Golpo romantic golpo প্রণয়ের রূপকথা

প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২০


প্রণয়ের_রূপকথা (২০)

দুদিন গেলেও আসতে পারলেন না ববিতা। কাজ থেমে আছে। দাদিজানের শরীর খারাপের বাহানায় দুটো দিন বাড়িতেই ছিল কুহু। সে বরাবরের মতনই দাদিজানের যত্ন নিয়েছে। দীপ্র বলে দিয়েছিল বাড়ির কাজ বন্ধ রাখতে। আজ সকাল থেকে আবার কাজ শুরু হয়েছে। খটখট তার আওয়াজ। কুহুর ভালো লাগে না। ও বেশ বিরক্তির সুরে বলে,”এই কাজ গুলো কবে শেষ হবে। শব্দ গুলো মাথার পোঁকা বের করে নিচ্ছে।”

দাদিজান বললেন,”আর কিছুদিন। দীপ্র বলল কাজ প্রায় শেষের দিকে। এরপর রং করা হবে।”

রং করার কথা শুনেই কুহুর মনটা খারাপ হলো। সেটা বুঝে বৃদ্ধা বললেন,”ও কুহু। চেহারা ওমন করলি কেন?”

কুহু হতাশার মতন করে বলল,”রং না করলে হয় না দাদিজান?”

“কেন রে? রং করলে তো বাড়িটা নতুন হয়ে ওঠবে।”

“তা হবে। কিন্তু তাতে পুরনো সব ছোঁয়া হারিয়ে যাবে।”

বৃদ্ধা একটু থামলেন। তার নিজের ও কেমন খারাপ লেগে ওঠল। পুরাতন ঘর। পুরাতন জিনিসপত্র। সব কিছুতে আলাদা মায়া থাকে। থাকে আলাদা স্নেহ।

“যাক গে, রং তো করতেই হবে। না হলে বাকিদের আবার সমস্যা হবে।”

বৃদ্ধা কিছু বললেন না। কুহু ঔষধ নিয়ে দাদিজানকে খাইয়ে দিল। তারপর বলল,”আমার ভার্সিটি যেতে হবে। আপনি নিজের খেয়াল রাখবেন।”

“রাখব। তুই সাবধানে যাস।”

“হুম।”

বলে বের হলো কুহু। ও চলে যেতেই ঘরের মধ্যে প্রবেশ হলো আয়ানার। মেয়েটি বুঝেছে এই বাড়িতে দাদিজানের আলাদা কদর আছে। তাছাড়া দীপ্র ভাইও দাদিজানকে ভীষণ সম্মান করে চলে। তাই বৃদ্ধার সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখতে হবে।

বেশ কটা দিন পর দবীরের সাথে ভালোভাবে কথা হচ্ছে দীপ্রর। এক পর্যায়ে দবীর বললেন,”তোমার সমস্যা হচ্ছে না?”

“একটু তো হচ্ছে। দূর থেকে সব সামাল দেয়া কষ্টের।”

“তাহলে, ওখানে গিয়েই দেখো সবটা। তোমার নতুন ব্যবসা। প্রথম প্রথম ভালো রেসপন্স পেয়েছ। তাই বলে সব সময় কিন্তু তেমন থাকবে না। গুরুত্ব দাও।”

“হুম।”

বলে মৌন হলো দীপ্র। ছেলেকে এক নজর দেখে নিয়ে দবীর বলল‍েন,”তোমার মাথায় কী চলছে দীপ্র?”

“তেমন কিছু না বাবা।”

“উহু। তুমি কিছু একটা বলতে চাচ্ছ না। না বলতে চাইলে জোর করব না।”

“ভেবেছি, ব্যবসাটা আর কন্টিনিউ করব না।”

“মানে?”

“দেশেই থাকব।”

দবীর চুপ হলেন। একটু ভাবলেন। তারপর বলল‍েন,”এখানে তোমার পিছুটান কী দীপ্র?”

দীপ্র উত্তর দিল না। দবীর চোখ মুখ একই ভঙ্গিতে রেখে বললেন,”তুমি এখন যথেষ্ট বড়ো। তোমার সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার আছে। তাই আমি এখানে মন্তব্য করব না। তবে ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নিও। বার বার ভুল করলে সমস্যা।”

“হুম। দেখি,এখনো সিওর না।”

“আসব দীপ্র দাদাভাই?”

আয়ানা এসে ঠকঠক করল। দীপ্র আর দবীর তাকালেন দরজার দিকে। আয়ানা হাসি রেখেছে ঠোঁটে।

“আয়ানা, কী খবর মা? হাতে আবার কী?”

“চা এনেছি বড়ো চাচ্চু।”

বলে আয়ানা ভেতরে প্রবেশ করল। অধরে হাসি রেখেই টেবিলে রাখল। দীপ্র বলল,”আমি তো চা চাই নি।”

“তা চাওনি। কিন্তু মনে হলো আনলে মানা করবে না।”

দীপ্র চা ওঠাল। আয়ানা উৎসাহ নিয়ে বলল,”আমি বানিয়েছি।”

“তাই নাকি?”

“হ্যাঁ, বড়ো চাচ্চু। টেস্ট করে দেখো।”

দবীর কাপ তুলে নিলেন। চুমুক বসালেন। চায়ের স্বাদ ভালো হয়েছে। আয়ানা কোনো কিছুই করে খায় না বলা চলে। সে চা বানিয়েছে এটা ভাবতেই ভালো লাগা কাজ করছে।

“ভালো হয়েছে মা।”

আয়ানা খুশি হলো। একই সাথে দীপ্রর দিকে চাইল। দীপ্র চা কাপে চুমুক বসাতেই ও শুধাল,”কেমন হয়েছে?”

“ভালো। বেশ ভালো।”

আয়ানার ভেতরে শত শত প্রজাপতি উড়তে লাগল। ওর অধরে হাসি খানা মিশেই রইল।

“দাদিজানের তো চা খাওয়া নিষেধ। আমি গিয়ছিলাম। টেস্ট করাতে পারলাম না। এটার জন্য খারাপ লাগছে।”

“কদিন পর থেকে খেতে পারবেন।”

“হুম। এ কদিনে আমি আরো অনেক কিছু শিখে ফেলব। চাচ্চু,আমি যাই। তোমাদের আর বিরক্ত না করি।”

বলে ট্রে খানা ওঠাল আয়ানা। তারপর দীপ্রর দিকে চেয়ে বলল,”আসছি দাদাভাই।”

আয়ানা চলে যেতেই দীপ্র একটু স্বাভাবিক ভাবে বাবার দিকে চাইল। দবীর বললেন,”যে কোনো সিদ্ধান্ত ভেবে চিন্তে নিও।”

“জি।”

আয়ানার মনে হলো সে আকাশ জয় করে ফেলেছে। ও খুশি মনে ট্রে নিয়ে নিচে যাচ্ছিল। তখনই দেখল কুহু বের হচ্ছে।

“ভার্সিটি যাচ্ছিস নাকি?”

পেছন ফিরল কুহু। প্রচলিত কথায় আছে, যাওয়ার পথে পিছু ডাকা ভালো নয়। যদিও এসব কুসংস্কার। তবে যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা কথা গুলো অন্তরে কেমন গেঁথে যায়। কুহু ছোট করে নিশ্বাস ফেলল।

“হ্যাঁ। এই সেমিস্টারটা তো এমনি এমনিই কেটে গেল। এই ক্লাস গুলো না করলে পরীক্ষা দিতে পারব না।”

“তোর সেমিস্টার ফিও তো বাকি।”

“হ্যাঁ।”

“দীপ্র দাদাভাইয়ের থেকেই নিতি।”

“না।”

“তাহলে বাবাকে বলব। যেন ফি দিয়ে দেয়।”

আয়ানা আঘাত করতে চাইল নাকি সত্যিই সাহায্য করতে চাইল তা বোঝা মুশকিল। কুহু চাচ্ছিল একটু বসে যেতে। কিন্তু এবার তাড়া দেখিয়ে বলল,”দরকার নেই আয়ানাপু। আমি যাই। লেট হচ্ছে।”

কুহু পা বাড়াতেই আয়ানা তিরস্কারের হাসি হাসল। সেই হাসিটা অদূর থেকে দেখতে পেল কণা। কথায় আছে যে যারে দেখতে পারে না, তার সব খারাপ ঐ মানুষের চোখেই পড়ে। তাই হয়তো আয়ানার সকল খারাপ গুণ কণার চোখে ধরা পড়ে।

সারাদিন ভার্সিটি করে সন্ধ্যার দিকে বাড়ি ফিরছিল কুহু। মোড়ে এসে দীপ্রর সাথে দেখা। দীপ্র ও ফিরছিল। এমন জলজ্যান্ত মানুষকে সরাসরি এড়ানো কঠিন। ও না চাইতেও চোখাচোখি হয়ে গেল। অতঃপর দুজন এক সঙ্গেই পথ চলতে লাগল। একটু সময় পর দীপ্র শুধাল,”এত লেট কেন হলো?”

“ক্লাস শেষে, প্রিভিয়াস ক্লাসের নোট গুলো করছিলাম।”

“বাসায় নিয়ে আসতি।”

“বাসায় পড়তে ইচ্ছে করে না।”

“অহ। পরীক্ষা কবে?”

“সামনের মাসে।”

“অহ।”

কথা ফুরালো। দুজনের মাঝে কথা বলার মতন বিষয় নেই আসলে। কেউ আর কোনো কথা না বলে বাড়ির দিকে এল। ভেতরে যাওয়ার পূর্বে কুহু দেখল ফুল গাছ গুলোয় ফুল এসেছে। ওর ভালো লাগল।
“যাক, গাছের যত্ন নিচ্ছিস তবে।”

কুহু তাকাল দীপ্রর দিকে। দীপ্র একই ভঙ্গিতে বলল,”ভেবেছিলাম রাগ দেখিয়ে গাছ গুলো মা রবি হয়তো।”

কুহু কঠিন সুরে বলল‍,”আমি তেমন নই যে, অকারণেই কোনো কিছু নষ্ট করব।”

“অহ, তাও ঠিক।”

বলে দীপ্র নিশ্বাস ফেলল। সে হয়তো মনে মনে অন্য কোনো কথাই ভাবছিল। তবে সেটির প্রকাশ ঘটল না। রয়ে গেল নীরবে।

বাড়ির ভেতর এসে দেখা গেল আয়ানা নাশতা বানিয়েছে। দীপ্রকে দেখে সে ভারী খুশি হয়েছিল। তবে সাথে কুহুকে দেখে সেই খুশিতে ভাঁটা পড়ল।

“দীপ্র দাদাভাই। তোমার অপেক্ষায় ছিলাম।”

“কেন? স্পেশাল কী আছে?”

“নাশতা বানিয়েছি। চিকেন পাকোড়া। তোমার তো খুব পছন্দ তাই না?”

কুহু দাঁড়িয়ে থেকে এ অবধি শুনল। তারপর পাশ কাটিয়ে চলে গেল। আয়ানা অধরে বাঁকা হাসি রেখে বলল,”এই কুহু, তুই খাবি তো?”

কুহু তাকাল। ঠিক তখনই আয়ানা দীপ্রর বাহু খানা ধরে বলল,”দ্রুত ফ্রেশ হয়ে আসো দাদাভাই। তোমার রিভিউ না পাওয়া অবধি শান্তি পাচ্ছি না।”

আয়ানার হঠাৎ ছোঁয়াটা দীপ্রকে একটু ভাবিয়ে তুলল। ও চাইল সামনের দিকে। কুহুর দৃষ্টি এদিকেই ছিল। আয়ানা এবার বলল,”খাবি তো কুহু?”

“আমি খেয়ে এসেছি আয়ানাপু। এখন আর ইচ্ছে নেই।”

“অহ। দীপ্র দাদাভাই। তুমি চলো তো।”

বলে এক প্রকার টেনেই নিয়ে যেতে লাগল আয়ানা। দীপ্র মুহূর্তেই বুঝে গেল আয়ানা কুহুকে জ্বালাতে চাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কুহু কি আদৌ জ্বলছে?

চলবে…
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply