প্রণয়ের_রূপকথা (১৯)
হন্তদন্ত হয়ে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করল কুহু। সে যেতে চেয়েছিল হসপিটালে। কিন্তু এতটা দূর থেকে জ্যাম ঠেলে আসতে আসতে দাদিজানকে হসপিটাল থেকে নিয়ে আসা হয়েছে। দাদিজান শুয়ে আছেন। বয়সের ভারে শরীর অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। নানান সমস্যায় শরীর এখন মুক্তি পেতে চায়। কুহু এসে একদম পায়ের কাছে বসল। ওর ভেতরটা হু হু করছে। একটু আগেও ঘরভর্তি করে সবাই ছিল। এখন শুধু দীপ্র দাঁড়িয়ে।
“দাদিজান।”
গলার কাছটা কেমন শুকনো লাগে। কুহুর খুব কান্না পাচ্ছে। পাশ থেকে দীপ্র বলে,”ঘুমাচ্ছে। ঔষধ দেয়া হয়েছে। রেস্টে থাকতে হবে।”
ঘরে যে জ্বলজ্যান্ত একটা মানুষ দাঁড়িয়ে। তা এত সময় পর খেয়াল করল ও। কান্নাটা গিলে নিয়ে শুধাল,”কী হয়েছিল?”
“বয়সের কারণে যা হয়। নানান সমস্যা। চেকাপ করা হয়েছে। রিপোর্ট সব গুলো আসেনি।”
কুহু বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়ে। পা বাড়াতে গিয়ে মাথাটা কেমন ঘুরে যেতে নেয়। দীপ্র ধরতে যাওয়ার আগেই নিজেকে সামলে নেয় ও।
“আমি একটু ঘর থেকে আসি। দাদিজানকে একা রাখবেন না।”
অতিরিক্ত চিন্তা ও হন্তদন্ত হয়ে আসার কারণেই শরীরটা বড়ো ক্লান্ত লাগছে। কুহু দূর্বল পায়ে ঘরে এসে পৌঁছায়। ওখানে আগে থেকেই কণা ছিল। ছিল কুঞ্জও। দুটিতে বসে আছে। কুহুকে দেখেই কণা প্রায় কেঁদে ফেলে। আজকাল ওর খুব ভয় হয়। বাবার মৃত্যুর পর মৃত্যু জিনিসটা ওদের নিকট ভয়ানক হয়ে গিয়েছে। কণাকে এক হাতে জড়িয়ে ধরে কুহু।
“সব ঠিক আছে কণা। সব ঠিক আছে।”
কণা কাঁপছে। ও আর আয়ানা তখন ঘরেই। দাদিজানের পাশে বসা। দাদিজান বললেন পানি খাবেন। ঘরে পানি নেই। আয়ানা পানি আনতে গেল। কণা দাঁড়িয়ে রইল। তারপর হুট করেই বৃদ্ধা কেমন অসুস্থ হয়ে পড়লেন। চোখ দুটো বড়ো বড়ো হতেই কণা চিৎকার করে ওঠল। ওর চিৎকারে সবাই ছুটে এল। ধরাধরি করে নেয়া হলো হসপিটালে। কণার দেয়া বর্ণনাতে শরীর কেঁপে ওঠে কুহুর। বাবাকে হারানোর কথা স্মরণ হয়। কুহু ছুটে গিয়েছিল হসপিটালে। পাগলের মতন গিয়েছিল ও। তবে ততক্ষণে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন ভদ্রলোক। সেই কথা, স্মরণ হলেই কুহুর সবটা এলোমেলো হয়ে যায়। ও শুকনো ঢোক গিলে বোনের পিঠে হাত বুলায়। কুঞ্জ চেয়ে রইল। বয়স কম হওয়ার দরুণ সে অনেক কিছুই ধরতে পারে না। তাই তার কাজ চেয়ে থাকা। শুধুই চেয়ে থাকা।
দীপ্র তখনো বসা ছিল। কুহু না বললেও সে বসেই থাকত। কুহু জামাকাপড় বদলে এসেছে। চোখে মুখে দিয়েছে পানির ঝাপটা। এখন কিছুটা ভালো লাগছে। ও ঘরে এসে বলল,”আপনি এখন যেতে পারেন।”
দীপ্র গেল না। এই প্রসঙ্গে কিছু বললও না। দাঁড়িয়ে রইল। কুহু গিয়ে বসল দাদিজানের পাশে। কিছুটা দূর থেকে খটখট আওয়াজ হচ্ছে। বাড়ি মেরামতের। মাথায় এসে লাগছে। কুহু মাথাটা চেপে ধরে বলল,”কাজটা দুদিন বন্ধ রাখা যায় না? দাদিজানের অসুবিধা হবে। আমারই মাথা ধরে যাচ্ছে।”
শব্দটা খেয়াল করল দীপ্রও। ও ছোট করে বলল,”বলে দেব।”
তারপর আবারো নীরবতা। কুহু চাচ্ছে দীপ্র চলে যাক। কিন্তু মানুষটা যাচ্ছে না। ওর ভালো লাগছে না। ও দৃষ্টি ফেরাল।
“আমি দাদিজানের খেয়াল রাখতে পারব।”
“জানি।”
আবারো একটা নীরবতা। কুহু কি বলবে বুঝে না। মৌন থাকে। খানিক বাদে দীপ্র বলে,”দাদিজানের কিছু হলে, অনেক কিছুই বদলে যাবে।”
কুহু না তাকিয়েই বলল,”এটা তো জানা কথা। সবাই এত স্বার্থপর।”
কুহু বোধহয় এই প্রথম, এভাবে বাক্যটা উচ্চারণ করল। দীপ্র চোখ মুখে আঁধার নিয়ে বলল,”চাচিও তাই মনে করেন। কিন্তু এই ক্যাটাগরিতে আমি পড়ব না।”
কুহুর বড়ো হাসি পেল। তবে ও হাসল না। একজন আগাগোড়ায় স্বার্থপর মানুষ কি না বলে, আমি এই ক্যাটাগরিতে পড়ব না!
অনেক সময় ধরে দাদিজানের ঘরের কাছে ঘুরঘুর করছে আয়ানা। দুজনকে একসাথে দেখে ওর মাথায় আগুন ধরে যাচ্ছে। ও পারছে না কিছু বলতে। সেই জন্যই রাগে গজগজ করতে করতে মায়ের কাছে এল। সবটা শুনে আবিদা মহা বিরক্তিতে বললেন,”এমন একটা বিষয় নিয়েও তোমার বাড়াবাড়ি না করলে হয় না?”
“না হয় না। তুমি দুজনের একজনকে বের করে আনো। না হলে আমি ওখানে গিয়ে কিছু একটা করে ফেলব।”
ভদ্রমহিলা দাঁত কিড়মিড় করতে করতে বের হলেন। শাশুড়ির ঘরে প্রবেশ করে বললেন,”কুহু, সেই কখন এসেছিস রে। যা কিছু খাওয়া দাওয়া কর।”
“পরে খাব চাচি।”
“এটা বললে হয় নাকি? বাড়িতে আপা নেই। তোর মাও নেই। আমিই আছি একজন। তোদের খাওয়া দাওয়ার বিষয়টা তো আমাকেই দেখতে হয়।”
কুহু আরো কিছু বলতে নিচ্ছিল। ঠিক তখনই দীপ্র বলল,”কারোই খাওয়া হয়নি। না খেলে, দেখা যাবে আবার কেউ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। কুহু, সবাইকে নিয়ে খাওয়া দাওয়া করে আয়।”
কুহু কথাটার গুরুত্ব বুঝল। ও চুপ করে বেরিয়ে গেল। কক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল আয়ানা। এই সাধারণ বিষয়টাও ওর ভালো লাগল না। ও ধরে বসল অন্যটা। ওর মনে হতে লাগল মা বলাতে কুহু যেতে চাচ্ছিল না। অথচ দীপ্র বলাতে চলে গেল। আয়ানার রাগ কমার বদলে বাড়তে লাগল। মায়ের সাথে দৃষ্টির বিনিময় হতেই ও রেগেমেগে চলে গেল। আবিদা আশ্চর্য হয়ে পড়লেন। এই মেয়েটিকে একদমই বুঝতে পারেন না সে।
দুপুরের পর থেকে বাড়িতে একে একে ফিরে এলেন দবীর,জেবা ও আনোয়ার। এসেই তারা মায়ের সাথে দেখা করেছেন। সবাই ফিরলেও ফিরতে পারেননি ববিতা। তার কাজটির সমাধান হয়নি এখনো। তিনি কয়েকবার কল করে খোঁজ নিলেন। একটা সময় পর বলে ওঠলেন,”আমি কালই ফিরে আসব আম্মা। আমি একটু দূরে আসতে না আসতেই আপনি কেমন হয়ে গিয়েছেন।”
বৃদ্ধা হাসলেন। বললেন,”কাজ শেষ করে এসো ছোট বউ। আমি ঠিক আছি।”
“আপনার জন্য চিন্তায় থাকব আম্মা।”
বলেই কল ছাড়লেন তিনি। বৃদ্ধা ছোট করে নিশ্বাস ফেললেন। ববিতার সাথেই দীর্ঘ এত বছরের ওঠা বসা। বাকি বউদের থেকে নারীটিকে অধিক স্নেহ করেন তিনি। অনেক সুখ দুঃখ এক সাথে ভাগ করেছেন কি না।
| আমি এখন অল্প করে লিখতে পারি। তার ওপর আমি চাচ্ছি সব গুলো চরিত্রকে নিয়ে লিখতে। সেই জন্য দীপ্র-কুহুর সীন গুলো কম আসছে। তবে বলে রাখি দু-চার পর্বের মাঝেই একটা বিষয় খোলসা হবে। ধৈর্য রাখবেন প্রিয় মানুষেরা। |
চলবে…
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি
Share On:
TAGS: প্রণয়ের রূপকথা, ফাতেমা তুজ নৌশি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৭
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১০
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১৩
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১২
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১৬
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১৪
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২১
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২২
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৩০
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১৫