প্রিয়া_আমার ❤️
পর্ব —২
দূর্বা_এহসান
“তুমি এতোটা হার্টলেস কিভাবে হলে আয়াশ?”
আহিনুর মির্জার প্রশ্নটায় উত্তরহীন রইলো আয়াশ। কোনো কথা বলতে পারল না। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ বারবার চলে যাচ্ছিল বিছানার দিকে, সাদা চাদরে ঢাকা নিথর শরীরটার দিকে। বুকের ভেতর কেমন একটা চাপ অনুভব হচ্ছিল। নেশা কেটে গেছে অনেক আগেই।
আহিনুর ধীরে ধীরে মাইমার কপালে হাত রাখলেন। শরীরটা অস্বাভাবিক রকম ঠান্ডা লাগল তার। তিনি চমকে উঠলেন।
“ডাক্তার ডাকো। এখনই।”
আয়াশ তৎক্ষণাৎ নড়েচড়ে উঠল। ফোন বের করল।কথা বলতে গিয়ে জিভ জড়িয়ে যাচ্ছিল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই বাড়ির ডাক্তার আর একজন নার্স রওনা হলেন।
আহিনুর মাইমাকে সাবধানে নিজের দিকে টেনে নিলেন।ঠিক তখনই আয়াশের দৃষ্টিতে ধরা দিল সাদা বেডসিটে রক্তের দাগ।হাত মুঠো হয়ে গেলো তার।মেয়েটা কুমারী ছিল! নিজের উপর রাগ লাগলো।মাইমার অবস্থা বলে দিচ্ছে আয়াশ কতটা লাগামছাড়া হয়েছিলো রাতে।
“হেল্প মী,আয়াশ।”
আহিনুর একা সামলাতে পারছিলেন না।আয়াশ দ্রুত এগিয়ে আসলো।মাইমাকে দুহাতে ধরলো।আহিনুর ততক্ষণাৎ ওয়াশরুমে চলে গেলেন।একটা টাওয়েল ভিজিয়ে নিয়ে এলেন।সময়৷ নিয়ে ধীরে মাইমার শরীর মুছিয়ে দিতে শুরু করলেন।এভাবে তো আর ডাক্তারের সামনে বাড়ির বউকে উপস্থিত করানো যায় না।আয়াশ মুখ ঘুরিয়ে নিলো।তা দেখে হালকা হাস্লেন আহিনুর।
“দেখো ওখানে জামা আছে।একটা দেও”
ঘরের কোণায় রাখা একটা ব্যাগের দিকে ইশারা করে বললেন আহিনুর।আয়াশ এগিয়ে গেলো সেদিকে।ছোট মতো একটা ব্যাগ।সে চেন খুললো।অগোছালো কয়েকটা কাপড়।আহিনুর তাড়া দিলেন।আয়াশ ঘাটলো না।উপরে যেটা ছিলো ওটাই এনে মায়ের হাতে দিলো।
নিজের দিকে তাকালো সে।চেঞ্জ করতে হবে।কাবার্ড খুলে ট্রাউজার আর টি শার্ট নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেলো।
ওয়াশরুমে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিচ্ছবিটা যেন নিজেই সহ্য করতে পারছিল না আয়াশ। চোখেমুখে জল ছিটিয়েও ভেতরকার দহন কমছে না। কাল রাতের স্মৃতিগুলো ধোঁয়াশা হলেও আবছা মনে পড়ছে তার হিংস্রতা… আর মাইমার কান্না। রাগে নিজের চোয়াল শক্ত হয়ে এল তার। টাইলসের দেয়ালে সজোরে একটা ঘুষি মারল সে। হাতে ব্যথা লাগল, কিন্তু বুকের ভেতরকার যন্ত্রণার কাছে তা নস্যি।
গত ২৪ ঘণ্টা তার চোখের সামনে যেন কোনো অভিশপ্ত চলচ্চিত্রের মতো ভেসে উঠছে। ওয়াশরুমের আয়নায় নিজের লাল হয়ে যাওয়া চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে সে কোনোভাবেই গতকালের সেই স্মৃতিগুলোকে ঝেড়ে ফেলতে পারছে না। আয়নার কাঁচ যেন হঠাৎ টাইম মেশিন হয়ে গেলো, যা তাকে ফিরিয়ে নিয়ে গেলো গতকালের সেই রোদেলা দুপুরে।
আয়াশ তখন অফিসে বসে ল্যাপটপের স্ক্রিনে ডুবে ছিল। হঠাৎ মায়ের ফোন। মা আহিনুরের গলার স্বর শুনে মনে হয়েছিল তিনি খুব অসুস্থ বা বড় কোনো বিপদে পড়েছেন। শুধু এটুকুই বলেছিলেন, “আয়াশ, তুমি এখনই গ্রামে আসো।”
আয়াশ আর কিছুই ভাবেনি। কোনো প্রশ্ন না করে, সে পাগলের মতো গাড়ি ছুটিয়ে গ্রামে পৌঁছায়। তার মনে তখন মা’কে নিয়ে ভয়। কিন্তু গ্রামে পৌঁছে বাড়ির উঠোনে পা রাখতেই সে থমকে যায়। বাড়ির পরিবেশ মোটেও শোকাতুর নয়, বরং সেখানে এক অদ্ভুত সাজসাজ রব।
ভিতরে যেতেই সে দেখলো মা আহিনুর সুস্থ শরীরে সোফায় বসে আছেন। তার পাশে বসে আছে বধু বেশে একটা মেয়ে।ঘোমটা দিয়ে মুখ ঢাকা। আয়াশকে অবাক করে দিয়ে আহিনুর নিজের জোর খাটিয়ে মেয়েটার সাথে তার বিয়ে দিলো।
বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর সবাই যখন আনন্দ করছিল, আয়াশের ভেতরে তখন আগ্নেয়গিরি জ্বলছে। সে মাইমার দিকে তাকালও না। তার মনে হচ্ছিল, এই মেয়েটিও হয়তো এই ষড়যন্ত্রের অংশ। এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হচ্ছিল মেয়েটাকে তুলে আছাড় দিবে।
সন্ধ্যা নামার আগেই আয়াশ কাউকে কিছু না বলে বেরিয়ে আসে। মা ডাকছিলেন, কিন্তু সে শোনেনি। মাইমা দরজার কোণে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল, কিন্তু আয়াশের হৃদয়ে তখন দয়া মায়ার কোনো স্থান নেই। সে শুধু জানে, এই সম্পর্ক সে মানে না। গাড়ির স্টার্ট দিয়ে সে শহরের দিকে রওনা হলো। পেছনে পড়ে রইল তার শৈশবের গ্রাম আর একটি জোর করে চাপিয়ে দেওয়া সম্পর্ক।
শহরে ফিরে আয়াশের মেজাজ খারাপ ছিল।সবকিছু ভোলার জন্য সে তার বন্ধুদের ফোন করে। তারা সবাই শহরের একটি নামী ‘পাব’-এ জড়ো হয়।
পাবের নীল-লাল আলো আর কানফাটানো মিউজিকের মধ্যে আয়াশ নিজেকে হারিয়ে ফেলতে চাইছিল। সে সাধারণত ড্রিংক করে না, কিন্তু আজ সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না। একটার পর একটা গ্লাস শেষ করতে লাগল সে। বন্ধুরা অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল, কারণ আয়াশ সবসময়ই সংযত ছিল।
সে প্রলাপ বকছিল, “মা আমাকে ঠকাল!”
তীব্র আক্রোশ। অ্যালকোহলের ঝাজে তার মস্তিষ্ক অসাড় হয়ে আসছিল। বন্ধুদের কাঁধে ভর দিয়ে যখন সে রাতে বাসায় ফিরেছিল।তারপর… তারপরেও গুলো জানা।
দ্রুত পোশাক বদলে বেরিয়ে এল আয়াশ। ততোক্ষণে আহিনুর মাইমাকে পোশাক পরিয়ে পরিপাটি করে শুইয়ে দিয়েছেন। মেয়েটার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে আছে, চোখের নিচে কালশিটে দাগ স্পষ্ট। আয়াশ বিছানার দিকে পা বাড়াতে চাইল, কিন্তু আহিনুরের কঠিন দৃষ্টি তাকে থামিয়ে দিল।
“ওখানেই দাঁড়াও। কাছে আসবে না একদম।”
তবুও এলো আয়াশ।মাইমাকে সাবধানে কোলে তুলে নিলো।বেডের যা অবস্থা কোনোমতেই এখানে ডাক্তার দেখানো যাবে না।অন্য ঘরে নেওয়া হলো। পরিষ্কার বিছানায়। আয়াশ আহিনুর নিজ হাতে চাদর ঠিক করে দিলেন।ঘরের বাইরে পরিবারের সবাইকে দেখা গেলো।তাড়া দ্রুত ঘরে প্রবেশ করলো।
মিনিট দশেকের মধ্যেই ডাক্তার এসে পৌঁছালেন। পারিবারিক ডাক্তার ইমতিয়াজ সাহেব। তিনি দ্রুত পায়ে ঘরে ঢুকে মাইমার নাড়ি টিপে ধরলেন। স্টেথোস্কোপ দিয়ে বুক পরীক্ষা করলেন। কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল তাঁর। থার্মোমিটারের রিডিং দেখে তিনি আহিনুরের দিকে তাকালেন।
“১০৪ ডিগ্রি জ্বর। পালস রেটও খুব ফ্লাকচুয়েট করছে। মিসেস মির্জা, উনি কি খুব বেশি মেন্টাল বা ফিজিক্যাল ট্রমার মধ্যে দিয়ে গেছেন?”
ডাক্তারের প্রশ্নে আহিনুর আড়চোখে একবার আয়াশের দিকে তাকালেন। আয়াশ অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। আহিনুর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “ওকে এখন সুস্থ করাটা জরুরি ডাক্তার। কী করতে হবে বলুন।”
“সিভিয়ার শক আর হাই ফিভার। আমি এখনই একটা ইঞ্জেকশন পুশ করছি। আর বডি ডিহাইড্রেটেড, তাই স্যালাইন দিতে হবে। জ্ঞান ফিরলে যেন কোনোভাবেই কোনো স্ট্রেস না দেওয়া হয়। কমপ্লিট বেড রেস্ট।”
ডাক্তার আর নার্স মিলে ক্যানুলা করে স্যালাইন সেট করে দিলেন। ইঞ্জেকশন পুশ করার সময় মাইমা অবচেতন অবস্থাতেই যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠল, কিন্তু চোখ খুলল না। সেই অস্ফুট আর্তনাদ আয়াশের কানে তীরের মতো বিঁধল।
“তোমার নেশা কেটেছে আয়াশ? নাকি এখনো বুঝতে পারছ না তুমি নিজের হাতে কি করেছো?”
আয়াশের বড় চাচা মোকারম মির্জা গম্ভীর মুখে পায়চারি করছিলেন। আয়াশের ছোট চাচী সুরাইয়া বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “আহারে মেয়েটা! কাল রাতে যেটুকু দেখলাম, মনে হলো যেন একটা কাঁচের পুতুল। আহিনুর আপা, মেয়েটার তো কোনো দোষ ছিল না। মা-মরা এতিম মেয়ে, আপনার কথা শিরোধার্য করে এ বাড়িতে পা রেখেছিল। এখন যদি ওর কিছু হয়ে যায়, তবে তো আমরা কারো কাছে মুখ দেখাতে পারব না।”
আয়াশ দেখল মাইমার ফ্যাকাশে ঠোঁটগুলো কাঁপছে। জ্বরের ঘোরে সে অবচেতন মনে বিড়বিড় করছে।মাঝে মাঝে শিউরে উঠছে সে। আয়াশ বিছানার পাশে একটা মোড়ায় বসে মাইমার ক্যানুলা লাগানো হাতটার দিকে তাকালো। এই ছোট হাতটা যে
দাদিমা লাঠিতে ভর দিয়ে ঘর থেকে বের হওয়ার উপক্রম করলেন। কিন্তু দরজার কাছে গিয়েও তিনি থামলেন। আড়চোখে একবার দেখে নিলেন আহিনুর বা অন্য কেউ আশেপাশে আছে কি না। সুযোগ বুঝে তিনি ধীর পায়ে আয়াশের একদম কাছে এগিয়ে এলেন।
আয়াশ মাথা নিচু করে ছিল, দাদিমা নিচু হয়ে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বিদ্রূপের স্বরে বললেন, “কী রে আয়াশ, খুব তো তেজ দেখিয়েছিলি কাল দুপুরে? বলেছিলি এই বিয়ে মানিস না, এই মেয়ে তোর যোগ্য না। তা এখন এই ‘অযোগ্য’ মেয়েটার অবস্থা দেখে তো বোঝা যাচ্ছে কি কি করেছিস?”
রুমের সবাই যখন বেরিয়ে গেলো তখন আয়াশ অপলক চেয়ে থাকলো মাইমার দিকে।এতো সুন্দর মেয়েটা তার সেই গ্রামে বিয়ে করে ফেলে আসা বউ?কঠোর আয়াশকে সবাই আজ এতকিছু বলার সাহস দেখালো অথচ সে প্রতিবাদ করলো না এই মেয়েটার জন্য?
চলবে
(১.৫k রিয়েক্ট হলে নেক্সট পার্ট আসবে।নাহলে এখানেই শেষ)
Share On:
TAGS: দূর্বা এহসান, প্রিয়া আমার
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডার্ক ডিজায়ার পর্ব ১৬
-
ডার্ক ডিজায়ার গল্পের লিংক
-
ডার্ক ডিজায়ার পর্ব ১৫
-
ডার্ক ডিজায়ার পর্ব ২
-
ডার্ক সাইড অফ লাভ পর্ব ৪
-
ডার্ক ডিজায়ার পর্ব ১৪
-
ডার্ক ডিজায়ার পর্ব ৪
-
ডার্ক ডিজায়ার পর্ব ৩(প্রথমাংশ + শেষাংশ)
-
ডার্ক ডিজায়ার পর্ব ৭
-
ডার্ক সাইড অফ লাভ গল্পের লিংক