বাবরি চুলওয়ালা পর্ব ২০
২০
আজকের রাতটা বিভীষিকাময়। মনে হচ্ছে কোথাও কিছু একটা ভয়ংকর ভুল হয়ে গেছে।
আমি ক্রমশ অস্থির হয়ে উঠছি। থেকে থেকে কাঁদছি পাগলের মতো। আমার মনটা পড়ে আছে হাসপাতালে। চোখ বন্ধ করলেই দৃশ্যগুলো ভেসে উঠছে। হাসপাতালের মন খারাপ করা আলো, বিছানায় শুয়ে থাকা বাবরি চুলওয়ালা, হাতে-পায়ে ব্যান্ডেজ। বুকের ভেতর হঠাৎ করে শ্বাস আটকে আসে আমার। কল দেবো, ফোন হাতে নিয়ে বসে থাকি। সাহস হয় না।
হঠাৎ ফোন বেজে উঠলো। আমি রিসিভ করলাম, ‘হ্যালো..’
‘পৌঁছেছো?’
‘হুম। পৌঁছে টেক্সট দিয়েছিলাম।’
‘কল দাওনি কেন?’
‘যদি ধরতে কষ্ট হয়…’
‘আহারে আমার পাগলীটা।’
তারপর সবকিছু চুপ। অনেক্ষণ কেউ কোনো কথা বললাম না।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘রাজু এসেছে?’
‘হুম। একটু আগে।’
‘খাবার খেয়েছেন?’
‘খেয়েছি সামান্য।’
‘কেন?’
‘রুচি আসছে না।’
‘ইশ!’
‘আমাকে ইনজেকশন দেবে। তুমি একটা কাজ করো। ভাত খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ো।’
‘কিভাবে ঘুমাবো?’
‘আমি তো ঠিক আছি।’
‘আপনি সবসময় ঠিক আছেন এই ভানটাই করেন।’
ওপাশ থেকে হালকা হাসির শব্দ আসলো, ‘রাগ করেছো?’
‘না।’
‘আমি জানতাম তুমি ভয় পাবে। তাই ফোন দেইনি।’
‘ভয় পাওয়াটাই কি স্বাভাবিক না?’
‘আমার হাতে স্যালাইন লাগাবে। তুমি একটু অপেক্ষা করতে পারবে?’
‘হুম।’
‘আমি কল দিচ্ছি কিছুক্ষণ পর।’
এরপরের সময়টুকু আমার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘশ্বাস আর উৎকণ্ঠায় ভরা। ঘড়ির কাঁটা একটু একটু করে এগোচ্ছে, বাইরে গভীর রাত। মা বাবা নিজেদের রুমে, হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। এদিকে আমি অস্থির হয়ে এদিক সেদিক ছোটাছুটি করছি। আমার বুকে সীমাহীন তোলপাড়। নিজের দেহের অর্ধেক অংশ বাইরে ফেলে আসলে কেউ কি ভালো থাকতে পারে!
একবার ভাবি কল দেই। আবার মনে হয়, যদি ঘুমিয়ে পড়ে? যদি ফোন ধরার মতো অবস্থায় না থাকে? বুকের ভেতর আবার সেই অস্থির ঢেউটা দুলে দুলে ওঠে।
নিজেকে বোঝাতে থাকি, ওখানে ডাক্তার আছে। নার্স আছে।
কিন্তু মন তো যুক্তি মানে না।
আমি উঠে জানালাটা খুলে দিলাম। আকাশে চাঁদ নেই। হালকা বাতাস আসছে। বাতাসে শরীরটা একটু ভালো অনুভব করলাম। আচ্ছা, এই বাতাসটাই কি হাসপাতালের জানালায়ও লাগছে এখন? তার কেবিনে!
বাতাস কি পারে না তার খবর এনে আমার অশান্ত মনকে শান্ত করে দিতে?
হঠাৎ ফোনটা কেঁপে উঠলো। সেইসাথে কেঁপে উঠলাম আমিও। দ্রুত ফোন রিসিভ করে কানে ধরলাম।
‘হ্যালো?’
‘ঘুমাওনি?’
তার কণ্ঠে অবসাদ, তবুও সেই গলার স্বরটা শুনে ভেতরের চাপ একটু আলগা হলো আমার। আমি স্বস্তিতে চোখ বন্ধ করে বললাম, ‘স্যালাইন দিয়েছে?’
‘হুম। যাচ্ছে আস্তে আস্তে।’
‘এখন কেমন লাগছে?’
‘ব্যথা আছে। ব্যাপার না।’
‘কোথায় বেশি?’
‘ডান কাঁধ আর পায়ে। শালা আমাকে বলছে কি জানো? বলে, শুক্রবারে তোকে বিয়ে করাচ্ছি। বলেই আমার পায়ে লাঠি দিয়ে সপাং করে মাইর।’
আমি দাঁতে দাঁত চেপে চোখের পানি আটকালাম। জানিনা কেন, হঠাৎ স্রোতের মতো চোখে পানি আসা শুরু করলো। কিছুতেই থামাতে পারলাম না নিজেকে। সে কিভাবে যেন বুঝেও ফেললো আমি কাঁদছি। আমাকে চমকে দিয়ে বললো, ‘কাঁদছো কেন?’
আমি কান্না ভেজা স্বরেই উত্তর দিলাম, ‘দেখতে পাচ্ছেন মনে হচ্ছে?’
‘তুমি দেখি একটা বাচ্চা মীরা। এই সামান্য দূর্ঘটনায় কেউ এভাবে কাঁদে?’
‘চুপ থাকুন। যা জানেন না তা বলবেন না।’
‘কি জানিনা?’
‘কিচ্ছু জানেন না আপনি।’
‘হুম। একদম ঠিক বলেছো মীরা। আমি কিচ্ছু জানিনা। আজকে নতুন করে জানলাম, আমার জন্য তোমার মনে এত আকুলতা।’
‘কিসের আকুলতা? কোনো আকুলতা নেই।’
সে হাসতে হাসতে বললো, ‘কিভাবে কাঁদছিলে তখন। জানো জীবনে এই প্রথম কাউকে আমার অসুস্থতায় কাঁদতে দেখলাম। ও হ্যাঁ, ছোটবেলায় একবার আমার মাকে দেখেছিলাম কাঁদতে। আমি তখন অনেক ছোট। ক্লাস থ্রি কিংবা ফোরে পড়ি। একদিন খুব জ্বর হলো। জ্বরে জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম। জ্ঞান ফিরলে দেখি আমার মা পাগলের মতো কাঁদতেছে আমাকে ধরে। মা হয়তো ভেবেছিলো তার কলিজার টুকরা শেষ। আজ এত বছর পর আবারও কাউকে দেখলাম আমার জন্য কাঁদতে। মীরা, আমার মতো একটা ছন্নছাড়ার জীবনে তুমি কেন এলে! কোন ভালো কাজের কল্যাণে তোমাকে পেলাম আমি?’
আমি চুপ করে রইলাম। আমার অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে গাল বেয়ে। জানালা থেকে সরে এসে বিছানায় হেলান দিয়ে বসি আমি। চোখ দুটো বন্ধ করে নিজেকে কল্পনা করি হাসপাতালের কেবিনে। ঠিক তার মুখোমুখি বসে যেন তার কথা শুনছি। আমার প্রাণের বাবরি চুলওয়ালা!
‘মীরা..’
‘হুম।’
‘কান্না থামলো?’
‘হুম।’
‘আমি তো দেখতে পাচ্ছি তুমি এখনো কাঁদছো?’
‘কিভাবে কি হলো আমাকে বলুন? আপনি কেন তনয়কে আমাদের ব্যাপারে কিছু জানাননি?’
