নির্লজ্জ_ভালোবাসা
লেখিকাসুমিচোধুরী
পর্ব ২৪ (❌কপি করা নিষিদ্ধ ❌)
পাগলের মতো ঘর আসা-যাওয়া করছে তুরা। কিন্তু পরার মতো কিছু পাচ্ছে না। পাবেই বা কিভাবে? এইটা একটা পুরুষের রুম। কোনো মেয়ের রুম না যে পরার মতো কিছু পাবে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর তুরা একটা ড্রয়ার খুলল। সেখানে অনেকগুলো প্যান্ট দেখতে পেল। তুরা নিজেকে ঢাকার জন্য সেখান থেকে একটা নেভি ব্লু রঙের প্যান্ট বের করে পরে নিল।কিন্তু পরেও হলো না! প্যান্টের বেল্ট লাগাতে পারছে না। অনেকক্ষণ চেষ্টা করে কোনো রকমভাবে লাগাল। তারপর হাঁপিয়ে উঠে বিছানায় ধুপ করে শুয়ে পড়ল। আর বড় বড় শ্বাস নিতে লাগল।
অনেকক্ষণ শ্বাস নিয়ে তুরা বেড থেকে উঠে আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল। আর নিজের প্রতিচ্ছবি আয়নাতে দেখে তার চোখ আস্তে আস্তে বড় বড় হয়ে গেল। এই প্রথম তুরা প্যান্ট-শার্ট পরেছে। তুরা আয়নার দিকে তাকিয়ে খুশিতে হাসতে হাসতে বলল।
“হিহিহি! আমি মিস্টার আব্রাহাম রৌদ্র খান হয়ে গেছি!”
তুরা হাসতে থাকল। হাসতে হাসতে যেন শহিদ হয়ে মরে যাবে। হঠাৎ তুরার হাসতে হাসতে চোখ গেল আয়নার সামনে টেবিলে রাখা স্মার্ট ওয়াচ আর সানগ্লাসের দিকে। তুরা কী মনে করে তাড়াতাড়ি করে সেই ওয়াচ আর সানগ্লাসটা পরে নিল। তারপর শার্টের হাতা কোনো রকম করে ভাঁজ করে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একদম রৌদ্রের স্টাইলের মতো কপি করে দাঁড়াল। গলা খাক্কারি দিয়ে রৌদ্রের মতো কঠোর স্বরে বলতে লাগল।
“এই শোন তুরা! তুই আমার জন্য এতদূর এসেছিস? তোর ভালোবাসা এতটা গভীর! আমি অবাক হচ্ছি! তোর ভালোবাসা পৃথিবীর সবথেকে বেস্ট!”
কথা বলেই তুরা রৌদ্রের স্টাইলে হেঁটে হেঁটে রুম থেকে বের হলো।রুম থেকে বেরিয়ে তুরা যে দৃশ্য দেখল, তাতে মুহূর্তের জন্য তার শ্বাস বন্ধ হয়ে গেল। সে যেন পৃথিবী ছেড়ে স্বর্গের কোনো উদ্যানে পা রেখেছে।চারিদিকে আলো ঝলমল করছে। স্নিগ্ধ, নির্মল বাতাস ভেসে আসছে। সামনেই রয়েছে বিশাল কাঁচের জানালা ভেদ করে দেখা যাওয়া একটি বিশাল সুইমিংপুল। পুলের নীল জল আলো প্রতিফলিত হয়ে যেন হীরা খচিত হয়ে আছে। পুলের ঠিক পাশে সাদা পাথরের চিকন পথ চলে গেছে নানা রঙের ফুলের বাগানের দিকে।
সেই বাগানটি যেন কোনো চিত্রকরের তুলি থেকে উঠে এসেছে। সূর্যমুখী, গোলাপ, টিউলিপ অসংখ্য অচেনা বিদেশি ফুলে চারপাশ সুগন্ধীময় হয়ে আছে। ফুলের মাঝে মাঝে যত্ন করে ছাঁটা সবুজ ঘাস গালিচার মতো বিছানো। বাগান ছাড়িয়ে চোখ গেলে দেখা যায়, পিছনে আল্পস পর্বতমালার বরফে ঢাকা ধূসর চূড়াগুলি রাতের আকাশ ছুঁয়ে আছে।
বাগান ও সুইমিংপুলের এক কোণে রয়েছে কাঠের তৈরি একটি ছোট সেতু। তার নিচে দিয়ে কৃত্রিম ঝর্ণার জল মৃদু শব্দে বইছে, যা এক শান্তিদায়ক সুর তৈরি করছে। সেই শব্দে মনের ভেতরের সব অস্থিরতা যেন দূর হয়ে যায়।
রৌদ্রের রুচি ও ঐশ্বর্য এই বাড়ির প্রতিটি কোণে যেন কথা বলছে। তুরা এক মুগ্ধ চাহনি নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল, ভুলে গেল যে সে এখন পুরুষের পোশাক পরে আছে। এই অসাধারণ সৌন্দর্য তার মনে নতুন করে আশা ও স্বপ্ন জাগিয়ে তুলল।তুরা কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। রৌদ্র এত সুন্দর জায়গাতে থাকে! যেটা স্বপ্নেও ভাবতে অবাক লাগবে। তুরা সামনেই সিঁড়ি দেখতে পেল। তুরা আস্তে আস্তে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে এসে ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে নামল।তুরা চারদিকে তাকিয়ে তাকাল। কিন্তু রৌদ্রকে কোথাও দেখতে পেল না। তুরা ভাবল রৌদ্র আবার কোথায় গেল?
তুরার ভাবনার মাঝেই সুইমিংপুল থেকে ‘ঝপাস’ করে শব্দ হলো। তুরা আচমকা এমন শব্দে চমকে উঠে ভয়ে দুই হাত দিয়ে চোখ বন্ধ করে চিৎকার মারল।পানির তল থেকে বেরিয়ে এল আব্রাহাম রৌদ্র খান! যে একটু আগে তুরাকে দেখে নিজেকে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছিল। বাইরে এসেও কেমন অস্থির লাগছিল। তাই এক প্রকার শার্ট খুলে ছুড়ে মেরে ঝাঁপ দিয়ে সুইমিংপুলে নেমেছিল।
তুরার চিৎকারে গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডরা দৌড়ে এল। তারা রৌদ্রকে পানিতে না দেখেই সামনে রৌদ্রের পোশাক পরা, সানগ্লাস স্মার্টওয়াচ পরা তুরাকে দেখে তাকেই রৌদ্র ভেবে বলল।
“Herr, Herr! Gibt es ein Problem?”
বাংলা অনুবাদ_ “স্যার, স্যার! কোনো সমস্যা?”
পরক্ষণেই গার্ডদের চোখ গেল তুরার লম্বা চুলের দিকে। গার্ডরা ভাবল তাদের স্যারের আবার এত বড় চুল কবে হলো? তারা হতভম্ব হয়ে তুরার (যাকে তারা স্যার ভাবছে। উদ্দেশ্যে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল।
“H-H-Herr, wann sind Ihre Haare so lang geworden?”
বাংলা অনুবাদ_”স্যা… স্যা… স্যার! আপনার চুল কবে এত হলো?।”
আরেকজন গার্ড ভয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে সামনের দিকে তুরাকে ভালোভাবে দেখে বলল।
“Mann! Das ist nicht unser Herr! Das ist ein Geist!”
বাংলা অনুবাদ_আরে শা’লা! এইটা আমাদের স্যার না! এইটা ভূত!”
কথাটা শুনে একজন গার্ড।
“কীহহহহহহ!”
গার্ডটা চিৎকার দিয়ে ভয়ে প্যান্টেই হিসু করে দিল! মুহূর্তের মধ্যে রৌদ্রের বিলাসবহুল সুইজারল্যান্ডের বাড়িটা যেন এক ভূতের বাড়িতে পরিণত হলো।গার্ডের চিৎকারে রৌদ্র সুইমিংপুল থেকে চোখ তুলে সামনের দিকে তাকাল। তুরার চিৎকার শুনতে না পারলেও গার্ডদের চিৎকার রৌদ্র স্পষ্ট শুনতে পেল। রৌদ্রের হঠাৎ চোখ গেল তুরার দিকে, যে তখনো দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে আছে।রৌদ্র সুইমিংপুল থেকে উঠতে নিবে, তার আগেই সব গার্ড দৌড়ে ভয়ে ঝাঁপ দিল সুইমিংপুলে! গার্ডরা রৌদ্রকে সুইমিংপুলে দেখে হতভম্ব । একজন গার্ড কাঁপতে কাঁপতে রৌদ্রের উদ্দেশ্যে বলল।
“S-S-Herr! Sie sind hier! Wer ist das dann dort?”
বাংলা অনুবাদ _”স্যা… স্যার! আপনি এখানে! তাহলে ওইখানে ওইটা কে?”
রৌদ্র গার্ডদের উদেশ্য দাঁতে দাঁত চেপে বলল।
“Das bin nicht ich! Das ist mein Herzschlag!”
বাংলা অনুবাদ_ ওইটা আমি না! ওইটা আমার হার্টবিট!”
কথাটা বলেই রৌদ্র সুইমিংপুলের গ্রিল ধরে এক লাফে উঠে পড়ল। সে তুরার সামনে এসে পা থেকে মাথা পর্যন্ত ভালো করে পর্যবেক্ষণ করল। তুরাকে দেখে রৌদ্রের হাসি পাচ্ছে শার্ট ভাঁজ করা আছে, প্যান্টটাও ঠিকমতো পরতে পারেনি।রৌদ্র মুখ চেপে এসে তুরার উদ্দেশ্যে রসিকতা নিয়ে বলল।
“ওরে ভীতুর শা’লী! এখন হাত নামা! সবগুলাই ভীতুর ডিম!”
রৌদ্রের ডাকেও তুরার কোনো সাড়া নেই । রৌদ্র তুরাকে হাত সরাতে না দেখে আবার একটু জোরেই উদ্বেগ স্বরে ডাক দিল।
“তুরা! তুই ঠিক আছিস তো?”
কথাটা বলেই রৌদ্র তুরার শরীর হালকা ঝাঁকিয়ে দিল। আর তুরা আচমকা হুঁশ থেকে ফিরে এল।
“হ্যাঁ! হ্যাঁ! ভূত! ভূত! ভূত মামা!”
কথাটা বলেই তুরা ভয়ে রৌদ্রকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তুরা ভয়ে নিজের হুঁশ হারিয়ে বরফের মতো দাঁড়িয়ে ছিল। যেন তার মনোযোগ এইখানে ছিল না, অন্য কোথাও ছিল। রৌদ্রের ঝাঁকিতে তুরার হুঁশ ফিরল আর ভয়ে সে রৌদ্রকে জড়িয়ে ধরল।তুরার স্পর্শে রৌদ্রের হৃদপিণ্ড কেঁপে উঠল। তার শরীরে অদ্ভুত শিহরণ বয়ে যাচ্ছে। রৌদ্রের ভিজা চুলের পানি তুরার শরীরে পড়ে শার্ট ভিজে যাচ্ছে। আর তুরা বারবার কেঁপে উঠছে। সেই ভেজা উষ্ণতা অনুভব করতেই রৌদ্রের ঘোর লাগছে।আচমকা রৌদ্র দাঁত চেপে নিজেকে সামলিয়ে নিল। সে তুরাকে পাজা কোলে তুলে নিয়ে উত্তেজনা স্বরে বলল।
“দাঁড়া! তুই আমাকে কন্ট্রো’লেস করতে চাস, তাই না? দেখাচ্ছি মজা তোকে আমি!”
কথাটা বলেই রৌদ্র তুরাকে কোলে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে রুমে এসে পড়ল। রৌদ্রের এরকম কাজে তুরা হতভম্ব । রৌদ্র তুরাকে বিছানায় এনে শুইয়ে দিল। এরপর নিজের পরনে থাকা প্যান্টের বেল্ট খুলে তুরার দুই হাত বিছানার মাঝখানে বেঁধে দিল। তুরা বুঝতে পারছে না, রৌদ্র এমন করছে কেন? কোনো খারাপ কিছু করবে নাকি? ভাবতেই তুরার রূহ কেঁপে উঠল। ভয়ে সে বড় বড় ঢোক গিলতে লাগল। কিন্তু তুরাকে অবাক করে দিয়ে রৌদ্র তোয়ালে কাঁধে নিয়ে তুরার উদ্দেশ্যে বলল।
“আর একটু ও সাউন্ড না করে চুপচাপ ঘুমাবি! আমি ফ্রেশ হয়ে এসে অন্য রুমে যাচ্ছি।”
কথাটা বলেই রৌদ্র টি-শার্ট ও ট্রাউজার নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। আর তুরা স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে শুরু করল। শুধু শুধু রৌদ্রকে ভুল বুঝেছে এসব ভাবতেই তুরা নিজের জিভে নিজেই কামড় দিল।বেশ কিছুক্ষণ পর রৌদ্র ফ্রেশ হয়ে বের হলো। তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে সে দেখল, তুরা এখনো চোখ বড় বড় করে চেয়ে আছে। অনিদ্রার রেশ যেন তার চোখে স্পষ্ট।রৌদ্রে শান্ত কণ্ঠে তুরার দিকে তাকিয়ে বলল।
“তুই এখনো ঘুমাসনি?”
রৌদ্রের কন্ঠ শুনে তুরা রৌদ্রের দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলল।
“না! হ্যাঁ! ভাইয়া ঘুমাচ্ছি! এই যে?”
কথাটা বলেই তুরা তাড়াতাড়ি চোখ বন্ধ করল।রৌদ্র দীর্ঘশ্বাস ফেলে তোয়ালে রেখে রুম থেকে ধীরে ধীরে যেতে নিবে, তার আগেই তুরা চটজলদি এক চোখ খুলে রৌদ্রকে যেতে দেখে সামান্য ভয় মেশানো চিৎকার দিয়ে বলল।
“রৌদ্র ভাইইইয়া! আপনি কোথায় যাচ্ছেন?”
তুরার আকুল ভীতু কণ্ঠস্বরে রৌদ্রের পা থমকে গেল। সে দীর্ঘশ্বাস চেপে চোখ-মুখ শক্ত করে একপ্রকার বিরক্তি নিয়ে তুরার দিকে তাকিয়ে তির্যক স্বরে বলল।
“কোথায় যাচ্ছি? নৃত্য করতে যাচ্ছি! যাবি আমার সাথে?”
রৌদ্রের এমন তেতো কথা শুনে তুরার মুখ চুপসে গেল। সে মন খারাপ করে ফেলল।তুরার মুখের বিষণ্ণ অবস্থা দেখে রৌদ্র গাল ফুলিয়ে শ্বাস নিয়ে,বিরক্তি দমন করে নরম স্বরে বলল।
“আমি অন্য রুমে যাচ্ছি! তুই ঘুমা। এখানে কেউ আসবে না।”
তুরা মাথা নিচু করে ভীতু অনুরোধ স্বরে বলল।
“আমার ভয় করছে এখানে! অন্য দেশ তো, তাই কেমন জানি লাগছে । প্লিজ, আপনি যাবেন না।”
রৌদ্র তুরার কথা শুনে চিন্তিত হয়ে পড়ল। এই তুরা আসলে এসেছে কিসের জন্য?ওকে জ্বালাইতে নাকি অন্য কোনো কারণ আছে? এসব চিন্তা রৌদ্রের মাথায় ঘুরতে লাগল। সে অস্বস্তি ও যুক্তির স্বর মিশিয়ে বলল।
“তুরা, দেখ! একটা ছেলে আর একটা মেয়ে একই রুমে থাকতে পারে না। আর যারা থাকে, তারা স্বামী-স্ত্রী। আমরা কিন্তু স্বামী-স্ত্রী নই!তাহলে আমাদের থাকা ঠিক হবে না। তাছাড়াও, তুইও আমার সম্পর্কে জানিস। আমি থাকলে তোর মনে ভয় থাকতে পারে। এসব যদি আমি তোকে উল্টা-পাল্টা কিছু…।
বাকিটুকু বলতে না দিয়েই তুরা তাড়াতাড়ি ঝড়ের গতিতে, দৃঢ় প্রত্যয়ের স্বরে বলে ফেলল।
“আমার বিশ্বাস আছে আপনার উপর! আপনি কোনো খারাপ কিছু করবেন না।আগের সেই রৌদ্র ভাইয়া আর এখনকার রৌদ্রের অনেক পার্থক্য।”
তুরার অটল বিশ্বাস দেখে রৌদ্র এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। যেই তুরা তাকে একদিন খারাপ বলে দাবি করেছিল, আজ সেই তুরা তাকে এই কথা বলছে! রৌদ্র যেন সম্পূর্ণ নতুন এক তুরাকে দেখছে। রৌদ্রের অবিশ্বাস ও মুগ্ধতা তার চোখে। রৌদ্রকে এইভাবে স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে তুরা ছলছল চোখে, নরম ও জিজ্ঞাসা ভরা স্বরে রৌদ্রের দিকে তাকিয়ে বলল।
“কী হলো ভাইয়া? ওইভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?”
তুরার কথায় রৌদ্রের অস্থির অবশেষে থমকে গেল। তার চোখ থেকে মুগ্ধতার ঘোর আর অবিশ্বাস কাটল। মুখে এক গভীর প্রশান্তি ফুটে উঠল।
রৌদ্রের স্বর এবার স্নেহ মাখানো, বিশ্বস্ততা যোগ করে শোনাল।
“কিছু না, এমনি। আচ্ছা, তুই ঘুমা। আমি এই রুমেই আছি, ভয় পাওয়ার কিছু নেই।”
তুরা চোখের পাতা কেঁপে উঠে আবার বলল।
“সত্যি তো?”
রৌদ্র মাথা ঝাঁকিয়ে আশ্বাস দিল।
“হুম, সত্যি।”
রৌদ্র আলতো হাতে তুরার বাঁধা হাত দুটো মুক্ত করে দিল। এরপর সাদা, নরম তুলতুলে কম্বল দিয়ে তুরাকে যত্ন ও মায়ায় ঢেকে দিল। আর তুরা যেন এক পরম আশ্রয় খুঁজে পেল। সে নিশ্চিন্তে, সমস্ত চিন্তা ভুলে চোখ বন্ধ করল। সারাদিনের ধকল, ভয়, এবং আবেগের তীব্র ক্লান্তিতে তুরার ঘুম মুহূর্তেই চলে এল।রৌদ্র একদৃষ্টে তুরার নিষ্পাপ, ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। বাচ্চাদের মতো ঘুমিয়ে থাকা তুরাকে দেখতে কী অসাধারণ মায়াবী! রৌদ্র মনে মনে স্বীকার করল এই মুখের গভীর মায়া থেকে নিজেকে মুক্ত করা অসম্ভব। ঠিক রৌদ্রও পড়েছে এই মুখের মায়ায়। রৌদ্র তুরার পাশে ঝুঁকে বসল। আলতো হাতে, নিবিড় ভালোবাসায় সে তুরার কপালে ও মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।কিছুক্ষণ পর কানে কানে গোপন ফিসফিস করে, ধীরে ও গভীর স্বরে রৌদ্র বলল।
“আমি জানি না তুরা, তুই আসলে কেন এসেছিস? কিন্তু তুই যে এসেছিস, আর আমাকে এইভাবে নিয়ন্ত্রণের সীমা পার করে জ্বালাচ্ছিস পরে কি আমি তোকে সহজে যেতে দেব? কোনোভাবেই না! আমাকে পাগল করার আগে একটু ভালোভাবে ভেবে নিস। কারণ, আমি একবার ক্ষেপে গেলে তুই নিজেকে সামলাতে সত্যি হিমশিম খাবি।”
কথাটা বলেই রৌদ্র দীর্ঘশ্বাস নিল,যেন অনেক কষ্ট করে নিজেকে সামলাতে পারল। সে বালিশ নিয়ে সোফায় শুয়ে পড়ল। আর কিছুক্ষণের মধ্যে রৌদ্রের চোখেও ক্লান্তির ঘুম নেমে এল। সুইজারল্যান্ডের সেই বিলাসবহুল রুমে এখন দুজনেই শান্তির ঘুমে বিভোর।
বাংলাদেশ,,,,
পরের দিন সকালে খান বাড়ির কারও মনে শান্তি না থাকলেও, তারা শান্তি জোগাড় করার চেষ্টা করছে। আজকে সকলে শিহাবের বাসায় যাবে। তারা ভাবছে যতই হোক, তাদের বিয়ে হয়েছে। যদি শিহাবের পরিবার মেনে নিতে পারে, তাহলে খান বাড়ির পরিবার কেন আরশিকে মেনে নিতে পারবে না? এসব ভেবে সকলে নিজেকে শান্ত রাখছে। কিন্তু তুরার কথা মনে পড়তেই সবার চোখ অশ্রুতে ভিজে উঠছে।
আশিক খানের মনে একটুও শান্তি নেই। মেয়েটার জীবন নষ্ট হয়ে গেল! এসব ভাবতেই আশিক খানের চোখ বারবার অশ্রুতে ভরে উঠছে। আশিক খান রুমে বসে ফোনে তার কলিজার টুকরো মেয়েটার (তুরার) দিকে তাকিয়ে আছেন। সেই তুরার হাসি, সেই তুরার মায়াবী মুখ। ঠিক সেই মুহূর্তে তনুজা খান রুমে প্রবেশ করলেন। নিজের স্বামীকে এইভাবে বিষণ্ণ হয়ে বসে থাকতে দেখে নরম স্বরে বললেন।
“সে কি! আপনি এখনো রেডি হননি? বড় ভাই তো রেডি হয়েছেন, সকলে রেডি।”
তনুজা খানের কথা শুনে আশিক খান চোখ থেকে চশমাটা খুলে চোখের পানি মুছে, ভারী কণ্ঠে বললেন।
“না, আর কি! ভালো লাগছিল না, তাই। আচ্ছা, তুমি রেডি হয়েছো?”
তনুজা খান স্বামীর অবস্থা বুঝে পাশে বসে কাঁধে হাত দিয়ে স্নেহভরা কণ্ঠে বললেন।
“কষ্ট হচ্ছে? চিন্তা করবেন না। আমাদের মেয়ে যেখানে আছে, ভালোই আছে! আল্লাহ তার সাথে আছেন। কোনো খারাপ কিছু হবে না।”
তনুজা খানের কথা শুনে আশিক খান যেন একটু সামান্যতম ভরসা পেলেন। তিনি মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মতি জানালেন।
তিথি কালো রঙের শাড়ি পরেছে, আরফা নীল রঙের শাড়ি পরেছে। আরফার ফোনে কল আসায় সে আগে বের হয়ে গেছে। তিথি শাড়ির আঁচল ঠিক করতে করতে হাঁটতে হাঁটতে সিঁড়ির কাছে এসে নামতে শুরু করবে, এমন সময় হঠাৎ কারও মাথার সাথে ‘ঠাস’ করে বাড়ি খেল!
দুজনেই ব্যথা পেয়ে মাথায় হাত দিয়ে তাকিয়ে দেখল আয়ান আর তিথি।
আয়ান মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে, তীব্র বিরক্তি কণ্ঠে তিথিকে বলল।
“এই! কানা নাকি? চোখে দেখিস না? দেখছিলি আমি নামছিলাম! তার মধ্যে কানার মতো এসে পড়েছিস কেন?”
তিথিও নিজের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে, রেগে গিয়ে প্রতিবাদী স্বরে বলল।
“কীহহ! আমি কানা? আমি কানা হলে তুমিও কানা! তাই তো চোখ থাকতেও চোখ হাতে নিয়ে ঘুরো।”
আয়ান অবিশ্বাস ও চিৎকার করে বলল।
“কীহহ! আমি চোখ হাতে নিয়ে ঘুরি?”
তিথি চোখ পাকিয়ে বলল।
“তা নয়তো কীহহ! নিজে আগে ধাক্কা দিয়ে সব দোষ আমার ঘাড়ে দিচ্ছো!”
আয়ান দাঁতে দাঁত চেপে বলল।
“তুই বড়দের সাথে তর্ক করা শিখে গিয়েছিস, তাই না?”
তিথি এক পা এগিয়ে গিয়ে চ্যালেঞ্জের সুরে বলল।
“তুমিও ছোটদের ভালোবাসতে ভুলে গেছো? ভদ্রভাবে কথা বলতে ভুলে গেছো? এখন এদিকে আসো! তোমার মাথার সাথে আরেকটা বাড়ি দেই! নাহলে তোমার ওই শক্ত গুরুর মতো মাথার সাথে বাড়ি খেয়ে আমার মাথায় শিঙ গজাবে!”
কথাটা বলেই তিথি আয়ানের কাছে গিয়ে আয়ানকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে, আয়ানের মাথায় আরেকটা ‘ধুপ’ করে নিজের মাথার সাথে বাড়ি দিল! তিথি সাথে সাথে মাথা বুলাতে বুলাতে শাড়ি ধরে দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে চলে গেল। এদিকে আয়ান তিথির কাণ্ডে রাগে জ্বলে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে এখনি তিথিকে কাঁচা চিবিয়ে খাবে।
,,,,,,,
আরশি ওয়াশরুমের ভেতর পেটিকোট আর ব্লাউজ পরে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে ধরা শাড়ি, শাড়ির দিকে সে অসহায় মুখ করে তাকিয়ে আছে। কোনোভাবেই শাড়ি পরতে পারছে না, আর কেউ সাহায্য করতেও আসছে না। অনেকক্ষণ পর আরশি চেষ্টা করে ব্যর্থ হলো। শাড়ি হাতে নিয়ে সে ওয়াশরুমের দরজা হালকা ফাঁক করে দেখল। রুমে কেউ আছে কি না। কাউকে দেখতে না পেয়ে আরশি ধীরে ধীরে, সাবধানে শাড়ি হাতে নিয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হলো। তারপর নিজের ফোন থেকে শাড়ি পরার ভিডিও বের করে দেখতে দেখতে পরার চেষ্টা করতে লাগল।
এদিকে শিহাবের মন ভালো লাগছিল না, তাই সে বেলকনিতে গিয়েছিল। কিছুক্ষণ বেলকনিতে দাঁড়িয়ে থেকে রুমের ভেতরে আসতেই শিহাবের চোখ রসগোল্লার মতো বড় হয়ে গেল!আরশি তখনো শাড়ি পরার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। আরশির ফর্সা, ধবধবে পেট এবং বুকের ব্লাউজের অংশটুকু স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। এসব দেখে শিহাব নড়তেও ভুলে গেল। সে এক ধ্যানে আরশির দিকে তাকিয়ে রইল।
আরশি শাড়ি পরার ভিডিও বের করেও কিছুতেই শাড়ি পরতে পারছে না। হঠাৎ আরশির চোখ গেল সামনে থাকা শিহাবের দিকে। দেখল, শিহাব তারই দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে। আরশি প্রথমত কিছুই বুঝল না, এইভাবে তাকিয়ে আছে কেন? পরক্ষণেই আরশির চোখ গেল নিজের দিকে। একবার নিজের দিকে তাকিয়ে তারপর শিহাবের দিকে তাকিয়ে দেখল শিহাব তার পেটের দিকেই তাকিয়ে আছে। আরশি ভয়ে চমকে গেল, শাড়ি হাত থেকে ফসকে ফ্লোরে পড়ে গেল, আর দিলো এক তীব্র চিৎকার।
“আআআআআআআআআআ!”
আরশির তীব্র চিৎকারে শিহাবের হুঁশ ফিরে এল। সে দেখল আরশির অবস্থা আরও উলঙ্গ! শাড়ি মেঝেতে পড়ে আছে। এসব দৃশ্য দেখে শিহাব গলায় বড় বড় ঢোক গিলতে গিলতে দ্রুত এক ধাক্কায় উল্টো দিকে ঘুরে দাঁড়াল। তীব্র বিরক্তি ও বিব্রত কণ্ঠে বলল।
“এই! তুমি এমন বেহায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছো কেন? লজ্জা করছে না?”
শিহাবের কঠোর কথায় আরশিও রাগে সব কিছু ভুলে গেল। সে প্রতিবাদী ও ক্ষুব্ধ স্বরে বলল।
“কীহহ! আমি বেহায়া? আমি যদি বেহায়া হই, তাহলে আপনিও লুচু বেটা! কীভাবে আমার পেটের দিকে তাকিয়ে ছিলেন? দেখে মনে হচ্ছিল এখনি আমার পেটটাকে খেয়ে ফেলবেন!”
আরশির এমন কথায় শিহাবের রাগ চরম পর্যায়ে পৌঁছাল। সে দাঁত কিড়মিড় করতে করতে কঠোর ও ক্রুদ্ধ স্বরে বলল।
“কী বললে? আমি লুচু? শোনো! যদি লুচু হতাম, তাহলে এখনো ভার্জিন থাকতাম না! কালকে রাতে যা করা হয়,সব করে ফেলতাম!”
শিহাবের কথায় আরশি তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে মুখ ভেংচি দিয়ে বলল।
“আয়ছে আমার সাধু লোক! জানা আছে কেমন আপনি! তাই তো কিছুক্ষণ আগে অসভ্য পুরুষের মতো তাকিয়ে ছিলেন?”
আরশির পাল্টা জবাবে শিহাব দাঁতে দাঁত চেপে বলল।
“আমি কি আর জানতাম তুমি এইভাবে শাড়ি ছাড়া, বেহায়া, নির্লজ্জ মেয়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকবে?”
আরশিও শিহাবের চূড়ান্ত জবাবে আঁচলের অভাব ভুলতে না পেরে ক্ষোভে বলল।
“হুহহ! আমি কি আর জানতাম হুট করে আপনি এসে সব লজ্জা শরম খেয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকবেন?”
আরশিরকে এইভাবে তর্ক করতে দেখে শিহাবের রাগে ইচ্ছে করছে যেন এই মুহূর্তে দুটো থাপ্পড় দেয় আরশির গালে। কোনো রকম রাগ নিয়ন্ত্রণ করে সে চাপা,কঠিন স্বরে বলল।
“এখন নির্লজ্জ মেয়ের মতো দাঁড়িয়ে আমার সাথে তর্ক না করে শাড়ি পরো!”
শিহাবের কথায় আরশি তাড়াতাড়ি মেঝে থেকে শাড়ি তুলে নিল। কিন্তু শাড়ি পরার কৌশল জানা না থাকায় সে আবারো অসহায় মুখ করে দাঁড়িয়ে রইল। শিহাব আরশির কোনো সাড়া না পেয়ে এবার প্রশ্নাত্মক স্বরে বলল।
“কী হলো? আমি কি বলছি?”
আরশি চোখ ছোট ছোট করে, আমতা আমতা করে বলল।
“আসলে… আমি শাড়ি পরতে জানি না।”
শিহাব তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল।
“তা জানবা কিভাবে? জানার তো কথা শুধু কাউকে ফাঁসিয়ে বিয়ে করতে হয়!”
আরশি বিরক্ত হয়ে বলল।
“দেখেন! আপনি কিন্তু আমার সাথে ঝগড়া করছেন!”
শিহাব উদাসীন ভাব কন্ঠে বলল।
“তোমার যেইটা মনে হয়! আই ডোন্ট কেয়ার!”
আরশি হতাশা নিয়ে বলল।
“এইভাবে ঝগড়া না করে, প্লিজ একটু বাইরে গিয়ে কাউকে ডেকে পাঠান?”
শিহাবের রাগ আরও বেড়ে গেল। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল।
“What! কীহহ! সিরিয়াসলি? আমাকে কি তোমার চাকর মনে হয় যে আমি নিচে গিয়ে তোমার আদেশ মতো পালন করবো?”
শিহাবকে এইভাবে চাপা অসহযোগিতা করতে দেখে আরশির ভীষণ রাগ হচ্ছে। ইচ্ছে করছে শিহাবের চুল সব টেনে হিঁচড়ে ছিঁড়তে। হুট করে আরশি কী থেকে কী ভেবে বলে ফেলল।
“না! আপনি কাজের লোক না, আপনি আমার স্বামী আর আমি আপনার স্ত্রী। আর একজন স্বামী তার স্ত্রীকে সাহায্য করবে এইটাই বড় কথা! এখন আপনি আসেন আর আমাকে শাড়ি পড়িয়ে দেন!”
শেষের লাইনটুকু বলতেই আরশি লজ্জায় নিজের জিভে নিজেই কামড় দিল! কী থেকে কী বলে ফেলল! ভাবতেই আরশি শাড়ি নিয়ে এক দৌড়ে আবারো ওয়াশরুমে গিয়ে দরজা লক করে দিল।
এদিকে আরশির অপ্রত্যাশিত দাবি শুনে শিহাব হতভম্ব।আরশি তাকে স্বামীর চোখে দেখছে কথাটা ভাবতেই শিহাবের রাগ চড়ে গেল। সে তীব্র রাগে সামনের দিকে ঘুরে যেই কিছু বলতে নিবে, দেখে আরশি নেই। ওয়াশরুমের দরজার দিকে তাকিয়ে দেখে ভেতর থেকে লক করা। তারমানে আরশি ভিতরে চলে গেছে।শিহাব চাপা রাগ নিয়ে ভারী দীর্ঘশ্বাস ফেলল। অসহায় ক্রোধে সে রুম থেকে দ্রুত বাহির হয়ে গেল।
রানিং…!
Share On:
TAGS: নির্লজ্জ ভালোবাসা, প্রিঁয়ঁসেঁনীঁ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা সূচনা পর্ব
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২৬
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২০
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১৯
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৩১
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১৭
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৯
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৩২