Golpo romantic golpo প্রণয়ে গুনগুন

প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১০


প্রণয়ে_গুনগুন

পর্ব_১০

মুন্নিআক্তারপ্রিয়া


ছাদে আজ বাতাস অস্বাভাবিক রকমের বেশি। কনকনে ঠান্ডা হাওয়ায় শরীর শিউরে উঠছে। অথচ সেই শীতের মাঝেই প্রণয় একা বসে আছে। মনে হচ্ছে, ঠান্ডার থেকেও বেশি কিছু ওকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে ওর ভেতরের আগুনটা। পাশে বসে আছে মাসুদ। সে খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে, গুনগুনের সাথে এমন খারাপ ব্যবহার করে প্রণয় নিজেও ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়েছে।

সেই যে সন্ধ্যার পর ছাদে উঠেছিল প্রণয়। এখন ঘড়ির কাঁটা ধীরে ধীরে রাত এগারোর দিকে ছুটছে। তবুও ওর ওঠার কোনো নাম নেই। মাসুদ এসেছে মিনিট বিশেক হবে। কয়েকবার কথা বলার চেষ্টা করেছে। কিন্তু প্রণয় যেন পাথর হয়ে আছে। কোনো কথারই কোনো জবাব দিচ্ছে না।

সিগারেট ধরিয়েছিল মাসুদ। দু’টো টান দিয়েই বিরক্ত হয়ে আধখাওয়া সিগারেটটা নিভিয়ে ফেলল। ঠান্ডা বাতাসে ধোঁয়াটাও বেশিক্ষণ টিকল না। প্রণয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আর কতক্ষণ এখানে বসে থাকবি?”

প্রণয় নিশ্চুপ। মাসুদ দুকদম এগিয়ে এলো। জিজ্ঞেস করল,

“কথা বলিস না কেন?”

প্রণয় এবার গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

“তুই যা।”

“আমি তো যামুই। তোরে সাথে নিয়াই যামু। চল।”

“জোর করিস না।”

“এরকম পাগলামি করার মানে কী?”

প্রণয় জবাব দিল না। মাসুদ নিজেই বলল,

“এতই যদি কষ্ট পাবি তাইলে ওর লগে অমন খারাপ ব্যবহার করতে গেলি ক্যান? আর সত্যি বলতে, এতগুলা মানুষের সামনে তুই ওরে অপমান কইরা কাজটা ঠিক করস নাই। ওরে আমার সহ্য হয় না। তবুও যখন ওর শুকনা মুখটা দেখলাম আমার নিজের কাছেই খারাপ লাগতাছিল। ওয় তো তোর জন্য কম করে নাই। তুই তাইলে কেমনে পারলি ওরে হার্ট করতে?”

প্রণয় চোখ গরম করে তাকাল মাসুদের দিকে। বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে মাসুদের কলার ধরে বলল,

“ওরে আমি অন্য কারো সাথে সহ্য করতে পারি না। কী করব আমি? ওরে দেখলেই ঐ দৃশ্যটা মনে পড়ে যায়। মাথা গরম হয়ে যায় আমার। ঘেন্না লাগে।”

মাসুদ জোরে ধাক্কা দিয়ে প্রণয়ের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,

“পাগলের মতো কথা বলিস না, প্রণয়। তুই গুনগুনরে পছন্দ করস বা ভালোবাসস এটা তোর ব্যাপার। এখানে তো ওর কোনো হাত নাই। ও কাকে ভালোবাসবে এটা নিশ্চয়ই তুই, আমি ঠিক করে দিতে পারি না।”

“আমারে ক্যান ভালোবাসল না? আমি ঐ ছেলের মতো ওর যোগ্য না তাই? আমার পরিবার নাই তাই?”

মাসুদ দীর্ঘশ্বাস নিল। প্রণয়ের এখন মাথা ঠিক নেই বুঝতে পেরে বলল,

“নিচে চল। রুমে গিয়ে কথা বলতেছি।”

“তুই যা তো। আমার ভাল্লাগতেছে না কিছু।”

মাসুদও জেদ দেখিয়ে বলল,

“তুই যাবি না? আচ্ছা আমিও যামু না। দেহি কতক্ষণ তুই এই ঠান্ডার মধ্যে থাকতে পারস। নে, আমিও বসলাম।”


গুনগুন মানসিকভাবে প্রচণ্ড ভেঙে পড়েছে। একদিকে মাহবুবের এভাবে এড়িয়ে চলা আর অন্যদিকে প্রণয়ের করা হঠাৎ এমন খারাপ ব্যবহার! মানসিক চাপ লাগছিল সবকিছু।

শিশিরকে পড়াতে যাওয়ার সময় সে দুই পায়ের দুই জুতা পরে বের হচ্ছিল। শিহাব তখন বাবার সাথে ড্রয়িংরুমে বসে টিভি দেখছিল। গুনগুনের দিকে তাকিয়ে শিহাব হঠাৎ হেসে বলল,

“এই আপু, তুমি দুই পায়ের দুই জুতা পরছ কেন?”

গুনগুন পায়ের দিকে তাকিয়ে থমকে গেল। সবকিছু এলোমেলো লাগছিল যেন। মৃদু হাসার চেষ্টা করে বলল,

“খেয়াল করিনি!”

এরপর রুমে গিয়ে আবার জুতা ঠিক করে পরে শিশিরকে পড়াতে গেল। আজ সে অন্য সময়ের মতো শিশিরের সাথে গল্প করেনি। চুপচাপ ছিল। শিশির প্রশ্ন করলেও কোনো জবাব দেয়নি। নাস্তাও খায়নি সে। শেলী চৌধুরী বিষয়টা লক্ষ্য করলেন। পড়ানো শেষ করে গুনগুন চলে যাওয়ার সময় ডেকে বললেন,

“তুমি কি কোনো কারণে ডিস্টার্ব, গুনগুন?”

গুনগুনের কান্না পেয়ে যাচ্ছিল। অতিকষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,

“না, আন্টি। আমি ঠিক আছি।”

“ভয় পেও না, কী হয়েছে জিজ্ঞেস করব না। তবে তোমাকে দেখলেই যে কেউ বুঝে যাবে তুমি মানসিকভাবে কিছু নিয়ে হয়তো বিরক্ত। কয়েকদিন রেস্ট নাও। শিশিরকে পড়াতে হবে না কিছুদিন। নিজেকে একটু সময় দাও। এবং নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও। সব ঠিক হয়ে যাবে ইন-শা-আল্লাহ্।”

গুনগুন মাথা নাড়িয়ে বলল,

“আচ্ছা।”

রাতে সে খেতেও গেল না। ওসমান গণি গুনগুনের এই পরিবর্তনটা খুব ভালো করেই লক্ষ্য করেছেন। তবে তিনি আপাতত গুনগুনকে ঘাঁটালেন না।

গুনগুন নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইল। নিজেকে শক্ত করার চেষ্টা করল। এভাবে সে ভেঙে পড়ছে এটা সে নিজেই মানতে পারছিল না যেন। পুরো দুটো দিন সে নিজেকে সবকিছু থেকে গুটিয়ে রেখেছে। বাইরে যায়নি, ক্লাসে যায়নি। প্রণয়ের সাথেও ওর দেখা হয়নি। কুলসুম বেশ কয়েকবার ফোন করেছিল। গুনগুন কোনো রেসপন্স করেনি। তার মেন্টাল হেলথ্ এর এমন অবস্থা যে, কারো সাথে কথা বলারও বিন্দু মাত্র ইচ্ছে নেই এখন।

আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখে রাধিকা এসেছে। গুনগুন নিভু নিভু দৃষ্টিতে তাকাতেই রাধিকা বলল,

“উঠ। আর কত ঘুমাবি?”

গুনগুন উঠে বসল। জিজ্ঞেস করল,

“কখন এসেছিস?”

“বেশিক্ষণ হয়নি। মাত্রই এসেছি। তোর ব্যাপারটা তো কিছু বুঝতে পারছি না।”

“কী?”

“নিজেকে এভাবে ঘরবন্দি করে রেখেছিস কেন?”

“এমনি।”

“গুনগুন এটা কি তুই বল তো? তোকে এভাবে মানায় না।”

“হুম। ঠিক হয়ে যাবে সব। চিন্তা করিস না।”

“কল করেছিল?”

“না।”

“মেসেজ?”

“না।”

“মেসেজও না! এই শা’লার আশা এবার বাদ দে তো। এ পুরা ঢপবাজ। তোর জীবন ঝালাপালা করতে এসেছে। আর কিচ্ছু না।”

“হুম বাদ দেবো।”

“মুখে বললে হবে না। ওকে সব জায়গা থেকে ব্লকও করে দিবি।”

“হ্যাঁ। শুধু একটু সময় নিচ্ছি। আরেকটু মানসিকভাবে স্ট্রং হলেই ব্লক করে দেবো।”

“মুখের কথা নাকি মনের কথা?”

গুনগুন হাসল। এই হাসিতে রহস্যের গন্ধ। রাধিকা বুঝতে পারল না। এসব ব্যাপারে আর কথা না বাড়িয়ে তাড়া দিয়ে বলল,

“এখন উঠ তো। কোথাও থেকে ঘুরে আসি।”

“ভালো লাগছে না। ইচ্ছে করছে না কোথাও যেতে।”

“বাইরে বের হলেই ভালো লাগবে। চল।”

অগত্যা গুনগুনকে রেডি হয়ে রাধিকার সাথে বের হতে হলো। যাওয়ার সময় রিকশায় বসেই চায়ের টং দোকানের দিকে একবার উঁকি দিল গুনগুন। প্রণয় নেই সেখানে। কেন সে প্রণয়কে খুঁজছে কে জানে! রাধিকা জিজ্ঞেস করল,

“কাকে দেখিস?”

“কাউকে না। কোথায় যাচ্ছি আমরা?”

“জিয়া উদ্যান যাব। ওখানে স্ট্রিটফুড খাব, হাঁটব, বসব আর জীবনের গল্প করব।”

গুনগুন মৃদু হাসার চেষ্টা করল। নিজেকে সে স্বাভাবিক করতে চাইলেও মন যেন কোনোভাবেই সায় দিচ্ছিল না। সে প্রতিবার নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করে, আল্লাহ্ যেন তাকে শক্তি দেয়। মানসিক শান্তি দেয়। যেকোনো সমস্যা মোকাবেলা করার মতো মানসিক শক্তিটুকু যেন তার থাকে।

দিনের আলো ও রাতের অন্ধকারের মতোই মাহবুবের বিষয়টাও এখন গুনগুনের কাছে পরিষ্কার। সে জানে না, কেন মাহবুব তাকে এড়িয়ে চলছে। তবে এতটুকু স্পষ্ট বুঝতে পারছে যে, গুনগুনকে সরাসরি ‘না’ বলার সৎ সাহস মাহবুবের নেই। সে হয়তো চাচ্ছে গুনগুন নিজে থেকেই সরে যাক। এতে করে মাহবুব নির্দোষ থাকবে। তাকে কেউ কখনো ব্লেইম দিতে পারবে না। তবে তা-ই হোক। গুনগুনও আর অপেক্ষা করবে না। সে নিজের জন্যই বাঁচবে।

রাধিকার সাথে ঘুরেফিরে একদম সন্ধ্যায় বাড়িতে ফিরল গুনগুন। যাওয়ার পথে খেয়াল করল প্রণয় আজ দোকান খুলেছে। গুনগুন একবার সেদিকে তাকিয়ে সোজা চুপচাপ হাঁটছিল। গুনগুনকে দেখে প্রণয় দৌঁড়ে এলো। পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে বলল,

“সরি।”

গুনগুন নিরুত্তর। প্রণয় আবার বলল,

“সরি গুনগুন। ক্ষমা করে দাও। আর করব না এরকম।”

গুনগুন দাঁড়াল। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে প্রণয়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,

“কী করবেন না আর?”

“তোমার সাথে আর কখনো খারাপ ব্যবহার করব না।”

“আমি আপনাকে আর সেই সুযোগটাই দেবো না। আমি সুযোগ দিয়েছিলাম বলেই আপনি সবার সামনে আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করতে পেরেছিলেন। এখন থেকে আমি আপনাকে চিনি না। আপনিও আর আমাকে চেনেন না। এভাবে আর কখনো আমার পথ আগলে দাঁড়াবেন না। সরুন।”

প্রণয় মোটেও দমে গেল না। গুনগুনের পাশাপাশি আবারও হাঁটতে হাঁটতে বলল,

“দাঁড়াব। শত-শহস্র বার তোমার সামনে দাঁড়াব। শুধু পথ আগলে না, প্রয়োজনে বুক পেতে দাঁড়াব। তুমি আমার বুকের ওপর পা রেখে হেঁটে গেলেও আমি সরে দাঁড়াব না। আবারও বুক পেতে দেবো। ততক্ষণ পর্যন্ত আমি সরব না, যতক্ষণ না পর্যন্ত তুমি আমায় ক্ষমা করো।”

গুনগুন আশেপাশে একবার চোখ বুলাল। এরপর চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,

“পাগল আপনি? কীসব যা তা বলছেন!”

“যা তা নয় গুনগুন। সত্যি বলছি। তুমি বললে আমি এখনই বুক পেতে শুয়ে পড়ছি।”

“নো! ফর গড সেইক, আপনার এসব পাগলামি বন্ধ করেন। আপনি এসব একদম করবেন না।”

“তাহলে বলো আমায় ক্ষমা করে দিয়েছ?”

“ক্ষমা করার প্রসঙ্গ আসছে কেন? আমরা কেউ কাউকে চিনি না আর।”

“তুমি আমায় না চিনতে পারো, গুনগুন। কিন্তু আমি তো তোমায় চিনি। তুমি আমার জীবনে আসা একমাত্র পরী; যে আমার জীবনটাকে একটু একটু করে রূপকথার গল্পের মতো বদলে দিচ্ছিলে। সেই পরীকে আমি কীভাবে ভুলে যাব বলো?”

চলবে…

[বিঃদ্রঃ হাতের অবস্থা ধীরে ধীরে ভালো হচ্ছে। পুরোপুরো ভালো হতে সময় লাগবে। এতদিন লেখা থেকে, আপনাদের থেকে দূরে রাখা কষ্টকর। তাই গল্প নিয়ে চলে এলাম। তবে একটা কথা, গল্প দেওয়া নিয়ে কোনো তাড়াহুড়া করতে পারব না। আর আপনারাও পর্ব ছোটো হলে দয়া করে অভিযোগ করবেন না। পারলে অ্যাপ্রিশিয়েট করবেন। আমার ভালো লাগবে। টেইক লাভ।🫶]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply