Golpo romantic golpo নয়নার এমপি সাহেব

নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ১২


নয়নার এমপি সাহেব

পর্ব:- ১২
লেখনীতে:- Sanjana’s – গল্পঝুড়ি

তরী তখন হৃদয়ের রুমের এক কোণে দাঁড়িয়ে।
কানে দুহাত চেপে, এক পা ভাঁজ করে তুলে রেখেছে। অতিরিক্ত বিরক্তিতে ওর চোখ মুখ কুঁচকে আছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে ভেতরে ভেতরে ফুঁসছে। তরীর মনে মনে ইচ্ছে করছে হৃদয়ের মাথাটা ফাটিয়ে দিতে। কিন্তু ইচ্ছে আর সাহস তো এক জিনিস না। এই সত্যিটা ও খুব ভালো করেই জানে। ওর ভাবনার মাঝেই হঠাৎ হৃদয় ধীরে মাথা তুলে তাকাল ওর দিকে। মুহুর্তেই ভ্রু দুটো এমনভাবে কুঁচকে গেল যেন চোখ দিয়েই সব বিচার করে ফেলেছে সে।
পরপর গম্ভীর গলায় বলে উঠল,
__আমার মাথা ফাটানোর চিন্তাভাবনা বাদ দিয়ে যদি একটু পড়াশোনাটা মন দিয়ে করতি,তাহলে আজ এই অবস্থা হতো না তোর।

তরী অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল হৃদয়ের দিকে।
এক মুহূর্তের জন্য কানে ধরা হাত দুটো ঢিলে হয়ে গেল ওর। বেচারি ভাবছে হৃদয় কিভাবে ওর মনের কথা বুঝে গেল, ও তো কিছুই বলিনি। তাহলে?
ভয় আর বিস্ময় একসাথে গুলিয়ে গেল ওর চোখের পাতায়। হৃদয় তখনো তাকিয়ে আছে তরীর দিকেই।

পরের দিন সকালবেলা,
আজ খান বাড়ি একদম ফাঁকা। নোহান বাদে অন্যরা সবাই যে যার গন্তব্যে ফিরে গেছে। হৃদয়ের সঙ্গে জরুরি কিছু কাজ আছে বলেই নোহান থেকে গেছে। সকালটা গড়িয়ে কাজের তাগিদে নোহান যখন সদর দরজার কাছে যায়,
ঠিক তখনই—
ঠাস করে এক মুহূর্তের অসাবধানতায় সামনে থেকে আসা এক রমনীর সঙ্গে সজোরে ধাক্কা লেগে যায় তার। নোহান মুখ খুলে কিছু বলবে, তার আগেই মেয়েটির মিষ্টি কণ্ঠ ভেসে এলো।

_ সরি সরি ভাইয়া। আমি খেয়াল করিনি। আপনার কোথাও লাগে নি তো? আগত মেয়েটার কণ্ঠটা এতটাই মিষ্টি, এতটাই কোমল শোনাল যে নোহান এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।কৌতুহল নিয়ে মেয়েটির মুখের দিকে তাকাতেই নোহান আরেকদফা চমকে গেল। সে এক নিমিষে স্থির হয়ে গেল। উজ্জ্বল শ্যামলা, পাতলা গড়নের, বাচ্চা বাচ্চা চেহারার মেয়েটা যেন অকারণেই মন কেড়ে নিল তার। নোহান নিজেই নিজের কাজে অবাক। কই আগে তো এইরকম অনুভূতি হয়নি তার, কম মেয়ে সে দেখেনি, কিংবা কম মেয়ের সঙ্গে সে সম্পর্কে জড়ায়নি? তাহলে এই এক ঝলক দেখাতেই বুকের ভেতরটা হঠাৎ চিনচিন করে উঠল কেন? এই অনুভূতি তো নতুন, বড্ড অচেনা তার কাছে। একদম অপ্রস্তুত করে দেওয়ার মতো অনুভূতি। নোহানের ভাবনার মাঝেই আবার সেই কণ্ঠ, _ভাইয়া, আপনি ঠিক আছেন তো?

মেয়েটির ডাকে নোহান বাস্তবে ফিরে এলো।
সে কিছু বলতেই যাবে, ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে এলো এক চেনা, উচ্ছ্বসিত হাসি।

__প্রমীইইইইইইই! তুই?

পরমুহূর্তেই মেয়েটি ঘুরে তাকালো। তরীকে দেখেই মুখটা ঝলমল করে উঠল ওর। এক পা এগোতেই তরী ছুটে এসে ওকে জড়িয়ে ধরল।

__ দোস্ত! তুই কখন আসলি? আর আসবি যে আমাকে জানালি না কেন? কতদিন হয়ে গেল ভার্সিটিতে যাস না, তোর কোনো পাত্তাই নেই?
আমি আর হৃদি তোকে ভীষণ মিস করি জানিস?
তরী এক নিঃশ্বাসে এতগুলো প্রশ্ন করে ফেলল যে
প্রমী কিছু বলার সুযোগই পেল না।

ঠিক তখনই পেছন থেকে নীলা চৌধুরী শান্ত কণ্ঠে বললেন মেয়েকে,
__ ওকে আগে বসতে দাও আম্মু। কতদিন পর মেয়েটা এসেছে, আর তুমি এসেই প্রশ্নবাণ ছুড়ছো তার উপর।

নিজৈর মায়ের কথায় তরী এক ঝটকায় প্রমীকে ছেড়ে দিল। পরপর মাথা নাড়িয়ে বলল,

__আরে হ্যাঁ! আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম।
আয় প্রমী, আয় বস। তুই বস, আমি এখনই হৃদিকে ডেকে আনছি। ও তোকে দেখলে যেই একটা খুশি হবে রে দোস্ত….

__আমাকে ডাকতে হবে না আমি এসে গেছি। কথাটা শেষ হতে না হতেই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে লাগলো হৃদি। পরপর হৃদিও প্রমীকে দেখতে পেয়ে দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল।

__ প্রমী! তুই কখন আসলি দোস্ত?

প্রমী জবাবে হেসে বলল,
__আমি তো এই মাত্রই এলাম। শুনলাম তোর নাকি শরীর ভালো না। কতদিন ভার্সিটি যায়নি, আর কাল গিয়ে দেখি তরী এবং তুই দুজনেই ভার্সিটিতে আসিসনি, পরে খোঁজ নিয়ে জানলাম তুই অসুস্থ। তাই আজ তোকে দেখতে চলে আসলাম।


তরী, হৃদি আর প্রমী স্কুল জীবন থেকেই তিনজন একসাথে। তিনজনই তিনজনের খুব ভালো বন্ধু। তাই এই বাড়ির সকলেই প্রমীকে চেনে জানে। প্রমীকে দেখেই রান্নাঘর থেকে এগিয়ে এলেন অনিমা বেগম।

__আরে প্রমী! তুই কখন আসলি?

অনিমা বেগমের কথায় প্রমী হালকা হেসে বলল,
__ আমি তো এই মাত্রই এলাম আন্টি। তুমি কেমন আছো ?

__আমি ভালো আছি রে। তুই বল, কতদিন পর আসলি আজ! আমাদের কথা বুঝি একদমই মনে পড়ে না?

অনিমা বেগমের কথার জবাবে প্রমী চোখ নামিয়ে মিষ্টি স্বরে উত্তর দিল,
মনে পড়ে বলেই তো চলে আসলাম আন্টি। তাদের কথোপকথনের মাঝেই নীলা চৌধুরীর বললেন, আচ্ছা তোরা তিনজনে গল্প কর। আমরা তোদের জন্য নাস্তা নিয়ে আসছি। বলেই নীলা চৌধুরী আর অনিমা বেগম কিচেনের দিকে চলে গেলেন। ঠিক তখনই ধীর পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখা গেল হৃদয়কে। প্রমী হৃদয়কে দেখেই হাসিমুখে এগিয়ে এল।

__ কেমন আছো ভাইয়া?

হৃদয়ও হালকা হেসে জবাব দিল,
__আমি ভালো আছি। তোর কী খবর? পড়াশোনা কেমন চলছে?

__ আমি ভালো আছি ভাইয়া, আর পড়াও ভালো চলছে।

__ বাড়িতে সব ঠিক আছে, তোর কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তো?

__না ভাইয়া, সব ঠিক আছে।

__ঠিক আছে কোনো অসুবিধা হলে আমাকে জানাবি।

প্রমী মাথা নেড়ে বলল,
__জ্বী

অতঃপর হৃদয় গিয়ে সোজা তরীর গা ঘেঁষে বসলো। তরী আড়চোখে একবার হৃদয়ের দিকে তাকাল, তারপর আবার হৃদি আর প্রমীর সাথে গল্পে মেতে উঠল।

কিছুক্ষণ যেতেই হঠাৎ হৃদয়ের নজর পড়লো দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা নোহানের দিকে। বেচারা এখনও একই অবস্থায় একই ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। নজর তখনও প্রমীতে।

__ নোহান, ওখানে এইভাবে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?
হৃদয়ের গম্ভীর স্বরে ধ্যান ভাঙল নোহানের।
সে চমকে উঠল এক মুহুর্তে। হৃদয় নোহানের দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকাতেই তার মুখের ভাব কিছুটা কঠিন হয়ে গেল। ঐদিকে নোহান হালকা একটা হাসি ঝুলিয়ে প্রমীর সরাসরি গিয়ে বসল।

হঠাৎই হৃদয় উঠে দাঁড়াল।পরপর নোহানের দিকে তাকিয়ে বলল,
__তোর সাথে কথা আছে। আমার রুমে আয়।

হৃদয়ের কঠিন স্বর‌ শুনে নোহান লাফিয়ে উঠলো একপ্রকার। পরপর পিছু ছুটলো হৃদয়ের। সিঁড়ির কাছে এসে হৃদয় আবারও একবার পেছনে তাকাল। তরী তখন বান্ধবীর সাথে গল্পে মগ্ন। ওর সেই হাস্যজ্জ্বল মুখটা যেন হৃদয়ের সহ্য হল না।
সে হঠাৎ গলা ছেড়ে বলে উঠলো—
__বাঁদর ছানা! আমার রুমে কফি নিয়ে আয়।
দ্রুত। এক মিনিট লেট হলে তোর খবর আছে।

সাথে সাথেই তরী চমকে উঠে হৃদয়ের দিকে তাকাল, আর হৃদয় ইতিমধ্যেই সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যাচ্ছে।

চলবে।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply