পিদিম_জ্বলারাতে. ৩৩✍️ (অন্তিম পর্ব) #রেহানা_পুতুল
প্রায় মাসখানেক পরের ঘটনা। বর্ষাকালের এক নিরালা দুপুর। ঘরের পিছনের উঠানে সবাই বিচ্ছিন্নভাবে অবস্থান করছে। মর্জিনা প্রসঙ্গত সাথীর কথা তুলল। তার কথার রেশ টেনে বাকিরাও সাথীকে নিয়ে নানান গল্প করতে লাগল দুঃখের শ্বাস ফেলে ফেলে। অভ্র কান্না জুড়ে দিল তার সাথিপুর জন্য। সেই সাথে রাবেয়াও সাথীর কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলল।
তার অশ্রু বির্সজন দেখে সীমা উদ্বেলিত না হয়ে রে *গে গেল। মুখ অন্য দিকে ঘুরিয়ে রাবেয়ার প্রতি এক দরিয়া অভিযোগ তুলে বলল,
“এখন আর মায়া কান্দন কাইন্দা লাভ নাই। বহুত মায়া কান্দন দেখাইছেন আপনে। যদি কইতে যাই,আমার মাইয়ার মৃত্যুর লাইগা আপনেই দায়ী। গোড়ার দিকে গ্যালে আঙুল আপনার দিকেই তুলতে হয়। আপনে ঘরের বড় বউ! সুন্দরী! সেই কাহিনীতো শুনলামই আদালতে যাইয়া। আপনে কী মনে করেন, এইসব কথা আপনার ডাক্তার বউ শুনব না? এক হাজারবার শুইনা যাইব। তখন কী বউ আপনারে সাধু জানব? দুধের মতো পবিত্র জানব? কিন্তু আমার সাথী যদি বাঁইচা থাকতো আর আপনার ঘরের বউ হইতো। সে কোনদিনও এসব নিয়া খোঁটা দিতনা আপনারে। কারণ সাথী ঘরের মাইয়া। আর নবনী পরের মাইয়া। দ্যাখেন সামলাইতে পারলে তো ভালই। আর আপনেই তো আমারে কথা দিলেন, তৌসিফ আপনার অবাধ্য হইব না। সাথিরে তার বউ বানাইবেন। কন,কননাই? সাক্ষী আছে আম্মা,আপা। তারাও তো কত কইতো। তারপরেই তো মাইয়ার কানে এইসব তুলছি আমি মাঝে মাঝে। আমার হিসাব আছিল আস্তে আস্তে যেন শরম ভাইঙ্গা যায়। কিন্তু আপনারা লোভে পইড়া ডাক্তার বউ আনছেন ঘরে। আর সাজা পাইলাম আমি। আমার বুক খালি হইয়া গ্যালো।”
মর্জিনা বিরক্ত গলায় সীমাকে ঝাড়লেন।
“মাইজ্জা বউ,তুমি এসব কী কও? তোমার দেমাক ঠিক আছে? খামোখা কথা কইয়া নিজেগো মইধ্যে আর মন কষাকষি রাইখো না। জন্ম, মৃত্যু, বিয়া খোদার হাতে। তিনি নারাজ হইয়া যাইবো তোমার কথা শুনলে। ওর জন্মের সময় কিসমতে কইরা মরণ এইভাবে লিখা আনছে। এইখানে কারো হাত নাই। ওর নিজের হাতে নিজের মরণ লিখা আনছে।”
সিমা চুপ হয়ে হাতের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
রাবেয়া নির্বাক হয়ে গেল সীমার লাগামহীন কথা শুনে। পাথর চোখে এক নজর সীমাকে দেখল। মুখে কোনো রা করল না। অভিযোগ ও অপমানের তীর ছুঁড়ে সীমার বলা প্রতিটি বাক্য রাবেয়ার অন্তরে শূলের মতো বিঁধে গেল। এই অভিযোগ কী হজম করা যায়? সেইই দায়ী সাথীর মৃত্যুর জন্য! অথচ এই সাথীকে সে নিজের জন্ম দেওয়া মেয়ের মতই স্নেহমায়ায় আগলে রাখতো! সেওতো চেয়েছে সাথী তার ঘরের বউ হোক। কিন্তু খোদার ইশারা নড়ানোর সাধ্যি কার আছে এই জগতে।
রাবেয়া অসাড় পায়ে সবার সম্মুখ হতে প্রস্থান নিল। তার বুকটা টনটন করছে ব্যথায়। ঘরে গিয়ে জাহেদকে সব বলল বাষ্পরূদ্ধ গলায়। জাহেদ সীমার উপর তেতে গেল। রাবেয়াকে নিজের মতো করে বুঝানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো। সীমাকে জিজ্ঞেস করতে চাইল। কিন্তু রাবেয়া বাধ সাধল প্রচন্ডভাবে।
যুক্তি দাঁড় করাল,
” দরকার নাই। তাইলে সীমা চেইতা যাইব। পিছনে আমার নামে বানায়াবুনায়া কতটি কইব কারো কাছে। এইভাবে পাড়া রইটা যাইব। তবে শুনতে তিতা লাগলেও এইটাই সত্য, বউ একদিন না শুনবই এইসব।আমাদের সমাজে দোষ না কইরাও মাইয়ালোক দোষী হয়।”
রাবেয়া ঝরঝর করে চোখের পানি ছেড়ে দিল। জাহেদ রাবেয়ার দুচোখ মুছে দিল। রাবেয়ার মাথায় ভরসার হাত রাখল।
তার চারদিন পর রাতে বিদ্যুৎ চলে গিয়েছে। রাবেয়া হারিকেন ও কুপি জ্বালিয়ে নিল। কুপিটি ঘরের ভিতরে মাঝখানে রাখল। যেন সারাঘরে চলাফেরা করতে অসুবিধা না হয়। ভোরে জাহেদের ঘুম ভাঙ্গল। দেখল দুজন মানুষ বাস করা নিরব ঘরটা আরো নিরব হয়ে আছে। সে এদিক সেদিক খুঁজে রাবেয়াকে কোথাও পেল না। পুরোনো ঘরে গিয়ে বিচলিত গলায় সবাইকে জানাল। সবাই রাবেয়াকে খুঁজল হন্যে হয়ে। কোথাও পেলনা রাবেয়াকে।
জাহেদ উৎকণ্ঠিত স্বরে মোবাইলে ফোন করে তৌসিফ ও তানভিরকে জানাল। তৌসিফ ঢাকা হতে নবনীকে নিয়ে উম্মাদের মতো গ্রামে চলে এল। সে একাই আসতে চেয়েছে। কিন্তু নবনী জোর করে তার সাথে চলে এল। তৌসিফ ও তানভির, নবনীর অগোচরে বাবার থেকে মায়ের বিষয়ে সব জানল। পরে তাদের জানামতে সম্ভাব্য সব আত্মীয় স্বজনদের বাড়ি গিয়ে খুঁজল দুই ভাই। কিন্তু কোথাও মা রাবেয়ার চিহ্নটুকুও খুঁঁজে পেলনা।
তানভিরের মাথায় এল, তার এইট পাশ মা কোথাও কিছু লিখে গেল কি-না। রাবেয়ার মাথার বালিশের ভিতর থেকে উদ্ধার হলো একটি চিঠি। তানভির দেখল, মায়ের হাতের লিখা চিঠিটি তার বাবার উদ্দেশ্যে লিখা। তানভির, বাবা ও বড় ভাইকে বলল। নবনীর আড়ালে চিঠিটি তানভির পড়ল বাবার অনুমতিক্রমে।
“আইজ হইতে বহু বছর আগে এক প্রদীপ জ্বলা রাইতে আমার পবিত্র শরীরে ও জীবনে কালিমা পড়ল। তারপরই বনবাসী হইতাম। কিন্তু আমার দুই ছেলের মুখের দিকে তাকায়া চুপ আছিলাম। আইজ আবার এতটা বছর পরে কারো মরনের অভিযোগ আইল আমার উপরে। লগে কলংকের খোঁটা৷ আর নিতে পারলাম না। আমারে মাফ কইরা দিয়েন। আপনে এখন সুস্থ! আমার পরানের দুই ছেলেরাও বড় হইছে। ঘরে বউ আছে। আমি না থাকলেও চলব। তাই আইজ আরেক প্রদীপ জ্বলা রাইতে আমি নিরুদ্দেশ হইয়া গেলাম আপনাগো সবার জীবন থেইকা। আমার দুই সন্তানের জন্য মায়ের প্রাণঢালা দোয়া রইলো। আমারে খুঁইজা লাভ নাই। পাইবেন না। আবার ভাইবেন না সাথীর মতো গলায় দড়ি দিছি। তা একদম না। তার ছিল আবেগের বয়স। আর আমার হইল বিবেকের বয়স। এই বয়সে পাপ কামানোর মতো জ্ঞানহীন আমি নই। আমার বাপের বাড়ি বা কোনো কুটুমের বাড়িও খুঁইজা আমারে পাইবেন না। আমি বাইঁচা থাকুম কোনো এক নির্জন স্থানে গিয়া। যেইখানে সমস্ত অভিযোগ, অপমান যেন আমারে আর না ছুঁইতে পারে। বাঁইচা থাকলে একদিন আমাগো দেখা হইব। ইতি.. আপনার রাবু।”
চিঠি পড়া শেষে তৌসিফ ও তানভির মা,মা বলে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। জাহেদ জগদ্দল পাথর হয়ে গেল। ওরা দুই ভাই সারাঘর হাতিয়ে দেখল মায়ের সবকিছুও অক্ষত পড়ে আছে। মা কিছুই নিয়ে যায়নি হাতব্যাগটি ছাড়া। এমন কী হাতের দুটো সোনার বালাও রেখে গিয়েছে একটি রুমাল পেঁচিয়ে। সবকিছুতেই মায়ের হাতের ছোঁয়া, মায়ের শরীরের সুবাসিত ঘ্রাণ!
সেদিন রাতেও ঘরে বিদুৎ চলে গিয়েছে। ভ্যাপসা গরম লাগছে। তৌসিফ, তানভীর,জাহেদ ও নবনী বিষাদগ্রস্ত মন নিয়ে বাইরে গিয়ে দাঁড়াল। আঙিনায় থই থই করা জোছনা। অদূরে একদল জোনাকিপোকা চক্রাকারে জ্বলছে আর নিভছে। তৌসিফ সেগুলোর দিকে চেয়ে ব্যথিত গলায় বলল,
“মা,তুমি কী আর কোনদিন আমাদের জীবনে ফিরে আসবে না? সারাজীবন স্বামী, সংসার,সন্তান, সমাজের কথা ভাবলে। তবে জীবনের এই পড়ন্তবেলায় অন্যের কথায় কেন আমাদের একলা করে চলে গেলে মা? আমরা তো কেউ তোমাকে কিছু বলিনি। কোনদিন বলতামও না মা। বলার মতো কোনো কাজ তো করনি। বরং ত্যাগই দিয়ে গেলে। দিতে দিতে শরীরের সব র* ক্ত পানি করে ফেললে। মেরুদণ্ড, কোমর ও পায়ের হাড় ক্ষয় করে ফেললে। জীবনটাও তো ক্ষয় করে ফেললে মা। তাহলে বাকি ক্ষয়টাও করে ফেলতে স্বামী,সংসার, সন্তানদের জন্য!
এই নতুন ঘর, ঘরের সবকিছু সবই যে তোমার মা। আর কারো নয়। আমি,বাবা,তানভির,নবনী, আমরা সবাই যে তোমার মা। এত অভিমান বুকে নিয়ে কীভাবে এতটা বছর হাসিমুখে সব সামলেছিলে মা? আমরা কী আর কোনদিন তোমার ওই আদরমাখা মুখখানি দেখব না মা? এতো দূর্ভাগ্য আমাদের? কোথায় খুঁজব তোমাকে মা? ফিরে এসো মা তোমার ভুবনে!
ভাইয়ের পাঁজরভাঙ্গা কথাগুলো শুনে তানভির কান্নার ঢলে পড়ল। সে বাবাকে জড়িয়ে ধরে ছোট বাচ্চার মতো ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল ‘বাবা’ বলে।
নবনী দু ‘ পা এগিয়ে নিয়ে জাহেদের পিঠে মাতৃস্নেহের মতো হাত রাখল। সবাইকে শান্তনা দিয়ে বলল,
” বাবা,আমি আপনাদের জীবনে নতুন। মা কেন বাড়ি, ঘর, গ্রাম ছেড়ে চলে গেল,তা সুস্পষ্টভাবে আমার জানা নেই। তবে আমি কথা দিচ্ছি আপনাদের তিনজনকে। যেভাবেই হোক, মাটি ফুঁড়ে হলেও আমি মাকে খুঁজে বের করবো। দুই সন্তানের কাছে তাদের মাকে ফিরিয়ে দিতে প্রয়োজনে আমার ডাক্তারি পেশা ছেড়ে দিব। তবুও মাকে খুঁজে বের করব। এই পিদিম জ্বলা রাতে আপনাদের কাছে আমার প্রতিজ্ঞা!”
জাহেদ নবনীকে ‘মারে’ বলে বুকে জড়িয়ে নিল। তৌসিফ ম্যাড়ম্যাড়ে স্বরে বলল,
“যে মানুষ নিজ থেকে নিখোঁজ হয়ে যায়,তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না নবনী।”
নবনী নিশ্চুপ রইলো। তৌসিফের দিকে উজল নয়নে চাইল। সামনে ঝোপের ভিতরে ঘন আঁধার! সেই গহীন আঁধার ঠেলে কানে ভেসে আসছে একদল ঝিঁঝিপোকার বুকচেরা ডাক। ওরা চারজন খাঁ খাঁ শূন্যতা ও এক আসমান দুঃখ বুকে নিয়ে সেই আঁধারের দিকে ঠায় চেয়ে রইল।
জীবন যতটুকু দেয় তারচেয়েও বেশীকিছু কেড়ে নেয়!
👉৩৩ ও শেষ। #
#সামাজিক #storytelling #writer #bengalistory #lifelessons #genre #lovestory #twist #loveyourself #✍️ #রেহানাপুতুল ✍️ #রেহানাপুতুল
Share On:
TAGS: পিদিম জ্বলা রাতে, রেহানা পুতুল
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৬
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ২৮
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৭
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৮
-
পিদিম জ্বলা রাতে গল্পের লিংক
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ২০
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ২২
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৮
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ২৩
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৪