প্রেয়সীর_অনুরাগ
লেখনিতে —#সাদিয়াজাহানসিমি
পর্ব_১৩
বাড়ির সকলের খাওয়া দাওয়ার পাট চুকলো। উদ্যানের নানার বাড়ির আত্মীয় স্বজন ড্রইং রুমে বসেছে। ছোটরা খেয়ে সবে উপস্থিত হয়েছে। রাফসা উপরে যেতে নিলেই উদ্যানের মামি শাহিদা বিবি ওকে কাছে ডাকে। রাফসা গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেল সেইদিকে। উনি রাফসার এক হাত ধরে নিজের পাশে বসিয়ে দেয়। রাফসার চুলে হাত বুলিয়ে বলে, “রাফসা মামনি, দেখতে দেখতে কত বড় হয়ে গেছে। সেই দিন দেখেছি, আর আজ যেন চোখের পলকে বড় হয়ে গিয়েছে।”
ওনার কথায় রাফসা আলতো হাসে। তারপর রাফসার ফুফুর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে, “আপা, আপনার বড় মেয়ে মিম কোথায়? ওকে তো দেখলাম না।”
জোহরা মির্জা মুখে পান গুঁজে দিয়ে কয়েকবার নাড়াচাড়া করে বলে, “মেয়ের ভার্সিটিতে আজ পরীক্ষা আছে। তাই এখানে আসতে পারেনি। আসবে, ঘুরে যাবে একদিন। মামাবাড়ি আসে না অনেক দিন মেয়েটা ।”
শাহিদা বিবি এইবার উদ্যানের পানে তাকালো। তড়িৎ কন্ঠে শুধায়, “উদ্যান, তুমি বিয়ে করবে কবে? বয়স তো আর কম হলো না। আল্লাহর রহমতে ভালো পজিশনে আছো। জলদি করে বিয়েটা সেরে নাও। নাতি নাতনির মুখ দেখে মন শান্ত করি।”
উদ্যান সবেই মুখে সেভেন আপ খাচ্ছিল। উনার কথা শুনে তা নিমিষেই মুখ থেকে বেরিয়ে এলো। উদ্যান সমান তালে কাশতে থাকে। বেচারার নাক মুখ জ্বলে যাচ্ছে। রোহান ওর পাশেই বসা ছিল। তড়িঘড়ি করে উদ্যানকে সামনের টেবিল থেকে পানি দিল। উদ্যান পানি খাওয়ার সময়টুকু পাচ্ছে না। সমানতালে কাশতে থাকে। পানি খেয়ে নিজেকে একটু স্বাভাবিক করে। দমটা যেন এক্ষুনি বেরিয়ে যাচ্ছিল।
“হ্যাঁ, অবশ্যই বিয়ে করবে আমাদের উদ্যান। ওর জন্য মেয়ে দেখা শুরু করে দেবো খুব শীঘ্রই। আটাশ বছর তো প্রায় শেষের দিকে।”
আব্বাস ফরাজীর কথা শুনে উদ্যান তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো ওনার পানে। হাতের মুঠোয় ধরে রাখা গ্লাসটা শক্ত করে চেপে ধরল। যেন এক্ষুনি তা ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে। গ্লাসের পুরো পানিটুকু একপলকে শেষ করে। ঠোঁটে বাঁকা হাসি এনে বলে, “আমার বিয়ের জন্য আপনাদের মেয়ে দেখতে হবে না বড় আব্বু। আপনি বরং রোহানের জন্য একটা সুপাএি খুঁজে বের করুন। আপনার চারদিকে হাত আছে, নিমিষেই একটা ভালো মেয়ে খুঁজে পাবেন।”
আব্বাস ফরাজী ফিসলে হাসে। উদ্যান ও তাকিয়ে আছে। দুজনের চোখে চোখে কথা হচ্ছে যেন। উনি শুধালেন, “এটা কেমন কথা বাপ! তুই বাড়ির বড় ছেলে। আর তোকে বিয়ে না করিয়ে রোহানকে বিয়ে করাই কি করে? মানুষ পরে বলবে, বাড়ির বড় ছেলের নিশ্চয়ই কোনো সমস্যা আছে। তাই তোর জন্য আগে মেয়ে দেখবো।রোহান পরে।”
উদ্যান মুচকি হাসে। চুলে হাত বুলিয়ে বলে, “আমার সমস্যা তো অবশ্যই আছে। তবে সেটা অন্যরকম। আমাকে নিয়ে টেনশন করবেন না বড় আব্বু।”
উদ্যানের মা আঁতকে উঠলেন ছেলের কথা শুনে। রাফসাও অবাক হয়েছে বটে। এই লোকের কিসের সমস্যা আবার। রাহেলা ফরাজী জড়ানো কন্ঠে বলল, “কি সমস্যা তো বাবা? শারীরিক কোনো সমস্যা? তাহলে এখনো বসে আছিস কেনো? জলদি হসপিটালে যা। আমি নাতি নাতনির মুখ দেখা ছাড়া মরতে পারব না।”
মায়ের কথায় নিমিষেই হতভম্ব হয়ে যায় উদ্যান। কি বলছে ওর মা। শারীরিক সমস্যা! এতো দূরে চলে গেল। রোহান রিশান মুখ চেপে হাসছে। রোহান উদ্যানকে খোঁচা দিয়ে ভ্রু নাচালো। রাহেলা ফরাজী নিজেও ভরকেছে। হুট করে মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেছে। উদ্যান রোহানকে চোখ রাঙানি দিল। রোহান তা দেখে ঠোঁট চেপে হাসছে।
“কাকি, আমাদের উদ্যানের একটা মেয়ে আছে। তোমরা বোধহয় তা জানো না। দেখতে একদম হুবহু উদ্যানের মতো।”
মুহূর্তেই ড্রইং রুমে যেন বোম ফাটালো রোহান। সবার চক্ষু চড়কগাছ। ওনাদের ধারণা উদ্যান তিনবছর দেশের বাইরে ছিল। ওখানেই বোধহয় উদ্যান বিয়ে করে নিয়েছে। আর একটা মেয়েও হয়েছে। রাহেলা ফরাজী আঁচল ধরে গুণগুণ করে কেঁদে উঠলো। ওনার একটা মাএ ছেলে এভাবে না জানিয়ে বিয়ে করে নিল।সবার চোখ এখন উদ্যানের পানে নিবদ্ধ। উদ্যান গরম চোখে রোহানের পানে তাকালো। ধুম করে ওমনি পিঠ বরাবর একটা বসিয়ে দেয়।দাঁত কিড়মিড় করে বলে, ফাজলামো করিস? মা’র খেতে না চাইলে চুপ থাক ।”
উদ্যানের জিম করা হাতে এক কিল খেয়েই রোহানের প্রাণ বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম। পিঠ বোধহয় ভেঙেই দিল। এক হাত দিয়ে পিঠ ঘষে উদ্যানের পানে কিছুটা চেপে ধীর কন্ঠে শুধায়, “তোর বউয়ের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। তোর বউয়ের জন্য কষ্টে আমার বুক ফেটে যাচ্ছে। দুঃখ পেলাম তোর বউয়ের জন্য।”
উদ্যান এ কথা শুনে গরম চোখে ফের তাকায়। ওমনি ধুম করে আরেকটা পড়ে। রোহান এইবার টাকি মাছের মতো লাফ মেরে উঠল। “ওই মামা আর না। আল্লাহ, এই আজরাঈলকে জিম করতে বলে কে। আমার পিঠ ইন্না লিল্লাহ। ও রাফসা তুই কিছু বল।”
রাফসা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। এসব দেখতে বিরক্ত লাগছে ওর । তাই আর বসে থাকেনি। গটগট পায়ে স্থান ত্যাগ করে। রোহান বেকুবের মতো তাকিয়ে রইল। এই কার কাছে সাহায্য চাইল।
“তুই এটা কি করে করলি বাবা? আমাদের না জানিয়ে বিয়ে করে ফেললি? তাও আবার তোর একটা মেয়ে আছে।”
এটা বলেই ওনি পুনরায় চোখের পানি ছেড়ে দেয়। উদ্যান ভারী বেজার। কন্ঠে হতাশা এনে বলে, “মা, কি বলছো এইসব? আমি তোমাদের না জানিয়ে বিয়ে করবো, তোমার মনে হয়?”
“মা , প্লিজ। ভাইয়ার কথা শোনো। মেজো ভাইয়া মজা করে বলেছে। তুমি ও বিশ্বাস করে নিলে।”
ঊষার কথায় ওনি চোখ মুছে। দুই জা মিলে ওনাকে শান্তনা দেয়। নাক টেনে শুধায়, “তাহলে রোহান বলল যে মেয়ে আছে? এটা কি ছিল!”
উদ্যান উঠে দাঁড়ায়। এখানে থাকলে মাথা আরো বিগড়ে যাবে। ঘাড় ঘুরিয়ে রোহানের পানে চেয়ে চোখ রাঙানি দিল। রোহান তা দেখে শুকনো ঢোক গিলে। জন্মের শিক্ষা হয়েছে আছে। ফিচলে হেসে আমতা আমতা করে বলে, “কাকি, আমি অ্যাশের কথা বলছি। আসলে, আমাদের উদ্যান আর অ্যাশের গায়ের রং সাদা। তাই বলেছি, অ্যাশ ওর মেয়ে।”
সবাই হতবাক। এতোক্ষণে বোধহয় নিঃশ্বাস ফেলে। রোহানের মা চোখ গরম করে হুমকি দিল রোহানকে।
“বাইরে একটা কুকুর ঘুরা ঘুরি করে।ওটা বোধহয় তোর ছেলে। হাইট,ওয়েইট, কালার সব দিক দিয়ে তাই মনে হয়।”
উদ্যানের কথায় সবাই উচ্চস্বরে হেসে উঠলো। রোহানের চোখ কপালে। চেঁচিয়ে বলল, “মিছা কথা কইবি উদ্যান, আসমানডা ভাইঙ্গা পড়বো তোর উপ্রে।ঠাডা মিছা কথা।”
রোহানের মুখে এই ভাষা শুনে ওদের হাসির মাএা বেড়ে যায়। উদ্যান রোহানকে চোখ মেরে জায়গা প্রস্থান করে।
অতিথিরাও বিদায় নিয়েছে।
বিকেল সাড়ে পাঁচটার কোটায়,,
রাফসা বোরকা পরে রেডি হচ্ছে। ছয়টায় জিনিয়ার কাছে গিয়ে পড়বে। মাইশারা চলে গেছে। শুধু মাহিন আছে এই বাড়িতে। ও কাল যাবে। ফরাজী বাড়ির কিছু মানুষ কাল ও বাড়ি যাবে। রাফসা রেডি হয়ে নিচে নেমে আসে। ঊষা আর রোহান বাদে ড্রইং রুমে কেউ নেই। সবাই এখন রুমে রেস্ট করছে। রাফসা এসে বলে, “চলো ভাইয়া, ছয়টা বেজে যাচ্ছে।দেরি হয়ে যাবে পরে।”
রোহান উঠে দাঁড়ায়। পকেট থেকে গাড়ির চাবি বের করে তাড়া দিয়ে বলল, “হ্যাঁ, চলো। তোকে দিয়ে একটু অফিসে যাবো। রিশান একাই সব সামলাচ্ছে। আমি আজ যাবো। আবার তোকে আনতে হবে। চল তাড়াতাড়ি।”
রাফসা মাথা নাড়িয়ে বলল, “সমস্যা নেই ভাইয়া। আমি একা চলে আসতে পারবো। অনেক দিন হয় রিকশায় উঠি না। আজ রিকশা করে বাড়ি ফিরব।”
“তুই একা পারবি?”
“হ্যাঁ পারবো। তুমি চিন্তা করো না।”
“আপু যাচ্ছি।”
কথাটা ঊষাকে উদ্দেশ্য করে বলে বেরিয়ে যায় ওরা।
উদ্যান সবেই ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামে। বাইরে যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে নেমেছে।পরনে ডার্ক ব্লু জিন্স, শরীরের সঙ্গে মানানসই করে ফিট করা। উপরে হালকা কালো রঙের টি-শার্ট, বুকের কাছে কোনো বাড়তি নকশা নেই, তবু ওর প্রশস্ত বুক আর শক্ত কাঁধ আপনাতেই চোখে পড়ে।
পায়ে সাদা স্নিকার্স, পরিষ্কার আর ঝকঝকে। বাম হাতে কালো স্ট্র্যাপের ঘড়ি, সময়ের চেয়ে স্টাইলটাই যেন বেশি বলে দেয়। চুলগুলো কপালের উপর একটু এলোমেলোভাবে পড়ে আছে। হালকা চাপ দাড়ি মুখটাকে আরও পরিণত দেখায়।
নিচে নামতেই এক মুহূর্ত থামে উদ্যান। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে গভীর একটা শ্বাস নেয়। বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে যাবে উদ্যান। দরজার পানে নজর যেতেই দেখে রোহান রাফসা মাএ বেরিয়েছে। উদ্যান ঊষার পানে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, “কোথায় যাচ্ছে ওরা?তাও এই সন্ধ্যায়!”
ঊষা টেবিলের উপর রাখা নিজের ফোনটা হাতে তুলে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। “রাফসা প্রাইভেটে যাচ্ছে। মেজো ভাইয়া দিয়ে আসবে।”
ঊষার কথায় উদ্যানের কুঁচকানো ভ্রু শিথিল হয় খানিক। বাইরের উদ্দেশ্যে পা চালাতেই বোনের ডাকে পেছনে ফিরে। ঊষা নিজেকে প্রস্তুত করে, জিভ দিয়ে ঠোঁটের অগ্রভাগ ভিজিয়ে জড়তা নিয়ে বলল, “ভাইয়া, রাফসার সাথে কি তোমার কোনো ঝামেলা? ও তোমাকে দেখতেই পারে না। তোমার নাম শুনলেই ফোঁস করে উঠে।”
বোনের হঠাৎ এই কথায় কিছুটা ভড়কে যায় উদ্যান। জিভ দিয়ে গাল ঠেললো। গম্ভীর কন্ঠে শুধায়, “আমাকে দেখতে না পারলে চোখে কাপড় বেঁধে রাখতে বলবি। আর ফোঁস ফোঁস করে উঠে কেনো, সেটা তুই খুব ভালো করেই জানিস।”
ভাইয়ের কথায় ভড়কালো ঊষা। বড় ভাইয়ের এসব কথা শোনা বা বলা ভালো দেখায় না। উদ্যান আর কিছু বলেনা। বোনের পানে এক নজর তাকিয়ে চলে গেল। উদ্যান যেতেই লম্বা লম্বা কয়েকটা শ্বাস নিল ঊষা।
অফিসের ভেতরটা সন্ধ্যার ব্যস্ততায় ভরে আছে। কাঁচের জানালা দিয়ে বাইরের নরম আলো ঢুকে পড়েছে। সাদা আলো আর কম্পিউটারের স্ক্রিনের নীল আভা মিলে একধরনের গম্ভীর পরিবেশ তৈরি করেছে। চারদিকে কিবোর্ডের টুপটাপ শব্দ, প্রিন্টারের একটানা গুঞ্জন, আর মাঝেমধ্যে ফোনের রিং—সব মিলিয়ে কাজের চাপা সুর।
রিশান নিজের ডেস্কে বসে আছে। পরিপাটি শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গুটানো, ঘড়ির কাঁটায় সময়ের তাড়া স্পষ্ট। টেবিলের উপর সাজানো ফাইলের স্তূপ, পাশে খোলা ল্যাপটপ, স্ক্রিনে সারি সারি লেখা আর গ্রাফ। এক হাতে মাউস, অন্য হাতে কলম—মাঝে মাঝে কাগজে কিছু নোট নিচ্ছে। চোখে তার একাগ্রতা, ভ্রু দুটো সামান্য কুঁচকে আছে, যেন প্রতিটা লাইনের ভেতর সে সমাধান খুঁজে বেড়াচ্ছে।
কফির মগটা ঠান্ডা হয়ে পাশে রাখা, তবু সে খেয়াল করে না। কাজের ভেতর ডুবে আছে রিশান। মাঝে মাঝে চেয়ারে হেলান দিয়ে গভীর শ্বাস নেয়, আবার সোজা হয়ে বসে দ্রুত টাইপ করতে থাকে। এমন সময় কেবিনের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে ফারিয়া। এই অফিসেই কাজ করে দীর্ঘ দিন ধরে। রিশান অফিসে জয়েন হওয়ার আগে বহুবার এসেছে। টুকটাক কাজ শিখেছে। রিশানকে দেখে অজান্তেই প্রেমে পড়েছে ফারিয়া নামের মেয়েটি। ও এসে রিশানের সামনে দাঁড়ালো। হাতের ফাইলগুলো ডেস্কে রাখে। রিশান মাথা তুলে তাকালো। তবে কিছু বলল না। পুনরায় কাজে মন দেয়। ফারিয়াকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রিশান ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে, “কিছু বলবেন মিস ফারিয়া? কোনো সমস্যা?”
ফারিয়া অনবরত হাত কচলাচ্ছে। রিশানকে আজ যে করেই হোওক মনের কথা জানাতে হবে। এসি চলা সত্ত্বেও কপালের চারপাশে ঘেমে গেছে।
“স্যার, আমার বাড়ি থেকে বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছে।”
ফারিয়ার কথা শুনে রিশান টাইপিং করতে করতে হেসে বলে, “এতো সুখবর। বিয়ের দাওয়াত দিবেন অবশ্যই।”
রিশানের কথায় নিমিষেই মুখটা কালো হয়ে গেল ফারিয়ার। “স্যার আমি বিয়ে করতে চাইছি না। আমার আপনাকে ভালো লাগে। আমি ভালোবাসি আপনাকে।”
ফারিয়ার কথায় চলন্ত আঙুল গুলো থেমে গেল কিবোর্ডের উপর। শান্ত দৃষ্টিতে ওর দিকে না তাকিয়েই বলে, “ভালোবাসতে থাকেন। আমি ও একজন কে ভালোবাসি।”
রিশানের কথায় ফারিয়ার বুকটা ধক করে উঠল। ওর ভালোবাসার মানুষের অন্য একজন ভালোবাসার মানুষ আছে। ফারিয়া আর এক মুহূর্ত দাঁড়ায়নি। দৌড়ে বেরিয়ে যায় কেবিন থেকে। রিশান দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ও আগেই বুঝতে পেরেছিল।
কল্যাণ সমিতির পুরোনো ঘরটা অদ্ভুত এক ভারী পরিবেশে ভরা। দেয়ালের রং খসে পড়েছে, সিলিং ফ্যানটা ধীরে ঘুরছে, বাতাসে ধোঁয়ার গন্ধ জমে আছে। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে আভিয়ান।
কালো শার্ট, উপরের দুইটা বোতাম খোলা। গলার কাছে হালকা ঘাম, কবজিতে স্টিলের ঘড়ি, হাতে সিগারেট। ধোঁয়াটা ঠোঁট ছেড়ে ধীরে ধীরে ওপরে উঠে ছাদের দিকে মিলিয়ে যায়। চোখে তার কোনো তাড়াহুড়ো নেই—শান্ত, ঠান্ডা, কিন্তু ভেতরে জমে থাকা আগুনটা স্পষ্ট।
শরীরের ড্রেস আপ নিখুঁত। চওড়া কাঁধ, শক্ত বুক, শার্টের নিচে চাপা পেশির রেখা বোঝা যায়। দাঁড়ানোর ভঙ্গিটাই বলে দেয়—এ জায়গায় সে কর্তৃত্ব করে।
তার সামনে এক ছেলে হাঁটু গেড়ে পড়ে আছে। মুখে ভয়, চোখে অসহায়তা। আভিয়ানের লোকদের একজন তাকে ধরে রেখেছে, আরেকজন বেদম মারধর করছে। ঘুষি পড়ছে, শব্দটা ঘরের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। ছেলেটার গোঙানি ধোঁয়ার সাথে মিশে ভারী হয়ে উঠছে।
আভিয়ান একটুও নড়ে না। শুধু সিগারেটের ছাইটা ধীরে ঝেড়ে ফেলে। চোখ তুলে তাকায়, কণ্ঠস্বর নিচু কিন্তু ধারালো—
“আমার মায়াবকে টিজ করার শাস্তি। তোর কলিজা আছে, আভিয়ানের মায়াবী কে ডিস্টার্ব করলে এর ফল এমনই হয়।”
কথা শেষ হতেই সে আরেক টান দেয়। ধোঁয়ার আড়াল থেকে তার চোখ দুটো আরও ভয়ংকর লাগে। এই মুহূর্তে কল্যাণ সমিতির ঘরটা যেন শুধু মারধরের জায়গা নয়—এটা আভিয়ানের ক্ষমতার নীরব।
রাফসাকে জিনিয়া কোনো রকম একা ছাড়তে চায়নি। তাই ওর ভাইকে দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেও একটা রিকশা ও পাওয়া যাচ্ছিল না। তাই বাধ্য হয়ে হেঁটে হেঁটেই যাচ্ছে বাড়িতে। রাফসা আর জিনিয়ার ভাই শামীম এইচএসসি পরীক্ষায় একই সেন্টারে পড়েছিল। দুজন দুজনকে দেখে চিনতে পেরেছে। শামীম ও মেডিকেলের জন্য প্রিপারেশন নিচ্ছে।
দুজন হেসে হেসে কথা বলতে যাচ্ছে। ঠিক সেসময় উদ্যান বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে এ রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফিরছে। নিরিবিলি জায়গায় ওর চোখ আঁটকে গেল রাফসার উপর। ছেলের সাথে হাসতে হাসতে হাঁটছে। উদ্যান থমকে দাঁড়ায়।
“তুমি চলে যাও। আমি যেতে পারব। আর আসতে হবে না।”
শামীম রাফসার কথায় ঘোর বিরোধীতা করে বলে, “এখনো অনেকটা রাস্তা বাকি আছে। একা আমি ছাড়বো না। চলো, আমি এগিয়ে দিচ্ছি তো।”
ওদের কথা বলার মাঝেই হঠাৎ কেউ সামনে এসে দাঁড়ায়। ওরা কথা বলাই খেয়াল করেনি। দাঁড়িয়ে পড়ল দুজনে। উদ্যান কে এখান দেখে ভ্রু কুঁচকালো রাফসা। শামীম উদ্যান কে দেখেই চিনতে পেরেছে। হেসে সালাম দিল। উদ্যান অনেক আগে দেখেছিল শামীম কে তাই চিনতে পারেনি।
“আচ্ছা, তুমি চলে যাও। ওকে আমি নিয়ে যাচ্ছি।”
শামীম হেসে ওদের থেকে বিদায় নিয়ে চলে যায় । শামীম চলে যেতেই উদ্যান চোখ ঘুরিয়ে রাফসার পানে তাকালো। রাফসা ধীরে ধীরে হাঁটছে। উদ্যান ওর পেছনে পেছনে। রাফসা এতে ভারী বিরক্ত । কিছু বলতেও পারছে না। ইচ্ছে করে না কথা বলতে এই লোকের সাথে। পেছন থেকে উদ্যান ভারী কন্ঠে বলে, “রাস্তায় ছেলেদের সাথে এতো হেসে কথা বলিস কেন?”
রাফসা বিরক্ত হয়ে পেছনে ফিরে। শীতল কন্ঠে শুধায়, “আপনাকে বলতে বাধ্য নয় আমি।”
উদ্যান রাফসার চোখে চোখ রেখে শাণিত গলায় বলল, “যা বলেছি তার উওর দে।”
রাফসার মন চাইছে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে এই খচ্চর কে সোজা করিয়ে দিতে।
“আপনি অন্য মেয়ের সাথে ঘেঁষাঘেঁষি করেন, তখন আমি কিছু বলি? আমার বেলায় কেন আপনি কৈফিয়ত চাইবেন? ছেলেদের সাথে আমি হেসে কথা বলি, নাকি হাত ধরে বলি তাতে আপনার সমস্যা কি ভাই?”
কথাটা বলতে দেরি রাফসার গালে থাপ্পড় পড়তে দেরি হয়নি। উদ্যান আবার প্রায় তিন বছর পর রাফসার গায়ে দ্বিতীয় বারের মতো হাত তুলেছে। থাপ্পড় খেয়ে রাফসা এক পাশে হেলে পড়ে। এমনিতেই দুইদিন ধরে দাঁত ব্যথা করছে। মাড়ি ফুলে আছে। এখন থাপ্পড় খাওয়াতে রাফসার মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো। কিছুটা জোরে থাপ্পর খেয়ে রাফসা নিজেকে আর শক্ত করে ধরে রাখতে পারেনি। শব্দ করে কেঁদে উঠে। বিশেষ করে দাঁতের ব্যথায় শরীর অবশ হয়ে আসছে। দুই হাত দিয়ে উদ্যানের বুকে ধাক্কা মেরে ঝাঁঝালো কন্ঠে চেঁচিয়ে বলল, “এই ফালতু লোক, সমস্যা কি আপনার? দূরে থাকতে বলেছি না আমার থেকে।”
উদ্যান রাফসার মাক্সের উপরেই এক হাত দিয়ে গাল চেপে ধরে হিসহিসিয়ে বলে, “চুপ, একটা আওয়াজ বের করবি না। গলার রগ টেনে ছিঁড়ে ফেলবো। বেশি বড় হয়ে গিয়েছিস?”
চলবে….?
উদ্যান বা আভিয়ান ওদের চরিত্র ভালো না লাগলে ইগনোর করবেন। আশা করি আমাকে গল্প ক্লিয়ার করতে সময় দিবেন।
Share On:
TAGS: প্রেয়সীর অনুরাগ, সাদিয়া জাহান সিমি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেয়সীর অনুরাগ গল্পের লিংক
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৩
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ১১
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৬
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৮
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ২
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৯
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৫(প্রথমাংশ + শেষাংশ)
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৪
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ১০