❌❌ কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ❌ ❌
বিঃ দ্রঃ:- কেউ কপি করবেন না । ❌❌❌
নয়নারএমপিসাহেব
পর্ব:- ৬
লেখনীতে:- Sanjana’s – গল্পঝুড়ি
হৃদয়ের গাড়িটা গিয়ে থামল তার নিজের বাড়ির সামনে। দারোয়ান দূর থেকেই গাড়িটা চিনে ফেলেছিল হয়তো, তিনি আর এক সেকেন্ডও দেরি না করে বড়ো গেটটা খুলে দিলেন। বিশাল লোহার গেট পেরিয়ে গাড়ি ঢুকে পড়ল ভেতরে, এসে থামল এক অদ্ভুত নীরব ভবনের সামনে।
বাড়িটা গভীর নীল আর সাদা রঙে মোড়া। ঠিক হৃদয়ের রুমটার মতোই, তবে হৃদয়ের রুমটা পুরোটাই নীল, কিন্তু এইখানে নীল রঙের সাথে সাদা রঙের মেল দেখা যাচ্ছে, শুধুই একটা রঙের প্রতি একজন মানুষের এত ঝোঁক কি করে থাকতে পারে তরী বুঝে উঠতে পারে না।
তরী পিটপিট করে তাকাচ্ছে একবার হৃদয়ের দিকে তো একবার বাড়িটার দিকে। ওর এতটুকু জীবনে হাতেগোনা তিনবার এসেছে এখানে। হৃদয় নিজেও খুব একটা আসে না এই বাড়িতে, আর না পরিবারের কেউ আসে। যেন এটা কোনো বাড়ি নয় , বরং একটা নীরব ভবন যেখানে হৃদয় নিজের রাগ আর ভালোবাসাকে লুকিয়ে রাখে।
হৃদয়ের ধমকের পর এখন আর তরী কাঁদছে না। বরং চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সব দেখছে। বেচারি কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না। গাড়ির ভেতরে এখনও দুজনেই বসে আছে। হৃদয় নিজেও নামছে না, তরীকেও নামতে দিচ্ছে না, দিচ্ছে না বললে ভুল হবে, তরী সাহস দেখিয়ে নামতে পারছে না।
বেশকিছুক্ষণ পর তরী আবারও তাকালো হৃদয়ের দিকে। অতঃপর ভাঙা কন্ঠে বললো,,,
__আমি কী করেছি? আমি কি কোনো ভুল করেছি? প্রতিটা শব্দ খুব ছোট এবং খুব অসহায় শোনালো হৃদয়ের কাছে।
হৃদয় এতক্ষণ কপালে আঙুল চেপে বসে ছিল। তরীর কথা শুনে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তাকালো তার দিকে। গভীর, ক্লান্ত চোখদুটো দিয়ে যেন ভস্ম করে দিবে তরীকে। তা দেখে তরী ফাঁকা ঢোক গিলল।
এইদিকে হৃদয়ের কাছে তরীর এই প্রশ্নটি অপরিচিত নয়। যখনই হৃদয় কোনো বিষয় নিয়ে তরীর উপর রেগে যায়, যার কারণ তরীর অজানা! তখন ঠিক এইভাবেই প্রশ্ন করে ও হৃদয়কে।
হৃদয় বড় করে নিঃশ্বাস নিল। বুকভরা বাতাস নিয়ে আবার ছেড়ে দিল ধীরে। তারপর গভীরভাবে তরীর দিকে তাকিয়ে কঠিন স্বরে বলল—
__তোকে বলেছিলাম না, প্লাবন থেকে দূরে থাকতে। ও ভালো ছেলে নয়। তাহলে কোন সাহসে তুই তার সাথে কথা বলিস?
হৃদয়ের বলা শব্দগুলো যেন তরীর বুকের ভেতর আঘাত করল। মুহূর্তেই ওর চোখ জ্বলে উঠল। এতক্ষণ ধরে জমে থাকা প্রশ্ন এখন রাগ আর কান্নায় পরিণত হল। পরপরই গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল নোনাজল। অতঃপর ও ভাঙা কন্ঠে বলল—
__উনি খুব ভালো… সত্যিই। আমি উনাকে পছন্দ করি এমপি সাহেব। খুব পছন্দ করি।
ব্যস এই কথাটুকুই যথেষ্ট ছিল। হৃদয়ের মুখের ভাব এক নিমিষে বদলে গেল। যেন কেউ হঠাৎ করে তার বুকের ভেতর আগুন ঢেলে দিয়েছে। শিরায় শিরায় অশান্তি ছুটে বেড়াতে লাগল। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, যার দরুণ বড় বড় করে নিঃশ্বাস নিতে লাগল সে। মাথার ভেতর ঝাঁ ঝাঁ শব্দ হচ্ছে, এই পছন্দ শব্দটা তার আর কিছুতেই সহ্য হচ্ছে না। আর কতভাবে সে এই মেয়েটাকে বুঝাবে।
হৃদয়ের চোখের গভীরে জমে উঠল এমন এক যন্ত্রণা, যা তরীর পক্ষে হয়তো বুঝে উঠা সম্ভব নয়।
তরী আবারও হৃদয়ের উদ্দেশ্যে বলল,,,
__ প্লাবন ভাইয়া কখনোই খারাপ হতে পারে না, উনি খুব ভালো মানুষ। আপনি উনাকে ভুল বুঝছেন।
হৃদয়ের হাতের মুঠো শক্ত হয়ে এলো এবার, দাঁতে দাঁত পিষলো। মনে হচ্ছে, আর এক মুহূর্ত এখানে থাকলে সে নিজেকে সামলাতে পারবে না।এত যন্ত্রনা সে নিতে পারছে না আর। কিন্তু শরীরে এতটুকু শক্তি পাচ্ছে না গাড়ি থেকে বেড়োনোর।
গাড়ির ভেতর নেমে এলো এক ভয়ংকর নীরবতা।যেখানে শুধু হৃদয়ের দমবন্ধ করা রাগ আর তরীর অজানা আশঙ্কা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে।
পাঁচ মিনিট এভাবেই কেটে গেল,,,,
হৃদয়ের পুরো মুখটা লালচে হয়ে উঠেছে। বুক ভরে শ্বাস নিতে গিয়েও পারছে না সে, হাঁফিয়ে উঠছে বারবার, যেন ভেতরের আগুনটা শরীর ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। যথাসম্ভব সে নিজেকে সামলে নিতে চাইছে, এখন সে তরীর উপর রাগ দেখাতে পারছে না, সে চাইছে তরীর উপর রাগ দেখাতে কিন্তু পারছে না। তরীর মুখে অন্য কাউকে পছন্দ করা শব্দগুলো শুনে হৃদয়ের বুকে অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে। যা সে প্রকাশ করতে পারছে না। এই অস্থিরতা, এই নিয়ন্ত্রণহীনতায় হঠাৎ করেই তার শরীরটা অসুস্থ হয়ে উঠেছে।
এইদিকে হঠাৎ হৃদয়কে এমন অবস্থায় দেখে তরী ভড়কে গেছে। ভয় আর দুশ্চিন্তায় ওর বুকটা ধক করে উঠল। কোনো ভাবনা না করেই নিজের ছোট্ট দুটো হাতে হৃদয়ের হাত আঁকড়ে ধরলো।
কি হয়েছে আপনার? এমন করছেন কেন? আপনার কি শরীর খারাপ লাগছে? ওর কণ্ঠে কাঁপন, চোখে ভয়।
তরী তাড়াতাড়ি নিজের ব্যাগ খুলে জলের বোতল বের করল। হাতের তালুতে পানি ঢেলে আলতো করে হৃদয়ের মুখ মুছে দিল। কপাল, গাল, গলা, ঘাড় একদম যত্ন করে।
__পানি খাবেন? অস্থির গলায় শুধলো ও।
হৃদয় মাথা নাড়তেই তরী হৃদয়কে পানি খাইয়ে দিল। কয়েক ঢোকের পর বুকের ওঠানামাটা একটু ধীর হয় তার।
তরী হৃদয়কে শান্ত হতে দেখে জিজ্ঞেস করলো,,,
__এখন একটু ভালো লাগছে? শব্দগুলো খুব নিচু এবং চিন্তিত ।
হৃদয় জবাব দিল না অপলক তাকিয়ে রইল তরীর দিকে। হঠাৎ হৃদয়কে এইভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে তরী ইতস্তত করলো।
অতঃপর হৃদয় কিছুক্ষণ চুপ থেকে ধীর স্বরে বলল —
__আমি ঘুমাতে চাই নয়ন ! আমার ভীষণ অস্থির লাগছে। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিবি?
এই অনুরোধে তরী এক মুহূর্ত থমকে গেল। হৃদয়ের কণ্ঠে আজ কোনো হুকুম নেই, কোনো রাগ নেই, আছে শুধু একরাশ ক্লান্তি আর অসহায়তা। তরীর খুব মায়া হল হৃদয়ের এমন কথা শুনে। বুকটা কেমন করে উঠল। ওর চোখের কোণ অজান্তেই ভিজে উঠেছে, কিন্তু কেন সেটা ওর জানা নেই, যাকে ও এত অপছন্দ করে তার জন্য এত মায়া কিসের। স্বাদেই কি হৃদয় তাকে মায়ার রানি বলে ডাকে।
হৃদয়কে গাড়িতেই শুতে দেখে তরী মিনমিনে গলায় বলল,,,,
__এইখানে আপনার শুতে কষ্ট হবে। আপনি কি একটু হেঁটে ভেতরে যেতে পারবেন? আমি আপনাকে ধরে রাখবো। আপনি পড়ে যাবেন না।
তরীর মুখে এমন কথা শুনে এক মুহূর্তের জন্য হৃদয়ের ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ একটা হাসি খেলল। এতক্ষণ শরীরটা অস্থির, মাথাটা ভারী লাগলেও এখন যেন কোথাও মনের কোণে একটা শান্তির হাওয়া বইয়ে গেল। অতঃপর সেই অবস্থায় হৃদয় মাথা নাড়ল, হৃদয়ের কথা মতো তরী ঘুরে গাড়ির দরজা খুলতে চাইলো। কিন্তু না পারছে না খুলতে। ও আবার দরজায় টান দিল। না খুলছে না। এবার বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে গেল ওর।
__আপনার গাড়ির দরজাটা এত শক্ত কেন? খুলছেই তো না!
হৃদয় আবারও হালকা হাসলো। গাড়ি আনলক করে নিজেই তরীর দিকে ঝুঁকে দরজাটা খুলে দিল।
তরী ভোঁতা মুখে চেয়ে রইল হৃদয়ের দিকে কিছুক্ষন পরপর যেই হৃদয় নিজের সাইডের দরজা খুলে বেরুতে চাইলো তার আগেই তরী একপ্রকার চিৎকার করে বলে উঠলো —
__খুলবেন না। আপনি পারবেন না দাঁড়ান আমি আসছি। যেই বলা সেই কাজ।ও আর এক মুহূর্তও দেরি না করে দৌড়ে গাড়ির অন্য সাইডে এসে দরজাটা খুলে দিল। ওর ভাব এমন যেন ওই আগে দরজা খুলেছে নাকি হৃদয়।
দরজা খুলে দিয়ে ও হৃদয়ের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে দৃঢ় স্বরে বলল—
__নেমে আসুন। আমি আছি।
হৃদয়ও নামলো। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই তরী নিজের কাঁধটা এগিয়ে দিল, এক হাতে হৃদয়ের কোমর শক্ত করে ধরে রাখল। যেন হৃদয় পড়ে না যায় কোনো ভাবে। দূর থেকে গার্ড এগিয়ে আসতে চেয়েছিল, কিন্তু হৃদয়ের হাতের ইশারায় থেমে গেল। এই মুহূর্ত হৃদয় কারো সঙ্গে ভাগ করতে চাইলো না হয়তো।
অতঃপর তরী ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগলো। প্রতিটা পা ফেলার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের ভেতর কেঁপে উঠছে পেশিগুলো। হৃদয় ইচ্ছে করেই তরীর উপর নিজের কিছুটা ভার ছেড়ে দিল, তরী চোখ মুখ খিঁচে হাঁটছে, বেচারি হাঁফিয়ে উঠেছে, কিন্তু তরী হৃদয়কে কিছু বলবে তার সাহস নেই। তারউপর মানুষটা অসুস্থ।
মনে মনে নিজেকে শুধু একটা কথাই বলল—
__এত ভারি কেন এই লোক? এত কী খায়?
ঠিক তখনই কানে এলো হৃদয়ের ফিসফিসে কণ্ঠ—
এখন আমার খাওয়া নিয়েও তোর প্রবলেম? একটু থেমে সে আবার বলল— তুই কি চাইছিস আমি এখন খাওয়াদাওয়া ছেড়ে দিই?
তরী থমকে গেল এক সেকেন্ড। হৃদয় কিভাবে ওর মনের কথা বুঝে গেল? গাল দুটো লাল হয়ে উঠেছে ঠোঁটে অনিচ্ছুক একটুখানি হাসি। কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে মিনমিন করে বলল—
__আমি তো সেরকমটা বলিনি? আপনি তো আমার থেকে অনেক বড়ো, তাই হয়তো একটু ওজন বেশি আপনার। সেটাই বলতে চাইছিলাম আরকি।
এবার হৃদয় দাঁড়িয়ে গেল। পরপর ভ্রু কুঁচকে তাকালো তরীর দিকে । সে দৃষ্টিতে রাগের চেয়ে বেশি ছিল অধিকারবোধের ঝাঁজ।
__তুই কি আমাকে বয়সের খোঁটা দিচ্ছিস? কণ্ঠটা চাপা, কিন্তু ধারালো ।
__শুধুমাত্র বারো বছরের বড়ো আমি তোর থেকে। তাই বলে কি আমি বুড়ো হয়ে গেলাম নাকি? এই ডিফারেন্সটা তো খুবই সামান্য।
এইবার তরী একেবারে হকচকিয়ে গেল , এটা সামান্য ডিফারেন্স? তাও তরী কথা ঘুরানোর জন্য বলতে লাগল ,,,,
__উফফ! আমি আপনাকে বুড়ো কখন বললাম! আপনি এত কথা পেঁচান কেন?
মুহুর্তেই হৃদয়ের ঠোঁটে অদ্ভুত এক হাসি খেলে গেল। সে তরীর কাঁধে ভর দিয়ে একটু ঝুঁকে বলল—
__শুনে রাখ। আমি যতই ভারি হই না কেন! একদিন এই সম্পূর্ণ আমিটাকেই তোর এই পুঁচকে শরীর দিয়ে সামলাতে হবে।
একটু থেমে গিয়ে আরও গভীর স্বরে বলল,,,,
__তাই এখন থেকেই অভ্যাস করে নে। কারণ ইব্রাহিম খান হৃদয় কখনোই কোনো কিছুর সাথে আপোষ করেনি। আর সেক্ষেত্রে… তোর বেলায় আপোষের কোনো প্রশ্নই ওঠে না।
তরী পিটপিট করে তাকিয়ে রইল হৃদয়ের দিকে।
এই কথাগুলোর মানে ধরতে গিয়ে ওর মাথার ভেতর যেন শব্দগুলো এলোমেলো হয়ে গেল। হৃদয়ের বলা কোনো কিছুর মানেই ও বুঝে উঠতে পারলো না। তাই ও আর কিছু বলল না। শুধু শক্ত করে হৃদয়কে ধরে হাঁটতে লাগল। যেন কথার মানে বুঝতে না পারলেও, অজান্তেই ও এই দায়িত্বটা মেনে নিচ্ছে।
চলবে ।
Share On:
TAGS: নয়নার এমপি সাহেব, সঞ্জনা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ৩
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ৪
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ২
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ১
-
নয়নার এমপি সাহেব গল্পের লিংক
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ৫