সে খানিকটা সময় নিয়ে বলতে আরম্ভ করলো, ‘আমাকে ভুল বুঝো না প্লিজ। তনয় তোমার ব্যাপারে অনেক সিরিয়াস। আমি ভয়টা পাচ্ছিলাম যদি বিয়েটা কোনোভাবে ভেঙে দেয়ার চেষ্টা করে। কারণ পছন্দের মানুষের জন্য মানুষ সব পারে। আমি নিজে কোনোদিন কারো ক্ষতি করিনি মীরা। নিজে যেচে সবার উপকার করে বেড়াই। সেই আমি তোমাকে পাবার নেশায় আমার বন্ধুর সঙ্গে লুকোচুরি খেলেছি। ওর নাম্বার দেয়ার জায়গায় আমি নিজে তোমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছি। কাজটা মোটেও ভালো করিনি। আমার মধ্যে অপরাধবোধ কাজ করে। তনয়ও যদি আমার ওপর রেগে কোনো অপ্রীতিকর কাজ করে বসে, সেই আশংকা আমাকে তাড়া করছিলো। ভেবেছিলাম শুক্রবারের পরে ওকে ঘটনাটা জানাবো। একবার বিয়ে হয়ে গেলে ও আর কিছু করতে পারবে না।’
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম, ‘এখন দেখলেন তো কী হলো! আপনার এখানে কোনো অপরাধ নেই। কাউকে পছন্দ করাটা অপরাধ নয়। ওনাকে জানানো উচিত ছিলো আপনার। তারপর দেখতাম উনি কী করে।’
‘ও তারপরও যদি প্রস্তাব দিতো?’
‘দিলে দিতো।’
‘যদি আংকেল ওর হাতে তোমাকে তুলে দিতেন?’
‘কেন? বাবার কাছে আপনার চাইতে তনয় মূল্যবান হয়ে যায়নি। বাবাও এই ব্যাপারটাতে কষ্ট পেয়েছে। আপনি আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এখন রাজার ছেলে এসে আমাকে বিয়ে করতে চাইলেও আমার বাবা রাজি হতেন না।’
সে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বললো, ‘মীরা রে। সত্যিটা হলো, আমি ভেবেছিলাম তুমি ওকে পছন্দ করো। যদি আমার পাশাপাশি ওর প্রস্তাবও এসে সামনে দাঁড়ায়, আর তুমি তাতে সম্মত হও। তাহলে তো আংকেলের মতামত কোনো পাত্তাই পেতো না। আমি আসলে তোমাকে নিয়েই বেশি টেনশনে ছিলাম। যদি তুমি আমার চাইতে ওকে বেশি ওপরে রাখো? এ কারণে নিজের চরিত্রের বাইরে গিয়ে আমি প্রতিমুহূর্তে চেষ্টা করেছি তোমাকে স্পেশাল ফিল করাতে। যা কখনো ভাবিনি, তাই তাই করতে চেয়েছি। রোমান্টিক হবার চেষ্টা করেছি, তোমাকে মুগ্ধ করতে চেয়েছি। দিনশেষে চেষ্টা করেছি দ্রুত সময়ের মধ্যে যেন তোমাকে বিয়ে করে ফেলতে পারি। আমার যদি কোনো ভুল হয়ে থাকে, আমাকে ক্ষমা করে দিও।’
আমি আনমনে হেসে ফেললাম। তাকে খানিকটা আরামদায়ক অনুভূতি দেয়ার জন্য বললাম, ‘একটা সত্যি কথা বলি? আমাকে নিয়ে আপনার টেনশন করতে হবেন। আপনি শতভাগ নিশ্চিত থাকুন আমি আপনাকেই বিয়ে করছি।’
‘আমাকেই কেন!’
‘আপনি সেই জায়গাটা অর্জন করে নিয়েছেন।’
‘তোমাকে মুগ্ধ করার চেষ্টা গুলোকে মিথ্যা ভেবোনা, অভিনয় ভেবো না মীরা। আমি শুধু তোমাকে স্পেশাল ফিল করানোর জন্য অনেক পাগলামি করেছি যা আমার সঙ্গে যায় না। তবে এর কোনোটাই মিথ্যা ছিলোনা।’
‘আপনার এসব প্রচেষ্টার আগেই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আপনাকে বিয়ে করবো।’
‘তাই! কখন?’
‘যখন প্রথমবার বাবা আপনার সঙ্গে আমার বিয়ে দিতে চেয়েছিলো। আমি তখনই রাজি ছিলাম।’
‘মীরা, তুমি কিন্তু বলেছিলে তুমি রাজি ছিলে না।’
‘ওটা এমনি বলেছিলাম। আপনার কাছে নিজেকে ছোট করতে ইচ্ছে করছিলো না আমার। চেয়েছিলাম আপনিও আমাকে চান, আপনার কাছে আমি গুরুত্বপূর্ণ থাকি। এজন্য কখনো স্বীকার করিনি। তবে, একদম শুরু থেকেই বাবার এই প্রস্তাবে আমি রাজি ছিলাম।’
সে উল্লাস করে উঠলো, ‘ও মীরা! কি শোনালে আমায়। আমি সুস্থ হয়ে গেছি। আমার শরীরে আর কোনো ব্যথা নেই। থ্যাঙ্কিউ মীরা, থ্যাঙ্কিউ। তুমি আমার সমস্ত হীনমন্যতা দূর করে দিলে। তুমি আমাকে সমস্ত বিপদ থেকে উদ্ধার করলে। আমার মাথাটা একদম ফুলের মতো হালকা হয়ে গেলো মীরা।’
আমারও মনটা অসম্ভব ভালো হয়ে গেলো। সামান্য রাজি থাকার কথা শুনেই যার মনে এত আনন্দ, তাকে যদি কখনো বলি, ‘আমি সেই শুরু থেকেই আপনার প্রেমে পাগল হয়ে আছি। আপনি আমার জীবনের সবচেয়ে আকাঙ্খার পুরুষ। আমি আপনাকে ভালোবেসেছি প্রচণ্ড উত্তাপের দিনে শীতল বাতাসকে মানুষ যেমন করে ভালোবাসে। আমি আপনাকে চেয়েছি প্রখর খরায় মানুষ যেভাবে বৃষ্টি কামনা করে সেভাবে।’ এসব শুনলে তো সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাবে!
.
সকালে উঠে লজ্জাশরমের মাথা খেয়ে বাবাকে বললাম, ‘ওনাকে বাসায় নিয়ে আসো। মা আছে, আমি আছি। আমরা ওনার সেবাযত্ন করি। এখানে আমরা ছাড়া ওনার আপনজন কেউ নাই।’
বাবা চুপচাপ। মুখে কোনো শব্দ নেই, হাসি নেই। পত্রিকার পাতায় চোখ রেখে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছেন। পাশেই চায়ের কাপ, ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে অথচ সেদিকে খেয়াল নেই। আমি পাশে এসে বসলাম।
‘আব্বু, কি হয়েছে?’
‘কিছু না তো।’
‘তুমি কি আবার তনয়কে নিয়ে ভাবছো নাকি? ভালো ঘরের ছেলে, মন আবার ওদিকে টানছে কিনা?’
বাবা অবাক চোখে আমার দিকে তাকালেন। আমি খানিকটা লজ্জায় পড়ে গেলাম। কথাটা বলা উচিত হয়নি ভেবে।
বাবা বললেন, ‘তনয় বলেছিলো মুনযিরের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিলে পস্তাবেন।’
আমি হঠাৎ ভয়ানক রেগে গেলাম, ‘যে ছেলে বন্ধুর বিয়ের কথা শুনে মেরে পা ভেঙে দিতে পারে। সেই ছেলের কথা শুনে তুমি চিন্তায় পড়ে গেছো? এই ছিলো তোমার সিদ্ধান্ত?’
বাবা ঠোঁট উলটে মাথা বাঁকিয়ে বললেন, ‘ছেলেটার ব্যাপারে কি আরো খোঁজ খবর নেয়া দরকার ছিলো?’
আমার বুকে কাঁপন ধরে গেলো। বললাম, ‘আজকে যদি তনয় এই কথা না বলতো, তাহলে কি বিয়েটা হতো না? আমার কথা বাদ দিলাম। যখন তুমি চেয়েছিলে বিয়েটা দিতে। মুনযিরের মধ্যে ঘাপলা থাকলে এক কথায় তখনই রাজি হয়ে যেতো। দ্বিতীয় বার যখন বাসায় ডেকে এনে বোঝালে তখনও সে রাজি হয় নাই। এর মানে ওনার ভেতর কোনো ঘাপলা নাই। তনয়ের কথাকে এত পাত্তা দেয়ার কিছু নাই আব্বু। ওর সঙ্গে দেখা না হলেও বিয়েটা হতে পারতো। আমি জানি, তুমি খোঁজ খবর না নিয়ে যার তার সঙ্গে আমার বিয়ে দেবে না।’
বাবা পত্রিকাটা বন্ধ করে আমাকে ধরে বললেন, ‘সবকিছু যেন শেষ পর্যন্ত ভালো থাকে রে মা। মুনযিরকে আমি সন্দেহ করছি না। ওকে বাসায় আনার আগ থেকেই আমি চিনি। অনেকদিন ধরে ছেলেটাকে খেয়াল করেছি। ও সব ছেলেদের মতো না। ওকে মনে ধরেছে বলেই বাসায় এনেছি।’
‘তাহলে?’
‘তোর জীবনটা যদি আরামের না হয়! মুনযির এমন ছেলে, না খেয়ে থাকলেও কোনোদিন বউকে বাইরে কাজ করতে দেবে না। শ্বশুরের ঘর থেকেও এক পয়সা নিতে দেবে না। তোর কষ্ট দেখতে আমি পারবো না রে মা।’
আমি হেসে বললাম, ‘এরকম একটা ছেলেকে নিয়ে তুমি মন খারাপ করছো বাবা? এত আত্মসম্মান বোধ সম্পন্ন ছেলে আমাকে দ্বিতীয়টা দেখাতে পারবা?’
‘আত্মসম্মান দিয়ে কি জীবন চলে রে মা? তোকে কোনোদিন আমরা অভাব বুঝতে দেইনি।’
‘তুমি ওর বস না? ঠিকমতো বেতন দিও। আমরা চালিয়ে নিবো ওতেই। আমার কোনো অসুবিধা নেই।’
কথাটা বলে লজ্জায় আমি লাল হয়ে গেলাম। বাবা ফিক করে হেসে ফেললেন। বহুদিন পরে বাবাকে নিজের খুব কাছেই অনুভব করলাম আমি। ঠিক ছোটবেলায় যেমন মন খুলে কথা বলতাম, যা ইচ্ছে তাই বলতাম।
বাবা উঠলেন। বললেন, ‘মুনযিরের ঘরটা গুছিয়ে রাখ। আমি যাচ্ছি।’
আমার মনে খুশির ঝিলিক বয়ে গেলো। সে আমার বাসায় এসে থাকলে আমি দুনিয়ার সমস্ত টেনশন থেকে মুক্তি পাবো। সবসময় চোখের সামনে থাকলে তনয়ের ব্যাপার নিয়ে আমার কোনো টেনশন নেই। হোক না সে অসুস্থ, তবুও আশেপাশেই থাকবে তো! যখন ইচ্ছে তখনই এক নজর দেখতে পারবো তো..
.
আমার আলমারি থেকে একটা পরিষ্কার বিছানার চাদর এনে তার রুমে বিছিয়ে দিলাম। টেবিলের ওপর বিছিয়ে দিলাম আমার ব্যবহৃত একটা সুতির ওড়না। তার ওপর রাখলাম ফুলদানি। ফুলদানিতে একগুচ্ছ তাজা ফুল। ফুলের সুবাস ঘরময় ছড়িয়ে পড়লো।
জানালার পর্দাটা বদলে এক সেট নতুন পর্দা ঝুলিয়ে দিলাম। হঠাৎ সেদিনের ড্রয়ারটার সামনে এসে দাঁড়িয়ে আমার হাসি পেয়ে গেলো। একদিন এই ড্রয়ারটা বন্ধ ছিলো বলে আমার কী যে রাগ হয়েছিলো। অথচ এখন থেকে তার প্রত্যেকটা ব্যক্তিগত জিনিসেও আমার সমান হস্তক্ষেপ থাকবে। তার প্রতিটা জিনিস আমিই গুছিয়ে রাখবো। শার্ট, প্যান্ট থেকে শুরু করে রেজর পর্যন্ত। সবকিছু থাকবে আমার নখদর্পনে। কিছু লাগলে বরং সে ই আমাকে জিজ্ঞেস করে খুঁজে নেবে, ‘মীরা, আমার মোজাটা পাচ্ছিনা। মীরা, আমার সাদা টিশার্টটা কই?’
ভাবতে ভাবতে আমি আনমনে হাসছিলাম। এই ঘরখানা গোছাতে গিয়ে মনে হচ্ছে নিজের সংসার সাজাচ্ছি। নিজের সংসার সাজাতে না জানি কত আনন্দ হবে!
সবকিছু গোছানোর পর বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে মনে হলো, এই ঘরটায় আমারই থেকে যেতে ইচ্ছে করছে। কী অদ্ভুত!
এক কাজ করলে কেমন হয়, বিয়ের পর এই ঘরেই যদি শিফট করি! বাবা মা ওপরতলায় থাকলেন, আমরা নিচতলায়। ব্যাপারটা কিন্তু বেশ হয়।
নিজের সাজানো গোছানো বিশাল বড় আলো ঝলমলে ঘরটা ছেড়ে নীচতলার অন্ধকারময়, স্যাঁতসেঁতে এই ছোট্ট ঘরে আমার থাকতে ইচ্ছে করছে। দুজনে একসাথে ঘরটাকে ভালোবাসায় ভরিয়ে রাখবো।
আমার ঘর থেকে দুয়েকটা পেইন্টিং, নকশী কাঁথা, শোপিস নিয়ে এসে ঘরখানা আরও একটু সাজাতে চেষ্টা করলাম। সবশেষে নিজের হাতে লিখলাম একটা চিরকুট। বালিশের নিচে চিরকুটটা রেখে দিলাম। সামান্য একটুখানি অংশ বের করে রাখলাম যাতে নজরে পড়ে।
সে যখন বালিশে শুতে যাবে, হুট করে চিরকুটটা দেখতে পাবে। তারপর কাগজটা হাতে নিয়ে দেখবে সেখানে লেখা,
‘ওইদিন জানতে চেয়েছিলেন না আমরা কোন ঘরে থাকবো? আমি আমার জন্য এই ঘরটা ঠিক করেছি। ঘরটাকে সামলে রাখবেন। আর আপনি কোথায় থাকবেন? আপনার জন্য ঘর লাগবে কেন! আপনি আমার মনের ঘরে ঘুমালেই পারেন।’
চলবে..
Share On:
TAGS: বাবরি চুলওয়ালা, মিশু মনি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
বাবরি চুল ওয়ালা পর্ব ৯
-
বাবরি চুলওয়ালা পর্ব ২১
-
বাবরি চুলওয়ালা পর্ব ১৯
-
বাবরি চুল ওয়ালা পর্ব ৬
-
বাবরি চুল ওয়ালা পর্ব ৪
-
বাবরি চুল ওয়ালা পর্ব ১৩
-
বাবরি চুলওয়ালা পর্ব ১
-
বাবরি চুলওয়ালা পর্ব ১৬
-
বাবরি চুলওয়ালা পর্ব ২৫
-
বাবরি চুলওয়ালা পর্ব ২৩