প্রেমের নিঃশব্দ সূচনা
ইরিন_নাজ
পর্ব_৩
তোহফাদের বাড়ি আজ মানুষজনে ভর্তি। তোহফার কাবিন হচ্ছে শুনে তার ফুফু, চাচারা স্ব-পরিবারে উপস্থিত হয়েছেন এই বাড়িতে। বড়রা ড্রয়িংরুমে হলেও, ছোটরা আস্তানা গেড়েছে তোহফার রুমে। অন্যান্য সময় কাজিনরা একত্রিত হলে সবচেয়ে বেশি দুষ্টুমি, বাঁদরামি করে তোহফা। কিন্তু আজ সে নিশ্চুপ। দুহাতে হাঁটু জরিয়ে তার উপর মুখ রেখে চুপচাপ বসে আছে বিছানার এক কোণে।
তোহফার চাচা দুইজন এবং ফুফু একজন। তিনজনই ঢাকাতে, তাদের কাছাকাছিই বসবাস করেন পরিবার নিয়ে। তোহফার বড় চাচা সাজ্জাদ সাহেবের সন্তান দুজন। শেহরান এবং শাম্মী। ভাইবোনদের মধ্যে মেজো হচ্ছেন তোহফার বাবা। তোহফার ছোট চাচা আতিক সাহেবের সন্তান তিনজন। তিন্নি, তাইয়েবা এবং তাহসিন। এদের সবার মধ্যে একমাত্র তাহসিনই তোহফার চেয়ে বয়সে ছোট। শাম্মী এবং তিন্নি সমবয়সী হলেও তিন্নি বিবাহিত। মেয়েটার বিয়ের প্রায় এক বছর হতে চলল। এর মধ্যেই সিরিয়াল লেগে গেল তোহফার।
অন্যদিকে, তোহফার একমাত্র ফুফু বুশরা বেগমের একটাই মেয়ে। নাম বিথি। বিথিও বয়সে বড় তোহফার। তবে একসাথেই এইচএসসি দিয়েছে তারা। মেয়েটা কেনো যেনো তাকে একদমই সহ্য করতে পারে না। সবসময় হিংসে করে। অবশ্য তার ফুফুটাও এমন। মেয়ে, মাকে দেখেই শিখেছে হয়তো। তাদের পরিবারের একমাত্র ভিলেন হচ্ছেন এই বুশরা বেগম। এককালে উনি খুব জ্বালিয়েছেন তোহফার মাকে। ভাইয়ের সংসার ভাঙার কতই না চেষ্টা করেছেন! এখনো যে পিছু ছেড়ে দিয়েছেন এমন নয়। উনিশ থেকে বিশ হলেই কথা শোনাতে ছাড়েন না ভাইয়ের বউকে। শুধু তোহফার মা নয়, সব ভাইয়ের বউ-বাচ্চাদের পেছনেই উনি লেগে থাকেন। এটাই যেনো উনার প্রধান কাজ। মেয়েটাও হয়েছে সেম। ঠিক এজন্যই তোহফা এবং বাদবাকি কাজিনরা এই মা-মেয়েকে একদম সহ্য করতে পারে না।
অনেকক্ষণ যাবৎই নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে তোহফা। একটিবারের জন্যও মুখ তুলে তাকায় নি ভাই-বোনগুলোর দিকে। তোহফাকে এভাবে দেখে একমাত্র বিথি ছাড়া সবারই মন খারাপ। একটু বেশিই মন খারাপ তাহসিনের। ছেলেটা বড্ড ভালোবাসে তোহফাকে। তার খেলার সঙ্গী, দুষ্টুমির সঙ্গী মেয়েটা আজ চুপ করে বসে আছে। হয়তো মুখ লুকিয়ে কাঁদছে। সে তোহফার কাঁধে হাত রাখল। আলতো হাতে ঝাঁকিয়ে আদুরে কণ্ঠে বলল,
“এই আপু, কিছু বলিস না কেনো? আমার তো ভালো লাগছে না তোকে এভাবে দেখতে। আর কাঁদিস না প্লিজ। ইশ, আরেকটু আগে যদি খোঁজ পেতাম, তাহলে তোর বিয়েটা হতেই দিতাম না।”
শেষ কথাটা মজার ছলে বলল তাহসিন। কিন্তু কোনো রিঅ্যাকশন এলো না তোহফার তরফ থেকে। তিন্নিও এবার মাথায় হাত রাখল তোহফার। নরম স্বরে বলল,
“আর কত কাদঁবি বল! জানি, আজ যেভাবে যা হয়েছে তা মোটেও ঠিক হয় নি। তুই কষ্ট পেয়েছিস। কিন্তু এটাই হয়তো ভাগ্যে লেখা ছিল। আর আরসালান ভাই তোর সাথে স্ট্রিক্টলি বিহেভ করেছেন সবসময়। তাই হয়তো তুই উনাকে পছন্দ করিস না। কিন্তু ছেলে হিসেবে উনি ভালো। সব দিক দিয়ে ভালো। এটা আমিও অস্বীকার করতে পারব না। কেউই পারবে না। চাচ্চু-চাচীমাও হয়তো এসব দিক দেখে রাজী হয়েছেন। তবে উনাদের তাড়াহুড়ো করাটা উচিত হয় নি। এভাবে হুট করে বিয়ে দিয়ে দেয়াটাও ঠিক হয় নি। কিন্তু, এখন কি আর করা যাবে বল!”
তাইয়েবা মেয়েটা ইন্ট্রোভার্ট স্বভাবের হলেও এবার মুখ খুলল সে। তোহফাকে এভাবে দেখে তারও যে ভালো লাগছে না। সে বড় বোন তিন্নির সাথে তাল মিলিয়ে বলল,
“দেখ বোন, তুই আর মন খারাপ করে থাকিস না। তিন্নি আপুরও তো অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ হয়েছে। আপু ভালো আছে না! তুইও ভালো থাকবি।”
বিথি এই পর্যায়ে মুখ বাঁকা করে বলে উঠল,
“উফঃ, আর কত ড্রামা যে দেখতে হবে! তোমাদের এই নাটক বন্ধ করো প্লিজ। দেখো গিয়ে, ম্যাডামের মনে মনে ঠিকই লাড্ডু ফুটছে। বুঝি না নাকি! দেখে আলাভোলা মনে হলেও ঠিকই রিচ, হ্যান্ডসাম দেখে ছেলে ফাঁসিয়ে নিয়েছে। এখন আবার ন্যাকামো হচ্ছে। যত্তসব ঢং!”
অন্যদিন হলে ঠিকই মুখের উপরে কিছু একটা কড়া জবাব দিতো তোহফা। কিন্তু আজ যেনো কথাগুলো তার কানেই গেল না। সে যে অন্য এক জগতে ডুবে আছে। মাথায় চলছে ভিন্ন কিছু। তবে তোহফা কিছু না বললেও বাকি সবাই রেগে গেল বিথির উপর। শাম্মী শক্ত চোখে তাকিয়ে বলল,
“তোমার প্রবলেম হলে তুমি এখান থেকে যেতে পারো, বিথি। কিন্তু তোমার মুখ থেকে আর একটা আলতুফালতু কথা শুনতে চাই। নেক্সট আর একটা উল্টোপাল্টা কথা বললে থাপড়ে গাল লাল করে দিব বলে দিলাম।”
শাম্মীর এমন কড়া কথায় এবং বাকি সকলের রাগী দৃষ্টি দেখে কিছুটা দমল বিথি। মুখ ঝামটা দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। তোহফা এত ভালো কিছু পেয়ে গেছে দেখে ভিতরটা জ্বলে যাচ্ছে তার।
বিথি বেরিয়ে যেতেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল সকলে। পুনরায় ব্যস্ত হলো তোহফার মন ঠিক করতে।
রাত সাড়ে এগারোটা। একই ভঙ্গিতে নিজের বেডে বসে আছে তোহফা। এখন আর কাঁদছে না সে। চোখের পানি বোধহয় শুকিয়ে গিয়েছে। নয়তো ঠিকই ঝরতো।
কাজিনরা সবাই হয়তো নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে গিয়েছে। বাড়ি এখন সম্পূর্ণ নীরব। যাওয়ার আগে সবাই খুব বুঝিয়ে গিয়েছে তোহফাকে। তবে তেমন একটা কাজ মনে হয় না হয়েছে। যাওয়ার আগে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছে সবাই। সেটা স্পষ্ট টের পেয়েছে তোহফা। কিন্তু কোনো হেলদোল নেই তার মাঝে। অভিমানের পাহাড় জমেছে মনে। অভিমান তার আর কারোর উপর নয়, নিজের প্রাণপ্রিয় বাবা-মায়ের ওপর। বয়স অল্প তার, বড্ড আবেগী সে। এই আবেগী মনেই সে একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। খুব কঠিন একটা সিদ্ধান্ত।
রাত তখন বারোটা প্রায়। তোহফার রুমে প্রবেশ করল আরসালান। আজ এই বাড়িতেই থাকবে সে। তাই বাবা-মা, ভাই ফিরে গেলেও এখানেই থেকে গেছে সে। রুমে প্রবেশ করতেই এলোমেলো ভঙ্গিতে বিছানায় বসে থাকা এক নারীসত্তা নজরে এলো তার। মেয়েটা তাকে দেখামাত্র সোজা হয়ে বসল। যেনো তারই অপেক্ষা করছিল। সত্যিটাও তাই। তোহফা সত্যি সত্যিই আরসালানের জন্য অপেক্ষা করছিল। সে জানতো আরসালান আজ এই বাড়িতে, তার সাথে, একই কামড়ায় থাকবে।
আস্তে ধীরে বিছানা ছাড়ল তোহফা। ধীর পায়ে এগিয়ে ঠিক আরসালানের মুখোমুখি এসে দাঁড়াল সে। এই পর্যায়ে তোহফার মুখটা স্পষ্ট আলোতে সম্পূর্ণরূপে দৃশ্যমান হলো। পরনে এখনো সেই একই শাড়ি। তবে পরিপাটি ভাবটা আর নেই। মাথার চুলগুলোও এলোমেলো। চোখ দুটো অসম্ভব লাল মেয়েটার। ফুলেও উঠেছে অনেকটা। সরু নাকের ডগাটাও রক্তিম হয়ে আছে। একেবারে বিদ্ধস্ত, ক্লান্ত লাগছে সামনে দাঁড়ানো হালকা গড়নের ছোট্ট রমণীকে।
আরসালান টু শব্দটিও করল না। নীরবে দেখে গেল তোহফার প্রতিটি পদক্ষেপ। তোহফা মিনিট দুই নীরব রইল। অতঃপর তার লালচে গোলাপি অধর নাড়িয়ে অত্যন্ত গম্ভীর স্বরে একটি প্রশ্ন করল,
“বিয়ে যেহেতু করেছেন; আজ, এই মুহূর্ত থেকে আমার দায়িত্ব নিতে পারবেন?”
আরসালানের ধূসর বর্ণের চোখদুটোর দৃষ্টি বরাবরের মতোই শীতল। ওই চোখের দিকে বেশিক্ষন তাকিয়ে থাকতে পারল না তোহফা। দৃষ্টি নত করল। তাকাল অন্যত্র। খেয়াল করল আরসালান আরও দু কদম এগিয়েছে তার দিকে। এই মুহূর্তে তারা দুজন একে-অপরের খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে। তোহফা শাড়ির আঁচল খামচে ধরে অপেক্ষায় রইল আরসালানের জবাবের। বেশিক্ষন অপেক্ষা করতে হলো না তোহফার। এক্সপেকটেশনের বাইরের কিছু একটা বলল আরসালান। ভরাট, পুরুষালি কণ্ঠে বলে উঠল,
“যেই মুহূর্তে কবুল বলে তোমাকে আমার ওয়াইফ হিসেবে একসেপ্ট করেছি, সেই মুহূর্ত থেকেই তোমার সকল দায়িত্ব আমার। ইজেন’ট ইট?”
তোহফা সকল জড়তা ভুলে চমকে তাকাল আরসালানের মুখপানে। তবে পরোক্ষনেই নিজেকে সামলে নিলো সে। আগের সেই গম্ভীর্য ধরে রেখে খানিকটা জিদ দেখিয়ে বলল,
“তাহলে আমাকে এক্ষনি এখান থেকে নিয়ে যাবেন। আপনার বাড়িতে থাকব আমি। এখানে আর এক মুহূর্ত থাকব না।”
তোহফার জিদ ধরতে পারল আরসালান। অধর কোণে সামান্য হাসির রেখা দেখা দিলো। দ্বিমত করল না সে। তোহফার দিকে খানিকটা ঝুঁকল। মেয়েটা তার সামনে বড্ড শর্ট। এক্কেবারে লিলিপুট যেনো। আরসালানকে ঝুঁকতে দেখে মাথা পিছিয়ে নিলো তোহফা। ড্যাবড্যাব করে অবাক চোখে তাকিয়ে রইল। ওকে আরেকটু চমকে দিতে আরসালান ফিসফিসিয়ে প্রশ্ন করল,
“আর ইউ শিওর?”
শিউরে উঠল তোহফা। কেমন যেনো একটা অনুভূতি হলো। কিন্তু অন্য সব চিন্তা-ভাবনা উড়িয়ে দিয়ে নিজের অভিমানকেই প্রাধান্য দিলো সে। পরমুহূর্তেই মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি দিলো। আরসালান সোজা হয়ে দাঁড়াল। পকেট থেকে ফোন বের করে কিছু একটা টিপটাপ করতে করতে বলল,
“গিভ মি টেন মিনিটস।”
চলবে?
(একটু ব্যস্ত ছিলাম, প্রিয়রা। দ্যাট’স হোয়াই, লেট হলো। লেখায় ভুলত্রুটি থাকতে পারে। ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ রইল। হ্যাপি রিডিং।🥹🫶)
Share On:
TAGS: ইরিন নাজ, প্রেমের নিঃশব্দ সূচনা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE