ড সম্পর্কে সব তথ্য দেয়ার পরেও আমাকে হেনস্থা করা হচ্ছে আর তার হাজব্যান্ড কিছু করেনা, সন্দেহজনক হওয়ার পরেও তাকে ছেড়ে দেয়া হবে? এ কেমন না ইনসাফী?”
যে লোকটি দাঁড়িয়ে ছিল সে তৎক্ষণাৎ বলল,
“বাড়াবাড়ি করবেন না? আমরা আপনার হাজব্যান্ডের জন্যই মূলত এখানে এসেছি। বাকিদের শুধু তালিকাবদ্ধ করে নিচ্ছি। তাই স্যারের সঙ্গে বেয়াদবি করবেন না। আপনি এখনো কথা বলছেন কোন মুখে? হাজব্যান্ড অবৈধ ব্যবসা করে তার ফুটানি দেখিয়ে ঘুরেন। এখন আবার গলাবাজি করছেন? এতো দেখি চোরের মায়ের তালগাছের সমান গলা।”
কথা শেষ হতেই লামিয়া ম্যাডাম এবং রুবি ম্যাডাম ফিক করে হেঁসে দিয়েছেন। হাসির শব্দ শোনা যাওয়ায় দুজনে মুখে হাত চেপে ধরেছেন। আজ বড্ড খুশি তারা। এই মহিলা আর মহিলার সাঙ্গপাঙ্গ বহু জ্বালিয়েছে। মানুষের পিছে পিছে গসিপ করত, গীবত গাইত, হাসাহাসি করত। এবার বুঝুক ঠেলা। নিশাত আজ একের পর এক অবাক হয়েই যাচ্ছে। এসব কি শুনছে সে? নাজমা ম্যাডামের হাজব্যান্ড অবৈধ ব্যবসা করেন? তার মাথা ধরে গেছে এত কাহিনী দেখে। খালেদ স্যার পিছন থেকে বললেন,
“যদিও উনি দোষী তবুও তার কথা কিন্তু একেবারে ফেলে দেয়ার মতো নয়? নিশাত ম্যাডামের হাজব্যান্ডের উপরে নজরদারি রাখা উচিত, আমি মনে করি।”
বাকিরাও সহমত জানালো। স্যার সম্বোধনকৃত লোকটি খালেদ স্যারের দিকে তীক্ষ্ণ নজর ফেললেন। খালেদ স্যার একটু কাঁপছেন। মনে মনে ভাবছেন, এই কথা বলে আবার তার বিপদ ডেকে আনলেন না তো? সামনের লোকটি কিছু ইশারা করতেই সকলকে রুম থেকে বের করে দেয়া হলো। নাজমা ম্যাডাম এবং খালেদ স্যার লোকটির মুখোমুখি বসা। লোকটি মাস্ক খুলে নাজমা ম্যাডামের দিকে চাইলেন। নিশাত তব্দা খেয়ে দাঁড়িয়ে গিয়ে অস্ফুট গলায় বলল,
“মারওয়ান আজাদ!!”
নাজমা ম্যাডাম হা করে বললেন,
“আপনি নিশাত ম্যাডামের হাজব্যান্ড না?”
লোকটি কেমন করে হেঁসে বলল,
“হলে কি করবেন?”
নাজমা ম্যাডাম ঢোক গিলে বললেন,
“আপনি আইনের লোক?”
রহস্যময় হেঁসে জবাব এলো,
“না আমি বেআইনের লোক।”
খালেদ স্যার বললেন,
“এসব কি বলছেন মিস? ওনার হাজব্যান্ড নাকি ভাদাইম্মা, কোনো কাজ করেন না তাহলে ইনি তার হাজব্যান্ড হয় কিভাবে?”
“আমি জানি না ভাই। কি হচ্ছে, কেন হচ্ছে সব আমার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। তবে ইনি নিশাত ম্যাডামের হাজব্যান্ড এতে কোনো সন্দেহ নাই।”
সামনের লোকটি রুক্ষ গলায় বলল,
“যাইহোক এই রুমে কি ঘটেছে, কি দেখেছেন সেসব যেন ভুলে যাওয়া হয়। মনে থাকবে?”
উভয়ই কাঁপা গলায় বললেন,
“জ্বি মনে থাকবে।”
লোকটি বাঁকা হাসল। সবাইকে বের করে দিয়ে নিশাতের সামনে দাঁড়িয়ে কোটটা খুলে বলল,
“ভালো আছেন মিসেস?”
নিশাত প্রতিউত্তর করতে পারল না। শার্টের বুকের উপরে লোগোতে লেখা,
এজেন্ট (IMF),
কোড নম্বর 2356xAC।
কোমরের হিপ হোলস্টারে পিস্তল রাখা। চোখের সামনে তুড়ি বাজানোর শব্দে নিশাতের ঘোর কাটল। কেমন গলায় বলল,
“আপনি মারওয়ান আজাদ?”
“উহু আজারাক সাইফার।”
নিশাত আর ভারসাম্য রাখতে পারল না। চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেল।
চলবে…
(আসসালামু আলাইকুম।)
Share On:
TAGS: তাজরীন ফাতিহা, ভবঘুরে সমরাঙ্গন
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৫০
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ২৮
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৫
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৩১+৩২
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৪৫+৪৬
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব (৫৬.১+৫৬.২)
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৬
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ২১
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৩৩+৩৪
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ২৬+২৭