Golpo romantic golpo নবরূপা

নবরূপা পর্ব ২৩


নবরূপা

পর্ব_২৩

কলমেঅনামিকাতাহসিন_রোজা

( ⚠️সেনসিটিভ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। দুর্বল ও ভীতুরা কিছু কিছু অংশ স্কিপ করতে পারেন।)

মিরপুরে অবস্থিত নামটাও হারিয়ে ফেলা পুরোনো স্কুলটা বহু বছর আগেই পরিত্যক্ত হয়েছে। এক সময় সেখানে বাচ্চাদের কোলাহল, বইয়ের পাতার শব্দ, আর সকালের সমবেত প্রার্থনার ধ্বনি ভেসে উঠত। এখন সেখানে শুধু ভাঙা দেয়াল, শ্যাওলা ধরা জানালা, আর বাতাসে উড়ে বেড়ানো শুকনো পাতা। স্কুলের ঠিক পেছন দিকটা আরও ভয়ানক নির্জন।
ঝোপঝাড়ে ঢাকা একটা অংশ—যেখানে সাধারণ কেউ পা রাখে না। কারণ মাটি সেখানে অদ্ভুতভাবে দেবে গেছে। সেই জায়গাতেই আছে একটা গভীর গর্ত। উপরে থেকে দেখলে বোঝা যায় না কিছু। ঘন লতা আর শুকনো ডালপালা দিয়ে এমনভাবে ঢেকে রাখা হয়েছে যেন মনে হয় এটা স্রেফ ঝোপঝাড়।

কিন্তু লতাগুলো সরালেই দেখা যায় নিচে নামার সরু কাদা মাখা সিঁড়ি। সেই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলেই বোঝা যায়, এটা কোনো সাধারণ গর্ত না। এটা একটা অভিশপ্ত আস্তানা। তৈরিকৃত পাতাল! ভেতরে প্রবেশ করলেই প্রথমে যে জিনিসটা ধাক্কা মারে তা হলো গন্ধ।
পচা র”ক্তের গন্ধ। পোড়া মাংসের গন্ধ। আর বহুদিনের জমে থাকা মৃ”ত দেহের গুমোট দুর্গন্ধ। গুহার মত সেই জায়গাটা অন্ধকারে ডুবে আছে। চারদিকে দেয়ালে টাঙানো আছে অদ্ভুত সব তাবিজ আর শুকনো লাল কাপড়। মাটির উপর সাদা চুন আর র”ক্ত দিয়ে আঁকা হয়েছে ভয়ংকর সব জাদুর চক্র। কোথাও আরবি অক্ষরের মত বিকৃত কিছু লেখা৷ কিন্তু সেগুলো কোরআনের আয়াত না, বরং উল্টো করে লেখা বি”কৃত বাক্য।

মাটির একপাশে স্তূপ করে রাখা আছে মানুষের হাড়। কিছু পুরো ক”ঙ্কাল, কিছু শুধু মাথার খু’লি। খুলিগুলোর চোখের গর্তগুলো অন্ধকারে ফাঁকা হয়ে তাকিয়ে আছে। একটা কোণায় ঝুলছে শুকনো কালো সুতা, পুড়ে যাওয়া তাবিজ, আর পশুর হাড়। মাঝখানে রাখা একটা কালো পাথরের মত বেদি। সেই বেদির উপর একটা বড় লোহার পাত্র। পাত্রটার ভেতরে কালচে লাল তরল ফুটছে ধীরে ধীরে। মাঝে মাঝে বুদবুদ উঠে ফেটে যাচ্ছে, আর সেই সাথে বের হচ্ছে তীব্র দুর্গন্ধ।

বেদির সামনে বসে আছে তামান্না ওরফে অনন্যা। তার চুল এলোমেলো হয়ে কাঁধ জুড়ে ঝুলে আছে। চোখ দুটো অস্বাভাবিক লাল। সাদা পোশাকের উপর র”ক্তের ছোপ শুকিয়ে কালচে হয়ে গেছে। তার সামনে মাটিতে রাখা একটা ছোট কাপড়ের পুতুল। পুতুলটার গায়ে কালো সুতা জড়ানো। পুতুলটার মাথায় গোঁজা একটা চুলের গোছা। সেই চুলটা নীহারিকার। অনন্যা ধীরে ধীরে পুতুলটার চারপাশে লাল রং দিয়ে কিছু আঁকছে। তার ঠোঁট নড়ছে অবিরাম। কিন্তু সে যা পড়ছে তা কোনো পরিচিত দোয়া না। শব্দগুলো কর্কশ- বিকৃত। ঠিক যেন কারো গলা দিয়ে মানুষের ভাষা নয়, অন্য কিছুর আওয়াজ বের হচ্ছে।চারপাশের বাতাস ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠছে।
বেদির পাশে রাখা একটা মানুষের খুলির ভেতর জ্বলছে কালো মোমবাতি। মোম গলে খুলির দাঁতের ফাঁক দিয়ে ঝরছে। অনন্যা ধীরে পুতুলটার বুকের দিকে একটা লম্বা সূঁচ বসিয়ে দিল। সাথে সাথে তার ঠোঁটে একটা বিকৃত হাসি ফুটে উঠল। ফিসফিস করে বলল,
—” পালাতে পারবি না নীহারিকা..!”
তার কণ্ঠ যেন দুটো মানুষের গলার মত শোনাল।
—” তোর শরীর আমার হবে…”
সে আবার মন্ত্র পড়তে শুরু করল। পাত্রের ভেতরের তরল হঠাৎ জোরে ফুটতে লাগল। দেয়ালের ঝুলন্ত তাবিজগুলো হাওয়ায় নাড়তে লাগল অদ্ভুতভাবে। মাটির এক কোণায় রাখা একটা শুকনো রক্তমাখা ছুরি ধীরে ধীরে কেঁপে উঠল। অনন্যা চোখ বন্ধ করে গভীর স্বরে বলল,
—” ইরফান..শুধু আমার…!”
তার সামনে থাকা পুতুলটার গলা শক্ত করে চেপে ধরল সে। আর ঠিক সেই মুহূর্তে— দূরে কোথাও
একটা অদ্ভুত অদৃশ্য হাসি প্রতিধ্বনির মত গুহার ভেতর ঘুরে উঠল। অনন্যা চোখ খুলল। তার ঠোঁটে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল এক ভয়ংকর সন্তুষ্টির হাসি। কারণ সে বুঝতে পারছে— নীহারিকার উপর তার বান এখন পুরো শক্তিতে কাজ শুরু করেছে।


নিজ গতিতে গাড়ি চলছে। ইরফান কোনো কিছু না জেনে অন্ধের মত নীহারিকা যেভাবে বলছে সেভাবেই গাড়ি চালাতে শুরু করেছে। অদ্ভুত বিষয় হলো নীহারিকা জানালায় মাথা ঠেকিয়ে চোখ বুঁজে রেখেই ডিরেকশন দিচ্ছে ইরফানকে। অবস্থা দেখে ইরফান জিজ্ঞেস করল,
—” তুমি আগেও তামান্না.. আই মিন অনন্যাকে খুঁজতে এদিকে এসেছিলে?”

নীহারিকা এবারে চোখ খুলে তাকালো। তবে ইরফানের দিকে নয়, জানালার বাইরে দিকে। বলল,
—” হ্যাঁ, আমি এসেছিলাম এদিকে।”

ইরফান অবাক হলো,
—” আমার অজান্তে অনেক কিছুই করে ফেলেছো। তুমি এত কিছু জেনেছো কীভাবে নীহা? এসব জাদুবিদ্যা সম্পর্কে কি তোমার ধারনা রয়েছে?”

নীহারিকা মলিন হাসলো। বলল
—” সত্যি বলতে গেলে, হ্যাঁ আমার ধারনা রয়েছে। আমার দাদু বাড়ি ছিল দেশের দক্ষিণ অঞ্চলে। গ্রামে অনেকটা সময় কাটিয়েছি কিশোরী বয়সে। আমার ফুফা এসব করতো। কালো জাদু করে আমার ফুফুকে বিয়ে করেছিল। সে অনেক বড় কাহিনী। কিন্তু সেই এলাকায় এসব জাদু চর্চা হতো। একদম নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় যেন। আর আমার ফুফু এসবে স্বীকার হওয়াতে আমারও একটুআধটু ধারনা রয়েছে।”

ইরফান বোঝার ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। গাড়ির ভেতরে অদ্ভুত এক ভারী নীরবতা। নীহারিকা এখনো জানালার কাঁচে মাথা ঠেকিয়ে বসে আছে। তার চোখ আধবোজা। ঠোঁট শুকনো। কিন্তু সে ঠিকই বলছে,
—” সামনে বাঁ দিকে নিন… তারপর সোজা… তারপর ডান দিকে একটা ভাঙা রাস্তা পাবেন…”
ইরফান ঠিক সেভাবেই গাড়ি চালাচ্ছে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর হঠাৎ তার মনে একটা অস্বস্তি হলো। সে একবার পাশ ফিরে তাকাল। নীহারিকা তার সাথে কথা বলছে, কিন্তু একবারও তার দিকে তাকাচ্ছে না।
সবসময় জানালার বাইরেই তাকিয়ে। ইরফান ভ্রু কুঁচকাল।
—” নীহা…”
নীহারিকা শান্ত গলায় বলল,
—” বলুন।”
—” তুমি আমার দিকে তাকাচ্ছো না কেন?”
নীহারিকা কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু বলল,
—” সামনে সোজা যান।”
ইরফানের বুকের ভেতরটা কেমন অস্বস্তি করতে লাগল।
—” নীহারিকা…”
এবার তার গলায় একটু জোর এলো।
—” আমার দিকে তাকাও।”

কোনো সাড়া নেই। শুধু জানালার বাইরের দিকে তাকিয়ে নীহারিকা ফিসফিস করে বলল
—” আর একটু সামনে যান তারপর ডান দিকে ঘুরবেন..!”

ইরফানের বুক ধড়ফড় করতে শুরু করল। সে এবার একেবারে জোর গলায় বলল,
—” নীহারিকা! আমার দিকে তাকাও!”

ধীরে, খুব ধীরে নীহারিকা তার মাথা ঘোরাতে শুরু করল। সময়টা যেন হঠাৎ ধীর হয়ে গেল। ইরফানের চোখ ধীরে ধীরে তার মুখের দিকে পড়ল, আর পরের মুহূর্তেই তার বুকের ভেতরটা যেন থেমে গেল। নীহারিকার মুখের ডান পাশ স্বাভাবিক। কিন্তু বাম পাশ, ওটা মানুষের মুখ না। মাংসগুলো যেন প”চে গলে গেছে। গালের চামড়া নেই প্রায়। ভেতরের কালচে মাংস আর হাড়ের আভাস দেখা যাচ্ছে। বাম চোখের জায়গাটা ফাঁকা। ঠিক যেন চোখটা কেউ তুলে নিয়েছে—শুধু একটা অন্ধকার গর্ত। সেই গর্তের ভেতর থেকে কালচে র”ক্ত জমে শুকিয়ে আছে। গাল বেয়ে নেমে এসেছে পচা তরল। তার ঠোঁটের বাম পাশটাও বিকৃত হয়ে গেছে। চামড়া ছিঁ”ড়ে গিয়ে দাঁতগুলো অস্বাভাবিকভাবে বের হয়ে আছে। গাড়ির ভেতরে সাথে সাথে ভেসে উঠল পচা মাংসের তীব্র গন্ধ। ঠিক যেন বহুদিনের ম”রা লা”শ গাড়ির ভেতর বসে আছে।

নীহারিকার সেই বি”কৃ”ত মুখটা ধীরে ধীরে ইরফানের দিকে ঘুরে তাকাল। ইরফানের বুক থেকে একটা আ”তঙ্কিত চিৎকার বেরিয়ে এল।
—” আল্লাহ!” তার হাত স্টিয়ারিং থেকে প্রায় ছিটকে গেল। সে হঠাৎ ব্রেক চাপল জোরে। গাড়ির চাকা ঘর্ষণের শব্দ তুলে রাস্তার মাঝখানে হঠাৎ থেমে গেল।
ইরফানের বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। তার চোখ ভয়ানক আতঙ্কে বড় হয়ে গেছে। সে কাঁপা গলায় বলল,
—” নী… নীহারিকা… তোমার মুখ…!”
কিন্তু ঠিক তখনই, নীহারিকা আবার মাথা ফিরিয়ে জানালার বাইরে তাকাল। কয়েক সেকেন্ড পর ধীরে বলল,
—” কী হয়েছে?”
ইরফান কাঁপতে কাঁপতে আবার তার দিকে তাকাল।
এবার, মুখটা পুরো স্বাভাবিক। একদম আগের মত। কোনো ক্ষ”ত নেই। কোনো প”চা মাংস নেই। সবকিছু স্বাভাবিক। নীহারিকা ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
—” গাড়ি থামালেন কেন? কী হয়েছে আমার মুখে?”

নীহারিকা এবারে আয়নায় দেখলো নিজেকে। এবারে একই জিনিস সেও দেখতে পেলো। সাথে সাথে শরীর শিউরে উঠতেই চোখ খিঁচে বন্ধ করে আবারো তাকালো নীহারিকা। এবারে সব স্বাভাবিক দেখে বলল,
—” কী হয়েছে ইরফান? সব তো ঠিকই আছে।”

ইরফানের গলা শুকিয়ে গেছে। তার ঠোঁট কাঁপছে।
সে বুঝতে পারছে না সে যা দেখেছে, ওটা ভ্রম… নাকি সত্যি। কিন্তু তার নাকে এখনো ভেসে আসছে সেই ভয়ানক প”চা লা”শের গন্ধ।আর তার বুকের ভেতর একটা কথাই ঘুরছে, অনন্যার বান এখন শুধু নীহারিকার উপর না, তার উপরেও কাজ শুরু করেছে। ইরফান কাঁপা কন্ঠে বলল
—” তোমার মুখে….

নীহারিকা তার কথা থামিয়ে বলল
—” এই সময় থেকে জাদুর শেষ সময় পর্যন্ত যা যা দেখবেন, কিছুই সত্যি না ইরফান। আমি বা আপনি কেওই বাস্তবে কিছু দেখছি না ঠিক আছে? শান্ত হোন।”

ইরফান মাথা নেড়ে বলল- ঠিক আছে। ঠিক পরমুহূর্তে আবারো তাকালো নীহারিকার দিকে। ভীষণ কাতর দৃষ্টিতে তাকিয়ে এক ঝটকায় তাকে জড়িয়ে ধরল ইরফান। নীহারিকা কে ভীষণ আকুল হয়ে জড়িয়ে ধরলো বুকের মাঝখানটায়। মেয়েটার চুলে মুখ ডুবিয়ে শান্তির শ্বাস নিয়ে অস্ফুটস্বরে বলল,
—” আমায় ক্ষমা করে দাও! মাফ করো আমায়।”

নীহারিকা অনুভূতিশূন্য দৃষ্টিতে শূন্যে তাকিয়ে ইরফানের পিঠে হাত বুলিয়ে দিল। বলল,
—” মাফ চাওয়ার কিচ্ছু নেই। ভাগ্যকে মেনে নিতে হয়। তকদির বিশ্বাস করি আমি। আপনার উপর এটুকুও রাগ নেই আমার।”

ইরফান একইভাবে ভাঙা স্বরে জিজ্ঞেস করল,
—” আমরা কী করতে যাচ্ছি? তোমার কিছু হবেনা তো?”

নীহারিকা অনেকটা সময় নীরব থাকলো। স্বান্তনা দিয়ে অদ্ভুত সুরে বলল
—” আপনার কিচ্ছু হবে না। ইনায়ারও কিচ্ছু হবেনা।”

—” আর তোমার? “

নীহারিকা ঠোঁট কাঁমড়ে বলল
—” নিশ্চিত বলতে পারছি না।”

নীহারিকার শেষ কথাটা যেন গাড়ির ভেতরের বাতাসকে জমিয়ে দিল। ইরফানের বুকের ভেতর গিয়ে এমনভাবে বিঁধল যেন কেউ ঠান্ডা ছুরি ঢুকিয়ে দিয়েছে। সে হঠাৎ নীহারিকাকে একটু দূরে সরিয়ে মুখের দিকে তাকাল। চোখদুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে গেছে।
—” কী বললে তুমি?” তার কণ্ঠে আতঙ্ক স্পষ্ট।
—” নিশ্চিত বলতে পারছো না মানে কী?”
নীহারিকা কোনো উত্তর দিল না। শুধু কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তাকিয়ে রইল। ইরফানের বুক ধড়ফড় করছে।
—” নীহারিকা..!”
তার গলা কেঁপে উঠল।
—” এসবের মানে কী?”

নীহারিকা ধীরে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। জানালার বাইরে তাকাল আবার। রাস্তার দুপাশে গাছগুলো কেমন অদ্ভুতভাবে কাঁপছে বাতাসে। সে খুব ধীরে বলল—
—” আমরা যে জায়গায় যাচ্ছি, সেখানে পৌঁছানোর পর দুটো জিনিসের একটা হবেই।”

ইরফানের বুক কেঁপে উঠল।
—” কী?”

নীহারিকা এবার তার দিকে তাকাল।
তার চোখে অদ্ভুত শান্তি।
—” হয় অনন্যার মৃত্যু হবে।”

একটু থামল সে। তারপর খুব নিচু স্বরে বলল—
—” না হয়…”

ইরফানের বুকের ভেতরটা শক্ত হয়ে গেল।
—” না হয় কী?”

নীহারিকা গভীর নিঃশ্বাস ফেলল।
—” না হয় আমি পুরোপুরি ওদের কবলে চলে যাব। ওদের জগতে।”

গাড়ির ভেতরটা হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ইরফানের মুখের রং মুহূর্তেই উধাও। কাতর স্বরে চিৎকার করলো সে,
—” না!”
হাত কাঁপছে তার ইরফানের,
—” এটা কী বলছো তুমি! এমন কিছু হতে দেব না আমি!”

নীহারিকা শান্ত গলায় বলল,
—” এটা আপনার হাতে নেই ইরফান।”

—” তাহলে কার হাতে!” তার কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছে।
—” কার হাতে আছে এটা!”

নীহারিকা ধীরে বলল,
—” জানি না।”

ইরফান কিছুক্ষণ স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল। তার বুকের ভেতর একটা ভয়ানক অপরাধবোধ জমে উঠছে।
—” সব আমার জন্য হয়েছে…!”
সে ফিসফিস করে বলল। কথা শেষ করতে পারল না।

নীহারিকা শান্ত স্বরে বলল,
—” যা হবার হবে। এত চিন্তার কিছু নেই।”
তারপর ধীরে যোগ করল,
—” এখন আমাদের সামনে যা আছে, সেটা মোকাবিলা করতে হবে।”

ইরফান অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
—” কিন্তু তোমার যদি কিছু হয়ে যায়…”
গলা আটকে গেল তার।

নীহারিকা হালকা হাসল।
—” দেখা যাক..
ইরফানের বুকের ভেতরটা আবার মোচড় দিয়ে উঠল।
সে হঠাৎ মাথা নাড়ল জোরে।
—” না!”
তার কণ্ঠ দৃঢ় হয়ে উঠল এবার।
—” তুমি এসব কথা এখন বলবে না।”
স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরল ইরফান।
—” তুমি কোথাও যাবে না। কিচ্ছু হবেনা তোমার।”
চোখে একরকম জেদ জ্বলে উঠল যেন,
—” আমি কাউকে মর”তে দেব না আর।”
নীহারিকা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তাকিয়ে রইল তার দিকে। চোখে অদ্ভুত এক মমতা ফুটে উঠল।
ঠিক তখনই, দূরে রাস্তার শেষে একটা ভাঙা স্কুলের অবয়ব দেখা গেল। জং ধরা গেট…ভাঙা দেয়াল…আর চারপাশে অস্বাভাবিক নীরবতা। নীহারিকার বুক ধীরে ধীরে ওঠানামা করল। সে ফিসফিস করে বলল,
—” এসে গেছি।”
★★

ভাঙা স্কুলটার ভেতরে পা রাখতেই এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা তাদের ঘিরে ধরল। মনে হচ্ছিল যেন বহু বছর ধরে এখানে মানুষের পায়ের শব্দ পড়েনি। চারপাশে ধুলো জমে আছে, দেয়ালের প্লাস্টার খসে পড়ে জায়গায় জায়গায় কালচে দাগ হয়ে আছে। ছাদের কোনায় কোনায় মাকড়সার জাল, বাতাসে একটা স্যাঁতসেঁতে পচা গন্ধ। ইরফান ধীরে ধীরে চারদিকে তাকাল। তার বুকের ভেতর ধকধক করছে। নীহারিকা ইরফানের হাত ধরলো শক্ত করে, নিচু স্বরে বলল,
—” সাবধানে থাকবেন। এই জায়গাটা স্বাভাবিক না।”
দুজনেই ধীরে ধীরে করিডোর ধরে এগোতে লাগল। করিডোরের মেঝেতে ছড়িয়ে আছে ভাঙা বেঞ্চ, ছেঁড়া বইয়ের পাতা, আর জায়গায় জায়গায় কালচে দাগ, যেন বহুদিনের শুকনো র”ক্ত। হঠাৎ ইরফানের চোখে পড়ল মেঝের এক কোণায় অদ্ভুত একটা চিহ্ন। মাটিতে গোল করে কিছু আঁকা। তার চারপাশে ছড়িয়ে আছে পুড়ে যাওয়া ধূপকাঠি, কালো মোমবাতির গলিত মোম আর অদ্ভুত কিছু শুকনো পাতা। নীহারিকা নিচু হয়ে দেখল। তার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।
—” এখানে জাদু করা হয়েছে।”

ইরফানের গা কাঁটা দিয়ে উঠল। পুরো জায়গাটাতে যে অনৈতিক কার্যক্রম চালানো হতো তা বোঝাই যাচ্ছে। তারা আরো ভেতরে এগোলো। হঠাৎ করিডোরের একদম শেষ মাথায় মেঝের একটা অংশ আলাদা মনে হলো। নীহারিকা পা দিয়ে চাপ দিতেই কাঠের মত শব্দ হলো। সে নিচু হয়ে ধুলো সরাতেই একটা পুরোনো লোহার দরজার আকার ফুটে উঠল। মাটির নিচে লুকানো দরজা। ইরফান শুকনো ঢোক গিলে বলল,
—” এইটাই?”

নীহারিকা কিছুক্ষণ দেখে ধীরে মাথা নাড়ল,
—” তাই তো মনে হচ্ছে। “

দুজন মিলে কষ্ট করে দরজাটা টেনে তুলতেই নিচ থেকে ঠান্ডা বাতাসের সাথে এমন এক ভয়ানক গন্ধ বেরিয়ে এলো যে ইরফানের বুক কেঁপে উঠল। পচা মাংস আর রক্তের তীব্র গন্ধ। সিঁড়ি নেমে গেছে অন্ধকার পাতালে। ইরফান ফোনের আলো জ্বালাল। ধীরে ধীরে তারা সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে লাগল। প্রতিটা পা ফেলার সাথে সাথে কাঠের সিঁড়ি কর্কশ শব্দ করছে। মনে হচ্ছিল যেন এই শব্দে অন্ধকারের ভেতর কিছু একটা জেগে উঠবে। নিচে নামতেই তারা যে দৃশ্য দেখল, ইরফানের বুকের ভেতরটা জমে গেল।

একটা বিশাল ঘর। কিন্তু সেটা কোনো মানুষের থাকার জায়গা নয়। চারপাশের দেয়ালজুড়ে ঝুলছে মানুষের কঙ্কাল। কেউ পুরো, কেউ অর্ধেক। কিছু ক”ঙ্কালের মাথার খুলি ফেটে আছে, কিছুতে এখনো কালচে মাংসের টুকরো লেগে আছে। মেঝের উপর আঁকা অদ্ভুত সব চিহ্ন। র”ক্ত দিয়ে আঁকা। বড় বড় বৃত্ত, ত্রিভুজ, অজানা ভাষার মত আঁকিবুঁকি। সেই বৃত্তের মাঝখানে রাখা কালো মোমবাতি। মোমবাতিগুলোর গায়ে জমে থাকা শুকনো র”ক্তের দাগ। এক কোণায় পড়ে আছে মানুষের হাড়ের স্তূপ। তার পাশে রাখা মরিচা ধরা ছুরি, করাত, আর অদ্ভুত কিছু লোহার সরঞ্জাম। আরেক কোণায় ঝুলছে কয়েকটা কাঁচের বোতল। ভেতরে কিছু কালচে তরল। কিছু বোতলের মধ্যে ভাসছে মানুষের আঙুল। একটাতে যেন একটা ছোট শিশুর হাত। নীহারিকার গা শিউরে উঠল। তার বুক কাঁপছে। মনে হচ্ছে যেকোনো মুহূর্তে বমি করে ফেলবে। হঠাৎ, ঘরের আরেক প্রান্ত থেকে একটা অদ্ভুত শব্দ ভেসে এলো। কারো খাওয়ার শব্দ। কটমট করে যেন কেউ খুব লোভ নিয়ে কিছু খাচ্ছে। আবার কিছুক্ষণের মধ্যে ঢকঢক করে কিছু খাওয়ার শব্দও এলো।

ইরফান আর নীহারিকা একসাথে সেই দিকে তাকাল। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। আর কয়েক পা এগোতেই তারা থমকে দাঁড়াল। সামনে যে দৃশ্যটা, সেটা মানুষের চোখে দেখা সবচেয়ে বিভ”ৎস দৃশ্যগুলোর একটা। ঘরের মাঝখানে একটা বড় পাথরের পাত্র। পাত্রের ভেতর ঘন লাল তরল, র”ক্ত। আর সেই পাত্রের সামনে বসে আছে অনন্যা।
তার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কাঁধে ঝুলে আছে। চোখ দুটো অস্বাভাবিকভাবে বড়। ঠোঁট আর থুতনি বেয়ে টপটপ করে লাল তরল গড়িয়ে পড়ছে। সে দুহাতে পাত্রটা ধরে মুখ নামিয়ে র”ক্ত খাচ্ছে। লোভী পশুর মত। আবার মাঝে কিছু হাড়গোড়ও খাচ্ছে শব্দ করে। হঠাৎ সে মাথা তুলে আবার পাত্রে মুখ দিল। তার ঠোঁটের পাশে জমে থাকা র”ক্ত আলোতে চকচক করছে। দৃশ্যটা এত ভয়ানক, ইরফানের বুক ধক করে উঠল। সে এক ঝটকায় নীহারিকাকে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল। নীহারিকার শরীর কাঁপছে। তার মুখ বিকৃত হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে এখনই বমি করবে। তার চোখে আতঙ্ক জমে উঠেছে। নীহারিকা কাঁপা স্বরে ফিসফিস করল,
—” আল্লাহ! এসব কি দেখছি ইরফান! আমার ধারনার থেকেও বেশি ভয়ানক এই অনন্যা। ও তো মানুষ না।”

আর ঠিক সেই মুহূর্তে, অনন্যা ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকাল। তার চোখদুটো অস্বাভাবিক লাল। আর ঠোঁটের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে টাটকা র”ক্ত। সে ধীরে ধীরে হাসল। একটা বি”কৃত, শীতল, অমানুষিক হাসি। সেই হাসিটা দেখে ইরফান আর নীহারিকা দুজনেই ভয় পেলো। অনন্যা মনে হয় টের পেয়েছে তাদের উপস্থিতি। অনন্যার ঠোঁটের কোণের সেই বিকৃত হাসিটা ধীরে ধীরে আরও চওড়া হয়ে উঠল।
ঘরের অন্ধকারে মোমবাতির ক্ষীণ আলো তার র”ক্তমাখা মুখে পড়ে এমন এক বিভ”ৎস ছায়া তৈরি করছিল, যেন কোনো মানুষ নয়—কোনো নরখাদক দানব বসে আছে সেখানে। সে ধীরে ধীরে পাথরের পাত্রটা নামিয়ে রাখল। পাত্রের ভেতরের র”ক্ত নড়েচড়ে উঠল, লাল তরলটা ঢেউ খেয়ে পাত্রের কিনার ছুঁয়ে আবার নিচে নেমে গেল। অনন্যা জিভ দিয়ে ঠোঁট চে!টে নিল। তার জিভটাও রক্তে ভিজে লাল। তারপর খুব ধীরে, প্রায় অলস ভঙ্গিতে মাথাটা কাত করল সে। চোখদুটো সরাসরি তাকিয়ে আছে অন্ধকারের সেই কোণটার দিকে—যেখানে দাঁড়িয়ে আছে ইরফান আর নীহারিকা। নীহারিকার বুক ধড়ফড় করছে। সে ফিসফিস করে বলল,
—” আমাদের দেখে ফেলেছে ইরফান!”

ইরফান নীরবে নীহারিকার কাঁধ আরও শক্ত করে ধরল। – ‘ এবার কী হবে?”

ঠিক তখনই, অনন্যার ঠোঁট নড়ল। কিন্তু তার গলা থেকে বের হওয়া শব্দটা মানুষের মত শোনাল না। একটা কর্কশ, ঘষা ধাতব শব্দের মত।
—” লুকিয়ে দাঁড়িয়ে আছো কেন ইরফান?”

তার কণ্ঠ ঘরের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে অদ্ভুত প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে এল।
—” বের হয়ে এসো..! আমার কাছে এসো!”

ইরফানের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। নীহারিকার হাত কাঁপছে। অনন্যা এবার ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার গায়ের কাপড় ছেঁড়া, জায়গায় জায়গায় শুকনো রক্তের দাগ। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে মুখের অর্ধেক ঢেকে রেখেছে। সে ধীরে ধীরে ঘাড় বাঁকিয়ে অন্ধকারের দিকে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে সেই ভয়ানক হাসি।
—” ইরফান…”
নামটা উচ্চারণ করল সে এমনভাবে, যেন বহুদিন ধরে অপেক্ষা করছিল এই মুহূর্তটার জন্য। ইরফানের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। নীহারিকা স্তব্ধ।
অনন্যা আবার বলল,
—” ভাবছো আমি টের পাইনি?”
সে ধীরে ধীরে এক পা এগিয়ে এল। তার পায়ের নিচে ভাঙা হাড় কড়মড় করে ভেঙে উঠল।
—” এতদিন ধরে তোমার জন্য অপেক্ষা করছি…”
তার চোখ দুটো অস্বাভাবিক উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
—” বিশেষ করে…
তার দৃষ্টি হিংস্র হয়ে উঠল।
—” তোমার শরীরের জন্য…
চোখে তখন তার এক অদ্ভুত লালসা আর পৈশাচিক উন্মাদনা।

নীহারিকার বুকের ভেতরটা ঠান্ডা হয়ে গেল। কিন্তু সেই ভয়টা মাত্র কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী হলো। তারপরই তার চোখের ভেতর অন্যরকম একটা দৃঢ়তা ফুটে উঠল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সবকিছু ভেবে নিয়ে নীহারিকা ইরফানকে চেপে ধরল। এক ঝলকে যেন সব হিসাব করে ফেলল সে। ইরফান কিছু বুঝে ওঠার আগেই নীহারিকা দ্রুত নিজের পায়ের জুতোর ভেতর হাত ঢুকিয়ে দিল। সেখান থেকে বের করল একটা চিকন, ধারালো ছু”রি। ছুরিটার ধাতব ফলক মোমবাতির আলোয় চিকচিক করে উঠল। পরের মুহূর্তেই, নীহারিকা ঝটকা দিয়ে ইরফানকে নিজের সামনে টেনে আনল। তারপর এমন দ্রুততায় ছুরিটা ইরফানের গলার কাছে ঠেকাল যে ইরফান সম্পূর্ণ হতভম্ব হয়ে গেল।
—” নীহা! তুমি কী—”
কথা শেষ করার আগেই নীহারিকার কণ্ঠ ভেসে উঠল।
কঠিন। ঠান্ডা।
—” এক পা-ও এগোবেনা অনন্যা!”

ঘরের ভেতর শব্দটা প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠল। অনন্যা থেমে গেল। তার চোখে হঠাৎ বিস্ময়ের ঝলক। র”ক্তাক্ত চোখদুটোতে আরো আঁধার নামলো। নীহারিকা এবার ধীরে ধীরে ইরফানকে নিয়ে সামনে এগিয়ে এলো অনন্যার সামনে। এমনভাবে দাঁড়াল যেন সে নিজেই ঢাল, আর ইরফান তার সামনে বন্দী। ছুরিটার ধার ইরফানের গলার চামড়া ছুঁয়ে আছে। সামান্য চাপ দিলেই র”ক্ত বের হয়ে আসবে। ইরফানের বুক ধড়ফড় করছে। সে বুঝতে পারছে না কী হচ্ছে। নীহারিকা কী করছে বুঝতে পারল না।

অনন্যা কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। তার চোখে তখন ভয়ানক অস্থিরতা। নীহারিকা ঠান্ডা গলায় বলল,
—” আর এক পা এগোলে, আমি ইরফান কবির কে মে রে ফেলব।”

ঘরের বাতাস যেন জমে গেল। অনন্যার ঠোঁটের বিকৃত হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। সে ফিসফিস করে বলল,
—” কী বললি তুই?”

নীহারিকার চোখ স্থির। সে বাঁকা হেসে বলল,
—” তুই খুব ভালো করেই জানিস আমি কী বলেছি। এক্ষুনি সবকিছু বন্ধ কর। আমার উপর থেকে বান সরা। আমাকে মুক্তি দে। নইলে এই মানুষকে আমি মেরে ফেলব।”
সে ছুরিটা আরও একটু চেপে ধরল। ইরফানের গলায় চিকন একটা লাল দাগ ফুটে উঠল। অনন্যার চোখ হঠাৎ ভয়ানকভাবে বড় হয়ে গেল।
—” না!” তার গলা কেঁপে উঠল।
—” ওকে আঘাত করবি না!”

নীহারিকার ঠোঁটে হালকা তিক্ত হাসি ফুটে উঠল।
—” আমি নিজেকে বাঁচানোর জন্য সব করতে পারি তামান্না..ওহ সরি, অনন্যা। “

অনন্যা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো। কর্কশ ও বি”শ্রী হাসিটা প্রতিধ্বনি হতে লাগলে নীহারিকা আরো তটস্থ হয়। ইরফান এখনো বুঝতে পারছেনা এসব কী হচ্ছে তার সাথে। অনন্যা এবারে হাসতে হাসতে বলল,
—” আমাকে দেখে কি তোর বলদ মনে হয়? তুই কখনোই ওকে মারবি না আমি জানি। কোন পাগলে নিজের স্বামীকে মারে হ্যাঁ?”

নীহারিকা পাল্টা হাসলো। বাঁকা হেসে বলল,
—” এটাই তো তোর ভুল ধারনা। আমি নিজেকে বাঁচানোর জন্য সবই করতে পারি। স্বামী নিয়ে আমি কী করব যদি নিজেই না বাঁচি।”
এই কথাটা শুনে অনন্যার মুখের অভিব্যক্তি মুহূর্তেই বদলে গেল। তার চোখে উন্মাদনা আর আতঙ্ক একসাথে জ্বলে উঠল। নীহারিকা এবার ঠান্ডা স্বরে বলল—
—” তাই যা বলছি দ্রুত কর। আর কোনো চালাকি করার চেষ্টা করবি না।”

অনন্যার বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। তার চোখ দুটো স্থির হয়ে আছে ইরফানের গলার উপর। ছুরিটার ধার ঠিক যেখানে লেগে আছে সেখানে। তার গলা দিয়ে একটা কর্কশ শব্দ বের হলো,
—” তুই এটা করতে পারিস না। তোকে শেষ করে দেব আমি। ছেড়ে দে আমার ইরফানকে।”

নীহারিকা এবার সরাসরি তার চোখে চোখ রেখে বলল,
—” আমাকে না চিনে, আমার পরিচয় না জেনে আমার উপর বান মা”রাটা তোর উচিত হয়নি অনন্যা। তোর কি মনে হয় তোকে আমি চিনতে পারিনি?”

এবারে ইরফানও অবাক হয়ে তাকালো। অনন্যা অস্বাভাবিক ভাবে মাথা নেড়ে চোখমুখ ফ্যাকাসে করে বলল,
—” তুই আমাকে চিনিস? কে রে তুই?”

নীহারিকা হাসলো। ঠান্ডা স্বরে বলল,
—” চিনবো না কেনো? এই জগতে তোর নাম জেনু। যে কিনা আমার ফুফার কাছেই জাদুবিদ্যার প্রাথমিক শিক্ষা নিয়েছিলি।আমার স্পষ্ট মনে আছে। আমার ফুপা তোকে নিয়ে ইন্ডিয়াতে গিয়েছিল। সেখানে গিয়ে আমার ফুফা টিকতে পারেনি। জ্বিনদের কবলে পড়ে নিজের প্রাণ হারিয়েছে। কিন্তু তুই… তুই টিকতে পেরেছিস। জঘন্য রকম ভাবে ভয়ানক ভাবে দক্ষ হয়ে ফিরে এসেছিস এখানে। তোকে আমি দেখেছিলাম আমার ফুপার সাথে গ্রামে। তোকে আমি দেখেছিলাম।”

অনন্যার চেহারা আরো কালো হয়ে গেলো। তার পুরো মুখ অন্ধকারে ঢেকে গিয়েছে। কাঁপা আঙুল তুলে ভয়ানক কন্ঠে সে বলল,
—” তুই….তুই সেই নীহা…হ্যাঁ..তুই তো নিজেও জাদু জানিস। তুই তো নিজেও..এই.এই এই। তোকে আমি চিনতে পেরেছি নীহারিকা। চিনতে পেরেছি। তুই তো নিজেও জাদু জানিস। হ্যাঁ জানিস তুই। তুই আমাকে মা”রতে এসেছিস তাইনা?”

অনন্যার শেষ কথাটা ঘরের ভেতর ধাক্কা খেয়ে প্রতিধ্বনির মতো ফিরে এলো। মোমবাতির শিখাগুলো হঠাৎ যেন দপদপ করে উঠল। ইরফান ভয় আতঙ্ক সব কিছু ভুলে অতি বিস্ময়ে তাকালো নীহারিকার দিকে। ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলো,
—” তুমি জাদু জানো নীহা?’

নীহারিকা শুকনো ঢোক গিলে সামনে চোখ রেখেই দৃঢ় কন্ঠে বলল,
—” খুব বেশি না। যতটুকু জানলে এখন আপনাকে রক্ষা করতে পারব, ততটুকু জানি।”

ইরফানের এবার বুদ্ধি উদয় হলো। সে এতদিন যাবৎ ঘটে যাওয়া সমস্ত ঘটনা মনে করতে থাকলো। স্মৃতিচারণ করতে থাকলে এতদিনের সমস্ত ঘটনা। তার আগেই বোঝা উচিত ছিল। তাই তো! নীহারিকা এতকিছু কিভাবে জানবে? এত দ্রুত নীহারিকা কিভাবে পারলো অনন্যার কাছে পৌঁছে যেতে? কি করলে কি হবে। কোন কাজটা করলে ফল ভালো হবে আর কোনটা করলে খারাপ হবে এসব কিভাবে বুঝতে পারছিল সে। এত সাহসই বা কোথা থেকে আসছিল তার? ইরফানের আগেই উপলব্ধি করা উচিত ছিল।

নীহারিকা স্থির চোখে তাকিয়ে রইল অনন্যার দিকে। তার হাতে ধরা ছুরিটা এখনও ইরফানের গলার কাছে।
ইরফানের বুক দ্রুত উঠানামা করছে। সে এখনো পুরোটা বুঝতে পারছে না— কী ভয়ংকর এক খেলায় সে দাঁড়িয়ে আছে। নীহারিকা খুব ধীরে হাসল। সেই হাসিটা ঠান্ডা।
—”মারতে?”
সে মাথা সামান্য কাত করল।
—”না অনন্যা… আমি তোকে মারতে আসিনি।”
এক মুহূর্ত থামল। তারপর তার চোখে ভয়ানক কঠোরতা ফুটে উঠল।
—”আমি এসেছি আমার পরিবারকে বাঁচাতে। জাদু ভাঙতে এসেছি।”
অনন্যার চোখ হঠাৎ র”ক্তবর্ণ হয়ে উঠল। তার ঠোঁট বিকৃত হয়ে গেল।
—”জাদু ভাঙবি তুই? তুই জানিস আমি কী শক্তি নিয়ে খেলছি?”
ঘরের চারপাশের মোমবাতিগুলো হঠাৎ কেঁপে উঠল।
মেঝের উপর আঁকা রক্তের চিহ্নগুলো যেন আরও গাঢ় হয়ে উঠছে। অনন্যা ধীরে ধীরে হাত তুলল। তার আঙুলগুলো কাঁপছে।
—”আমি এমন শক্তি ডেকে এনেছি। যার সামনে তোর ওই তুচ্ছ বিদ্যা ধুলোর সমান!”

নীহারিকা চোখ সরু করল।
—”তুই জ্বিন ডেকেছিস।”

অনন্যা থমকে গেল। কয়েক সেকেন্ড। তারপর তার মুখে আবার সেই উন্মাদ হাসি ফুটে উঠল।
—”বাহ…”
সে ধীরে তালি দিল,
—”বেশ জানিস তো!”

নীহারিকা এবার গম্ভীর হয়ে গেল।
—”আমার ফুফা কীভাবে মা”রা গেছে আমি জানি।”
তার চোখে কঠিন আগুন জ্বলছে।
—”তুই সেই একই পথ ধরেছিস।”

অনন্যা এবার হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল,
—”চুপ!”
তার কণ্ঠে পাগলামি।
—”ওটা মৃত্যু না!”
নিজের বুকে হাত মারল অনন্যা। পাগলের মত প্রলাপ বকে বলল,
—”ওটা শক্তি!”
তার চোখ পাগলের মতো জ্বলছে।
—”আমি তাদের আয়ত্ত করেছি!”

ঠিক তখনই, ঘরের ভেতর হঠাৎ একটা অদ্ভুত শব্দ উঠল। যেন কোথাও গভীর অন্ধকারে কেউ ফিসফিস করছে। শশশশ, মোমবাতির শিখাগুলো একসাথে লম্বা হয়ে উঠল। ইরফানের বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল। সে আতঙ্কিত চোখে চারপাশে তাকাল।
—”এটা… এটা কী শব্দ?”
অনন্যার ঠোঁট ধীরে ধীরে বাঁকতে লাগল। সে ফিসফিস করে বলল,
—”ওরা জেগে উঠছে।”
ঘরের অন্ধকার কোণগুলো যেন আরও গভীর হয়ে উঠছে। দেয়ালে ঝোলানো কঙ্কালগুলো বাতাসে দুলে উঠল। নীহারিকার চোখ এক মুহূর্তের জন্য কঠিন হয়ে উঠল। সে বুঝে গেছে, সময় শেষ হয়ে আসছে। অনন্যা ধীরে ধীরে বলল,
—”তুই ভেবেছিস আমাকে থামাতে পারবি?”
তার চোখে উন্মাদ আলো।
—”আজ তোর আত্মা দিয়েই শেষ আচারটা পূর্ণ করব আমি।”
ইরফানের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। নীহারিকা হঠাৎ ছুরিটা আরও শক্ত করে ধরল। তার চোখে তখন অন্যরকম দৃঢ়তা। সে নিচু স্বরে বলল,
—”অনন্যা… শেষ সুযোগ দিচ্ছি তোকে। সব বন্ধ কর।”
অনন্যা কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে মাথা কাত করল। আর সেই মুহূর্তে সে এমন এক ভয়ংকর হাসি দিল যে পুরো পাতালঘরটা কেঁপে উঠল।
—”এখন আর থামার সময় নেই…!”
তার চোখ সরাসরি নীহারিকার উপর স্থির।
—”এখন শুরু হবে আসল খেলা। “

ইরফানের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। কিন্তু ঠিক তখনই, নীহারিকার চোখে এক অদ্ভুত স্থিরতা ফুটে উঠল। সে খুব ধীরে ইরফানের কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল,
— ” ভয় পাবেন না। আমি যা করব, কিছু বলবেন না।”
ইরফান কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু নীহারিকার কণ্ঠের দৃঢ়তা তাকে থামিয়ে দিল। নীহারিকা এবার ছুরিটা একটু সরিয়ে নিল ইরফানের গলা থেকে। তারপর অনন্যার দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,
— “তুই ভাবছিস তুই একাই প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছিস?”

অনন্যা ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— “মানে?”

নীহারিকা ধীরে হাঁটু গেড়ে বসল মাটিতে। তার ডান হাত দিয়ে মেঝের ধুলো সরাল। সেখানে লুকিয়ে ছিল একটা ছোট কাপড়ের থলি। ইরফান বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল। নীহারিকা থলিটা খুলল। ভেতর থেকে বের করল কয়েকটা শুকনো পাতা, একটা ছোট তাবিজ আর লাল রঙের সুতো। অনন্যার চোখ সরু হয়ে গেল।
— “তুই এসব নিয়ে এসেছিস?”

নীহারিকা ঠান্ডা গলায় বলল,
— “আমি জানতাম তুই জ্বিনের শক্তি ব্যবহার করবি।”
সে দ্রুত মেঝের উপর আঙুল দিয়ে একটা বৃত্ত আঁকতে শুরু করল। রক্তে ভেজা মাটির উপর দ্রুত একটা চিহ্ন তৈরি হতে লাগল। অনন্যা হঠাৎ চিৎকার করে উঠল,
— “না!”
সে সামনে এগিয়ে আসতে গেল। ঠিক তখনই, নীহারিকা পকেট থেকে ছোট্ট একটা শিশি বের করে সেই বৃত্তের উপর ছিটিয়ে দিল। লবণ আর কালোজিরার গুঁড়ো। সাথে সাথে বৃত্তটা যেন ঝিলিক দিয়ে উঠল। অনন্যা সামনে আসতেই সে যেন অদৃশ্য দেয়ালে ধাক্কা খেল। তার শরীর পিছিয়ে গেল। অনন্যার চোখ ভয়ানক হয়ে উঠল।
— “তুই… প্রতিরোধের বৃত্ত এঁকেছিস!”
নীহারিকা উঠে দাঁড়াল। তার চোখে এখন ভয় নেই। বরং কঠিন দৃঢ়তা।
— “আমার ফুফা শুধু জাদু করেনি, প্রতিরোধের বিদ্যাও শিখিয়েছিল।”

অনন্যা এবার উন্মাদের মতো চিৎকার করল।
— “আমি তোকে শেষ করে দেব!”

সে হাত তুলে অদ্ভুত কিছু শব্দ বলতে শুরু করল। ঘরের বাতাস হঠাৎ ঘূর্ণির মতো ঘুরতে লাগল। মোমবাতিগুলো দপদপ করে উঠল। কোথাও থেকে সেই ফিসফিস শব্দ আবার ভেসে এল। ইরফান আতঙ্কিত চোখে চারপাশে তাকাল। ঠিক তখনই, নীহারিকা তার হাত ধরে টেনে নিল।
— “বৃত্তের ভেতরে দাঁড়ান!”
ইরফান দ্রুত তার পাশে এসে দাঁড়াল। অনন্যা তখন মন্ত্র পড়ছে। তার চুল বাতাসে উড়ছে। চোখ দুটো আগুনের মতো লাল। হঠাৎ ঘরের অন্ধকার কোণ থেকে একটা ছায়া নড়ল। আরেকটা। আরেকটা। ইরফানের বুক কেঁপে উঠল।
— “ওগুলো…কী?”

নীহারিকা খুব নিচু স্বরে বলল,
— “জ্বিন।”

ইরফানের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। কিন্তু নীহারিকা তখন তাবিজটা হাতে তুলে নিল। তার ঠোঁট নড়ছে। সে ধীরে ধীরে কুরআনের কিছু আয়াত পড়তে শুরু করল। তার কণ্ঠ খুব জোরে নয়কিন্তু অদ্ভুত শক্তিতে ভরা। প্রথম আয়াতটা শেষ হতেই— ঘরের বাতাস কেঁপে উঠল। অনন্যার মুখ বিকৃত হয়ে গেল।
— “চুপ কর!”

সে চিৎকার করল। কিন্তু নীহারিকা থামল না। তার কণ্ঠ আরও দৃঢ় হয়ে উঠল। আর ঠিক তখনই— বৃত্তের চারপাশে যেন অদ্ভুত আলো ঝলসে উঠল। অন্ধকারের ছায়াগুলো হঠাৎ পিছিয়ে যেতে লাগল।অনন্যার চোখ বিস্ফারিত।
— “অসম্ভব..!”
নীহারিকা তখন ধীরে মাথা তুলে তাকাল। তার চোখে অদ্ভুত শান্তি। সে বলল,
— ” অন্ধকার যত শক্তিশালী হোক…আলোর সামনে টিকতে পারে না অনন্যা।”
কিন্তু ঠিক তখনই, ঘরের ভেতর হঠাৎ ভয়ানক একটা শব্দ হলো। মেঝের নিচে কোথাও যেন কিছু ভেঙে উঠল। অনন্যা ধীরে ধীরে হাসতে শুরু করল। সেই হাসি আবার ভয়ানক হয়ে উঠল।
— ” তুই দেরি করে ফেলেছিস নীহারিকা…””
তার চোখ উন্মাদ।
— ” ওরা পুরোপুরি জেগে উঠেছে।”
পাতালঘরের অন্ধকারে তখন সত্যিই যেন আরও বড় কিছু নড়ছে। অনন্যার বিকৃত হাসিটা পাতালঘরের অন্ধকারে ছড়িয়ে পড়ছিল। মোমবাতির শিখাগুলো পাগলের মত দপদপ করছিল। কিন্তু নীহারিকা স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তার ঠোঁটের কোণে ধীরে একটা অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল। সে শান্ত স্বরে বলল,
— ” না অনন্যা। আমি একদম সময়মতোই এসেছি।”
অনন্যা কিছু বুঝে ওঠার আগেই, নীহারিকা হঠাৎ হাতের ছুরিটা ঘুরিয়ে ধরল। কিন্তু আঘাত করার জন্য নয়। সে ঝট করে এগিয়ে গিয়ে অনন্যার কব্জি শক্ত করে চেপে ধরল। তারপর অন্য হাতে পকেট থেকে বের করল একটা ছোট কাঁচের শিশি। অনন্যা চোখ বড় করে তাকাল।
— ” এটা কী?”
কথা শেষ হওয়ার আগেই নীহারিকা শিশিটা খুলে তার মুখের সামনে ছিটিয়ে দিল। একটা তীব্র গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল। ধোঁয়ার মত কুয়াশা উঠল। অনন্যা কয়েক সেকেন্ড কাঁপল। তার চোখ উলটে গেল। তারপর সে মাটিতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। ঘরের ভেতর কয়েক মুহূর্ত নীরবতা। ইরফান হতবাক। ধীরে ধীরে পুরো জায়গাটা ঠান্ডা হয়ে এলো।

