Golpo romantic golpo প্রেমবসন্ত প্রেমবসন্ত সিজন ২

প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৪২


প্রেমবসন্ত_২ ।৪২।

হামিদাআক্তারইভা_Hayat

নুসরাত একটু ভীতু হলো। শেহের ওর ভয় বুঝতে পেরে একহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল ওকে। যারা সামনে উপস্থিত আছেন তাদের দেখে মনে হচ্ছে গ্রামের খুব সাধারণ মানুষ। হয়তো পাশের বড় নদী থেকে মাছ ধরার জন্য এসেছেন। একজন লোক কপাল কুঁচকে গম্ভীর গলায় ধমক দিয়ে বললেন,

“এই, কে তোমরা? এই রাত্রি করে বাইরে কী করো?”

শেহের শুষ্ক ঠোঁট ভিজিয়ে শান্ত স্বরে বলল,
“আমরা উসমান সাহেবের বাংলো বাড়ির মেহমান। হাঁটতে বের হয়েছিলাম একটু। আমার ছেলেকে খুঁজতেই মূলত এই পথে পা বাড়িয়েছিলাম।”

নুসরাত কপাল কুঁচকে পিটপিট করে শেহেরের দিকে ঘাড় উঁচু করে তাকাল অন্ধকারে। শেহের যে সত্যি কথা লুকাচ্ছে বেশ করে টের পেল। সামনের লোকটা বললেন,
“উসমান সাহেবের বাংলো বাড়ির মেহমান? উসমান আমার চাচা হয়। সত্যি বলছো নাকি আমাদের বোকা মনে করছো হ্যা? এই রাত করে ফস্টিনস্টি করতে আসোনি তো আবার?”

নুসরাত রেগে বলল,
“শেহের ভাই, তুমি কেন কিছু বলছো না? এই লোক গুলো যা-তা বলে যাচ্ছে।”

একজন বললেন,
“ভাই? তোমাদের সম্পর্ক কী? সত্যি করে বলো।”

শেহের পরিস্থিতি বুঝে “হাসব্যান্ড-ওয়াইফ” বলার সাথে সাথে নুসরাতও বলল,
“আমার কাজিন।”

অন্ধকারের নিস্তব্ধতায় নুসরাত আর শেহেরের পরস্পরবিরোধী উত্তর যেন এক মস্ত বড় বিস্ফোরণ ঘটাল। ব্যাস! কাহিনি শুরু এখানেই। শেহের দাঁত চেপে নুসরাতের দিকে তাকাল। এমনিতে তো মাথায় বুদ্ধির অভাব নেই, অথচ আজ সব আক্কেল গেল কোথায়? লোক গুলোর মধ্যে একজন শেহেরকে টেনে নুসরাতের থেকে দূরে সরাল। বিশাল নামের লোকটা কাঁধের গামছা ঠিক করে বলল,
“উসমান চাচার নাম্বার আমার কাছে আছে। ফোন দিয়ে খোঁজ নিলেই হবে।”

শেহের স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলল,
“ঠিক আছে! উনাকে কল করলেই সব ক্লিয়ার হয়ে যাবে। আপনারা আমার ওয়াইফকে আমার কাছে আসতে দিন।”

লোকটা ধমক দিয়ে বলল,
“কীসের ওয়াইফ? প্রমাণ কী তোমরা যে জামাই-বউ? “

শেহের পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য দৃঢ় গলায় বলল,
“ও ভয় পেয়েছে তাই ভুল বলছে। আসলে ও আমার সদ্য বিবাহিত স্ত্রী। কাজিনও হয় আবার স্ত্রীও। আপনারা ভুল বুঝবেন না।”

লোকটা কথা না বাড়িয়ে নাম্বারে কল দিল। খানিক বাদে ওপাশ থেকে এক গম্ভীর পুরুষালী লোকের কণ্ঠস্বর এলো। বিশাল ভালো-মন্দ জিজ্ঞেস করে বললেন,
“চাচা, আপনার বাংলোতে নাকি নতুন মেহমান আসছে?”

ওপাশ থেকে ভদ্রলোক বললেন,
“কীসের মেহমান? বাড়ি তো বছর খানিক ধরে বন্ধই পড়ে আছে। রাত করে এসব অদ্ভুত কথা বলে আমায় বিরক্ত করো না বিশাল। ফোন রাখছি, আমি ব্যস্ত।”

কলটা সঙ্গে সঙ্গে কেটে গেল। শেহের হতবাক! জারার বাবা জানেন তারা যে বাংলোতে এসেছে তাহলে এখন কেন লোকটা অস্বীকার করছে বাংলো বছর খানিক ধরে বন্ধ? নুসরাত কিছুটা চওড়া গলায় বলল,
“আপনারা আপনাদের লিমিট ক্রস করছেন। আমাদের রাস্তা ছাড়ুন।”

বিশাল লোকটা প্রায় আব্দুর চৌধুরীর বয়সী হবেন। তিনি ধমক দিলেন নুসরাতকে। হঠাৎ অন্ধকারে ছাপিয়ে কয়েক জোড়া পায়ের শব্দ শোনা গেল। লোক গুলো পেছনে লাইট দিতেই স্বার্থদের মুখ স্পষ্ট হলো। ওর কোলে ছোট্ট আদি। এত বড় একটা ছেলেকে কোলে নিয়ে হেঁটে আসছে এদিকেই। নুসরাত ওদের দেখেই চিৎকার করে বলল,
“ওইযে দেখুন, আমার বোন আর ছেলেও আসছে।”

স্বার্থরা নিকটে এগিয়ে আসল। স্বার্থ অবাক হওয়ার ভান করে শেহেরকে দেখে বলল,
“তুমিই তাহলে নুসরাতকে নিয়ে এসেছ?”

শেহের কপাল কুঁচকে ফেলল। স্বার্থ যে কোনো একটা আকাম করতে যাচ্ছে বেশ করে বুঝতে পারল সে। চোখ গরম করেও কাজ হলো না। বিশাল বললেন,
“তুমি ওদের চেনো?কারা ওরা?”

স্বার্থ নুসরাতকে দেখিয়ে বলল,
“ও আমার বউয়ের বোন, নুসরাত। এই গ্রামেই একটা ছেলের সাথে ওর বিয়ের কথা চলছে। ছেলের পরিবার দেখার জন্যই আসা। কিন্তু সন্ধ্যার পর ওকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না, তাই তো সবাই মিলে বের হয়েছি খুঁজতে।”

নুসরাত আর শেহের দুজনেই যেন আকাশ থেকে পড়ল। নুসরাতের মুখটা বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গেল। সে চিৎকার করে বলতে চাইল, “স্বার্থ ভাই! তুমি এসব কী আজেবাজে বকছ? আমি তো তোমার সাথেই বাংলোয় আসলাম!”
নিশা শুকনো ঢোক গিলে স্বার্থর পেছনে গিয়ে লুকালো। নুসরাত আদিকে দেখিয়ে বলল,
“ওরা সবাই মিথ্যে কথা বলছে। এই বাচ্চাটা আমার। ওর মা আমি। বিশ্বাস না হলে ওকে জিজ্ঞাসা করুন?”

আদি স্বার্থর গলা জড়িয়ে ধরে বলল,
“আন্টি মিথ্যে কথা বলে।”

নুসরাতের পায়ের নিচের মাটি যেন সরে গেল। সে অবিশ্বাসে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল আদির দিকে। স্বার্থ আবারও দরদি গলায় নুসরাতকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“কেন এমন করছ নুসরাত? শেহের ভাইকে বিয়ে করতে চাইলে আমাকে বলো, আমি নিজে তোমাদের বিয়ে দেব। এভাবে বাড়ি থেকে পালিয়ে এসে মাঝরাস্তায় ধরা পড়ার কী দরকার ছিল?”

নুসরাত রাগে চোখ বন্ধ করে ফেলল। তার শরীর কাঁপছে অপমানে। সে চিৎকার করে বলল,
“তামাশা বন্ধ করো স্বার্থ ভাই! কী আজেবাজে কথা বলছ এসব? আমি আর শেহের ভাই কেন পালাব? তুমিই তো আমাদের এখানে নিয়ে এলে!”

কিন্তু গ্রামের লোকগুলোর সামনে স্বার্থ এমনভাবে নিজেকে উপস্থাপন করল যেন সে এক আদর্শ বড় ভাই। নুসরাত এবার দিশেহারা হয়ে শেহেরের দিকে ফিরল। তার দুচোখে তখন আগ্নেয়গিরির লাভা। সে চিৎকার করে শেহেরকে বলল,
“তুমি তোমার বন্ধুর সাথে বুদ্ধি করে এসব করছ তাই না? তুমি এত নিচ কী করে হতে পারলে শেহের ভাই? আমাকে সবার সামনে ছোট করার জন্য এই নাটক সাজালে?”

শেহের হতভম্ব হয়ে গেল। সে শুকনো ঢোক গিলে নুসরাতের হাত ধরতে গিয়ে বলল,
“নুসরাত, শোনো… আমি কিছু জানি না!”

নুসরাত সরে গিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
“ছুঁবে না একদম! তোমাদের মতো অসভ্যদের আমি চিনে ফেলেছি।”

কান্নায় নুসরাতের ফর্সা মুখটা টকটকে লাল হয়ে গেছে। গ্রামের মুরুব্বিরা এবার বিরক্ত হয়ে উঠলেন। বিশাল একজনকে ইশারা করে বললেন,
“এই, কাজী ডাক তো কেউ দ্রুত! এই রাত করে এতক্ষণ নস্টামি করে এখন নাটক শুরু করছে। খানিকক্ষণ আগেও তো দেখলাম এই ছেলেটার বুকের সাথে ডলাডলি করছিল। আবার বলে বিবাহিত।”

স্বার্থ এবার সুযোগ বুঝে আগুনের উপর ঘি ঢালল। সে সায় জানাল,
“আমার কোনো আপত্তি নেই চাচা। আপনারা কাজী ডাকুন, এখনই বিয়ে পড়িয়ে দিন ওদের। অন্তত বংশের মুখটা তো বাঁচুক!”

নুসরাত বলল,
“ভাইয়াদের ফোন দাও এখনি। ভাইয়াকে ডাকো স্বার্থ ভাই।”

স্বার্থ উত্তর দিল না। লোকজন কাজী ডাকতে গেলে শেহের স্বার্থর সাথে আলাদা কথা বলতে চাইলে স্বার্থ সোজা বারণ করে দেয়। এই মুহূর্তে একা কথা বলা মানে নিজের পায়ে নিজেরই কুড়াল মারা। এই নুসরাতের জন্য চৌধুরি বাড়িতে নিশার বিয়ে নিয়ে কথা ওঠে না কখনও। সে আর কতদিন বউ ছাড়া একলা বিছানায় গড়াগড়ি করবে? একটা বউয়ের দরকার আছে না? তাছাড়া আজ বিয়ে না দিলে এই দেবদাস বন্ধু জীবনেও বিয়ের মালা গলায় ঝুলতে পারবে না। নিশা আর আদি ভুলেও নুসরাতের ধারের কাছে যায়নি। ওরা দূরে দূরে থেকেছে। নুসরাত কাঁদছে অঝরে। কাজী চলে এসেছে। কাজী যখন তাকে কবুল বলতে বলল তখন সে চুপ ছিল। লোক গুলোর ধমক খেয়ে গড়গড় করে তিন কবুল বলে দিল মেয়েটা। শেহের সময় নিয়ে কবুল করল তাকে। খানিকক্ষণ আগে যে মেয়ের বিরহে ছটফট করেছে শেহের, এই মুহূর্তে সেই নারী তার স্ত্রী। পাশেই শুকনো ডালের উপর বসে আছে শক্ত করে। স্বার্থরা আগেই কেটে পড়েছে লোক গুলোর সাথে। যাওয়ার আগে শেহেরের ফোন শেহেরেকে দিয়ে গেছে। ফোনের ওয়ালপেপারে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে নুসরাত ছোট্ট আদিকে কোলে নিয়ে গাল ভরে হেসে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছে। শেহের শুকনো ঢোক গিলল। হালকা গলা পরিষ্কার করে বলল,

“কথা বলো রাতপাখি।”

নুসরাত হঠাৎ উঠে দাঁড়াল। কোনো কথা না বলে হাঁটা ধরল বাংলো বাড়ির রাস্তায়। শেহের হতভম্ব হয়ে নিজেও উঠে পিছু নিল নুসরাতের।
“রাত, তোমার সাথে আমার কথা আছে। আমাকে উপেক্ষা করে তুমি যেতে পারো না।”

নুসরাত দাঁড়াল। তারপর পিছু ঘুরল। শীতল বাতাস তার সর্বাঙ্গ ছুঁতেই খোলা চুল গুলো উড়ে এসে পড়ল মুখের সামনে। কণ্ঠ কেমন বরফের মতো ঠান্ডা।
“কী বলার আছে আর?”

“আমার তোমার সাথে কথা আছে।”

“তোমার সাথে আমার কোনো কথা থাকতে পারে না শেহের ভাই। অন্তত আজকের পর থেকে কোনোদিনও না।”

“তুমি আমায় ভুল বুঝছো নুসরাত।”

নুসরাত নিজের হাত মুঠোয় শক্ত করে ধরল। বলল,
“তোমার সাথে আমার কোনো কথা নেই। আমার কিংবা আমার ছেলের আশেপাশে ভুলেও এসো না।”

এই বলে নুসরাত আবার হাঁটা ধরলে পেছন থেকে শেহের ভাঙা গলায় বলে,
“আমি তোমার হাসব্যান্ড, ভুলে যেয়ো না।”

নুসরাতের বোধহয় শরীর কাঁপল একটু। পর-মুহূর্তে শক্ত হয়ে এলো। পিছু না ফিরেই শক্ত গলায় বলল,
“তুমি আমার কেউ না। না আমি এই বিয়ে মানি আর না তোমায়। কোনো অধিকার তোমার নেই আমার উপর।”

••

চৌধুরী বাড়ি এই সময়ে রাতের খাবার খেয়ে শুয়েছেন মাত্রই। মাশফিক চৌধুরী তো স্ত্রীকে নিয়ে ফিরে গেছেন নিজের বাড়ি। আব্দুর চৌধুরী নিজের ঘরে পায়চারী করছিলেন। লতা বেগম বিছানা ঠিক করতে করতে আড়চোখে তাকালেন স্বামীর চিন্তিত বদনে।
“কী নিয়ে এত চিন্তা আপনার? কিছু হয়েছে?”

আব্দুর চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“বুঝলে লতা, একটা সময় কায়নাতকে নিজের সন্তানের স্থান দিতে পারিনি। কিংবা এমনও হতে পারে নিজের মেয়ে বলে মনেই হয়নি। কিন্তু আজ দুই মেয়েকে আলাদা নজরে দেখতে পারছি না আমি। বড্ড চিন্তা হচ্ছে দুটোকে নিয়ে।”

লতা বেগম কপাল কুঁচকে বিছানায় বসলেন।
“সেকি কথা? চিন্তার কী আছে এতে?”

“নাজনীন আগে কথায় কথায় মেয়েটার গায়ে হাত তুলতো। আবেগের বশে আব্বার কথা শুনে বিয়েটা তো দিয়েছি, কিন্তু অবুঝ মেয়েটা আদৌ ভালো আছে ওর সাথে? বড্ড তাড়াহুড়ো করে ফেললাম। অন্যদিকে অর্ণ বড্ড বেয়াদব ছেলে। ওর মতো বেয়াদব জামাই জীবনে দুটো দেখিনি। দেখলে না, কেমন করে মুখে মুখে তর্ক করে? ছেলে হিসেবে ঠিক হলেও জামাই হিসেবে মানতে পারছি না।”

লতা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বললেন,
“অত চিন্তা করে এখন লাভ আছে? কায়নাতের বিয়ে হয়েছে অনেক বছর আগে। সেই স্বামীর সাথে সংসার করছে কত গুলো মাস ধরে।”

“তো?”

“তো আবার কী? আপনার মাথায় কী চলছে?”

আব্দুর চৌধুরী উত্তর দিলেন না। বিছানায় বসে ফোন বের করলেন পকেট থেকে। তারপর কল লাগালেন অর্ণর নাম্বারে।
ওদিকে অর্ণ বউকে ঝাঁপটে ধরে ঘুমে ডুবে ছিল। প্রচুণ্ড শব্দে ঘুম ভাঙতেই বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে এলো। কায়নাত পিটপিট করে চোখ খুলে ফোনের দিকে তাকিয়ে দেখল আব্দুর চৌধুরী কল করেছেন। অর্ণ উঠছে না বলে অর্ণকে বেশ কয়েকবার ডাকলে অর্ণ খেঁকখেঁক করে ওঠে।

“এক আছাড় মারব বেয়াদব মহিলা। চুপচাপ ঘুমাও।”

কায়নাত মুখ কালো করে বলল,
“বাবা কল করেছেন।”

“তোমার বাপের খেয়ে দেয়ে কাজ নেই? এই সময়ে কোন শ্বশুর তার মেয়ের জামাইকে বিরক্ত করে? সময়টা কত ইমপোর্ট্যান্ট এটা তিনি জানেন না?”

কায়নাত নাক কুঁচকে ফেলল বেহায়ামো কথায়। অর্ণ বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরল। ওপাশে আব্দুর চৌধুরীর গম্ভীর গলা শোনা যেতেই অর্ণ কোনো ভূমিকা ছাড়াই সরাসরি জিজ্ঞেস করল,
“এই মাঝরাতে কল দেয়ার কারণ কী?”

আব্দুর চৌধুরী ওপাশ থেকে থতমত খেয়ে গেলেন। জামাইয়ের এমন সোজাসাপ্টা প্রশ্নে তিনি কিছুটা অপ্রস্তুত।তিনি আমতা আমতা করে বললেন,
“না মানে… এমনিতে কল দিয়েছি। তোমরা ঠিক আছো তো?”

অর্ণ তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল,
“ মাঝরাতে কল দিয়ে এসব জিজ্ঞেস করছেন? এই খবর নেয়ার জন্য কাল সকাল পর্যন্ত কী অপেক্ষা করা যেত না? নাকি অন্য কোনো কারণ আছে?”

আব্দুর চৌধুরী এবার একটু আমতা আমতা করে কথা ঘোরালেন,
“না, তেমন কিছু না। ভাবলাম কায়নাত হয়তো জেগে আছে, ওর সাথে একটু কথা বলি। ও কই?”

অর্ণ আড়চোখে কায়নাতের দিকে তাকাল। কায়নাত তখনো বিচ্ছু বাঁদরের মতো ফোনের দিকে কান পেতে আছে। অর্ণ কায়নাতকে এক হাতে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে পিষে ধরল। কায়নাত ছটফটিয়ে উঠতেই অর্ণ শীতল গলায় বলল,
“আমার বউ ঘুমাচ্ছে। আর আমি চাই না এই অসময়ে ওর ঘুমটা কেউ নষ্ট করুক। আপনার যদি বড্ড বেশি কথা বলতে ইচ্ছে করে, তবে কাল সকালে কল দিয়েন। এখন আমি ব্যস্ত।”

আব্দুর চৌধুরী ওপাশে রেগে গিয়ে বললেন, “বেয়াদব ছেলে! শ্বশুরের সাথে কথা বলার আদব শেখনি? আমি কী তোমার ইয়ার-দোস্ত যে যখন তখন থামিয়ে দেবে?”

অর্ণ নির্লিপ্তভাবে বলল,
“আদব আর সময়—দুটোই বেশ দামী জিনিস শ্বশুর আব্বা। আমি আপনাকে সম্মান করি বলেই এতক্ষণ কথা বলছি। এখন রাখি, কাল কথা হবে।”

বলেই অর্ণ খট করে কলটা কেটে ফোনটা বিছানার এক কোণে ছুঁড়ে মারল। কায়নাত বড় বড় চোখ করে অর্ণর দিকে তাকিয়ে রইল। সে ভাবতেই পারছে না অর্ণ তার বাবার সাথে এভাবে কথা বলতে পারে! কায়নাত আমতা আমতা করে বলল,
“আপনি… আপনি বাবার সাথে এভাবে কেন কথা বললেন? উনি তো বড়, মুরুব্বি মানুষ।”

অর্ণ কায়নাতের কোমরে দুহাত বেষ্টন করে ওকে নিজের উপর টেনে আনল। ওর নাক কায়নাতের নাকে ঘষে বলল,
“মুরুব্বি মানুষ বলেই তো ছেড়ে দিলাম। অন্য কেউ হলে এই সময়ে কল দিলে ফোনের ওপাশ থেকে তাকে উদ্ধার করে ছাড়তাম। এখন বাপের চিন্তা ছাড়ো তো মিসেস, তোমার সামনে যে ‘বিপজ্জনক’ স্বামীটা বসে আছে তার দিকে মন দাও।”

কায়নাত লজ্জায় অর্ণর শার্টের কলার খামচে ধরল। অর্ণর সেই রাগী আর নেশাতুর চোখের চাহনিতে সে যেন আবারও এক মায়াবী জালে জড়িয়ে পড়ছে। সে কায়ানাতকে নিজের বাহুবন্দি করে অনেকটা গভীরে যেতে চাইছিল, তার তপ্ত নিঃশ্বাস কায়ানাতের ঘাড়ে আছড়ে পড়ছিল বারবার। কিন্তু প্রতিবারই কায়ানাত এক অজানা আড়ষ্টতায় নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছিল, দুহাত দিয়ে অর্ণর প্রশস্ত বুকটা ঠেলে সরিয়ে দেয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল সে। অর্ণর স্পর্শে শিউরে উঠলেও সেটা যেন ভালোবাসার চেয়ে বেশি ভয়ের আবেশে জড়ানো ছিল। বারবার বাধা পেয়ে অর্ণ কায়নাতকে ছেড়ে দিয়ে বিছানা থেকে নেমে এলো। রাগে ওর ফর্সা কপালটা লাল টকটকে হয়ে উঠেছে, গলার রগগুলো ফুলে ফেঁপে উঠেছে। সে শার্টের হাতাগুলো গুটিয়ে দাঁত চেপে গর্জে উঠল,

“কী সমস্যা তোমার কায়নাত? আমি কাছে এলেই এমন মরণাপন্ন রোগীর মতো করো কেন? আমার ছোঁয়া কী এতটাই বিষাক্ত লাগে তোমার কাছে? নাকি অন্য কাউকে মনে পড়ছে এই মুহূর্তে?”

কায়নাত কোনো কথা বলতে পারল না। সে বিছানার চাদরটা বুকের উপর শক্ত করে খামচে ধরে ভীতু চোখে মুখ ফিরিয়ে নিল।ওর এমন ঘেয়েমি যেন সহ্য হলো না অর্ণর।
“বেয়াদব মহিলা একটা! সারাক্ষণ জেদ আর এই অদ্ভুত নাটক। আমি কী তোমার কাছে সোহাগ ভিক্ষা করতে এসেছি? কী ভাবো নিজেকে? বড্ড বেশি বাড়াবাড়ি করছ না? যাও, একাই থাকো তুমি এই ঘরে!”

বলেই অর্ণ ড্রেসিং টেবিলের উপর থাকা কাঁচের গ্লাসটা সজোরে ফ্লোরে আছাড় মারল। ঝনঝন শব্দে পুরো ঘরটা কেঁপে উঠল। কায়নাত চমকে উঠে কান ঢেকে ফেলল। অর্ণ আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। সে ধপধপ করে পা ফেলে রুম থেকে বেরিয়ে গেল এবং সশব্দে দরজাটা টেনে দিল। ঘরটা মুহূর্তেই এক ভয়াবহ নিস্তব্ধতায় ডুবে গেল।
কায়নাত ভয়ে মুখ চেপে কেঁদে উঠল। কিন্তু মিনিট পনেরো পার হওয়ার পর ওর কান্নার চেয়ে আতঙ্কটা বেশি দানা বাঁধল। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার, ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর অচেনা এই বাগান বাড়ি। অর্ণর রাগ তো সে ভালো করেই জানে; রাগের মাথায় লোকটা কী বাংলো ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে গেল? কোনো বিপদ হবে না তো?
ভয়ে কায়নাতের বুক ধক করে উঠল। সে দ্রুত আঁচল ভালো করে শরীরে জড়িয়ে নিয়ে কাঁপাকাঁপা হাতে দরজা খুলে করিডোরে এলো। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে দেখল ড্রয়িংরুমটা অন্ধকারে ডুবে আছে, শুধু একটা ডিম লাইট জ্বলছে। অর্ণকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। কায়নাত ধীর স্বরে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
“এই,কোথায় গেলেন আপনি? প্লিজ ফিরে আসুন!”

সে দেখল বাগানের দিকের স্লাইডিং দরজাটা আধখোলা। ঠান্ডা বাতাস হু হু করে ভেতরে ঢুকছে। কায়নাত সাহসে ভর দিয়ে গুটি গুটি পায়ে বাগানের সেই ঘুটঘুটে অন্ধকারে পা বাড়াল। ঘাসের উপর শিশির কণা ওর পায়ে শীতল ছোঁয়া দিচ্ছে, কিন্তু ওর মন তখন অর্ণকে খোঁজার অস্থিরতায় পাগলপ্রায়।
সে বাগানের এক কোণে আমগাছটার নিচে একটা অস্পষ্ট ছায়া দেখতে পেল। অন্ধকার চিরে দেখল অর্ণ সেখানে একা দাঁড়িয়ে আছে, ওর হাতে একটা জ্বলন্ত সিগারেট। আগুনের লাল আভাটা অন্ধকারে বারবার জ্বলে উঠছে আর নিভে যাচ্ছে।

অর্ণর সেই রুদ্রমূর্তি দেখে কায়নাতের বুকটা দুরুদুরু করে কেঁপে উঠল। কায়নাত খুব ভালো করেই জানে, অর্ণ তখনই ধুমপান করে যখন তার রাগ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
কায়নাত পা টিপে টিপে ঘাসের উপর দিয়ে এগিয়ে গেল। শিশিরে ভেজা ঘাস ওর পায়ে শীতল ছোঁয়া দিচ্ছে, কিন্তু ওর মনে তখন অপরাধবোধের দহন। অর্ণর ঠিক পেছনে গিয়ে সে স্থির হয়ে দাঁড়াল। অর্ণ কী বুঝতে পেরেছে ওর উপস্থিতি? হয়তো পেরেছে, কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না।
কায়নাত নিভু নিভু গলায় ডাকল,
“শুনছেন? ঘরে চলুন না প্লিজ।”

অর্ণ কোনো জবাব দিল না। সে নির্বিকারভাবে সিগারেটে শেষ টান দিয়ে অবহেলায় ওটা মাটিতে ফেলে পা দিয়ে পিষে দিল। তারপর পকেটে হাত দিয়ে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল। ওর এই মৌনতা কায়নাতের কাছে হাজারটা ধমকের চেয়েও বেশি যন্ত্রণাদায়ক। কায়নাত পেছন থেকে অর্ণর শক্ত বলিষ্ঠ পিঠটা নিজের দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল। ওর মুখটা অর্ণর পিঠে ঠেকিয়ে ধরা গলায় বলল,
“সরি। আমি আসলে… আমি ভয় পেয়েছিলাম। ঘরে চলুন না!”

অর্ণ পাথরের মতো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কায়নাত নিজের দুহাত দিয়ে অর্ণর বলিষ্ঠ কোমর আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। কান্নভেজা গলায় বিড়বিড় করে বলল,
“আমি আর কক্ষনো এমন করব না। আপনি রেগে জেলে বড্ড ভয় হয় আমার।”

অর্ণ কায়নাতের হাতের বাঁধন আলগা করে ওর দিকে ঘুরল। ওর চোখ দুটো অন্ধকারের মাঝেও আগুনের গোলার মতো জ্বলজ্বল করছে। কায়নাতের কাঁধ দুটো শক্ত করে চেপে ধরে সে দাঁত চেপে বলে উঠল,
“ভয় লাগে? আমার রাগে তোমার ভয় লাগে, অথচ আমার ভালোবাসায় তোমার গা ঘিনঘিন করে? বারবার আমাকে বাধা দিয়ে বুঝিয়ে দাও যে আমার ছোঁয়া তোমার সহ্য হয় না।”

কায়নাত মাথা নেড়ে বোঝাতে চাইল সে এমনটা ভাবেনি, কিন্তু অর্ণ থামল না। সে কায়নাতকে এক প্রকার ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বজ্রকঠিন কণ্ঠে ধমক দিয়ে উঠল,
“যাও এখান থেকে! নিজের ওই পবিত্র শরীর নিয়ে ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে ঘুমাও। আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকার কোনো প্রয়োজন নেই।”

অর্ণর এই বিধ্বংসী ধমক খেয়ে দুই হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল ও। মাঝরাতের নিস্তব্ধ বাগানে কায়নাতের কান্নার শব্দটা বড্ড করুণ শোনাল। কান্নার তোড়ে ওর শরীরটা কাঁপছে, আর সে সেখানেই ঘাসের উপর বসে পড়ার উপক্রম হলো।
অর্ণ হাত মুষ্টিবদ্ধ করে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। অর্ণ কী পারবে এই অভিমানী আর অবাধ্য মেয়েটাকে অবহেলা করতে? মোটেও না! অর্ণর ভেতরের সেই কঠোর জেদটা বেশিক্ষণ টিকল না। মাঝরাতের নিস্তব্ধ বাগানে কায়নাতের ওই অসহায় কান্নার শব্দ ওর পাথরের মতো হৃদয়েও ফাটল ধরাল। অর্ণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের মুষ্টিবদ্ধ হাতদুটো শিথিল করল। রাগটা এখনো মেজাজের উপর চড়ে আছে ঠিকই, কিন্তু কায়নাতের কান্না সে সহ্য করতে পারছে না।
অর্ণ ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে কান্নারত কায়নাতের সামনে ঘাসের উপর হাঁটু গেড়ে বসল। কায়নাত তখনো দুই হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কাঁদছে, ওর কাঁধদুটো বারবার কেঁপে উঠছে। অর্ণর বলিষ্ঠ হাতটা আলতো করে কায়নাতের মাথায় স্পর্শ করতেই সে চমকে উঠল। অর্ণ আদুরে স্বরে ডাকল,
“ও বউ,তাকাও আমার দিকে?”

এই একটা ডাকে কায়নাতের কান্নার বেগ যেন আরও দ্বিগুণ হলো। সে মুখ থেকে হাত সরিয়ে অশ্রুসজল চোখে অর্ণর দিকে তাকাল। চাঁদের আবছা আলোয় ওর ভেজা গাল আর লাল হয়ে থাকা নাকটা দেখে অর্ণর মায়া হলো, কিন্তু পরক্ষণেই ওর গলার স্বর আবার গম্ভীর হয়ে উঠল। সে কায়নাতের চিবুকটা আঙুল দিয়ে উঁচিয়ে ধরে বলল,
“কাঁদলে সব মাফ হয়ে যায়, তাই না? বেয়াদব মহিলা একটা! এখন এই বাগানে এসে মায়াকান্না জুড়ে দিয়েছ। জানো এই রাত-বিরেতে তোমাকে একা রেখে আমার কোথায় যেতে ইচ্ছে করছিল?”

কায়নাত হেঁচকি তুলে মাথা নাড়ল। অর্ণ ওর কপালে জমে থাকা একগুচ্ছ চুল সরিয়ে দিয়ে কড়া শাসনে বলল,
“খবরদার! আর একবার যদি আমার থেকে ওভাবে দূরে সরে যাও, তবে মনে রেখো— অর্ণ চৌধুরী কিন্তু দ্বিতীয়বার ডাকতে আসবে না। তখন নিজের ওই জেদ নিয়ে একাই থেকো। বুঝেছ?”

কায়নাত অর্ণর শার্টের হাতা খামচে ধরে ধরা গলায় বলল,
“বুঝেছি। আর কক্ষনো এমন করব না। আপনি প্লিজ রাগ করবেন না।”

অর্ণ এবার কায়নাতের ভেজা গালে আলতো চুমু খেয়ে ওকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল। কায়নাত অপ্রস্তুত হয়ে অর্ণর ঘাড় জড়িয়ে ধরল। অর্ণ বাংলোর দিকে ফিরে যেতে যেতে নিচু স্বরে ফিসফিসিয়ে বলল,
“রাগ ভাঙানোর মাসুল কিন্তু এখনো বাকি আছে বউ। ঘরে চলো, আজ সারারাত তোমার এই অবাধ্যতার বিচার আমি কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে নেব।”

(হাই সিঙ্গেল পিপল, কী খবর তোমাদের?🌚
রেসপন্স করো বেশি বেশি।)

চলবে…?

প্রেমবসন্ত বই প্রি-অর্ডার করেছেন?

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply