বাবরি চুলওয়ালা
১৯
মায়ের ডাকে ঘুম ভাংলো। সকাল দশটা নাকি বেজে গেছে! আমি ঘুম থেকে উঠে আরামে চোখ বুজে শুয়ে রইলাম। নরম বালিশ, আরামদায়ক আবহাওয়া আর গায়ে জড়ানো কাঁথার উম, আমাকে বিছানা ছেড়ে উঠতে বারণ করছে।
সবচেয়ে বেশী আটকে রাখছে গতরাতের স্মৃতি। মানুষের জীবনে সবকিছুর প্রথমবার হওয়ার স্মৃতিটা সুন্দর, যা আজীবন মনে থাকে। গত রাতটা আমার জীবনের তেমনই একটা রাত। সারা রাত জেগে ফোনে কথা বলেছি আমরা। শুরুতে টেরই পাইনি এত কথা ফোনে বলা সম্ভব! কথা বলতে বলতে কখন যেন ভোর হয়ে গেছে..
দুজনে অবাক হয়ে শেষে ফোনটা রেখে ঘুমিয়ে পড়ি। রাতের প্রতিটা কথা এখন আমার কানে এসে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। জানালার ফাঁক গলে আসা আলোটা মুখ ছুঁয়ে যেন কিছু বলতে চাইছে। আমি চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছি। বুকের ভেতর জমে থাকা অনুভূতিগুলো এতটাই স্বপ্নের মতো যে, চোখ খুললেই ভেঙে যাবে মনে হচ্ছিল।
বালিশে মুখ গুঁজে আমি মনে মনে ভাবলাম, যদি জীবনের সব সকাল এমন হতো! আগের রাতে বলা কিছু কথার রেশ নিয়ে, আর অজান্তেই হাসি চলে আসা এমন একটা সকাল..
হাতমুখ ধুয়ে নাস্তা নিয়ে বসলাম। মা রাগারাগি করছেন, ‘দুইদিন পর নিজের সংসার হবে। রান্নাবান্না কিছু শিখ? আবেগ দিয়ে সংসার চলবে না। বিয়ের পরে নিজের কাজকর্ম নিজেরই করতে হবে। ভাতটাও ফুটিয়ে খাইতে না পারলে কপালে দুঃখ আছে।’
মায়ের কথাগুলো আমার বাম কান দিয়ে ঢুকে ডান কান দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। আমি বুঁদ হয়ে আছি আমার বাবরি চুলওয়ালার স্বপ্নে বিভোর হয়ে। তার ঘুম লেগে আসা কণ্ঠটা এত মধুর, কানের ওপর ফোনটা নিয়ে কথা বলার সময় মনে হচ্ছিলো সে বোধহয় আমার কানের কাছে এসে ফিসফিস করে কথা বলছে।
মা তাগাদা দিলেন দ্রুত নাস্তা শেষ করে ঘরের কাজে হাত লাগাতে। আজকে সব কয়টা ঘরের মাকড়সার জাল, ধুলা ময়লা ঝেড়ে পরিষ্কার করা হবে। রান্নাঘরের সমস্ত মশলার বয়াম ধুয়ে মা রোদে দিয়েছেন। ঘরোয়া আয়োজনে হলেও মেহমান তো কম বেশী থাকবেই। মায়ের ব্যস্ততা তাই সবচেয়ে বেশি।
.
রাত নেমেছে। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি বাবরি চুলওয়ালার ফোনকলের জন্য। আমি জানি সে ফোন করবেই। গতকাল শুনেছি তার ছেলেবেলার কথা। কীভাবে বেড়ে উঠেছে, কতটা লড়াই করে এতদূর আসা, সবকিছু। তার গল্পগুলো আমাকে তার আরও কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছে।
এমন সময় বাবার নাম্বার থেকে একটা কল আসলো। রিসিভ করে বললাম, হ্যালো আব্বু।
ওপাশটা চুপচাপ। বাবা কোনো কথা বলছেন না। আমি কয়েকবার করে ‘হ্যালো’ বলার পরেও না। আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘কি হলো আব্বু? নেটওয়ার্ক সমস্যা করছে নাকি? কিছু শুনতে পাচ্ছিনা।’
বাবা যা বললেন, তা শোনার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। তনয় বাবার অফিসে এসেছিলো বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। ওর মুখে বিয়ের কথা শুনে বাবা মুনযিরকে ডেকে জিজ্ঞেস করেছেন, তুমি ওকে কিছু জানাও নি?
মুনযির বলেছে, আমি ধীরেসুস্থে ওকে বুঝিয়ে বলবো ভেবেছিলাম। পরিস্থিতি সেরকম ছিলোনা আংকেল।
বাবা শুধু নাকি বলেছেন, মুনযিরের সঙ্গে আগামী শুক্রবার মীরার বিয়ে। এটুকু শুনেই তনয় ভয়ংকর রেগে যায়। মুনযির তার সঙ্গে বিশ্বাস ঘাতকতা করেছে এসব বলে উঠে এসে ওর কলার ধরে রাগারাগি করে। মুনযির ওকে বোঝাতে চেষ্টা করে বিষয়টা তা নয়। দুজনের মাঝে এক পর্যায়ে হাতাহাতি হয়।
আমি সব শুনে উদ্বিগ্ন হয়ে বললাম, এখন সব ঠিক আছে?
বাবা আবারও চুপ। বাবা সাধারণত চুপচাপ থাকার মানুষ নন। তার নিরবতা আমাকে ভেতর থেকে চিন্তিত করে তুলছে। আমি আরও বেশি উৎকণ্ঠা নিয়ে বললাম, ‘আব্বু? বলো? চুপ করে আছো কেন?’
বাবা বললেন, ‘তনয় ওকে অনেক মেরেছে।’
‘অনেক মেরেছে মানে! কিভাবে মারলো? তোমার সামনে ওর গায়ে হাত দেয়ার সাহস পায় কিভাবে?’
‘আমার সামনে না। তনয়কে আমি আর মুনযির বুঝিয়ে সুঝিয়ে বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছি। কিছুক্ষণ পর তনয় ওকে ফোন দিয়ে বলে দেখা করতে। এরপর মুনযির একা গিয়েছে।’
আমার শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগলো। রাগে, দুশ্চিন্তায়, ক্ষোভে আমি কিছু বলার ভাষা হারিয়ে ফেললাম।
বাবা বললেন, ‘বাকিটা ওরা দুই বন্ধু জানে কিভাবে ওদের মধ্যে মারামারি লেগেছে।’
‘উনি এখন কোথায়!’ কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বললাম আমি।
বাবা বললেন, ‘হাসপাতালে। ডাক্তার বলেছে দুইদিন ভর্তি থাকতে হবে।’
ফোনটা রেখে আমি স্তব্ধ হয়ে বসে পড়ি। আমার কোনো ইন্দ্রিয় কাজ করছে না। চারপাশের শব্দ হঠাৎ নিঃশেষ হয়ে গেছে। ঘরের দেয়াল, ছাদ, জানালা সবকিছু যেন একসাথে দূরে সরে গেলো। মনে হলো আমি ধু ধু মরুভূমির মধ্যিখানে বসে আছি।
‘হাসপাতালে’ শব্দটা মাথার ভেতর বারবার ধাক্কা খেতে লাগলো।
এই মানুষটা, যার কণ্ঠ শুনে ঘুম এসে ভর করছিলো গত রাতেই, সে এখন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছে! আমার বুকের ভেতরটা হঠাৎ হু হু করে উঠলো। চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়লো পানি। দেহটা এমন ভারী হয়ে গেছে যে নড়ার শক্তিটুকুও নেই।
তনয় কেন এমন করলো? বন্ধুত্বের নাম করে কীভাবে কারো গায়ে হাত তোলা যায়? আর মুনযির, সে কেন একা গেলো? কেন আমাকে কিছু বললো না? আমি কি এতটাই দূরের মানুষ ছিলাম?
ফোনটা হাতে নিলাম। তার নামটা স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে। কল দেবো? যদি ধরতে না পারে? যদি ব্যথায় কথা বলতে না পারে? হাজারটা ভয় আমাকে আটকাতে চাইলো। তবুও কল বাটনে চাপ দিলাম।
একবার রিং হলো, দুইবার…
কল ধরলো না।
বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। সে কি কল ধরার মতো অবস্থায় নেই! চোখ বন্ধ করে মনে মনে বললাম, ‘আল্লাহ, ওকে ভালো রাখো। ওকে ভালো রাখো।’
এই প্রথম বুঝলাম সে আমার অস্তিত্বের সঙ্গে ঠিক কতখানি জুড়ে আছে। এক ধরনের ভয়, অস্থিরতা আর হারানোর আশঙ্কায় ভেতরটা ছিঁড়ে যেতে লাগলো আমার।
আমি জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। বাইরে রাত নেমেছে। আকাশে চাঁদ নেই। সবকিছু অন্ধকার। আমার ছুটে বেরিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে। বাবা আমাকে কেন একবার ডাকলেন না? কেন জিজ্ঞেসও করলেন না আমি যেতে চাই কিনা!
.
খানিকটা ধাতস্থ হয়ে আমি পাগলের মতো মায়ের ঘরে ছুটে আসি। মাকে খুব অনুনয় করে বলি একবার আমাকে হাসপাতালে নিয়ে চলো। মা তৎক্ষনাৎ গায়ে বোরকা জড়িয়ে আমাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন।
হাসপাতালে পৌঁছাবার পথটুকু আমার কাছে মনে হতে লাগলো বিশাল দীর্ঘ। যেন বছরের পর বছর ধরে এই পথ দিয়ে চলছি। তবুও হাসপাতালে পৌঁছাতে পারছি না..
অবশেষে পৌঁছে গেলাম। কোনোদিকে না তাকিয়ে আব্বুকে কল দিতে দিতে আমি ভেতরে ঢুকি। উদভ্রান্তের মতো ছুটতে ছুটতে বাবরি চুলওয়ালার কেবিনের দরজায় গিয়ে থামি। দরজা ধাক্কা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করার সাহসটুকু নেই। চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি আমি।
এমন সময় বাবা এসে দরজা খুলে দিলেন। সে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। হয়তো ঘুমাচ্ছে। আমি এক পা, দুই পা করে সামনে এগিয়ে যাই।
কোনো সাড়াশব্দ নেই। হাতে, পায়ে ব্যান্ডেজ। একটা মানুষ নিজের বেস্টফ্রেন্ডকে কি এভাবে মার* তে পারে! আমার দম বন্ধ হয়ে আসতে লাগলো। অজান্তেই কখন চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো টের পেলাম না। আম্মু আমাকে ধরে বললেন, ‘ও তো ঘুমাচ্ছে। তুই চেয়ারে বস।’
আমি আব্বুকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কি দিয়ে এভাবে আঘাত করছে ওনাকে?’
আব্বু কোনো উত্তর দিতে পারলেন না। কিন্তু বাবরি চুলওয়ালা ফট করে চোখ খুলে ফেললো। আমাকে দেখে চমকে উঠে সে। তড়িঘড়ি করে উঠে বসলো।
আমি অন্যদিকে তাকিয়ে চোখ মুছে স্বাভাবিক গলায় জানতে চাইলাম, ‘এই অবস্থা কিভাবে হলো আপনার?’
‘আরে সেরকম কিছু না। সামান্য ব্যাপার। ঠিক হয়ে যাবে।’
‘হালত দেখে তো বুঝতেই পারছি কতটা স্বাভাবিক। আপনার ফ্রেন্ড কি মানুষ না জানোয়ার?’
আব্বু বললেন, ‘থাক না ওসব।’
আমি রাগত স্বরে বললাম, ‘থাকবে কেন? ওনার অপরাধ কি? তোমরা এরকম চুপচাপ কেন আমি তো বুঝতে পারছি না। আমরা এখান থেকে থানায় যাবো। গিয়ে জিডি করে আসবো ওই গুণ্ডাটার নামে।’
বাবরি চুলওয়ালা ফিক করে হেসে বললো, ‘আরে মীরা, এটা তেমন কিছু না। ঠিক হয়ে যাবে।’
‘আপনি ওনার গায়ে হাত তুলেছেন?’
‘না।’
‘তাহলে উনি আপনার গায়ে কেন হাত তুলবে? সবকিছুর একটা লিমিট থাকে। ওই ফালতু লোকটা নিজেকে কি ভাবে? ওনার নাম্বার আমাকে দিন। আমি ওনাকে দেখতেছি।’
বাবরি চুলওয়ালা একবার বাবার মুখের দিকে, একবার মায়ের মুখের দিকে তাকালো। আমি হতভম্বের মতো তাকিয়ে আছি তার দিকে। বাবা মা খুবই স্বাভাবিক। যেন এই ঘটনাটা নিতান্তই তুচ্ছ। ওনাদের স্বাভাবিক অবস্থা দেখে আমার মেজাজটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
বললাম, ‘আপনাকে হাসপাতালে দুইদিন থাকতে বলেছে কেন? নিশ্চয়ই পরিস্থিতি গুরুতর?’
‘ওটা এমনিই বলেছে। ডাক্তারকে বলেছিলাম বাসায় একা থাকি। টেক কেয়ার করার কেউ নেই এজন্য বলেছে হাসপাতালে দুইদিন থাকুন।’
আমি আশ্চর্য হয়ে বাবাকে বললাম, ‘কে বলেছে ওনার কেউ নেই? আমরা কি ওনার কেউ না আব্বু? তুমি ডাক্তারকে কিছু বলোনি কেন?’
‘আমি তো এলাম একটু আগে।’
এবার আমি বাবরি চুলওয়ালার দিকে তাকিয়ে চোখ রাঙিয়ে বললাম, ‘আপনিই বা এমন কেন! একবার বলবেন না আমাদেরকে? আমরা কি আপনার পর?’
শেষ লাইনটা বলতে গিয়ে আমার গলা ধরে এলো। সে ম্লান হাসি দিয়ে বললো, ‘এইমুহুর্তে কাউকে অযথা পেরেশান করতে চাচ্ছিনা। আমি ঠিক আছি। কোনো অসুবিধা নেই। কালকেই চলে যাবো।’
ক্ষণিকের জন্য নিরবতা নেমে এলো। আমার ভীষণ অস্থির লাগছে। মা বাবা পাশে বসে আছেন। কিছুক্ষণ একাকী সময় কাটাতে ইচ্ছে করছে আমার। অন্তত একটা কথাও যদি একাকী বলতে পারতাম!
খানিকক্ষণ পর বাবরি চুলওয়ালা বললো, ‘আপনারা বাসায় চলে যান। রাত বেড়ে যাচ্ছে। আমি ভালো আছি। আমাকে নিয়ে টেনশন করবেন না।’
বাবা বললেন, ‘রাতের খাবার দিয়েছে ওরা?’
‘না।’
‘খাবারটা দিয়ে যেতে বলি? খেতে পারবে তো হাত দিয়ে?’
বাবরিচুল স্মিত হেসে বললো, ‘পারবো। আপনারা অযথা চিন্তা করছেন। আমার তেমন কিছু হয়নি।’
আবারও ক্ষণিকের জন্য নিরবতা নেমে এলো। আমি কেমন যেন অস্বস্তিতে ভুগছি। ওনাকে ফেলে বাসায় চলে যাবো ভাবলেই আমার অস্বস্তি হচ্ছে। মনে হচ্ছে নিজের শরীরের একটা অংশ এখানে ফেলে যাচ্ছি! কিন্তু মা বাবার সামনে মুখ ফুটে বলতেও পারছি না আমি হাসপাতালে ওনার পাশে থাকতে চাই।
হঠাৎ প্রসঙ্গটা তুলে জানতে চাইলাম, ‘রাতে উনি কি এখানে একা থাকবেন?’
বাবা বললেন, ‘নার্সরা আছে তো। সমস্যা নেই।’
আমার প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে বাবার ওপর। নার্সরা আছে মানে! বাবা এটা কিভাবে বলতে পারলো। দুইদিন ধরে মুনযির মুনযির করে পাগল হয়ে গেছে। আজকে সেই আদরের মুনযিরকে একা ফেলে চলে যাবে!
অবশ্য মুনযির আমার যতটা জুড়ে আছে, সবার কাছে তো তা নয়। তাদের জায়গা থেকে হয়তো দেখতে আসা পর্যন্তই স্বাভাবিক। কিন্তু মুনযিরকে একা ফেলে আমি যেতে পারবো না। সেটা কিভাবে বলি…
বাবাকে দেখে মনে হচ্ছে পুরো ব্যাপারটাতে উনি খুবই বিরক্ত হয়েছেন। বিশেষ করে তনয়ের হাতে অকারণে মার খাওয়াটা ওনার পছন্দ হয়নি। এত বড় গ্যাঞ্জামটা হয়েছে ওনার নিজের মেয়েকে নিয়ে, অথচ তিনি কিছুই জানেন না। সবমিলিয়ে বাবাকে বেশ বিব্রত দেখাতে লাগলো।
আমি মাকে টেনে নিয়ে বাইরে এসে জিজ্ঞেস করলাম, ‘মা, আমি ওনার সঙ্গে হাসপাতালে থাকি?’
‘আরে না। তোর বাবা রাগ করবে।’
‘কেন! ওনাকে একা রেখে যাবো?’
‘তোর বাপ এমনিতেই রেগে আছে।’
‘এই অবস্থায় রেগে থাকার কারণ কি মা? এই ছেলেটাকে না বাবা অনেক ভালোবাসে?’
‘এখন ওনাকে কিছু বলা যাবে না। আর তোকে উনি এখানে থাকতেও দিবে না।’
আমি চুপ হয়ে গেলাম। বারবার মনে হতে লাগলো, আজ যদি আমি ওনার বিবাহিত স্ত্রী হতাম তাহলে কি এমন করতে পারতো! একটা বিয়েতে সবকিছুই পুরোপুরি বদলে যায়..
কতক্ষণ উশখুশ করলাম। বাবা বাইরে গেলেন, আবার ফিরে আসলেন। আমাদেরকে বললেন, চলো বের হই।
আমার দ্রুত হার্টবিট হতে লাগলো। বাবাকে কি একবার বলবো আমি এখানে থাকি?
কথাটা বলবো কি না, দ্রুত ভাবছি। বাবা নিশ্চয়ই বলবেন, ‘দরকার নেই।’ অবশ্য নাও বলতে পারেন। একবার বলে তো দেখি..
কথাটা বলতে যাবো, এমন সময় বাবা বললেন, ‘রাজুকে আসতে বলেছি। ও থাকবে মুনযিরের এখানে।’
আমার ভেতরে যেন ধ্বস নামলো। আমি কি কিছুই করতে পারবো না এই মানুষটার জন্য? একেবারে কিচ্ছু না?
বাবা মুনযিরকে বললেন নিজের খেয়াল রাখতে, খাবার খেয়ে নিতে, কিছু প্রয়োজন হলে নার্সকে ডাকতে। আর যেকোনো মুহুর্তে বাবাকে কল করতে পারে এটুকু বলে তিনি বিদায় নিলেন।
কিন্তু কেবিন থেকে বের হতে হতে আমি যেন মুষড়ে পড়লাম। আমার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যেতে লাগলো। আমার কলিজা ছিঁড়ে যাচ্ছে। এভাবে ওকে ফেলে আমি বাসায় চলে যাবো, মানতেই পারছি না আমি। এত কাছে এসেও একটু ছুঁয়ে দেখতে পারলাম না! একটু পাশে বসতেও পারলাম না…
বাবা বললেন, ‘মীরা চল মা?’
আমি বাবার কথায় স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকি। এদিক সেদিক তাকাই। আমার খুব কান্না পাচ্ছে। বাবা মা কেবিন থেকে বেরিয়ে গেছেন। আমি কেবিনের দরজার কাছে এসে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছি।
বাবরি চুল হঠাৎ ডাকলো, ‘মীরা..’
আমি দ্রুত পিছনে ফিরলাম। যেন তার এই ডাকটার অপেক্ষাতেই ছিলাম আমি। মাকে বললাম, ‘তোমরা এগোও, আমি আসছি।’
ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালাম তার পাশে। কী বলবো বুঝে ওঠার আগেই ঝরঝর করে কেঁদে ফেললাম আমি। সে আমার কান্না দেখে খানিকটা অবাক, খানিকটা ভড়কে গিয়ে দ্রুত আমাকে থামানোর চেষ্টা করে বললো, ‘এই পাগলী, কাঁদছো কেন?’
‘আমি আপনাকে রেখে বাসায় যেতে চাচ্ছি না। আপনি কি বাবাকে বলবেন কথাটা? যে মীরা এখানে থাকুক?’
‘আংকেল এমনিতেই ব্যাপারটাতে মন খারাপ করেছে। ভেবেছে আমাদের তিনজনের মধ্যে কোনো বড়সড় ঘাপলা হয়েছে। এই অবস্থায় কিছু বললে উনি আমাকে খারাপ ভাববেন।’
আমি আরও কাছাকাছি দাঁড়িয়ে চেষ্টা করলাম ওনার হাতটা একবার ধরার। কিন্তু পারলাম না। খানিকটা এগিয়ে গিয়ে হাত সরিয়ে নিলাম। পাছে সে আমাকে খারাপ ভাবে!
বললাম, ‘আপনার এখানে কেউ নাই। আমিও যদি পাশে থাকতে না পারি… আই এম সরি।’
‘কাঁদবেন না প্লিজ।’
‘আমাকে শুধু তুমি করে বলবেন। একবার তুমি, একবার আপনি শুনতে ভালো লাগেনা।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে। মীরা, চলে যাও। আংকেল আন্টি বাইরে অপেক্ষা করছেন।’
আমি দাঁতে দাঁত চেপে আমার ব্যথাটা সহ্য করলাম। তাকে কিভাবে বোঝাই আমার ভেতরে কী বয়ে যাচ্ছে? কিভাবে বললে সে বুঝবে আমিও তার মতোই কষ্ট পাচ্ছি?
বাবরি চুলওয়ালা আমার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে বললো, ‘মীরা, যাও। লক্ষী মেয়ে না তুমি?’
‘যাচ্ছি। আপনি ফোন ধরবেন।’
সে ফিক করে হেসে বললো, ‘ধরবো। এখন যাও।’
আমার গতরাতের ঘটনাটা মনে পড়ে গেলো। যখন আমি ফোন ধরিনি বলে সে ছুটে এসেছিলো পাগলের মতো। আজ আমাকে সেই পাগল মনে হচ্ছে। সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলো যেন!
আমি বললাম, ‘ব্যথা কি বেশি পেয়েছেন? কোথায় কোথায় ব্যথা পেয়েছেন দেখি?’
‘এইযে এখানে আর এখানে। খুব বেশি না। কালকেই ঠিক হয়ে যাবো।’
‘ব্যথার ওষুধ খাবেন ঠিকমতো। আমাকে কেন একবারও ফোন দেননি বলুন তো?’
‘টেনশন দিতে চাচ্ছিলাম না। আংকেলকে একটু বুঝিয়ে বলবে প্লিজ? উনি হয়তো অনেক কিছু ভাবছেন। তুমি ওনাকে একটু বুঝিয়ে বোলো যেন কিছু মনে না করেন।’
আমি মাথা ঝাঁকিয়ে বললাম, ‘হুম। বলবো।’
‘মীরা, সরি। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্য। আমি তোমাকে ফোনে সবকিছু জানাবো। এখন বাসায় যাও। আমার জন্য টেনশন কোরো না।’
আমি আবারও মাথা ঝাঁকালাম। কিন্তু পা তোলার শক্তি পাচ্ছি না। চলে যাবো ভাবলেই কান্না আসছে। কান্নাটা কোনোমত সামলে নিয়ে বললাম, ‘নাহয় আপনিও চলুন আমাদের সঙ্গে? হাসপাতালে কথা বললে ওরা কি রিলিজ দিবে না?’
‘আজকে ভর্তি হয়ে গেছি তো। রাতে স্যালাইনের মাধ্যমে ইনজেকশন দেবে।’
‘ওহ!’
আমি বোধহয় ভুলে গেছি কিভাবে হাঁটতে হয়। আমার ভেতরটা মুহুর্তে মুহুর্তে নুইয়ে পড়ছে। কতটা পাথর ঠেলে ঠেলে যে বেরিয়ে আসলাম নিজেও জানিনা। সবকিছু যেন ঠিকঠাক থাকে। সীমাহীন ব্যথা ঠেলে ঠেলে রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম।
শুক্রবার আর মাত্র ক’টা দিন বাকি। কত কী ভেবে রেখেছিলাম! কিন্তু এই মুহূর্তে আমার কাছে শুক্রবার মানে বিয়ে না। শুক্রবার মানে, তার সুস্থ হয়ে যাওয়া।
চলবে..
Share On:
TAGS: বাবরি চুলওয়ালা, মিশু মনি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
বাবরি চুল ওয়ালা পর্ব ৬
-
বাবরি চুলওয়ালা পর্ব ২৪
-
বাবরি চুলওয়ালা পর্ব ২২
-
বাবরি চুলওয়ালা পর্ব ২০
-
বাবরি চুলওয়ালা পর্ব ২
-
বাবরি চুলওয়ালা পর্ব ২১
-
বাবরি চুল ওয়ালা পর্ব ৩
-
বাবরি চুল ওয়ালা পর্ব ১২
-
বাবরি চুলওয়ালা পর্ব ১৭
-
বাবরি চুলওয়ালা পর্ব ২৩