ইরফান তপ্ত শ্বাস ফেলে বড় বড় চোখ করে বলল,
—” নীহা..তুমি..
কন্ঠ কাঁপছে তার। নীহারিকা কোনো উত্তর দিল না। সে ধীরে হাঁটু গেড়ে বসল মেঝেতে। তারপর চারপাশে তাকাল। মেঝের উপর আঁকা রক্তের বৃত্তের দিকে। সে ধীরে সেই বৃত্তের মাঝখানে গিয়ে বসে পড়ল। ইরফানের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেছে।
— ” তুমি কী করছো?”
নীহারিকা এবার মাথা তুলে তাকাল। তার চোখে তখন আর ভয় নেই। বরং ভয়ংকর এক স্থিরতা।
— ” শেষ কাজটা।”
সে বলল। তারপর ধীরে দুহাত মাটির উপর রাখল। তার ঠোঁট নড়তে শুরু করল। কিন্তু এবার সে আয়াত না, অদ্ভুত এক ভাষায় কথা বলছে। ঘরের বাতাস আবার ভারী হয়ে উঠল। মোমবাতির শিখাগুলো লম্বা হয়ে উঠল। চারপাশের অন্ধকার যেন ঘনীভূত হয়ে বৃত্তের দিকে এগিয়ে আসছে। ইরফানের বুক ধড়ফড় করছে। হঠাৎ, ঘরের ভেতর সেই ফিসফিস শব্দ আবার ভেসে উঠল।

অন্ধকারের ভেতর থেকে যেন কয়েকটা ছায়া বেরিয়ে এলো। তারা পুরো মানুষ না। আবার পুরো ছায়াও না।বাতাসে ভাসমান বিকৃত অবয়ব। ইরফানের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। সে পিছিয়ে গেল এক পা। নীহারিকা চোখ বন্ধ রেখেই বলল,
— “আমি জানি তোমরা আছো। চুক্তি অনুযায়ী তোমাদের পাওনা কী বাকি আছে?”

ঘরের অন্ধকারে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। একটা কর্কশ ফিসফিস কণ্ঠ ভেসে এলো, যেন বহু গলার মিশ্র শব্দ।
— “রক্তের চুক্তি হয়েছে…আমাদের প্রাপ্য..একটি তরুণ প্রাণ…!”
ইরফানের বুকের ভেতরটা ধপ করে উঠল। নীহারিকা চোখ খুলল। তার চোখে ভয় নেই। সে বুঝে গেলো অনন্যা নীহারিকাকেই বলি দিতে যাচ্ছিল জ্বিনদের কাছে। তরুণী দেয়ার কথা দিয়েছিল সে, তারমানে নীহারিকা কেই দিত। নীহারিকা কিছুক্ষণ ভাবলো। সে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল মাটিতে পড়ে থাকা অনন্যার দিকে। অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। রক্তমাখা কাপড়। অন্ধকারে তার মুখ ছায়ায় ঢাকা। নীহারিকা শান্ত স্বরে বলল,
— ” চুক্তি ভাঙা হবে না। চুক্তি অনুযায়ী সব কিছু পূরণ হবে।”
ছায়াগুলো যেন নড়ল। নীহারিকার কণ্ঠ কঠিন হয়ে উঠল।
— ” তবে, যার মাধ্যমে তোমাদের ডাকা হয়েছে, সেই-ই তোমাদের প্রাপ্য।”
সে আঙুল তুলে দেখাল অনন্যার দিকে।
— ” তোমাদের তরুণী।”
ঘরের বাতাস হঠাৎ কেঁপে উঠল। অন্ধকারের ছায়াগুলো ধীরে ধীরে অনন্যার দিকে সরে গেল। মোমবাতির আলো হঠাৎ কাঁপতে লাগল। ইরফান আতঙ্কে তাকিয়ে আছে। নীহারিকা আবার বলল,
— ” কিন্তু একটা শর্ত আছে।”
অন্ধকার যেন থেমে গেল। নীহারিকা গভীর স্বরে বলল,
— ” আর কখনো এই চুক্তি নিয়ে দাবি থাকবেনা। কখনোই আমার পরিবারকে স্পর্শ করবে না। আর কখনো এই জায়গায় ফিরে আসবে না।”

কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর অন্ধকার থেকে সেই কর্কশ কণ্ঠ ভেসে এলো,
— ” চুক্তি গ্রহণ করা হলো…!”
ঘরের বাতাস হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে গেল। অন্ধকারের ছায়াগুলো ঘন হয়ে অনন্যার চারপাশে জড়ো হলো। তার শরীর ধীরে ধীরে অন্ধকারে ঢেকে যেতে লাগল। ইরফানের চোখ বিস্ফারিত। কয়েক মুহুর্ত টর মোমবাতির শিখাগুলো হঠাৎ একসাথে নিভে গেল। পাতালঘর অন্ধকারে ডুবে গেল। আর পরের মুহূর্তেই, আবার আলো জ্বলে উঠল। সবকিছু নিস্তব্ধ। মেঝের উপর রক্তের বৃত্ত মুছে গেছে। মোমবাতিগুলো নিভে ঠান্ডা। আর, অনন্যা নেই। একেবারে নেই। যেন কখনো ছিলই না। নীহারিকা ধীরে চোখ খুলল। তার মুখ ফ্যাকাসে। কিন্তু চোখে শান্তি। ইরফান স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
— ” সব… শেষ?”
ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল সে।

নীহারিকা ধীরে মাথা নেড়ে ক্লান্ত কন্ঠে বলল,
— ” হ্যাঁ…সব শেষ।”
পাতালঘরের অন্ধকার তখন অস্বাভাবিকভাবে শান্ত হয়ে গেলো। আজ থেকে আর এমন জঘন্য দুনিয়ার প্রভাবের স্বীকার হবেনা কবির পরিবার।

চলবে…

🔥 অনেক বড় পর্ব ছিল আজকে। গল্প শেষের পথে। আগামী দিন শেষ পর্ব আসবে।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply