প্রণয়ের_রূপকথা (৬৭)
কুহু বরাবরই হালকা সেজে থাকে। ভারী মেকাপ করা হয় না একদমই। তবে রাত্রিপুর বিয়ে বলে কথা। না সেজে পারা যায়? তাই মেকাপ আটির্স ওকে সাজাচ্ছে। ওকে সাজাতে সাজাতে মেয়েটি বলল,”আপনি আজ কত জনের ক্রাশ হবেন তাই ভাবছি। প্রপোজ পাওয়ার জন্য প্রস্তুতি রাখুন।”
কুহুর বলতে হলো না। পাশ থেকে হেসে রাত্রিই বলল,”সে সুযোগ নেই আপু। আগেই বুকিং।”
“তাই নাকি? প্রেমিক আছে তবে?”
কুহু মিনমিনে সুরে বলল,”না।”
“প্রেমিক নেই? তাহলে?”
“আমি ম্যারিড।”
এ কথা বলতেই আর্টিস্ট মেয়েটা হেসে বলল,”তাই নাকি? এইটুকু মেয়ে, বিয়েও হয়ে গেছে! লাভ ম্যারেজ বুঝি?”
এবার কুহু আসলেই বিপাকে পড়ল। এটাকে ঠিক কী ম্যারেজ বলে? ও জানে না। তাই রাত্রির দিকে অসহায় ভাবে চাইল। রাত্রি হেসে বলল,”অ্যারেঞ্জ প্লাস লাভ। কুহু কিন্তু সম্পর্কে আমার বোন ও ভাবি হয়।”
“তার মানে কাজিনের সাথে বিয়ে হয়েছে?”
“হুম।”
“বাহ। দারুণ ব্যাপার। খুব সুখী হও। অবশ্য আজ তোমার বর হার্ট বিট মিস করবে। খুব সুন্দর লাগছে।”
কুহুর লজ্জা লাগছে। ও মাথা নামিয়ে ফেলল। আর্টিস্ট মেয়েটা বের হতেই রাত্রি এসে দাঁড়াল ওর পাশে। কুহু ও দাঁড়িয়ে গেল। রাত্রি ওর দিকে মুগ্ধ হয়ে চেয়ে রইল। কুহু এমনিতেই ভীষণ সুন্দরী। চেহারায় বাড়তি মায়া ও আছে। আজ মেকাপে সেই রূপে আরো বেশি গ্ল্যামার যোগ হয়েছে। ওকে নায়িকাদের অনুরূপ লাগছে।
“এভাবে কী দেখো রাত্রিপু?”
“তোকে দেখছি আর ভাবছি।”
“কী?”
“আজ দীপ্র ভাইয়ের মাথা নষ্ট হবে।”
“এই যা। এভাবে বোলো না প্লিজ।”
“হুম, এভাবে বলব না ঠিক আছে। তবে মিলিয়ে নিস, আজ আর তাকে আটকাতে পারবি না।”
কুহু অসহায়ের মতন চাইল। রাত্রি হেসে ওর গাল ছুঁয়ে দিল। বলল,”বোকা, ভালোবাসার মানুষকে দূরে সরাতে নেই। আমি তো জানি সেই ছেলেবেলা থেকে দীপ্র ভাইয়ের প্রতি কতটা আবেগ তোর।”
“রাত্রিপু তুমি…
ও কথা পুরো করতে পারে না। রাত্রিই বলে,”আমি জানি কুহু। সবটা জানি। শোন বোন, মামার মৃ ত্যুতে তুই নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিস। তবে তোর হৃদয়ে যা জমে আছে, তা কিন্তু হারায়নি। না হলে এই বিয়েটা হোতো না বোন। হোতো না। আর অপেক্ষা করাস না। ভালোবাসতে চাইলে, ভালোবাসতে দিতে হয়। সে ও কিন্তু মানুষ।”
কুহু দৃষ্টি নামিয়ে ফেলে। ওর বুকের ভেতরে ধীম ধীম করে। রাত্রি আদরের সহিত বলে,”ভেবে দেখ বোন। আমি আসছি।”
ও চলে যেতেই কুহু আয়নার সামনে এসে দাঁড়ায়। নিজেকে দেখে। নতুন ভাবে দেখে ও। তারপর ফিরে যায় অতীতে। যেই অতীতে, দীপ্র ভাই নামক এক পাগলামি চলত। যাকে নিয়ে রাত ভর রূপকথার স্বপ্ন বুনত ও।
দীপ্র তৈরি হচ্ছিল। পারফিউমটা হাতে নেওয়া মাত্রই কক্ষের দরজায় নক পড়ল। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, দীপ্রর মন বলল এটা কুহু। ও নিশ্চিত হতে শুধাল,”কুহু?”
“জি।”
“ভেতরে আয়।”
কুহু বেশ অবাক হয়েছে। দীপ্র ভাই তার উপস্থিতি কীভাবে টের পেল? অন্য কেউ ও তো হতে পারত। নাকি আন্দাজে ঢিল দিয়েছে। ও বিহ্বলের মতন চেয়ে আছে। দীপ্র উঠে দাঁড়িয়েছে। গায়ে হলুদের পাঞ্জাবি। কুহু নজর ফিরিয়ে বলল,”কীভাবে বুঝলেন, আমি এসেছি?”
“বুঝেছি কোনো এক ভাবে।”
বলে দীপ্র এক পা আগাল। এবার ভালো মতন মেয়েটিকে দেখা গেল। আলোতে ওকে দেখে দীপ্র মৃদু হাসল। কুহুর খানিকটা অস্বস্তি হচ্ছে। ও হাত কচলাতে শুরু করেছে। দীপ্র আরেকটু এগোল। দূরত্ব কমাল। কুহুর দৃষ্টি তখনো নত করে রাখা।
“সুন্দর লাগছে।”
দীপ্রর মুখ থেকে এই ছোট্ট বাক্যটাও যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতন লাগে। কুহুর হৃদয়ে মিষ্টি হাওয়া এসে দোল দেয়। ও বুক ভরে দম নিতেই টের পায় দীপ্র ভাইয়ের গায়ের সুবাস। এই সুবাসে আলাদা মাদকতা আছে। যা কুহুকে সেই ছেলেবেলা থেকে টানে। তখন এই অনুভূতিটা ঠিক ঠাক টের পেত না ও। কিন্তু বড়ো হওয়ার সাথে সাথে এই অনুভূতিটা ওর মস্তিষ্ক ঠিকই ধরতে পারে। ওর চুপচাপ, এমন অস্বস্তি অনুভূতি থেকে দীপ্র শুধায়,”কিছু বলবি না?”
এ কথায় ধ্যান ভাঙে ওর। ও বলে,”জি। থ্যাংঙ্কিউ।”
দীপ্র পুনরায় হাসে। দৃষ্টি নামায়। কুহুর পায়ে জুতো নেই। পা খালি। কোমল পা দুটো অদ্ভুত সুন্দর। ছেলেটির দৃষ্টি খেয়াল করে কুহু দ্রুত পা জড়োসড়ো করে। দীপ্র মাথা তুলে এবার। দূরত্ব রেখেই বলে,”একদম রুমে চলে এসেছিস। যদি ধৈর্য হারাই? তখন কী হবে?”
কুহু জানে না কী হবে। ও এসেছে প্রশ্রয় দিতে। নিজেকে এবং দীপ্র ভাইকে। তবু মিথ্যে মিথ্যে বলে,”জানি, হারাবেন না।”
“এত বিশ্বাস?”
এ প্রশ্নের আর জবাব আসে না। দীপ্রও অপেক্ষা করে না। ও পুনরায় বলে,”আর কিছু বলবি?”
“বলব।”
“বল। আমি শুনছি।”
বিষয়টা কীভাবে বলবে কুহু বুঝতে পারে না। আসার পথে কত কিছুই তো সাজাল। কিন্তু এখন আর সেসব মনে আসছে না। সবসময় এমন হয়। ও যা ভাবে, তা করতে পারে না। দীপ্র ভাইয়ের সামনে এলোমেলো হয়ে যায় সব। আর আজ তো ও এসেছে প্রশ্রয় নিয়ে। তবে গলা শুকিয়ে যাচ্ছে।ও শুকনো গলাটা ঢোক গিলে ভিজিয়ে নেয়। হাত কচলাতে কচলাতে বলে,”একটা জিনিস দেখাতে এসেছিলাম।”
“কী জিনিস? দেখা তো।”
উত্তর পেয়ে কুহু এবার বুক ভরে দম নেয়। ওর অস্বস্তি, নিশ্বাসের গতি, চোখের দৃষ্টি সবটাই লক্ষ্য করছে দীপ্র। তবে আগ বাড়িয়ে কিছু বলে না। ওকে সময় দেয়। কিছু সেকেন্ড পর, কুহু হাত বাড়িয়ে দেয়। দীপ্র নজর ঘুরিয়ে আনে। দেখে ওর হাতে নিজের নামটা। কুহু মিনমিনে সুরে বলে,”এটাই দেখাতে এসেছি।”
দীপ্রর অধরে মৃদু হাসি এসে ধরা দেয়। দূরত্ব কমালেও, খানিকটা দূরত্ব তো ছিলই। সেটা আরেক ধাপ কমিয়ে আনে ও। কুহুর মন আর মস্তিষ্ক দ্বিধায় পড়ে। পিছু হটতে চেয়েও ও পারে না পিছু হটতে। দাঁড়িয়ে থাকে। দীপ্র আলগোছে ওর হাতটা তুলে নেয়। দীপ্র ভাইয়ের বড়ো হাতের কাছে ওর ঐ তুলতুলে হাতটা নেহাতই বাচ্চা। ওর শরীরে শিহরণ বয়ে যায়। দীপ্র বলে,”এখানে কী লেখা কুহু?”
এ কথায় তাজ্জব বনে যায় কুহু। দীপ্র ভাই কি মশকরা করছে তার সাথে? বাংলা কি তিনি পড়তে জানেন না?
“বল, কী লেখা।”
“আপনি, আপনি পড়তে পারছেন না?”
“উহু। পারছি না। তুই বল।”
ও আবারো পড়ে বিপাকে। দীপ্র ওর হাতটা তখনো ধরে আছে। এই স্পর্শে এমনিতেই মোহ মেশানো। কুহু হাতটা ছাড়িয়ে নেবে, সে শক্তিও পাচ্ছে না। ও হতাশ হয়ে যায়। এই প্রশ্রয় দেয়ার বিষয়টা মোটেও সহজ হয়। কুহুর বুকের ভেতর আনচান করে। দীপ্র আবারো বলে,”বল কুহু। বল এখানে কি লেখা। বল প্লিজ। জান আমার, বল না।”
দীপ্রর কণ্ঠে আকুতি। ওর চেষ্টা আরো দূরত্ব কমানোর। কুহুর আসলেই এবার দম বন্ধ হয়ে আসতে চায়। দীপ্র এগোয়। হাত ছেড়ে কোমর জড়িয়ে ধরে। হাতের জোরে একদম কাছে টেনে আনে। কুহুর বুকের ভেতর ঝড় উঠে। ও কথা হারায়। দীপ্র অন্য হাতের সাহায্যে মেয়েটির গাল ছুঁয়ে দেয়। ধীরে ধীরে তা নেমে আসে ঠোঁটের কাছে। কুহুর নিশ্বাস ভারী হয়ে এসেছে। দীপ্র বলে,”এভাবে সেজে গুজে আমাকে শাস্তি দিতে চাচ্ছিস? তুই জানিস, বুকের বাঁ পাশটায় কী চলছে? কী চাইছে সে। কুহু, আমার জান,আমি ভুল করে ফেললে, তখন আমায় মাফ করবি তো? বল মাফ করবি। বল প্লিজ। বল জান।”
বলতে বলে, দীপ্র নিজেই বলতে দেয় না। কুহুর ঠোঁটে আঙুল চেপে ধরে। মুখটা কানের কাছে এনে বড়ো করে দম নেয়। ঠিক তখনই দরজায় এসে কড়া নাড়ে অরণ্য। চ্যাঁচিয়ে বলে,”দীপ্র, আর কত সময় নিবি ভাই?”
ওর কণ্ঠে দীপ্রর হাতের বাঁধন আলগা হয়। ছাড় পেয়ে কুহুও নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়। দ্রুত অন্যপাশ ফিরে দৃষ্টি লুকায়। বড়ো বড়ো করে দম নেয়। দীপ্র একবার কুহুকে দেখে নিয়ে, বড়ো বড়ো পায়ে এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে। অরণ্য কিছু বলার পূর্বেই চিবিয়ে চিবিয়ে ও বলে,”তোর মতন বন্ধু থাকার থেকে শত্রু থাকাও ভালো অরণ্য।”
এ কথায় অরণ্য বোকা বনে যায়। পর পর চোখের পলক ফেলে বলে,”আমি কী করলাম? ভেতরে কি তুই রোমান্স করছিলি নাকি? আমি তো শুধু….
বলে ও উঁকি দিতেই দেখতে পায় কুহু দাঁড়িয়ে। অন্যপাশ ফিরে আছে। অরণ্য বুঝে ভুল সময়ে এসেছে। বন্ধুর দিকে চায়। দীপ্রর চোখ-মুখ দেখে মেকি হাসি দেয়। তারপর অপরাধ স্বীকার করে বলে,”সরি ব্রো। আমি কি জানতাম এখানে কী চলছে? তোর যত সময় লাগে তুই নে। আমি সবাইকে ম্যানেজ করে নেব। নো চিন্তা। আমি আর বিরক্ত করব না। একদমই না।”
বলে দাঁত কেলাতে কেলাতেই চলে যায় অরণ্য। দীপ্র ফোঁস করে দম ফেলে। দরজা লাগিয়ে পেছন ফিরতেই দেখতে পায়ে কুহু একদম জড়োসড়ো হয়ে আছে। ও নিজেকে সামলায়। ধৈর্য ধরে। বলে,”সবাই অপেক্ষা করছে। আমাদের যেতে হবে কুহু।”
চলবে….
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি
Share On:
TAGS: প্রণয়ের রূপকথা, ফাতেমা তুজ নৌশি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৩৪
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১৪
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৩২
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৫২
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৫
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৩৫
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪০
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৩
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১৫