নির্লজ্জ_ভালোবাসা
পর্ব ৬
লেখিকাঃ-#প্রিঁয়ঁসেঁনীঁ
ঘরের বাতাস যেনো ভারি হয়ে গেছে। জানালার পর্দা এলোমেলোভাবে উড়ছে, আর রাতের নিস্তব্ধতা এমন গভীর যে মনে হয়, এই পৃথিবীতে এখন নিঃশ্বাস নিচ্ছে কেবল সময়। সবাই গভীর ঘুমে মগ্ন পুরো খান বাড়ি নিশ্চুপ, কেবল ঘড়ির টিকটিক শব্দটুকু যেনো বাতাস ছেদ করে বেজে চলেছে।কিন্তু সবার চোখে ঘুম থাকলেও রৌদ্রের চোখে নেই। সে রুমের সোফায় বসে আছে, এক পা আরেক পায়ের উপর তুলে, নিঃস্তব্ধ ঘড়ির টিকটিক শব্দ শুনছে মনোযোগ দিয়ে মনে হচ্ছে, কোনো কিছুর অপেক্ষায় আছে সে। তার দৃষ্টি স্থির, ঠোঁটে এক অদ্ভুত শান্ত হাসি যেনো জানে, এখন যা ঘটবে, তা সবকিছু বদলে দেবে।
এদিকে তুরা তার রুমে, হাতে রৌদ্রের দেওয়া গিফ্টের বাক্স। কৌতূহলে ভরা দৃষ্টিতে ধীরে ধীরে বাক্সটা খুললো। আর মুহূর্তেই চোখ কপালে উঠে গেলো। ভিতরে রাখা আছে এক জোড়া অসাধারণ ডায়মন্ডের বালা যা ঘরের আলোয় ঝিলিক দিচ্ছে একদম মুক্তোর মতো। তুরা নিঃশ্বাস আটকে তাকিয়ে রইলো।বালাগুলোর সূক্ষ্ম নকশা, প্রতিটি কোণে আলোর খেলা সবকিছু এত নিখুঁত, এত মারাত্মকভাবে সুন্দর যে তুরা কথা বলার ভাষাই হারিয়ে ফেললো। শুধু মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইলো সেই বালার দিকে, যেনো ওর চোখের দৃষ্টি আর ওখান থেকে সরানোই সম্ভব নয়।
তুরা কাঁপা কাঁপা হাতে বাক্সের ভেতর থেকে সেই বালা দুটি বের করলো। হাতের তালুতে রেখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো তারপর একে একে কব্জিতে পরতে লাগলো। বালা দুটো হাতে পরতেই ঘরের আলো যেনো আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠলো, যেনো সেই ডায়মন্ডের ঝিলিক ছুঁয়ে দিচ্ছে তুরার মুখের হাসিকে। নিজের প্রতিচ্ছবি আয়নায় দেখে তুরা নিঃশব্দে হেসে উঠলো।ও কখনো ভাবেনি, রৌদ্র তাকে এমন দামী উপহার দেবে। মনের ভেতর খুশির ঢেউ একটার পর একটা আছড়ে পড়ছে। সে যেনো খুশিতে আত্তহারা হয়ে গেছে।
কিন্তু ঠিক সেই খুশির মাঝেই তুরার চোখ আবার পড়ে গেলো বাক্সের ভেতরে। ভেতরে আরেকটা জিনিস আছে একটা রুমাল। সাদা রঙের, কিনারায় সোনালী নকশা করা। তুরা অবাক চোখে রুমালটা হাতে নিলো। নরম কাপড়ের ভাঁজ খুলতেই তাতে সূক্ষ্ম অক্ষরে কিছু লেখা চোখে পড়লো।লেখাটা পড়তেই তুরার চোখ কপালে উঠে গেলো।
“পছন্দ হয়ছে, মাই ভবিষ্যৎ রানী? এইসব কিছু তোর জন্যই। ভবিষ্যতে এর থেকেও ভালো দিবো আমার ভিতরে আগুন জ্বালানো চুম্বক পাখি।”
লেখাটা পড়ে তুরার মনে কেমন জানি একটু খটকা লাগলো। বেশ কিছুদিন দরেই দেখছে রৌদ্র তার সাথে অস্বাভাবিক আচরণ করছে, যেগুলো আগে কখনো দেখেনি। তুরা রৌদ্রের সেই আচরণগুলো মজার ছলেই নিতো, কারণ রৌদ্রের চরিত্র পরিবারের কাছে গোপনে হলেও তুরা জানে রৌদ্র কেমন। রৌদ্র যে প্লে বয়, তা তুরার অজানা না শুধু কখনো প্রকাশ করেনি, পরিবারের একজন সদস্য অর্থাৎ ভাইয়া বলে।
তুরা ভাবতো রৌদ্র মেয়েদের সাথে নাটক করতে করতে এখন সেই নাটকগুলো তার সাথেও করছে, হয়তো শুধু মজা করে দুষ্টুমি। কিন্তু যতই সময় যাচ্ছে, ততই রৌদ্রের আচরণ আরও অস্বাভাবিক হয়ে উঠছে।
মনে মনে এসব ভেবে তুরার মনটা হঠাৎ উল্টে গেলো,নিজেকে নিজেই ধমকের স্বরে বলল।
“আমি এসব কি ভাবছি ছিহ্! ভাইয়া হয়তো প্লে বয় হতে পারে, তাই বলে সে আমার সাথে সেরকম কিছু করবে? আমি তো ভাইয়ার বোন, তার পরিবারের একজন সদস্য! আমাকে কেনো ওই চোখে দেখবে? তুরা, তুই ও না মাথা ঠিক কর। কালকে তুই শিহাবের বউ হতে যাচ্ছিস, আর তুই ভাবছিস অন্য বেডাকে নিয়ে তবা তবা তবা।”
তুরা নিজেকে নিজেই বকে বকে শান্ত হলো। বোকা তুরা বুকে ভেতর যা ভাবছে সেটা পুরোপুরি বুজলো না, মনে হলো যেনো ওবুজের মতো রয়ে গেছে। তারপর ধীরে ধীরে রুমালটার চারপাশ ঘুরিয়ে দেখতে লাগলো। চোখ শুধু রুমালের দিকে অনেক সুন্দর রুমালটা, যা তুরার খুব পছন্দ হয়েছে। মনে মনে বলল রৌদ্র ভাইয়ার সত্যিই পছন্দ আছে বলতে হবে।
হঠাৎ তুরার মনে পড়ে গেলো রৌদ্র ছাদে বলেছিলো রুমালটার ঘ্রাণ নিবি, দেখবি পাগল হয়ে যাবি।রৌদ্রের কথা মনে পড়তেই তুরা আর দেরি করলো না। সঙ্গে সঙ্গে রুমালটা নাকের কাছে নিয়ে বড় একটা নিশ্বাস নিলো। ঘ্রাণ নেওয়ার সাথে সাথে বুজতে পারলো সত্যিই অসাধারণ, সুন্দর একটা ঘ্রাণ, যা তার কাছে একদম প্রিয় হয়ে গেলো। তুরা আরেকবার ঘ্রাণ নিলো, এবার আরও মনোযোগ দিয়ে।
যতোই তুরা ঘ্রাণ নিচ্ছে, ততোই তার ইচ্ছে আরও বেড়ে যাচ্ছে আরো নিতে। আরো অনুভব করতে, অনেকক্ষণ এমন করার পর তুরার মাথা হঠাৎ কেমন জানি চক্কর খেতে লাগলো। শরীরের সব কিছু কেমন জানি মাতাল লাগছে, মনে হচ্ছে পুরোটা পাগল পাগল, একদম নেশার মতো অনুভূতি ভর করছে প্রতিটি কোণে।সব কিছু কেমন জানি দুইটা দুইটা করে দেখছে তুরা। হাতে থাকা রুমালের দিকে তাকিয়ে দেখে দুইটা রুমাল! চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে হা হি হি করে হাসতে হাসতে বলল,
“হি হি হা হা! জাদু জাদু! কিছুখন আগে তো এখানে একটা রুমাল ছিলো, আর এখন দুইটা! কোথা থেকে আসলো হো হো! জাদু নিশ্চয়ই রুমালটা জাদু জানে!”
তুরা মুহূর্তেই পাগলের মতো আচরণ শুরু করলো। দাঁড়াতে গেলে মাথা ঘুরে পড়ে যেতে নেই সাথে সাথে টেবিলে দরে ফেলে নিজেকে সামলালো। তারপর পাগলের মতো হেসে হেসে বলল,
“হা হা হা! রৌদ্র ভাইয়া আমাকে কি দিলো রেএএএ ! ঘ্রাণ নেওয়ার সাথে সাথে তো আমার কেমন জানি পাগল পাগল লাগছে, মাথা ঘুরাচ্ছে, নাঁচতে ইচ্ছে করছে! হা হা হু হু লে লে হাহহা।”
তুরা আয়নার সামনে গিয়ে নিজেকে দেখে হো হো করে হাসতে হাসতে চুলগুলো মাথার চারপাশে ঘুরাতে ঘুরাতে বলল,
“লে পাগলু! ডান্স, ডান্স, ডান্স!”
তুরা যেনো কোনো নেশার জগতে প্রবেশ করেছে। নিজের হুশ হারিয়ে পাগলের মতো নাঁচতে লাগলো। হঠাৎ নাঁচতে নাঁচতে আয়নাতে দেখলো রৌদ্র দাঁড়িয়ে আছে, পিছনে। তুরা এটাকেও জাদুর মতো মনে করলো।
রৌদ্রের দিকে ঘুরে তুরা এগিয়ে গেলো, চারপাশ ঘুরতে ঘুরতে বলল।
“এহ হে! রৌদ্র ভাইয়া আমাকে কি দিলো রে! প্রথমে রৌদ্রের জিনিসের পাওয়ার, তারপর সেই পাওয়ারে রৌদ্র ভাইয়াকেও আমার রুমে নিয়ে এসে পড়লো! হা হা, কি মজা!”
রৌদ্র তুরার পাগলামি দেখে বাঁকা হাসলো।তার মানে, তার পরিকল্পনা কাজ করেছে। রৌদ্রের ভাবনার মাজেই তুরা এগিয়ে এসে রৌদ্রের কাছে এসে গলা জড়িয়ে ধরে বলল,
“আচ্ছা জাদু ভাই, আমার এমন কেনো লাগছে?”
রৌদ্র ফিসফিস করে বলল,
“কেমন লাগছে?”
তুরা উদ্দীপনায় ছলছল চোখে উত্তর দিল,
” কেমন জানি, পাগল পাগল লাগছে নিজেকে! মাথা ঘুরাচ্ছে, নাচতে ইচ্ছে করছে… ইচ্ছেমতো আমার সাথে নাচেন প্লিজ! আমার খুব নাচতে ইচ্ছে করছে।”
কথাটা বলেই তুরা রৌদ্রের দুই হাত ধরে রৌদ্রকে নিয়ে নাচতে লাগলো। রৌদ্রও কম্প্রেশনে তার সাথে তাল মিলিয়ে দিলো। দুজনেই এখন যেনো এক ধরনের ব্যাঙের রূপে পরিণত হয়েছে উচ্চ লাফ, একসাথে ছন্দে দোল।নাচের মাঝেই রৌদ্র ঘড়ির দিকে তাকালো, রাতের সময় দেখে হাঁপাতে হাঁপাতে তুরাকে বলল,
“তুরা, আয়! মলে যাই ওইখানে আরও অনেকে আছে। আমাদের সাথে নাচবে, আরও মজা হবে!”
তুরা খুশির ঝিলিকে চোখে আটকে ধরে বলল,
“সত্যিইইই?”
“হুম, চল।”
তুরা সাথে সাথে বলল,
“ওকে, চলেন! আমি যাবো, আমি খুব নাচবো।”
কথাটা বলেই তুরা ধরজার দিকে এগোলো। কিন্তু ধরজার কাছে এসে হঠাৎ থেমে গেলো, যেনো কোনো ঝটকা লেগে গেছে। রৌদ্রের দিকে তাকিয়ে বলল,
” আচ্ছা, আমি তো রুমের ধরজা বন্ধ করে রেখেছি। আপনি কিভাবে আমার রুমে এলেন?”
রৌদ্র তুরার কাছে এসে চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“কেনো মনে নেই? তুই তো বললি জাদু’। তাহলে তো আমি নিজে থেকে আসিনি, আমাকে নিয়ে এসেছে জাদু! দেখ, কেমন জাদু আমি ধরজা না খুলেই হাওয়ার মতো এসে পড়লাম।”
তুরা সঙ্গে সঙ্গেই হেসে ফেললো,
“হু হু! হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে পড়েছে, জাদু জাদু!”
কথাটা বলেই তুরা রুমের দরজা খুলে বের হলো। পিছন পিছন রৌদ্রও বের হলো। হঠাৎ রৌদ্র দৌড়ে এসে তুরার মুখ চেপে ধরে বলল,
“হুশশশ! আস্তে, শব্দ করবি না, নাহলে মানুষ জেগে যাবে। তখন আমাদের কে যেতে দেবে না, আর আমরা নাচতেও পারবো না।”
তুরা সঙ্গে সঙ্গেই মুখে আঙুল দিয়ে মাথা নাড়ালো। রৌদ্র তুরার এক হাত ধরে চুপি চুপি তুরাকে নিয়ে বেরিয়ে গেলো। তুরাও বাচ্চার মতো শান্ত, আনন্দমুখী হয়ে রৌদ্রের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাইরে বের হয়ে গেলো।
রাতের শেষ প্রহর। চারদিক নিস্তব্ধ, শুধু গাড়ির ইঞ্জিনের মৃদু শব্দ বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে। রৌদ্র গাড়ি চালাচ্ছে, আর তুরা তার কাঁধে মাথা রেখে বাচ্চাদের মতো ঘুমিয়ে আছে একটা শান্ত, গভীর ঘুম, যেনো কোনো নেশায় ডুবে আছে সে। চুলের কিছু গোছা মুখে এসে পড়েছে, নিশ্বাসের ছন্দে দুলছে আঁলতো করে।রৌদ্র একবার তুরার দিকে তাকালো মুখে নিস্পাপ শান্তি, চোখে নিঃশব্দ স্বপ্নের ছায়া। ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠলো রৌদ্রের। নিচু গলায় নিজের সঙ্গে নিজেই বলল,
“জানি না তুরা, যখন তুই জেগে যাবি,তখন তোর রিয়াকশন কেমন হবে তবে আমি তোর রিয়াকশনে যাই ধরি না। কারণ আমার তোকে লাগবে শুধু তোকেই। পৃথিবী যদি ধ্বংসও হয়েও যায়, তবু আমি তোকে ছাড়বো না, তুরা শুধু আমার!শুধুই আমার।”
শয়তান বেডা রৌদ্র তুরাকে নিয়ে ঠিকই চলে গেলো। আর এখন সময় খান বাড়ির দিকে ফিরে যাওয়ার। রাত পেরিয়ে ভোরের আলো ফুটেছে, কিন্তু সেই আলো যেনো খান বাড়ির উঠোনে পৌঁছাতেই চাইছে না। সকালের হালকা হাওয়া, পাখির ডাক, কুয়াশা সব কিছুই যেনো অস্বস্তিকর নীরবতায় ঢেকে গেছে। ঘরের ভেতর এখনো সবাই ঘুমে, কেউ জানে না তাদের বাড়িতে কি ঝড় বয়ে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই এই শান্ত সকাল ভেঙে যাবে, শুরু হবে কান্না, চিৎকার, আর হাহাকারের এক ভিন্ন সকাল চল এখন দেখি খান বাড়ির ভেতর কি অবস্থা। আর সবাইকে একটা কথা বলি যে পড়ছেন ভালো করে শুনেন যদি আমার গল্প আপনার পছন্দ হয় তাহলে আমার পেইজ প্রিঁয়ঁসেঁনীঁ পেইজে ফলো করে রাখবেন আমি টাইমটু টাইম গল্প দেই,এখন শুরু করা যাক।
খান বাড়ির উঠোনে তখন সকালবেলার রোদটা হালকা সোনালি হয়ে মাটিতে পড়ে আছে, আর তার মধ্যে ধুলোর সাথে মিশে ঘুরে বেড়াচ্ছে ফুলের গন্ধ। রান্নাঘর থেকে একটার পর একটা মশলার ঝাঁজ আর ভাজা-পোড়ার গন্ধে চারপাশ ভরে উঠেছে। গেট থেকে শুরু করে বারান্দা পর্যন্ত রঙিন ফুলের মালা আর ঝালরে সাজানো কোথাও গোলাপ, কোথাও গাঁদা, কোথাও ঝিলিমিলি বাতি।আঙিনায় ছোট ছোট বাচ্চারা এদিক ওদিক দৌড়াচ্ছে, কেউ গ্লাসে দুধ খেয়ে রেখে ভুলে গেছে, কেউ আবার ফিতার টানে মেতে আছে। মেয়েরা চুলে ফুল গুঁজছে, কানের দুল ঠিক করছে, আর একে অপরকে দেখিয়ে বলছে দেখ, আমার শাড়িটা কেমন লাগছে?মাইক্রোফোনে হালকা সুর বাজছে সেই পুরোনো বিয়ের গান। বড়রা বসে বিয়ের কাজের তালিকা মিলাচ্ছে, কারো মুখে চাপা উৎকণ্ঠা ফটোগ্রাফার এসেছে তো? কেউ আবার হাসতে হাসতে বলছে এই যে, বর পক্ষের ফোনটা ধর কেউ, রওনা দিছে কিনা দেখি।পুরো খান বাড়ি যেনো এক উৎসবের মঞ্চ আলো, হাসি, শব্দ আর ব্যস্ততায় মিশে আছে আনন্দের সুর। কিন্তু এই আনন্দের ভেতরেই কোথাও যেনো একটা অদ্ভুত নীরবতা লুকিয়ে আছে, কেউ জানে না এই সকালটা ঠিক কেমন পরিণতি বয়ে আনবে।
মহিলারা সবাই নিজেদের কাজে ডুবে আছে রান্না, সাজসজ্জা, বাচ্চাদের দেখাশোনা সবকিছুতেই যেনো এক উন্মাদনা। কিন্তু এই ব্যস্ততার মাজেই রৌশনী খানের মনে একটা অস্বস্তি ধীরে ধীরে জায়গা নিচ্ছে। যতবার চারদিকে চোখ ঘোরাচ্ছে, কোথাও তুরাকে দেখা যাচ্ছে না। ভাবল হয়তো এখনো ঘুমাচ্ছে, কিন্তু সময় তো অনেক হয়ে গেছে। মুখে একটু চিন্তার রেখা নিয়ে সে বলল,
“তুরা এখনো ঘুম থেকে উঠেনি নাকি?”
এই ভেবে রৌশনী খান তুরার রুমের দিকে যাচ্ছে ঠিক তখনই তিথির আতঙ্কিত চিৎকার কানে এলো।তিথি দৌড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
“তুরা আপু রুমে নেই! কোথাও নেই! রুমের ওয়াশরুম, বারান্দা, সব জায়গা দেখেছি তুরা আপু নেই! আর রুমের দরজাটাও বাহির থেকে লাগানো ছিল, ভিতর থেকে না!”
রৌশনী খান এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেলেন। তার মুখের রঙ ফ্যাকাসে হয়ে গেলো, চোখের ভেতর এক অদ্ভুত আতঙ্কের ছায়া নেমে এলো। চারপাশের কাজ থেমে গেলো সবাই তিথির দিকে তাকিয়ে রইলো। বিয়ের ঘরের কোলাহলের মধ্যে হঠাৎ করেই যেনো একটা ভারী নিস্তব্ধতা নেমে এলো, যেনো কেউ অদৃশ্যভাবে পুরো আনন্দটা থামিয়ে দিয়েছে।
আয়ান প্রথমে তিথির কথায় বিশ্বাস করতে পারছিলো না। এত সকালে, বিয়ের ঘরে এত মানুষ, আর তুরা রুমে নেই এটা যেন অসম্ভব শোনাচ্ছে। আয়ান দ্রুত এগিয়ে গিয়ে বলল,
“তুই কি বলছিস এসব, তিথি? তুরা রুমে থাকবে না মানে কী? হয়তো বাড়িতেই আছে, আশেপাশে কারও রুমে গিয়েছে।”
আয়ানের কথাটা শেষ হওয়ার আগেই পিছন দিক থেকে এক পরিচিত, কিন্তু ভয়ে কাঁপা কণ্ঠ শোনা গেলো আরিশার।
” নাই আমি পুরো বাড়ি দেখেছি তুরা কোথাও নেই আর আর আর…!
আরিশার কণ্ঠ যেনো ক্রমে ভারী হয়ে আসছে কথা বলতে গিয়ে গলা আটকে যাচ্ছে। সবাই এখন তার দিকে তাকিয়ে আছে। রৌশনী খানও নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে আছেন। হঠাৎ আরিশা কেঁপে উঠলো, থেমে গেলো এক মুহূর্ত, তারপর নিচু গলায় বলল,
“আর… আর… রৌদ্র ভাইয়াও কোথাও নেই।”
মুহূর্তে খান বাড়ির বিয়ের সকালে সব শব্দ যেনো থেমে গেলো। হাঁসির শব্দ, রান্নার আওয়াজ, গান সব নিস্তব্ধ। কারও মুখে কোনো কথা নেই, শুধু বিস্ময় আর ভয় মিশে থাকা নিঃশব্দ চোখগুলো একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে এই নিখোঁজ হওয়ার খবরটা যেনো পুরো বাড়ির বুকের ভেতর এক ঝড় তুলে দিয়েছে।
আনোয়ার খান খবরটা শুনেই একদম নিথর হয়ে গেলেন।ধব্বাস করে সোফায় বসে পড়লেন তিনি। মুখটা ফ্যাকাশে, চোখে অবিশ্বাস আর দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কেউ কিছু বলার আগেই আশিক খানও মাথায় দুই হাত দিয়ে ধীরে ধীরে নিচু হয়ে বসলেন। মনে হচ্ছে, যেনো পৃথিবীটা এক মুহূর্তে তার পায়ের নিচ থেকে সরে গেছে।
সবার আর বুজতে বাকি রইলো না রৌদ্রই যে তুরাকে নিয়ে গেছে। কিন্তু ঘরের বাতাসে এখনো একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, রৌদ্র কেন তুরাকে নিয়ে গেলো? রৌদ্রের সাথে তুরার এমন কী সম্পর্ক, যে এত বড় একটা কাজ সে করতে পারলো?
মুহূর্তের মধ্যেই গান, হাসি, আড্ডা সব বন্ধ হয়ে গেলো। খান বাড়ি একেবারে মরুভূমির মতো নিস্তব্ধ হয়ে উঠলো। প্রতিটি কোণে যেনো এক অদ্ভুত চাপ নেমে এসেছে।তনুজা খান শাড়ির আঁচল চেপে চেপে কান্না আটকানোর চেষ্টা করছে, চোখের কোণ দিয়ে পানি গড়িয়ে যাচ্ছে। পুরুষরা মাথায় হাত দিয়ে নিচু হয়ে বসে আছে, যেনো মনে হচ্ছে, সবাই গভীরভাবে ভাবছে এবার শিহাবদের কি জবাব দিবে?ঘরের পরিবেশ একেবারে ভারী, প্রত্যেকের মুখে উদ্বেগ আর চিন্তার ছাপ, বাতাসে অদৃশ্য এক অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে।
তাজা ফুলের গন্ধে ভরা ঘরটা আজ যেনো অন্যরকম লাগে শিহাবের কাছে। চারদিকে রঙিন ফুলের মালা ঝলমল করছে। তার চোখে এখন শুধু একটাই ছবি তুরা। আজ তার বিয়ে, তারই পছন্দের মানুষের সঙ্গে। আজ থেকে এই ঘরেই থাকবে তুরা, তার পাশে, তার জীবনসঙ্গী হয়ে।
ভাবতেই শিহাবের ঠোঁটে মিষ্টি একটা হাসি খেলে গেলো। লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেললো, যেনো সে নিজেই নিজের কল্পনায় হারিয়ে গেছে। তারপর ধীরে ধীরে পকেট থেকে ফোন বের করলো, স্ক্রিনে খুললো তুরার এক হাসিমাখা ছবি যেটা সে গোপনে তুলেছিলো একদিন, তুরার অজান্তে।
তুরার মুখের দিকে তাকিয়ে শিহাবের চোখ ভিজে উঠলো ভালোবাসায় তারপর মৃদু কণ্ঠে বলল।
“আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা, তুরা। তারপর তুমি আমার হয়ে যাবে। আমরা একসাথে হবো, চিরদিনের জন্য। আমি কখনো ভাবিনি তোমাকে পাবো, তুরা। বিশ্বাস করো, তুমি শুধু আমার পছন্দ না তুমি আমার ভালোবাসা। এই কথাটা তোমাকে আজ রাতেই বলবো আমি তোমাকে ভালোবা……..!
বাকিটুক আর বলতে পারলো না শিহাব। হঠাৎ কানের পাশে এমন এক খবর এসে আঘাত করলো যা তার গোটা পৃথিবী কাঁপিয়ে দিলো। যেনো মুহূর্তেই সব আলো নিভে গেলো, চারপাশটা অন্ধকার হয়ে গেলো। বুকের ভেতর কিছু একটা ছিঁড়ে গেলো ভেতরটা ধুম করে মুচড়ে উঠলো কষ্টে। হাত থেকে ফোনটা ফসকে পড়ে গেলো মেঝেতে, তুরার হাসিমাখা মুখটা স্ক্রিনে থেমে রইলো, কিন্তু শিহাবের চোখে এখন ঝাপসা হয়ে গেছে সব।
(আর লিখতে পারবো না অনেক বড় করে দিছি এই পর্ব টা হাত ব্যাথা করছে। আর যাই হোক আমার শিহাবের জন্য কষ্ট হচ্ছে বেচারি কি শর্ট টাই না খায়লো 🥹🥹)
চলবে….!
~~
আসসালামু আলাইকুম প্রিয় পাঠক মহল যদি কোনো বানান ভুল হয় তাহলে অবশ্যই আমাকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। আর আজকের পর্ব কেমন হলো তা কিন্তু অবশ্যই জানাবেন ধন্যবাদ সবাইকে…!😊
Share On:
TAGS: নির্লজ্জ ভালোবাসা, প্রিঁয়ঁসেঁনীঁ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২৪
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৩০
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১৪,১৫
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৯
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১৭
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২৯
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১০
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২০
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১৮