পিদিম জ্বলা রাতে. ২৯✍️ #রেহানা_পুতুল
জাহেদ হাতে জ্বলতে থাকা পিদিমটি নিয়ে রুমে প্রবেশ করল। দেখল প্রায় নগ্ন রাবেয়া ঠকঠক করে কাঁপছে অশীতিপর বৃদ্ধার ন্যায়। রাবেয়ার সাথে কাঁপতে লাগল জাহেদও। হাত থেকে পড়ে নিভে গেল পিদিমটি।
জাহেদ পকেট থেকে দিয়াশলাই বের করে নিল। ফের জ্বালিয়ে নিল প্রদীপটি। জ্বলন্ত চোখে তার তরুণী বধূটির দিকে চাইল। পরনের অবিন্যস্ত শাড়ি ঠিক করে পরে নিতে বলল। এবং আশ্চর্য চোখে চেয়ে ভয়ার্ত কণ্ঠে জানতে চাইলো,
“কী হয়েছে? তোমার এই হাল কেন?”
রাবেয়া স্বামীর বুকে আছড়ে পড়ে তীর ভাঙ্গা ঢেউয়ের ন্যায়। হাত লম্বা করে রুমের বেড়ার দিকে দেখায়। জড়ানো স্বরে কুৎসিত বিষয়টা বলল স্বামীকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে। জাহেদ রুমের কোনার দিকে তাকিয়ে গোঙ্গানির মতো করে শব্দ করে উঠে! রাবেয়াকে বুক থেকে সরিয়ে চৌকিতে বসিয়ে দেয়। প্রদীপটি হাতে তুলে নেয়। আলো ফেলে ফেলে বেড়ার উপর থেকে নিচ পর্যন্ত মোটা তারের বাঁধগুলোকে পরখ করে দেখে নেয়।
জাহেদ নির্বাক! তার সমস্ত বোধশক্তি লোপ পেয়ে গেছে। তবুও মাথা খাটিয়ে নেয়। রুম থেকে বেরিয়ে গেল। শোকেসের উপর থেকে তিন ব্যাটারির টচ লাইটা হাতে নিল। তার পিতার রুমের দরজা ফাঁক করল। আলো ফেলে দেখল সলিমুল্লা একাকী রুমে ঘুমাচ্ছে বেঘোরে। পরক্ষণেই সে চলে গেল ছোট ভাই জাবেদের রুমে। রুমে প্রবেশ করেই টর্চের আলো ফেলে পুরো রুম আলোকিত করে ফেলল।
ঘুমন্ত ভাইয়ের পিঠে হাতের শক্ত চাপ দিয়ে ডাকতে লাগল,
“এই জাবেদ! এই! উঠ ভাই উঠ! বড় বেশি বিপদ ঘটে গেছে। আমাদের ঘরে চোর বা ডাকাত আসছে। আমার রুমে আয়।”
জাবেদ আঁতকে উঠে বড় ভাইকে তার সামনে দেখে। ধড়মড়িয়ে উঠে বসল বিছানার মাঝ বরাবর। কাঁচাঘুম থেকে উঠার কারনে চোখজোড়া টকটকে লাল হয়ে আছে। ঠিক যেনো ইট ভাটার গনগনে আগুন। সে কোনো কথাই বলতে পারছে না। দুই ভাই মিলে সেই রুমের ভিতরে গেল। জাহেদ রুমের দরজা বন্ধ করে দিল। কারণ যেন তার পিতা টের না পায়। কিছু বুঝতে না পারে। প্রদীপের আলোয় জাবেদ রাবেয়ার দিকে এক পলক নজর ফেলল। রাবেয়া জবুথবু হয়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে আছে চৌকির এককোণায়। সিঁটিয়ে আছে বাঁশের একটি খুঁটির সাথে। কাঁপছে ঝড়ে ভেজা পাখির ছানার ন্যায়।
জাহেদ বলল,
“আরেহ, ওরে দেখে কাজ নেই। এদিকে দেখ। বেড়ার বাঁধ সবগুলো কেটে নিয়েছে। তোর ভাবির অবস্থা নাজেহাল!”
দুই ভাই লাইট নিয়ে ঘরের বাইরে গেল। যতটুকু সম্ভব ঘরের চারপাশ দেখলো। নির্জন রাত্রিতে কোথাও কোনো জন মানুষের চিহ্নটুকু পেল না। তারা ঘরে ফিরে এলো। জাহেদ ভাইয়ের কাছেও গোপন রাখল রবেয়ার শরীরে পর পুরুষের হাত পড়ার বিষয়টি। সে চায় না তার স্ত্রী ছোট হয়ে যাক দেবরের কাছে। জাবেদ বাঁশের খুঁটির সাথের বেড়াকে ভালো করে দেখল।
আতংকিত স্বরে বলল,
“এটা চোরের কাজ নয়। চোর আসে জিনিসপত্র চুরি করতে। এই দুজন ডাকাত হতে পারে। কিছু না পেয়ে ভাবির গায়ে হাত দিয়েছে নাকি?”
“তা মনে হয় না। সে ভয়ে এমন কাঁপছে।”
তারপর দুই ভাই মিলে তার খুঁজে বের করল রান্নাঘর থেকে। আগের চেয়েও মজবুত করে বেড়া বেঁধে নিল বাঁশের খুঁটিটার সাথে৷ জাবেদ উৎকন্ঠিত গলায় ভাই, ভাবিকে শান্তনা দিয়ে নিজের রুমে চলে গেল। এবং ঘুমিয়ে পড়ল। সেই অমাবস্যার তিমির রাতে আর ঘুম এল না জাহেদ ও রাবেয়ার নয়নজুড়ে। জাহেদ রাবেয়াকে বুকে টেনে নেয় আদুরে বিড়ালের ন্যায়। অনুভব করে রাবেয়ার হ্যাংলা পাতলা গড়নের কোমল দেহখানি তখনও কাঁপছে।
সে বলল,
“জাবেদের কথাই ঠিক। ঘরে ডাকাত প্রবেশ করেছে। কিছু না পেয়ে তোমার সাথে খারাপ কাজ করতে চেয়েছে। যদিও তারা সফল হয়নি আল্লার অশেষ মেহেরবানীতে। লাখো কোটি শুকরিয়া ও কৃতজ্ঞতা উনার প্রতি। ভাগ্যিস! আমি এসে পড়েছি। নয়তো আজ আমার আসার কথা ছিল না। যাইহোক, তুমি এই অংশটুকু দ্বিতীয় কান করো না। যেমন করে আমি জাবেদের কাছে বলেছি এটা বাদ দিয়ে। শুধু সেটাই বলবে।”
রাবেয়া মাথা হেলিয়ে সম্মতি প্রকাশ করে। এবং হাতের মুঠি খুলে একটি জিনিস গুঁজে দেয় জাহেদের হাতে। প্রদীপের আলোয় জাহেদ দেখল একটি সোনার চেইন। জাহেদ অদ্ভূত চোখে তাকিয়ে থাকে চেইনটির দিকে। রাবেয়াকে বলল,
“মানে তার গলা থেকে তোমার হাতে এসেছে?”
রাবেয়া এতক্ষণ কোন কথাই বলতে পারেনি। তার কণ্ঠনালী রুদ্ধ হয়ে গিয়েছে। ভাষারা হয়ে গিয়েছে পঙ্গু! ঘটনার আকস্মিকতায় সে ভীতসন্ত্রস্ত! বিমূঢ়! তবুও অস্ফুট স্বরে কোনমতে বলল,
“তারা দু’জনেই ঠোঁট দিয়া আমার গলা,ঘাড়ে স্পর্শ দিতে লাগল সমানতালে। তখনই আমি তাদেরকে ঠেইলা সরাইতে গিয়া একজনের গলা হইতে এইটা ছিঁড়ে আমার হাতে চইলা আইল। তাদের চেইনের দিকে হুঁশ ছিল না। কেবল আমার শরীরের দিকেই মন ছিল।”
জাহেদ থম মেরে থাকে চিন্তিত মুখে। একটু পরে স্তম্ভিত গলায় বলল,
” আল্লাহ! তাহলেতো এরা ডাকাত নয়। এরা ধর্ষক! এটা আমার কাছে দাও। এটার ক্লু ধরেই আমি এদেরকে বের করব। জাবেদকে বলতে পারলে উপকার হতো। সে হেল্প করতে পারতো। কিন্তু এতে তুমি,আমি একদম ছোট হয়ে যাব।”
“না না! আপনের আল্লাহর দোহাই লাগে। ছোট ভাইয়ারে এই কলংকের কথা কইয়েন না। তাইলে আমি কোনদিন আর এই দুই চোখ হ্যারে দেখাইতে পারুম না। শরমে মইরা যামু।”
“কিসের কলংক রাবু! তারা তো তোমার সর্বনাশ করতে পারেনি। সর্বস্ব কেড়ে নিতে পারেনি।”
এভাবে রাত কেটে যায়। পরেরদিন জাবেদ মসজিদের লোক দিয়ে মাইকে একটি ঘোষণা দিল।
“আমাদের গ্রামের কারো গলার একটি সোনার চেইন হারানো গিয়েছে না-কি? সলিমুল্লাহ মুন্সির বড় ছেলে জাহেদ ভাইয়ের কাছে চেইনটি গচ্ছিত আছে। উপযুক্ত প্রমাণ দিয়ে চেইনটি নেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হইলো।”
তার কয়েকদিন পর গ্রামের একটি কিশোর ছেলে জাহেদের সাথে দেখা করল। বলল তার মায়ের গলার চেইন পথে হারিয়েছে। সেটার এক জায়গায় ঝালাই ছুটে গিয়েছে। তাকে হাত করেই জাহেদ বের করে ফেলল চেইনের আসল মালিককে। জাহেদ গোপনে ভাড়া করা মাস্তান ঠিক করল টাকা দিয়ে। তারা সেই ছেলেকে তুলে নিয়ে তাদের আস্তানায় আটকে ফেলল। তাকে জিম্মি করে বাকিজনকে আটক করল। বেরিয়ে এল আসল সত্য। মাস্তানরা সেই দুজন যুবক ছেলেকে উলটো ঝুলিয়ে প্রহার শুরু করল।
তখন তারা স্বীকার করল, একদিন রাবেয়াকে বাড়ির বাগানে দেখে তাদের লোভ হয়। এতো সুন্দর বউ তারা এই গ্রামে আর দেখেনি। একে যদি তারা একরাত পেত জীবন ধন্য হতো। তারা জাবেদকে বলল বিষয়টা। জাবেদ প্রথমে রাজী হয় না। পরে মোটা অংকের বিনিময়ে জাবেদের সাথে তাদের ডিল হয়। জাবেদ অর্থের লোভে পড়ে যায়। কারণ সে ছিল তখন সদ্য বি.কম পাশ করা এক বেকার যুবক। বিনা পরিশ্রমে যদি ইনকাম হয় মন্দ কী! যেদিন জাহেদ বাড়ি থাকবে না। ঘর তুলনামূলক ফাঁকা থাকবে। সেদিন তারা দুই বন্ধু একইসাথে রাবেয়াকে ভো* গ করবে মন ভরে সারারাত ধরে।
তাই সেদিন সুযোগ পেয়ে জাবেদ তাদের খবর দেয়। কিন্তু তাদের দূর্ভাগ্য জাহেদ বাড়ি চলে আসে। তাদের লোলুপ ইচ্ছা আর পূর্ণ হল না। এখন ধরাও পড়ে গেল। জাহেদ সেই দুজনকে থানায় সোপর্দ করে দিল। বাড়ি এসে রাবেয়াকে বিষয়টা বলল। কিন্তু জাবেদের বিষয়টা গোপন করল। কারণ তাতে সে নিজেই ছোট হয়ে যাবে স্ত্রীর কাছে। তার চেয়ে ভালো সে জাবেদকে শায়েস্তা করবে তারমতো করে। তবুও রাবেয়ার কাছে বলা যাবে না এতে জাবেদের হাত আছে। সে এদের থেকে ঘুষ খেয়েছে সাপোর্ট দেওয়ার জন্য।
জাবেদ বলল,
“এটা কী মা,বাবাকে জানানো উচিত না?”
রাবেয়া স্বামীর পায়ে লুটিয়ে পড়ল। বলল,
“নাহ! এইটা ঘরে জানাজানি হইলে আমার কল্লা পইড়া যাইব। মন্দ কথা দাবানলের মতো। চতুর্দিকে ছড়াইয়া যাইব তার তাপ। আমার পোলাপাইন হইলে তারাও জাইনা যাইব। তাদের ত থানায় দিছেন। আর কী। হইছে তো। যেমনেই হোক আমার ইজ্জত তো খোয়া যায়নি। রক্ষা করতে পারছি।”
জাহেদ চুপ হয়ে যায় স্ত্রী কথার মূল্যায়ন করে। তারপর এক রাতে সেই মাস্তানদের দিয়ে সে জাবেদকে তুলে নেয়। তাকে থানায় দেয়নি। নিজহাতে শাস্তি দিবে বলে। মাস্তানরা ও সে মিলে ইচ্ছেমতো প্রচণ্ডভানে মারে জাবেদকে। জাবেদ জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে যায় অর্ধমৃত অবস্থায়। অবস্থা বেগতিক দেখে তাকে হাসপাতালের বারান্দায় নিয়ে ফেলে রাখে। জাবেদ নিষ্ঠুর যন্ত্রণায় হাসপাতালের বারান্দায় কাতরাতে থাকে। কেউ জিজ্ঞেস করলে বাড়ির ঠিকানা বলে কুঁকিয়ে। বাড়ি থেকে ছুটে যায় সলিমুল্লা, মর্জিনা ও খুকী। তারা জানল চাঁদাবাজরা জাবেদকে তুলে নিয়ে গিয়েছে। কিছু পায়নি বলে বেধড়কভাবে মেরেছে।
দুই সপ্তাহ পর জাবেদ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে আসে। তারপর হতে জাহেদ আর জাবেদের সাথে কথা বলে না। সবার সামনে যতটুকু বলতে বাধ্য হতো,ঠিক ততটুকুই বলতো।
তবে রাবেয়ার কাছে যেহেতু জাবেদ নির্দোষ! তাই সে স্বাভাবিকভাবেই কথা বলতো তার সাথে। আবার জাহেদেরও চরিত্র নিয়ে কোনো সন্দেহ ছিল না ভাইয়ের উপরে। তার পাকাপোক্ত বিশ্বাস হলো,জাবেদ বেকার বলে টাকার লোভে এই হীনকাজে সাপোর্ট দিয়েছে। কিন্তু সেতো এমন নয়।
এদিকে জাবেদ নিগুঢ় সত্যিটা প্রকাশ করতে পারেনি নিজে ধরা পড়ে যাবে বলে। কিন্তু অন্তরে তার প্রতিশোধের আগুন। জ্বলছে একশো চুল্লী!
তার মাস দুয়েক পরের ঘটনা! এক নির্জন বর্ষণমুখর রাত। অবিরাম বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির শব্দে পাশের রুমের কথাও কেউ শুনতে পায় না। জাহেদ বাড়ি নেই। মর্জিনা অসুস্থ। তাই স্কুল পড়ুয়া খুকী মা,বাবার রুমে ঘুমিয়েছিল। জাবেদ রাবেয়ার রুমের দরজায় টোকা মারে। রাবেয়া ‘কে’ বলে উঠে।
“ভাবি,বাইরে এসো মা কেমন জানি করছে।”
চাপাস্বরে বলল জাবেদ।
রাবেয়া দ্রুত রুমের দরজা খুলে দেয়। যেহেতু শাশুড়ী অসুস্থ,তাই অবিশ্বাসের কোনো সুযোগ নেই। জাবেদ অন্ধকার রুমে ঢুকে পড়ে। রাবেয়া ঘাবড়ে উঠে। বুকের আঁচল ঠিক করতে করতে বেরিয়ে যেতে চায়।
রাবেয়ার হাত টেনে ধরে জাবেদ। ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে দেয়।
চলবে…২৯
#সামাজিক #storytelling #writer #bengalistory #lifelessons #genre #lovestory #twist #loveyourself #✍️ #রেহানাপুতুল ✍️ #রেহানাপুতুল
Share On:
TAGS: পিদিম জ্বলা রাতে, রেহানা পুতুল
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ২৩
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৮
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৫
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৩
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৭
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১২
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৪
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৬
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১০