Golpo romantic golpo নূর এ সাহাবাদ

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৯


নূরসাহাবাদ

jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস

পর্ব- ৯

সাহাবাদ প্রাসাদের বিশাল ছাদের ধারে দাঁড়িয়ে আছে বাইজিদ শাহ্। বিকেলের আলো তখন ধীরে ধীরে নরম হয়ে এসেছে। সূর্যের সোনালি রঙটা প্রাসাদের পুরোনো গম্বুজ, মিনার আর কারুকাজে লেগে এমন এক আবেশ তৈরি করেছে, যেন পুরো জায়গাটা ইতিহাসের ভেতর ডুবে আছে।
ছাদের ওপাশে যতদূর চোখ যায়, শুধু বিস্তীর্ণ জঙ্গল। উঁচু উঁচু গাছের মাথা বাতাসে ধীরে ধীরে দুলছে। কোথাও কোথাও পাখির ঝাঁক উড়ে যাচ্ছে, আবার কোথাও জঙ্গলের গভীরতা এমন গাঢ় যে মনে হয় সেখানে সূর্যের আলোও পুরোপুরি ঢুকতে পারে না। সেই জঙ্গলের দিকেই স্থির হয়ে আছে বাইজিদ শাহের দৃষ্টি।

তার পরনে সাদা শুভ্র পাতলা পাঞ্জাবি। একেবারে সাদা কোনো জাঁকজমক নেই। তবু অদ্ভুতভাবে সেটাই তাকে আরও বেশি রাজকীয় করে তুলেছে। বাতাসে পাঞ্জাবির হালকা কাপড়টা নড়ে উঠছে, আর সেই সাদা রঙটা বিকেলের সোনালি আলোয় কখনো উজ্জ্বল, কখনো কোমল দেখাচ্ছে। নিচে সাদামাটা পাজামা, পায়ে কোনো জুতো নেই। অথচ তাকে দেখলে মনে হয়, সাধারণ পোশাকের ভেতরেও এক অদ্ভুত আভিজাত্য লুকিয়ে আছে।

বাইজিদ শাহের দেহগঠন দীর্ঘ আর বলিষ্ঠ। কাঁধ দুটো প্রশস্ত, বুকটা সোজা, দাঁড়ানোর ভঙ্গিটা এমন স্থির যেন সে নিজেই এই প্রাসাদের এক নীরব স্তম্ভ। তার শরীরের প্রতিটি রেখায় এক ধরনের শক্তি আর স্থিরতা আছে যা তাকে দেখলেই বোঝা যায় সে সাধারণ কোনো পুরুষ নয়।
তার চুলগুলো ঘন কালো, ভীষন মসৃণ। দেখলেই বোঝা যায় ভীষণ যত্ন তাদের। হালকা বাতাসে সেই চুল গুলো বারবার কপালের উপর এসে পড়ে, আবার সরে যায়। সেই এলোমেলো চুলের ভেতরেও এক ধরনের স্বাভাবিক সৌন্দর্য আছে, যা তাকে আরও বেশি আকর্ষণীয় করে তোলে।

তীক্ষ্ণ চোয়ালটা স্পষ্ট আর দৃঢ়। মুখের গড়ন এমন নিখুঁত যে মনে হয় কোনো দক্ষ ভাস্কর খুব যত্ন করে গড়ে তুলেছে এই মুখাবয়ব। তামাটে ঠোঁট দুটি ভীষণ অস্থির দেখাচ্ছে।

কিন্তু সবচেয়ে গভীর তার চোখ। সবুজাভ সেই চোখ দুটি যেন জঙ্গলেরই কোনো রঙ নিয়ে জন্মেছে। দূরের গাছপালার দিকে তাকিয়ে আছে সে, কিন্তু সেই দৃষ্টির ভেতর এমন এক গভীরতা আছে, যেন সে শুধু জঙ্গল দেখছে না, তার চেয়েও অনেক দূরের কিছু ভাবছে।

বাতাস এসে তার পাঞ্জাবি ছুঁয়ে যাচ্ছে, চুলগুলো দুলিয়ে দিচ্ছে, তবু সে নড়ছে না। একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে স্থির হয়ে। বাহ্যিকভাবে তাকে দেখলে মনে হবে এক নিখুঁত, সুদর্শন, রাজকীয় পুরুষ। যার মাঝে কোনো অভাব নেই। কিন্তু আজ তার চোখের ভেতর লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত বিষণ্নতা।

মনে হয় যেন সেই জঙ্গলের ভেতরেই কোথাও হারিয়ে গেছে তার কোনো স্মৃতি, কোনো ব্যথা, কিংবা এমন কোনো মানুষের ছায়া… যার কথা ভাবলেই বুকের ভেতরটা নিঃশব্দে ভারী হয়ে ওঠে।
ছাদের ধারে দাঁড়িয়ে সে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকে।
জঙ্গল নড়ে, বাতাস বয়ে যায়, পাখি উড়ে যায়
কিন্তু বাইজিদ শাহ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, নিজের গভীর চিন্তার অদৃশ্য গোলকধাঁধার ভেতরে

আসলে তার মন আটকে আছে গত রাতের সেই অদ্ভুত, অস্থির, অস্বস্তিকর রাতটায়।
হঠাৎ করেই তার বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে ওঠে।
গতরাতে সে এমন একটা কাজ করেছে, যা করার কথা সে কখনো ভাবেনি।
সাহাবাদ প্রাসাদের চারপাশ তখন নিঃশব্দ। গভীর রাত। চারদিকে এমন এক নীরবতা, যেন পুরো পৃথিবী ঘুমিয়ে পড়েছে। শুধু দূরে কোথাও রাতজাগা পাখির ডাকে মাঝে মাঝে সেই নিস্তব্ধতা একটু ভেঙে যাচ্ছিল। সেই সময় নিজের কক্ষের দরজা ধীরে খুলেছিল বাইজিদ শাহ।

কেন বের হয়েছিল সে নিজেও ঠিক বলতে পারে না। শুধুই এক অকারণ টান। নিজের বিবেকের সাথে বহু যুদ্ধ করেও নিজেকে থামাতে পারেনি কাল। মেহেরুন্নেসা কে একবার দেখার প্রয়াস তার এ যাবৎ কালের সংযম কে ভেঙে গুড়িয়ে দিয়েছিলো। কত সুন্দরী রমনী জমিদার কন্যারা তার সাক্ষাৎ চেয়েছে। কই কখনো তো সারা দেয় নি। তাহলে কি এমন আছে এই মেয়েটার মাঝে যার জন্য নিজের সংযম ধরে রাখতে পারলো না সে।

প্রাসাদের দীর্ঘ করিডোরগুলো তখন আধো অন্ধকারে ডুবে ছিল। দেওয়ালে টাঙানো লণ্ঠনের ক্ষীণ আলোয় পুরোনো দেয়ালগুলো অদ্ভুত ছায়া ফেলছিল মেঝেতে। বাইজিদ পা ফেলছিল খুব ধীরে এতটাই নিঃশব্দে, যেন তার উপস্থিতি বাতাসও টের না পায়। প্রাসাদের প্রতিটি পথ তার চেনা। তাই পাহারাদারদের চোখ এড়িয়ে কোন পথে যেতে হবে। কোথায় ছায়া বেশি সব হিসাব করেই এগোচ্ছিল সে। নিজের মহলেই চোরের মতো এগোতে হয়েছিলো। পাছে কোনো রক্ষী দেখে নেয়। এমনিতেই একবার মেহের এর ঘরের দিকে যেতে দেখে কি তুলকালাম টাই না বেধেছিলো।

মেহের সবসময় আড়ালে থাকে। দিনের বেলায় তাকে দেখা মানেই শুধু নত চোখ, নীরবতা আর পর্দার আড়াল। কিন্তু সেই মেয়েটাই যেন অদ্ভুতভাবে তার মনে জায়গা করে নিয়েছিল।
কক্ষটার কাছে এসে কিছুক্ষণ থেমে ছিল বাইজিদ। তার বুকের ভেতর তখন অদ্ভুতভাবে ধুকপুক করছিল। যেন সে কোনো অপরাধ করতে যাচ্ছে। হাতটা একবার দরজার দিকে এগিয়েও আবার থেমে গিয়েছিল।
কেন জানি না, মনে হচ্ছিল এই দরজা খুললেই তার জীবনের কিছু অংশ বদলে যাবে। তবু শেষ পর্যন্ত সে থামেনি। দরজাটা পুরো খোলেনি। শুধু এতটুকু ফাঁক করেছিল, যাতে ভেতরের আলোটা দেখা যায়। আর সেই মুহূর্তেই প্রথমবার সে দেখেছিল তাকে।

মেহেরুন্নেসা তখন জানালার পাশের আরাম কেদারায় শুয়ে ছিলো। বোধহয় এখানে বসে বাহিরটা দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে গেছে। চাঁদের আলো এসে পড়েছিল তার উপর। তার মাথায় ঘোমটা ছিলো না। লম্বা চুল গুলো রাজকীয় সোফাটার হাতল বেয়ে চকচকে মেঝে ছুঁয়েছিলো। মনে হচ্ছে বদ্ধ পাখিটি নিজের কক্ষে শান্তিতে একটু ডানা ঝাপটাচ্ছে।

তখনই বাইজিদ প্রথমবার দেখেছিল সেই মুখ।
মুহূর্তটা যেন স্থির হয়ে গিয়েছিল। বাইজিদ শাহ অনেক সুন্দরী নারী দেখেছে। রাজপরিবারের অনুষ্ঠান, জমিদারবাড়ির আসর কোথাও সৌন্দর্যের অভাব ছিল না।কিন্তু এমন রূপ সে কল্পনাও করেনি। মেহেরুন্নেসার মুখে ছিল অদ্ভুত এক কোমলতা। বন্ধ চোখ দুটোর ঘণ পাপড়ি, গভীর চোখ, আর এত শান্ত যে মনে হয় সেখানে হাজার বছরের নীরবতা জমে আছে।

তার গায়ের রঙে যেন চাঁদের আলো মিশে গেছে। ঠোঁটের রেখা এত কোমল যে তাকিয়ে থাকলে মনে হয় কোনো ঘোরের ভেতর ঢুকে পড়েছে মানুষ। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় তার মধ্যে কোনো সাজ ছিল না। কোনো গয়না না, কোনো আড়ম্বর না। তবু তাকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন কোনো স্বর্গীয় সৌন্দর্য ভুল করে মানুষের জগতে নেমে এসেছে।

বাইজিদ সেই মুহূর্তে দরজার আড়ালেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। চোখ সরাতে পারছিল না। মনে হচ্ছিলএভাবে দেখা ঠিক না। এটা তার করা উচিত না। তবু দৃষ্টি ফিরিয়ে নেওয়ার শক্তি ছিল না। অদ্ভুতভাবে তার বুকের ভেতরটা কেমন অস্থির হয়ে উঠেছিল।

কিছুক্ষণ পর হঠাৎ মেহেরুন্নেসা একটু নড়েছিল।
তখনই যেন ঘোর কাটে বাইজিদের। দ্রুত দরজাটা আগের মতো লাগিয়ে নিঃশব্দে সরে গিয়েছিল সে।

প্রাসাদের ছাদে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্যগুলোই বারবার মনে পড়ছে তার। আর সেই স্মৃতিই তাকে অস্বস্তিতে ফেলে দিচ্ছে। কারণ সে জানে, একজন পর্দাশীল নারীর দিকে এভাবে লুকিয়ে তাকানো তার উচিত হয়নি।
তবু যতই নিজেকে বোঝাতে চায়… তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে সেই মুখ। মেহেরুন্নেসার সেই অদ্ভুত, নীরব, অপার্থিব সৌন্দর্য। বাইজিদ ধীরে চোখ বন্ধ করে। তবু লাভ হয় না। কারণ সেই রূপ এখন তার চোখে ভাসে।

চোখ বন্ধ করলেও সেই মুখটা যেন আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে। যেন স্মৃতির ভেতর থেকে আলো হয়ে ভেসে উঠছে। সেই শান্ত চোখ, সেই নরম মুখাবয়ব, সেই অদ্ভুত কোমলতা সবকিছুই যেন তার মনে এমনভাবে গেঁথে গেছে যে চাইলে আর মুছে ফেলা যাবে না।


নিজ কক্ষের খাটে হেলান দিয়ে আনমনেই কি যেন ভাবছে বাকের শাহ। দরজায় টুকটুক শব্দ। চোখ খুলতেই সামনে দেখলো সিমরান কে। মাথায় ঘোমটা টানা মুখে মৃদু হাসি।
“আসবো চাচাজান?”

বাকের শাহ্ সোজা হয়ে বসলো। এক গাল হেসে বলল
“সিমরান? এসো মা এসো। তোমার অনুমতি নেবার কি আছে? রত্না আর সুনেহেরার মতো তুমিও আমার মেয়ে। এসো”

সিমরান ঘরে ঢুকে পাশের ছোট জলচৌকি টার ওপর বসলো। ঘরের চারিদিকে চোখ বুলিয়ে বলল
“আপনার সাথে কথাই না অনেক দিন।”

বাকের শাহ্ বিচক্ষণ মানুষ। সিমরান এর খাম খেয়ালি তেই যেন বুঝে ফেলল সে কিছু বলতে চায়
“কিছু বলবে মা?”

সিমরান ঢোক গিলে মাথা নিচু করে বলল
“বেয়াদবি মাফ করবেন চাচাজান। কিন্তু মেহেরুন্নেসার সাথে এটা ঠিক হচ্ছে না বলুন”

বাকের শাহ ভ্রু গুটিয়ে তাকালো সিমরান এর দিকে।
“কি বলতে চাইছো বলোতো মা”

“চাচাজান, আমি বলতে চাইছি যে মেহেরুন্নেসা তো এখন সুস্থ। হ্যা ওকে আমরা যথেষ্ট আতিথিয়েতার সহিত ই রাখছি। তবুও ওর মনে হতে পারে না? যে ওকে আমরা এখনো বন্দি করে রেখেছি।”

বাকের শাহ্ গভীর ভাবনায় ঢুকে ওপর নিচ মাথা নাড়ে। সিমরান বুঝলো তার কথা সঠিক পথ ধরেই এগোচ্ছে। আরো উসকে দিতে বলল
“মেয়েটা ভালো, পর্দা করে। এমন অচেনা অপরিচিত দের মাঝে খুউউউব অস্বস্তি তে আছে সে চাচাজান। পরিবার থেকে দূরে আছে, ওর বাড়ির লোক যেমনই হোক। ও তো ভালো তাই না। তাই আমার মনে হচ্ছে, এক্ষুনি ওকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়াই উত্তম। কি বলেন চাচাজান?”

“তুমি একদম ঠিক বলেছো সিমরান। বাইজিদ কে একটু খবর দিও তো, বলবে আমি ডেকেছি। কাল ভোরেই তাকে বাড়িতে পাঠানোর ব্যাবস্থা করছি আমি”
সিমরান এর ঠোঁটে খেলে গেলো বিশ্বজয়ের হাসি। বাকের শাহ্ কে সালাম দিয়ে চলে আসলো বৈঠক খানায়। মারজান বিবি বৈঠক খানায় নেই। তাই তার খোঁজে সিমরান ভিতরের ঘরে গেলো।

অন্দরমহলের এক নিরিবিলি কক্ষে বসে ছিলেন মারজান বেগম। সামনে পানের বাটা খোলা, আঙুলে ধীরে ধীরে সুপারি কাটছিলেন তিনি। মুখে সেই চিরচেনা স্থির ভাব, কিন্তু চোখে সবসময়ই যেন হিসেবের রেখা লুকিয়ে থাকে।
ঠিক তখনই দরজার পাশে এসে থামল সিমরান।
সে একটু ইতস্তত করল, তারপর নরম গলায় বলল,
“আম্মাজান… একটু আসতে পারি?”

মারজান মাথা তুলে তাকালেন। চোখ বুলিয়ে নিলেন সিমরানের মুখে। মেয়েটার মুখ ভার, চোখে অস্বস্তি। তিনি মৃদু হেসে বললেন,
“এসো। কী হয়েছে তোমার? মুখটা এমন করে রেখেছ কেন?”

সিমরান ধীরে ধীরে ভেতরে এসে বসল। কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, যেন কথাগুলো গুছিয়ে নিচ্ছে।
তারপর একটু অভিমানী গলায় বলল,
“আপনি তো বলেছিলেন… জমিদার সাহেবের মন জয় করা খুব কঠিন কিছু নয়।”
মারজান ভ্রু তুললেন।
“হুঁ… বলেছিলাম”

সিমরান নিচের দিকে তাকিয়ে বলল,
“কিন্তু তিনি তো আমার দিকে তাকিয়েই দেখেন না।”

মারজানের ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটল।
“ওমা! তাই নাকি?”
সিমরান এবার একটু উত্তেজিত হয়ে বলল,
“আমি যতবার সামনে যাই… তিনি এমন ব্যবহার করেন যেন আমি নেইই। কথা বললেও মুখে শুধু বিরক্তি।”

মারজান ধীরে ধীরে পান মুখে দিলেন। কিছুক্ষণ চুপ করে সিমরানের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
“তাহলে বুঝি তোমার পিরিতি কাজ করছে না?”
সিমরান বিরক্ত হয়ে বলল,
“আমি মজা করছি না, আম্মাজান।”
সিমরান এর কণ্ঠ এবার একটু নিচু হলো।
“আমার মনে হয়… অন্য কেউ তার মন টেনে নিয়েছে।”

মারজানের চোখ সরু হয়ে এলো।
“কে?”
সিমরান এক মুহূর্ত দ্বিধা করল। তারপর ফিসফিস করে বলল
“ওই মেয়েটা… মেহেরুন্নেসা।”
কিন্তু তাতে মারজানের মুখে কোনো বিস্ময় দেখা গেল না। বরং তিনি খুব ভেবে বললেন,
“তুমি কেন এমন ভাবছ?”

সিমরান বলল,
“আমি লক্ষ্য করেছি… তার নাম উঠলেই জমিদার সাহেবের চোখ বদলে যায়। আর যখন সে সামনে আসে… তিনি অন্যরকম হয়ে যান।”

মারজান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর ধীরে ধীরে হাসলেন।
“তাহলে তো ব্যাপারটা মজার।”
সিমরান অবাক হয়ে তাকাল।
“মজার?”

মারজান একটু সামনে ঝুঁকলেন।
“শোনো সিমরান… পুরুষ মানুষের মন খুব অদ্ভুত জিনিস। তারা যতই কঠিন হোক, চোখের সামনে যদি রূপের ঝলক পড়ে, মন গলতে সময় লাগে না। আল্লাহ রুপ যৌবন যথেষ্ট দিয়েছে তোমায়।
কাজে লাগাও”

সিমরান ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কিন্তু আমি তো চেষ্টা করছি।”

মারজান মাথা নেড়ে বললেন,
“না। তুমি ঠিকভাবে চেষ্টা করছ না।”

সিমরান অবাক হয়ে তাকাল।
“তাহলে কীভাবে?”

মারজান এবার কণ্ঠ একটু নিচু করলেন, যেন গোপন কথা বলছেন।
“তুমি তার সামনে গিয়ে শুধু কথা বলছ। এতে কিছু হবে না।”
সিমরান চুপ করে শুনছে। মারজান ধীরে ধীরে বললেন,
“তোমাকে এমনভাবে তার সামনে দাঁড়াতে হবে… যাতে সে চোখ ফিরিয়ে নিতে না পারে।”

সিমরানের চোখে কৌতূহল জাগল।
“মানে?”
মারজানের ঠোঁটে চতুর হাসি ফুটল।
“রূপ, যৌবন… এগুলো নারীর সবচেয়ে বড় অস্ত্র। পুরুষ যতই গম্ভীর হোক, এই অস্ত্রের সামনে অনেক সময় দুর্বল হয়ে যায়।”

সিমরান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর আস্তে বলল,
“আপনি কি বলতে চাইছেন? আমি……”

মারজান তার কথা কেটে দিলেন।
“হ্যাঁ। ঠিক তাই।”

তার চোখে তখন কেমন যেন তীক্ষ্ণ ঝিলিক।
“তুমি এমনভাবে তার সামনে আসবে… যাতে সে তোমাকে নতুন চোখে দেখতে বাধ্য হয়।”
সিমরান ঠোঁট কামড়ে একটু হাসল।
“কিন্তু যদি তবুও তিনি তাকান না?”

মারজান হালকা হেসে বললেন,
“তখন তাকাতে বাধ্য করো।”
তিনি আরও একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে বললেন,
“মনে রাখো… পুরুষের মন জয়ের আগে তার চোখ জয় করতে হয়।”

সিমরানের চোখে ধীরে ধীরে এক ধরনের আত্মবিশ্বাস ফিরে এলো।সে উঠে দাঁড়াল।
“তাহলে… আমাকে নতুনভাবে চেষ্টা করতে হবে।”
মারজান মাথা নেড়ে বললেন,
“ঠিক তাই। যত্ন, পিরিত, ভালোবাসা এতকাল খুব তো দেখালে। কাজ হলো কিছু? এবার একটু রুপ যৌবন ও দেখাও। তারপর দেখো, মেহেরুন্নেসার সৌন্দর্য বড়, নাকি তোমার কৌশল।”

সিমরান উৎফুল্ল মনে বাইরে আসলো। রক্ষী দের থেকে জানতে পারলো বাইজিদ ছাদে গেছে।নিজের কক্ষে গিয়ে আয়নায় নিজেকে দেখলো। ঠিকঠাক লাগছে। পরিপাটি হয়ে পা বাড়ালো ছাদের দিকে।

ছাদের ধারে দাঁড়িয়ে ছিলো বাইজিদ। দু’হাত পেছনে গোঁজা, চোখ দূরের জঙ্গলে স্থির। ঠিক তখনই পায়ের নরম শব্দ তুলে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠল সিমরান।

তার পায়ের নূপুর খুব আস্তে বাজল, কিন্তু তবুও শব্দটা বাইজিদের কানে গেল। তিনি একটু ঘুরে তাকালেন। সিমরান ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে। আজ তার চোখে অদ্ভুত এক দীপ্তি, ঠোঁটের কোণে লাজুক নয় বরং কেমন যেন হিসেবি হাসি।
সিমরান এসে একেবারে বাইজিদের পাশেই দাঁড়াল। এতটাই কাছে যে তার ওড়নার প্রান্তটা হালকা ছুঁয়ে গেল বাইজিদের বাহু।

বাইজিদ একটু ভ্রু কুঁচকে তাকালো। তারপর সামান্য সরে দাড়ালো সিমরান এর থেকে।
সিমরান মৃদু স্বরে বলল,
“কি হয়েছে জমিদার সাহেব? আপনাকে এত গম্ভীর দেখাচ্ছে?”

বাইজিদ শান্ত গলায় বললেন,
“আপনার কিছু বলার ছিল?”
সিমরান ঠোঁট কামড়ে হেসে ফেলল। একটু ঝুঁকে রেলিংয়ে হাত রাখল, যেন হাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু চোখের কোণ দিয়ে দেখছে শুধু বাইজিদকে।
“আপনি তো জানেন জমিদার সাহেব। আপনাকে গম্ভীর দেখতে আমার একদমই ভালো লাগে না।”

বাইজিদের কণ্ঠ আরও ঠান্ডা করে বলল
“সন্ধ্যা হয়ে আসছে। ভিতরে যান”

সিমরান মৃদু হেসে তার দিকে আরেকটু সরে এল।
“কেন? আমার কথা শুনতে কি এতই অপছন্দ আপনার?”
এবার বাইজিদ স্পষ্ট বিরক্ত হলো। আরো এক পা সরে দাঁড়ালো।
“আপনি কী বলতে চান, সরাসরি বলুন।”

সিমরান এবার মুখটা একটু নিচু করল, যেন খুব লজ্জা পাচ্ছে। কিন্তু তার কণ্ঠে লজ্জার চেয়ে খেলাচ্ছলই বেশি।
“আমি মাঝে মাঝে ভাবি, এই বিশাল প্রাসাদে এত লোকের মাঝেও আপনি কি একা লাগেন না?”

বাইজিদ চোখ সরু করে তাকালো সিমরানের দিকে। কঠিন স্বরে বলল
“এটা আপনার ভাবার বিষয় নয়।”
সিমরান আবার হাসল। এবার সে হাত বাড়িয়ে ছাদের রেলিং ছুঁল, কিন্তু আঙুলের ডগা প্রায় ছুঁয়ে গেল বাইজিদের হাত।
“না মানে যদি আপনার কখনো একা লাগে….

“আপনি কি বুঝতে পারছেন আপনি কী ধরনের কথা বলছেন?”

বাইজিদ এর এমন রুক্ষ কথায় সিমরান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর খুব মৃদু হেসে বলল,
“আমি তো শুধু আপনার খোঁজ নিচ্ছিলাম, জমিদার সাহেব।”
বাইজিদের মুখ আরও কঠিন হয়ে গেল।
“আমার খোঁজ নেওয়ার জন্য এই প্রাসাদে যথেষ্ট মানুষ আছে।”
বলেই বাইজিদ অন্দরের দিকে হাটা দিলো। সিমরান ছাদেই দাঁড়িয়ে রইল। তার ঠোঁটের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
কিন্তু চোখে তখন অন্য এক আগুন জ্বলছে।
যেন মনে মনে সে বলছে
“আপনি যত দূরে সরে যান, জমিদার সাহেব… আমি ততই কাছে আসব।”

পিছন থেকে ফের ডাকলো
“শুনুন, চাচাজান আপনাকে কক্ষে ডেকেছেন”

বাকের শাহ্ এর কক্ষে আসতেই তিনি বললেন মেহেরুন্নেসার চলে যাওয়ার কথা। বাইজিদের বুকের ভেতরটা ধীরে ধীরে ভারী হয়ে ওঠে। কানে বাজতে কথাটা ‘মেহেরুন্নেসা কাল চলে যাবে’

এই ভাবনাটা মাথায় আসতেই তার ভেতরে অদ্ভুত এক শূন্যতা তৈরি হয়। যেন কেউ হঠাৎ করে তার বুকের ভেতর থেকে কিছু একটা তুলে নিতে যাচ্ছে। ধীরে শ্বাস নেয়। নিজেকে বোঝাতে চায়, এটা তেমন কিছু না। পৃথিবীতে কত মানুষ আসে, আবার চলে যায়। একজন মেয়ের চলে যাওয়াতে এত ভাবনার কী আছে?তবু মন তার কথা শুনছে না। এই করিডোরগুলো থাকবে, এই বিশাল উঠোন থাকবে, এই উঁচু দেয়াল আর গম্বুজগুলোও থাকবে, কিন্তু কোথাও আর থাকবে না সেই নীরব উপস্থিতি।
হয়তো আর কোনোদিন এই প্রাসাদের কোনো জানালার পাশে বসে থাকবে না মেহেরুন্নেসা।
হয়তো আর কোনোদিন হালকা বাতাসে তার মেহেরুন্নেসা চলে গেলে তার মনে অদ্ভুত এক ফাঁকা জায়গা তৈরি হবে। আর সেই ফাঁকা জায়গাটা হয়তো কেউ কোনোদিন পূরণ করতে পারবে না।

এই ভাবনাটা আসতেই তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে ওঠে। তার আঙুলগুলো ধীরে মুঠো হয়ে যায়।
একজন অচেনা মেয়ে, দুই দিন ধরে দেখছে। যে মেয়েকে সে ঠিকমতো চিনেও না তবু কেন তার চলে যাওয়ার কথা ভাবতেই এমন অস্বস্তি হচ্ছে?


সন্ধ্যার ঠিক আগ মুহূর্ত। প্রাসাদের বাহিরে সারি সারি রক্ষীরা দাঁড়িয়ে। সকলের সামনে সিড়ির চূড়ায় দাড়িয়ে মাহাদি। কিছু বলছেন সকলের উদ্দেশ্যে, সকলে মনোযোগ দিয়ে শুনলো। হাতের বর্শা টা উঁচু করতেই সকলে চলে গেলো যে যার দ্বায়িত্বে। মাহাদি রক্ষীদের বিদায় করে দিয়ে পিছনে ফেরা মাত্রই এক ধারালো তলোয়ার ছো ছো করে গেলো তার সামনে দিয়ে। অল্পের জন্য এক পা পিছিয়ে বেঁচে গেলো যেনো। আক্রমণ কারীকে আঘাত করতে নিজেও কোমরে গুজে রাখা তরবারি কোষ থেকে তলোয়ার টা বের করতেই সামনে দেখা গেলো সেই তেজী মুখ খানা। চোখ দুটো যেন আগুনের গোলা হয়ে আছে। সোনালি চুল গুলো বাতাসে পিছন দিকে উড়ছে। এই মেয়েটা দেখতেও আস্ত একটা আগুনের গোলা।

তার সোনালি চুল গুলো যখন উড়ে, মনে হয় দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। সুনেহেরা কে দেখেই মাহাদির হাত শিথিল হলো। তলোয়ার টা নিচু করে বলল
“ওহহ শাহজাদী আপনি? তা এমন আচমকা আক্রমণ করলেন কেনো? বললেই তো গর্দান প্রস্তুত। শুধু একবার বলে দেখুন। আপনার হাতে দু-টুকরো হতে একবারও দ্বিধা বোধ করবো না”

সুনেহেরা তলোয়ার এর জোর বাড়ালো। খানিকটা টুকসে গেলো মাহাদির বুকের অংশের লোহার বর্ম। কিন্তু মাহাদির চোখ জোড়া স্পষ্ট হাসছে। তা দেখে সুনেহেরার রাগ বাড়লো আরো
“খুউব অনধিকার চর্চা করার শখ জেগেছে না? দুই টুকরো কি? আপনাকে আমি কুচি কুচি করবো করের বার আমার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালে”

তলোয়ারে বল প্রয়োগ করতেই মাহাদি একটু পিছিয়ে গেলো। যদিও সুনেহেরার শক্তি মাহাদি কে নাড়াতেও পারতো না। সে যেনো সেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করলো। সুনেহেরা ফিরে যেতে নিলেই মাহাদি পিছন থেকে ডাকলো
“জাহ্নবী”

সুনেহেরার পা থামলো। এই লোকটা তার নাম ধরে ডাকলো? এত সাহস? কটমট করে পিছে তাকাতেই আর দেখা গেলো মা মাহাদি কে।

আমি কয়েকটা গ্রুপে পোস্ট দেখলাম নূর-এ-সাহাবাদ গল্পটা অনেকে হারিয়ে ফেলেছে। লিংক চাচ্ছে এখন। তোমাদের বলি, আমার পেইজ টা ফলো করে রাখো, গল্প দেওয়ার সাথে সাথে পেয়ে যাবে।

পরবর্তী পর্বে বাইজিদ+মেহেরুন্নেসা, আর তিলোত্তমার শশুর বাড়ি থাকবে। এই পর্বে ভালো রেসপন্স করিও। কত কষ্ট করে তোমাদের জন্য লিখি। আর হ্যা, প্রত্যেক অপরাধী শাস্তি পাবে। এত অধৈর্য হইয়ো না পাখি রা। রিয়্যাক্ট দাও আর অবশ্যই জানিও কেমন হয়েছে 🫶😌

আর যারা টিকটক আইডি হারিয়ে ইনবক্সে কান্নাকাটি করতেছো। তাদের জন্য একবালতি দুক্ক। বহুবার নিষেধ করেছিলাম। যে রিলস বানাও, কিন্তু গল্প দিও না। তাও দিলে, আবার আমার পেইজ থেকে ভিডিও ডাউনলোড করে নিয়ে টিকটকে দাও। ইচ্ছা হলে নিজে বানিয়ে দাও। না করিনি তো, তবে গল্প দিতে পারবে না।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply