নবরূপা
পর্ব_৯
কলমেঅনামিকাতাহসিন_রোজা
ইরফানের মনটা আজ একটু এলোমেলো। বিছানায় হেলান দিয়ে সিলিং ফ্যানে স্থির দৃষ্টি তার। পাশে শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে রয়েছে ইনায়া। মাত্রই ঘুম পাড়িয়েছে তাকে সে। ইরফান বড্ড ভয় পাচ্ছে। নীহারিকা একটা অতি সাধারনের মধ্যে অসাধারণ মেয়ে। বাইরে থেকে দেখে তাকে যতটা শান্ত, ভদ্র, সরল মনে হচ্ছে, হয়তো ভেতর থেকে ততটাই আত্মনির্ভরশীল ও স্মার্ট। যত সহজে ইরফানকে সে আপন করে নেবে, যদি কখনো প্রতারিত হয়, বা অসন্তুষ্ট হয়, তবে ঠিক ততটাই কঠিন ভাবে ইরফানকে প্রত্যাখ্যানও করবে। এই ভাবনা টা ইরফানের জন্য অযৌক্তিক ও অস্বাভাবিক। এমন চিন্তা করার কোনো কারন না থাকলেও সে করছে। কারন কখন কী হবে, ভবিষ্যতে কোন পরিস্থিতিতে পড়তে হবে তা সে জানে না। সে শুধু একটা কথাই জানে যে নীহারিকাকে সে মোটেই ঠকাচ্ছে না। প্রতারণাও করছে না তার সাথে।
হুট করেই ইরফানের ফোন বাজতে শুরু করলো। রাতে ফোন সাইলেন্টে রাখে ইরফান, ইনায়ার ঘুমের যেন অসুবিধে না হয় সেই কারনে। ভাইব্রেশনে সে টের পায় কারো কল এসেছে। স্ক্রিনে ‘ R’ লেখাটি ভেসে উঠতেই ইরফান ইনায়ার গায়ে চাদর ঠিক মত ঢেকে দিলো, ফোনটা হাতে নিয়ে উঠে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো। কলটা ধরার সাথে সাথেই ওদিক থেকে ভেসে এলো কোনো পুরুষের গলা,
—” গুড এভিনিং স্যার। হঠাৎ আমায় স্মরণ করলেন যে…!”
ইরফান কিছুক্ষণ সময় নিয়ে বলল,
—” আগামী সপ্তাহে আমি বিয়ে করছি। দাওয়াত রইলো।”
পুরুষালি কন্ঠটা হেসে উঠলো ওপাশ থেকে। বললে
—” বাপরে! এ কি অবস্থা! আমার মত মানুষকেও আপনাদের ভদ্র সমাজে দাওয়াত দেয়া হয়। আমি তো আশ্চর্য হয়ে গেলাম স্যার! আপনি তো মারাত্মক সাহসী!”
ইরফানও বাঁকা হাসলো।
—” সাহসী বলেই তোমার মত মানুষের সাথে সম্পর্ক রেখেছি। কোনো মানুষকে দেখেছো একটা ক্রিমিনালের নাম্বার সেভ করে রাখতে?’
এবারে পুরুষালি কন্ঠ টা নিভে এলো। বলল
—” স্বার্থ ছাড়া কেও কিছু করে না স্যার!”
—”তাহলে তো তুমি জানোই আমার স্বার্থ কী?”
—”কিন্তু, আপনি মরিচীকার পেছনে ছুটছেন স্যার। আমি কিছুই জানি না। আমি নির্দোষ! আপনার প্রাক্তন স্ত্রীকে আমি….!”
ইরফান কথা শেষ করতে দিলো না। থামিয়ে দিলো মাঝপথে। বলল,
—” আমি আবারো বলছি রুদ্র! তোমায় আবারো সময় দিচ্ছি। সত্যি টা আমায় জানাও দ্রুত। নইলে আমি নিজের খারাপ রূপটা বের করতে বাধ্য হবো। খুব একটা ভালো মানুষও নই আমি। ভেবো না যে, ভদ্র সমাজে একজন শিক্ষক বলে আমি অনেক সরল!”
রুদ্র কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। ওপাশে শুধু হালকা নিশ্বাসের শব্দ। যেন শব্দটাও হিসেব করে ছাড়ছে সে।
তারপর গম্ভীর স্বরে বলল,
—” আপনি বদলাননি স্যার। আগেও ভয় দেখাতেন, এখনো দেখান। কিন্তু সত্য সব সময় আপনার পছন্দের হয় না।”
ইরফান বারান্দার রেলিংয়ে ভর দিল। রাতের বাতাসে গলার স্বর আরও ঠান্ডা হয়ে উঠল।
—” সত্যটা আমার পছন্দের হোক আর না হোক, জানার অধিকার আমার আছে। বিশেষ করে যখন সেই সত্য আমার ভবিষ্যৎ স্ত্রীর জীবন ছুঁয়ে যায়।”
রুদ্র হেসে উঠল। কিন্তু সেই হাসিতে কোনো আনন্দ নেই, কেবল বিদ্রূপ।
—” তাই বুঝি? নীহারিকা ম্যামের কথা বলছেন, তাই তো?”
ইরফানের চোখ কুঁচকে গেল।
—” তার নাম তোমার মুখে মানায় না, রুদ্র। সাবধানে কথা বলো।”
—” আপনি দেখি আগের মতই সতর্ক স্যার!”
একটু থেমে রুদ্র নিচু স্বরে যোগ করল,
—” কিন্তু জানেন স্যার, কিছু আগুন আছে—যত ঢেকে রাখবেন, ততই ধোঁয়া বেরোবে।”
ইরফানের কণ্ঠ এবার কঠিন হয়ে উঠলো,
—” ধোঁয়া আমি সামলাতে জানি। আগুনের উৎসটা জানাও।”
ওপাশ থেকে দীর্ঘশ্বাস এলো।
—”উনি..উনি যেভাবে মারা গেছেন, সেটা পুরোটা দুর্ঘটনা নয় স্যার।”
ইরফানের আঙুল শক্ত হয়ে ফোনটা চেপে ধরল।
—” ভেবে কথা বলো।”
—” আপনিও এটা জানেন স্যার। আমি ভেবেই বলছি। আমি সেখানে ছিলাম না ঠিকই, কিন্তু যিনি ছিলেন, তিনি আবার আমার খুব কাছের মানুষ।”
—”কে?”
—” এই নামটা এখনো বলব না। কারণ বললেই আপনি আমাকে চুপ করিয়ে দেবেন, চিরজীবনের জন্য! “
ইরফান ঠাণ্ডা গলায় বলল,
—” আমি চুপ করাই না রুদ্র। আমি শেষ করি। হয়তো তোমায় করব না, কিন্তু আসল কালপ্রিটকে তো করতেই পারি!”
রুদ্র এবার সিরিয়াস কন্ঠে বলল
—” স্যার, আমি জানি যে আপনার বিয়ের আগে সত্যিটা জানাটা আপনার দরকার। কারণ নীহারিকা ম্যাম যদি জানতে পারেন যে আপনি অন্ধকারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আলো দেখাচ্ছেন, সে আলোয় উনি পা রাখবে না।”
এক মুহূর্তের নীরবতা। বারান্দার বাতি ঝাঁপসা হয়ে এল ইরফানের চোখে।
—” তুমি কী চাও?”
—”সময়। আর নিরাপত্তা।”
—”সময় তোমায় আগেও দিয়েছি।”
—”এবার কম।”
—”কত?”
—” আপনার বিয়ের আগের রাত পর্যন্ত। “
ইরফান হালকা হাসল। কিন্তু সেই হাসি ভয়ংকর।
—” বেশ। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো, রুদ্র। আমি যদি একবার বুঝে যাই তুমি মিথ্যে বলছো.. তাহলে তোমার আর কোনো ‘রাত’ থাকবে না।”
রুদ্র ধীরে বলল,
—” ঠিক তাই স্যার। এই খেলায় হয় সত্য জিতবে, নয়তো আমরা সবাই হারবো।”
লাইন কেটে গেল। ইরফান ফোন নামিয়ে আকাশের দিকে তাকাল। সিলিং ফ্যানের নিচে ঘুমিয়ে থাকা ইনায়া, আর সামনের দিনে দাঁড়িয়ে থাকা নীহারিকার মুখ—দুটোই একসাথে ভেসে উঠল তার চোখে। সে ফিসফিস করে আবারো বলল,
—” আমি কাউকেই ঠকাচ্ছি না, কাওকেই না। কিন্তু সত্য যদি আমাকেই ঠকায়?”
কয়েকটা দিন কেটে গেলো খুব নিঃশব্দে, অথচ ভেতরে ভেতরে ভারী শব্দ তুলে। সময় এগোলেও ইরফানের মন থেমে থেমে হাঁটল। রুদ্র আর ফোন করেনি, ইরফানও আর যোগাযোগ করেনি। অজানা আশঙ্কা বুকের ভেতর জমে রইল, তবে সে আশঙ্কাকে সে বাইরে বেরোতে দেয়নি। কারণ আজ যে দিনটার নাম—বিয়ে।
ভোরের আলো ঠিকরে পড়তেই কবির মহল বাড়িটা অন্যরকম হয়ে উঠল। পরিচিত দেয়ালগুলো যেন নতুন করে শ্বাস নিচ্ছে। উঠোন জুড়ে গাঁদা আর রজনীগন্ধার গন্ধ, দরজার সামনে কলাগাছ, ভেতরে ভেতরে আত্মীয়স্বজনের ব্যস্ত পায়ের শব্দ। কেউ চা চাইছে, কেউ গয়না খুঁজছে, কেউ আবার হঠাৎ হেসে উঠছে অকারণেই। এই বাড়িতে আজ কোনো ভয় নেই, শুধুই উৎসব।
ইরফান সাদা পাঞ্জাবি পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে চেনা স্থিরতা, কিন্তু চোখে লুকোনো অস্থিরতা। আজ আর কোনো প্রশ্ন নয়, কোনো সন্দেহ নয়। আজ শুধু প্রতিজ্ঞা। আজ শুধু নীহারিকা আর নতুন জীবন!
তামান্না আজ অনেকদিন পর সেজেছে। সুন্দর গোলাপি রঙের শাড়ি পড়ে ইনায়াকে কোলে নিয়ে তদারকি করছে সে। গায়ে হলুদও হয়ে গেছে। আজ দুপুরে আরেকবার গায়ে হলুদ হয়েই সন্ধ্যায় বিয়ে পড়ানো হবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তামান্নার সাথে হাতে হাতে আজ কাজ করছে ইয়াশাও। সেও আজ ফর্মাল টিনেজ ড্রেসআপ ছেড়ে কষ্ট করে লেহেঙ্গা পড়েছে। মুখে হালকা মেকআপ! ইনায়াকে সে তামান্নার কোল থেকে নিয়ে বলল,
—” তামান্না যা তো তুই। বাইরে যা দ্রুত। হুসাইন ভাইয়ের গাড়ি ঢুকেছে এলাকায়। হয়তো খুব তাড়াতাড়ি পৌঁছে যাবে, যা ওদেরকে নিয়ে আয়। “
তামান্নাও দেরি না করে গেটের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। হুসাইন হলো ইরফানের ছোট ফুফুর ছেলে। বিদেশে ছিল দীর্ঘ সময়। ঠিক তিন বছর পর পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফিরেছে। কয়েক মাস থেকে আবারো ব্যাক করবে। সকাল থেকে দৌড়াদৌড়ি করতে করতে ঘেমে গিয়েছে তামান্না।শাড়ির আঁচল দিয়ে কপাল মুছে নিয়ে সে উঁকি মেরে দেখতে থাকলো বড় গাড়িটা আসছে কিনা ।কয়েক মিনিটের মধ্যেই গাড়ি দেখতে পাওয়া গেল। তামান্না তড়িঘড়ি করে সিকিউরিটি গার্ডকে বলে দরজা খুলে দিল। গাড়িটা ভেতরে আসতেই তামান্না জোরে জোরে ডেকে উঠলো,” খালামনি তাড়াতাড়ি বাইরে এসো। দেখো কে এসেছে। “
আয়েশা বেগম বাগানেই ছিলেন সেখানে বড় করে স্টেজ সাজানো হচ্ছে। তামান্নার কণ্ঠ শুনে তিনিও দ্রুত দৌড়ে আসলেন। গাড়িটা থামতেই প্রথমে দরজা খুলে নামলো হুসাইন। লম্বা, ছিপছিপে গড়ন, পরিপাটি শার্ট-প্যান্টে একরাশ সহজ হাসি নিয়ে। শ্যাম বর্ণের মুখটা রোদের আলোয় আরও উজ্জ্বল লাগছে। চোখে সেই মানুষগুলোর চেনা উচ্ছ্বাস—যারা দীর্ঘদিন পর বাড়ি ফেরে, অথচ বাড়িটা যেন তাদের জন্যই অপেক্ষা করছিল।
—” আসসালামু আলাইকুম ছোট ম্যাডাম!”
গেটের ভেতর ঢুকেই গলা ভরাট করে বলে উঠল হুসাইন। তামান্না এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল, তারপর হেসে ফেলল।
—” ওয়ালাইকুম সালাম! আরে বাপরে, তুই তো পুরো মানুষ হয়ে গেছিস রে।
হুসাইন হেসে মাথা চুলকালো।
—” মানুষ তো আগেও ছিলাম বোইন, এখন শুধু একটু এক্সপোর্ট কোয়ালিটির!”
এই কথায় আশপাশে হেসে উঠলো দু-একজন। ঠিক তখনই গাড়ির অন্য পাশের দরজাটা খুলে নামলো আরেকজন। হালকা ধূসর লেহেঙ্গা, চুল বাঁধা, চোখে কাজলটা একটু বেশি গাঢ়—মুখে কোনো হাসি নেই, বরং ঠোঁটের কোণে চাপা একরকম বিরক্ত ভাব। তাকিয়ে তাকিয়ে চারপাশটা মেপে নিচ্ছে সে। হুমায়রা। হুসাইনের ছোট বোন!
—” আসসালামু আলাইকুম!”
নিচু স্বরে বলল সে। কণ্ঠে বিনয় আছে, কিন্তু উচ্ছ্বাস নেই। ততক্ষণে আয়েশা বেগম ছুটে এসেছেন। হুসাইনকে দেখেই চোখ দুটো ভিজে উঠল তার। এক পা এগিয়ে এসে দুহাতে মুখটা ধরে বললেন,
—” আল্লাহ! আমার ছেলেটা কত বড় হয়ে গেছে রে! এই তিন বছরে একবারও তো তোকে ঠিক করে দেখা হলো না।”
হুসাইন সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকে পড়ল।
—” মামি, তুমি তো আগের মতোই আছো দেখা যায়। আমায় চিনে ফেললে? আমি তো ভেবেছিলাম চিনবেই না!”
—”চিনবো না?”
আয়েশা বেগম হেসে কপালে হাত রাখলেন তার।
—”তুই তো আমার নিজের ছেলের মতো। বিদেশে থাকিস বলেই দূরে, নাহলে বুকের কাছেই থাকতিস।”
হুসাইনের চোখে মুহূর্তের জন্য নরম একটা আবেশিত আলো ভেসে উঠল।
—” এই কথাটার জন্যই তো দেশে এলে আগে তোমাদের বাড়িতে আসি মামানি।”
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা হুমায়রা তখনো নীরব। আয়েশা বেগম তার দিকে তাকিয়ে হাত বাড়ালেন।
—” এই যে, আমার হুমায়রাও বড় হয়ে গেছে! কী সুন্দর লাগছে আজ।”
হুমায়রা সামান্য মাথা নুইয়ে বলল,
—” ধন্যবাদ মামি!”
চোখে তখনো সেই চাপা, হিসেবি দৃষ্টি, সবকিছু দেখে নিচ্ছে, কিন্তু কিছুই প্রকাশ করছে না। চাপা স্বভাবের মানুষেরা এমনই হয়।
তামান্না হাত নেড়ে বলল,
—” এই যে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা না বলে ভেতরে এসো সবাই। আজ তো বাড়িটা যুদ্ধক্ষেত্র!”
হুসাইন চারপাশে তাকিয়ে হাসল।
—” বুঝতেই পারছি। ইরফান ভাইয়ের বিয়ে বলে কথা!”
হুমায়রা চুপচাপ তার পেছনে হাঁটতে হাঁটতে একবার বাড়ির ভেতরের আলোঝলমলে সাজের দিকে তাকাল। চোখে এক ঝলক কৌতূহল, সঙ্গে অজানা কিছু ভাবনা। হাসি, ব্যস্ততা আর অপেক্ষার শব্দ পেরিয়ে—হুসাইন আর হুমায়রা ধীরে ধীরে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ল। বাড়িটা যেন আরও একটু পূর্ণ হয়ে উঠল তাদের আগমনে।
অন্যদিকে নীহারিকার ঘরে যেন সময় থমকে গেছে। আয়নার সামনে বসে থাকা মেয়েটা আর আগের সেই শান্ত, সাধারণ নীহারিকা নয়। শাড়ির প্রতিটা ভাঁজে যত্ন, কপালের টিপে দৃঢ়তা, চোখে অদ্ভুত এক আলো, ভয় আর সাহসের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে থাকা এক নারীর আলো। রাবেয়া বানু বারবার চোখ মুছছে। মেয়েকে আজ নতুন করে চিনছে সে।
—” আমার মেয়েটাকে আজ এত সুন্দর লাগছে কেন রে?”
কথাটা বলতে বলতেই গলা ভেঙে যায় তার। নীহারিকা হালকা হেসে মায়ের হাতটা চেপে ধরল। সে জানে—আজ তাকে শুধু সাজানো কনে হতে হবে না, তাকে নিজের সবটুকু বিশ্বাস নিয়ে সামনে এগোতে হবে।
বিকেলের দিকে নীহারিকা দের বাড়িটায় লোকজনে ভরে গেলো। কাজী সাহেবের গলা, কোরআনের তিলাওয়াত, ফিসফাস আর চাপা উত্তেজনা—সব মিলে বাতাসটাও ভারী হয়ে উঠল। আর ঠিক তখনই, হলের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা ইরফানের ফোনটা হঠাৎ একবার কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল আবারো একটাই অক্ষর— R।
ইরফান তাকিয়ে রইল। ধরল না। চোখ তুলে তাকাল স্টেজের দিকে, যেখানে কিছুক্ষণের মধ্যেই নীহারিকা এসে বসবে। আজ সিদ্ধান্তের দিন। আজ আর পেছনে ফেরার দিন নয়।
সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে গাঢ় হতে শুরু করেছে। হলের ভেতর তখন আলো জ্বলছে—নরম, উষ্ণ, একটু সোনালি। কাজী সাহেবের গম্ভীর কণ্ঠে কোরআনের তিলাওয়াত থামতেই চারপাশে একটা পবিত্র নীরবতা নেমে এলো। ফিসফাসগুলোও যেন নিজেরাই থেমে গেল। নীহারিকাকে এনে বসানো হলো। মেরুন শাড়িতে সে আজ অন্যরকম—চেনা শান্ত মুখটা আরও স্থির, আরও গভীর। চোখ নামানো, হাত দুটো কাঁপছে সামান্য। বুকের ভেতরটা কেমন জানি খালি খালি লাগছে তার, আবার অদ্ভুতভাবে ভারীও। এত মানুষের সামনে, এত সিদ্ধান্তের মাঝখানে—এই প্রথম সে নিজের জীবনকে এমন করে সামনে এগিয়ে দিতে চলেছে। ইরফান একটু দূরে বসে আছে। গম্ভীর মুখ, চোখে অদ্ভুত দৃঢ়তা। ফোনটা তখনো পকেটেই আছে। পর্দার আড়ালে থাকায় সে এখনো নীহারিকা কে দেখতে পায়নি। তবে আবছা দেখা যাওয়ায় বুঝতে পারলো মেয়েটাকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে।
কাজী সাহেব বিয়ে পড়ানো শুরু করলে নীহারিকার কানে মুহূর্তে সব শব্দ ঝাপসা হয়ে গেল। মনে পড়ে গেল কতটা ভয়, কতটা দ্বিধা, কত না বলা কষ্ট। গায়ের রঙ নিয়ে লুকোনো লজ্জা, নিজেকে ছোট করে নেওয়ার পুরোনো অভ্যাস—সব একসাথে বুকের ভেতর হুলস্থুল করে উঠল। তারপর হঠাৎ মনে পড়লো ইরফানের চোখের সেই দৃষ্টি। বিচারহীন, তুলনাহীন, নিখাদ। এরপর কাজীর বলাতে নীহারিকা খুব আস্তে, কিন্তু স্পষ্ট কণ্ঠে বলল,
—” কবুল।”
এক মুহূর্ত নিস্তব্ধতা। তারপর যেন বাতাস ছাড়ল সবাই একসাথে। কেউ কেউ নিঃশ্বাস ছাড়লো, কেউ চাপা হাসলো। ইরফানের দিকে কাজি সাহেব গেল। ইরফান এক সেকেন্ডও দেরি করল না।
—” কবুল।”
শব্দটা ছোট, কিন্তু দৃঢ়। সিদ্ধান্তটা তো বহু আগেই নেয়া ছিল। তৃতীয়বার কবুল বলার পর কাজী সাহেব দোয়া পড়ালেন। হাত তুলে সবাই ‘আমিন’ বলল। হলের ভেতর হালকা গুঞ্জন, কেউ চোখ মুছছে, কেউ ফোন তুলে ছবি তুলছে। রাবেয়া বানু চুপচাপ বসে কাঁদছেন। আনন্দের কান্না। নিজের মেয়েকে আজ নতুন জীবনের পথে তুলে দিলেন—এই ভাবনাটাই তার চোখ ভিজিয়ে দিচ্ছে। আয়েশা বেগম নীহারিকার মাথায় হাত রেখে দোয়া করলেন, ঠোঁট নড়ে নীরবে। তামান্না দূর থেকে তাকিয়ে আছে—চোখে প্রশান্তির হাসি। ইয়াশা খুশিতে ইনায়াকে কোলে নিয়ে নীহারিকার পাশে গিয়ে বসলো।
নীহারিকার তখন মনে হচ্ছে—সব শব্দ দূরে সরে গেছে। সে শুধু নিজের বুকের ভেতরের ধুকপুকানিটা শুনতে পাচ্ছে। ভয় আছে, অজানা ভবিষ্যৎ আছে, কিন্তু তার মাঝখানে একফোঁটা শান্তিও আছে। আজ প্রথমবার সে নিজেকে লুকোয়নি, ছোট করেনি। আজ সে নিজের মতো করেই কাউকে কবুল করেছে। ধীরে সে চোখ তুলে তাকালো ইরফানের দিকে। ইরফানও তাকিয়ে ছিল। তাদের চোখ মিললো। কোনো কথা হলো না। প্রয়োজনও পড়লো না। বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। আর সেই মুহূর্তে—নীহারিকার জীবনের একটা অধ্যায় নীরবে শেষ হয়ে, আরেকটা শুরু হয়েছে।
চলবে…
আজ লেখা ভালো হয়নি😅 অসুস্থ তো! আর, ১৮ হাজার সদস্যের পরিবার হয়েছি আমরা! অভিনন্দন 🥹❤️ খুব তাড়াতাড়ি, ২০ হাজার যেন হয়ে যাই!
Share On:
TAGS: অনামিকা তাহসিন রোজা, নবরূপা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নবরূপা পর্ব ৪
-
নবরূপা পর্ব ২
-
নবরূপা পর্ব ১১
-
নবরূপা গল্পের লিংক
-
নবরূপা পর্ব ৫(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
নবরূপা পর্ব ১০
-
নবরূপা পর্ব ১
-
নবরূপা পর্ব ৩
-
নবরূপা পর্ব ৮
-
নবরূপা পর্ব ৬