Golpo romantic golpo নয়নার এমপি সাহেব

নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ২৯


নয়নারএমপিসাহেব

পর্ব:- ২৯
লেখনীতে:- Sanjana’s – গল্পঝুড়ি

খান বাড়ির বড় ড্রয়িংরুমটা আজ অস্বাভাবিকভাবে গম্ভীর। সাধারণত এই বাড়িতে সবসময় কোলাহল, হাসিখুশি লেগেই থাকে। কিন্তু আজ যেন সেই বাড়িটাই অন্য রূপ নিয়েছে । সোফার মাঝখানে গম্ভীর মুখে বসে আছে হৃদয়।
তার মুখের রেখাগুলো শক্ত হয়ে আছে, চোখের দৃষ্টি ঠান্ডা অথচ তীক্ষ্ণ। তার ঠিক পাশেই গুটিসুটি মেরে বসে আছে তরী। মাথা নিচু, দুই হাত জড়িয়ে ধরে বসে আছে। মাঝে মাঝে ভীত চোখে চারপাশে তাকাচ্ছে, আবার দ্রুত চোখ নামিয়ে নিচ্ছে।

খান বাড়িতে আজ অনেকেই উপস্থিত। প্লাবনের মাবাবা সহ শিরিন বেগমও এসেছেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ঘরের ভেতর এত মানুষের মাঝেও একটা শব্দও নেই। হৃদয়ের মুখের ভঙ্গিমা আজ এতটাই কঠোর যে কেউই কথা বলার সাহস পাচ্ছে না। এইদিকে তরী বুঝতে পারছে না হৃদয় আবার কেন রেগে গেছে, কিছুক্ষণ আগেও তো অন্যরকম মুড়ে ছিল, তাহলে হঠাৎ আবার কি হল, তরী কিছুক্ষণ আগের ঘটনা পুনরায় মনে করে নিল, ও কিছু ভুল করেছে কিনা। কিন্তু না ও এমন কিছুই করেনি যার কারণে হৃদয় এত রেগে থাকবে। এটা ভেবেই ও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

অবশেষে এই নীরবতা ভাঙলেন নীলা চৌধুরী। তিনি ধীরে হৃদয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,

__ কি হয়েছে হৃদয়? তুই সবটা স্পষ্ট করে না বললে তো আমরা কিছুই বুঝতে পারছি না।

জবাবে হৃদয় কিছু বলবে কিন্তু তার আগেই শিরিন বেগম হঠাৎ তেড়ে উঠলেন।

_ ও কি বলবে আর! উনার কণ্ঠে তীব্র ক্ষোভ। তিনি সরাসরি নীলা চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বললেন, _ তুমি তোমার মেয়েকে কিছু বলো না বলেই আজ ওর এত বাড়াবাড়ি!

এমন কথায় ঘরের ভেতর এক মুহূর্তেই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল। হৃদয় ভ্রু কুঁচকে শিরিন বেগমের দিকে তাকালেন। শিরিন বেগম সেসব পাত্তা না দিয়ে আবার বললেন,

__ তোমার মেয়ে কি জানত না যে আর কিছুদিন পর ইলেকশন? তাহলে কেন গেল ঐখানে আমাদের প্লাবনকে নিয়ে? আজ যদি আমাদের ছেলেটার কিছু হয়ে যেত তখন?

শিরিন বেগমের তালে তাল মিলিয়ে ইনায়াও বলে উঠলো,
__হ্যাঁ আর হৃদয় ভাইয়া তো বারবার করে ওকে বলেছে যে ভার্সিটি শেষ হলে ও যেন সোজা বাড়িতে চলে আসে, কিন্তু ও কি করেছে? বাড়ি না এসে উল্টো প্লাবন ভাইয়াকে নিয়ে ঐখানে গিয়েছে। শেষ পর্যন্ত প্লাবন ভাইয়াকেই ফাঁসিয়ে দিল।

ঘরের ভেতরের বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। এতক্ষণ নীলা চৌধুরী চুপচাপ বসে থাকলেও। কিন্তু এবার ধীরে ধীরে উনার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল। উনার চোখে স্পষ্ট রাগের ঝলক ফুটে উঠল। আজ পর্যন্ত তিনি নিজে কখনো তার মেয়ের সঙ্গে এইভাবে কথা বলেননি।
আর আজ তার সামনেই অন্য কেউ তার মেয়েকে এভাবে দোষারোপ করছে! এটা তার সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে দিচ্ছে। নীলা চৌধুরী ধীরে সোজা হয়ে বসলেন। অতঃপর উনি ধীরে ধীরে তরীর দিকে তাকালেন। উনার চোখের দৃষ্টি কঠোর, কিন্তু সেই কঠোরতার আড়ালেও মায়ের উদ্বেগ স্পষ্ট। কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে তিনি শান্ত কণ্ঠে তরীকে জিজ্ঞেস করলেন,

__ উনারা যা বলছেন তা কি সত্যি?

মুহুর্তেই সবাই তরীর দিকে তাকালো সকলেই হয়তো উত্তর শোনার অপেক্ষায়। এইদিকে হৃদয় এখনো একেবারে চুপচাপ বসে আছে। তার মুখের অভিব্যক্তি পড়া অসম্ভব। কিন্তু তার চোখ সোজা স্থির হয়ে আছে প্লাবনের উপর। তার দৃষ্টি এতটাই ঠান্ডা আর তীক্ষ্ণ যে প্লাবন অস্বস্তিতে কুঁকড়ে যাচ্ছে বারবার। মাঝে মাঝে আড়চোখে হৃদয়ের দিকে তাকাচ্ছে। আজ সত্যিই সে ভয় পেয়ে গেছে। তার বুকের ভেতরটা যেন অনবরত কাঁপছে।

ঠিক তখনই পরিবেশটা একটু নরম করার চেষ্টা করলেন প্লাবনের মা । তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

__আহ নীলা! এইভাবে রাগারাগি করলে চলে নাকি? ও তো এখনো ছোট মানুষ। হয়তো বুঝতে পারেনি। উনার কণ্ঠে মায়া মিশে আছে। উনি সবসময়ই তরীকে নিজের মেয়ে স্নেহার মতোই স্নেহ করেন। আজও তার কথায় সেই স্নেহের ছাপ স্পষ্ট।

তরী এতক্ষণ চুপ থাকলেও, এবার আর চুপ করে থাকল না। ও মাথা তুলে সোজা নীলা চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বলল,

__ আম্মু, আমি তো ঐখানে যেতে চাইনি। আমি তো প্লাবন ভাইয়াকে বারবার বলেছিলাম আমি যাব না। কিন্তু উনি বারবার করে বলছিলেন আমাকে। অতঃপর ও সরাসরি প্লাবনের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল,

__ কি হল প্লাবন ভাইয়া? আপনি কিছু বলছেন না কেন? বলুন, আমি কি ঐখানে যেতে চেয়েছিলাম?

ঘরের ভেতর মুহূর্তেই ভারী নীরবতা নেমে এল।
সবাই তাকিয়ে আছে প্লাবনের দিকে। প্লাবনের যেন হঠাৎ করেই দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেল। সে বুঝতেই পারছে না কি বলবে। আজকের এই ঘটনাটা এভাবে ঘুরে দাঁড়াবে, সে কল্পনাও করেনি। আর এই ছোট্ট ঘটনাকে কেন্দ্র করে হৃদয় যে এত বড় পদক্ষেপ নেবে, এটাও তার ভাবনার বাইরে ছিল।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই প্লাবনের মাথার ভেতর হাজারটা চিন্তা ঘুরে গেল। শেষমেশ সে মনে মনে একটা সিদ্ধান্ত নিল,এই পরিস্থিতি থেকে নিজেকে বাঁচাতেই হবে যেভাবে হোক।

প্লাবন কিছু বলার আগেই শিরিন বেগম তখন তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলে উঠলেন,

__ কি বলছিস তুই তরী? আমাদের প্লাবন তোকে সেখানে নিয়ে গেছে? এত বড় মিথ্যে কথা বলছিস তুই? আমরা কি জানি না আমাদের ছেলে কেমন? সে তোকে নিয়ে ঐ দীঘির পাড়ে যাবে? আর সেটা আমরা বিশ্বাস করব?

শিরিন বেগমের কথার জবাবে তরী স্থির গলায় বলল,

__ আপনি বিশ্বাস না হলে প্লাবন ভাইয়াকেই জিজ্ঞেস করুন না।

তরীর এই পাল্টা উত্তরে শিরিন বেগম যেন আরও রেগে গেলেন। একে তো তরীর জন্য উনার এতদিনের সব পরিকল্পনাই ভেস্তে গেছে। তার উপর এই মেয়েটা আবার তার মুখের উপর কথা বলছে আবার এই বাড়ির কেউ তরীকে কিছু বলছেও না। এইটা যেন উনার সহ্য হচ্ছে না।

ঠিক তখনই প্লাবনের মা শান্ত গলায় বললেন,
__ প্লাবন, তরী যা বলছে তা কি ঠিক? তুমি কি ওকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিলে?

প্লাবনের জবাব দেওয়ার আগেই শিরিন বেগম তৎক্ষণাৎ কটাক্ষ করে বললেন,
__ তোমার কি মনে হয় ভাবি আমাদের প্লাবন এইরকম কাজ করতে পারে? এই মেয়েই তাকে সেখানে নিয়ে গেছে আমি নিশ্চিত। এখন আমাদের ছেলেকে ফাঁসাচ্ছে।

ঘরের ভেতর সবাই আবারও প্লাবনের দিকে তাকিয়ে আছে। হয়তো সবাই প্লাবন থেকে জানতে চাইছে সত্যটা।

অতঃপর কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে প্লাবন ধীরে বলল,
_ আম্মু! ফুফু ঠিকই বলছে। তার গলায় কৃত্রিম অসহায়তা। সে আবারও বলল, _ আমি যেতে চাইনি। নয়নাই আমাকে সেখানে ঘুরতে যাওয়ার জন্য রিকোয়েস্ট করছিল। তাই আমি মানা করতে পারিনি।

প্লাবনের মুখ থেকে এমন কথা শোনার পর, তরী যেন আকাশ থেকে পড়ল। ওর চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। ও বিশ্বাসই করতে পারছে না? প্লাবন এমন নির্লজ্জভাবে মিথ্যে বলতে পারে! এমন কিছু তরীর ভাবনারও বাইরে ছিল।

আসলে প্লাবন স্বার্থপর প্রকৃতির। নিজের লাভের জন্য, নিজের সুবিধার জন্য, নিজের নিরাপত্তার জন্য সে যে কোনো কিছু করতে পারে। আজও ঠিক তাই করল।

তখনই শিরিন বেগম যেন বিজয়ী ভঙ্গিতে বললেন,
__ দেখেছো ভাবি? আমি বলিনি? এই মেয়েটা কত অসভ্য! এখন আবার আমাদের হৃদয়কেও ফাঁসাচ্ছে। আসলে বাবার পরিচয়হীন মেয়ে, বাবার শাসন বারন ছাড়া বড় হয়েছে, এইরকমই তো হবে। উনার কণ্ঠ ছিল একদম বিষাক্ত , যেন এতদিনের জমানো রাগ একদিনে উগড়ে দিচ্ছে।

এইদিকে সকলেই বিস্মিত চোখে তাকিয়ে আছেন উনার দিকে, শিরিন বেগম এইরকম কিছু বলবে এইটা হৃদয়ের বাবা মা কল্পনাও করেননি।

তখনই ঠাস!করে ঘরের ভেতর তীব্র একটা শব্দ প্রতিধ্বনিত হল হঠাৎ। মুহুর্তেই সবাই চমকে উঠল।
হৃদয় ঠিক তখনই শিরিন বেগমকে কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু সে আর কিছু বলতে পারলো না তার আগেই নীলা চৌধুরীর সবার সামনে তরীর গালে একটা জোরালো চড় মারলেন। চড় মেরে উনি নিজেই হতবাক।

তরী গালে হাত দিয়ে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মায়ের দিকে। ওর চোখে বিশ্বাসহীনতা।

হৃদয় অনিমা বেগম, ইব্রাহিম খান, হৃদি, তাহির, ঘরে উপস্থিত সবাই হতভম্ব। কারণ আজ পর্যন্ত নীলা চৌধুরী কখনোই তরীর গায়ে হাত তোলেনি।
হৃদয়ও স্থির হয়ে গেছে এক মুহূর্তের জন্য। সে ভেবেছিল সবাই কথা শেষ করলেই সে একে একে সবার ব্যবস্থা করবে। কিন্তু তার আগেই এমন কিছু ঘটবে , সে কল্পনাও করেনি। পরের মুহূর্তেই হৃদয় রাগে উঠে দাঁড়িয়ে গেল। রাগে তার চোখ আগুনের মত লাল হয়ে গেছে। সে প্রায় চিৎকার করে উঠল তখন,

__ মনি!!!

হৃদয়ের সেই বজ্রকণ্ঠে পুরো ঘর আবার কেঁপে উঠল। অনিমা বেগম ছেলের রাগের মাত্রা বুঝে দ্রুত এগিয়ে এলেন তার দিকে।

এইদিকে তরীর চোখ জ্বালা করতে শুরু করেছে।
নীলা চৌধুরীর এই বিহেভিয়ারটা ওর কাছে সম্পূর্ণ নতুন। ছোটবেলা থেকে আজ পর্যন্ত তার আম্মু কখনো তাকে মারেননি। আর আজ? সবার সামনে তাকে মারলেন। তরী যেন এই অপমানটা সহ্য করতে পারছে না। ও তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়াল।
অতঃপর কিছু না বলে দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল।

নীচে দাঁড়িয়ে অনিমা বেগম অবাক হয়ে বললেন,
__এটা তুই কি করলি নীলা? মেয়েটার গায়ে হাত তুললি?

নীলা চৌধুরী নিজেও যেন বিশ্বাস করতে পারছেন না তিনি কি করেছেন। উনার হাত পা কাঁপছে। এটাতো উনি চাইনি, তাহলে কি উনি অন্যদের রাগ নিজের মেয়ের উপর তুললেন। ভয়ে উনি কপালে হাত দিলেন, মুহুর্তেই উনার মনের ভেতর ভয় ঢুকে গেল, এই ঘটনার প্রভাব মেয়ের মনে পড়বে না তো? হৃদয় নীলা চৌধুরীকে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। সম্ভবত সে নীলা চৌধুরীর মনের অবস্থা বুঝতে পেরেছে গেছে। অতঃপর সে আর কিছু বলল না। হঠাৎই ঘুরে দাঁড়িয়ে দ্রুত সিঁড়ির দিকে দৌড়ে উঠল।

চলবে।

আমি নিজেও জানি না কি লিখেছি, রিচেকও দেয়নি।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply