Golpo romantic golpo প্রণয়ের রূপকথা

প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৩


প্রণয়ের_রূপকথা (৩)

খেতে খেতে কুহু আর দীপ্র’র কয়েকবার চোখাচোখি হলো। ববিতা ও উপস্থিত আছেন। তবে তাকে প্রাণহীন মনে হচ্ছে। কুহু খাবার শেষ করে হাত ধুতে গিয়ে দেখল দীপ্র ভাই ও হাত পরিষ্কার করছেন। দীপ্র যখন পেছন ফিরল তখনই কুহুর সাথে দৃষ্টি মিলে গেল। কুহু নজর ফেরাল। দীপ্র তোয়ালে দিয়ে হাত মুছে নিতেই নত মস্তিষ্কে কুহু বলল,”টাকা গুলোর দরকার ছিল না।”

“দরকার আছে বলেই দিয়েছি। নিজের মতন খরচা করবি।”

“আমার চাই না। আপনি ফিরিয়ে নিন।”

দীপ্র চলে যেতে নিয়েও থেমে রইল। পেছন ফিরিয়ে এগিয়ে এল কয়েক পা। কুহু তখনো মাথা নামিয়ে।

“দেওয়া জিনিস ফিরিয়ে নিতে বলছিস?”

“জি। আমার প্রয়োজন নেই।”

“কিন্তু আমার দেওয়ার প্রয়োজন আছে। কুহু, আমি তোর দায়িত্ব নিয়েছি। তোর সব প্রয়োজন, অপ্রয়োজন, ভালো, মন্দ সবটা আমি দেখব। বুঝেছিস?”

কুহু বুঝুক কিংবা না বুঝুক, তবে তার প্রতিক্রিয়া এল না। দীপ্রও বোধহয় জবাবের আশা করেনি। তাই তো বড়ো বড়ো কদমে পা বাড়াল।

দীপ্র-কুহুর বিয়ে উপলক্ষ্যেই বাড়িতে এসেছে সবাই। এক সাথে এভাবে আসা হয়নি বহু বছর হয়ে গিয়েছে। বাড়িটা এখন যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। তবে এই প্রাণ ফিরে পাওয়ার মধ্যেও যেন কোথাও একটা না পাওয়া আছে। এই না পাওয়ার নাম কাদের। হাসি খুশি একটা মানুষ। জীবনের বেশি সময় পার হয়েছে স্কুলে। হেডমাস্টার কাদের দেওয়ান, বাচ্চাদের কাছে এক আলাদা আবেগের নাম। বকা ঝকা না করে তিনি বাচ্চাদের ভালোবেসে, বুঝ দিয়ে পড়াশোনা করানোর পক্ষে ছিলেন। তিনি যখন কথা বলতেন তখন সবাই হা হয়ে তাকিয়ে থাকত। সেই লোকটা হঠাৎ করেই মা রা গেলেন। এটা মেনে নেওয়া আসলেই কষ্টের। ববিতা স্বামীর ছবি খানা নিয়ে চোখের জল ফেলে যাচ্ছিলেন। কণা বেশ অনেকক্ষণ হলো মায়ের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। তবে মা সেটা টের পাননি। তিনি কেঁদে চলেছেন।

“মা।”

মৌন ভেঙে কথা শুরু করল কণা। মেয়ের কণ্ঠ পেয়ে চট করেই চোখ মুছলেন ববিতা।

“কণা? কখন এসেছিস? তোর শরীর ভালো?”

মেয়েটার জ্বর প্রায় সপ্তাহ হলো। এই আসে এই যায়। ডাক্তার দেখানো হয়েছে, তবু সুরাহা মিলছে না। একটু শহরে নিয়ে যে যাবে, সেই সুযোগটিও হচ্ছে না। কণা আলগোছে মায়ের পিঠ খানা জড়িয়ে ধরল। স্কুল শেষ করলেও, কণা একদম বাচ্চাই রয়ে গিয়েছে। কুহু যেমন বাবার নেউটা, কণা ঠিক তেমনই মায়ের নেউটা।

“কী হয়েছে রে? মন খারাপ?”

“বাবাকে মনে পড়ছে তোমার?”

কথাটা ওঠতেই ববিতার চোখ দুটো আবারো বেহায়ার মতন জল নামিয়ে দিল। কণা আরো শক্ত করে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরল।

“বাবাকে আমারো মনে পড়ছে মা। কতদিন হলো বাবাকে দেখতে পাই না। মনে হচ্ছে কত জনম চলে গেল।”

ববিতার চোখের জল মুছে নিলেন। এক হাতে মেয়ের মাথা খানা ছুঁয়ে বললেন,”খাবার খেয়েছিস?”

সবাইকে খাবার পরিবেশন করেই চলে এসেছিলেন তিনি। তাই মেয়েটার খাওয়া হয়েছে কি না তিনি জানেন না ঠিক।
“কী রে? খেয়েছিস?”

“তুমি তো খাওনি মা।”

“আমি? আমার তো ক্ষুধা লাগেনি রে। তুই খাস নি সেই কারণে? এমন করে কেউ!”

তিনি একটু তাগাদার মতন করেই ওঠে গেলেন। কণার শরীরটা দুর্বল।

“আয়,খাবি চল।”

“তুমি না খেলে খাব না মা।”

“আমিও খাব রে সোনা। আমিও খাব।”

বলেই মেয়ের গাল ছুঁয়ে দিলেন তিনি। কণার চোখে মুখে একটা আদুরে ভাব চলে এল। মা যে বড়ো আপন তার। এই মায়ের আঁচলের ছায়া চলে গেলে, কণা ম রে যাবে। একদমই ম রে যাবে।

মায়ের সাথে একটুখানি মনের দূরত্ব রয়েছে কুহুর। এটা একদম ছোট থেকেই। হয়তো বড়ো সন্তান বলেই অনেক কিছু সে বলতে পারে না। এদিক থেকে কণা আবার সেরা। মায়ের সাথে ভারী আহ্লাদ তার। তাই তো কণাকে মায়ের কাছে পাঠিয়েছিল ও। এখন মা খাবার খাচ্ছে। এটা দেখে ওর ভেতরে শান্তি শান্তি একটা অনুভূতি যোগ হলো। ও ছোট করে নিশ্বাস ফেলে নিজের ঘরের দিকে আগাচ্ছিল। ওমনি বিপদটা ঘটে গেল। একদম পা পিছলে পড়ল মেয়েটি। দীপ্র মাত্রই ছাদ থেকে ফিরছিল। ঘটনা দেখে হন্তদন্ত হয়ে এল। ব্যথা পেয়ে কুহু চোখ বন্ধ করে নিয়েছে। দীপ্র বেশ বিরক্তি নিয়ে বলল,”শুকনো বনে পড়লি কী করে? তোর স্বভাব আর বদলালো না!”

কুহুর আছাড় খাওয়া অনেকটাই নিয়মিত। বিশেষ করে ছোটবেলায় প্রচুর পা হড়কে পড়েছে সে। এতে করে তার শরীরে জখম ও হয়েছে। সেটা জানে দীপ্র। তাই তো প্রসঙ্গ টেনে কথাটা বলল। কিন্তু পড়ে গিয়ে কুহু যতটা ব্যথা পেয়েছে তার থেকে বেশি লজ্জা লাগছে। দীপ্র ওকে সাহায্য করল ওঠে দাঁড়াতে। যদিও বেশ একটা ব্যথা পেয়েছে তবু নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,”ঠিক আছি।”

“সিওর?”

“জি।”

“মনে তো হলো অনেকটা ব্যথা পেয়েছিস।”

“তেমন একটা না।”

“সত্যি তো?”

“হাঁ।”

বলে থামল কুহু। ধীরে পা ফেলতে গিয়ে বুঝল ব্যথা একটু নয় বরং অনেকটুকু। ও ঠোঁট কামড়ে নিজেকে শাসন করল। মনে মনে বুঝ দিল, কুহু তোর কিচ্ছু হয়নি। কিচ্ছু না।

কুহুর বুঝ দেওয়াটা কাজে লেগেছে। ব্যথা নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছে ও। অনেকটা দূর চলেও যাচ্ছিল। দীপ্র পেছন থেকে ডেকে ওঠল।

“কুহু, শোন।”

ডাক পেয়ে দাঁড়িয়ে গেল মেয়েটি। দীপ্রর ঘরটা কাছেই। ও চট করে রুমে গেল। ফিরে এল মুহূর্তেই। কুহু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে। দীপ্র ঔষধের প্যাকেটটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল,”ব্যথা পেয়েছিস, সেটা বোঝা যাচ্ছে। ঔষধটা খেয়ে নিস।”

ঔষধ হাতে তুলে নিল কুহু। দীপ্র একটা দীর্ঘশ্বাসের মতন করে বলল,”চলি রে। গুড নাইট।”

গুড নাইট। বাংলায় শুভ রাত্রি। দীপ্র কুহুকে শুভ রাত্রি জানাল। তবে,তবে কুহুর রাত্রি কি শুভ হবে? উহু না। শুভ হবে না তার রাত্রি। হবেই বা কেমন করে? এই যে দীপ্র ভাই তাকে ঔষধ দিয়ে গেলেন, তা তো খেল না ও। ব্যথায় সমস্ত রাত কষ্ট করল, তবে ঔষধ খেল না ও। এই না খাওয়ার পেছনে, অনেকটা অভিযোগ আছে। আছে অভিমান ও। কিন্তু সেসব কি দীপ্র ভাইয়ের হৃদয়কে ভেদ করে? কুহু শুধু প্রশ্ন করেই যায়। তবে তার উত্তর আসে না। তবু মেয়েটি নীরবে নিভৃতে প্রশ্ন করে বেড়ায়। ও যে এমনই। ওর সবটুকুই নিভৃতে।

| যারা দীপ্র-কুহুকে আগে পড়েছেন তাদের জন্য বার্তা। এবার আমি ১৮০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে লেখার চেষ্টায় আছি। কাজিন থীম মানেই গড়পড়তা একটা লেখা। তবে আমি ভিন্ন মাত্রা দেওয়ার চেষ্টা করব। আর আগামীকাল তো চাঁদ রাত, সবাই শুভেচ্ছা জানবেন। যারা আমার নিয়মিত পাঠক, তারা চাঁদ রাতে একটা বাঁকা চাঁদ পেতে চলেছেন। ইদের ছুটি নিলুম তিনদিনের।সবাই মন্তব্য জানাবেন।অপেক্ষায় আমি। |

চলবে….
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply