Golpo romantic golpo প্রণয়ের রূপকথা

প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪০


প্রণয়ের_রূপকথা (৪০)

রাত্রির মনটা ভালো নাকি খারাপ তা বোঝা যাচ্ছে না। ও রেডি হচ্ছে। পাশেই বসা কুহু। ও দেখছে। ওর ভালো লাগছে না। রাত্রিপুর এমন ভাব ওর ভালো লাগছে না।

“রাত্রিপু।”

ডেকে ঘরে প্রবেশ করল কণা। ওর মাঝে চঞ্চল ভাব দেখা যাচ্ছে।

“কী রে।”

“রাত্রিপু! তোমাকে তো পরী লাগছে।”

বলে কাছে এসে জড়িয়ে ধরল কণা। রাত্রি হেসে বলল‍,”বুড়ো হয়ে গেছি। আর বলছিস পরী লাগছে?”

“উফ, যা তা কথা। তুমি বুড়ো কোথায়?”

“কী বলিস,বুড়ো না? বয়স তো কত হয়ে গেল। ঠিক সময় বিয়ে করলে তোর সমান বাচ্চা থাকত আমার।”

“কী বিরক্তির কথা! তোমার বয়স তো পঁচিশ ও হয়নি। শুধু শুধু নিজেকে বুড়ো বলছো।”

রাত্রি ফোঁস করে দম ফেলে। তার বয়স বেশি না কম এ নিয়ে আগে কখনো মাথা ব্যথা হয়নি। আজকাল হচ্ছে। মনে হচ্ছে, সত্যিই বয়স বেশি হয়ে গেছে। অথচ উচিত ছিল আগেভাগে বিয়ে করে সংসার করা।

“এই রাত্রিপু।”

“হ্যাঁ, বল রে কণা।”

“তোমার বর এসে গেছে।”

এ কথায় রাত্রি প্রতিক্রিয়া জানানোর আগেই ফোঁস ফোঁস করে ওঠল কুহু। ও বিছানা থেকে ওঠে এসে রাগি সুরে বলল‍,”কী সব কথা! বর কীভাবে হয়? এখনো বিয়ে হয়েছে? বিয়ে তো ঠিক ও হয়নি।”

ওর এহেন আচরণে কণা বেকুব বনে গেল। তার বোন এভাবে কখনো রিয়্যাক্ট তো করে না। আজ হলো কী? আর ও তো এত ভেবেও বলেনি। তাই হাবুলের মতন চেয়ে রইল।

“কুহু, ওকে বকছিস কেন? ও বুঝে বলেছে? আর এই ছেলে আমার বর হলেও তো হতে পারে।”

“তুমি, তুমি..

বলে কথা আটকাল কুহু। কণা তখনো চেয়ে। রাত্রি ওর গাল ছুঁয়ে বলল,”আমি আসছি বোন। তুই যা। আর কুহুর কথায় পাত্তা দিস না তো। এই ছেলের ছোট ভাই নেই তো, তাই ওর রাগ হয়েছে। ভাই থাকলে, আমার জা হয়ে যেত যে।”

অন্য সময় হলে কণা বলত,’কখনোই না। রাত্রিপু কুহুপু তোমার জা হতেই পারে না। ও তোমার ভাবি হবে। আমার ও ভাবি হবে। আর দীপ্র ভাইয়ের বউ হবে। কিন্তু আজ একটি শব্দও বলল না। ও আসলেই আহত হয়েছে। শব্দহীন ভাবেই কক্ষ ত্যাগ করল। রাত্রি এল কুহুর কাছে।

“কুহু শোন।”

কুহু মাথা তুলে চাইল। ওর কেন যেন কান্না পাচ্ছে। রাত্রির সাথে ওর চোখাচোখি হলো।

“বোন, আমি বুঝতে পেরেছি অরণ্যকে তোর খুব পছন্দ। তুই চাস ওর আর আমার সবটা ঠিক হোক।”

“রাত্রিপু।”

বলে কুহুর চোখ দুটো টলমল করে ওঠল। রাত্রি আলতো হেসে বলল,”শোন বোন, যা হবার তা হবেই। অন্যের মতামতকে প্রাধান্য না দিয়ে নিজের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। এতদিন আমিও ভুল বলে এসেছি। দীপ্র ভাইয়ের সাথে তোর বিয়ে হবে কি না, এটা তোর আর দীপ্র ভাইয়ের সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত। একপাক্ষিক তো কিছু না। আর অন্যের চাপিয়ে দেয়া মতামত ও না।”

কুহু আজ এ বিষয় নিয়ে কিছুই বলল না। ও রাত্রিপুর দিকে করুণ চোখে তাকাল।

“আমার মনে হয়, অরণ্য ভাইয়া তোমাকে এখনো ভালোবাসে।”

“সেটা জানি।”

“তাহলে, সব কেন ঠিক হচ্ছে না?”

“ইগো। ওর ও বেশি। আর আমারও। এভাবে সংসার হবে না রে।”

বলে রাত্রি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ওর মুখে এতক্ষণ কষ্ট না থাকলেও এখন একটা আক্ষেপ আছে। ও কুহুর মাথায় হাত ছোঁয়াল।

“তুই অনেকটা চেষ্টা করেছিস। আমি সেসব দেখেছি। কিন্তু ভাগ্যে না থাকলে হয় না রে। আমি আশা রাখিনি। যা হবার হবে।”

বলে রাত্রি বেরিয়ে গেল। কুহু ওর যাওয়ার পানে চেয়ে বুঝতে পারল, রাত্রির আসলেই অভিমান হয়েছে। ও অপেক্ষায় ছিল। ভেবেছিল অরণ্য কিছু একটা বলবে। বলবে বিয়েটা না করতে। কিন্তু তেমন হয়নি। অরণ্য ওর জন্যও এখানে আসেনি। ভালোবাসাটা আসলেই ফিঁকে হয়ে গেছে। আর ফিঁকে হওয়া ভালোবাসা, পূর্ণতা পায় না। কখনোই না।

নিচ তলায় রাত্রিকে দেখানো হচ্ছে। সিঁড়ি থেকে দেখেই কুহু চলে এল দীপ্রর ঘরের দরজার কাছে। দীপ্র আজ বাসায় আছে। তবে বের হয়নি নিজ ঘর থেকে। এমনকি রাত্রিকে যে দেখতে আসবে, এ বিষয়েও তার আগ্রহ নেই। এমনকি বাঁধাও নেই। কুহুর আসলেই রাগ হলো। অন্তত দীপ্র ভাই কিছু করতে পারতেন। কুহু দাঁড়িয়ে আছে দরজার কাছে। দীপ্র কাজ করছিল। ল্যাপটপের স্ক্রিনে মেয়েটিকে দেখতে পেয়েই মুখ দিয়ে আপনা আপনি বের হয়ে এল।

“কুহু।”

কেঁপে ওঠল মেয়েটি। অন্যরাও কুহু বলেই তো ডাকে। তবে দীপ্রর এই নাম ধরে ডাকাটা ওর নিশ্বাস চেপে ধরে। বুকের ভেতর নতুন একটা আওয়াজের আর্বিরভাব ঘটায়। দীপ্র পেছন ফিরে তাকিয়েছে। কুহু হাত কচলাতে লাগল। যতটা রাগ, অভিমান নিয়ে দরজার কাছে এসেছিল, তার সবটাই মিলিয়ে গেল। এখন একটা চাপা অনুভূতি তৈরি হয়েছে। একটা সংকোচ, অস্বস্তি মিশ্রিত অনুভূতি।

“দাঁড়িয়ে কেন?”

“আপনি কাজ করছেন।”

“তো?”

তো শব্দতে যেন দীপ্র এক বুক অধিকার দিয়ে দিল। কুহুর দুটো চোখে অস্বস্তি। ভেতরে ঝড়। ও ধীর পায়ে কক্ষের ভেতরে এল। দীপ্র ল্যাপটপের স্ক্রিন নামিয়ে ওঠে দাঁড়াল। মুহূর্তেই কুহু দেখল, একটা শক্তপোক্ত বুক ওর চোখের সামনে ভেসে ওঠেছে। এতদিনে কুহু খেয়াল করে নি, দীপ্র ভাই আসলে খুব লম্বা। একটু বেশিই বটে।

“কী দেখিস?”

কুহু চেয়ে ছিল এক দৃষ্টিতে। হুট করে দীপ্রর কণ্ঠ পেয়ে খানিকটা থতমত খেল। দৃষ্টি ঘুরিয়ে বলল,”কিছু না তো।”

“কিছু না?”

“না। কী দেখব?”

“কিছু দেখার নেই?”

কুহু চোখ দুটো মুদিত করল। মাঝে মাঝে ওর যে কি হয়। ও দু বার শ্বাস নিয়ে বলল,”আপনি এখনো কিছু করবেন না?”

ওর কথার মানে যদিও বুঝেছে, তবু না বোঝার ভান ধরল দীপ্র। শুধাল,”কী করার কথা বলছিস?”

“রাত্রিপুকে দেখতে এসেছে।”

“তো?”

“কিছু করবেন না?”

“কী করব?”

“কী করব বলতে? আপনার কিছু করার নেই?”

“না নেই।”

“কেন নেই?”

“কারণ, বিয়েটা রাত্রির। তোর নয়।”

শেষ কথায় কুহু ভ্যাঁবাচ্যাকা খেল। বুঝলেও ধরা দিল না অবশ্য। বলল,”অরণ্য ভাইয়াকে একটু বলেন না।”

“কী বলব? বলব রাত্রিকে বিয়ে কর? কুহু, রাত্রি ফেলনা নয়। অরণ্য ও ফেলনা নয়। নিজেদের সম্পর্কের জন্য, কাউকে না কাউকে একটু নরম হতেই হয়। কিন্তু ওরা সেটা করছে না।”

“কেন করছে না?”

কুহু এত অবুঝের মতন কথাটা বলল। ওর আসলেই খারাপ লাগছে। ও বহুদিন পর, একটা কিছুর জন্য এত মড়িয়া হচ্ছে। ওর মুখের পানে চেয়ে দীপ্র শুধুই হতাশার শ্বাস ফেলল।

“বোস।”

কুহু বসল না। দীপ্র আবারো বলল,”বসতে বলেছি।”

যন্ত্রের ন্যায় বসল কুহু। মনটা বিষণ্ণ হয়ে রইল। কুহু বসেছে বিছানায়। দীপ্র ওর বরাবর মেঝেতে হাঁটুগেড়ে বসল। কুহু থমকাল। পরের মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিল।

“কুহু।”

সরাসরি দীপ্রর চোখের দিকে চাইল কুহু। কয়েক সেকেন্ড পর একটা জিনিসই বুঝল, দীপ্র চোখ দুটো দারুণ সুন্দর। ও চেষ্টা করেও দৃষ্টি ফেরাতে পারল না।

“একটা ব্যাপার বলি? একটু ভেঙেই বলি? বলব?”

দীপ্র ভাই অনুমতি চাইছেন? কুহুর আসলেই বিশ্বাস হয় না। এই মানুষটাকে এককালে কঠিন মনে হয়েছিল। মনে হয়েছিল সবটা অন্যের ওপর চাপিয়ে দেয়া ছাড়া আর কিছুই পারে না। কিন্তু ও যে ভুল ছিল, তা আবারো প্রমাণ হলো। লজ্জাই লাগল ওর।

“একটা জিনিস তুই দেখ। সম্পর্ক আসলে দুজন মানুষের মনের বিষয়। একপাক্ষিক কিছু না। ধর আমার আর তোর বিয়েটা। যদিও বা হতো। তবে, তুই আমাকে মেনে নিতে পারতি? পারতি না কিন্তু। স্বাভাবিক কিছুই থাকত না। কেন থাকত না? কারণ আমাদের সম্পর্কে মায়া মহব্বত থাকত না। রাত্রি আর অরণ্যর বিষয়টা আরেকটু জটিল। ওরা একে অপরকে ভালোবাসে। চায় মন থেকেই। তবে ইগোর জন্য ওদের কিছু আগায় না। আমাদের দেয়া চাপের কারণে, যদি ওরা বিয়ে করেও নেয়, তবে সুখী হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। যেমনটা আমাদের ছিল। আমি যদি রাগ জেদ দেখিয়ে তোকে বিয়ে করেও নিতাম, দিনশেষে তুই কিন্তু আমাকে ঘৃণাই করতি কুহু। কখনো ভালো বাসতি না। বাসতি?”

দীপ্রর সব কথা শুনল কুহু। আসলে মানুষটা ওকে কী বোঝাল? ওর গুলিয়ে যাচ্ছে সবটা। অরণ্য আর রাত্রির বিষয়টা বলতে গিয়ে, অর্ধেকের বেশি তো নিজেদেরটাই বলে গেল। কুহু হাবুলের মতন চেয়ে। দীপ্র বোধকরি হতাশই হলো। এ মেয়েটি বোকা নয়। আবার চালাকও নয়। এ মেয়েটি কেমন যেন। তবে যেমনই হোক, দীপ্রর আদরের। খুব বেশি আদরের। আর আদরের বিধায়, খুব বেশি সময় রাগ করে থাকতে পারে না। আদতে নিজের যা কিছু, তা তো নিজেরই হয়। আর নিজের ওপর কখনো রাগ হয় না। যা হয়, তা ক্ষণিকের অভিমান। কুহু তো দীপ্র’রই।

চলবে….
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply