Golpo romantic golpo প্রণয়ের রূপকথা

প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১৭


প্রণয়ের_রূপকথা (১৭)

সকাল থেকেই বাড়ির ভেতর টুংটাং আওয়াজ চলছে। কর্মচারী’রা বাড়ির কাজ করে চলেছে। বেশ ভালোই এগিয়েছে। সব কাজ শেষ হলে বাড়িটা আবার রং করা হবে। কুহু খুব একটা খেয়াল করতে পারে না, এই বাড়িটায় যখন রং ছিল তখন কেমন দেখতে লাগত। ওর মনে পড়ে না ওসব। শুধু মনে পড়ে রংচটা বাড়িটার কথা। যেখানে বাবার ছায়ায় বেড়ে ওঠা। আবারো বাবার কথা স্মরণ হওয়াতে কুহুর মনটা বিষণ্নতায় ভরে ওঠল। ও চলে যেতে নিচ্ছিল। ওমন সময় অদূর থেকে আয়ানার ডাক।

“শোন রে কুহু।”

কুহু দাঁড়িয়ে গেল। আয়ানা এল পা চালিয়ে। মেয়েটির মুখে কিছু একটা লাগানো। সম্ভবত রূপচর্চার জন্যই লাগিয়েছে।

“পার্লারে যাবি?”

কুহু ছোট করে বলল,”আমি তো যাই না।”

“সেকি রে! স্কিন কেয়ার করিস না?”

“সেভাবে কিছু দেয়া হয়না আয়ানাপু।”

“অহ। যাক, সেটা ব্যাপার না। আমার সাথে যাস তাহলে।”

কুহু একবার ভাবল না করবে। আবার ভাবল আয়ানাপু যখন ভালো ভাবে বলছে, তো হ্যাঁ করাই যায়। ও হ্যাঁ করল। আয়ানা পা বাড়াল। বলল দুপুরের খাবার খেয়েই যাবে। এই ঘটনা যখন কণাকে জানানো হলো তখন কণা বড়ো বড়ো চোখ করে তাকাল।

“এভাবে তাকাচ্ছিস কেন?”

“তুই ঐ ডাইনির সাথে যাবি আপু?”

“কণা! এভাবে বল‍িস কেন?”

“আর কীভাবে বলব? শোন আপু, এই আয়ানাপুকে আমার সহ্য হয় না। তুই খুব বোকা। রাত্রিপুর ও আসার নাম নেই। কবে আসবে। ভালো লাগে না। মা ও আসে না।”

বলে বিছানায় বসল কণা। কুহুর হাতে জামাকাপড়। শুকাতে দিয়েছিল ছাদে। সেসবই নিয়ে ফিরেছে।

“কেউ ভালো ব্যবহার করলে,তার সাথেও একই আচরণ করতে হয় কণা।”

“তাই? তাহলে তুই কেন দীপ্র ভাইয়ের সাথে ভালো ব্যবহার করিস না আপু?”

“ভালো করি না। তবে খারাপও তো করি না। ওনার সাথে আমার সেই সম্পর্কটাই নেই।”

কণা কিছু বলে না। কুহু জামাকাপড় গুলো কাবাডে তুলে রাখে। এসে বসে ছোট বোনের পাশে।

“কণা, তুই আয়ানাপুকে পছন্দ করিস না। তাই তোর কাছে এমন লাগে।”

“কে জানে। কিন্তু তুই কিন্তু সাবধানে থাকবি।”

“আচ্ছা থাকব।”

বলে ছোট বোনকে আশ্বস্ত করল কুহু। এরই মধ্যে দরজায় এসে উঁকি দিল কুঞ্জ। বাচ্চাটিকে দেখে কণার অধরে হাসি এল।

“এদিকে আয়।”

বলে ডাকতেই ছুটে এল কুঞ্জ। একদম কণার পাশে এসে বসল। ওকে এক হাতে জড়িয়ে ধরল কণা।

“কী ব্যাপার তোর? আজকাল দেখাই যায় না।”

“আমি তো আসতে চাই কণাপু। কিন্তু আয়ানাপুর জন্য ভয় হয়।”

“কেন? তোকে আসতে মানা করে নাকি?”

“ঠিক তা না। কিন্তু….

বলে থামে কুঞ্জ। ওর মনটা সরল। তাই মনে যা এসেছে বলে দিয়েছে। কণার সাথে চোখাচোখি হয় কুহুর। কণা ইশারায় বোঝায় আয়ানা আসলেই বিপদজনক। কুহু সেসব পাত্তা দেয় না।

আয়ানাকে বার বার বলা হলো সে যেন কুহুর সাথে ভালো আচরণ করে। আবিদার কথায় এবার বিরক্তই হলো ও।

“তুমি তো আমার কানের পোঁকা বের করে দেবে। কতবার এক কথা বলব?”

“তোকে ভরসা করতে পারছি না। তুই নিজের মধ্যেই নেই।”

“বেশ তো। ভরসা কোরো না।”

“আয়ানা, আবারো বলছি, কোনো ঝামেলা না। তোমার বাবা গতকাল কী বলেছে?”

কল করে অনেক কিছু বুঝিয়েছেন বাবা। আয়ানা সেসব শুনেছে। বুঝেছেও। তবু আবিদার ভয় কাটে না। তিনি মেয়েকে ভরসাই করতে পারেন না।

ঘর থেকে বের হয়ে আয়ানা এসে দাঁড়াল দীপ্রর কক্ষের সামনে। সে সেজেছে। তাকে সুন্দর লাগছে। এটা তো দীপ্র ভাইকে দেখানো চাই। ও মুখটায় হাসি এনে দরজায় নক করল। দীপ্র আজ পুরো দিন বাড়িতেই আছে।

“আসব দাদাভাই?”

“আয়ানা?”

দরজাটা হালকা খুলে আয়ানা ঠোঁট প্রসারিত করে হাসল। দীপ্রর কাজ সারাক্ষণ ল্যাপটপে। যেহেতু তার নিজস্ব ব্যবসা বিদেশের মাটিতে। তাই অনলাইনেই কাজ গুলো করতে হচ্ছে। বাকি সময়টা সে কাটায় গ্রামে ঘুরে। আয়ানা কে একবার দেখে নিয়ে দীপ্র বলল,”কোথাও যাচ্ছিস?”

“হ্যাঁ, পার্লারে যাচ্ছি। তোমার সাথে দেখা করতে এলাম।”

“আচ্ছা, সাবধানে।”

“হুম। তোমার কিছু লাগবে?”

“না। কী লাগবে?”

এমনি বলার জন্য বল‍ল আয়ানা। ও আসলে কথা বাড়ানোর সুযোগ খুঁজে চলেছে।

“না মানে, কিছু যদি লাগত।”

“না, না তেমন কিছু…

বলতে গিয়ে ওর চোখ গেল দরজার দিকে। কুহু করিডোর দিয়ে চলছে। দীপ্র ডেকে ওঠল।

“কুহু?”

আয়ানা তাকাল পেছন দিকে। কুহুর পাও থেমে গিয়েছে। ও জবাব দিতে চাচ্ছে না। তবু সবটা স্বাভাবিক দেখাতে ও বলল,”জি?”

“কোথাও যাচ্ছিস নাকি?”

দরজার কাছ থেকেই কুহু বলল,”জি। আয়ানাপুর সাথে যাব।”

আয়ানার মুখটা একটু অন্ধকার। ও তবু সেটা সরিয়ে ফেলার প্রয়াস করে বলে,”হ্যাঁ, হ্যাঁ ও আমার সাথেই যাচ্ছে।”

“চাচি আসবেন কবে?”

পাল্টা প্রশ্ন করে দীপ্র। কুহু এবার পুরো দৃষ্টি মেলে চায়।

“কদিন সময় লাগতে পারে।”

“এ কদিন ভার্সিটি যাবি না তাহলে?”

“জি, যাব। কাল থেকেই যাব।”

সত্যি বলতে যাওয়ার মতন পরিস্থিতি তার নেই। তবু মিথ্যেটা বলল সে। দীপ্র আয়ানার দিকে দৃষ্টি ফেরাল।

“সাবধানে, দুজনকেই সন্ধ্যার আগে বাড়ি দেখতে চাই। মনে থাকবে?”

আয়ানা মাথা নাড়িয়ে বলল,”হুম, মনে থাকবে।”

শেষ পর্যায়ে আয়ানার মুখটায় হাসি এল। ও বের হলো একরাশ খুশি নিয়ে। কুহু অবশ্য চুপ। সে নিজের মতন হেঁটে চলেছে। ওরা দুজন চলে যেতেই দীপ্র ল্যাপটপ খানা রেখে দিল। তাকে উদাসীন লাগছে। মনটা ভালো নেই।

যেতে যেতে আয়ানা বলল,”একটা বিষয় ভালোই হয়েছে।”

“কী?”

“দীপ্র ভাই আর তোর বিয়েটা হলো না যে।”

কুহু ছোট করে বলে,”হুম।”

“দেখ কুহু, যা হয় ভালোই কিন্তু হয়। হয় না?”

“হ্যাঁ, হয়।”

” বাট তুই কি কোনো ভাবে, দীপ্র ভাইকে পছন্দ করিস নাকি?”

এ কথায় কুহু তাকায় আয়ানার দিকে। আয়ানা তখনো প্রশ্ন নিয়ে চেয়ে।
“কী রে? পছন্দ করিস নাকি?”

“হুট করে এসব কেন জিজ্ঞেস করছো আয়ানাপু?”

“আসলে কুহু, বিষয়টা তোর জানা দরকার।”

কুহু তাকিয়ে থাকে। আয়ানা একটু চোখ মুখ শক্ত করে। বলে,”তুই হয়তো জানিস না। বা বুঝিস নি।”

“কী?”

“দীপ্র ভাই আর আমি একে অপরের ওপর সফট। আই মিন আমরা পছন্দ করি একে অপরকে।”

“অহ।”

কুহুর এই স্বাভাবিক আচরণ আয়ানাকে একটু দ্বিধায় ফেলল। ও কুহুর দু বাহু ধরে বলল,”তুই কি ওনাকে পছন্দ করিস?”

“না। পছন্দ করতে কেন যাব?”

“যাক ভালো। কুহু, তুই আমার ছোট বোন। তাই তোকে বললাম। আমরা আসলেই একে অপরকে পছন্দ করি। তুই কিন্তু এখনই কাউকে বলতে যাস না। না হলে আরেক ঝামেলা হবে।”

“বলব না। তুমি চিন্তা কোরো না।”

বলে চোখ বন্ধ করে কুহু। আয়ানা মনে মনে খুশি হয়। কুহু হয়তো বিশ্বাস করে নিয়েছে। না নিলেও সমস্যা নেই। সে তো নিজের অনুভূতির বিষয়ে সচেতন করেই দিল। তবু যদি কুহু কিছু করতে চায়, তবে অবশ্যই এর জন্য ভুগতে হবে।

ফিরতে গিয়ে লেট হলো। গ্রামে আজকাল বেশ সমস্যা দেখা দিচ্ছে। রাজনীতি নিয়ে যত সব ঝামেলা। কুহু বার বার বলেছিল একটু দ্রুত করতে। আয়ানাই লেট করল। এখন দেখা গেল গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না। আয়ানা আসলে ইচ্ছে করেই লেটটা করেছে। ও কল করল দীপ্রর নাম্বারে। দীপ্র তখন বাহিরেই ছিল। আয়ানা একটু কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল,”দাদাভাই, তুমি কি আমাদের নিতে আসতে পারবে? আসলে কুহুর জন্য লেট করে ফেলেছি। এখন মোড়ের রাস্তা দিয়ে যেতে ভয় হচ্ছে। গাড়িও নেই।”

ইচ্ছে করেই কুহুর ঘাড়ে দোষ চাপাল আয়ানা। কুহু একটু দূরে দাঁড়িয়ে। কথা শেষ করে আয়ানা বলল‍,”দীপ্র দাদাভাই আসছে। দেখলি তো, আমার প্রতি তার ভালোবাসা ঠিকই আছে।”

কুহু কিছুই বলল না। শুধু একটু হাসার চেষ্টা দেখাল। আয়ানা আরো একবার খুশি হলো। কুহুর সামনে দীপ্রকে নিয়ে কথা বলতে বেশ মজা লাগছে ওর। ও আরো একটু জ্বালাতে চাচ্ছিল। তবে কুহুর চোখে মুখে জ্বালা পো ড়া নেই। কেমন সবটা স্বাভাবিক। তাই খুব একটা সুবিধা করতে পারল না।

দীপ্র এল প্রায় বিশ মিনিট পর। হেঁটে আসতে হয়েছে তাকে। এই সড়কে বড়ো গাড়ি নিয়ে চলা মুশকিল। ঘুরে আসতে গেলে আবার অনেকটা সময় লেগে যেত। দীপ্রকে দেখেই আয়ানা এগিয়ে এল। চোখ মুখ অসহায়ের মতন করে বলল,”সরি। কুহুটার কথায় লেট করে ফেলেছি।”

দীপ্র এ বিষয়ে কিছু বলল না। কিছু দূরে দাঁড়িয়ে কুহু। এদিকে আসছে না।

“ওকে আসতে বল।”

আসতে বলল আয়ানা। কুহু এল। ওদের পথচলা শুরু হলো। আয়ানা ইচ্ছে করেই দীপ্রর গা ঘেঁষে চলেছে। কুহু পেছন পেছন। কিছু দূর এগিয়ে দীপ্র চাইল পেছনে। হঠাৎ তাকানোর কারণে দুজনের চোখাচোখি হলো। কিছুটা কঠোর সুরে দীপ্র বলল,”সামনে আয়।”

চুপচাপ সামনে এল কুহু। চলতে লাগল। দীপ্র বেশ চুপচাপ হাঁটলেও আয়ানা এটা সেটা বলে চলেছে। সড়কের এ মাথায় একটা দোকান রয়েছে। এখানে কিছু বাইক রাখা। বোঝা যাচ্ছে এলাকার কিছু সস্তা ছেলেপুলে। যারা রাজনীতির নামে এখানে সেখানে বাইক নিয়ে ঘুরতে থাকে। এদের উত্তাপ বেড়েছে আজকাল। দীপ্র চোখ মুখ কঠোর করল। কুহু কিছুটা এগিয়ে গিয়েছে।

“কুহু, দাঁড়া।”

দাঁড়াল কুহু। দীপ্র এসে ওর পাশে দাঁড়াল। সাথে এল আয়ানাও। দুজনকে একপাশে দিয়ে দীপ্র বলল,”চুপচাপ আমার সাথে হেঁটে যাবি। কোনো কথা নয়।”

আয়ানা প্রশ্ন করতে চাচ্ছিল। তবে দীপ্র থামিয়ে দিয়ে বলল‍,”একদম চুপচাপ।”

ও দমল। দীপ্রর একপাশ হয়ে দুজন চলতে লাগল। দোকানের কাছে আসতেই হাসির শব্দ শোনা গেল। ছেলে গুলো কিছু একটা নিয়ে হেসে চলেছে। দীপ্র চোখ মুখ কঠোর রেখেই কুহু আর আয়ানাকে সাথে করে পথটা শেষ করল।

| মাইলস্টোনের ঘটনায় আমি ভোগান্তিতে আছি। ট্রমা কাটতে শুরু করেছে। একটু একটু করে লেখার চেষ্টা করছি। আশা করি পরের পর্ব পরশুই দিতে পারব। সবাই দোয়া করবেন। আর আমি বলেছি এটা বিস্তারিত গল্প। প্রতিটা ঘটনা বর্ণনা করব আমি। মনে হতে পারে স্লো। আমি তাদের বলব ধৈর্য রাখেন। সব আজকেই জেনে গেলে, সেটা তো আর বিস্তারিত কিছু থাকল না। |

চলবে….
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply