নির্লজ্জ_ভালোবাসা
লেখিকা সুমি চোধুরী
পর্ব 29 (বোনাস পার্ট)
❌কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ❌
আরশি রুমে এসে দেখল, শিহাব বিছানায় শুয়ে আপন মনে ফোন চাপছে। আরশি আর কথা না বাড়িয়ে পাশ থেকে একটা বালিশ নিয়ে সোফায় ঘুমানোর উদ্দেশ্যে এগোতে যাবে, ঠিক সেই মুহূর্তে শিহাব আরশির দিকে না তাকিয়েই, ফোন চাপতে চাপতে বলল।
“বিছানায় শুতে পারো, সমস্যা নেই। তোমাদের বাড়িতে যদি আমি বিছানায় থেকে তোমাকে সোফায় দিই, তাহলে বিষয়টা খুব অদ্ভুত দেখাবে।”
আরশি শিহাবের কথায় একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল।
“তাই ! আপনি যে আপনাদের বাড়িতে আমাকে বিছানায় ঘুমাতে দিয়েছিলেন? সেইদিন তো আপনিই সোফায় ঘুমিয়েছিলেন! তাহলে আমি কেন আপনাকে বিছানায় দিতে পারব না? আজকে আপনি বিছানায় ঘুমান, আমি সোফায় ঘুমাচ্ছি।”
শিহাব চোখ সরু করে তাকাল আরশির দিকে। তার কণ্ঠে স্পষ্ট বিরক্তি।
“বেশি বক বক না করে বিছানায় ঘুমাও। তুমি তোমার জায়গায়, আমি আমার জায়গায় থাকব।”
আরশি মুখ খোলার জন্য কিছু বলতে যাবে, তার আগেই শিহাব তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল।
“স্টপ। ডোন্ট সে অ্যানিথিং। জাস্ট লায় ডাউন কোয়াইটলি অ্যান্ড স্লিপ।” (থামো। আর কিছু বলো না। শুধু চুপচাপ শুয়ে পড়ো এবং ঘুমাও।)
শিহাব কথাটা বলেই পাশ ফিরে উল্টো হয়ে শুয়ে পড়ল। আরশি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে বাধ্য হয়ে বিছানার এক প্রান্তে কাঁচুমাচু করে শুয়ে পড়ল এবং মনে মনে দোয়া দুরুদ পড়তে লাগল। তার ভয়, কোনোভাবেই যেন শিহাবের সঙ্গে সামান্যতমও স্পর্শ না লাগে। কারণ, আরশির ঘুম মানেই বাচ্চাদের ঘুমের মতোই সে পুরো বিছানা জুড়ে গড়াগড়ি খায়!
,,,,
রাত গভীর। চারদিকে নিস্তব্ধতা বয়ে যাচ্ছে, আর মাঝে মাঝে কুকুরের ডাক সেই নীরবতাকে যেন আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। হঠাৎ শিহাবের ঘুম ভেঙে গেল, আর চোখ খোলতেই চোখের সামনে আরশির চেহারা ভেসে এল। শিহাব চারপাশে তাকাল আরশি রুমের আলো বন্ধ না করেই ঘুমিয়ে পড়েছে।
শিহাব আবার না চাইতেও আরশির দিকে তাকাল। আরশি দু’হাত গালে রেখে একদম ছোট্ট বাচ্চাদের মতো কাঁচুমাচু হয়ে ঘুমিয়ে আছে। তার উষ্ণ, ঘন শ্বাস দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
শিহাব অজান্তেই আরশির দিকে সামান্য এগিয়ে এল। আরশির উষ্ণ, ঘন শ্বাস প্রায় শিহাবের মুখে এসে লাগছে।
আরশির ঘুমন্ত মায়াবী মুখের দিকে শিহাব যেন এক ধ্যানে তাকিয়ে রইল। শিহাব নিজেও জানে না, সে যে এইভাবে আরশির দিকে অন্যমনস্কভাবে তাকিয়ে আছে।
হঠাৎ শিহাবের চোখ গেল আরশির বুকের দিকে। ওড়না বুক থেকে সরে গেছে, আর জামার গলাও বড় হওয়ায় ফর্সা বুকের অনেকটা অংশ উন্মুক্ত হয়ে আছে, যা খুব গভীরভাবে দেখা যাচ্ছে। আর আরশির বুকে একটা তিল আছে, যা আরও বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
শিহাব না চাইতেও সেখান থেকে চোখ ফেরাতে পারল না। কেমন জানি মনে হচ্ছে, সেই তিলটা নিজের ঠোঁট দিয়ে ছুঁয়ে দিতে। শিহাব দ্রুত আবার আরশির মুখের দিকে তাকাল। আরশির কপালে এসে পড়া এলোমেলো চুলগুলো আলতো করে কানের পাশে গুঁজে দিল। আরশি ঘুমের মাঝেই সামান্য নড়েচড়ে উঠল।
আরশির নড়ে ওঠাতেই শিহাবের হুঁশ ফিরল। সে এক ঝটকায় দূরে সরে গেল। যেন সে এমন কোনো কাজ করে ফেলেছে যা করা তার উচিত হয়নি!
শিহাব বড় বড় ঢোক গিলতে লাগল। সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না তার কী হয়েছে। হঠাৎ আরশিকে দেখে তার এমন অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে কেন? আগে তো এমন হতো না, তাহলে হঠাৎ এমন হচ্ছে কেন? সে নিজেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিল না।
শিহাব মনটাকে হালকা করার জন্য রুম থেকে বের হয়ে বারান্দায় আসল। সে বহুদূর আকাশের দিকে তাকাল। হঠাৎ শিহাবের তুরার কথা মনে হলো। শিহাব জানে না তুরা এখন কোথায় আছে, কী করছে। শিহাব ইচ্ছে করেই আর খোঁজ নিচ্ছে না। কারণ এখন খুঁজে বের করলে হয়তো আরও বেশি কষ্ট পাবে। সে নিজে না মানুক, তবে এটাই বাস্তব তার বিয়ে হয়ে গেছে। তাই এখন তুরার সামনাসামনি মুখোমুখি হওয়া মানেই কষ্ট। মানুষটাকে দেখতে পারবে, কিন্তু ছুঁতে পারবে না। আর চাইলেও পারবে না, এটাই বাস্তব। বিয়ে একবারই হয়,আর এইটাই শিহাব বিশ্বাস করে।
আরশিকে কোনোদিন সে মেনে নিবে কিনা, তা তার জানা নেই কিন্তু কোনো একদিন হয়তো মেনে নিবে। তারও পরিবার হবে। সবকিছুই সময়ই বদলে দেবে। এই কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই শিহাব এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
শিহাব আকাশের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে যেন নিজেকেই প্রশ্ন করল।
“কী বিচিত্র এই খেলা! যাকে এই হৃদয়-আত্মা উজাড় করে চাইলাম, তাকেই পেলাম না। অথচ, যার সামান্যতম অস্তিত্ব নিয়েও কখনও ভাবিনি সে আজ আমার হলো! এখন যদি বলি, কাউকে গভীর আবেগে চাওয়াটাই অপরাধ তাহলে কি ভুল বলা হবে? কারণ তাই তো! বিধাতা যেন সেই অপরাধটুকু আমাদের দিয়ে করাতে চান না, তাই সবচেয়ে প্রিয় চাওয়াটার বদলে অন্য কাউকে এনে দেন!”
🌿______________🌿
সুইজারল্যান্ড,,,
সকালের পথঘাট আজ অন্যরকম স্নিগ্ধ। হালকা হালকা শীতের আমেজ আর ধীর বাতাসের কোমল স্পর্শ চারদিকে।
তুরা আর রৌদ্র দু’জনেই একটা ব্রিজের রেলিংয়ে হেলান দিয়ে ঘনিষ্ঠভাবে ঘুমিয়ে আছে। তুরা রৌদ্রের বুকে মাথা রেখে গুটিসুটি মেরে একদম ছোট্ট বাচ্চাদের মতো জড়িয়ে ধরে আছে। রৌদ্রও কোমলভাবে তুরাকে ধরে, ব্রিজে মাথা হেলান দিয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
কাল রাতে দু’জনেই গল্প করতে করতে রাস্তার মাঝেই ঘুমিয়ে পড়েছে! ভালোবাসা যে কোনো পরিস্থিতি বা স্থান মানে না, তা এই তুরা আর রৌদ্রকে না দেখলে হয়তো বোঝা যেত না।
ধীরে ধীরে রৌদ্রের ঘুম ভাঙল, আর চোখ খুলতেই নিজের বুকে তুরাকে পেল। তুরা কেমন আদুরে ভঙ্গিতে তাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে! রৌদ্র একবার তুরার দিকে তাকিয়ে আবার চারপাশে তাকাল সকাল হয়ে গেছে। কখন যে এই ব্রিজে ঘুমিয়ে পড়েছে, টেরই পায়নি! তবে এখন যাওয়া উচিত, আর বেশিক্ষণ থাকলে সমস্যা হতে পারে।
রৌদ্র খুব আলতো করে তুরাকে ডাক দিল।
“এই তুরা, শুনছিস?”
রৌদ্রের ডাকে তুরা নড়েচড়ে উঠল,তুরা যেন আরও আরাম খুঁজে নিল। সে রৌদ্রকে কোলবালিশের মতো আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তুরার এই শিশুসুলভ কাণ্ড দেখে রৌদ্রের মুখে একটা কোমল হাসি ফুটে উঠল। সে অসীম মমতায় তুরাকে সাবধানে কোলে তুলে নিল। রৌদ্র তুরাকে নিয়ে ধীর পায়ে হাঁটতে থাকল।
তুরার ঘুম ভেঙে গেল। চোখ খোলতেই রৌদ্রের চেহারা ভেসে উঠল। তুরা প্রথমে একটু চমকে উঠে রৌদ্রের গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে সঙ্কুচিত কণ্ঠে বলল।
“আ… আ… ব… আমি আপনার কোলে কীভাবে এলাম?”
রৌদ্র তুরার কথা শুনে দুষ্টু হাসি হেসে, মিষ্টি, টিজিং এর সুরে বলল।
“তোকে কে যেন রাস্তায় ফেলে দিয়ে গিয়েছিল, আমি দেখে কুড়িয়ে নিয়ে আসলাম।”
তুরা রৌদ্রের কথা শুনে কোল থেকে নামার জন্য ছটফট করতে করতে, অভিযোগের সুরে বলল।
“মিথ্যুক! নামান বলছি!”
তুরার এই ছটফটানি দেখে রৌদ্র তুরাকে আরও শক্ত করে কোলে জড়িয়ে ধরে, গভীর ভালোবাসার দৃঢ়তায় বলল।
“যদি মিথ্যা বলে তোকে রাগানো যায়, তাহলে আমি এমন মিথ্যা হাজার হাজার বলতে রাজি আছি।”
মুহূর্তে রৌদ্রের কথা শুনে তুরা স্তব্ধ হয়ে গেল। সে এক পলকে রৌদ্রের দিকে তাকাল। রৌদ্রও এক পলকে তুরার দিকে তাকিয়ে আছে। সুইজারল্যান্ডের সেই স্নিগ্ধ সকালে, তারা দু’জনেই যেন সময়ের সীমানা ভুলে একে অপরের চোখে হারিয়ে গেল।
হঠাৎ তুরা নিজের অজান্তেই, রৌদ্রের চোখে দৃষ্টি একদম স্থির রেখে, নরম, আবেগময় কণ্ঠে বলল।
“রৌদ্র ভাই, আপনি আমাকে কতটা ভালোবাসেন?”
রৌদ্রও তুরার চোখের দিকে দৃষ্টি স্থির রেখে, রহস্যময় হাসিতে বলল।
“প্রমাণ লাগবে?”
তুরা ঠোঁট কামড়ে ধরে, উত্তেজিত অথচ ফিসফিস করে বলল।
“না মানে,হ্যাঁ!দেখতে চাই।”
তুরার উত্তেজিত উত্তরটা না মানে, হ্যাঁ! দেখতে চাই শোনামাত্রই রৌদ্রের ঠোঁটে এক আকাশ সমান হাসি ফুটে উঠল। সেই হাসি ছিল আনন্দের গভীরতম বহিঃপ্রকাশ। এই হাসির অর্থ তুরা একেবারেই বুঝতে পারল না। সে কেবল রৌদ্রের সেই হাসি মাখা মায়াবী মুখের দিকে একদম বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। রৌদ্রের চোখ দুটো হাসছিল, আর সেই হাসি যেন সুইজারল্যান্ডের সকালের স্বচ্ছ রোদকেও হার মানাচ্ছিল। তুরা বুঝতে পারল না, ঠিক কী ঘটতে চলেছে।
রানিং…!
Share On:
TAGS: নির্লজ্জ ভালোবাসা, প্রিঁয়ঁসেঁনীঁ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২৮
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৩০
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১৬
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২০
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২৩
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা সূচনা পর্ব
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৩১
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২৬
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১০
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা গল্পের লিংক