Golpo romantic golpo প্রণয়ের রূপকথা

প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৭৪


প্রণয়ের_রূপকথা (৭৪)

স্কুলে অনুষ্ঠান থাকায় কুহু আজ খুব ব্যস্ত সময় পার করল। একদম পুরো দমে শিক্ষিকা হয়ে উঠেছে মেয়েটি। আজ আবার শাড়ি পরে এসেছিল। বয়সের তুলনায় খানিকটা বড়ো ও লাগছে। দীপ্র গাড়ির ভেতর থেকেই ওকে দেখে যাচ্ছিল। কুহু এসে দরজা খুলে বলল,”আপনি আসবেন আগে বলেননি তো।”

দীপ্র গিয়েছিল কাজে। সেখান থেকেই এখানে ফেরা। কুহু বড়ো করে দম নিল। ফের বলল,”বাচ্চাদের পড়ানো খুব কঠিন কাজ,জানেন?”

“জানি।”

“জানেন,কিন্তু কীভাবে?”

দীপ্র ইষৎ হাসল। গাড়ি চলতে শুরু করেছে। কুহু চেয়ে আছে জবাবের আশায়।

“তোর মনে নেই, ছোট বেলায় কোনো টিচারের কাছেই পড়তে চাইতি না। আমাকেই পড়াতে হবে বলে নাক ফুলিয়ে বসে থাকতি?”

কথাটা খেয়াল হলো কুহুর। ও খানিকটা লজ্জা পেল। তবে ধরা না দিয়ে বলল,”তাই নাকি? আমার তো মনে নেই।”

কথা শেষ করে আড়চোখে চাইল কুহু। দীপ্রর অধরে তখনো হাসি মেশানো। কুহু ফের বলল,”আমি কিন্তু ‍দুষ্টু বাচ্চা ছিলাম না।”

“হুম, খুব ভালো ছিলেন আপনি।”

এ কথায় কুহু বড়ো বড়ো চোখে চাইল। দীপ্রর মুখে আপনি শুনতে অদ্ভুত ই লাগে। পাশ ফিরে দীপ্র বলল,”যতটা জ্বালিয়েছিস,তার এক ভাগও জ্বালালে, তুই সহ্য করতেই পারবি না।”

কুহু কথা বাড়ায় না। সামনের দিকে দৃষ্টি রাখে। দীপ্রই বলে,”কোথায় যাবি?”

ঠিক কতদিন পর একসাথে বের হওয়া হলো, কুহুর ও মনে নেই। দীপ্র ফের বলল,”কী হলো? কোথায় যেতে চাস?”

কুহু একটু ভেবে বলল,”নদীর পাড়ে নিয়ে যাবেন? অনেকদিন হয় যাই না।”

দীপ্র একটু চেয়ে রইল। তারপরই গাড়ি ঘুরিয়ে আনল নদীর দিকে। কুহুদের এলাকার শেষ মাথায় বিশাল এক নদী রয়েছে। আগে জায়গাটা খুব জমজমাট হলেও এখন শান্ত। কেউ আসে না বললেই চলে। দীপ্র গাড়ি থামাতেই কুহু নেমে গেল। একাই সামনে এগোতে লাগল। চোখ দুটো মুদিত করে কয়েকবার দম নিতেই ও খেয়াল করল দীপ্র ভাই ওর কাছে। কাছে মানে খুব কাছে। ও নড়তে যেতেই দীপ্রর শক্তপোক্ত হাত খানা ওকে পেছন থেকে জড়িয়ে নিল। ঘাড়ে থুতনি রেখে বলল,”কতদিন হয়,জড়িয়ে ধরি না তোকে।”

কুহুর যে খুব কান্না পায়। বুকের ভেতরটা কেমন করে। মানুষ যখন একবার ভালোবাসা পেয়ে যায় তখন তার মন বেহায়া হয়ে যায়। বেহায়া মন বার বার ভালোবাসা পেতে ব্যাকুল হয়ে উঠে।

“আমাকে তো ভুলেই গেছেন।”

মেয়েটির কণ্ঠে কী অভিমান মিশে? দীপ্রর হাতের বাঁধন আরো প্রকট হয়। কুহু ছাড়াবার চেষ্টা করে না। ওভাবেই থাকে।

“ভুলে গেছি কেন মনে হলো?”

“মনে হবে না? ঠিক ঠাক দেখাও তো করেন না।”

দীপ্র থেমে থাকে। কুহু জানে না রোজ নিয়ম করে দীপ্র ওকে দেখে। ও যখন ঘুমিয়ে থাকে, দীপ্র আলগোছে মেয়েটির পাশে এসে বসে। দেখে দু চোখ ভরে। কুহু নাক টানে।

“কাঁদছিস নাকি?”

“কাঁদব কেন?”

বলে নিজেকে ছাড়াতে চায় মেয়েটি। দীপ্র ছাড়ে না। আরো গাঢ় হয় হাতের বাঁধন। নাকটা গলার কাছে ঘষে নিয়ে বলে,”সরি। খুব ব্যস্ত হয়ে গেছি আমি। অথচ আমার এমনটা করা উচিত হয়নি।”

কুহু জবাব দেয় না। ওর অভিমান ও কমে না। দীপ্র এবার হাতের কৌশলে মেয়েটি নিজের দিকে ফেরায়। কুহুর দৃষ্টি পাশে। আকাশ ঝকঝকে তকতকে। অথচ আজ এই মুহূর্তে এক পশর্ল বৃষ্টির বড়োই প্রয়োজন ছিল।

“এত অভিমান হয়েছে?”

“আপনি কী বলেছিলেন?”

দীপ্র একটু ভাবে। বোঝার চেষ্টা করে। তারপরই এগিয়ে যায় মুখের কাছে। এক হাতে গাল ছুঁয়ে বলে,”তুই চাইলে তো আমি যখন তখন থাকতে পারি। কিন্তু তুই ই তো বলেছিলি পরিবারের জন্য অপেক্ষা করতে।”

“আমি বললেই শুনতে হবে? সবসময় আমার কথা তো শোনেন না দীপ্র ভাই।”

এ কথায় দীপ্র অবাক না হয়ে পারে না। এটা সেই কুহু? সেই লাজুক কুহু? ও ভাষা হারিয়ে ফেলে। মেয়েটি কি খুব বড়ো হয়ে গেল? যেচে ভালোবাসা চেয়ে নেয়ার মতন বড়ো? দীপ্র দু হাতে ওর মুখটা তুলে নেয়। কুহু দৃষ্টি নামায়। ও খুব বেশি সময় স্থির থাকতে পারে না। নড়েচড়ে উঠে। ছাড়াতে চায়। কিন্তু দীপ্র দেয় না। বরং মেয়েটিকে আরো শক্ত করে চেপে ধরে। কয়েক সেকেন্ড থেমে থেকে চুমু খায় মন ভরে।

দীপ্র-কুহু ফিরতেই দেখা গেল বসার ঘরে সবাই এসে বসেছে। রাত্রি কিছু একটা ইশারা করছে। কুহু বুঝে নি তখনো। ও এগিয়ে এসে বলল,”সবাই এভাবে জড়ো কেন হয়েছে?”

“সেটা তো জানি না। তবে মনে হচ্ছে স্পেশাল কিছু।”

কুহু সামনের দিকে চায়। দাদিজান অসুস্থ গলায় ডাকেন,”দীপ্র।”

দীপ্র এগিয়ে যায়। বৃদ্ধার পাশে বসে। হাতটা তুলে নিয়ে চুমু খায়। বৃদ্ধার অন্তরটা কেমন যেন শান্তিতে ভরে উঠে। এই নাতিকে তিনি একটু বেশি ভালোবাসেন, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

“দাদিজান, কেমন আছেন আপনি?”

“আমার কথা তোমার মনে আসে?”

“এ কথা কেন বলছেন? আপনাকে কীভাবে ভুলি?”

বৃদ্ধা নাতির দিকে চেয়ে থাকেন। এত সুন্দর এই মুখখানা যে, চেয়ে থেকেও মন ভরে না। তিনি বুক ভরে দম নেন। আদরের সহিত নাতির গাল ছুঁয়ে বলেন,”বোসো।”

ঠিক পাশেই দীপ্র বসে। বৃদ্ধা এবার বলেন,”দবীর, তুমি বলবা নাকি আমি বলব?”

দবীর দেওয়ান মুখ তুলে চান। ছেলের সাথে চোখাচোখি হয় তার। তিনি খুব বেশি সময় তাকাতে পারেন না। তার ছেলের দৃষ্টি মারাত্মক। এটা নিয়ে দ্বিধা নেই। তিনি তড়িঘড়ি করে দৃষ্টি ফিরিয়ে বলেন,”আপনিই বলেন আম্মা।”

“ছোট বউ, তুমি?”

এক কোণে দাঁড়িয়ে আছেন ববিতা। বৃদ্ধার ডাকে ধ্যান ফিরে। তিনি মেয়ের দিকে চান। তারপর বলেন,”আপনি বল‍লেই ভালো হয় আম্মা।”

দু পক্ষের সম্মতি পেয়ে, বৃদ্ধা বলেন,”কুহু কই? কোথায় লুকিয়ে আছে?”

কুহু ছিল পেছনের দিকে। ও এগোয়। বলে,”এই তো দাদিজান।”

“এদিকে আয়।”

কুহু কাছে এগোয়। দাদিজানের আরেকপাশে বসতে যেতেই তিনি বলেন,”এখানে না।”

বৃদ্ধা ফের দীপ্র পাশ দেখিয়ে বলেন,”ওপাশে বোস। দীপ্রর পাশে।”

কুহু বসতে পারে না। দ্বিধা কাজ করে। কেমন একটা অনুভূতি হয়। ও মায়ের দিকে চায়। মা ইশারা করতেই নরম পায়ে গিয়ে বসে দীপ্র ভাইয়ের পাশে। দীপ্র এক পলক দেখে নেয় মেয়েটিকে। পরিবারের সবার সামনে একটু বেশিই লাজুক হয়ে পড়েছে। অথচ তখন মুখ ফুটে কত বড়ো কথা গুলো বলল!

“একটা কথা তো জানো। দেয়ালের ও কান থাকে। তোমরা বিয়ে করেছ, এ কথা দেওয়ান বাড়ির বাইরেও কম বেশি পৌঁছে গেছে।”

কুহুর দৃষ্টি নত হয়ে যায়। বুঝে না কিছু। হাঁসফাস লাগে খুব। বিয়ের বিষয়টি এলেই ওর মনে হয়, শ্বাসরোধ হয়ে যাবে। ওদিকে দীপ্র ভাই শান্ত। একদম স্থির। এই মানুষটার হৃদয়ে কোনো চিন্তাই কি নেই?

“কোন পরিস্থিতি, কীভাবে বিয়ে হয়েছে ওসব পুরাতন আলাপ। ওগুলো না আনি। আমি চাই,এখন সবার সামনে তোমাদের চার হাত এক হোক। সবাই সবটা জানুক।”

মায়ের পর এবার দবীর কথা বলার প্রয়োজন মনে করলেন। বললেন,”হ্যাঁ, এবার একটা মিটমাট হওয়া ভালো। আমিও আম্মার সাথে এক মত।”

এ কথার পরপরই দীপ্র বলল,”মিটমাট হোক। আমার তো সমস্যা নেই। কুহু তাহলে আমার সাথে থাকুক?”

বসার ঘরে থাকা সকলের চোখ, বড়ো হয়ে গেল। কেউ কেউ মিটিমিটি হাসতে লাগল। কুহুর হাত পা সমস্ত শরীর অবশ হবার উপক্রম। পরিবারের সামনে কেমন যেন লাগছে। দবীর ছেলের কথার বিপরীতে কথা খুঁজে পেলেন না। চাইলেন স্ত্রীর পানে। জেবা চুপচাপ। তিনি আগেই বলেছিলেন ছেলে-মেয়েদের চার হাত এক করা হোক। কিন্তু তার স্বামীর বাহানার শেষ ছিল না। সব মিলিয়ে এবার বুঝুক ঠ্যালা। ঠিকই আছে, এবার তো ছেলে নির্লজ্জের মতনই বলে ফেলল কথাটা। দীপ্র তখনো স্থির। দাদিজান নাতির হাত ধরলেন। হেসে বললেন,”আর কয়টা দিন ধৈর্য রাখো ভাই। এত অধৈর্য হলে হয়?”

কুহুর মন চায় উঠে চলে যেত। এক ছোটে সবার থেকে আড়াল হতে। ওর ই ভুল। ও যদি আগ বাড়িয়ে এক সঙ্গে থাকার বিষয়টা না বোঝাত, তবে দীপ্র ভাই এভাবে হয়তো বলতেন না। রয়ে সয়ে বলতেন। দীপ্র হাসল। কুহুকে একবার দেখে নিয়ে দাদিজানের দিকে দৃষ্টি ফেরাল। বিড়বিড় করে বলল,”ধৈর্য তো ভেঙেই গেছে দাদিজান। আর একবার ধৈর্য ভাঙলে, তা ফের ধরে রাখা ভীষণ মুশকিল।”

প্রিয় পাঠক, আগামীকাল “দূর পাহাড়ের দেশে” ও “অনুভূতির লাস্টে স্টেশন” বই দুটোর অটোগ্রাফ ইনশাআল্লাহ। যারা অটোগ্রাফ ও অধিক ছাড় মিস করতে চান না তারা এখনই অর্ডার করে ফেলুন।

চলবে….
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply