প্রেসিডেন্টওয়াহেজইবনান
অন্তিম
সানজিদাআক্তারমুন্নী
ওয়াহেজ আনভির হাত শক্ত করে ধরে লিভিং রুমে নেমে আসে। ড্রয়িংরুমে উপস্থিত বাড়ির প্রতিটি সদস্য তাদের এভাবে নামতে দেখে মুহূর্তেই বিচলিত হয়ে পড়েন।
সবার ঠিক মাঝখানে এসে দাঁড়ায় ওয়াহেজ। একপলক তাকায় ওহির বাবা, অর্থাৎ নিজের চাচা শোয়েব ইবনানের দিকে। তারপর আনভির দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে শান্ত শীতল কণ্ঠে প্রশ্ন করে, “নিজের আসল বাবাকে দেখতে চাও না?”
‘আসল বাবা!’ শব্দদুটো শুনে ঘরের উপস্থিত সবাই এক কথায় বোবা হয়ে যান। আনভি হতবাক দৃষ্টিতে ওয়াহেজের চোখের দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে, “জি।”
ওয়াহেজ এবার সরাসরি শোয়েবের দিকে আঙুল তাক করে। দাঁত চেপে চাপা আক্রোশে বলতে থাকে, “উনিই তোমার বাবা! তুমি এই ইবনান পরিবারেরই সন্তান। উনার প্রথম স্ত্রী ছিলেন তোমার মা। নিজের সম্মান বাঁচাতে উনি ইয়াহিয়াকে তোমার বাবা সাজিয়েছেন। তোমাকে নিজের চোখের সামনে রাখতে আর ইয়াহিয়ার মাধ্যমে আমার ক্ষতি করতেই আমাদের বিয়ের এই পুরো ছক কষেছিলেন উনি। তোমার এই আসল পিতা শুধু একজন প্রতারকই নন, একজন দেশদ্রোহীও। গতকাল রাতে ইয়াহিয়া নিজের মুখে সব স্বীকার করেছে, আমার কাছে প্রতিটি কথার অকাট্য প্রমাণ আছে।”
ওয়াহেজের কথাগুলো শোনার পর পুরো লিভিং রুমে যেন শ্মশানের মৌনতা নেমে আসে। আনভি কথা বলার শেষ শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলে। কী শুনছে এসব সে? ওয়াহেজের মাথা কি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেল! রুশদী তো রীতিমতো মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার উপক্রম। তিনি তীব্র কণ্ঠে চিৎকার করে ওঠেন, “কী বলছ কী ওয়াহেজ এসব! তুমি কাকে কার মেয়ে বানিয়ে দিচ্ছ!”
ওয়াহেজ আনভির হাত ছেড়ে দিয়ে তাদের দিকে আরও কয়েক কদম এগিয়ে যায়। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে, মাথা নত করে দাঁড়িয়ে থাকা শোয়েব ইবনানের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, “সত্যটা এবার নিজের মুখেই প্রকাশ করুন, মিস্টার শোয়েব ইবনান।”
শোয়েব ধীরেসুস্থে চোখ তুলে একবার সবার দিকে তাকান। পালানোর আর কোনো রাস্তাই আজ তার খোলা নেই। তিনি আনভির দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলতে শুরু করেন, “হ্যাঁ, আনভি আমারই মেয়ে। হোস্টেল জীবনে আনভির মায়ের সাথে প্রেম করে বিয়ে করেছিলাম আমি। কিন্তু পরে চাকরি পেয়ে রুশদীদের কোম্পানিতে ঢোকার পর, পরিস্থিতির শিকার হয়ে আমি রুশদীকে বিয়ে করি। তবে আমি আনভির মাকে সত্যিই ভালোবাসতাম, তাকে হারাতে চাইনি। আমার পরিকল্পনা ছিল রুশদীদের পুরো কোম্পানিটা হাতিয়ে নিয়ে ওকে ছেড়ে দেব, তারপর আনভি আর ওর মাকে নিয়ে নতুন করে সংসার পাতব। কিন্তু তার আগেই অভিমানে আমার পৃথিবী ছেড়ে চলে যায় আনভির মা। এরপর আমিই ইয়াহিয়াকে দিয়ে আনভিকে বড় করেছি। জেসমিন নামের এক নার্সকে তার খালামণি সাজিয়ে দেখভালের দায়িত্বে রেখেছিলাম। সারাকে বিদেশে পাঠিয়ে তোমার আর ওয়াহেজের বিয়ের বন্দোবস্তও আমারই করা। আমি ওয়াহেজকে ক্ষমতা থেকে সরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছি, কারণ আমার ড্রাগসের চালানসহ অনেক অবৈধ ব্যবসাই ওর জন্য বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবে হ্যাঁ, আমি ওয়াহেজকে মারতে চাইনি। কারণ আমি চেয়েছিলাম আনভির সাথে ওয়াহেজ থাকুক, আর আমার চোখের সামনে আমার প্রথম ভালোবাসার শেষ স্মৃতি, আমার মেয়েটা সুরক্ষিত থাকুক। আমি ভুল করেছি আজ আমি সব স্বীকার করছি।”
শোয়েবের নিজ মুখে তার এমন ভয়াবহ স্বীকারোক্তি শোনার পর পুরো বাড়িটা নিস্তব্ধতায় ডুবে যায়। এত বছরের সংসার জীবনে যার সাথে ছায়ার মতো জুড়ে ছিলেন, তার এমন রূপ দেখে রুশদীর পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যায়। তিনি আর নিজেকে সামলাতে না পেরে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন। আনভি স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে তার জন্মদাতার দিকে। যে মানুষের ঔরসে তার জন্ম, আজ তার প্রতি শুধুই ঘৃণা আর বিতৃষ্ণা জন্ম নিচ্ছে। নিজের অস্তিত্বের প্রতিই এখন ঘেন্না হচ্ছে তার; দু’চোখ বেয়ে অঝোরে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু।
পরিস্থিতি আর বিশৃঙ্খল না হয়, তাই ওয়াহেজ কঠোর গলায় নির্দেশ দেয়, “বাড়ির মহিলারা সবাই নিজেদের ঘরে চলে যাও। এই অপরাধীকে ধরতে এখনই পুলিশ আসবে।”
তার কড়া দৃষ্টির সামনে কেউ আর কথা বলার সাহস পান না। ওয়াহেজের মা রুশদীকে ধরে নিয়ে যান, আইরাও ওহিকে নিয়ে ভেতরে চলে যায়। কিন্তু আনভি যেন পাথরের মূর্তির মতো অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তাকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ওয়াহেজ গম্ভীর গলায় বলে, “সামাইরা, ভেতরে যাও।”
আনভি শুনতে পায় না। ওয়াহেজ এবার আরও জোরালো ধমক দেয়, “সামাইরা, যাও!”
এবার আনভির সম্বিত ফেরে। তড়িঘড়ি করে চোখের পানি মুছে, একবুক যন্ত্রণা নিয়ে সে ঘরের দিকে পা বাড়ায়। মহিলারা ভেতরে যেতেই পুলিশ ফোর্স নিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করে প্রশাসনের লোকেরা। ওয়াহেজ আগে থেকেই সবকিছু প্রস্তুত করে রেখেছিল। পুলিশ এসে শোয়েবের হাতে হাতকড়া পরায়। ওয়াহেজ আর তার বাবা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখতে থাকেন।
আনভি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। পর্দার আড়াল থেকে সে দেখছে তার জন্মদাতাকে পুলিশের গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য। সে জানে, এই মানুষটার মৃত্যু কতটা ভয়াবহ হবে। দেশদ্রোহীদের প্রকাশ্যে বিশাল কড়াইতে ফুটন্ত পানিতে সেদ্ধ করে মারা হয় এই নির্মম সত্যটা তার বুকে কাঁপন ধরায়। বাবা হয়েও বাবাকে না পাওয়ার আক্ষেপে তার ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে। যাকে সে নিজের মায়ের বোন, নিজের মায়ের মতো জেনে এসেছে, সেও যে এই ভয়ংকর নাটকের অংশ ছিল এই সত্য আনভিকে কুরে কুরে খেয়ে নিল পুরোটা।
ওয়াহেজ ধীরপায়ে আনভির পেছনে এসে দাঁড়ায় আর নরম গলায় বলে, “তোমার মনের অবস্থা আমি বুঝতে পারছি। এভাবে ভেতরে ভেতরে গুমরে থেকো না, জোরে কেঁদে নিজের সব কষ্ট বের করে দাও। আজকেই এই সব যন্ত্রণার সমাপ্তি হোক।”
আনভি অশ্রুসিক্ত চোখে ওয়াহেজের দিকে ঘোরে। তারপর আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। হু হু করে কেঁদে উঠে ওয়াহেজের গলা জড়িয়ে ধরে, তার বুকে মুখ গুঁজে দিয়ে ভাঙা গলায় বলে, “আমি কী করব? আমার কী করা উচিত? একের পর এক এত বড় ধাক্কা আমি আর নিতে পারছি না, সত্যি মানতে পারছি না।”
ওয়াহেজ পরম মমতায় আনভির পিঠে হাত বুলিয়ে দেয়। সান্ত্বনার সুরে বলে, “হয়তো এটাই আল্লহর ইচ্ছে। নিজেকে শক্ত করো, আমি তো আছি।”
আনভি ওয়াহেজের শার্ট খামচে ধরে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে। তাকে তো এখন শক্ত হতেই হবে। ওয়াহেজ তাকে বুকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আনভির কপালে আলতো করে চুমু এঁকে দেয়। ফিসফিস করে বলে, “কেঁদো না সামাইরা। যা হওয়ার তা তো হবেই, এখন শুধু ওদের প্রাপ্য শাস্তি পাওয়াটুকু বাকি।”
আনভি কোনো উত্তর দেয় না নিঃশব্দে ওয়াহেজের বুকে মাথা রেখেই দাঁড়িয়ে থাকে।
বিকেল সাড়ে পাঁচটা। পশ্চিম আকাশের সূর্যটা ম্লান হয়ে আসছে বিচারের ময়দানে দাঁড়িয়ে আছে আনভি। আনভি একেবারে স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার পায়ের খুব কাছেই পড়ে আছে এক বাবার নিথর দেহ। একটু আগেই জল্লাদের নির্মম খড়গ নেমে এসেছে ইয়াহিয়ার ঘাড়ে, ধুলোয় লুটিয়ে পড়েছে তার ছিন্ন মস্তক। বাতাসে ভাসছে তরতাজা রক্তের তীব্র গন্ধ।
কিন্তু আনভির শোক করার বা ডুকরে কেঁদে ওঠার ফুরসতটুকুও নেই। কারণ বাতাস চিরে ক্রমাগত ভেসে আসছে আরেক বাবার গগনবিদারী আর্তনাদ। শোয়েব কে চোখের সামনে জীবন্ত সেদ্ধ করা হচ্ছে ফুটন্ত মৃত্যুতে। তার এই যন্ত্রণাকাতর চিৎকারে ময়দানে উপস্থিত সবার শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে যাচ্ছে আতঙ্কের স্রোত। অথচ আনভি পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে দেখছে।
তার চোখের সামনে শুধু ভাসছে একটু আগের দৃশ্যটা। শোয়েবের সাথে শেষবারের মতো কথা বলার ওই ছোট্ট সুযোগ। টানা পাঁচ ঘণ্টার পাশবিক রিমান্ড আর বেধড়ক টর্চার লোকটার শরীরে আস্ত কিছু রাখেনি। মাংস থেঁতলে গিয়েছিল, কিন্তু ঘাতকেরা তার মুখ থেকে একটা টুঁ শব্দও আদায় করতে পারেনি। ইস্পাতের মতো কঠিন ছিলেন তিনি। কিন্তু আনভিকে যখন সামনে আনা হলো, তার রক্তাক্ত, ক্লান্ত চোখ দুটো মুহূর্তে শান্ত হয়ে গেল। কাঁপতে থাকা ঠোঁটজোড়া জোড়া করে তিনি শুধু একটা কথাই বলতে পেরেছিলেন
“আমাকে মাফ করিস, মা।”
ব্যস, এতটুকুই! আর কোনো কথা তার মুখ থেকে বের হয়নি।আনভি জানে, কেন এই মানুষটা আজ স্বেচ্ছায় এই ফুটন্ত মৃত্যুর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। ওয়াহেজ যখন আনভির নামটা উচ্চারণ করেছিল, আনভির জীবনের ওপর যখন হুমকি এসেছিল, তখন আর পাথর হয়ে থাকতে পারেননি শোয়েব। যে মানুষটা নিজের শরীরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া নরকযন্ত্রণা অবলীলায় সয়ে নিয়েছিল, সে-ই আনভিকে আগলে রাখার ওয়াদায় আবদ্ধ হয়ে সব দোষ নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে।
জীবদ্দশায় হয়তো বাবার দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করতে পারেননি শোয়েব, সেই আক্ষেপ তার ওই শেষ কথাটার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল। কিন্তু আজ এই বিদায়বেলায় তিনি যা করে যাচ্ছেন, তা বোধহয় কোনো রূপকথার বাবাও পারে না। নিজের শরীরটাকে তিলে তিলে গলিয়ে দিয়ে, চরম যন্ত্রণাকে আলিঙ্গন করে তিনি তার মেয়েকে এক নিরাপদ ছায়াতলে রেখে যাচ্ছেন।
আকাশের আলো ফুরিয়ে আসছে। আনভি বোবা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ময়দানের দিকে তার এক বাবা রক্তে ভেসে মাটিতে মিশে গেছে, আর অন্যজন একটু একটু করে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে শুধু তাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য।
ওয়াহেজ নিজের চেয়ারে বসে আছে এতক্ষণ পড় ওয়াহেজ নিজের চামড়ার চেয়ারটা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। মাইক্রোফোনটা একটু নিজের দিকে টেনে নিয়ে সে পুরো মাঠের দিকে একবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায় তারপর তার ভরাট, গম্ভীর কণ্ঠস্বরে বলতে থাকে,
উপস্থিত দেশবাসী, আপনারা আজ এক ঐতিহাসিক ও নির্মম সত্যের সাক্ষী হয়ে থাকুন। রাষ্ট্রদ্রোহিতার শাস্তি কতটা ভয়াবহ ও দৃষ্টান্তমূলক হতে পারে, আজ তা আপনাদের চোখের সামনেই প্রমাণিত। অপরাধীর পরিচয় এখানে নিতান্তই তুচ্ছ সে আমার পরমাত্মীয় হোক, আমার শ্বশুর কিংবা আপন পিতৃব্য হোক রাষ্ট্রের স্বার্থের কাছে রক্ত বা সম্পর্কের কোনো মূল্য নেই। এই ভূখণ্ডের সমাজ, নীতি ও ন্যায়বিচারের একমাত্র মাপকাঠি আমি। আমার উচ্চারিত প্রতিটি শব্দই এখানে আইন, আমার নির্দেশই চূড়ান্ত বিধান। এই বিধান শোনা এবং মান্য করা আপনাদের ঐচ্ছিক কোনো বিষয় নয়, বরং অলঙ্ঘনীয় কর্তব্য। যারা এই নিয়মের অবাধ্য হবে, তাদের পরিণতি হবে ঠিক এমনি ভয়াবহ ও মর্মান্তিক।
আমার কানে এসেছে, কিছু উদ্ধত মস্তক আমার এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের দুঃসাহস দেখাচ্ছে। রাজপথে আন্দোলনের হুংকার তুলছে। তাদের জ্ঞাতার্থে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিচ্ছি আমি সেই দুর্বল চিত্তের শাসক নই যে জনতার সস্তা আবেগের কাছে মাথা নত করবে বা কথায় উঠবে-বসবে। রাষ্ট্রের বৃহত্তর কল্যাণে এবং শৃঙ্খলার স্বার্থে যা অপরিহার্য, আমি নির্দ্বিধায় ঠিক তাই করব।
যে কণ্ঠস্বর আমার এই ন্যায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে, সেই কণ্ঠকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া হবে। যে হস্ত আমার বিধানে হস্তক্ষেপ করতে চাইবে, তা সমূলে উৎপাটন করা হবে। আশা করি, আমার বার্তা আপনাদের মস্তিষ্কে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে পৌঁছেছে। মনে রাখবেন, আমার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত, এবং আমার বিধানই এই রাষ্ট্রের শেষ কথা।
সবাইকে ধন্যবাদ।
রাত এখন ঠিক দুটো। নিস্তব্ধ চরাচর। শহরের সব কোলাহল কোনো এক জাদুমন্ত্রে ঘুমিয়ে পড়েছে। ব্যালকনির আধো-অন্ধকারে রাখা সোফাটায় নিশ্চল হয়ে বসে আছে আনভি। রাতের হিমেল বাতাস তার এলোমেলো চুলগুলো নিয়ে খেলা করছে, কিন্তু সেদিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। জীবনের খাতায় জমে থাকা কত শত না-বলা অভিযোগ আজ তার মনের ভেতর উথালপাথাল করছে। আজ আদালতের কাঠগড়া থেকে ফেরার পর চারপাশের পৃথিবীটা বড্ড অচেনা ঠেকছে আনভির কাছে। ওয়াহেজের মা এসে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে অনেক সান্ত্বনা দিয়েছেন, কিন্তু মনের ভার কি এত সহজে কমে! রশদী এখন হাসপাতালে ভর্তি। এত বড় একটা নির্মম সত্যির মুখোমুখি হওয়ার পর, আর চোখের সামনে নিজের স্বামীর আকস্মিক মৃত্যুর দৃশ্য দেখে সে এখন মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে প্রলাপ বকছে। সত্যি, জীবন বড়ই অদ্ভুত! এই আছে, তো এই নেই। হুট করেই সব শুরু হয়, আবার ঝড়ের বেগে সব তছনছ করে দিয়ে নিমেষেই শূন্যতায় মিলিয়ে যায়।
এক বুক গভীর বিষণ্ণতা আর ক্লান্তি নিয়ে আনভি তার মাথাটা এলিয়ে দেয় ওয়াহেজের প্রশস্ত কাঁধে। ওয়াহেজ তাকে অতি মমতায় আগলে রেখেছে, নিজের এক হাত দিয়ে আনভিকে আরও একটু নিজের কাছে টেনে নিয়েছে সে। বারবার বোঝাচ্ছে, সান্ত্বনা দিচ্ছে, সাহস জোগাচ্ছে। এই যে চারপাশের এত এত অশান্তি, এত দমবন্ধ করা পরিস্থিতির মাঝেও একটা মানুষ তাকে এতটা বুঝতে পারছে, ছায়ার মতো পাশে থাকছে এটাই আনভির কাছে অতি প্রাপ্তির। এই অশান্তির মাঝেও ওয়াহেজের এই সাপোর্টটা আনভির জন্য এক টুকরো নিটোল প্রশান্তি।
ওয়াহেজ একদৃষ্টে, একরাশ মুগ্ধতা আর মায়া নিয়ে চেয়ে আছে আনভির শ্রান্ত মুখের দিকে। আর আনভির শূন্য দৃষ্টি সুদূর আকাশের ঐ একাকী চাঁদে নিবদ্ধ। হঠাৎ আনভি দৃষ্টি ঘুরিয়ে ওয়াহেজের চোখে চোখ রাখে। শুকনো গলায় বলে ওঠে, “জানেন ওয়াহেজ, একটা কথা।”
ওয়াহেজ ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বলে, “না তো, জানি না। তুমি বললে তবেই না জানব।”
আনভি ওয়াহেজের কাঁধ থেকে মাথা তুলে সোজা হয়ে বসে। নিজের নরম দুই হাতের তালু আলতো করে রাখে ওয়াহেজের দুই গালে। এরপর স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, “এই যে আপনার কাঁধে, আপনার বুকে আমি এতটা নিশ্চিন্তে মাথা রাখি পৃথিবীর সব কোলাহল ভুলে যাই আমার কাছে আপনার এই বিশ্বস্ত কাঁধ আর বুকটাও একধরনের রিজিক!”
কথাটা শুনে ওয়াহেজের চোখে প্রেম আর মায়া চিকচিক করে ওঠে। সে আনভির মুখের দিকে আরেকটু এগিয়ে আসে, তারপর তার কপালে আদরে আলতো করে এঁকে দেয় ভালোবাসার এক পবিত্র চুম্বন আর ফিসফিস করে বলে ওঠে, “আর তুমি? তুমি তো পুরোটাই আমার জন্য আল্লাহর দেওয়া সবচেয়ে সুন্দর নেয়ামত, আমার প্রিয়তমা।”
ওয়াহেজের কণ্ঠের এই ছোট্ট অথচ অতলস্পর্শী কথাগুলো এক ঐন্দ্রজালিক প্রলেপ হয়ে ছুঁয়ে যায় আনভির মন। মুহূর্তেই কর্পূরের মতো উবে যায় তার দীর্ঘদিনের জমিয়ে রাখা সমস্ত বিষণ্ণতা, যাবতীয় ক্লান্তি। অলক্ষ্যেই তার আনত মুখের আদলে, ঠিক ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে ভোরের প্রথম আলোর মতো পবিত্র হাসি।
তার জীবনের যত না-পাওয়া, অভিমানের ভারী মেঘ, না-বলা হাহাকার আর পেরিয়ে আসা সমস্ত ঝড়-ঝঞ্ঝা এই একটি তৃপ্তির হাসিতেই আজ তৃপ্তি খুঁজে পেয়েছে আনভি। চারপাশের নিবিড় নৈঃশব্দ্য আর আকাশ থেকে ঝরে পড়া চাঁদের রুপোলি আলো দূর থেকে নীরবে সাক্ষী হয়ে রয় দুটি ভালোবাসার মানুষের এক সুন্দরতম সমাপ্তির।
(সমাপ্ত)
গল্পটি এখানেই শেষ করলাম। যদিও এখনও অনেক কিছু বলার বাকি, অনেক অনুভূতি আর ঘটনার রেশ অমলিন রয়ে গেছে গল্পটি বই আকারে প্রকাশের কথা মাথায় রেখে আজ একটু সংক্ষেপেই ইতি টানলাম।এই গল্পে আপনাদের অগাধ ভালোবাসা, প্রতিটি প্রতিক্রিয়া আর পাশে থাকার জন্য হৃদয়ের গভীর থেকে কৃতজ্ঞতা জানাই। আপনাদের এই সাড়া না থাকলে ওয়াহেজ আর আনভির গল্প এতটা প্রাণ পেত না।
বিদায় নিচ্ছে ওয়াহেজ আর আনভি তাদের ভালোবাসা, দ্বিধা আর গল্প আপনাদের মনে কিছুটা জায়গা করে নিতে পেরেছে বলেই আমার এই লেখা সার্থক।
আশা রাখি, খুব শীঘ্রই নতুন রূপে, নতুন আবহে আবার ফিরে আসবে এই গল্প আরও বিস্তৃত, আরও গভীর হয়ে, বইয়ের পাতায়। ততদিন পর্যন্ত ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন।আর হ্যাঁ, আগামীকালই আসছে নতুন একটি গল্প আশা করি সেটিও আপনাদের ভালো লাগবে।
ভালোবাসা রইল ❤️🩹
Share On:
TAGS: সানজিদা আক্তার মুন্নী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেসিডেন্ট ওয়াহেজ ইবনান পর্ব ৭
-
তুষারিণী পর্ব ১০
-
তুষারিণী পর্ব ৪
-
তুষারিণী পর্ব ৯
-
তুষারিণী পর্ব ২
-
প্রেসিডেন্ট ওয়াহেজ ইবনান পর্ব ১০
-
তুষারিণী পর্ব ৮
-
প্রেসিডেন্ট ওয়াহেজ ইবনান পর্ব ৯
-
তুষারিণী পর্ব ১১
-
তুষারিণী গল্পের লিংক