পিদিমজ্বলারাতে. ২ ✍️ #রেহানা_পুতুল
সবাই বিস্মিত চাহনি নিক্ষেপ করল তৌসিফের মুখ পানে। তৌসিফ যা বলবে তা তাদের কল্পনার বাইরে। সলিমুল্লা ছেলে মেয়েদের উদ্দেশ্যে বলতে লাগল,
“খোদার অশেষ রহমতে আমি এক কন্যা ও তিন পুত্রের পিতা হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করছি। মেজো ছেলে জামাল বিদেশ। তোমরা বাকি ৩ ভাইবোন হাজির আছো। বউয়েরাও আছে। আমাদের সংসার আগের মতই চলব। শুধু সম্পত্তি বন্টন কইরা দিমু। কারণ খোলাসা করি। জামাল মোবাইলের মাধ্যমে আমারে জানাইলো সে সামনে দ্যাশে আইব। নতুন ঘর দিব। দালানের ঘর। আমি চিন্তা করলাম ভিটা না ঠিক কইরা দিলে তার মর্জিমতে ঘর তুইলা ফালাইবো। এরপর হয়তো জাহেদও দিব। সামনে তৌসিফরে বিয়াসাদি করাইতে হইব। বাড়ির উপরের সম্পত্তি ভাগ কইরা দিলে ঘর তোলা নিয়া তোমাগো মাঝে আর বিবাদ সৃষ্টি হইব না। লোকে হাসাহাসি করার সুযোগ পাইব না। এর বাদে তোমরা যার যার সীমানায় পছন্দসই সবজি চাষ করতে পারবা। বড় বড় গাছের চারা রোপন করতে পারবা। হাঁস মুরগীর খোয়াড় বসাইতে পারবা। এইসব তোমরা আরো দশ বছর বাদেও করতে পারবা। আমি শুধু বন্টন কইরা দিমু মরণের কথা ভাইবা। বলতে বলতে সলিমুল্লা খুক খুক কেশে উঠলেন। রাবেয়া পানির মগ এগিয়ে দিলো শ্বশুরের দিকে। পানি খেয়ে তিনি লম্বা শ্বাস ছাড়লেন।
জাবেদ বলে উঠল,
“আমার খুব পছন্দ হয়েছে আব্বার হিসাবনিকাশটা। কার কখন মৃত্যু হয় ঠিক নাই। আমাদের যোগ্য পিতা। আব্বা আমাদের ফসলি জমিগুলা?”
“কইতাছি। সেগুলাও সমান তিনভাগ হইবো। যার যার ভাগের জমিতে সেই ফসল ফলাইবা। প্রোগ্রাম শ্যাষ হইলে ভূমি মাপার আমিন আইবো। তারে বইলা রাখছি আমি।”
সবাই মনোযোগ দিয়ে সলিমুল্লার কথাগুলো শুনল। এবং তাদের মনঃপুত হলো। খুকীর মুখের সহজ ভঙ্গি একটু কঠিন হলো। তার মা অনুধাবন করতে পেরে বলল,
“কিরে,তুই কিছু কইবি?”
খুকীর মেলানো ঠোঁট ফাঁক হলো।
“বাবা,আমি কী দোষ করছি। আপনাগো একটা মাত্র মাইয়া আমি। আদর কইরা নাম রাখছেন খুকী। অথচ আমার কথা কিছুই কইলেন না? আমার ভাগের সম্পদ কই? সব যে বিলি করার কথা বললেন,তাইলে আমি কোনদিক দিয়া নিমু জায়গা? আমার তো বাবার সম্পদে হক আছে।”
খুকীর কথা শুনে রাবেয়া,জামালের স্ত্রী সিমা,জাবেদের স্ত্রী মনি তাজ্জব হয়ে গেল। কিন্তু তারা মুখে কিছুই বলল না। ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো। সলিমুল্লা মেয়েকে দৃঢ় স্বরে বললেন,
“মাটি কই চইলা যাইতাছে? এইটা আলাদা কইরা বলার কী?তোর হক তোর প্রাপ্য। কারো কথা বলার জো নাই। না আইনমতে,না ধর্মীয়মতে। যখন মন চায় নিয়া যাইস। ভাইয়েরা দিয়া দিব।”
খুকী চুপ হয়ে গেল। তৌসিফ চওড়া হেসে বলল,
“বাহ দাদী বাহ! দুপুরে সামান্য একটা চিংড়ির বিষয়ে কথা বললাম বলে, আমাকে পাঁচকথা শোনালে। আমি হিংসুটে তাও বললা। এখন ফুফু যে সম্পত্তির ভাগ চেয়ে বসল,এটা কী স্বার্থপরতা,হিংসামী নয়?”
খুকী চট করেই বলে উঠলো,
“আমার মাথায় এইটা আইছে তোর লাইগা। আইজ দুপুরে যা করলি তাতে সব বুঝা হই গ্যাছে। নইলে ঠিকই তোগোরে দান কইরা দিতাম।”
“আপনার দান নেওয়ার মতো ফকির নই আমরা। যত জলদি পারেন নিয়ে আমাদের মুক্ত করেন।”
খুকী উত্তর দেওয়ার আগেই মর্জিনা মরিচ কণ্ঠে বলল,
“তোর হইছেটা কী? হাপের চোখ দেখছত না পিঁপড়ার লেজ দেখছত?
“এগুলো দেখিনাই। তবে ঘরের ভিতরের অনেক কিছুই দেখেছি।”
“কী দেখছত? খুকী নিজের হকের কথা কইছে। তোর বাপের হক তো চায়নাই।”
” আমিও তো দুপুরে আমার মায়ের ভাগের একটা চিংড়ির কথা বলেছি। তাহলে আমাকে কথা শোনালে কেন? নিজের বেলায় ষোলআনা, অন্যের বেলার পাইকড়িও না। কেন দাদী? কেন?”
জাহেদ রাগত স্বরে ধমকে উঠলেন ছেলেকে। হাতের কাছে পেলে কষিয়ে গাল লাল করে ফেলতেন। রাবেয়াও ছেলেকে খুব ঝাড়ল। তৌসিফ চুপ করল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। কপালের র * গগুলো ভেসে উঠল।
সলিমুল্লা বলল,
“তুই কী কইতে চাইছিলি ক?”
“অবশ্যই বলব। প্রোগ্রাম শেষ হোক। আর দাদা, জায়গা নিয়ে আপনার হিসেব ঠিক আছে। লজিক্যাল। তাতে আমাদের কারোই দ্বিমত নেই। তবে আমার প্রশ্ন হলো,প্রোগ্রামের আগে আজই কেন আপনার এই বিষয়টা ফয়সালা করতে হলো?”
” দুপুরে একটা মাছ খাওয়া নিয়া যা হইলো, তাতে আমার মনে হইল,সামনের দিনগুলায় এমন কথা কাটাকাটি ভুল বুঝাবুঝি হইতেই থাকবো। আমি জিন্দা থাকতে তোদের এই রকম আচার আচরণ? আমি মাটির নিচে চইলা গ্যালে তোরা কী করবি,তা বুঝা হই গ্যাছে আমার।”
“আপনার বোঝা হয়েছে না কেউ বুঝিয়েছে তাও আমার বোঝা হয়ে গিয়েছে দাদা। যাইহোক, এমন যদি সব বিষয় বুঝতেন,আর আপনার দৃষ্টিগোচর হতো তাহলে কারো জীবনটা সুন্দর হতো। সুখের হতো।”
“কার জীবন অসুন্দর? সুখের নয়?”
“কারো না দাদা। বাদ দেন।”
সলিমুল্লার নির্দেশ পেয়ে সবাই উঠে গেল যার যার মতো করে। তৌসিফ ভারমুখে বের হয়ে বাড়ির সামনের দিকে চলে গেল। কাচারিঘরের ভিতরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। লাইট না জ্বালিয়ে মোবাইলের ফ্ল্যাশ অন করল। জিন্সের প্যান্টের পকেট হতে ট্যাবলেটের পাতাটি বের করল। কিছুক্ষন আগে সে জাবেদের রুমে গেল তার তাওয়েল খুঁজতে। যেহেতু তাদের যৌথ পরিবার,সবাই সবার জিনিসপত্র ব্যবহার করে। তাওয়েল নিয়ে তাদের ড্রেসিং টেবিলের একটি পাল্লা খুলে নিল লিপজেল নেওয়ার জন্য। তখনই ঘটনাক্রমে সে এই ট্যাবলেটের পাতাটি পেয়ে যায়। তৌসিফ ট্যাবলেটের নাম দেখল। সম্পুর্ন অজানা নামটি তার কাছে। ঘরে কে খায় এই ট্যাবলেট? কিসের জন্য খায়? সে মোবাইলে ছবি তুলে নিল। মেসেজসমেত ছবিটি হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে দিল তার ডাক্তার বন্ধু নবনীকে। নবনী তার স্কুল ও কলেজ লাইফের বন্ধু। দুজনেরই বর্তমান বাস ঢাকায়। সচ্ছল পরিবারের নবনী মেডিক্যাল ভর্তি পরিক্ষায় চান্স পেল। নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরের তৌসিফ চান্স পেল জগন্নাথে। পড়াশোনা শেষে তৌসিফ দ্রুত একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে জয়েন্ট হলো। তাদের জীবনে মধ্যবিত্ত শব্দটা রয়ে গেলেও নিম্ন শব্দটা দূর হলো।
সে কিছুক্ষণ বাইরে হাঁটাহাঁটি করলো। কিন্তু নবনীর কোনো রিপ্লাই পেল না। হয়তো অফলাইন। তৌসিফ একটি সিগারেট বের করে নিল। পরক্ষণেই আবার রেখে দিল। এখন সিগারেট খেয়ে ঘরে গেলে বাবা,মা বুঝে যাবে। তারা খুব অপছন্দ করে সিগারেট খাওয়া। মশার জন্য বাইরে থাকা যাচ্ছেনা আর। তৌসিফ দেখল সবাই ভাত খাচ্ছে। তাদের খাওয়া প্রায় শেষ। সে তার রুমে চলে গেল। সবাই খেয়ে উঠে গেল। তৌসিফের সাথে তারা কেউ কথা বলল না। ঘরে একেকজনের মুখভঙ্গি একেকরকম। সে খেতে গেল। তার মা তাকে ভাত দিলো। নিজেও খেতেও লাগল। রাবেয়া নিজ থেকেই বলল,
“বাবা শোন,তুই ঘরের কোনো বিষয়ে নাক গলাইস না। সবকিছু যেমনে আছে চলুক না। তেমন অসুবিধা তো হইতাছেনা।”
“সবকিছু ঠিক আছে না বেঠিক আছে তুমি নিজেই সেটা বুঝনা মা। অনুভব, অনুভূতি বলতে কিছু আছে নাকি তোমার? আরেকজন যে আছে তোমার স্বামী, উনার অনুভূতিও পুরাই ভোঁতা। তোমার আর কী দোষ। ‘সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে’র মতোন।”
চাপা স্বরে বলল তৌসিফ।
রাবেয়ার অনুভূতি বলতে সত্যিই কিছুই নেই। তার বোধগম্য হচ্ছেনা,কেন তার বড় ছেলে হঠাৎ এত শক্ত শক্ত কথা বলা শুরু করলো। নাকি সামনে বউ আসবে বলে ঘরে কর্তৃত্ব ফলানো শুরু করেছে তার ছেলে। নাহ। তৌসিফ তো এমন নয় স্বভাবে। রাবেয়া নরম গলায় জানতে চাইলো,
“ওহ! ভালো কথা। তোর আব্বায় তোকে জিজ্ঞেস করতে বলছিল,প্রোগ্রামের পর কী বলবি তোর দাদারে?”
“পরের কথা পরেই শোনে নিও। এখন নয় মা।”
তৌসিফ খেয়ে আবার বেরিয়ে যায় ঘরের বাইরে। কলেজ পড়ুয়া ছোট ভাই তানভিরকে মোবাইলে ফোন দিল। তানভির জেলা শহরের একটি আবাসিক হোস্টেলে থাকে। বাড়ি থেকে তার কলেজ বেশ দূরে। নিকটের কলেজগুলোর মান এই কলেজের চেয়ে নিম্নমানের। তাই তৌসিফ ভাইকে এই কলেজে ভর্তি করাল। তৌসিফ ভাইকে দিনের ও রাতের ঘটনা অবহিত করল। শেষে বলল,
“তুই কবে আসবি?”
“পূর্বের দিন আসিব ভ্রাতা। গৃহে দিবানিশি গৃহযুদ্ধ চলিতে থাকে। যদিও তাহা উষ্ণ নহে মৃদু ঠান্ডা। প্রত্যক্ষ নহে পরোক্ষ।”
“চুপ করে থাকিস কেন তাহলে?”
“আমি ছোট মানুষ। কীভাবে উচ্চবাচ্য করিয়া অভদ্র বিশেষণ গ্রহণ করিয়া লই? তথাপি আমাদের মাতার তো কোনো সমস্যা দেখিনাই কভু।”
” এটা ভুল ধারণা তোর। আমাদের মাতার জীবনাবস্থা কতটা নিষ্পেষিত! কতটা গুরুত্বহীন! কতটা উপেক্ষিত! কতটা মায়া-মমতাহীন তা অকল্পনীয়! তুই কী একাডেমিক পড়াশোনা বাদ দিয়ে সারাদিন গল্প উপন্যাস নিয়ে থাকিস?”
“নাতো ভ্রাতা।”
কথা শেষ হলে তৌসিফ ফোন রেখে দেয়।
তৌসিফের মেসেজ দেখে নবনী আপ্লুত মনে বলে,
“সেটাই বন্ধু! প্রয়োজন ছাড়া তুমি মেসেজ,ফোন দেওয়ার ছেলে নয়। কেবল আত্মমর্যাদা,পারসোনালিটি,উঁচু নিচুর তফাৎ ,পরিবার,দায়িত্ব এসব বোঝো, কিন্তু কোন মানবীর মনটাকে বোঝার চেষ্টা করনা।”
নবনী জুম করে সময় নিয়ে ট্যাবলেটের পাতাটি দেখে। আতংকিত হয়ে উঠে। দ্রুত মেসেজ টাইপ করে সেন্ড করে তৌসিফকে।
“তুমি এই মারাত্মক ট্যাবলেট কোথায় পেলে তৌসিফ? কার কাছে?কে খায়? এটা আমাকে ক্লিয়ার করো। এই মেডিসিন তো বাংলাদেশে নিষিদ্ধ। কোনো ফার্মেসী বা হসপিটালেও বিক্রি হয়না এই ট্যাবলেট। এটা ধীরে ধীরে মানুষের দেহের সমস্ত স্নায়ুকোষকে দুর্বল ও অকেজো করে দেয়।”
পড়া শেষে তৌসিফ বিমূঢ় হয়ে যায়। ঘাবড়ে উঠে অনেকটা। সে জোরে জোরে শ্বাস ফেলতে থাকে। যেভাবেই হোক এই নিষিদ্ধ ট্যাবলেটের রহস্য তাকে উদঘাটন করতেই হবে।
Share On:
TAGS: পিদিম জ্বলা রাতে, রেহানা পুতুল
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৬
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৭
-
পিদিম জ্বলা রাতে গল্পের লিংক
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৭
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৬
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১২
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৩
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৫
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১১