Golpo romantic golpo প্রেসিডেন্ট ওয়াহেজ ইবনান

প্রেসিডেন্ট ওয়াহেজ ইবনান পর্ব ১১


প্রেসিডেন্টওয়াহেজইবনান

পর্ব : ১১

সানজিদাআক্তারমুন্নী

বিয়ের আগের নিজের বাড়ির চেনা আঙিনায় আজ কয়েক দিন পর পা রেখেছে আনভি। যেখানে সে আর তার খালামণি থাকতেন। এই বাড়ি, এই দেয়াল সবকিছুর সাথেই জড়িয়ে আছে ওর আর খালামণির অসংখ্য স্মৃতি। কিছু দরকারি জিনিসপত্র নেওয়ার অযুহাতে আজ এখানে আসার অনুমতি মিলেছে ওয়াহেজের কাছ থেকে। তবে ওয়াহেজ নিজে আনভি কে নিয়ে আসার ফুরসত পায়নি, নিজের কোনো এক অজানা ব্যস্ততায় আটকে গিয়ে আনভিকে পাঠিয়ে দিয়েছে বাড়ির গাড়িতে।

আনভিকে নিজের কাছে পেয়ে খালামণির আনন্দরা আর বাঁধ মানছে না। মেয়েটা কতদিন পর এসেছে, তাই হরেক রকম রান্নার আয়োজনে তুমুল ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন তিনি। আনভি বারবার বারণ করছে এতসব ঝক্কি পোহাতে, কিন্তু কে শোনে কার কথা! আদরের ভাগ্নির জন্য তার এই ব্যস্ততা এক প্রকার উৎসব।
নিজের পুরোনো ঘরটার দরজায় এসে থমকে দাঁড়ায় আনভি। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে অজান্তেই। মনে হচ্ছে এক যুগ পর নিজের একান্ত আশ্রয়ে ফিরেছে সে। ঘরের প্রতিটি কোণ ঠিক আগের মতোই পরিপাটি, একটি সুতোও এদিক থেকে ওদিক হয়নি। গায়ের বোরখাটা খুলে রেখে সোজাসুজি ওয়াশরুমে চলে যায় সে। চোখেমুখে পানির শীতল ঝাপটা দিয়ে শ্রান্তি ধুয়ে যখন বেরিয়ে আসে, ঠিক তখনই স্তব্ধতা ভেঙে কেঁপে ওঠে বিছানায় পড়ে থাকা ওর ফোনটা।
স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে ওয়াহেজের নাম। আনভির ভ্রু কুঁচকে যায়। মানুষটার এই নিখুঁত, মিথ্যে আদিখ্যেতা দেখে সে বারবার তাজ্জব বনে যায়। কী অবলীলায়, কত সুন্দর করেই না অভিনয় করতে পারে লোকটা! আনভির বিস্ময় ক্ষণে ক্ষণে রূপ নেয় তিক্ততায়। প্রথম দু’বার ফোনটা বাজতে দেয় সে, ধরার কোনো তাগিদ অনুভব করে না। তবে তৃতীয়বার বেজে উঠতেই একপ্রকার বাধ্য হয়েই রিসিভ করে। ওপাশ থেকে ওয়াহেজের সুমিষ্ট গলা ভেসে আসে। সালাম দিয়ে ভারী রসিকতার সুরেই বলে, “আসসালামু আলাইকুম। কী অবস্থা বেগম সাহেবা, সহিসালামতে পৌঁছে গেছেন তো?”
সালামের উত্তর দিয়ে আনভি যথাসম্ভব শান্ত, নির্বিকার গলায় বলে, “ওয়ালাইকুম আসসালাম। জি, এসে গেছি। আপনি কী করছেন? দুপুরের খাওয়া-দাওয়া শেষ?”
“জি হ্যাঁ, এইমাত্র খেয়ে উঠলাম। তুমি খেয়ে নিয়েছ তো? গতরাতে বলছিলে অনেক কষ্ট হয়েছে, এখন শরীর ঠিক আছে তো? নাকি আবার জ্বর-ট্বর বাঁধিয়ে বসবে?”

এ শুনে আনভি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। নিজের বিরক্তিটা সযত্নে লুকিয়ে বলে, “না, খাইনি। একটু পর খাব। আর শরীর ঠিক থেকে কী হবে শুনি? আপনি তো এক নির্লজ্জ পুরুষ, কাছে পেলে আবারও তো অসুস্থ করে দেবেন।”
ওয়াহেজ শব্দ করে হেসে ওঠে ওপাশে আর বলে “আরে, এরকম একটু-আধটু অসুস্থতা তো জায়েজ আছে, কোনো সমস্যা নেই!”
আনভি আর এই প্রহসন বাড়াতে চায় না। তাই শুকনো গলায় বলে, “আচ্ছা, আমি তাহলে রাখি। খালামণি খাবারের জন্য ডাকছেন। বাড়ি ফেরার সময় ফোন দেব।”
“আচ্ছা, রাখো। আর আসরের আগেই বাড়ি চলে এসো, ড্রাইভার চলে যাবে।”
“আচ্ছা। আসসালামু আলাইকুম।”
“ওয়ালাইকুম আসসালাম।”

কলটা কেটেই ফোনটা সজোরে বিছানার ওপর ছুঁড়ে মারে আনভি। বুকের ভেতর জমে থাকা রাগ আর বিরক্তিরা একসঙ্গে দলা পাকিয়ে ওঠেছে। অত্যন্ত তিক্ত স্বরে বিড়বিড় করে সে, “যত্তসব মিথ্যে আদিখ্যেতা!”

ফোনটা হাত থেকে নামিয়ে রেখেই আনভি এগিয়ে যায় আলমারির দিকে। অত্যন্ত সন্তর্পণে সেখান থেকে বের করে আনে সযত্নে লুকিয়ে রাখা কিছু ফাইল। এই জীর্ণ ফাইলগুলোর প্রতিটি পৃষ্ঠায় চাপা পড়ে আছে তার জন্মদাতা বাবার জঘন্য সব কুকীর্তির অকাট্য প্রমাণ। আনভি দীর্ঘদিন ধরেই লোকচক্ষুর আড়ালে বাবার প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর নজর রাখছে। সে মনেপ্রাণে চায়, তার বাবা তার প্রাপ্য শাস্তিটুকু পাক। মানুষ হিসেবে তিনি যে কতটা নিকৃষ্ট, তা আনভির চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না।

আনভির মনে পড়ে যায় তার জন্মের তিক্ত ইতিহাস। তার বাবা আর মায়ের বিয়েটা হয়েছিল তীব্র ভালোবাসার টানে। বেকার যুবক বাবার চাকরি পাওয়ার সাত মাসের মাথাতেই পৃথিবীতে আসে আনভি। কিন্তু জন্মের ঠিক দশ দিন পর তার মায়ের সামনে উন্মোচিত হয় এক নিদারুণ সত্য তার বাবা নিজের বসের মেয়েকে, অর্থাৎ সারার মাকে বিয়ে করেছেন। সেই চরম মুহূর্তে তাদের সাথে সমস্ত যোগাযোগ পর্যন্ত বন্ধ করে দেন তার বাবা। প্রতারণা আর অসহায়ত্বের ভার সইতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন আনভির মা। এই মর্মান্তিক ঘটনার পর বাবার তথাকথিত ‘বিবেক’ হয়তো কিছুটা জাগ্রত হয়। আনভির সমস্ত দায়িত্ব তিনি তুলে দেন তার খালামণির হাতে। শুধু প্রতি মাসে খরচের টাকাটা পাঠিয়েই নিজের দায় সারেন। আর খালামণি? আনভিকে বড় করতে গিয়ে তিনি নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় আত্মত্যাগটি করেন। আনভিকেই জীবনের কেন্দ্রবিন্দু মেনে নিয়ে, আজীবন অবিবাহিত থেকে যান।

আনভির কাছে তার বাবা এক চরম নিচু আর ঘৃণ্য সত্তা। লোকটা তাকে প্রকাশ্যে নিজের সন্তান হিসেবে স্বীকৃতিটুকু পর্যন্ত দেয় না। তার ওপর ড্রাগস পাচার, সন্ত্রাস সবকিছুর সাথেই সে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এককথায়, পাপকেই সে নিজের বাপ বানিয়ে নিয়েছে। বেড়ানোর নাম করে মাঝে মাঝে ওই বাড়িতে গিয়ে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে আনভি জোগাড় করেছে এই ভয়াবহ প্রমাণগুলো সরাসরি খুন আর ড্রাগস পাচারের বেশ কিছু ছবি আর নথিপত্র। ভেবেছিল, কোনো একদিন এগুলো তুলে দেবে প্রশাসনের হাতে। আজ সেই দিন। আনভি তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। এই ফাইলগুলো ও পৌঁছে দিবে ওয়াহেজের কাছে। এর মধ্যেই নিজের এক বান্ধবীর সাথে কথা বলে রেখেছে, আগামী কয়েকটা দিন সে তার কাছেই হোস্টেলে গিয়ে উঠবে। একদিকে বাবা ধরা পড়বে তার পাপের দায়ে, অন্যদিকে আনভি পাবে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন আর মুক্ত জীবন। প্রয়োজনীয় সমস্ত জিনিসপত্রই সে গুছিয়ে নিয়ে এসেছে নিজের সাথে। ঐ বাড়ি থেকে একেবারে চিরবিদায় নিয়ে, একটি নতুন ভবিষ্যতের দিকে চূড়ান্ত পা বাড়াতে যাচ্ছে আনভি।

আনভি এ বাড়িতে থাকা নিজের সমস্ত পোশাক একে একে গুছিয়ে ব্যাগে নিয়ে নেয়। প্রমাণস্বরূপ থাকা প্রতিটি জিনিসের ছবি নিজের কাছে যত্ন করে তুলে রাখে সে। এরপর একটি ছোট চিঠিসহ সবকিছু একটা খামে পুরে নেয়। ঠিক সেই মুহূর্তেই তাকে খাওয়ার জন্য ডাকতে ঘরে প্রবেশ করেন খালামণি। আনভিকে এভাবে ব্যাগ গোছাতে দেখে তার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। তিনি ভুরু কুঁচকে প্রশ্ন করেন, “কী রে, এসব ব্যাগে নিচ্ছিস কেন?”
আনভি চাইলেও এই মুহূর্তে তাকে সত্যিটা বলতে পারে না, সব খুলে বলা সম্ভবও নয়। তাই নিজেকে সামলে নিয়ে সে বলে, “আরে, এই তো এগুলো আমি নিজের বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছি।”
এ কথা শুনে খালামণি দু’পা এগিয়ে এসে বিছানায় বসেন এবং আনভিকে তার সামনে বসতে বলেন। আনভি বসতেই তিনি তার চোখের দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেন, “সংসার সুখে করছিস তো? ওয়াহেজ তোকে ভালো রাখছে তো? ও তোকে ঠিকঠাক সময় দেয় তো?”

খালামণির কথা শুনে আনভি ঠোঁটে এক চিলতে ম্লান হাসি ফুটিয়ে তোলে বলে, “হ্যাঁ, আমি খুব ভালো আছি। ওয়াহেজ আমাকে যথেষ্ট সম্মান আর মর্যাদায় রেখেছেন।”

এ কথা শুনে খালামণি স্বস্তির শ্বাস ফেলেন। আনভির মাথায় সস্নেহে হাত বুলিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, “যাক, তাহলে আমি নিশ্চিন্ত হলাম রে মা!” এরপর উঠে দাঁড়িয়ে তাগিদ দেন, “আয়, খাবার খেয়ে নিবি।”

আনভি শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়, “আচ্ছা, তুমি যাও, আমি আসছি।”

তিনি দরজা পেরোতেই আনভির মুখের মেকি হাসি মিলিয়ে গিয়ে এক ফ্যাকাশে শূন্যতা নেমে আসে। জীবন তাকে কখনোই সুখ দেয়নি, আজও দিল না। কী করে সে এখন খালামণিকে বোঝাবে যে, ওয়াহেজ কেবল নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্যই তার সাথে এই সংসারের নাটক করে চলেছে! সে আনভিকে ভালোবাসে না। আনভি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। চারপাশের সবকিছু তার কাছে ঘোলাটে মনে হয়। তার কেবলই মনে হতে থাকে, এই বুঝি ঘরের দেয়ালগুলো তার ওপর ধসে পড়ছে, মুহূর্তের মাঝেই বোধহয় সব ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে!

খালামণির মনে যাতে কোনো সন্দেহ না জাগে, তাই আনভি ওয়াহেজের পাঠানো গাড়িতে করেই বাড়ি থেকে বের হয়। তবে কিছুটা পথ পেরোতেই সে গাড়ি থেকে নেমে পড়ে। তার নিজের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো ভয় নেই, কারণ জনসমক্ষে কেউ জানেই না যে সে ওয়াহেজের স্ত্রী। গাড়ি থেকে নেমে আনভি সেই খামটা ড্রাইভারের হাতে তুলে দিয়ে নির্দেশ দেয়, খামটা যেন ওয়াহেজের হাতে পৌঁছে দেন। ড্রাইভার অনেক করে তাকে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার কথা বললেও আনভি সে কথায় কান দেয় না। তাকে বিদায় করে দিয়ে আনভি একটা রিকশা ডেকে নিজের এক বান্ধবীর হোস্টেলের দিকে রওনা হয়। নিজের জীবনের এই নাটকীয় পরিণতি দেখে তার হাসি পায়। কী তাড়াহুড়ো করেই না সব শুরু হয়েছিল, আর কী দ্রুতই সব শেষ হয়ে গেল! বাহ, কী অদ্ভুত এক জীবন তার! সে এখনো ঘোরগ্রস্ত হয়ে আছে। কি হলো আর হবে? বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে একটা সুন্দর সংসারের যে রঙিন স্বপ্ন সে বুনতে শুরু করেছিল, বাস্তব তার ঠিক উল্টো পিঠে এসে দাঁড়িয়েছে। আনভি আরেকটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে নিজেকে শক্ত করে নেয়।

এদিকে বাড়িতে আনভির জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে ওয়াহেজ। সে এই বিয়েটা মেনে নিলেও তার মনে কোথাও একটা গভীর সন্দেহ দানা বেঁধে আছে। তার মনে হচ্ছে, হয়তো এসবই ইয়াহিয়ার কোনো নতুন চাল। আর এই সন্দেহের পেছনে যথেষ্ট কারণও রয়েছে। ইয়াহিয়া দাবি করেছিল যে তার মেয়ে পালিয়ে গেছে, অথচ দেখা যায় ঠিক আজকের দিনের মালয়েশিয়া যাওয়ার টিকিট এক মাস আগেই কাটা হয়েছিল, যার পেমেন্ট ইয়াহিয়ার অ্যাকাউন্ট থেকেই করা। তাই ওয়াহেজ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, এসবই এক চক্রান্ত, আনভি নিশ্চয়ই তাকে ধোঁকা দেবে। সে এখন আনভির কাছ থেকে সেই চরম আঘাতটুকু পাওয়ার অপেক্ষাতেই প্রহর গুনছে। সব পরিষ্কার বুঝেও আনভিকে সে পুরোপুরি দোষীও ভাবতে পারছে না। আনভি ফুলের মতো স্নিগ্ধ, তার সরল মুখখানার দিকে তাকালে মনেই হয় না যে সে এমন কোনো প্রতারণা করতে পারে। তবে দুনিয়ার নিয়ম তো বড়ই অদ্ভুত, সহজ-সরল রূপের আড়ালেই তো সবচেয়ে বড় ক্ষতি লুকিয়ে থাকে! গত কয়েকদিনে এই আনভি তাকে আক্ষরিক অর্থেই পাগল করে তুলেছে। সে ধোঁকা দিক বা না দিক, ওয়াহেজকে সে নিজের মায়ায় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিয়েছে। কিছুক্ষণ আনভির চন্দ্রিমা-মাখা মুখখানা না দেখলেই ওয়াহেজের ভেতরটা অস্থিরতায় ছটফট করে ওঠে, বুক ধড়ফড় করে, শ্বাসটাও ঘন হয়ে আসে। তাই সে অধীর হয়ে অপেক্ষা করছে কখন আনভি আসবে, আর সে তার গন্ধে নিজেকে একটু রাঙিয়ে নেবে।বসে বসে যখন এসবই ভাবছে, ঠিক তখনই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হয়। আনভি এসেছে ভেবে ওয়াহেজ তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়িয়ে বলে, “খোলাই আছে, ভেতরে আসো।”

দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করেন ড্রাইভার। তাকে দেখে ওয়াহেজের ভ্রু কুঁচকে যায়। সে অবাক হয়ে প্রশ্ন করে, “আংকেল, আপনি? আমার ওয়াইফ কোথায়?”

ড্রাইভার ধীরপায়ে এগিয়ে এসে ওয়াহেজের দিকে সেই খামটা বাড়িয়ে দিয়ে বলেন, “স্যার, ম্যাডাম এই খামটা আপনাকে দিতে বললেন। তিনি আসেননি, মাঝরাস্তায় নেমে গেছেন। আমি অনেক করে বললেও তিনি আমার কোনো কথাই শোনেননি।”

কথাগুলো শুনে ওয়াহেজ আকাশ থেকে পড়ে। খামটা হাতে নিয়ে সে হতবিহ্বল কণ্ঠে ড্রাইভারকে বলে, “আপনি কী করে ওকে ওভাবে একা যেতে দিলেন আংকেল? এভাবে মাঝরাস্তায় তাকে ছেড়ে আসাটা আপনার একদমই উচিত হয়নি!”

“সরি স্যার! আমি ম্যাডামের কথার অবাধ্য হইনি। ভেবেছিলাম তিনি হয়তো নিজের কোনো দরকারে বাইরে যাচ্ছেন।”

“আচ্ছা, আপনি এখন যান। আমি দেখছি বিষয়টা।”

“জি, স্যার।”

ড্রাইভার রুম থেকে বেরিয়ে যেতেই ওয়াহেজের হাত-পা তিরতির করে কাঁপতে শুরু করে। আনভি কোথায় গেল? আর এই খামেই বা কী আছে? ধুকপুক বুকে ওয়াহেজ খামটা খোলে। ভেতরে থাকা জিনিসগুলো দেখতেই তার চক্ষু চড়কগাছ! সেখানে ইয়াহিয়ার করা জঘন্য সব পাপের স্পষ্ট প্রমাণ। কিছু ড্রাগস ডিলের সাইন করা ফাইল কোনো ছবিতে সে নিজের হাতে খুন করছে, কোনোটিতে লাশ গুম করার জন্য কবর খুঁড়ছে, আবার কোনোটিতে বসে আড্ডা দিচ্ছে ভারতীয় টেররিস্টদের সাথে। সব মিলিয়ে ইয়াহিয়ার গর্দান ফেলে দেওয়ার জন্য এটুকু প্রমাণই যথেষ্ট।
ওয়াহেজ তো মনে মনে এসবই খুঁজছে! সে ভেবে রেখেছিল, আনভি যদি সত্যি তার সাথে থাকে, তবে তাকে সব বুঝিয়ে বলে এমন কিছু প্রমাণ জোগাড় করবে। আনভি যেহেতু তারই মেয়ে, সে যে এত বড় কাজ করতে পারবে তা ওয়াহেজ আশাও করেনি। নিজে এত এত গোয়েন্দা লাগিয়েও সে কোনো পরিষ্কার প্রমাণ বের করতে পারেনি, আর আনভি একা হাতে তাকে এত কিছু এনে দিয়েছে! ছবি আর ফাইলগুলোর মাঝে একটা ভাঁজ করা চিঠিও পায় ওয়াহেজ। সবকিছু হাত থেকে নামিয়ে রেখে সে চিঠিটা খোলে। সেখানে তাকেই উদ্দেশ্য করে কিছু কথা লেখা,

প্রেসিডেন্ট সাহেব,
আপনার কাঙ্ক্ষিত প্রমাণগুলো তো অবশেষে আপনার হস্তগত হলো, তাই না? এই কাগজের ভাঁজে ভাঁজে যে আমার বাবার অপরাধের দলিলগুলো আছে, তা কি যথেষ্ট হয়েছে? যদি হয়ে থাকে তাহলে এবার অন্তত এই অকাট্য দলিলগুলো ব্যবহার করে আমার বাবা নামক নিষ্ঠুর মানুষটির প্রাপ্য শাস্তিটুকু নিশ্চিত করুন। তিনি তো এবার শাস্তি পাবেন, তাই না? আমার এই ভাঙা বুকের ওপর দাঁড়িয়ে যে খেলা আপনারা খেললেন, তার শেষটা যাতে অন্তত আপনার মনমতো হয়।

আমার কাছ থেকে আপনার যা কিছু প্রত্যাশা ছিল, আমি তা আপনার হাতে তুলে দিলাম। দিয়ে আমি বিদায় নিলাম। জানি আমর খুজ করবেন না। করেই বা কি করবেন? কি আর প্রয়োজন এই আমার এখন আপনার? আমি চলে যাচ্ছি আপনার জীবন থেকে কিন্তু চিরবিদায়ের বেলায় একটা কথা না বললেই নয় আপনি না আমার সাথে মোটেও সুবিচার করেননি প্রেসিডেন্ট সাহেব। একদমই ঠিক করেননি। এই যে একটা মিথ্যে সংসারের নিখুঁত নাটক আপনি দিনের পর দিন আমার চোখের সামনে সাজিয়ে গেলেন, আমাকে একবার বিন্দুবিসর্গও বুঝতে দিলেন না! এই নির্মম কপটতার কি খুব প্রয়োজন ছিল? আমার এই সম্বলহীন, কাঙাল নারীমনটাকে নিয়ে এমন নিপুণভাবে ছিনিমিনি না খেললেও কি আপনার উদ্দেশ্য সফল হতো না?

তবে আপনাকেই বা কী দোষ দেব! সব দোষ তো আমার এই কপালের। আমি আজন্ম এক হতভাগী, এক অভিশপ্ত জন্ম আমার। জন্মের পরপরই বাবা যখন অন্য কাউকে বিয়ে করে আমাদের ছুড়ে ফেললেন অস্বীকারের আস্তাকুঁড়ে, তারপর মা-ও যখন অভিমানে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করলেন, তখন এক পিতৃপরিচয়হীন অনাথ মেয়ে হিসেবেই বড় হয়েছি খালামণির আশ্রয়ে। বুকের ভেতর এক আকাশ শূন্যতা আর কষ্টগুলোকে যখন একটু একটু করে গুছিয়ে নিয়ে সদ্য নিজের মতো করে বাঁচতে শুরু করেছিলাম, ঠিক তখনই বাবার সাজানো এক নোংরা ষড়যন্ত্রের বলি হয়ে আপনার সাথে আমার বিয়েটা হলো। আমি জানি না বা আজও জানতে পারিনি, ঠিক কী স্বার্থে তিনি আপনাকে আমার স্বামী হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন, আর কেনই বা আমাকে দাবারুঁটি বানালেন!

আমার আজ কোনো কিছু নিয়েই আর কোনো অভিযোগ নেই, কোনো আক্ষেপ নেই। বুকের ভেতর শুধু একটাই চিনচিনে ব্যথা, যা আমাকে প্রতিনিয়ত কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে, যে আপনাকে আমি আমার গোটা দুনিয়ার কেন্দ্রবিন্দু ভেবেছিলাম। আমার জমাট বাঁধা অন্ধকারের জীবনে যে আপনি ছিলেন এক চিলতে রোদের মতো। দিনশেষে সেই আপনিটাও আমাকে শুধুমাত্র আপনার প্রয়োজন মেটানোর এক হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহার করে গেলেন! আমার সাথে যে নিখুঁত অভিনয় আপনি করেছেন, তার জন্য আপনাকে সাধুবাদ জানাই। সত্যিই খুব ভালো করেছেন। আপনাকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করে, নিজের সত্তার সবটুকু উজাড় করে দেওয়ার বিনিময়ে, এই যে এক ‘নাটকীয় সংসারের’ উপহার আপনি আমার হাতে তুলে দিলেন এর জন্য আমি আপনার কাছে আজীবন ঋণী হয়ে রইলাম।

আপনার সাথে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি ক্ষণ, আপনার বলা প্রতিটি কথা আমার কাছে ভীষণ সত্যি ছিল। আপনাকে আমি মন থেকে, অন্তরের একদম গভীর থেকে ভালোবেসেছিলাম। আপনি হয়তো আগাগোড়াই অভিনয় করে গেছেন, আপনার কাছে হয়তো সবটাই ছিল সময়ের প্রয়োজনে সাজানো এক ছক কিন্তু আমি আপনাকে ভালোবেসেছিলাম অন্তত এক মুহূর্তের জন্য হলেও আমি আপনাকে সত্যিই ভালোবেসেছিলাম।

খুব ভালো থাকবেন। আশা করি, আপনার উদ্দিষ্ট লক্ষ্যের জন্য এই প্রমাণগুলোই যথেষ্ট হবে। যাওয়ার আগে শেষবারের মতো শুধু একটা কথাই বলতে চাই, বিশ্বাস করুন প্রেসিডেন্ট সাহেব,
“হয়তো আমি অযোগ্য, কিন্তু প্রতারক নই!”

ইতি,

  • সামাইরা

চিঠির লেখাগুলো পড়ে ওয়াহেজ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তার মনে হচ্ছে চারদিকের দুনিয়াটা শোঁ শোঁ করে ঘুরছে। আনভিকে কি তবে সে হারিয়েই ফেলল? আনভি সব জেনে গেছে? কিন্তু কীভাবে জানল? তার মানে গতরাতে সাফির সাথে বলা কথাগুলো সে আড়াল থেকে শুনে ফেলেছে! আর এ জন্যই তার আচরণ এমন অদ্ভুত হয়ে গিয়েছিল।

ওয়াহেজ তড়িঘড়ি করে চিঠিটা পকেটে পুরে আনভির নাম্বারে ফোন দেয়। কিন্তু আনভির ফোন বন্ধ দেখাচ্ছে। সে আর এক মুহূর্তও দেরি করে না এভিডেন্সগুলো দ্রুত খামে ভরে নিজের ড্রয়ারে লক করে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে। আনভি যেখানেই যাক, দেশের ভেতরেই তো আছে! ওয়াহেজ তাকে ঠিকই খুঁজে বের করবে, তারপর সব বুঝিয়ে বলবে। আনভি নিশ্চয়ই তার কথা বুঝবে। নিজের গার্ড আর সিকিউরিটি নিয়ে ওয়াহেজ দ্রুত বেরিয়ে পড়ে। গাড়িতে উঠেই প্রথমে সে আনভির খালামণির কাছে ফোন দেয়। আনভি সেখানে আছে কি না, সেটাই তার প্রথম জানার বিষয় যদিও ও জানে আনভি সেখানে থাকবে না। ওয়াহেজের আন্দাজই ঠিক হয়, আনভি সেখানে নেই।

ওয়াহেজ আর এক মুহূর্তও দেরি করে না। ড্রাইভার আনভিকে ঠিক যেখানে নামিয়ে দিয়েছিল, সরাসরি সেই এলাকার ‘ত্রিনয়ন’ নেটওয়ার্কে যুক্ত হয় সে। শুরু হয় আনভির খোঁজ। তবে কী এই ত্রিনয়ন? কীভাবে এটি কাজ করে?

ক্ষমতায় আসার পর ওয়াহেজের প্রধান প্রতিশ্রুতিই থাকে একটি অপরাধমুক্ত, সুশৃঙ্খল ও আধুনিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা। চীনের ‘স্কাই নেট’ মডেল তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। সে বুঝতে পারে, কোটি মানুষের এই ঘনবসতিপূর্ণ দেশে শুধু প্রচলিত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে সবকিছু নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব। আর সেই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় তার যুগান্তকারী মেগা প্রকল্প ‘ত্রিনয়ন’।

এক অদৃশ্য ডিজিটাল চাদর বর্তমানে বাংলাদেশের প্রতিটি ইঞ্চি জমি মুড়িয়ে আছে অদৃশ্য এক ডিজিটাল চাদরে। টেকনাফের সমুদ্রসৈকত থেকে শুরু করে পঞ্চগড়ের চা-বাগান, পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি গলি থেকে গুলশানের অভিজাত এভিনিউ সবকিছু এখন একটিমাত্র কেন্দ্রীয় সার্ভারের হাতের মুঠোয়। দেশের প্রত্যন্ত মফস্বল পর্যন্ত সবখানে বসানো হয়েছে লাখ লাখ অত্যাধুনিক এআই-চালিত সিসিটিভি ক্যামেরা। রাস্তার মোড়, বাজারের অলিগলি, হাইওয়ে, এমনকি পাড়ার মুদির দোকানের সামনের রাস্তাও এই ‘ত্রিনয়ন’-এর তীক্ষ্ণ দৃষ্টির আওতাভুক্ত।

এই ক্যামেরাগুলো সাধারণ ক্যামেরার মতো শুধু ভিডিও রেকর্ড করে না। এগুলোর সাথে সরাসরি যুক্ত আছে ন্যাশনাল আইডি সার্ভার, পাসপোর্ট ডেটাবেস এবং রিয়েল-টাইম ফেসিয়াল রিকগনিশন সিস্টেম। এই প্রকল্পের প্রাথমিক ফলাফল রীতিমতো জাদুকরী। শহরের বিশৃঙ্খল ট্রাফিক ব্যবস্থা অভাবনীয়ভাবে শৃঙ্খলায় ফিরে আসে। কেউ সিগন্যাল অমান্য করলে বা ভুল পথে গাড়ি চালালেই ক্যামেরা তার গাড়ির নম্বর প্লেট ও চেহারা স্ক্যান করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে জরিমানার টাকা কেটে নেয়।
অপরাধ নিয়ন্ত্রণ হয়। ছিনতাই, চুরি বা ডাকাতির হার নেমে আসে শূন্যের কোঠায় কারণ অপরাধ করে পালানোর কোনো পথই আর খোলা নেই।
দ্রুত উদ্ধার করা যায় যে কোনোকিছু। একটা বড় রেলওয়ে স্টেশন থেকে হারিয়ে যাওয়া একটি পাঁচ বছরের শিশুকে মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল। ত্রিনয়নের এআই শহরের হাজার হাজার মানুষের ভিড়ে শিশুটিকে এবং অপহরণকারীকে নিখুঁতভাবে শনাক্ত করে কাছের পুলিশ টহল দলকে অ্যালার্ট করে দিয়েছিল। নিরাপত্তার এই সুফল সবাই উপভোগ করলেও, মুদ্রার অপর পিঠ ধীরে ধীরে নাগরিকদের জীবনে প্রভাব ফেলতে শুরু করে। ওয়াহেজ নাগরিকদের আচরণ নিয়ন্ত্রণের জন্য চালু করেছে একটি ‘ডিজিটাল নাগরিক স্কোরিং সিস্টেম’। রাস্তায় যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলা, জেব্রা ক্রসিং ছাড়া রাস্তা পার হওয়া বা প্রকাশ্যে তীব্র ঝগড়া করার মতো বিষয়গুলো ক্যামেরায় ধরা পড়লেই নাগরিকদের ব্যক্তিগত স্কোর কমে যায়। স্কোর কমে গেলে ট্রেনের টিকিট পেতে সমস্যা হয়।ব্যাংক লোন বা সরকারি সেবা পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।মানুষের মধ্যে সারাক্ষণ একধরনের অদৃশ্য সতর্কতাবোধ কাজ করে। আড্ডায়, চায়ের দোকানে বা পার্কে হাঁটার সময় সবাই জানে উপর থেকে ‘ত্রিনয়ন’ সবসময় তাদের দেখছে। ওয়াহেজের শাসনামলে বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ দেশে। মাঝরাতে একজন সাধারণ মানুষ নিশ্চিন্তে নির্জন রাস্তা দিয়ে হেঁটে বাড়ি ফিরতে পারে, যা একসময় কল্পনাও করা যেত না। ‘প্রকল্প ত্রিনয়ন’ দেশের চেহারা পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। এই মেগা প্রকল্পের সবচেয়ে বড় চমক হলো এর সম্পূর্ণ দেশীয় উৎপাদন। ওয়াহেজ বিশ্বাস করে, জাতীয় নিরাপত্তার মতো স্পর্শকাতর জায়গায় অন্য কোনো দেশের প্রযুক্তি ব্যবহার করা চরম আত্মঘাতী। বিদেশি চিপ বা সফটওয়্যারে গোপন কোড বা ‘ব্যাকডোর’ থাকতে পারে, যা দিয়ে চাইলেই অন্য দেশ তথ্য চুরি বা পুরো সিস্টেম বিকল করে দিতে পারে।

এই ঝুঁকি এড়াতে দেশের সেরা প্রকৌশলী, এআই বিশেষজ্ঞ এবং তরুণ বিজ্ঞানীদের এক ছাদের নিচে নিয়ে আসে সে। ত্রিনয়নে ব্যবহৃত এআই অ্যালগরিদম, মাইক্রোচিপ, ডেটা সার্ভার থেকে শুরু করে ক্যামেরার হার্ডওয়্যার পর্যন্ত সবকিছুই শতভাগ বাংলাদেশের মানুষের হাতে তৈরি। বাইরের দেশের ওপর নির্ভরশীলতা যেমন শূন্যের কোঠায়, তেমনি হ্যাকিং বা তথ্য পাচারের ঝুঁকি থেকেও দেশ সম্পূর্ণ সুরক্ষিত। প্রযুক্তি বিশ্বে বাংলাদেশ আজ আত্মপ্রকাশ করেছে এক নতুন পরাশক্তি হিসেবে। আর এই পরাশক্তির নিখুঁত সিস্টেম ব্যবহার করে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই ওয়াহেজ বের করে ফেলে আনভি ঠিক কোথায় আছে। স্ক্রিনে আনভির লোকেশন দেখার পর আর এক মুহূর্তও বসে থাকে না ওয়াহেজ। আনভির খোঁজে একাই বেরিয়ে পড়ে ওয়াহেজ। পরনে সাধারণ একটা গাঢ় রঙের হুডি, মুখ ঢাকা কালো মাস্কে মাথায় ক্যাপ। দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী হয়েও আজ সে নিতান্তই একজন সাধারণ মানুষের বেশে রিকশায় চড়ে এসে থামে সেই মহিলা হোস্টেলের বিশাল গেটের সামনে।

কিন্তু মূল ফটকেই পথ আটকে দাঁড়ায় কর্তব্যরত সিকিউরিটি গার্ড। কড়া গলায় জানিয়ে দেয়, কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো পুরুষের ভেতরে প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষেধ। অদ্ভুত এক বিড়ম্বনায় পড়ে যায় ওয়াহেজ। এই কড়া নিয়মটা খোদ তারই হাতে তৈরি! নারীদের নিরাপত্তার জন্য যে আইন সে নিজেই জারি করেছিল, আজ নিজের তৈরি সেই আইনের বেড়াজালেই অসহায়ভাবে আটকে গেছে সে। শত চেষ্টা করেও ভেতরে ঢোকার কোনো উপায় মেলাতে পারছে না। নিয়মের সামান্য এদিক-ওদিক হলেই গার্ডের স্কোর কাটা যাবে, গুণতে হবে কড়া জরিমানা। তাই হাজারো অনুনয়-বিনয়েও লোকটিকে একটুও টলানো যাচ্ছে না।
ওয়াহেজ চারপাশটায় একবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বুলিয়ে নেয়। না, ধারেকাছে জনপ্রাণীর কোনো আনাগোনা নেই। চারপাশ নিরাপদ বুঝতে পেরে সে ধীরহাতে মাথার টুপি আর মুখের মাস্কটা সরিয়ে ফেলে। এ দেখে গার্ডের চোখের দৃষ্টি স্থির হয়ে যায়, পায়ের তলার মাটি মুহূর্তেই সরে যায় তার! যে লোকটা এতক্ষণ কড়া ভাষায় নিয়ম শেখাচ্ছিল, স্বয়ং প্রেসিডেন্টকে নিজের সামনে সশরীরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারে না। ঢোক গিলে, তোতলাতে তোতলাতে ‘স্যার, স্যার’ করে মুখে ফেনা তুলে ফেলে সে।
লোকটার ঘাবড়ে যাওয়া অবস্থা দেখে ওয়াহেজ নিজেই এগিয়ে যায় গিয়ে অত্যন্ত সাবলীল ভঙ্গিতে তার কাঁধে হাত রেখে শান্ত স্বরে বলে, “আপনি একদম ঘাবড়াবেন না। আমি এখানে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত একটি কাজে এসেছি। আমার আসার কথাটা দয়া করে গোপন রাখবেন। আমাকে শুধু একটা তথ্য দিয়ে সাহায্য করুন।”
গার্ডের হাত-পা এখনও থরথর করে কাঁপছে। এত বড় একজন মানুষের সান্নিধ্যে নিজেকে সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে কাঁপা কাঁপা গলায় সে বলে, “জি স্যার… ব-বলুন, কী জানতে চান?”
ওয়াহেজ এবার আরেকটু ভরসা জোগাতে তার অন্য কাঁধে হাত রেখে মৃদু হেসে বলে, “ভয় পাচ্ছেন কেন? আমি তো আপনার ছেলের বয়সি। আচ্ছা, আজ আসরের পর পাঁচটা নাগাদ এখানে নতুন কেউ কি এসেছে?”
গার্ড কিছুটা আমতা আমতা করে উত্তর দেয়, “নতুন আর পুরোনো তো আলাদা করে বোঝা যায় না স্যার। এখন তো দেশের নিয়মানুযায়ী সবাই পর্দার ভেতরেই থাকেন, তাই চেহারা দেখে চেনা দায়। তবে হ্যাঁ, আজ আসরের পর একজন নতুন এসেছেন। তিন নম্বর ফ্লোরের পাঁচ নম্বর রুমে উঠেছেন তিনি। আপাদমস্তক কালো বোরখায় ঢাকা ছিলেন, তার ভারী ব্যাগ আমি নিজেই রুমে দিয়ে এসেছি।”
কথাটা শোনামাত্রই ওয়াহেজের বুকের ভেতরটা স্বস্তিতে ভরে ওঠে। বুঝতে আর বাকি থাকে না যে, এই মেয়েটিই তার আনভি। ও গার্ড কে বলে, “আমি ভেতরে ওনার কাছেই যাচ্ছি। উনি আমার স্ত্রী। ওনার সাথে আমার জরুরি কিছু কথা আছে। মনে রাখবেন, আমার এখানে আসার ব্যাপারটা যেন কেউ ঘুণাক্ষরেও টের না পায়।”
গার্ড মন্ত্রমুগ্ধের মতো দ্রুত মাথা নেড়ে সায় দেয়, “জি আচ্ছা, স্যার।”
এ বলে বিড়বিড় করে ‘বিসমিল্লাহ’ পড়ে ধীর পায়ে গেটের ভেতরে প্রবেশ করে ওয়াহেজ। বুকের ভেতর বাজছে হাজারো অনুভূতির দামামা। নিজের সাংসারিক জীবনে সে কোনোভাবেই অশান্তির কালো ছায়া পড়তে দিতে রাজি নয়। রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুদায়িত্ব আর হাজারো ব্যস্ততার মাঝে নিজের সংসারটা সে কিছুতেই ভাঙতে দেবে না। আজ যদি আনভির পায়ে ধরেও ক্ষমা চাইতে হয়, সে বিনা দ্বিধায় তাই করবে। নিজের অভিমানী সামাইরা কে বুঝিয়ে-শুনিয়ে নিজের সাথে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। এত সুন্দর একটা জীবনের সূচনায় কোনোভাবেই সে বিচ্ছেদের করুন উপসংহার টানতে দেবে না।

চলবে….

4k হলে গল্প পাবেন আর গঠনমূলক মন্তব্য করে যান প্রিয়-রা 🤍🌷

Share On:

TAGS:



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply