Golpo কষ্টের গল্প পরগাছা

পরগাছা পর্ব ১৫


পরগাছা |১৫|

ইসরাত_তন্বী

(অনুমতি বিহীন কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ)

কক্ষের দখিনা দুয়ার খুলে রাখা। প্রশস্ত বারান্দা ডিঙিয়ে হুড়মুড়িয়ে প্রবেশ করছে মুঠো মুঠো ঠাণ্ডা হাওয়া। কক্ষের সর্বকোণ কাঁচা ফুলের সুগন্ধে ভরে উঠেছে। নিঃশ্বাসের সহিত মিশে সুখকর অনুভূতির দোলা দিয়ে যাচ্ছে। রাজকীয় পুষ্পে সজ্জিত পালঙ্কের মধ্যিখানে চুপচাপ বসে আছে অদিতি। কিছুক্ষণ আগেই ওকে খাইয়ে কক্ষে রেখে গেছে কয়েকজন মিলে। তখন থেকেই ঠায় বসে আছে মেয়েটা। লণ্ঠনের মৃদু আলোকরশ্মি ছড়িয়েছে চারপাশে। মুগ্ধ চোখে কক্ষের চারিদিক দেখে চলেছে।

অদিতি যখন সবটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে ব্যস্ত তখন শ্রবণেন্দ্রিয়ে প্রবেশ করল পুরুষালী কণ্ঠস্বর,
“একাকী বিরক্ত হচ্ছেন?”
অদিতি চমকে উঠল। চকিতে পাশ ফিরল। দেখল পালঙ্কের পাশে হাসিমুখে রবী দাঁড়িয়ে আছে। কখন এসেছে মানুষটা? দরজার দিকে আড়দৃষ্টিতে তাকাল। ওটা বন্ধ করা। এত কিসের ভাবনায় মত্ত ছিল যে একটা মানুষের উপস্থিতি একটুও অনুভব করতে পারেনি? ভীষণ লজ্জায় পড়ল মেয়েটা। চোখ নামিয়ে রিনরিনে গলায় বলল,
“না, ঠিক আছি।”
অদিতি জবাব দিল, তবে ওকে অবাক করে দিয়ে রবী হেসে উঠল। মেয়েটা হকচকিয়ে গেল। এখানে হাসার মতো কী বলল? রবী সময় নিয়ে হাসি থামাল। বিজ্ঞদের মতো করে বলল,
“আপনি কি কোনোভাবে নিজেকে পরিবর্তন করার চেষ্টা করছেন রাগিনী? যদি সেটার ইচ্ছা থাকে তাহলে বলব, না। আমি যেই ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়েছি সেটা ধরে রাখুন। আপনার সাথে এমন নরম সরম কণ্ঠস্বর মানায় না। ওই কঠিন গলার আওয়াজটা ছাড়া আপনি অসম্পূর্ণ। আমি আম্মার থেকে সবটা শুনেছি। চিন্তা করবেন না, পরবর্তীতে আর কখনো এরকম ঘটনার সম্মুখীন হতে হবে না আপনাকে। আমি ওরকম বিভ্রান্তকর ঘটনার জন্য দুঃখিত।”

অদিতি অবাকের শীর্ষে পৌঁছেছে। নেত্র যুগলে ছড়িয়েছে পাহাড়সম মুগ্ধতা। রবীর রুপের মুগ্ধতা তাকে বশ করতে পারেনি। পুরুষ মানুষের রুপ দিয়ে কী হবে? চেহারা, সৌন্দর্য সব তো ক্ষণস্থায়ী। এই আছে তো এই নেই। পুরুষ বাঁচে টাকায়, পুরুষ বাঁচে ব্যক্তিত্বে। একজন পুরুষের, একজন নারীর, একজন মানুষের সুন্দর ব্যক্তিত্বের উপরে কিছু নেই। এই মুহূর্তে ঠিক সেই ব্যক্তিত্বেই মুগ্ধ হয়েছে অদিতি। ঠোঁট দ্বয়ে মৃদু হাঁসি খেলে গেল। সেভাবেই মেয়েটা বলল,
“আপনি একজন মানুষ হিসেবে অসাধারণ।”

রবী অধর ছড়িয়ে হাসল,
“কী জানি! আচ্ছা আপনার পরিহিত শাড়ি পরিবর্তন করা প্রয়োজন তাই না? আমি শাড়ি দিচ্ছি আপনি পরিবর্তন করে আসুন। অনেকক্ষণ এভাবে আছেন।”
অদিতি এতক্ষণে খেয়াল করল রবীর শরীরে বিয়ের পাঞ্জাবী পাজামা নেই। তার মানে সব পরিবর্তন করেই স্টেশনে গিয়েছিল। ওর নিজেরও ভীষণ অস্বস্তি লাগছে শাড়িতে। ভারী শাড়িটা খুলতে পারলেই বাঁচে। অদিতি মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। সেটা লক্ষ্য করতেই পাশের টেবিল থেকে লণ্ঠন তুলে নিল রবী। পায়ে পায়ে আলমিরার দিকে অগ্রসর হলো। ফিরে এল একটা গোলাপি রঙের সুতি শাড়ি, ব্লাউজ এবং পেটিকোট নিয়ে। পালঙ্কের এক পাশে রাখল। ছোট্ট করে বলল,
“বাথরুম থেকে শাড়ি পরিবর্তন করে বারান্দায় আসুন। আজ পূর্ণিমা। জোৎস্না বিলাস করি দুজনে মিলে।”
অদিতি মুচকি হাসল, “আচ্ছা।”
রবী চলে গেল বারান্দায়। অদিতি পালঙ্ক থেকে নেমে দাঁড়াল। লণ্ঠন আর শাড়ি হাতে বাথরুমের দিকে হাঁটা ধরল।
.

চন্দ্রালোকিত রাত্রি। প্রকৃতির নৈস্বর্গিক সৌন্দর্যে নিজেদের খুইয়ে বসেছে একজোড়া কপোত কপোতী। বৃষ্টির পরে আকাশ এখন স্বচ্ছ। প্রকৃতি নিস্তব্ধ। চাঁদের মিষ্টি আলোয় আলোকিত ধরিত্রী।‌ শীত শীত একটা হাওয়া বয়ে চলেছে। ক্ষণে ক্ষণে শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছে। বারান্দায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে অদিতি এবং রবী। দুজনের মধ্যিখানে বেশখানিকটা দুরত্ব বজায় রাখা আছে। ঘড়ির কাঁটার দখলদারিত্ব একটার ঘরে। মধ্যরাতে সচরাচর গ্রামের মানুষেরা তন্দ্রাচ্ছন্ন থাকে। সেখানে চৌধুরী বাড়ি একটু ব্যতিক্রম বৈকি। অদিতি নীল অম্বরে চেয়ে আওড়াল,
“আজকের আকাশটা ভীষণ সুন্দর।”
“ঠিক আপনার মতোই।”
রবীর দৃষ্টি নিবিষ্ট দূরাকাশের শশীর দিকে। সেদিকে তাকিয়েই বলল কথাটা। অদিতি নিজেও চোখ সরাল না। কেবল হাসল,
“মশকরা করছেন?”
“আপাতত না।”
“সন্ধ্যার আলোচনায় বড়োদের থেকে জানার সুযোগ হলো, আপনি নাকি এখন বিয়ে করতে চাননি। জোরপূর্বক আমাকে দেখতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল আপনাকে।”
প্রশ্নটা করে উত্তরের আশায় রইল অদিতি। রবী তৎক্ষণাৎ কিছু বলল না। বেশ কিছুক্ষণ নিশ্চুপ রইল। অতঃপর জবাব দিল,
“বিয়ে শব্দটার সাথে এখনই জড়াতে ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু আপনাকে দেখার পরে ফিরে আসার সাধ্য হয়নি।”
“আচ্ছা।”
ছোট্ট কথাটা বলে চুপ হয়ে গেল অদিতি। রবী নিজেও কিছু বলল না। দুজন আড়চোখে তাকাল। দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলল কিয়ৎসময়ের জন্য। নীরবে নিভৃতে সময় পেরিয়ে চলল। নবদম্পতির সঙ্গী হলো প্রকৃতি। একে অপরকে বোঝার জন্য তারা নীরবতার আশ্রয় নিল। সব যদি মুখে বলেই বোঝাতে হয় তাহলে সম্পর্কের বাঁধন আর শক্ত হলো কোথায়? কিছু শব্দ, কিছু অনুভূতি না হয় অব্যক্ত থাক। অপরপক্ষ বিচক্ষণতার সাথে, ভালোবাসা দিয়ে নতুবা যত্ন করে সেগুলো উপলব্ধি করুক। সব যে মুখে বলতে নেই।
.

আরুষ বাড়ি ফিরেছে মাত্র। ভিজে চুপচুপে হয়ে আছে পরিহিত পাঞ্জাবী। লেপ্টে আছে বলিষ্ঠ দেহের সহিত। ঠাণ্ডায় চোখ মুখ লাল হয়ে ফুলে গেছে। নীচে আসমান শেখ বসে ছিলেন ছেলের অপেক্ষায়। আরুষকে এই অবস্থায় দেখে দ্রুত দোতলায় পাঠিয়েছেন।‌ কক্ষের দরজাটা আলগোছে খুলতেই কাঁচা ফুলের সুবাস এসে নাসারন্ধ্রে ঠেকল। থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল আরুষ। মাথাটা বড্ড ধরেছে। চারপাশে ঝাঁপসা দেখছে। সেই ঝাঁপসা চোখেই কক্ষের চারিদিক দেখল। আজও পালঙ্কটা সেই প্রথম দিনের মতোই সজ্জিত কাঁচা ফুলের সমাহারে। বিছানার একপাশে বসে আছে চন্দ্রা। ঘটনা সহজেই বুঝল আরুষ। অমনিই মুচকি হাসল। আলমিরার দিকে অগ্রসর হলো। গেঞ্জি আর লুঙ্গি নিয়ে বাথরুমে চলে গেল। চন্দ্রাকে যেন দেখেও দেখল না।

কিছু সময়ের ব্যবধানে আরুষ পরিহিত সিক্ত কাপড় পরিবর্তন করে বেরিয়ে এল। মুখমণ্ডলে পানি দিয়ে এখন একটু ভালো লাগছে। কিন্তু মাথা যন্ত্রণা এত সহজে কমার নয়।‌ দীর্ঘক্ষণ ভেজার ফলস্বরূপ সামনে যে বড়ো একটা অসুখে পড়তে চলেছে তার আগাম বার্তা দিব্যি পাচ্ছে ছেলেটা। তবে সেসবে সবসময়ের মতোই নিরুদ্বেগ। আরুষ হাতে থাকা গামছাটা যথাস্থানে রেখে পালঙ্কের সামনে এসে দাঁড়াল। তীক্ষ্ণ চোখে চন্দ্রাকে উপর থেকে নিচ অবধি দেখল। মেয়েটা মুখ নুইয়ে রেখেছে। আরুষ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। হেসে প্রশ্ন করল,
“সেজেছ?”
এতক্ষণে চন্দ্রা মুখ তুলে চাইল। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি দৃশ্যমান। একঝাক লজ্জা নিয়ে উত্তর দিল, “জি, সারথী সাজিয়ে দিয়েছে।”

আরুষের মাঝে কোনো হেলদোল দেখা গেল না। মাথাটা বিদ্যুৎ চমকানোর ন্যায় যন্ত্রনায় থেকে থেকে চমকে উঠছে। অসহনীয় যাতনা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে প্রতিটা নিউরনে। আরুষ আলগোছে হাত উঠিয়ে কপালে বার কয় ঘষা দিল। সেভাবেই ফের জিজ্ঞাসা করল, “কার জন্য সেজেছ?”

চন্দ্রার হাসি মুখটা আস্তে ধীরে থমথমে হয়ে উঠছে।‌ এই সাধারণ প্রশ্নগুলো ওর জন্য বড্ড জটিল শোনাচ্ছে। আত্মসম্মানবোধে আঘাত হানছে। কিন্তু আজ তো স্বেচ্ছায় নির্লজ্জতা বরণ করেছে। সেখানে এগুলো ভাবা বড়ো বোকামি। চন্দ্রা আরুষের থেকে চোখ নামিয়েছে ততক্ষণে। নরম কণ্ঠে জবাব দিল,
“আপনার জন্য।”

জবাবে আরুষের মুখের হাসি বাড়ল। মেয়েটার জন্য বড্ড মায়া হয় ওর। এমন একটা জীবনের সাথে মেয়েটা নিজেকে জড়িয়েছে যেখানে অপরপক্ষের নিজেই জীবনকে তোয়াক্কা করে না। সেখানে এই মেয়েটাকে কীভাবে মূল্য দিবে? গুঞ্জনের ভাষায় কাপুরুষ বটে। আরুষ হাসিমুখে বলল,
“আমাকে দেখাতে চেয়েছিলে। দেখলাম আমি। তুমি ভীষণ সুন্দর। লাল শাড়িতে সেই সৌন্দর্য আরও কয়েকগুণ বেড়েছে। এখন ঘুমিয়ে পড়ো কাপড় পরিবর্তন করে। আমি পাশের কক্ষে থাকব আজ থেকে।”

আরুষ মুখের কথা শেষ করে উলটো ঘুরে হাঁটা ধরল। অপরপক্ষকে কিছু বলার সুযোগ দিল না। দরজা অবধি পৌঁছাতেই কর্ণগোচর হলো কান্নার করুণ আওয়াজ। থেমে গেল চলন্ত পা জোড়া। পিছু ফিরল। চন্দ্রার আজ কী হয়েছে কে জানে! হঠাৎ করেই মেয়েটা বুক ধরে হাউমাউ করে কাঁদছে। যেন বুকের মাঝে খুব কষ্ট হচ্ছে ওর। আরুষ ম্লান চাহনিতে চেয়ে রইল। মুখ ফুটে কিছু বলল না।

চন্দ্রা কাঁদতে কাঁদতেই ছুটে এসে আরুষের সম্মুখে মেঝেতে বসে পড়ল। মেঝেতে দুহাত রেখে ডুকরে কেঁদে উঠল। ক্রন্দনরত গলায় বলে চলল,
“আমাকে ফিরিয়ে দিবেন না। আমি একটা শক্ত আশ্রয় চাই। আমার সাত কুলে কেউ নেই। একটা বাচ্চা দিন। আমি কথা দিচ্ছি তাকে নিয়ে এই জীবন পার করে দিব। শুনছেন আপনি? আপনার আম্মা আমাকে ঠকিয়েছে। আমি সইতে পারছি না এই যন্ত্রনা। আপনাকে আমি কখনোই বিয়ে করতাম না। গুঞ্জকে আমি ভালোবাসি। আমার শৈশবের সুখ দুঃখের সঙ্গী গুঞ্জ। তার ঘর কীভাবে ভাঙব? আমাকে জোরজবরদস্তি করে বিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি কোথাও একটুও সম্মান পেলাম না। কেউ মূল্যায়ন করল না। মামার কথা রাখতে যেয়ে আমি সবার সাথে ভুল করেছি। পাপ কুড়িয়েছি। সবার চোখে খারাপ হয়েছি। ভালোবাসা হারিয়েছি। আমাকে আজ ফিরিয়ে দিবেন না। এই জীবন বয়ে বেড়ানোর মত একটা অবলম্বন দিন। গুঞ্জর জায়গা আমার চাই না। সেটা আমার ভাগ্যে নেই।”

চন্দ্রা যেন আজ নিজের মধ্যে নেই। পাগলের মত প্রলাপ বকে চলেছে। আরুষ কথাগুলো শুনল। কী করবে, কী বলবে বোধগম্য হচ্ছে না। হাঁটু ভেঙ্গে বসল চন্দ্রার সামনেই। আলতো করে ভরসার হাতটা চন্দ্রার মাথায় রাখল। আশ্বাস দিল,
“ভয় নেই। তোমার প্রাপ্য মর্যাদা তুমি পাবে। এখানেই থাকবে তুমি। গুঞ্জন এখনও তোমাকে ভীষণ ভালোবাসে। ওর সাথে প্রতিযোগিতায় না নেমে ভালোবাসা দিয়ে আপন করে নাও। আম্মার সাথে আমি নিজে কথা বলব। একদিন সময় করে তোমার সব গল্প শুনব। তোমার সুখ দুঃখের ভাগীদার হব। কথা দিচ্ছি।”
একটু থেমে ফের বলল,
“আমার একটু সময়ের প্রয়োজন। ভাবতে চাই। একজনকে ভালোবেসে আরেকজনকে গভীরভাবে ছোঁয়ার দুঃসাহস দেখানোর মতো সাহসী আমি এখনও হইনি চন্দ্রা। আশাকরি বুঝতে পারছ সবটা। আমিও একজন মানুষ। চারদিকের এত এত চাপ আমার মস্তিষ্ক বিক্ষিপ্ত করে রাখে। তবে তোমার কোনো ক্ষতি হবে না মেয়ে। নিশ্চিন্ত থাকো। রাত হয়েছে যাও ঘুমিয়ে পড়ো।”

নিজের মতো কথাগুলো বলে উঠে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল আরুষ। চন্দ্রা রক্তিম বদন তুলে দেখল সেই প্রস্থান। ফিরিয়ে দিল ওকে? গ্রহণ করল না? এই একজীবনে ভাগ্য আর কত উপহাস করবে? এমন তুচ্ছ জীবন তো চন্দ্রা কখনোই চায়নি। বুকটা কেউ যেন ছুরিকাঘাতে ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছে। গলাটা জ্বলে যাচ্ছে। বারকয় ডলল গলার নিচে। মেঝেতেই শরীর ছেড়ে দিল চন্দ্রা। একটা ব্যথীত অন্তরের সঙ্গী হলো দূরাকাশের মৃগাঙ্ক, প্রকৃতিতে রাজত্ব করা মারুত, বৃক্ষের উঁচু শাখায় ঘর বাঁধা নিশাচরী পেঁচা।
.

মধ্যিখানে পেরিয়েছে একটা দিন। ঘড়ির কাঁটা ঘুরে নিজের ঘাঁটি বেঁধেছে দশটার ঘরে। আজ দুপুর নাগাদ অদিতিকে চৌধুরী বাড়িতে আনতে যাবে গুটি কয়েক জন মিলে। নতুন জামাই আসবে শেখ বাড়িতে। সেই খুশিতে রান্নাঘরে চলছে হরেক পদের রান্না। কাজের চাচি গুলো বাড়িঘর মুছে তকতক করে রাখছে। বেশকিছু অতিথি রয়ে গেছে। গুঞ্জরিকা তাদের জন্যই ফল কাটছে খাবার টেবিলে বসে। হাতে ছুরি। আজ সকালে একবার কথা কাটাকাটি হয়েছে শাশুড়ির সাথে। সেই থেকে মন মেজাজ খুব একটা ভালো নেই। আজকাল কথায় কথায় রোকেয়া শেখ গুঞ্জরিকার পরিবার তোলে।‌ আর এটা একদমই ভালো লাগে না মেয়েটার। গুঞ্জরিকার কাজের মাঝেই পাশে এসে দাঁড়ালেন আয়েশা শেখ। গুঞ্জরিকাকে অন্যমনস্ক দেখে কর্কশ গলায় বললেন,
“সামান্য কয়ডা ফল কাটতে আজ কি সারাডা দিন লাগায় দিবি নাত বৌ? তুই যে দেখি আজকাল কোনো কামেই গুরুত্ব দিস না।”

গুঞ্জরিকা ধ্যান চ্যুত হলো। অকস্মাৎ এমন কথাতে ঈষৎ কাঁপল কায়া। ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে দেখল। মুখটা কঠিন রেখেই বলল,
“কাজ তো করছি দাদী। বসে তো নেই। আমার হাত দুটো।”

আয়েশা শেখ মুখের উপর এমন কথা ঠিক হজম করতে পারলেন না। অথচ মেয়েটা ভালোভাবেই বলল কথাটা। কিন্তু সেটাকে পেঁচিয়ে উলটো ধরে বসে থাকলেন। ওই যে বলে যে যেমন তার চিন্তাভাবনাও ঠিক তেমনই। চোখ দুটো গরম করে চেয়ে রইলেন। দাঁতে দাত পিষে বললেন,
“আমার মুখে মুখে তক্ক করিস তুই নাত বৌ? দুপয়সার দাম দিচ্ছিস না? আজ দাদু ভাই আইলে বিচার দিমু।”

শেষের বাক্যটা গুঞ্জরিকার সব ধৈর্য মুহুর্তেই ভেঙে দিল। হাতে রাখা আপেলটা জোরে শব্দ করে থালাতে রেখে উঠে দাঁড়াল। আয়েশা শেখের চোখ চোখ রেখে বলল,
“ডাকুন আপনার দাদুভাইকে। এক্ষুনি ডাকুন। দেখি সে আমার কী করে।”

গুঞ্জরিকার এমন ব্যবহারে আয়েশা শেখ কথাটাও বলতে ভুলে গেলেন। পাশের চেয়ারে বসে শব্দ করে কেঁদে উঠলেন। চারপাশ থেকে সবাই ছুটে আসল। আরুষ ধীর পায়ে নিচে নেমে সিঁড়ির কাছটাই দাঁড়াল। রোকেয়া শেখ ছেলের কাছেই গেলেন।‌ ঘটনা সবটা খুলে বললেন। আয়েশা শেখ ফ্যাচ ফ্যাচ করে কেঁদে চলেছেন। সেভাবেই বিড়বিড় করে আওড়ালেন,
“নতুন নাত বৌ এর নখের ও যোগ্য না তুই। আমারে এভাবে আজ পর্যন্ত কেউ বলে নাই। আল্লাহ তোর বিচার করমু।”

আয়েশা শেখ মুখের কথাতে সমাপ্তি টানা মাত্রই গুঞ্জরিকা বলে উঠল। মেয়েটার ব্যঙ্গাত্মক কণ্ঠস্বর,
“আল্লাহ বুঝি আপনার একার? পাপ করে আবার বিচার ও দিচ্ছেন? আরে বাহ্! চমৎকার বিনোদন।”

তৎক্ষণাৎ অদূর থেকে ভেসে এল পুরুষালী গম্ভীর কণ্ঠস্বর,
“গুঞ্জন মুখ সামলে। দাদী তোমার গুরুজন।”
আরুষ একপ্রকার ধমকে উঠল গুঞ্জরিকাকে। কিন্তু তারপর যা ঘটল সবটা অভাবনীয়। গুঞ্জরিকার হাতে ছুরি ছিল। রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে সেটা ছুড়ে মারল আরুষের দিকে। ভ্রু সহ চোখের পাশ ঘেঁষে দিয়ে একটা রেখা এঁকে গেল। চোখের কোনাও কেটেছে সম্ভবত। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটতে শুরু করল। উপস্থিত সকলে স্তব্ধ হয়ে গেল। ঘটনা কী ঘটল বুঝতে বেশ কিছুক্ষণ সময় লাগল। ছোটখাটো হট্টগোল বেধে গেল শেখ বাড়িতে। সবাই ছুটল আরুষের দিকে। অথচ রোকেয়া শেখ ছুটলেন গুঞ্জরিকার দিকে। বিশ্রী এক গালি ছুঁড়লেন,
“বেশ্যা আমার ছেলের দিকে হাত বাড়ানোর সাহস কোথায় পেলি তুই?”

“আম্মা থামুন।”
মাঝ পথেই ওনাকে থামিয়ে দিল আরুষ। ছেলের আদেশ অমান্য করার সাহস দেখালেন না রোকেয়া শেখ। গুঞ্জরিকা রাগে রিতিমত কাঁপছে। নিজের কাজের জন্য একটুও অনুতপ্ত নয় সে। মানুষটা সবসময় কেন ওকে চুপ করাতে ছুটে আসে? দোষীদের উপরে একটা শব্দও কেন বলে না? সব অবিচার কেন ওর সাথেই? চোখ থাকতে সবাই কেন অন্ধ সাজে?

চন্দ্রা কাঁদতে কাঁদতে পানি আনতে ছুটেছে।‌ হঠাৎ করে কী থেকে কী হয়ে গেল! আরুষ একখণ্ড পাথরে পরিণত হয়েছে। কাটা স্থানের র ক্তে স্নানিত ছেলেটা। সবাই তাকে নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েছে। অথচ সে নির্বিকার, অনুভূতিহীন। তাকিয়ে আছে গুঞ্জরিকার নির্লিপ্ত চোখ দুটোতে। যেখানে নেই কোনো ভালোবাসা, নেই কোনো অনুশোচনা, নেই কোনো দয়া। এতটা পর কবে হলো আরুষ? দেহের ব্যথা ছাপিয়ে মনের ব্যথা ছেলেটাকে কাবু করে ফেলল মুহুর্তেই।‌

শেখ বাড়ির পরিবেশ যখন এলোমেলো, পরিবারের সকলে ছেলের শোকে কাতর তখন বাড়ির পরিবেশ আরেকটু বিক্ষিপ্ত করতে, সবার শোক বাড়িয়ে দিতে প্রধান ফটকে এসে উপস্থিত হলো একজন অচেনা যুবক ছেলে। শরীরে ঢিলেঢালা অপরিষ্কার শার্ট দৃশ্যমান। চৌধুরী বাড়ি থেকে পাঠানো হয়েছে তাকে। ছেলেটা হাঁপাচ্ছে। হাঁপাতে হাঁপাতেই উচ্চস্বরে সবাইকে ডাকল,
“আপনারা কে কোথায় আছেন? এদিকে আসুন। খবর আছে। এ বাড়ির নতুন জামাই রবী চৌধুরী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে।”

চলবে

(ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আপনাদের সকলের রেসপন্স ও গঠনমূলক মন্তব্যের আশা রাখি।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply