Golpo romantic golpo প্রেসিডেন্ট ওয়াহেজ ইবনান

প্রেসিডেন্ট ওয়াহেজ ইবনান পর্ব ৯


প্রেসিডেন্টওয়াহেজইবনান

পর্ব : ৯

সানজিদাআক্তারমুন্নী

তাহাজ্জুদের নামাজ একসঙ্গে আদায় করার পর ওয়াহেজ মসজিদে চলে গিয়েছিল ফজরের নামাজ পড়তে। কিন্তু মসজিদ থেকে ফিরে সে দেখে, আনভি বিছানায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে। প্রচণ্ড জ্বরে তার শরীর রীতিমতো কাঁপছে, বিছানা ছেড়ে ওঠার মতো শক্তিটুকুও তার নেই। ওয়াহেজ দ্রুত গিয়ে বিছানায় উঠে পড়ে, তারপর আনভিকে নিজের বুকের মাঝে টেনে নিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ফিসফিস করে বলে, “সামাইরা, একটু ঘুমানোর চেষ্টা করো। শরীরটা খারাপ, একটু কষ্ট করে সহ্য করে নাও।”
আনভি জ্বরের ঘোরে ওয়াহেজের গলায় মুখ গুঁজে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বিড়বিড় করে বলে, “হুম আপনিও ঘুমিয়ে পড়ুন।”
ওয়াহেজ আলতো হাতে আনভির মাথায় বিলি কাটতে কাটতে বলে, “তুমি ঘুমিয়ে পড়ো।”
আর এখন সকাল সাতটা বাজতে চলল। আনভির কামিজের ভেতর মুখ গুঁজে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ওয়াহেজ। প্রথম আনভিকে নিজের বুকে জড়িয়ে ঘুমালেও, একটু পর সে নিজেই বিড়ালের মতো আনভির কাছে ঘাপটি মেরে ওম খুঁজছে। পুরুষ মানুষ বলে কথা, প্রিয়তমার শরীরের উষ্ণতা ছাড়া কি আর সকালের কাঁচা ঘুম আসে!
হঠাৎ দরজার কড়া নাড়ার শব্দে আনভির ঘুম ভেঙে যায়। সে ওয়াহেজকে নিজের ওপর থেকে সরানোর জন্য হালকা ধাক্কা দিয়ে ঘুমজড়ানো গলায় বলে, “উমম… উঠুন না! কে ডাকছেন, একটু কষ্ট করে দেখুন তো।”
ওয়াহেজ চরম বিরক্তি নিয়ে ওঠে চোখ কচলাতে কচলাতে সে দরজার দিকে এগিয়ে যায়। বাইরে থেকে কেউ ঘরের ভেতরটা দেখতে না পায়, তাই দরজাটা সামান্য একটু ফাঁকা করে। দরজা খুলতেই দেখে সামনে উষা দাঁড়িয়ে আছেন। ওয়াহেজকে দেখেই উষা তাগাদা দিয়ে ওঠেন, “তোদের ঘুম থেকে উঠতে এত দেরি হচ্ছে কেন? তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নিচে আয়। আর আনভিকে বল কিচেনে আসতে।”
মায়ের কথা শুনে ওয়াহেজের গতরাতের আনভির কথাগুলো মনে পড়ে যায় ওয়াহেজের মন চায় জিজ্ঞেস করতে -আনভি কেন সব করবে? তবে ওয়াহেজ এটা না জিজ্ঞেস করে শান্ত গলায় বলে, “আনভি আজ কিচ্ছু করতে পারবে না মা। ওর রাত থেকে হাড়কাঁপানো জ্বর। জ্বরের ঘোরে ও হাঁটতে পর্যন্ত পারছে না।”
এ কথা শুনে উষার কপালে ভাঁজ পড়ে তিনি ভ্রু কুঁচকে বলেন, “হঠাৎ জ্বর এলো কেন? দেখি তো! সর, দেখি কী হয়েছে ওর।”
এই বলে তিনি ওয়াহেজকে একপাশে সরিয়ে তড়িঘড়ি করে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়েন। এদিকে আনভি বিছানায় এলোমেলো ভঙ্গিতে শুয়ে আছে। জ্বরের ক্লান্তি আর ঘুমের ঘোরে তার চোখের পাতা আঠার মতো লেগে আছে, কিছুতেই খোলা সম্ভব হচ্ছে না। উষা বিছানার কাছে এগিয়ে গিয়ে আনভির দিকে ঝুঁকে জ্বর দেখার জন্য তার কপালে ও গলায় হাত ছুঁয়ান। আনভির মনে হয়, এটা বুঝি ওয়াহেজই আবার তাকে বিরক্ত করছে! তাই ঘুমের ঘোরেই সে বিরক্ত হয়ে ধমকে ওঠে, “এই নির্লজ্জ প্রেসিডেন্ট! বারবার আপনি আমাকে কেন ছুঁচ্ছেন? একটু ঘুমাতে দিন না! কাল সারাটা রাত তো আপনাকে দিলাম, অন্তত সকালটা আমাকে দিন!”
কথাটা বলতে বলতেই আনভি ধড়মড় করে চোখ খোলে। আর চোখ খুলেই দেখে, সামনে ওয়াহেজ নয়, বরং শাশুড়ি মা উষা দাঁড়িয়ে আছেন! উষাকে দেখেই আনভি এক লাফে বিছানায় উঠে বসে। লজ্জায় তার মুখ লাল হয়ে যায়। ছিঃ ছিঃ! কী থেকে কী বলে ফেলল সে! লজ্জায় তো মাটির নিচে ঢুকে যেতে ইচ্ছে করছে এখন তার। আনভির মুখে এমন সর্বনাশা কথা শুনে ওয়াহেজ মনে মনে ‘বিসমিল্লাহ বিসমিল্লাহ’ জপতে শুরু করে। কোনোমতে নিজের ইজ্জত বাঁচাতে সে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়। মায়ের সামনে এমন একটা পরিস্থিতির শিকার হয়ে সে নিজেও ভীষণ সংকোচে পড়ে গেছে। এদিকে উষা এই অভাবনীয় পরিস্থিতিতে পড়ে নিজেই চরম বিব্রত হয়ে পড়েছেন। অবস্থা বেগতিক বুঝে তিনি তাড়াতাড়ি বলে ওঠেন, “তোরা… তোরা ফ্রেশ হয়ে নিচে আয়।” এইটুকু বলেই তিনি প্রায় ছুটন্ত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যান। উষা বেরিয়ে যেতেই ওয়াহেজ আনভির দিকে তাকায়। তার একই সঙ্গে হাসিও পাচ্ছে, আবার লজ্জাও লাগছে। আনভি ভয়ে ভয়ে ওয়াহেজের দিকে তাকায়, এই বুঝি একটা প্রচণ্ড ধমক খেতে হবে তাকে! কিন্তু না, ওয়াহেজ আনভিকে ধমকায় না। বরং ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটিয়ে সে বলে, “দুর্ঘটনা তো যা ঘটানোর ঘটিয়েই ফেলেছো, এখন আর কী করবে! যাও, উঠে ফ্রেশ হয়ে নাও।”

ওয়াহেজের এমন শান্ত আচরণে আনভির মনের ভেতর জমে থাকা শঙ্কাটুকু কেটে গিয়ে অদ্ভুত এক স্বস্তি নেমে আসে। ওয়াহেজের কথামতো ফ্রেশ হওয়ার জন্য গায়ের ওপর থেকে কাঁথাটা সরিয়ে সে বিছানা থেকে নামতে উদ্যত হয়। কিন্তু তার আগেই ওয়াহেজ এগিয়ে এসে আলতো করে তার হাতটা টেনে ধরে দাঁড় করায়, তারপর অনায়াসেই তাকে পাঁজকোলা করে কোলে তুলে নেয়। আনভির চোখের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলে, “এখন তো ঠিকমতো হাঁটতে পারবে না, তাই কোলেই নিলাম।”
ওয়াহেজের এমন কথায় আনভির গাল দুটো লজ্জায় আরক্ত হয়ে ওঠে, ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে লাজুক হাসি। ওয়াহেজ তাকে সাবধানে বেসিনের সামনে দাঁড় করিয়ে তার হাতে মিসওয়াক তুলে দেয়। আনভি নিজের মিসওয়াক করা শেষে ধোয়ার জন্য হাত বাড়াতেই ওয়াহেজ সেটা নিজের হাতে নিয়ে নেয় এবং সেই একই মিসওয়াক দিয়ে নিজে দাঁত মাজতে শুরু করে। ওয়াহেজের এমন কাণ্ড দেখে আনভি বেশ অবাক হয়। এই লোকটার যে আসলে কতগুলো রূপ, তা তার কাছে এক বিশাল রহস্য। দুজনে মুখ ধোয়া শেষ করলে ওয়াহেজ আবারও তাকে কোলে তুলে এনে সযত্নে বিছানায় বসিয়ে দেয়। আনভির হাতে একটা তোয়ালে আর ভ্যাসলিনের কৌটা ধরিয়ে দিয়ে সকালের নাস্তা আনার জন্য সে নিচে চলে যায়। নিচে গিয়ে ওয়াহেজ উষাকে বলে, “মা, আমাদের দুজনের নাস্তাটা একটা ট্রেতে করে দিয়ে দাও।”
উষাও কোনো রকম ভনিতা না করে ছেলের কথায় খাবার গুছিয়ে দিতে শুরু করেন। কিন্তু এই দৃশ্য দেখে ওয়াহেজের চাচি রুশদীর চোখ তো টাটিয়ে ওঠে। তিনি উষার কানের কাছে ফিসফিস করে বিষ ঢালতে শুরু করেন, “বিয়ের দশ দিনের মাথায়ই বউয়ের এই অবস্থা! এক মাস পার হলে তো মনে হয় আলাদা বাড়ি নিয়ে থাকবে ওরা। বউ তো দেখি ছেলেকে জাদু করে ফেলেছে..” ইত্যাদি আরও অনেক কথা বলেন। তবে উষা এসব কথায় মোটেও কান না দিয়ে নিজের কাজেই মনোযোগ দেন। খাবারের ট্রে হাতে নিয়ে ওয়াহেজ ফিরে আসে ঘরে। পরম মমতায় নিজ হাতে আনভিকে খাইয়ে দেয় সে। খাওয়া শেষে প্লেটগুলো আবার কিচেনে রেখে এসে সে ঘরের দরজাটা বেশ ভালো করে আটকে দেয়। দরজার ছিটকিনি লাগানোর শব্দে বিছানায় আধশোয়া আনভির ভ্রু জোড়া কুঁচকে ওঠে। সে কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করে, “দরজা লাগালেন কেন? আজ বাইরে যাবেন না আপনি?”
ওয়াহেজ ঠোঁটে এক চিলতে দুষ্টু হাসি ঝুলিয়ে বিছানায় উঠে আসে। আনভির একদম পাশ ঘেঁষে বসতে বসতে বলে, “এই যে সকাল থেকে তোমার এত খাতির-যত্ন করলাম, তার একটা সুন্দর হাদিয়া কি আমার প্রাপ্য নয়?”
ওয়াহেজের চোখের ভাষা আর মতিগতি দেখে আনভির বুঝতে বাকি থাকে না যে, এই লোক আবারও তার সঙ্গ চাইছে। আনভি তড়িঘড়ি করে একটু দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করতে করতে বলে, “না, না, একদম না! এসব এখন হবে না। জ্বর আরও বেড়ে যাবে আমার। যা হওয়ার সব কাল হবে, আজ আর কোনো কথা নয়।”
এ কথা বলে আনভি আরেকটু সরে যেতে নিলেই ওয়াহেজ ছোঁ মেরে তাকে টেনে নিয়ে বালিশের ওপর শুইয়ে দেয়। আনভির মুখের ওপর ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলে, “জ্বর কমে যাবে, সত্যি বলছি বেশি কিছু করব না।”
আনভি ওয়াহেজের গভীর চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, “আমি তো জানতাম আপনি ভীষণ লাজুক। কিন্তু আপনি যে এতটা নির্লজ্জ, তা তো আজ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।”
“লজ্জা কি আর সব জায়গায় দেখাতে হয়, সামাইরা?”
কথাটা বলেই ওয়াহেজ আনভির গা থেকে ওড়নাটা সরিয়ে নেয়। আনভি চোখ বুজে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। ওয়াহেজকে দমানোর সাধ্য তার নেই, আর সত্যি বলতে তার ইচ্ছেও নেই। একটু শারীরিক কষ্ট হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ওয়াহেজের এই গভীর ছোঁয়াটুকু তো সে পাচ্ছে! প্রথমে কিছুটা আপত্তি করলেও ধীরে ধীরে আনভি নিজেকে ওয়াহেজের কাছে সঁপে দেয়। ওর মনের এক কোণে একটা ছোট্ট ভাবনা উঁকি দেয় একে তো ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়েছে, তার ওপর আবার এখন দরজা আটকে প্রেমে মত্ত! বাড়ির লোক যে কী ভাবছে, তা একমাত্র আল্লাহই জানেন!

সময়টা বারোটার দিকে

প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের বিশাল, পাথরে বাঁধানো প্রাঙ্গণ দমবন্ধ করা স্তব্ধতায় ডুবে আছে। হাজারো মানুষের ভিড় জমেছে চারদিকে ভাসছে শুধু আগুনের ভয়ংকর গর্জন আর মাঝেমধ্যে আর্তনাদের চাপা স্বর। আজ মাসের সেই নির্দিষ্ট দিন, যেদিন এখানে উন্মুক্ত আদালত বসে। এই
প্রাঙ্গণের একেবারে শেষ প্রান্তে, উঁচু মঞ্চে বিচারকের আসনে পাথরের মূর্তির মতো বসে আছে স্বয়ং ওয়াহেজ। বর্তমান এই রাষ্ট্রে ওয়াহেজি যেহেতু সর্বেসর্বা। তাই কোনো আপিল নেই, কোনো দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া নেই ওয়াহেজের মুখের একটি শব্দই এখানে চূড়ান্ত রায়, তার চোখের ইশারাই এ দেশের অলঙ্ঘনীয় আইন।
মঞ্চের ঠিক একপাশে মাটি খুঁড়ে তৈরি করা হয়েছে একটা বড় ও অন্ধকার কুয়া। কুয়ার নিচ থেকে দাউদাউ করে আকাশের দিকে উঠে আসছে লেলিহান আগুনের শিখা। আগুনের লেলিহান শিখায় চারপাশের বাতাসও বোধহয় ঝলসে যাচ্ছে, সেই উত্তাপ এসে লাগছে উপস্থিত প্রতিটি মানুষের গায়েও। সেখানে মানে কুয়ার ভেতরে একের পর এক মানুষকে নির্মমভাবে নিক্ষেপ করা হচ্ছে। যাদের নিক্ষেপ করা হচ্ছে এরা সাধারণ কেউ নয় এরা ভয়ংকর সন্ত্রাসী চক্রের সদস্য, ওয়াহেজের শাসনামলে যাদের প্রায় সাত হাজারের বেশি ধরা পড়েছে। এরা ছিল দেশের অগ্রগতির পথে সবচেয়ে বড় বাধা। যখনই দেশের কোনো সম্ভাবনাময় মানুষ মাথা তুলে দাঁড়াতে চেয়েছে, নিজেদের নোংরা আধিপত্য রক্ষার্থে এই সন্ত্রাসীরা তাদের নিঃশব্দে সরিয়ে দিয়েছে। এখন তাদের সেই পাপের চূড়ান্ত প্রায়শ্চিত্ত হচ্ছে এই জ্বলন্ত নরকে। যাদের কেই ধরা হয়েছে তাদের কেই এভাবে পুড়িয়ে দিয়েছে ওয়াহেজ। এবার অন্য কেউ তো কিছু বলতেও পারবে না কারণ আমার দেশে আমি টেরোরিস্ট পেয়েছি শাস্তি দিয়েছি এটি আমার সার্বভৌমত্বের ব্যাপার। এই যে এইসব রাষ্ট্রদ্রোহীদের জন্য ওয়াহেজের নির্দেশ একটাই কোনো ক্ষমা নয়, সরাসরি অগ্নিদগ্ধ।
আদালতের অন্য প্রান্তে চলছে আরেক নির্মম শুদ্ধি অভিযান। সেখানে সারি বেঁধে দাঁড় করানো হয়েছে চুরি ও চাঁদাবাজিতে যুক্ত অপরাধীদের। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার সাথে সাথেই জল্লাদের ভারী অস্ত্রের এক কোপে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হচ্ছে তাদের এক হাত।
পাশেই চলছে সমাজের সবচেয়ে কঠিন বিচার তা হলো ব্যভিচারের শাস্তি। বিবাহিত কেউ পরকীয়ায় লিপ্ত হলে, তাকে মাটিতে অর্ধেক পুঁতে দিয়ে চারপাশ থেকে ছোঁড়া হচ্ছে ভারী পাথর (রজম) । মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত থামছে না এই শাস্তি। আর অপরাধী অবিবাহিত হলে উন্মুক্ত জনসম্মুখে তার পিঠে আছড়ে পড়ছে চাবুকের ভয়ংকর আঘাত এক, দুই করে পাক্কা একশটি বেত্রাঘাত, আর তারপর এক বছরের চরম নির্বাসন। রক্তের গন্ধে ভারী হয়ে উঠছে চারপাশ, কিন্তু ভয়ে সাধারণ মানুষের বুকের ধুকপুকানি ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই সেখানে।
মঞ্চে বসে ওয়াহেজ স্থির চোখে দেখছে এই সবকিছু। তার চেহারায় বিন্দুমাত্র মায়া বা অনুশোচনা নেই। ওর দর্শন খুব স্পষ্ট এবং অটল পাপ দমন করতে হলে শাসককে হতে হবে বজ্রের চেয়েও কঠোর। মানুষের মন জুগিয়ে, নরম কথায় দেশ চালাতে গেলে শাসনযন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে, সমাজ পঁচে যায়। তার এই লৌহকঠিন শাসনের ফলেই একসময়কার রাস্তাঘাটের সমস্ত অরাজকতা, দুর্নীতি আর অশ্লীলতা আজ নির্মূল হওয়ার পথে।
দেশের চারদিকে এখন শুধু এক নিস্তব্ধ, ভয়ংকর শৃঙ্খলা। মানুষ এখন পাপ করতে ভয় পায়। আর এই ভয়টাই ওয়াহেজের রাজত্বের সবচেয়ে বড় শক্তি।

।।।।

একটি পুরোনো গোডাউনের একটি ঘর। ঘরের পরিবেশটা বেশ থমথমেই বলতে গেলে। বড় এক মেহগনি কাঠের টেবিল ঘিরে বসে আছেন তিনজন লোক। তাদের পেছনে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে পাথরের মূর্তির মতো সতর্ক পাহারায় দাঁড়িয়ে আছে কয়েকজন সুঠাম দেহের গার্ড।
টেবিলের ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অসংখ্য ছবি আর নথিপত্র। সবই ওয়াহেজের। কোনো ছবিতে দেখা যাচ্ছে ওয়াহেজ বিশাল জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে তেজোদীপ্ত ভাষণ দিচ্ছেন, কোনোটা আবার তার ক্লোজ-আপ শট। প্রমাণ হিসেবে রাখা এই ছবিগুলোই এখন এই তিনজনের সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ।
বসে থাকা তিনজনের মধ্য থেকে প্রধান লোকটি বিরক্তি নিয়ে টেবিল থেকে ওয়াহেজের একটি ছবি হাতে তুলে নেন। ছবির দিকে কিছুক্ষণ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে কঠিন গলায় তিনি বলেন, “অনেক হয়েছে! এত কিছুর পরও ওকে আমরা দমাতে পারিনি। কিন্তু এবার ওকে একেবারে শেষ করে দেওয়ার পালা।”
হাতের ছবিটা টেবিলের ওপর তাচ্ছিল্যের সঙ্গে ছুড়ে ফেলে তিনি আবার বলতে শুরু করেন, “যেকোনো মূল্যে ওর এই শাসন চুরমার করে দিতে হবে আমাদের। নয়তো আর কয়েকদিন পর আমাদের নিজেদেরই ধরা পড়ে আগুনে জ্বলতে হবে। সময় বুঝে কোনোভাবে ওদের বাড়িতে সরাসরি বোম ফেলতে হবে। ওদের বাড়ির ঠিকানা দুনিয়ার সবার থেকে লুকানো থাকলেও, আমার কাছে অজানা নয়। এক আঘাতেই পুরো বংশ নির্বংশ করে দিতে হবে!”
তার এই ভয়ংকর পরিকল্পনা শুনে টেবিলের পাশে বসে থাকা দ্বিতীয় লোকটি কিছুটা নড়েচড়ে বসে গলাটা সামান্য নিচু করে তিনি জিজ্ঞেস করেন, “কিন্তু… নিজের মেয়েকে কী করবেন? হামলা হলে সেও তো তখন ওই বাড়িতেই থাকবে।”
প্রশ্নটা শুনে প্রথম লোকটির মুখে কোনো বিকার দেখা দেয় না। উল্টো তার ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে এক কুটিল আর তাচ্ছিল্যের হাসি চরম নির্লিপ্ত আর শীতল কণ্ঠে তিনি জবাব দেন, “এ রকম দু-একটা মেয়ে মারা গেলে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। বরং ও মরে গেলে আমার পথের কাঁটাই দূর হবে, আমি উল্টো বেঁচে যাব।”

চলবে,,,

Share On:

TAGS:



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply