নীভৃতেপ্রেমআমার_নীলাঞ্জনা
নাজনীননেছানাবিলা
পর্ব_২২
অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষেধ ❌❌❌❌❌❌
নীলা কে আবার ইউনিভার্সিটির গেইট দিয়ে আসতে দেখে মিহাল অবাক হয়ে গেল।সে মাঠের মাঝখানে দাড়িয়ে অনলাইনে প্রজেক্ট বানানোর জিনিস ১ ঘণ্টার মধ্যে অর্ডার পাওয়ার জন্য এক্সপ্রেস ডেলিভারি কনফার্ম করছিল।এমন সময়ে ইউনিভার্সিটির মেইন গেটের দিকে তাকাতেই দেখলো নীলা খুব দ্রুত পায়ে ভেতরে আসছে।হাতে একটি ক্যান।মিহালের মস্তিষ্ক জানান দিচ্ছে যে তার নীলাঞ্জনা কিছু একটা করবে।আর এখন সে নীলার চেহারার কোমলতা এবং কান্নার ছিটেফোঁটাও দেখছে না। বরং সেই আগের ন্যায় তেজ এবং জেদ দেখছে।আর আগের চেয়ে বেশি আক্রোশ দেখছে। মস্তিষ্কে চাপ পরতেই মিহাল লিসা কে খুঁজতে লাগলো।তার মস্তিষ্ক জানান দিচ্ছে যা খারাপ হবে তা লিসার জন্য এবং লিসার সাথে হবে।লিসার সাথে খারাপ কিছু হবে তাও তার নীলাঞ্জনার দ্বারা আর মিহাল তা নিজ চোখে দেখবে না তা তো হতে পারে না। এরকম কিছুক্ষণ এদিক সেদিক খুঁজতে খুঁজতে মিহাল লিসা কে বাম পাশে করিডোরে বসে আড্ডা দিতে দেখলো। মূলত লিসা তার দিকেই তাকিয়ে ছিল।মিহাল তাকাতেই লিসার নিজের চুল ঠিক করতে লাগলো।যা দেখে মিহাল বাঁকা হেসে একা একাই বলল__
“আমার নীলাঞ্জনা তোমার যেই স্বাদের চুল নষ্ট করে দিয়েছিল সে চুল ঠিক করেও যেই যায়গায় আমার নজড় কাড়তে পারলে না সেই যায়গায় নকল চুল ঠিক করে কিছুই করতে পারবে না। শুধু একটা কাজ হবে সেইটা হলো তোমার নকল চুল খুলে যাবে।আর আমার দিকে তাকিয়ে ভাব নিতে নিতে আন্দাজও করতে পারবে না কখন আমার নীলা রাণী এসে তোমাকে লীলা দেখাবে।”
মিহাল ঠোঁট কামড়ে হেসে আবার নীলার দিকে দৃষ্টিপাত করলো।এখন নীলা কি করবে তাই সে দেখতে চায়।
অন্যদিকে লিসা এবং তার সাঙ্গপাঙ্গরা তো নীলা যে আসছে তা লক্ষ্যই করেনি। নীলা একদম লিসার পিছনে এসে দাঁড়ায়। কিন্তু পেছন থেকে বাড় করার ব্যক্তি সে না।তাই তো ক্যানটি খুলতে খুলতে লিসার উদ্দেশ্যে গলা খাঁকারি দিল।লিসা এবং তার সাঙ্গপাঙ্গরা পিছন ফিরে তাকাতেই নীলা কে দেখতে পেয়ে কিঞ্চিত চামকালো।নীলা কে তারা মোটেও আশা করেনি।তারা তো ভেবেছিলো হয়তো নীলা রুমে কোণায় বসে কান্না করছে। কিন্তু নীলা কে নিজের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার অসচেতন মন সচেতন হয়ে গেল লিসার।সে কিছু বলতে নিবে তার আগেই নীলা লিসার পরণের পোশাক কিছুটা ফাঁক করে ক্যান থেকে Itching Powder লিসার গলা দিয়ে ড্রেসের ভেতর ছিটিয়ে দিল। আবার সেখান থেকে বের করে লিসার চুল সরিয়ে ঘাড় দিয়ে Itching Powder ঢেলে দিল।আশে পাশের অনেক মানুষই অবাক চোখে দেখেছিল। প্রিন্সিপালের মেয়ের দিকে চোখ তুলে কথার বলার জন্যেও সাহসের প্রয়োজন।আর সেই যায়গা এমন প্রতিবাদ করার জন্য তো অসংগত সাহসের প্রয়োজন যা এই মেয়ের আছে।
নীলা নিজের কাজ করে লিসা থেকে দূরে সরে দাঁড়ালো।লিসা রাগ দেখিয়ে যেই না কিছু বলতে যাবে ওমনি শরীরে চুলকানি অনুভব করল।কথা বলার সময় পর্যন্ত পেলো না দাঁড়িয়ে উঠে পাগলের মতো শরীর চুলকাতে লাগলো। নীলা এবং আশেপাশের সবাই তাকে দেখে হাসছে। লিসা আর সেখানে দাঁড়িয়ে না থেকে দৌড় দিয়ে স্থান ত্যাগ করল।তার পেছন পেছন তার সাঙ্গপাঙ্গরাও চলে গেল।লিসার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে নীলা হাসতে হাসতে শেষ। হাসতে হাসতে যেই না মাঠের দিকে তাকালো অমনি নিজের ইকোনমিক প্রফেসরকে দেখে থমকে গেল।মিহাল তার দিকে তাকিয়ে হাসছিল। নীলা তাকাতে দুজনের চোখাচোখি হলো।মিহাল প্রাণ খুলে হেসে নীলার চোখে চোখ রেখে তালি বাজালো।নীলাও দূর থেকে তা দেখে হেসে উঠলো।মিহাল নীলা কে থাম্বস আপ দেখলো। তারপর নীলা কে ইশারা দিয়ে চলে যেতে বলল।নীলাও আর দাঁড়াল না।এখন তার বেশ হালকা লাগছে। এতক্ষণ মন ভার হয়ে ছিল এখন সকল কষ্ট বাতাশের সাথে মিশে গিয়েছে।সে খুশি মনে গুন গুন করতে করতে ইউনিভার্সিটি থেকে বের হয়ে এলো।মিহাল নীলার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে একা একাই বলতে লাগলো __
নীলা রাণীর লীলা দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারছি না। তোমাকে ব্যবহার করে নয় বরং তোমাকে নিজের করে ইরফানের নামক গাঁধার, গাঁজাখোরের কাছ থেকে প্রতিশোধ নিবে। নীলা মির্জা কেবল মিহাল খানের।আর মিহাল খান ওরফে পেয়ারে লাল কেবল তার নীলা মির্জা ওরফে নীলাঞ্জনার।
মিহাল কথাগুলো বলতে বলতেই চলে গেল ফুটেজ রুমে। আজকের করা নীলার ক্রাইমের ভিডিও টাও তো তার ডিলেট করতে হবে।সে ফুটেজ রুমে গিয়ে ফুটেজ ডিলিট করতে করতে বলল__
লীলা রানী তুমি ক্রাইম করবে যত ইচ্ছে তত। তোমাকে আড়াল করতে তোমার এই দাস আছেই তো।তোমার সেনাপতি হয়ে তোমাকে প্রটেক্ট করব আবার তোমার ক্রাইম পার্টনার হয়ে সহযোগিতা করব তোমায়।বেশ ইন্টারেস্টিং ব্যাপার।
মিহাল বাঁকা হেসে ফুটেজ ডিলিট করে রুম থেকে বের হয়ে পড়ল। এখন আবার বাড়ি গিয়ে তাকে প্রজেক্ট বানাতে হবে। আজকের ভেতর কাজ শেষ করতে হবে যাতে কালকে তার নীলাঞ্জনা জিতে যায়।
একজন ডাক্তারের দিন মানেই অবিরাম ছুটে চলা, যেখানে সকালের স্নিগ্ধতা ছাপিয়ে ওঠে রোগীর আর্তনাদ আর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ব্যস্ততা। দিন-রাত ভুলে, নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে, তারা অন্যের জীবনের আলো ফেরাতে প্রতিনিয়ত গোয়েন্দার মতো রোগ নির্ণয় ও নিরাময়ে লিপ্ত থাকেন, মাঝে মাঝে চরম ক্লান্তি আর অসহায়ত্বের মুখোমুখি হয়েও।মুনভির সময় খুবই ব্যস্ত কাটছে। অবশ্য শত ব্যস্ততার মাঝেও সে হুট হাট ইকরা কে মনে করে টেক্স করত। শুধু খোঁজ নিত মেয়েটির। জিজ্ঞেস করতো কোনো সমস্যা হচ্ছে কিনা ইত্যাদি ইত্যাদি। অবশ্য ইকরারও বেশ ভালো লাগলো মুনভির এমন খোঁজ খবর নেওয়াতে।মুনভি যেমন ইকরার নাম কটন ক্যান্ডি দিয়ে সেইভ করেছে ইকরাও তেমনি মুনভির নাম জেন্টলম্যান দিয়ে সেইভ করেছে।
নীলা অ্যাপার্টমেন্টে এসেই ইকরা কে আজকের ঘটনা খুলে বলল। ইকরার নীলার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা শুনে যেমন কষ্ট পেল তেমনি নীলার করা প্রতিবাদের কথা শুনে হাসতে হাসতে শেষ হয়ে গেল।আর বলল_
উফ্ নীলা তুই পারিসও বটে। খুব ভালো কাজ করেছিস। ফাজিল মেয়ে একটা।ওকে পেলে ঠাঁটিয়ে দুটো চড় দিতাম আমি।
নীলা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল _ মাত্র দুটি? কম হয়ে গেলো না? এইবার দুজন একসাথেই হেসে উঠলো। হাসতে হাসতে থেমে ইকরা নীলার উদ্দেশ্যে বলল_
তারপর তুই কি আর প্রাইজ পাবি না তাহলে? কষ্ট তো কম করলি না।
নীলার দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে মাথা উঁচু করে উপরের দিকে তাকিয়ে নরম স্বরে বলল_
পবিত্র কুরআনে অনেক আয়াতে বলা হয়েছে যে, মহাবিশ্বের সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছায়, তাঁর জ্ঞান ও পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটে।আর সূরা আত-তাকভীরের ২৯ নং আয়াত, যেখানে বলা হয়েছে: “তোমরা ইচ্ছা করো না, যতক্ষণ না রাব্বুল আলামিন আল্লাহ ইচ্ছা করেন”।
আমি কি জোর করতে পারিরে? “নিশ্চয়ই আল্লাহ উত্তম পরিকল্পনাকারী”।
ইকরাও এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। শান্তনা দেওয়ার মতন ভাষা নেই তার কাছে। কিইবা বলবে মেয়েটাকে। মেয়েটি তো কম ধৈর্য্য ধরলো না জীবনে।ইকরা কেবল মেয়েটির জন্য প্রাণ খুলে দোয়াই করতে পারবে। ইকারার ভাবনায় ছেদ পড়ল নীলার বচন শুনে।
নীলা হঠাৎ বলে উঠল যে প্রফেসর মিহাল তার প্রজেক্ট নিয়েছে সম্পূর্ণ করার জন্য।
কথাটি শোনা মাত্রই ইকরার চিৎকার করে বলে উঠলো __
কিহহহহ! প্রফেসর তোর প্রজেক্ট নিয়েছে করে দেওয়ার জন্য?আনবিলিভেবল! কি বলিস? কাহিনী কি মামা?
ইকরা নীলাকে হাতের কনুই দিয়ে গুতা দিতে দিতে বলল। কিন্তু নীলার অগ্নি দৃষ্টি দেখেই পরক্ষণেই চুপ হয়ে গেল। নীলা বলতে শুরু করল _
জানি না উনি কেন এমনটা করলেন কিন্তু এখন আমার নিজের প্রতি নিজেরই খুব রাগ পাচ্ছে। আমি নিজেও জানিনা কিন্তু উনার সামনে দুর্বল হয়ে পড়ে বেচারী এবং ন্যাকা মেয়েদের মত কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছিলাম। এইসব ন্যাকামি আর যাই হোক আমাকে মানায় না। কিন্তু মুড সুইংয়ের কারণে এমনটা হয়ে গিয়েছে।
ইকরা প্রতি উত্তর না করে উল্টো জিজ্ঞেস করল_
তুই কি কখনো কাউকে সুযোগ দিবি না?
নীলা সময় ব্যয় না করে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল __
জানিনা।
ইকরা নীলাকে বোঝানোর জন্য বলতে লাগলো_ জীবনে সুখী থাকতে গেলে অন্তত একটা জীবনসঙ্গীর** কথাটা সম্পূর্ণ করার আগেই নীলা শব্দ করে হেসে উঠলো। নীলার হাসি দেখে ইকরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল।নীলা হাসতে হাসতে বলল __
জীবনে সুখী থাকতে টাকা প্রয়োজন বেডা না।
ইকরা স্তব্ধ হয়ে গেল।কি বলবে অথবা কি বলা উচিত তা তার জানা নেই। তাই নীরব থাকাকেই উত্তম মনে করল। এই নিরবতা ভেঙে নীলা আবার বলতে শুরু করল__
তোর কাছে একটা সিক্রেট শেয়ার করতে পারি যা কাউকে বলিনি আমি?
ইকরা নড়ে চড়ে উঠে নিজের সম্পূর্ণ মনোযোগ নীলার দিকে দিল।নীলা মুচকি হেসে বলতে এক লম্বা কাহিনী তাকে শোনালো। ইকরা পুরো ঘটনা শুনে হতভম্ব হয়ে গিয়েছে। যা শুনলো তা সে কখনো শুনতে পারবে অথবা জানতে পারবে এমনটা কল্পনাও করেনি। কিছুক্ষণ নীরব থেকে আবার চিৎকার করে বলে উঠলো_
কিহ্ তোর তোর ফুফু আছে? তাও এই দেশে?প্যারিসে? কিন্তু আমি জানতাম তোর বাবারা তিন ভাই আর তুই আজকে বলছিস তোর একটা ফুপু আছে। ওওওও ভাইসাফফফ। এটাতো একদম অবিশ্বাস্য ঘটনা বলতে আমাকে। আর জিনিসটা কেমন ফিল্মি হয়ে গেল না? তুই তোর ফুফুর কথা নিজের বাবার ডাইরি লুকিয়ে পড়ে জানতে পারলি। আবার আসার সময় নিজের বাবার ডাইরি এবং ফুপুর ছবিও নিয়ে এসেছিস সঙ্গে করে। তুই তো একদম গোয়েন্দা হয়ে গেলি।
নীলা শব্দ করে হেসে। হাসতে হাসতে বলল_
কিন্তু এখন যে আমাকে আমার ফুফুকে খুঁজে বের করতে হবে।
কথাটি শোনা মাত্রই ইকরার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। সে চিন্তিত স্বরে বলল_
তুই কেবল জানিস তোর ফুফু প্যারিসে আছে। কিন্তু এত বড় দেশে একটা মানুষকে খুঁজে পাওয়া চারটে খানি কথা না নীলু।
নীলা বাঁকা হেসে ইকরার মাথায় চাটি দিয়ে বলল,,,,
ইকু তুই বলদ হতে পারিস কিন্তু আমি না। আমি প্যারিসে আসার আগে আমাদের পাড়ার কিছু কাকিমা দের সাথে ভালো সম্পর্ক রেখেছি। এদের সাথে এমন ভাবে কথা বলেছি যাতে তারা বুঝে যে আমি প্যারিস থেকে যাবার সময় তাদের জন্য বিদেশী কিছু নিয়ে। তারপর তাদের কাছ থেকে তিলকে তাল বানিয়ে এই কাহিনীকে আর এক কাহিনী বানিয়ে খবর নিয়েছি মুবিন খান মানে আমার ফুফা আর যিনি আমার বড় চাচার বেস্ট ফ্রেন্ড ছিলেন তার সম্পর্কে। অনেক খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম ফুফার পরিবার এখন ঢাকাতেই কোথাও ফ্লাট নিয়ে থাকেন। আর ফুফা প্যারিসের এই শহরেরই কোথাও একটা বিজনেস করেন। তাহলে অবশ্যই খোঁজতে বেশি সময় লাগবে না তাই না।
ইকরা এইবার কিছুটা নিশ্চিন্ত হলো। কারণ এতে অনেকটা কাজই এগিয়ে গিয়েছে। কিন্তু তবু একটা ঘাটতি থেকে যায়। সেই ঘাটতি নিয়ে মনে প্রশ্ন জাগতেই নীলাকে বলে উঠলো__
কিন্তু খোঁজ খবর নেওয়ার জন্য আমাদের এই দেশে পরিচিত মানুষ চাই। কিন্তু এইখানে তো আমাদের কোন চেনা বিশ্বাসি পরিচিত মানুষ নেই।
নীলা তখনই ইকরার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসলো।ইকরা কিছুক্ষণ অবুঝের মত তাকিয়ে থেকে যেই না নীলার বাঁকা হাসির মানে বুঝে উঠতে পারে সে নিজেও বাঁকা হাসলো। তারপর দুজনেই একসাথে জোড়ে বলে উঠলো_
ইয়েএএএএএ।
(সেই পরিচিত মানুষটি কে হতে পারে??)
সীন নদীর পাড় ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা আইফেল টাওয়ারটি আজ রাতে যেন এক মেঘলা চাদরে নিজেকে ঢেকেছে। ধীরগতিতে বয়ে যাওয়া বাতাস আর হালকা বৃষ্টির ছাঁট, প্যারিসের ব্যস্ততাকে থামিয়ে দিয়ে এক অদ্ভুত শান্ত স্নিগ্ধতার জন্ম দিয়েছে। লোহার কারুকার্যময় টাওয়ারের সোনালী আলোয় মিশে যাচ্ছে রাতের কুয়াশা। মনে হচ্ছে, শহরটি তার সমস্ত ক্লান্তি ধুয়ে ফেলছে আজকের এই শীতল, মেঘাচ্ছন্ন রাতে। শীতে হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় এক যুবক রুমের ভেতর কাজের কারণে পায়চারি করছেন। ফলস্বর তার পরনে শীতের কাপড় না থাকা সত্ত্বেও শীত তাকে গ্রাস করতে পারছে না। যেন আজ সে কাজ করে শীতকেই হার মানিয়ে ফেবল বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। টেবিলের ওপর জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এক ফ্লেক্স কফি শেষ করেও যেন ক্ষান্ত হয়নি পুরুষটি।মাথা ঝিমঝিম করছে।সেই সকাল থেকে নাওয়া খাওয়া ভুলে এই প্রজেক্ট এর কাজে হাত লাগিয়েছে। এখনো পর্যন্ত কাজ শেষ করে উঠতে পারেনি। আর করবেই বা কি করে? এই কাজ এক সপ্তাহে করা হয়েছিল সেই কাজ কি একদিনে করা সম্ভব? হয়তা না কিন্তু তাকে যে এই অসম্ভব কাজ সম্ভব করে দেখাতে হবে। খুব বড় মুখ করে নিজের নীলাঞ্জনার সামনে বলে এসেছে। হ্যাঁ নীলাঞ্জনার সামনে নিজেকে ছোট করতে তার কোন সমস্যা নেই কিন্তু তার জন্য তার নীলাঞ্জনা ছোট হবে এইটা সে বরখাস্ত করবে না। প্রয়োজন পড়লে আজ না ঘুমিয়ে কাজ শেষ করে কাল ইউনিভার্সিটিতে নিয়ে যাবে প্রজেক্ট। তবুও যে করেই হোক আজ রাতের মাঝেই তাকে এই প্রোজেক্ট শেষ করতে হবে। বক্স বানাতে গিয়ে হাতে কয়েকবার ব্যথা পেয়েছে সে খানিকটা রক্ত বের হয়েছে কিন্তু সে বিন্দুমাত্র পরোয়া না করে নিজের কাজে মগ্ধ হয়ে থাকলো পুরুষটি। যেন সে এক যুদ্ধে নেমেছে এই যুদ্ধে হারিয়ে গেলেই তার রাজ্য তাকে হারাতে হবে। কিন্তু রাজ্যের প্রতি তার কোন লোভ নেই তার লোভ তার রানীর প্রতি। অবশ্য এটাকে লোভ বলা চলে না এটা কে রানী কে হারানোর ভয় বলে।
মিহাল কাজ করতে করতে আনমনে বলল__
হতে পারে আমি কোন রাজ্যের রাজা না কিন্তু আমার জীবনে আসা রানীকে হারাতে পারবো না। রাজ্য ছাড়া রাজার মূল্য পাওয়া গেলেও রানী ছাড়া সেই রাজা মূল্যহীন। কিন্তু আমি আমার জীবনের অমূল্য রানীকে হারাতে পারবো না। এই অমূল্যরানীকে হারিয়ে নিজের জীবনকে মূল্যহীন করতে পারবোনা।
মিহাল আবার কাজে মনোনিবেশ করল।কাজ করতে করতে রাত ২টা বেজে গেল কিন্তু এখনো কাজ সম্পন্ন করতে অনেকটা সময় লাগবে। ঘুম এসে ভার করছে মিহালের চোখ।গত এক সপ্তাহ যাবত সে ট্রেনিং এর জন্য ক্যাম্পে থেকে ছিল। সেখানে অনেক মানুষের সাথে ঘুমাতে হয়েছিল বলে ঘুমাতে পারিনি ভালো করে। রাতে তিন কি চার ঘণ্টা ঘুমিয়ে ছিল। সারাদিন কাজ করে ৩-৪ ঘন্টা ঘুমানো নিতান্তই কম ঘুম। তারপর আজ এসেই কাজে লেগে পরল।সেও তো মানুষ। সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মেছিল। ছোট থেকে বড় হয়েছে অভাব নামক শব্দটি থেকে দূরে সরে। এদিক সেদিক গিয়ে ঘুমাতে পারে না। শখের বশে কেবল শিক্ষকতার চাকরি নিয়ে ছিল। এবং এই প্রফেশনের জন্য তাকে যত কষ্টই করতে হোক সে সব কষ্ট সহ্য করে নেবে।
টেবিলে বসে কাজ করতে করতে যেই না চোখ লেগে এলো উমনি মিহাল সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও চোখ মেলে রাখার জন্য কিন্তু পারছে না। আজ যেন ঘুম তার সাথে বেঈমানি করছে। তাকে তার নীলাঞ্জনার জন্য জেগে থাকতে দিচ্ছে না। টেবিলে মাথা এলিয়ে চোখ বন্ধ করে নিল। এখন যদি না ঘুমায় তাহলে কাল হয়তো শরীর বেশ খারাপ করবে তার। কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে রাখতেই হঠাৎ তার চোখের সামনে ভেসে উঠল এক ইঁদুরের পিঠ। ইঁদুরটি তার দিকে ফিরতেই সে দেখল সম্পূর্ণ শরীর ইঁদুরের কিন্তু মুখ খানা ইরফানের। ইরফান নিজের ইঁদুর শরীর কে নাচিয়ে নাচিয়ে বলতে লাগলো_
আমি ইঁদুরের মত দেখতে হলেও নীলা কে আমি জিতে নিয়েছি তুই জিততে পারিস নি আর নীলাকে জেতাতেও পারিস নি। তাই নীলা মির্জা কখনোই তোর নীলাঞ্জনা হতে পারবেনা সে কেবল এই ইরফান মির্জার নিলাম মির্জা হয়ে থাকবে।
মিহাল ধপ করে উঠে বসলো। কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। তোতলাতে তোতলাতে বলতে লাগতো__
এই,, এই,,, এই,, এইটা কি কি কি ছিল?
তারপর নিজের গালে নিজেই কয়েকটা চড মারতে মারতে বলল__
আর কোন স্বপ্ন পেলিনা দেখার? নীলা কে বিয়ে করে সুখে সংসার করছিস এমন স্বপ্ন দেখলেও তো পারতি। শুধু শুধু নিজের সতীনকে নিয়ে কেন স্বপ্ন দেখলি। আর তোকে ঘুমাতে কে বলেছিল? ঘুমালে কি এসব কাজ ইরফান করে দিবে? সেই ইদুরের দ্বারা এ কাজ হবে না। তোকেই করতে হবে মিহাল খান। নিজের মিহাল খান মার্কা অরা( aura) বাদ দিয়ে নিজের নীলাঞ্জনার জন্য তার পেয়ারে লাল হয়ে কাজ কর তুই। তোকে আজকে জাগতেই হবে এবং জেগে থেকে সম্পূর্ণ কাজ শেষ করতেই হবে।
বলেই আরেকটি ফ্লাক্স থেকে কফি মগে ঢেলে এক চুমুক কফি খেয়ে নিল। তারপর নিজেকে মোটিভেশন দেওয়ার জন্য বলতে লাগলো’_
শোন মিহাল খান ওরফে নীলাঞ্জনার পেয়ারে লাল তুই যদি আজকে এই কাজ করতে না পারিস তাহলে সত্যি সত্যি ইরফান তোর নীলাঞ্জনা কে ছিনিয়ে নিবে।তাই নিজের নীলাঞ্জনা কে নিজের করে রাখতে হলো তোকে রাত জেগে এই কাজ করতে হবে। তুই পারবি তোকে পারতেই হবে।
নিজেকে মোটিভেট করে আবার কাজে মনোনিবেশ করল মিহাল। এবার যেন তার কাজের গতি আগের থেকে দ্বিগুণ হয়ে গেল। যেন হঠাৎ তার ভেতর কারেন্ট চলে এলো। সে খুব নিখুঁতভাবে এবং দ্রুত গতিতে কাজ করছে।
ঘড়ির কাঁটায় সকাল ৮টা সবে মিহালের কাজ শেষ হলো। সারারাত না জেগে সে এই প্রজেক্ট সম্পূর্ণ করার প্রচেষ্টা চালিয়ে গিয়েছে। অবশেষে তার প্রচেষ্টা সফল হল। ছবির সাথে মিলিয়ে দেখলো তার বানানো প্রজেক্ট খারাপ হয়নি বরং ভালোই হয়েছে। দক্ষ হাতের কাজ বললেই চলে। চোখে একরাশ ঘুম থাকলেও ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। এখন তার শাওয়ার নেওয়ার প্রয়োজন। ঠান্ডা পানির শাওয়ার নিলেই ঘুমের রাস কেটে যাবে। আবার ইউনিভার্সিটিতে যাবার আগে তার নীলাঞ্জনা কে এই প্রজেক্টটা হাতে ধরিয়ে দিতে হবে।বেশি সময় নেই তার কাছে। তাই আর দেরি না করে কাভার্ড থেকে কাপড় নিয়ে বাথরুমে চলে গেল।
চলবে???
কালকে দেওয়ার চেষ্টা করব।
বি দ্র: কাল ও পরশু গায়ে হলুদ এবং বিয়ের দাওয়াত জানি না দিতে পারবো কিনা। এবং আমার পরীক্ষা ১৮ তারিখ শেষ হবে। তারপর আবার আগের মতোন করে গল্প দিব।
Share On:
TAGS: নাজনীন নেছা নাবিলা, নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ২০
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৩+বোনাস পর্ব
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ১২
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ১
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৪
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ১৪
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা গল্পের লিংক
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৭
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ১৮
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৮+বোনাস