প্রণয়ে_গুনগুন
পর্ব ৯
মুন্নিআক্তারপ্রিয়া
গুনগুন ও মাহবুব মুখোমুখি বসে আছে। গুনগুন নিরব। ওর মুখে কোনো কথা নেই। শুধু নিষ্পলকভাবে তাকিয়ে আছে মাহবুবের দিকে। তবে মাহবুবকে বেশ হাসি-খুশি দেখা যাচ্ছে। সে ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে রেখেই বলল,
“কী খাবে বলো?”
গুনগুন ম্রিয়মাণ কণ্ঠে বলল,
“কফি।”
“শুধু কফি?”
“হু।”
“ঠিক আছে।”
মাহবুব ওয়েটারকে ডেকে দুটো কফি অর্ডার দিল। এরপর গুনগুনের দিকে ফিরে বলল,
“তোমাকে সুন্দর লাগছে।”
গুনগুন মৃদু হেসে বলল,
“থ্যাঙ্কিউ।”
গুনগুনের সবকিছু এলোমেলো লাগছে। একটুখানি জড়তাও হয়তো কাজ করছে। অথচ একটা সময় এই মানুষটাই ছিল গুনগুনের সবচেয়ে কাছের মানুষ, যাকে সে মন খুলে সব বলতে পারত। কিছু বলার আগে এত আগে, পিছে কিছুই ভাবতে হতো না। শুধু মাঝখানে কিছুদিনের যোগাযোগহীনতা যে একটা মানুষকে এতটা দূরে নিয়ে যেতে পারে গুনগুনের তা জানা ছিল না।
নিরবতা কাটিয়ে মাহবুব বলল,
“বিয়ে করোনি কেন এখনো?”
গুনগুন বলল,
“উত্তরটা কি তোমার জানা নেই?”
মাহবুব অবাক হয়ে বলল,
“তুমি কি এখনো আমার অপেক্ষায় আছো?”
“থাকতে না করছ?”
“গুনগুন, আমি তো তোমাকে আগেও বলেছি আমার জন্য অপেক্ষা কোরো না। ভালো ছেলে পেলে বিয়ে করে ফেলো। আমি খুবই আনসার্টেইন ছিলাম তোমার জীবনে। আমি চাইনি, আমার জন্য অপেক্ষা করে তুমি তোমার জীবনটা নষ্ট করো।”
গুনগুনের কী হলো কে জানে। এত শক্ত মনের মেয়েটাও যেন হঠাৎ করেই ভেঙে পড়ল। আচমকা সে মাহবুবের হাত ধরে বলল,
“কিন্তু এখন তো তুমি সার্টেইন। মাহবুব, তুমি অপেক্ষা করতে বলোনি। কিন্তু তবুও আমি অপেক্ষা করেছি। আমার অবচেতন মন সবসময় শুধু তোমাকেই চেয়ে এসেছে। এতদিন বেকার ছিলে বলে না হয় আমাদের সম্পর্ক নিয়ে ভয়ে ছিল। কিন্তু এখন তো তুমি বেকার নও। এখন তো চাইলেই আমরা বিয়ে করতে পারি। মাহবুব, প্লিজ চলো আমরা আরেকবার চেষ্টা করি?”
মাহবুব নিষ্পলকভাবে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,
“তুমি আমার সাথে এতদিন যোগাযোগ করোনি কেন?”
“কারণ দিনশেষে আমিও মানুষ। আমারও আত্মসম্মানবোধ আছে, ইগো আছে। একটা মানুষ আর কতটাই বা ইগনোরেন্স নিতে পারে? লাস্ট যখন আমাদের কথা হয়, তখন আমাদের দেখা হওয়ার কথা ছিল। তুমি নিজে থেকে দেখা করতে চেয়েছিলে। দেখা হওয়ার দিন তোমার খবর নেই। আমি মেসেজ করার পরও তুমি সীন করে রেখে দিয়েছিলে। তাই আর আমি কোনো যোগাযোগ করিনি তোমার সাথে। কিন্তু তুমি! তুমিও তো করোনি যোগাযোগ। সেদিন কেন করোনি দেখা?”
“আরে টাকা-পয়সার ঝামেলায় ছিলাম তখন। যাই হোক, বাদ দাও। এখন চাকরি হয়েছে। মাস শেষে চল্লিশ হাজার করে টাকা পাব। ফ্রেন্ডদের সাথে শেয়ারে বিজনেস করতেছি। সেখানেও আল্লাহ্ চাইলে ভালো একটা প্রফিট পাব।”
গুনগুনের এসব টাকা-পয়সা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। সে উতলা মাহবুবকে নিয়ে। সে ফের আকুতিভরা কণ্ঠে বলল,
“চলো আমরা বিয়ে করে ফেলি?”
“বিয়ে তো আর বললেই হয়ে যায় না, গুনগুন। আমাকে একটু সময় দাও। আমরা দুদিন কথা বলি। ভাবি একটু। দেখি কথা বলে যে, আমাদের কোথায় কেন কীভাবে কথা বন্ধ হয়েছিল। ভুলগুলো খুঁজে বের করি। তারপর দুজনে মিলে না হয় সিদ্ধান্ত নেব।”
গুনগুন মাহবুবকে খুব করে চায় এ কথা সত্য। তবে সে জোর করার মতো মেয়ে নয়। তাই মাহবুবের কথা মেনে নিয়ে বলল,
“ঠিক আছে। আমি পজেটিভ উত্তরের আশায় রইলাম।”
মাহবুব এই প্রসঙ্গে আর কথা না বলে গুনগুনের পড়াশোনা নিয়ে কথাবার্তা বলছিল। মিনিট বিশেক থেকে দুজনই বেরিয়ে পড়ল কফিশপ থেকে। রিকশা নেওয়ার সময় মাহবুব বলল,
“তোমাকে বাড়িতে পৌঁছে দেই?”
গুনগুনের জন্য এটা অপ্রত্যাশিত ছিল। তাই সে ভীষণ খুশি হয়ে গেল। বলল,
“বাসায় দিয়ে আসবে?”
“হ্যাঁ। যদি তোমার সমস্যা না থাকে আরকি!”
“সমস্যা নেই কোনো।”
“ঠিক আছে।”
দুজনে আজ কতদিন পর পাশাপাশি বসেছে। হুটখোলা রিকশায় একসময় দুজন মিলে পুরো শহর ঘুরে বেড়াত। আজ তার কিছুটা স্মৃতি যেন আবার ফিরে এসেছে। মাহবুব গুনগুনের হাত ধরে বলল,
“তোমার পুরনো কথা মনে পড়ে না, গুনগুন?”
গুনগুন মাথা নাড়িয়ে বলল,
“পড়ে।”
“আমারও মনে পড়ে। পুরনো কোনো কথাই আমি ভুলিনি। আমাদের প্রথম দেখা, কথা, তোমার চঞ্চলতা সবকিছুই চোখের সামনে ভাসে।”
“এরপরও একটাবার যোগাযোগ করলে না?”
“যোগাযোগ করিনি কিন্তু তোমার সব আপডেট-ই রাখতাম। ফেইক আইডি দিয়ে তোমার আইডি ভিজিট করতাম। দেখতাম তুমি খুব ভালোই আছো। ঘুরে বেড়াচ্ছ মনের আনন্দে।”
গুনগুনের ভীষণ হাসি পেল। কষ্টের হাসি। সে হেসে বলল,
“ফেসবুকে আইডি দেখে তুমি আমার ভালো থাকা জাজ করে ফেললে? নীল-সাদার দুনিয়ায় আমরা একটা মানুষকে ততটাই জানতে পারি, যতটা তারা আমাদের জানাতে চায়।”
মাহবুব হেসে বলল,
“তার মানে তুমি ভালো নাই?”
“আছি! ভালোই আছি।”
রিকশা বাড়ির গলিতে ঢুকেছে। প্রণয়ের দোকান পার হওয়ার সময় মাসুদ প্রণয়কে ডেকে বলল,
“গুনগুনের সাথে এই ছেলে কে?”
প্রণয় হতবাক হয়ে চলে যাওয়া রিকশাটি দেখছে। বুকের ভেতর সূক্ষ্ম চিনচিনে ব্যথাও অনুভব করছে সে। কিন্তু কেন? গুনগুনের পাশে অপরিচিত কোনো ছেলেকে দেখে তার কেন কষ্ট হচ্ছে!
বাড়ির সামনে রিকশা থামার পর গুনগুন মাহবুবকে বলল,
“মাহবুব, জীবন তো একটাই। এই একটা জীবন আমি তোমাকে না পাওয়ার আফসোস নিয়ে কাটাতে চাই না। প্লিজ, একটাবার ভেবে দেখো ভালোমতো।”
“হ্যাঁ, আমি ভাবব। তুমি চিন্তা কোরো না। বাসায় যাও।”
“তুমিও সাবধানে যেও। বাড়িতে পৌঁছে মেসেজ দিও।”
“আচ্ছা। আল্লাহ্ হাফেজ।”
এই রিকশা দিয়েই মাহবুব আবার ফিরে যাচ্ছিল। প্রণয়ও দেখল মাহবুবকে। এখনো সে মাসুদের কথার জবাব দিচ্ছে না। মাসুদ নিজে নিজেই বলতে লাগল,
“আমি শিওর এই পোলা গুনগুনের বয়ফ্রেন্ড লাগে। তোমার পাখি দিছে উড়াল। ভালা হইছে না এখন? আরো বদলাও নিজেরে অন্য মাইয়্যার লেইগা।”
প্রণয় নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছে। সে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“আজেবাজে কথা বলিস না তো, মাসুদ। আমি কারো জন্য নিজেরে চেঞ্জ করিনি। নিজের জন্য করছি। আর গুনগুনের কারো সাথে সম্পর্ক থাকতেই পারে। এটা তো আমার মাথা-ব্যথার বিষয় না।”
“ঐ ভাই থাম তুই। তোরে আমি দুইদিন ধইরা চিনি না যে, তুই যা কইবি আমি বিশ্বাস কইরা নিমু। মুখে যতই কস যে, তুই ওর লেইগ্যা চেঞ্জ হস নাই কিন্তু কলকাঠি তো গুনগুন-ই নাড়ছে। ওর প্রভাবেই তো তোর মাথায় চেঞ্জের ভূত আসছে। আর ঐ শা’লা’র ঘরে শা’লা আমার সামনে নাটক মারাবি না। গুনগুনের সম্পর্ক নিয়া তোর মাথা-ব্যথা নাই না? তুই তোর মুখটা দেখ একবার মোবাইলের ক্যামেরায়। একজন অপরিচিত মানুষও কইয়্যা দিতে পারব যে, তোর ভেতর কীরকম ঝড় হইতাছে। আর আমি তোর এতদিনের বন্ধু হইয়া বুঝুম না?”
ঝড়? হ্যাঁ, সত্যিই তো। প্রণয়ের বুকের ভেতর অদৃশ্য ঝড় হচ্ছে। সবকিছু ভেঙেচুরে চুরমার করে দিচ্ছে। কাউকে সেই ঝড় দেখানো যাচ্ছে না। বোঝানো যাচ্ছে না। শুধু নিজে নিজে অনুভব করতে পারছে। কিন্তু এরকম হওয়ার কারণ কী হতে পারে? মাসুদের বলা কথাগুলোই কি তাহলে সত্যি? সে কি সত্যি সত্যি গুনগুনকে ভালোবাসতে শুরু করেছিল?
মাহবুবের এখনো কোনো কল কিংবা মেসেজ আসেনি। অথচ এতক্ষণে ওর বাড়িতে পৌঁছে যাওয়ার কথা। গুনগুন তো বলে দিয়েছিল, বাড়িতে গিয়ে জানাতে। মাহবুব তাহলে জানাল না কেন? গুনগুন কি নিজে থেকে কি একটা কল করবে? কিন্তু কেমন যেন একটা জড়তা কাজ করছিল। তাই সে মেসেজ করল হোয়াটসএপে,
“কোথায় আছো?”
মেসেজ ডেলিভারি হয়েছে দেখে গুনগুন ফোন রেখে পড়তে বসেছে। মিনিট দশেক পর মেসেজ টোন বেজে উঠতেই তড়িঘড়ি করে ফোন হাতে নিল গুনগুন। চেক করে দেখল,ভার্সিটির গ্রুপে মেসেজ এসেছে। হতাশ হয়ে গুনগুন ফোন রেখে দিয়ে আবার পড়তে বসেছে। কিন্তু সত্যি বলতে ওর মন একদম পড়ার দিকে নেই।
রাতে খেতে বসেও ঠিকমতো খেতে পারল না। ঘুমও আসছিল না। একটু পরপর ফোন চেক করছিল গুনগুন। মাহবুবের লাস্ট সিন দেখাচ্ছে ত্রিশ মিনিট আগে। গুনগুন মেসেজ করেছে আরো তিন ঘন্টা আগে। অথচ গুনগুনের মেসেজ সিন করেনি, রিপ্লাই করেনি। তাহলে কি মাহবুব ওকে ইগনোর করছে?
.
.
প্রণয় প্রতিদিন রাতে একবার করে গুনগুনকে ফোন করে। সারাদিনের খোঁজ-খবর নেয়। গুনগুন যে খুব বেশি ওর সাথে কথা বলে, ঠিক তা নয়। সর্বোচ্চ ছয় থেকে দশ মিনিট কথা বলবে। এইটুকু সময়েই শর্টকাটে নিজের খবর বলে প্রণয়ের টুকটাক খবর নিয়ে কল রেখে দেবে। প্রণয়ের অবশ্য এতে কোনো আক্ষেপ ছিল না কখনোই। গুনগুন যে ওকে এটুকু সময় দেয় এতেই সে খুশি। চাওয়া-পাওয়া কম ছিল বলে, প্রণয় সর্বদা নিজেকে সুখী মানুষই মনে করত। কিন্তু গতকাল গুনগুনকে অন্য ছেলের সাথে দেখার পর থেকে ‘সুখী মানুষ’ তকমাটা তার সাথে আর যাচ্ছে না বলেই তার ধারণা।
প্রণয় গতকাল রাতে গুনগুনকে কল করেনি। ইচ্ছে করেই করেনি। অন্যজনের প্রেমিকাকে সে বিরক্ত করতে চায় না। কিন্তু তার অবচেতন মন খুব করে চাচ্ছিল যে, গুনগুনের একটা কল কিংবা মেসেজ আসুক। কিন্তু আসেনি। প্রণয় নিজেকে নির্বোধ ও বোকা বলতে লাগল। এখনো সে গুনগুনের কল, মেসেজের আশা করে! গুনগুনের কি আর এত সময় আছে? এত দায়-ভারও নেই গুনগুনের। ও হয়তো এখন প্রেমিকের সাথে কথা বলায় ব্যস্ত। থাকুক ব্যস্ত, সমস্যা তো নেই।
তবে প্রণয়ের খুব আক্ষেপ ও অভিমান গুনগুনের ওপর। ও যদি একটাবার মাহবুবের কথা জানাত, তাহলে প্রণয় কখনোই ওকে বিরক্ত করত না। কেন জানায়নি গুনগুন? অবশ্য জানানোর তো কথাও না। সে তো আর গুনগুনের আপন কেউ নয়। প্রণয়ের রাগ, ক্ষো’ভ, ঘৃ’ণা সব একসাথে হচ্ছে।
সকালে অনিচ্ছা সত্ত্বেও টিউশনিতে যাওয়ার জন্য বের হয়েছে প্রণয়। বাড়িতে বসে থাকলেই গুনগুনের কথা মনে পড়বে। নিজেকে ব্যস্ত রাখতে হবে। যখনই দেখল গুনগুনও বাড়ি থেকে বের হয়েছে ভার্সিটিতে যাওয়ার জন্য, তখন সে আড়ালে লুকিয়ে পড়েছে। গুনগুনের মুখোমুখি সে হতে চায় না। তবে ওকে দেখার পর সেই সূক্ষ্ম চিনচিনে ব্যথাটা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।
ক্লাসের ব্রেক টাইমে দুটো কফি নিয়ে মাঠে ঘাসের ওপর বসে আছে গুনগুন ও রাধিকা। ভার্সিটিতে আসার পর থেকেই রাধিকা খেয়াল করেছে গুনগুন ভীষণ আপসেট। কিন্তু ক্লাস চলছিল বলে আর কিছু জিজ্ঞেস করেনি। একটু শান্তিমতো যেন কথা বলা যায় তাই মাঠ বেছে নিয়েছে। রাধিকা কফিতে চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“বল তো এখন, কী হয়েছে তোর? এত আপসেট কেন তুই?”
গুনগুন দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল,
“কী আর হবে?”
“যা হয়েছে তা-ই বল।”
গুনগুন শুরু থেকে সবটা বলল। রাধিকা দাঁত কিড়মিড় করে বলতে লাগল,
“এই আপদটার সাথে এখনো তুই কথা বলিস কেন? এর জন্য জীবনে কত ঝামেলা পোহাতে হয়েছে তোকে। এতদিন কোনো খোঁজ-খবর ছিল না। এখন উদয় হলো কোত্থেকে?”
গুনগুন নিরুত্তর। রাধিকা বলল,
“শোন, এই ছেলে আস্ত একটা রেড ফ্লাগ। এখন সরকারি চাকরি হয়েছে। তাই এসেছে তোকে রিগ্রেট ফিল করাতে।”
“আমার রিগ্রেট করার কী আছে? আমি কি ওকে চিট করেছি?”
“না। কিন্তু ওর তো ধারণা তুই ওকে ছাড়াই ভালো আছিস। তাই কোনো যোগাযোগ করিসনি। এজন্য এসেছে চাকরির কথা জানাতে। যাতে তুই এখন এসব জেনে আফসোস করিস।”
“ওর ভালো চাকরি, টাকা-পয়সা নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথা-ব্যথা আমার নেই, রাধিকা। ও যখন বেকার ছিল তখনো ওকে বিয়ে করতে রাজি ছিলাম আমি। বরং ও নিজেই করেনি। সবসময় একটা কথাই বলত, ও খুব আনসার্টেইন।”
“মাহবুব শুরু থেকেই রেড ফ্লাগ ছিল। যেটা তুই বুঝিসনি। এবং এখনো বুঝতে চাচ্ছিস না। গতকাল যে তোকে বলল, ওর নাকি বিয়ে-শাদী করার ইচ্ছে নেই। করবে না। পুরোটাই একটা ভাঁওতাবাজি। বাবা-মায়ের পছন্দে বড়োলোক বাপের মেয়ে দেখে ঠিকই বিয়ে করে ফেলবে দেখবি।”
গুনগুনের চোখ দুটোতে হঠাৎ করে বিষন্নতা ভর করল। সত্যিই মাহবুব এমনটা করবে? রাধিকা গুনগুনের মনের কথা বুঝতে পেরে ওর হাত ধরে বলল,
“শোন জান, আমার কথাগুলো শুনতে তোর খারাপ লাগতে পারে। কিন্তু আমি সত্যিই বলছি। মাহবুব তোকে ভালোবাসে না। আগেও কখনো ভালোবাসেনি। শুধু টাইমপাস করেছে। সে যদি তোকে ভালোইবাসতো, তাহলে এখন এসে এসব নাটক করত না যে, তুই বিয়ে করিসনি কেন ব্লা ব্লা। ডিরেক্ট তোকে বলত, ‘চলো বিয়ে করি।’ ইভেন, তুই নিজেই তো বলেছিস বিয়ে করার কথা। ও কী বলেছে? ভাববে। ভেবে জানাবে। ভাই, এখানে এত ভাবাভাবির কী আছে? ও না তোকে ভালোবাসে? তাহলে আবার নতুন করে কী ভাববে? ও কি তোকে দুদিন ধরে চিনে যে, ভাবতে হবে? আবার দেখ, তুই নিজে থেকে মেসেজ করেছিস। তারও কোনো রিপ্লাই নাই। আজ কয়টা বাজে এখন? অলরেডি দুপুর বারোটা পার হয়েছে। গতকাল রাত থেকে আজ দুপুর হয়ে গেছে, এই পর্যন্ত তার সময় হয়নি তোকে রিপ্লাই করার? এতটাই ব্যস্ত সে? আচ্ছা এসব কথাও বাদ। সে তো তোকে নিজে বলেছে যে, দুদিন তোর সাথে কথা বলে তারপর ডিসিশন নিবে। তাহলে তার কি উচিত ছিল না তোকে নিজে থেকে কল করা? তার তো নিজেই কল করার কথা। করেছে? করেনি। উলটো তোকে ইগনোর করছে। এরপরও কি তুই বুঝতে পারছিস না যে, সে তোকে ভালোবাসে না?”
গুনগুন মনে হচ্ছে দম আটকে বসে আছে। রাধিকা যা বলছে, সব যুক্তিসংগত কথাই বলছে। তবুও কেন জানি সে, মাহবুবকে ছাড়া নিজেকে ভাবতে পারছে না। রাধিকা ফের বলল,
“আমি জানি, তুই মাহবুবকে অনেক ভালোবাসিস। তোর পক্ষে হয়তো এতটা সহজও হবে না নিজেকে বোঝানো। আমিও বলছি না যে, হঠাৎ করেই ছেড়ে দে। নিজেকে দুটো দিন সময় দে। দেখ এরমধ্যে সে নিজে থেকে কোনো কল বা মেসেজ করে কিনা। যদি না করে তাহলে দুদিন পর তুই নিজেই কল দিয়ে জিজ্ঞেস করবি, সে কী চায়। তোকে বিয়ে করবে কি না? ইয়েস অর নো। বিস্তারিত কোনো আলাপে যাবি না। এরপর উত্তর তো তুই নিজেই পাবি। সেই অনুযায়ী না হয় পরে ডিসিশন নিস। আপাতত ভেঙে পড়িস না। নিজেকে শ’ক্ত কর। তুই এত শক্ত মনের মেয়ে গুনগুন। অথচ এভাবে ভেঙে পড়েছিস আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না! তোকে যারা বদরাগি, জিদ্দি, একরোখা আর স্ট্রং ভাবে, তারা যদি তোর এই ভাঙা রূপটা দেখে আমি শিওর যে, নির্ঘাত জ্ঞান হারাবে ওরা।”
গুনগুন দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল,
“আমরা যতই শক্ত মনের মানুষ হই না কেন, কিছু কিছু মানুষ থাকে যাদের সামনে চাইলেও আমরা স্ট্রং থাকতে পারি না। নিজেকে ভেঙেচুরে উজার করে দেই একটু ভালোবাসা পাওয়ার জন্য।”
“কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, সেই মানুষগুলো কখনোই বুঝতে পারে না। বুঝতে চায় না।”
গুনগুন কিছু বলল না। বুকের গহীন থেকে বেরিয়ে এলো ভারী দীর্ঘশ্বাস।
দ্বিতীয় ক্লাস করে বিকেলে ভার্সিটি থেকে সোজা টিউশনি করাতে চলে যায় গুনগুন। টিউশন শেষ করে সন্ধ্যায় বাড়িতে ফেরার সময় দেখে প্রণয়ের দোকান আজ বন্ধ। গুনগুনের একটু খটকা লাগল। দোকান হঠাৎ বন্ধ কেন? গতকাল সন্ধ্যার পর থেকে প্রণয়ের সাথে আর কথা হয়নি। প্রণয় তো কখনো এমন করে না। মাহবুবের দুশ্চিন্তায় প্রণয়ের কথা একদমই মাথায় ছিল না। ও কি অসুস্থ? তা-ই হবে হয়তো!
প্রণয়কে কল করার জন্য গুনগুন ব্যাগ থেকে ফোন বের করল। কল করার পর রিং হচ্ছে, কিন্তু রিসিভ করছে না। গুনগুন কল দিতে দিতেই হাঁটছিল। পাশের চায়ের টং দোকানে কলের রিংটোন শুনে সেদিকে তাকাল। কারণ প্রণয়ের রিংটোন চেনে ও। একটা গানের রিংটোন। গুনগুন দেখতে পেল প্রণয় সিগারেট খাচ্ছে আর ক্যারাম খেলছে। পাশেই অবহেলায় ফোনটি বাজছে। গুনগুনের কিছুটা রাগ-ই হলো। এদিকে সে দুশ্চিন্তায় ম’র’ছে যে, প্রণয় অসুস্থ কিনা! অথচ দিব্যি সুস্থ মানুষ বন্ধুদের সাথে ক্যারাম খেলছে। আচ্ছা সে না হয় খেলুক। ওর দোকান ও বন্ধ করে খেলুক, যা ইচ্ছে করুক। কিন্তু ফোন কেন রিসিভ করবে না? এভাবে ইচ্ছে করে ইগনোর করার কারণ কী? সবাই কী পেয়েছে ওকে!
গুনগুন কিছুটা রাগ নিয়েই দোকানে গেল। জিজ্ঞেস করল,
“ফোন রিসিভ করছেন না কেন?”
প্রণয় ফিরে তাকাল পেছনে। গুনগুন দেখতে পেল, প্রণয়ের চোখদুটো লাল হয়ে আছে। ঘোলাটে দেখাচ্ছে। ক্লান্তও মনে হচ্ছিল। গুনগুন আর রাগ দেখাতে পারল না। কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক রেখে জিজ্ঞেস করল,
“আপনি কি অসুস্থ?”
প্রণয় গম্ভীরকণ্ঠে বলল,
“না।”
“ওহ। কল ধরছিলেন না কেন?”
“দেখিনি।”
স্পষ্ট মিথ্যা কথা জেনেও গুনগুন জেরা করল না এই বিষয়ে। জিজ্ঞেস করল,
“দোকান বন্ধ কেন আজ?”
প্রণয় তিরিক্ষি মেজাজ দেখিয়ে বলল,
“সেই কৈফিয়ত তোমাকে দেবো কেন? আমার ইচ্ছে হয়েছে দোকান বন্ধ রেখেছি। আজাইরা এত জেরা কইরো না তো। তোমার কাজ তুমি করো গিয়ে। আমি এখন ব্যস্ত। যাও তুমি।”
গুনগুন অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। উপস্থিত সবাই বিস্মিত। প্রণয় যে এখন গুনগুনের সাথে এভাবে কথা বলতে পারে এটা কারো কল্পনাতেও আসে না। সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছে মাসুদ। সে গুনগুনকে দেখতে পারে না এ কথা ঠিক। কিন্তু আজ প্রথমবারের মতো গুনগুনের বিষাদিত মুখটা দেখে ওর মায়া লাগছে। অন্ধকারেও গুনগুনের ছলছল করা চোখদুটো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে ও। প্রণয় কি দেখেছে বিষাদমাখা সেই চোখ দুটো? না, দেখার কথা না। প্রণয় সামনে ফিরে আসে। গুনগুনের দিকে আর তাকায়নি। তাকালে কি একইভাবে কর্কশকণ্ঠে কথাগুলো বলতে পারত?
গুনগুন দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না। অন্য সময় হলে কথাগুলো হয়তো ওর গায়ে লাগত না। উলটো পালটা জবাব ও নিজেও দিয়ে দিত। আজও চাইলে সে জবাব দিতে পারে।কিন্তু সে খেয়াল করে দেখল, তার আসলে কথা বলার শক্তিটুকুও নেই। মনের মধ্যে কোনো জোর নেই। সে গুরুত্বহীন ভাঙা একটা মানুষ, যাকে সবাই শুধু নতুন করে ভাঙতেই পারে, কষ্ট দিতে পারে। ভালোবাসতে পারে না, আগলে রাখতে পারে না। গুনগুন খুব করে উপলব্ধি করছে, সে পৃথিবীর বুকে একমাত্র অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তি! সবার সামনে অপমানিত হয়ে আর একটা টু-শব্দ পর্যন্ত না করে রাগি, জেদি মেয়েটা নিঃশব্দে স্থান ত্যাগ করল।
চলবে…
[আজকের লেখাগুলোতে ছন্দপতন হতে পারে। ভালনারেবল লাগতে পারে। কারণ আমি নিজেই মানসিক এবং শারীরিকভাবে কিছুটা অসুস্থ। একটা বাজে টাইম ফেইস করতেছি, তবুও চাচ্ছি না লেখালেখিতে এর কোনো প্রভাব পড়ুক। অনেক প্রচেষ্টার পর পূনরায় লেখালেখিতে এক্টিভ হয়েছি। তাই আর ইনএক্টিভ হয়ে হারিয়ে যেতে চাই না, নিজের লেখক সত্ত্বাকেও হারাতে চাই না। এজন্যই এতকিছুর মধ্যেও লেখার চেষ্টা করছি। দোয়া করবেন সবাই।]
Share On:
TAGS: প্রণয়ে গুনগুন, মুন্নি আক্তার প্রিয়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৭
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৬
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৫
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৮
-
প্রণয়ে গুনগুন গল্পের লিংক
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ২
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৩
-
তুমি অজান্তেই বেঁধেছ হৃদয় গল্পের লিংক
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৪
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১