নূরএসাহাবাদ
jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
পর্ব – ১৭
সুনেহেরার দৃষ্টি তখনও স্থির জাহাজটার দিকে, কিন্তু চোখের ভেতরের ঝড়টা ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসছে। সে নিজেকে সংযত করল। তারপর খুব নিচু, কিন্তু দৃঢ় স্বরে মেহেরুন্নেসা কে বলল
“সবটা… প্রাসাদে গিয়ে বলব। আপাতত প্রশ্ন করো না”
মেহেরুন্নেসা কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু সেই মুহূর্তেই বাতাস চিরে ছুটে এলো আরেকটি তীর।
“শোঁওও!”
তারপর আরেকটা। আরও একটা। মুহূর্তের মধ্যেই যেন অন্ধকার আকাশ ভরে গেল তীরের বৃষ্টিতে। একটার পর একটা ছুটে আসছে তাদের দিকে নির্দয়, নিখুঁত, বিরতি হীন। সুনেহেরা এক ঝটকায় মেহেরুন্নেসার হাত ধরে টেনে নামিয়ে দিল নিচে। “ঝুঁকে পড়ো!”
দুজন মাটির কাছাকাছি হয়ে ঝুঁকে পড়তেই তীরগুলো সাঁ করে তাদের মাথার ওপর দিয়ে ছুটে গিয়ে গাছের গায়ে আছড়ে পড়তে লাগল। চারপাশ কেঁপে উঠছে যেন। একটা তীর এতটাই কাছে দিয়ে গেল যে মেহেরুন্নেসার গাল ছুঁয়ে ঠাণ্ডা বাতাস কেটে গেল। তার শ্বাস আটকে এলো, কিন্তু সুনেহেরা আর সময় নষ্ট করল না।
চারপাশ একবার চোখ বুলিয়েই সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল।
“এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে বাঁচব না। জঙ্গলে ঢুকতে হবে এখনই!”
আর কোনো কথা না বলে সে মেহেরুন্নেসাকে টেনে নিয়ে ছুটল জঙ্গলের ভেতর। পেছন থেকে এখনও তীর আসছে, তবে গাছপালার ঘনত্ব বাড়তেই সেগুলোর গতি আর নিখুঁততা কমে আসতে থাকে। কোথাও ডালে লেগে ভেঙে যাচ্ছে, কোথাও মাটিতে গেঁথে থেমে যাচ্ছে। জঙ্গল ক্রমশ ঘন হয়ে ওঠে। চাঁদের আলো প্রায় ঢুকতেই পারে না। চারপাশে শুধু অন্ধকার আর ছায়া। শুকনো পাতার ওপর দৌড়াতে দৌড়াতে পায়ের শব্দ কানে কেমন অস্বস্তিকরভাবে বাজতে থাকে।
মেহেরুন্নেসার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে। বুক যেন ফেটে যাবে, তবুও থামে না সে। পেছনে তাকানোর সাহসও হয় না। সুনেহেরা থামে না একবারও। তার দৃষ্টি শুধু সামনে আর ভেতরে। আরও দূরে।
অবশেষে, অনেকটা পথ অতিক্রম করার পর, তীরের শব্দ পুরোপুরি মিলিয়ে যায়। শুধু রয়ে যায় তাদের হাঁপিয়ে ওঠা নিঃশ্বাস আর রাতের নিস্তব্ধতা।
অন্ধকারের মাঝখান থেকে ধীরে ধীরে ভেসে ওঠে একটা বিশাল অবয়ব। উত্তরের প্রাসাদ। নিঃশব্দ, গম্ভীর, অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা এক প্রাচীন কাঠামো। যেন বহুদিন ধরে কেউ তাকে জাগায়নি, তবুও সে সবকিছু দেখছে নীরবে।
দুজনই এসে থামে বিশাল লোহার গেটের সামনে।
গেটটা বন্ধ। পুরনো, ভারী, মরিচা ধরা লোহা। তাদের শরীর আর সাড়া দেয় না। প্রায় একসাথে তারা গেটের সামনে বসে পড়ে। ক্লান্তিতে শরীর নিস্তেজ হয়ে আসে। বুক ওঠানামা করছে দ্রুত, গলা শুকিয়ে গেছে।
কিছুক্ষণ কেউ কথা বলে না। শুধু নিঃশ্বাসের শব্দ।
ধীরে ধীরে মেহেরুন্নেসা মাথা তোলে।
তার দৃষ্টি উঠে যায় প্রাসাদের দিকে আরও উপরে।
আর ঠিক তখনই, তার চোখ থেমে যায়।
প্রাসাদের সামনের দিকের উঁচু সেই বিশাল বারান্দা অন্ধকারের মাঝেও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।
শাহজাদার বারান্দা। মেহেরুন্নেসার দৃষ্টি স্থির হয়ে থাকে সেখানে। যেন কিছু একটা মিল খুঁজে পেয়েছে হঠাৎ। তার কপাল কুঁচকে আসে।
ধীরে, খুব ধীরে সে বলে ওঠে
“এই বারান্দা এখান থেকে এত স্পষ্ট?”
সুনেহেরা তাকায় তার দিকে। কপাল কুচকে বলল
“কেন বলোতো?”
মেহেরুন্নেসা এবার গেটের বাইরে থেকে চারপাশে একবার তাকিয়ে আবার বারান্দার দিকে চোখ ফেরায়। তার কণ্ঠে এখন বিস্ময়ের সঙ্গে মিশে আছে এক অদ্ভুত উপলব্ধি
“এইখান থেকে বারান্দা দেখা যায়, তারমানে বারান্দা থেকেও এই প্রাসাদ দেখা যায়”
কথাটা শেষ হতেই চারপাশের নীরবতা যেন আরও গভীর হয়ে ওঠে। সুনেহেরা এবার পুরোপুরি সোজা হয়ে বসে। তার দৃষ্টি ধীরে ধীরে উঠে যায় সেই বারান্দার দিকে।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে বলে
“মানে, ওদিক থেকেও এই দিকটা স্পষ্ট দেখা সম্ভব?”
মেহেরুন্নেসার বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে আবার।
জাহাজে দেখা সেই অবয়ব, তার অদ্ভুত মিল, তীর ছোড়ার নিখুঁত লক্ষ্য। সবকিছু যেন এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা। আবার বারান্দা আর এই প্রাসাদের মাঝখানে লুকিয়ে থাকা কোনো অজানা সংযোগ।
মেহেরুন্নেসা ধীরে বলে ওঠে
“এটা কি কাকতালীয় হতে পারে নাকি?”
তার চোখে আবার সেই কঠিন আলো ফিরে আসে। রাত তখন আরও গভীর।
সুনেহেরা বলল
“আর দেরি করা যাবে না। খানিক বাদেই ভোর হবে, প্রাসাদের লোকজন জেগে উঠবে। আলো ফোটার আগেই ফিরতে হবে আমাদের। চলো”
মেহেরুন্নেসাও আর দেরি করল না। গেটের ঠান্ডা লোহার গায়ে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াল। শরীর এখনো ভারী, পা দুটো কাঁপছে হালকা, তবুও সে নিজেকে সামলে নিল। দুজনেই আর কোনো কথা না বলে ধীরে ধীরে হাঁটা শুরু করল প্রাসাদের দিকে।
জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এবার তাদের চলা আগের মতো ছুটে নয় সাবধানে, নীরবে, প্রতিটা পা ফেলে। শুকনো পাতার শব্দ যেন এখন আরও বেশি স্পষ্ট শোনায়। বাতাস ঠান্ডা হয়ে এসেছে, রাত তার শেষ প্রহরে।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মেহেরুন্নেসার মনে পড়ে যায় কিছু। সে একটু থেমে নিচু স্বরে বলে
“আপা… ঘোড়াটা তো আমরা নদীর পাড়ে রেখে এলাম”
তার কণ্ঠে উদ্বেগ। সুনেহেরা হাঁটা থামায় না। শুধু মাথা সামান্য ঘুরিয়ে বলে
“ও নিয়ে ভাবতে হবে না।”
মেহেরুন্নেসা তাকায় তার দিকে।
সুনেহেরা এবার খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে যোগ করে।
“ঘোড়া নিজেই আস্তাবলে ফিরে যাবে। তেমন লোক আছে ওখানে । ঠিকই নিয়ে আসবে।”
তার কণ্ঠে এমন নিশ্চয়তা, যেন এসব তার জন্য নতুন কিছুই না। মেহেরুন্নেসা আর কিছু বলে না। শুধু নিঃশব্দে হাঁটতে থাকে তার পাশে।
ধীরে ধীরে জঙ্গল ফিকে হয়ে আসে। সামনে ভেসে ওঠে সাহাবাদ প্রাসাদের পেছনের অংশ। যা পুরোপুরি অন্ধকারে ঢাকা।
প্রাসাদ তখন প্রায় নিদ্রামগ্ন। দিনভর উৎসবের পর সবকিছু ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে যেন। দুজনেই পা আরও হালকা করে ফেলে। পেছনের ছোট দরজাটার কাছে এসে থামে সুনেহেরা। চারপাশ একবার ভালো করে দেখে নেয়। কোনো প্রহরীর শব্দ নেই, কোনো নড়াচড়া নেই।
তারপর ধীরে হাত বাড়িয়ে দরজাটা ঠেলে দেয়।
“কড়রর…”
হালকা শব্দ হলেও সেই নীরবতায় তা বেশ জোরেই শোনায়। দুজনেই এক মুহূর্ত থেমে যায়।
শ্বাস আটকে রাখে। সুনেহেরা খুব আস্তে করে ভেতরে ঢুকে পড়ে। মেহেরুন্নেসাও তার পেছনে পা রাখে।
ভেতরের করিডোর অন্ধকার। দেয়ালের পাশে রাখা মশালগুলো প্রায় নিভে এসেছে, শুধু হালকা কমলা আলো দপদপ করছে। দুজনেই শব্দহীন পায়ে এগোতে থাকে।
একটা নির্দিষ্ট জায়গায় এসে সুনেহেরা থামে।
মেহেরুন্নেসার দিকে তাকায়। নিচু স্বরে বলে
“এখন থেকে সাবধানে যাবে। কেউ যেন টের না পায়।”
মেহেরুন্নেসা মাথা নাড়ে।
তার চোখে এখন ক্লান্তির সঙ্গে মিশে আছে চাপা উত্তেজনা। সুনেহেরা আর কিছু না বলে অন্যদিকে সরে যায়, অন্ধকারের ভেতর মিলিয়ে যায় তার অবয়ব। মেহেরুন্নেসা একা হয়ে যায়। তার বুকের ভেতর আবার ধকধক শুরু হয়। সে ধীরে ধীরে নিজের কক্ষের দিকে এগোয়। প্রতিটা পদক্ষেপে সতর্কতা। কোথাও কোনো শব্দ হচ্ছে কি না বারবার খেয়াল করছে।
অবশেষে নিজের কক্ষের দরজার সামনে এসে দাঁড়ায় মেহেরুন্নেসা। হাত বাড়িয়ে থামে এক মুহূর্ত। তার বুকটা ধুকপুক করছে। যদি বাইজিদ বিছানায় না থাকে, তাহলে সে নিশ্চিত জাহাজের বগি তে ওটা বাইজিদ ই ছিল। সৃষ্টি কর্তার কাছে প্রার্থনা করে এমন টা যেন না হয়। যাকে সে নিজের হাতে অচেতন করে রেখে গেছে, সে যেন তেমনই থাকে।
ধীরে ধীরে দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢোকে সে।
ঘরের ভেতর মৃদু আলো এখনও জ্বলছে। ফুলের গন্ধ যেন আরও ঘন হয়ে আছে। আর ঠিক মাঝখানে বিছানায় শুয়ে আছে বাইজিদ।
একইভাবে। গভীর, নিশ্চল ঘুমে।
মেহেরুন্নেসা কিছুক্ষণ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকে। চোখ স্থির হয়ে থাকে তার ওপর।
তারপর খুব আস্তে, শব্দ না করে ভেতরে ঢোকে।
দরজাটা আবার নিঃশব্দে বন্ধ করে দেয়।
তার চলাফেরা এতটাই সাবধানী, যেন বাতাসও টের না পায়। ধীরে ধীরে বিছানার কাছে এসে দাঁড়ায়।
নিঃশ্বাস এখনও ভারী, কিন্তু সে নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করে। একবার নিচু হয়ে তাকায়। বাইজিদের বুকে ওঠানামা করছে ধীর ছন্দে।
বোঝা যাচ্ছে ঘুম ভাঙেনি। মেহেরুন্নেসা চোখ বন্ধ করে একটুখানি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।
তারপর খুব নিঃশব্দে নিজের জায়গায় বসে পড়ে।
অনৃতত এটা নিশ্চিত যে জাহাজে বাইজিদ ছিল না। কিন্তু দুজন মানুষ কি করে এক চেহারার হতে পারে? মেহেরুন্নেসা কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে ধীরে উঠে দাঁড়ায়।
তার শরীরজুড়ে এখনও লেগে আছে রাতের ক্লান্তি, জঙ্গলের ধুলো, অদ্ভুত এক অস্থিরতা। সে একবার তাকায় বাইজিদের দিকে।
তারপর নিঃশব্দে সরে যায় স্নানাগারের দিকে।
স্নানাগারের ভেতরটা ঠান্ডা, পাথরের দেয়ালে রাতের শীতলতা জমে আছে। বড় পিতলের কলসিতে রাখা পানি স্পর্শ করতেই শরীর শিরশির করে ওঠে। ধীরে ধীরে সে নিজের ওপর পানি ঢালে।
ঠান্ডা জল গড়িয়ে পড়ে কপাল বেয়ে, গলা বেয়ে, শরীর জুড়ে মুছে দিতে থাকে রাতের সব চিহ্ন।
জলের সাথে যেন ধুয়ে যায় ভয়, ক্লান্তি, অস্থিরতা।
অনেকটা সময় নিয়ে সে নিজেকে পরিষ্কার করে।
তারপর ভেজা চুল পিঠে ছড়িয়ে, ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে স্নানাগার থেকে।
ঠিক তখনই দূর থেকে ভেসে আসে আজানের সুর। ফজরের আযান। নিস্তব্ধ প্রাসাদের বুক চিরে সেই ধ্বনি ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। এক অদ্ভুত শান্তি নেমে আসে পরিবেশে। মেহেরুন্নেসা থেমে যায় এক মুহূর্ত। তার চোখে ভেসে ওঠে প্রশান্তির ছায়া। সে দ্রুত নামাজের প্রস্তুতি নেয়। মেঝেতে জায়নামাজ বিছিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে কিবলামুখী হয়ে। তার ঠোঁট নড়ে ধীরে ধীরে আয়াতের শব্দে।
চারপাশের সব অস্থিরতা যেন থেমে যায় এই কিছুক্ষণের জন্য।
নামাজ শেষে সে দু’হাত তুলে দোয়া করে। চোখ বন্ধ, মুখে গভীর এক নিবেদন।
এই রাতের সব রহস্য, ভয়, সিদ্ধান্ত সবকিছুর ভেতর সে যেন একটুখানি আশ্রয় খোঁজে এই প্রার্থনায়।
ধীরে ধীরে হাত নামিয়ে নেয়। তারপর জায়নামাজ গুটিয়ে রেখে উঠে দাঁড়ায়। ভেজা চুল থেকে পানি এখনও ফোঁটা ফোঁটা ঝরছে। সে নরম তোয়ালে দিয়ে চুলগুলো মুছতে মুছতে ধীরে পা বাড়ায় পালঙ্কের দিকে।
ঘরের ভেতর তখন প্রদীপের মৃদু আলো। সেই আলোয় সবকিছু নরম, শান্ত, স্থির। তার দৃষ্টি গিয়ে থামে বাইজিদ এর দিকে। একইভাবে শুয়ে আছে। ঘুমের ভেতরেও তার মুখে অদ্ভুত এক প্রশান্তি।
মেহেরুন্নেসা থেমে যায়। ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে।
তার চোখ এবার আর সরতে চায় না।
প্রদীপের হলদে আলো পড়ে বাইজিদের মুখে তীক্ষ্ণ চোয়াল, ঘন ভ্রু, বন্ধ চোখের পাতা, আর ঠোঁটের কোণে হালকা ক্লান্তির ছাপ সবকিছু যেন আরও স্পষ্ট, আরও গভীর হয়ে ওঠে।
মেহেরুন্নেসা মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে থাকে।
একদম ধীরে। যেন প্রতিটা রেখা, প্রতিটা ছায়া আলাদা করে মনে গেঁথে নিতে চায়।
তার আঙুল অনিচ্ছাকৃতভাবে একটু এগিয়ে আসে কিন্তু মাঝপথেই থেমে যায়। ছোঁয় না। শুধু দেখে।
এক অদ্ভুত অনুভূতি জমে ওঠে তার ভেতরে। সাথে জাগ্রত হয় তীব্র অপরাধবোধ। হয়তো আজ রাত টা তার জন্য হওয়া উচিত ছিলো।
কিছুক্ষণ এভাবেই দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে চোখ সরিয়ে নেয়। নিজেকে সামলে নেয় আবার। নিঃশব্দে ঘুরে অন্দরের দিকে চলে যায়।
মেহেরুন্নেসা অন্দরের দিকে এগোচ্ছিল ধীর, স্থির পায়ে। ভেজা চুলের ডগা থেকে এখনও টুপটাপ পানি ঝরছে, আঁচল দিয়ে সে সেগুলো মুছছে অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে। ঠিক সেই সময় করিডোরের মোড় ঘুরতেই সামনে এসে পড়ে সিমরান।
সে যেন তাড়াহুড়ো করে কোথাও যাচ্ছিল, কিন্তু মেহেরুন্নেসাকে দেখে হঠাৎ করেই থমকে দাঁড়ায়।
একটুর জন্য ধাক্কা লাগে না। তার চোখ এক মুহূর্তে বড় হয়ে যায়।
ভেজা চুলে গোসল সেরে আসা চেহারা, চোখে অদ্ভুত প্রশান্তি? সব মিলিয়ে দৃশ্যটা যেন তার প্রত্যাশার সঙ্গে একেবারেই মেলে না। তার মুখের ভাব বদলে যায়। স্পষ্ট বিস্ময়। আর সেই বিস্ময়ের আড়ালে এক ঝলক অস্বস্তি।
কারণ সে দুধে নিদ্রাবিষটা মিশিয়েছিল এই ভেবে
যেন আজকের এই রাতটা অসম্পূর্ণ থাকে। শাহজাদা যেন তার নববধূর কাছে পৌঁছাতে না পারে। সঙ্গ দিতে না পারে মেহেরুন্নেসার
কিন্তু এখন মেহেরুন্নেসার এই চেহারা দেখে সব হিসেব যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
“আপনি…?”
সিমরানের ঠোঁট কাঁপে হালকা, কিন্তু পুরো কথাটা বেরোয় না। মেহেরুন্নেসা থামে না। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। তার চোখ একবার স্থির হয়ে থামে সিমরানের মুখে। গতকাল কে সুনেহেরার বলা কথা টা ভোলে নি সে।
ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে এক অদ্ভুত হাসি। সেই হাসিটা এতটাই গা-জ্বালানো, এতটাই অর্থবহ যেন কোনো কথা না বলেও অনেক কিছু বলে দেয়।
মেহেরুন্নেসা কিছু বলে না।
শুধু সেই হাসিটা রেখে দেয় সিমরানের দিকে তাকিয়ে। তারপর আবার মাথা নিচু করে ভেজা চুল মুছতে মুছতে পাশ কাটিয়ে চলে যায়।
একটা প্রশ্ন বারবার ঘুরতে থাকে তার মাথায়।
তাহলে গত রাতে ঠিক কী হয়েছিল? তাহলে কী শাহজাদা স্ত্রীর সাথে ঘনিষ্ঠ সময় কাটিয়েছিল? দুধটা কি সে খায় নি?
সকালটা ধীরে ধীরে জেগে উঠেছে সাহাবাদ প্রাসাদে। রান্নাঘরের দিক থেকে ভেসে আসছে গরম ভাতের ধোঁয়া, মসলার গন্ধে ভরে উঠেছে চারপাশ। অন্দর মহলেও একে একে সকলে জড়ো হতে শুরু করেছে।
বড় টেবিলটা সাজানো হয়েছে পরিপাটি করে।
এক এক করে সবাই এসে বসে পড়ছে।
মেহেরুন্নেসা একে একে সবার সামনে খাবার তুলে দিচ্ছে। তার চলাফেরা একদম প্রানবন্ত আর খোশমেজাজ।
সিমরান দূর থেকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে
তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে।
“আমি সাহায্য করি?”
মেহেরুন্নেসা একবার চোখ তুলে তাকায় তার দিকে। তারপর খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে বলে
“না, লাগবে না। আমি পারব। আপনিও বসুন। খেয়ে নিন”
সিমরানের ঠোঁট শক্ত হয়ে আসে হালকা। চোখে এক ঝলক হিংসা খেলে যায়। সে আর কিছু বলে না। শুধু ধীরে সরে গিয়ে নিজের জায়গায় বসে পড়ে। টেবিলের একপ্রান্তে বসে আছেন বাকের শাহ্। গম্ভীর চেহারা, কিন্তু চোখে আজ আলাদা এক প্রশান্তি।
খাবার মুখে দিয়েই তার ভ্রু হালকা উঁচু হয়ে ওঠে।
“মাশাআল্লাহ…”
তিনি ধীরে বলে ওঠেন। সবাই একবার তাকায় তার দিকে। বাকের শাহ্ এবার স্পষ্ট করে বলেন
“এই রান্না মেহেরুন্নেসার হাতের?”
মেহেরুন্নেসা তখনও দাঁড়িয়ে, মাথা নিচু করে।
“জি আব্বা”
খুব নরম স্বরে জবাব দেয়। বাকের শাহ্ হালকা মাথা নাড়েন। তার চোখে প্রশংসার ছাপ স্পষ্ট।
“অসাধারণ হয়েছে। স্বাদে, গন্ধে সবদিক থেকেই। এমন হাতের রান্না অনেকদিন পর খেলাম।”
টেবিলে হালকা এক প্রশংসার গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। মেহেরুন্নেসার মুখে কোনো বাড়তি হাসি নেই। শুধু মাথা আরও খানিকটা নিচু হয়ে আসে।
কিন্তু পাশে বসে থাকা সিমরানের মুখের রঙ বদলে যায়। তার আঙুলগুলো টেবিলের ওপর শক্ত হয়ে ওঠে। চোখের কোণে জমে ওঠে চাপা বিরক্তি।
ঠিক তখনই বাকের শাহ্ চোখ তুলে বলেন
“সিমরান, তুমি বসে আছো কেন? খাওয়া শুরু করো।”
সিমরান একটু থামে। তারপর মাথা নিচু করে, খুব সংযত কণ্ঠে বলে
“শাহজাদা তে এখনও আসেননি”
রত্নপ্রভা বলল
“এসে যাবে। তুই বোস। খেয়ে নে”
সিমরান মাথা নিচু করে বলল
“তাকে না খাইয়ে আমি খাই না।”
কথাটা বলার সময় তার চোখ এক ঝলক মেহেরুন্নেসার দিকে যায়। সেই দৃষ্টিতে স্পষ্ট অধিকারের ছাপ। আর একরকম নীরব দাবি।
মেহেরুন্নেসা কিছুই বলে না। সে শুধু নীরবে নিজের কাজ করে যায় একজন থেকে আরেকজনের প্লেটে খাবার তুলে দেয়।
সিড়ি দিয়ে নামার পথে কথা গুলো কর্ণগোচর হয় সুনেহেরার। চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। এগিয়ে এসে বলল
“ভাবি, ভাইজান উঠেছে। তোমায় কক্ষে ডাকছে যাও”
মেহেরুন্নেসা নিচু স্বরে বলল
“আমি তো পরিবেশন করছি।”
“সিমরান করে দেবে। তুমি যাও মেহের”
প্রভার কথায় মেহেরুন্নেসা যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়ালেই সিমরান খপ করে ধরলো মেহেরুন্নেসার হাত।
“তুমি থাকো, আমি দেখছি তার কি লাগবে”
মেহেরুন্নেসা কে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে সিমরান হাটা দিলো বাইজিদ এর কক্ষের দিকে। মেহেরুন্নেসাও কি মনে করে গেল পিছু পিছু। দুজন সিড়ি পেরোতেই ওপর থেকে ভেসে আসে চিৎকার। খাওয়া ছেড়ে সকলেই উঠে দাড়ায়। মূহুর্তের মধ্যে সিমরান সিড়ি দিয়ে গড়িয়ে নিচে এসে পড়ে।
রিয়্যাক্ট এর অবস্থা এমন হলে আমি অনিয়মিত হয়ে যাবো সত্যিই। অন্যদের মত সপ্তাহে ২-৩ টা পর্ব দিব। রোজ এত গুলো শব্দ লিখি কষ্ট করে। আজ কয়েকটা দিন ধরে ৩k এর ধারে কাছেও আসছে না 🙂
সবাই রিয়্যাক্ট দিও। আর বলিও কেমন হয়েছে। পরের পর্বে মেহেরুন্নেসা আর বাইজিদ এর ভালোবাসা থাকবে।
Share On:
TAGS: জান্নাতুল ফেরদৌস, নূর এ সাহাবাদ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২৭
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৭
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪১
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২০
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৮
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২২
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪৩
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩০
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪৮ এর শেষাংশ
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩২