নিষিদ্ধ_রংমহল 🥀
পর্ব_২৮
লেখকঃ Atia Adiba – আতিয়া আদিবা
ঊষার প্রথম রক্তিম আলোকচ্ছটা যখন কারুকার্যখচিত ঝরোকা ভেদ করে মহলের সিক্ত আঙিনায় এসে পড়ল, তখনো চারপাশের প্রকৃতি এক সুগভীর তন্দ্রায় আচ্ছন্ন।
অন্দরমহলের প্রবেশপথে যখন বাঈজী মহলের সেই রাজকীয় পালকি এসে থামল। তখনো গজনবী মহলের সিংহদ্বারে প্রহরীদের বর্শার ফলকগুলো প্রাতঃকালীন আলোয় ঝকঝক করছিল। পালকির বাহকগণ অত্যন্ত সন্তর্পণে কাঁধ হতে পালকিটি নামিয়ে রাখল। পালকির রেশমী পর্দা সরিয়ে হেমাঙ্গিনী সিক্ত আঙিনায় পা রাখল। তার বুক দুরুদুরু কাঁপছিল।
আভিজাত্যের এই বিশাল প্রাসাদ, সুউচ্চ স্তম্ভ আর বিশাল খিলানগুলো হেমাঙ্গিনীকে আজ যেন এক নিগূঢ় রহস্যের দিকে আহ্বান জানাচ্ছিল। সে জানত, এই অন্দরমহলে পা রাখা মানেই এক আজন্ম যুদ্ধের সূচনা। তার পায়ের নূপুরের শব্দ এই প্রাতঃকালীন নিস্তব্ধতায় কেমন অদ্ভুত শোনাল। যেন কোনো বিষন্ন সুর তুলছে।
হেমাঙ্গিনী বিস্ময়বিস্ফোরিত নেত্রে তাকিয়ে দেখল, অন্দরমহলের প্রধান সোপানে স্বয়ং জমিদারপুত্র তাইমুর গজনবী দণ্ডায়মান। তিনি ধীরপদে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসে হেমাঙ্গিনীর অতি সন্নিকটে দাঁড়ালেন। তার গভীর চাহনি হেমাঙ্গিনীর কম্পিত অধর আর আনত নয়নের ওপর নিবদ্ধ হলো।
তিনি অত্যন্ত শান্ত স্বরে শুধালেন,
- কেমন আছেন, বাঈজী সাহেবা? ঝোড়ো হাওয়ার মাঝে পালকিতে আসতে আপনার খুব বেশি কষ্ট হয়নি তো?
হেমাঙ্গিনী মাথা নিচু করে আনত নয়নে উত্তর দিল,
- হুজুর, আপনার কৃপায় পথিমধ্যে কোনো বিঘ্ন ঘটেনি। তবে বাঈজী মহলের সেই পরিচিত চার দেয়াল ছেড়ে এই বিশাল অন্দরমহলের গাম্ভীর্যের মাঝে নিজেকে বড়ই নগণ্য মনে হচ্ছে।
তাইমুর কিঞ্চিৎ স্মিত হাসলেন। বললেন,
- নগণ্য ভাববেন না। এই মহলের প্রতিটি প্রস্তরখণ্ড আজ আপনার আগমনে ধন্য। অন্দরমহলের এই নতুন পরিবেশ মানিয়ে নিতে হয়তো আপনার কয়েক দিন সময় লাগবে। অতি স্বাভাবিক বিষয়।তবে আমি আপনার পাশে আছি। আপনার ক্লান্ত চোখদুটো বলছে আপনার বিশ্রাম প্রয়োজন। ঘুম হয়নি বুঝি?
হেমাঙ্গিনী মৃদু হেসে উত্তর দিল,
- সেতো কারো আগমনের অপেক্ষায় আপনার দুচোখের পাতাও এক হয় নি, হুজুর।
তাইমুরের হাসি প্রশস্ত হল। তিনি বললেন,
- চলুন, আপনার কক্ষটি দেখে নিন।
তাইমুর অত্যন্ত সসম্মানে হেমাঙ্গিনীকে অন্দরমহলের ভেতরে নিয়ে যেতে লাগলেন। অভ্যন্তরে প্রবেশের সাথে সাথে তিনি বলে উঠলেন,
- বাঈজী সাহেবা, এই বিশাল প্রস্তরখণ্ডের প্রাসাদে আপনার ন্যায় একজন মহৎ শিল্পীকে স্বাগতম! আপনি হয়তো ভাবছেন এই অন্দরমহল আপনার জন্য কেবল একটি কারাগার। তবে, বিশ্বাস রাখুন, যত্নে কোনো ত্রুটি হবে না। আপনার প্রতিটি নিশ্বাস এই মহলের সম্মানের অংশ।
হেমাঙ্গিনী কোনো উত্তর দিল না। সে শুধুমাত্র মুগ্ধ নয়নে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই বলিষ্ঠ পুরুষটিকে অবলোকন করছিল।
তাইমুর হেমাঙ্গিনীকে নিয়ে অন্দরমহলের এক নির্জন সুসজ্জিত কক্ষের সামনে এসে দাঁড়ালেন। কক্ষটি অন্দরমহলের মূল খাসমহলের বেশ সন্নিকটে। সেগুন কাঠের কারুকার্যখচিত বিশাল দুয়ারের পাল্লা দুটো সরিয়ে তাইমুর হেমাঙ্গিনীকে ভেতরে প্রবেশের ইঙ্গিত করলেন।
ভেতরে প্রবেশ করতেই হেমাঙ্গিনী এক অপূর্ব চন্দন ও জাফরানি আতরের সুবাসে আবিষ্ট হল। কক্ষের বিশালতা দেখে তার চক্ষু চড়কগাছ! শ্বেতপাথরের মেঝেতে পারস্যের গাঢ় নীল রঙের মিহি গালিচা বিছানো। কক্ষের মাঝখানে একটি বিশালাকার পালঙ্ক, যার পায়াগুলো হাতির দাঁতের কারুকাজ করা। পালঙ্কের ওপরে চারকোণা খুঁটি হতে ঝুলে আছে ধবধবে সাদা মসলিনের মশারি। কক্ষের একপাশে বড় এক আয়না, যার ফ্রেমটি স্বর্ণখচিত। জানালার কপাটে ঝোলানো দামী মখমলের গাঢ় লাল রঙের যবনিকা। যবনিকাটি সরিয়ে দিলেই বাইরের সিক্ত বাগান আর সুদূর অরণ্যের রহস্যময় ছায়া চোখে পড়ে। দেয়ালে ঝোলানো গজনবী বংশের বীরত্বের তৈলচিত্র আর পিতলের সুদৃশ্য প্রদীপগুলো কক্ষটিকে এক রাজকীয় গাম্ভীর্য প্রদান করেছে। এক কোণে রাখা শ্বেতপাথরের ফুলদানিতে তাজা রজনীগন্ধার গুচ্ছ কক্ষের আভিজাত্যকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
তাইমুর গম্ভীর স্বরে বললেন,
- আজ হতে এটিই আপনার বিচরণক্ষেত্র। আমি চাই না গজনবী মহলের শ্রেষ্ঠ শিল্পী কোনো সাধারণ দাসীশালায় অবস্থান করুক। এই কক্ষ আপনার যোগ্য মর্যাদা রক্ষা করবে।
ঠিক সেই মুহূর্তে অলংকারের সুমধুর ঝংকার তুলে সুলতানা কক্ষে প্রবেশ করলেন। তার মুখমণ্ডলে সেই চিরচেনা অবোধ বালিকার অভিনয়। তিনি কৃত্রিম আনন্দ নিয়ে হেমাঙ্গিনীর সন্নিকটে এলেন। অথচ তার চোখের মণির অতল গহ্বরে যে বিষের নীল স্রোত বয়ে যাচ্ছিল, তা সকলের অগোচরে রয়ে গেল।
সুলতানা অত্যন্ত ধূর্ততার সাথে হেমাঙ্গিনীর চিবুক স্পর্শ করে এক বিচিত্র হাসি দিয়ে বললেন,
- হেমাঙ্গিনী!
তাইমুর বিস্মিত স্বরে শুধালেন,
- আপনি চিনতে পেরেছেন?
সুলতানা লজ্জামিশ্রিত হেসে উত্তর দিলেন,
- আপনি কি আমায় এতটাই অবোধ মনে করেন, হুজুর? আমি গজনবী মাহফিলের রত্নকে চিনতে পারব না? এমন অপরূপা সুন্দরী আর গুণবতী নারীকে সাথী হিসেবে পেয়ে আমি ধন্য।
এরপর সুলতানা হেমাঙ্গিনীর পানে চেয়ে বললেন,
- আপনি চিন্তা করবেন না। এই অন্দরমহলের প্রতিটি রীতিনীতি, আচার-আচরণ আমরা শিখে নেব। আমরা দুজনে মিলে এই নির্জীব মহলকে মাতিয়ে রাখব। তাই নয় কি?
হেমাঙ্গিনী কুর্নিশ জানিয়ে সহমত পোষণ করল।
- আপনি বিশ্রাম করুন। আমি এখন আসছি।
তাইমুরের দিকে ফিরে অবনত মস্তিষ্কে সম্মান জানিয়ে সুলতানা গটগট করে নিজের কক্ষের দিকে চলে গেলেন। পরিচারিকারাও তার পিছু নিল।
খাদেমরা চলে গেলে অন্দরমহলের সেই সুসজ্জিত নিভৃত কক্ষে তখন তাইমুর আর হেমাঙ্গিনী একা রয়ে গেলেন। কক্ষের ভারী যবনিকাগুলো প্রাতঃকালীন সিক্ত বাতাসে কাঁপছিল। তাইমুর যেন এই সময়ের অপেক্ষার প্রহর গুনছিলেন।
তিনি হেমাঙ্গিনীর অত্যন্ত নিকটে এগিয়ে এলেন। তার শরীরের সেই পুরুষালি চন্দন সুঘ্রাণে হেমাঙ্গিনী নেশাগ্রস্ত হল। তাইমুর কোনো ভনিতা করলেন না। হেমাঙ্গিনীর দুই ক্ষুদ্র হাত নিজের বলিষ্ঠ হাতের মুঠোয় নিলেন। হেমাঙ্গিনী ভয়ে আর লজ্জায় সিঁটিয়ে গিয়ে কম্পিত স্বরে বললেন,
- হুজুর, কেউ দেখে ফেললে সর্বনাশ হয়ে যাবে!একজন বাঈজীর সাথে আপনার এই সান্নিধ্য কারো নজরে এলে আপনার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হবে।
তাইমুর রহস্যময় হাসি দিয়ে হেমাঙ্গিনীকে নিজের বলিষ্ঠ বক্ষের অত্যন্ত কাছে টেনে নিলেন। তার গলার স্বর তখন আবেগে রুদ্ধপ্রায়। তিনি অত্যন্ত নিচু স্বরে নিজের ঠোঁটজোড়া হেমাঙ্গিনীর তিরতির করে কাঁপতে থাকা ওষ্ঠদ্বয়ের অতি নিকটে এনে ফিসফিস করে বললেন,
- এই মুহূর্তে এই বিশাল প্রাসাদের নিভৃত কক্ষে কেউ আমাদের মাঝে প্রাচীর হয়ে দাঁড়াতে পারবে না। আর মর্যাদার কথা বলছেন? গজনবী মহলের সম্মান আমি যেমন রক্ষা করতে জানি, তেমনি আমার হৃদয়ের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতেও আমি পিছপা হই না। রজনীর সেই ঝোড়ো হাওয়ার মাঝে আমাদের কথাগুলো অপূর্ণ রয়ে গিয়েছিল। আমার সেই আমানতকে আজ এই প্রাসাদে সশরীরে সুরক্ষিত পেয়ে আমার হৃদয়ে প্রশান্তির বৃষ্টি ঝরছে। আপনার চোখের মায়ায় আমি বন্দী হয়ে গেছি।
হেমাঙ্গিনী তাইমুরের উষ্ণ বক্ষে মুখ লুকিয়ে ফেলল। অনুভব করল তার হৃদপিণ্ডের দ্রুত স্পন্দন। তাইমুর অত্যন্ত আবেগঘন হয়ে হেমাঙ্গিনীর ললাটে চুমু আঁকলেন।
তার হাতজোড়া ধীরে ধীরে হেমাঙ্গিনীর মুখাবয়ব হতে চিবুকের দিকে নেমে এল। পুনরায় তাইমুরের মুখমণ্ডল হেমাঙ্গিনীর সিক্ত অধরের অতি সন্নিকটে চলে এল। কামাতুর শিহরণে হেমাঙ্গিনী চোখ বুজল। সে তার সমস্ত সত্তা আজ ভালোবেসে তাইমুরের কাছে সমর্পণ করতে প্রস্তুত।
দুজনের অধরে সামান্য স্পর্শ লাগতেই কক্ষের দরজায় সশব্দে করাঘাত পড়ল।
তাইমুর এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেন। তার চোখমুখে বিরক্তি ফুটে উঠল। ক্রোধে লাল হয়ে গেল মুখমণ্ডল। হেমাঙ্গিনী দ্রুত তার আঁচল সামলে দূরে সরে গেল।
কক্ষের ভেতরে অত্যন্ত তটস্থ ভঙ্গিতে প্রবেশ করলেনশোবহান মির্জা। কুর্নিশ জানিয়ে তিনি বললেন,
- বেয়াদবি মার্জনা করবেন হুজুর! তবে পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুতর। রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এক নিদারুণ জটিলতা দেখা দিয়েছে। ব্রিটিশ রেসিডেন্টের পক্ষ হতে এক বিশেষ পরোয়ানা এসেছে। হুজুর সিকান্দার গজনবী আপনাকে অত্যন্ত জরুরি ভিত্তিতে তলব করেছেন। তিনি বৈঠকখানায় আপনার জন্য চরম অস্থিরতায় প্রতীক্ষা করছেন। এক মুহূর্ত বিলম্ব করার অবকাশ নেই হুজুর! বিষয়টির গুরুত্ব অপরিসীম।
তাইমুরের ললাট মুহূর্তেই কুঁচকে গেল। তার দুই চোখের সেই প্রেমের কোমল বহ্নি মুহূর্তেই এক কঠোর যোদ্ধার জিঘাংসায় রূপান্তরিত হলো।
তাইমুর হেমাঙ্গিনীর দিকে একবার গভীর দৃষ্টিতে তাকালেন। স্বাভাবিক গলায় বললেন,
- আপনি আপনার কক্ষেই অবস্থান করুন। বিশ্রাম নিন।
এরপর তাইমুর শোবহান মির্জাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
- চলুন! দেখা যাক ব্রিটিশদের নতুন চাল কী এবং পিতা কেনই বা এত অস্থির হয়ে আছেন!
তাইমুর ঝোড়ো গতিতে কক্ষ হতে বেরিয়ে গেলেন। হেমাঙ্গিনী একা সেই সুউচ্চ ও গম্ভীর কক্ষের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল। সে অনুভব করল, তার জীবনের প্রকৃত সংগ্রাম আজ থেকে শুরু হয়েছে!
৪০০০ লাইক, ৬০০ কমেন্ট সম্পন্ন করে দিবেন।
Share On:
TAGS: আতিয়া আদিবা, নিষিদ্ধ রংমহল
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ১০
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ১
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ২৬
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ১৪
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ৭
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ৪
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ৩
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ৯
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ১৯
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ২