প্রেমবসন্ত_২ ।২৩।
হামিদাআক্তারইভা_Hayat
স্বার্থ বরাবরই একটু অন্যরকম।নিজের জিনিসের ভাগ যেন সহ্যই হয় না।যেমন জেদ,তেমন অভিমান।নিশার দৃষ্টি ছলছল হলো।একপা এগিয়ে এসে স্বার্থর হুডির হাতা টেনে বলল,
“এমন করছো কেন?আমি কী করেছি?”
স্বার্থ নিশার চিবুক উঁচিয়ে দাঁত চেপে বলল,
“কিছুই করিসনি তুই।এটাই সমস্যা।”
সে হনহন করে সামনে হাঁটা ধরল।পেছনে দাঁড়িয়ে রইল নিশা।কী করবে সে?স্বার্থর রেগে থাকার কারণ আছে কোনো?
সামনে প্রেম হেঁটে যাচ্ছিল নিধির সাথে।প্রেমের কানে মুঠোফোন।হসপিটালেই হয়তো কারোর সাথে কথায় ব্যস্ত।নিধি গায়ের ওড়না আঙুলে মুড়িয়ে একবার তাকাল পাশে।লম্বা চওড়া এক পুরুষ তার পাশে হেঁটে যাচ্ছে।কিছুটা অর্ণর মতো দেখতে।
হঠাৎ প্রেম নিধির হাত চেপে ধরল।ধমক দিয়ে বলল,
“কোনদিকে চোখ নিয়ে হাটিস?রাস্তা ভাঙা দেখছিস না?”
নিধি চমকে উঠল।নিচে তাকিয়ে দেখল সামনেই খানিক রাস্তা ভাঙা।আর একটু হলেই পড়ে যেত সে। নিধি একটু লজ্জা পেয়ে হাত ছাড়াতে চাইল;প্রেম তখনও ফোন কানে ধরে আছে।কথা শেষ করে ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে সে নিধির দিকে তাকাল।কঠিন গলায় বলল,
“মনটা কোথায় থাকে তোর?একটু দেখে-শুনে হাঁটতে পারিস না?”
নিধি ঠোঁট কামড়ে মাথা নাড়ল।
“খেয়াল করিনি।”
প্রেম আর কিছু বলল না।হাতটা অবশ্য ছাড়লও না।এভাবে দু’কদম এগোতেই পেছন থেকে স্বার্থের রাগী কণ্ঠ ভেসে এল,
“এই প্রেম!দাঁড়া।”
প্রেম থামল।ঘুরে তাকাতেই দেখল স্বার্থ গজগজ করতে করতে আসছে।নিশা একটু দূরে দাঁড়িয়ে,চোখে অনিশ্চয়তা আর অপরাধবোধ।
“কী হয়েছে আবার?”প্রেম বিরক্ত গলায় জিজ্ঞেস করল।
স্বার্থ নিশার দিকে একবার তাকিয়ে আবার চোখ ফিরিয়ে নিল।
“কিছু না।হাঁটতে ইচ্ছা করছে না।চল,একটু পাশে যাই।”
প্রেম বুঝল,কিছু একটা হয়েছে।কিন্তু এখন ঘাঁটাতে চাইল না।
“ঠিক আছে।নিধি,তুই নিশার সাথে যা।”
নিধি নিশার পাশে এসে দাঁড়াল।দু’জনেই চুপ।হেঁটে যেতে যেতে নিশা হঠাৎ ফিসফিস করে বলল,
“আমি কি খুব খারাপ কিছু করেছি?”
“আমি কী করে বলব?”
“ধুর,স্বার্থ ভাই বেহুদা রেগে আছে।কাল ভার্সিটির সামনে কাব্য ভাই এসেছিল,এটা উনি দেখেছেন।”
“তো?”
“সে ভাবছে কাব্য ভাইয়ের সাথে আমি কথা বলি।”
নিধি নিশ্চুপ হয়ে মাথা নাড়ল।হাঁটা ধরল সামনে।
•
কায়নাত এসেছিল কলেজে।আজগর চৌধুরীর আসার কথা থাকলেও তিনি আসেননি।কায়নাতের সাথে অর্ণ এসেছে কলেজে।কলেজ গেটের সামনে কায়নাত দাঁড়িয়ে আছে।অর্ণ গেছে রিকশা আনতে।মেয়েটা অবাক হয়ে অর্ণর কাণ্ড দেখে যাচ্ছে।অর্ণ কেন এসেছে খুলনায়?বুঝতেই পারছে না।অর্ণ রিকশা নিয়ে এলো।কায়নাত উঠে বসতেই গাড়িটা ছুটে গেল লম্বা রাস্তায়।আজ ভীষণ রোদ উঠেছে।গরমে কায়নাতের অবস্থা নাজেহাল।অর্ণ ঘাড় ঘুরিয়ে ঠোঁট কামড়ে মেয়েটার কাঁপা,ঘামে ভেজা আখি জোড়া দেখে নরম গলায় জিজ্ঞেস করল,
“এই বেয়াদব মহিলা,তোমার কী গরম লাগছে?”
কায়নাত চোখ বড় বড় তাকায়।এত মিষ্টি স্বরের মধ্যেও ছিল ধমক।
দুপুর হওয়ায় রাস্তায় মানুষ জন নেই বললেই চলে।অর্ণ হাতের ছোট্ট শপিং ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে ওর সামনে এগিয়ে দিয়ে বলল,
“পানি খাও।”
কায়নাত শুকনো ঢোক গিলে বোতল হাতে নিয়ে পানি খায়।রিকশায় ঝাঁকি লাগছিল বলে মুখ লাগিয়েই পানি খেয়েছে সে। হঠাৎ করেই অর্ণ কায়নাতের হাত থেকে বোতলটা নিয়ে নিল।তারপর ঢকঢক করে পানি খেল।একেবারে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে—যেন এতে অবাক হওয়ার কিছুই নেই।
কায়নাত বিস্ময়ে তাকিয়ে থেকে বলল,
“কী করছেন?আমি তো মুখ লাগিয়ে খেয়েছি।”
অর্ণ কোনো উত্তর দিল না।চোখ সরাল না সামনের রাস্তা থেকে।শুধু বোতলের ঢাকনাটা বন্ধ করল নিঃশব্দে।নীরবতার ভেতরেই যেন তার জবাবটা লুকিয়ে রইল।
কায়নাতের বুকের ভেতরটা কেমন করছে।লজ্জায় গাল দুটো জ্বলে উঠল।সে অজান্তেই ঠোঁট কামড়ে ধরল।রোদ আর গরম—সব যেন হঠাৎ গায়েব হয়ে গেল লাজের কাছে।রিকশার ঝাঁকুনিতে শরীরটা একটু সামনে ঝুঁকে পড়তেই অর্ণ নিঃশব্দে হাত বাড়িয়ে তার কনুই চেপে ধরল।স্পর্শটা ক্ষণিকের, অথচ অসম্ভব দৃঢ়।
“সোজা হয়ে বসো।”
লজ্জা পায় সে।অর্ণর এই ছোট ছোট যত্ন গুলোর অনুভূতি নতুন।স্বামীর থেকে পাওয়া প্রথম যত্ন।সে আড়চোখে তাকিয়ে সাহস করে বলে,
“একটা কথা বলব?”
“দশটা বলুন।”
“আমার একটা আবদার রাখবেন?”
“হাজারটা রাখব।”
অর্ণর কণ্ঠস্বর শক্ত হলেও সেথায় কোনো জোর ছিল না।কায়নাত এত অবাক হলো অর্ণর আচরণে বলার বাইরে।মেয়েটা শুকনো ঢোক গিলে বলল,
“আমার মাকে অনেকদিন হলো দেখি না।আপনি নিয়ে যাবেন মায়ের বাড়ি?”
অর্ণ ভ্রু কুঁচকে তাকায়।কায়নাত দৃষ্টি নামিয়ে হিজাবের কোণা মুচড়ে বলে,
“আমার পালক মায়ের কথা বলছি।আমার মা তো পোয়াতি,তাকে দেখতে ইচ্ছে করছে।”
অর্ণ গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল,
“বাড়ি কোথায়?”
“ভোগুল-হাট।”
“আচ্ছা।”
অর্ণ আর একটা কথাও বলল না।কায়নাত বুঝতে পারল না অর্ণর মতি-গতি।লোকটা কী নিয়ে যাবে তাকে?নাকি নিবে না!
চৌধুরী বাড়ির সামনে যখন গাড়ি থামল,তখন মাথার উপর টগমগ করছে রোদ।কায়নাত হেঁটে যাচ্ছে বাড়ির ভেতর;আর ঠিক পেছনে তার হালাল পুরুষ।কায়নাত সদর দরজার সামনে গিয়ে পেছন ফিরে দাঁড়ায়।সাথে সাথে অর্ণর বুকের সাথে হালকা বারি খেয়ে দু’পা পিছিয়ে যায়।নাক কুঁচকে বলে,
“লম্বা খাটাস!”
অর্ণ বুক টানটান করে পকেটে হাত গুঁজে বলে,
“লিলিপুট মহিলা,রাস্তা ছাড়ো।”
কায়নাত সামনে থেকে সরে গিয়ে বলে,
“আপনি নিয়ে না গেলে কিন্তু আমি একাই চলে যাব।শুধু যাওয়ার আগে আমাকে কিছু টাকা দেবেন।ফকিরের মতো খালি হাতে যেতে পারব না।”
“আমাকে কী তোমার আম্বানি ফ্যামিলির মেম্বার মনে হয়?”
“তা কেন মনে হবে?”
অর্ণ ফোঁস করে চাপা নিঃশ্বাস ফেলে কায়নাতের কপালে আঙুল ঠেকিয়ে বলল,
“শোনো মেয়ে,আমি গরিব মানুষ।তোমার স্বামীর এত টাকা-পয়সা নেই।যা আছে সেই দিয়েই শ্বশুর বাড়ি রওনা হব।”
অর্ণ বাড়ির ভেতর হাঁটা ধরল।কায়নাত বলদের মতো দাঁড়িয়ে রইলো একজায়গায়।অর্ণকে দেখে আজ কেমন আতঙ্ক আতঙ্ক লাগছে।লোকটার কী মাথায় সমস্যা হলো?নাকি একদিন বউকে না পেয়ে মাথার ঘিলু ঘেটে গেছে?সে সামনে পা বাড়াতেই আতিয়া বেগম সামনে এসে হাজির হলেন।কায়নাতকে টেনে নিয়ে গেলেন সোফায়।
“এবার বল দেখি,তোদের মধ্যে সব ঠিক হয়েছে?”
কায়নাত বলল,
“সব তো ঠিকই আছে।”
“আমার দাদুভাই তোকে ভালোবাসে?”
কায়নাত নাক কুঁচকে ফিসফিস করে বলল,
“ওসব তোমায় বলব কী করে?দাদার কথা আমায় বলেছ কী?”
আতিয়া বেগম কায়নাতের মাথায় গাট্টা মারলেন।
“দিন দিন ফাজিল হয়ে যাচ্ছিস বুড়ি।”
কায়নাত হাসল।হেলে দুলে উপরে উঠে এলো।আজকে ভীষণ গরম পড়েছে।এখন গোসল না করলে জান বেরিয়ে যাবে।অর্ণর ঘরে ঢুকে দেখল আদির সাথে অর্ণ ভিডিও কলে কথা বলছে।সে এগিয়ে আসতেই আদি গম্ভীর গলায় বলল,
“তুমি আমার মামুর ঘরে কী করো?”
কায়নাত চোখ পাকিয়ে বলে,
“এটা আমারও ঘর।”
“তুমি খারাপ।আমার মামুর থেকে দূরে থাকবে তুমি।”
“থাকব না।”
আদি রেগে কল কেটে দিল।অর্ণ কপাল কুঁচকে পেছনে তাকায়।বলে,
“তুমি কী বাচ্চা?ওর সাথে সব সময় ঝগড়া করার মানে কী?”
“আপনি শুধু আমাকেই চোখে দেখেন?ও যে আমার সাথে ঝগড়া করে সেটা দেখেন না?”
“আশ্চর্য!ও বাচ্চা সেটা বোঝো না?”
কায়নাত বিড়বিড় করে কাপড় নিয়ে ঢুকল ওয়াশরুমে।অর্ণ ফোঁস করে চাপা নিঃশ্বাস ফেলল।
বিকেল বেলা চারপাশটা রঙিন।শীত হাতে গোনা কয়েকদিন আছে আর।ড্রয়িংরুমে কাজ করছিলেন রেখা বেগম।ফারিহা হাতে হাতে কাজ করে দিচ্ছিল শাশুড়ির।হঠাৎ শরীরটা দুর্বল হয়ে পড়েই যাচ্ছিল। জয়া সিঁড়ির দিক থেকে দৌঁড়ে এলো নিকটে।সোফায় ফারিহাকে বসিয়ে দিয়ে চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কী হলো তোমার?”
ফারিহাকে জয়া পানি এনে খাওয়াল।ফারিহাকে একটু সময় দিল শান্ত হওয়ার।রেখা বেগম বউমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন।ফারিহা লাজুক চোখে শাশুড়ির চিন্তিত মুখ খানা দেখে নিচু গলায় বলল,
“আম্মা,কী করে বলি?”
রেখা বেগম রেগে বললেন,
“নাটক না করে তাড়াতাড়ি বলো।চিন্তা হচ্ছে তো!”
ফারিহা আঁচল দিয়ে কপালের ঘাম মুছে বলল,
“আপনার ছেলেকে এখনও জানাইনি।মানে…মানে আমি..!”
রেখা বেগম যেন বুঝে গেলেন।আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেই ফারিহাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন শক্ত করে।জয়া মুখ চুপসে বসে রইল।হলো কী?রেখা বেগম বললেন,
“আমার ঘরে নতুন সদস্য আসবে?আল্লাহ!এই খুশির সংবাদই তো শুনতে চেয়েছি এতদিন।”
জয়া হঠাৎ চিৎকার করে বলল,
“বাচ্চা হবে?”
জয়ার চিৎকার শুনে সবাই ইতোমধ্যে আতঙ্কিত হয়ে ছুটে এসেছেন নিচে।ফারিহা লজ্জায় মুখ ঢাকল।বাড়িতে দেবররা যে উপস্থিত তখন।আতিয়া বেগম সামনে এগিয়ে আসতেই রেখা বেগম হেসে বললেন,
“আম্মা,আমি দাদি হচ্ছি।সবাইকে বলুন এই খুশির সংবাদ।”
আতিয়া বেগম চোখ বড় বড় করে জয়ার দিকে তাকালেন।জয়া এতক্ষণ হাসলেও দাদির চাহনি দেখে ভড়কাল একটু।দাদি হঠাৎ মুখে আঁচল চেপে বললেন,
“এটা খুশির সংবাদ কিভাবে হয়?জয়ার বয়স কত?নাজনীন জানে?”
জয়া সহ সবাই হতভম্ব।কায়নাত তখন এগিয়ে এসেছে নিকটে।সিঁড়ি বেয়ে অর্ণ,নাজনীন,সুহা,মাহি সবাই নেমে আসছে।দাদির কথা শুনে নাজনীনের চোখ কপালে।বাবা হবে সে?আজ অব্দি জয়ার কাছে ভালো করে ঘেঁষেছে কিনা সন্দেহ।
কায়নাত মুখ খানা একটু বানিয়ে ফেলেছে।বেচারির আফসোস হচ্ছে।নাজনীন এগিয়ে এসে জয়ার সামনে চোখ পাকিয়ে তাকাতেই জয়া হতবাক হয়ে বলল,
“আমি মা হচ্ছি?কী বলো দাদি?”
“তো কী?এই মাত্রই তো শুনলাম।”
রেখা বেগম কপাল চাপড়ে বললেন,
“আম্মা!আমি ফারিহার কথা বলেছি।”
আতিয়া বেগম স্তব্ধ হয়ে গেলেন এহেন সংবাদ শুনে।এতক্ষণ তিনি জয়াকে ভেবে ভুল ভাবছিলেন।মুহূর্তেই সবার ভাব-ভঙ্গির পরিবর্তন ঘটল।আতিয়া বেগম খুশিতে আত্মহারা।খুশিতে চোখে পানি চিকচিক করছে।তিনি ফারিহার মাথায় হাত রেখে বললেন,
“আমি তো আরও ভাবছিলাম..যাকগে!যা ভাবছিলাম তা না হলেই ভালো।”
জয়া মুখ কালো করল।কী আশ্চর্য ব্যাপার!তার বাচ্চা হলে কী কেউ খুশি হবে না?দাদি এভাবে বলতে পারল?মেয়েটা চোখ কটমট করে ঘাড় উঁচিয়ে তাকাল নাজনীনের দিকে।নাজনীন সদর দরজার সামনে গিয়ে ভাই,চাচা,দাদা সবাইকে খবর দিচ্ছে।মাশফিক চৌধুরীকে খবর দিতেই তিনি ভীষণ খুশি হলেন।সবাইকে জানানোর পর এদিকে এগিয়ে আসতেই জয়া তার পেটে চিপটি কেটে ফিসফিস করে কিছু একটা বলল।নাজনীন বুঝতে না পেরে দাঁত চিবিয়ে বলল,
“আর একটা কথা বললে চোয়াল ভেঙে ফেলব।”
মেয়েটার আরও অভিমান হলো।পরিবারের উপর যেন ভীষণ রাগ হচ্ছে।দেখে দেখে একটা বুড়োর সাথেই তাকে বিয়ে দিয়েছে।দুই বোনের কপালটাই যেন খারাপ।
কায়নাত চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল অর্ণর পাশে।বাড়ি জুড়ে হইহুল্লোড় লেগে গেছে খুশিতে।নাজনীন ছুটেছে বাইরে মিষ্টি আনতে।মেয়েটা নীরব চোখে সব পর্যবেক্ষণ করছে।বাড়ির প্রত্যেকে কত খুশি।বাড়ির বউকে বাড়ির মেয়ের মতো দেখে দেখেন সবাই।নিজের ভাগ্যের প্রতি গর্ব হলো।এমন একটা পরিবারের বউ সে।
অর্ণ হালকা কেঁশে বাড়ির বাইরে হাঁটা ধরল।বাচ্চার স্বপ্নটা যেন বহুদিন আগের।কিন্তু জীবনের কাছে ইচ্ছেটা তুচ্ছ হয়েছে আরও বেশ কয়েক বছর আগে।আজ কায়নাতের জায়গায় অন্য নারী থাকলে বোধহয় সব কিছু অন্যরকম হত।দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে।কায়নাত পেছন থেকে তার প্রস্থান দেখল।
রাতে বাড়িতে সেকি এলাহি কাণ্ড।হাসানের খুশি আর দেখে কে?বিয়ের ৫ বছর পর খুশির সংবাদ শুনেছে সে।বাড়ির সবাই মিষ্টি মুখ করেছেন খানিকক্ষণ আগেই।আজগর চৌধুরী চাইছেন বাড়িতে বিশাল বড় করে মিলাদ পড়াবেন।সবার মতামত নিয়ে আগে ছেলেদের সাথে আলোচনা করলেন তিনি।ইতোমধ্যে নাজনীনের বাবা মতিউর চৌধুরীকে সংবাদ দেয়া হয়েছে।তিনি আসবেন বলেছেন।কায়নাত দাদির কাছে জানতে চাইল তার শ্বশুর বাড়ি থেকে কেউ আসবেন কিনা।আতিয়া বেগম বলেছেন সবাই আসবেন।খুশি হলো সে।এটাও জানতে পারল নিধির জন্য পাত্র দেখা হচ্ছিল;যেটা এইবারই ঠিক করা হবে।
চৌধুরী বাড়ির এত এত নিয়ম-নীতি দেখে মেয়েটা অনেক অবাক হয়।বংশটা যেন বিশাল বড়।নাজনীনের বিয়ের সময় দেখেছিল,বাড়ি ভর্তি গিজগিজ মানুষ।এত মানুষ, এত সম্পর্ক, এত হিসেব—সবকিছুর মাঝখানে নিজেকে কখনো কখনো খুব ছোট মনে হয় তার।তবু এই বাড়ির প্রতিটা আনন্দে সে আপন হয়ে জড়িয়ে পড়ে।আজও ব্যতিক্রম নয়।
রাতের খাবারের পর সবাই ড্রয়িংরুমে জড়ো হলো।মিলাদের কথা, আত্মীয়দের আসা—এসব নিয়েই আলোচনা।কায়নাত এক কোণে চুপচাপ বসে শুনছিল।হঠাৎ আতিয়া বেগম তার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“কাল সকালেই তোদের ভোগুল-হাট যাওয়া হবে, তাই না?”
কায়নাত চমকে উঠে বলল,
“জি দাদি।”
“তোর মাকে খুশির খবরটা নিজের মুখেই জানাস।ভালো কথা।”
কায়নাত মাথা নাড়ল।বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল।অনেকদিন পর মায়ের কাছে যাবে—এই ভাবনাটাই তাকে নরম করে দিচ্ছে।আতিয়া বেগম আলাদা করে মির্জা বাড়ির জন্য জিনিস আনিয়েছেন।রাত ঘনিয়ে আসছে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে।
হাসানের ঘরে টিপটিপ করে জ্বলছে আপছা আলো।বিয়ের অনেকটা সময় পর এই সংবাদ শুনতে পেয়েছে সে।মেয়েটা কত কান্না-কাটি করত বাচ্চা হয় না বলে।আল্লাহ যেন সব সুখ আজ তাদের ঘরে ঢেলে দিয়েছেন।ফারিহা তখনও স্বামীর বুকে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে যাচ্ছে।হাসান হেসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
“পাগল মেয়ে,কাঁদছ কেন তুমি?”
ফারিহা বলল,
“আমি ভেবেছিলাম কোনোদিনও আপনাকে বাবা ডাক শোনার খুশি টুকু উপহার দিতে পারব না।”
“তাতেও আমার কোনো অভিযোগ ছিল না।সব তো আল্লাহর দান বলো?আমি কখনও অভিযোগ করেছি এই নিয়ে?”
ফারিহা মাথা নাড়ল।পড়ে রইল স্বামীর বুকে।জীবনে কোনো কিছুর কমতি ছিলো না এই একটা সংবাদ ছাড়া।আজ যেন উপর ওয়ালা তাকে পুরিপূর্ণ করেছেন।
•
চারপাশে তখন ঘুটঘুটে অন্ধকার।জারা নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে ঘরে।উদাস পরাণ খানা।অর্ণ আর কায়নাতের সম্পর্কটা ঠিক বুঝতে পারছে না সে।কারোর কাছে আগ-বাড়িয়ে কিছু জিজ্ঞেসও করা হয়নি।অর্ণর সাথে তার বিয়ের কথা হয়েছিল আরও বছর তিনেক আগে।সে হাত চোখের সামনে ধরল।আঙুলে এখনও অর্ণর নামে তার মায়ের দেয়া একখানা রিং।এটার মূল্য কতটুকু?যেখানে সম্পর্ক তুচ্ছ মনে হচ্ছে সেখানে আদৌ এই আংটির কোনো মূল্য আছে?আজ সে দেখেছিল,দুপুরে অর্ণ কায়নাতকে নিয়ে বাড়ি ফিরছে।গরমে কায়নাতের মাথার হিজাব ঘেমে গিয়েছিল বলে যত্ন করে মুখের নিকাব খুলে দিয়েছে।কী আশ্চর্যময় দৃশ্য!
বুকে একটু ব্যথা অনুভব হয়েছিল সেটা দেখে।মনে হচ্ছিল এতদিনের অপেক্ষা সব বৃথা।কোনো কিছুই তো তার নয়।না অর্ণ,না অর্ণর করা যত্ন আর না অর্ণর এই পরিবার।বাড়ির প্রত্যেকে ভীষণ ভালো।তার সাথে সবাই বাড়ির মেয়ের মতোই ব্যবহার করেছে,যত্ন করেছে।বিশেষ করে আতিয়া বেগম যেন খুব সহজেই মানুষকে আপন করে নেন।আজ যখন দুপুরে খাওয়ার সময় গলায় খাবার আঁটকে এলো,তখন আদুরে হাত মাথায় বুলিয়ে পানি খাইয়ে দিলেন।বড্ড লোভ হচ্ছে তার।মা-বাবা তো কখনও এভাবে যত্ন নেয়নি তার।সবাই যেন সবার জীবন নিয়ে ব্যস্ত।কারোর কাছেই তার জন্য সময় নেই,গুরুত্ব নেই আর না আছে একটুখানি ভালোবাসা।
(২.৫k রিঅ্যাক্ট পূরণ করুন।বড় মন্তব্য করবেন সবাই।)
চলবে….?
Share On:
TAGS: প্রেমবসন্ত সিজন ২, হামিদা আক্তার ইভা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১০
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৭.১
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৪
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৯
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২১
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৭(প্রথমাংশ +শেষাংশ)
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২২
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৮
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ গল্পের লিংক
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৬