Golpo romantic golpo নবরূপা

নবরূপা পর্ব ১৮


নবরূপা

পর্ব_১৮

কলমেঅনামিকাতাহসিন_রোজা

আজকাল ইনায়া ঘুমোচ্ছে ভীষণ। হয়তোবা সিজন পরিবর্তন বা শরীর দুর্বল হওয়ায়। নীহারিকা বেশ চিন্তিত। সেই সকাল দশটায় ঘুমিয়েছে ইনায়া। এখন দুপুর দুটো বাজে, তবুও মেয়েটা কি শান্তিতে ঘুমোচ্ছে। নীহারিকার মন চাইলো না তাকে ডেকে দিতে। কিন্তু খাওয়া-দাওয়ার পর্বটাও চোকাতে হবে। নইলে আরো শরীর খারাপ করবে বিধায় নীহারিকা আস্তেধীরে বিছানার কাছে বসলো। আলতো করে ঘুমন্ত ইনায়াকে কোলে তুলে নিল সে। পিঠে হালকা চাপড় দিতে দিতে আদুরে কন্ঠে ডাকতে শুরু করলো
—” ইনামনি, মা আমার। ওঠ মা। খেতে হবে যে। তোর বাবা কিন্তু কিছুক্ষণ পর এসে যাবে। ওঠ মা। দেখি৷ চোখ খোল!’
বারবার ডাকতে ডাকতে একটুখানি ঘুম ভাঙলো ইনায়ার। নীহারিকা দ্রুত ওকে নিজের দিকে তাকাতে বাধ্য করালো
—” এইযে এইযে মা, এদিকে। উঠে পড়। চকলেট কুকিস কে খাবে হুম? ক্যালোক্স চকোস কে খাবে? আমি তো দুধ গরম করতে দিয়েছি। খাবি না? চল, ফ্রেশ করিয়ে দিই।”

চকোসের কথা শুনে ইনায়ার ঘুম মনে হয় ছুটেই গেলো। রসগোল্লার মত চোখজোড়া মেলে সে তাকিয়ে রইলো নীহারিকার দিকে। চুপচাপ নীহারিকার কথামত হাত মুখ ধুয়ে তার কাঁধে মাথা এলিয়ে দিলো। আধো স্বরে বলল
—” বাবা বাবা।”

নীহারিকা ঠোঁট ভিজিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করলো। আশেপাশে তাকিয়ে সতর্ক হলো কেও আছে কিনা। এরপর ইনায়ার কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে কাতর কন্ঠে বলল,
—” আর কত বাবা ডাকবি হুম? একটু মা ডাক না। একটাবার মা বল। মাম্মাম বলে ডাক। তোর বাবা যে আমায় এই ডাক শোনানোর জন্যই এনেছে। ডাকবিনা মা?”

ইনায়া কিছু বুঝলো কিনা জানা নেই। তবে সে মনের শান্তিতে নীহারিকার চুল আঙুলে পেঁচিয়ে খেলতে শুরু করলো। দু’হাতেই নীহারিকার চুল নিয়ে এলোমেলো ভাবে খেলতে থাকলো। নীহারিকা ওকে কোলে নিয়েই বিছানা গুছিয়ে ফেলল। এরপর নিচে নেমে এলো দ্রুত। সোফায় ইনায়াকে বসিয়ে নীহারিকা দ্রুত গেলো রান্নাঘরে। গরম দুধ বাটিতে ঢেলে ক্যালোক্স চকোস নিয়ে নিল। যদিও ইরফান এসব খেতে দেয়না ইনায়াক। তবে নীহারিকা এসবে একটু বিরক্ত। ছোট থেকে এতটা নাজুক করে তুললে তো পরবর্তীতে বড় হয়ে মেয়ে খাওয়াদাওয়াই ঠিকমত করবেনা। সবকিছু খাওয়া শিখতে হবে, সাধারন খাবারগুলোয় সবকিছুর স্বাদ থাকা ভালো। তাই অতটা প্রতিবন্ধকতা মানে না নীহারিকা। ইনায়া যদি কোনো কিছু পেট ভরে খেয়ে নেয়, সেটা সে দিয়ে দেয়। অবশ্যই ভালো কিছুই।

ইনায়াকে কোলে নিয়ে নীহারিকার টিভি টা অন করে দিলো। এরপর এক হাতে ইনায়াকে নিয়ে আরেক হাত দিয়ে তাকে খাওয়াতে শুরু করলো। মাঝে মাঝে চোখ রাখলো টিভির দিকে। হুট করে টিভির স্ক্রিনের নিচের দিকে চোখ গেলো নীহারিকার। কিছু একটা লেখা খুব মনোযোগ দিয়ে পড়লো সে। কিছুক্ষন স্তব্ধ হয়ে বসে থেকে হিসেবে কষে নিলো মনে মনে। এরপর রিমোট হাতে নিয়ে দ্রুত চ্যানেল পাল্টে দিয়ে দিলো কার্টুন চ্যানেলে। মুচকি হেসে ইনায়াকে আদর করে খাওয়াতে থাকলো। কিন্তু কিছুক্ষণ আগেই মাথায় ঠোক্কর খাওয়া জিনিসটা সে নামাতে পারলো না। অজান্তেই আবারো তা নিয়ে ভাবলো সে।
★★

—” মা, আপনার ছেলে এলে বলবেন আমি আমার বান্ধবীর বাড়ি মিরপুর ২ এ যাচ্ছি। বেশিক্ষণ সময় নষ্ট করব না মা। সন্ধ্যার আগেই ফিরে আসব। আপনার ছেলে আসার পর বেরোতে গেলে দেরি হয়ে যাবে। আর যাওয়াটাও জরুরি।”

নীহারিকার কথা ফেরাতে পারলেন না আয়েশা বেগম। ইতস্তত করে বললেন
—” না সমস্যা নেই। যাও। কিন্তু ইনায়াকেও নিয়ে যাবে?’

—” হ্যাঁ মা। ইয়াশা তো পড়তে বসেছে। তামান্নাও নেই। আপনার কাছে তো আমি দিয়ে যাবই না। অসুস্থ আপনি। আমিই বরং নিয়ে যাই। একটু বাইরে থেকে ঘুরেও আসলো। এমনিতেও ইনায়াকে নিয়ে আমার সময় কাটানো হয়না খুব একটা।”

আয়েশা বেগম মুচকি হাসলেন। মেয়েটা এমন ভাবে অনুমতি চাইছে যেন সে এ বাড়ির কেওই না। আয়েশা বেগম মুখ কুঁচকে বললেন,
—” হয়েছে বাবা হয়েছে। এত কিছু বলতে হবেনা। তোমারই মেয়ে। নিয়ে যাও। সাবধানে যেও।”

নীহারিকা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলো। খুশিতে আত্মহারা হয়ে দ্রুত বেরিয়ে পড়লো ইনায়াকে নিয়ে। সে যাওয়ার ঠিক মিনিট দশেক পরই ইরফান ফিরে এলো। ক্লান্ত শরীর নিয়ে সে বাড়িতে প্রবেশ করেই যখন জানতে পারলো নীহারিকা ইনায়াকে নিয়ে বাইরে গেছে, তখন সাথে সাথে অবাক না হয়ে পারলো না ইরফান। কারন প্রথমত নীহারিকা কখনো ইরফানকে না জানিয়ে এভাবে যাওয়ার কথা না। আর সে তো চাইলেই কল করেও জানাতে পারতো। কিন্তু জানালো না কেনো? বিভ্রান্ত অবস্থায় নিজের ঘরে প্রবেশ করলো ইরফান। সাথে সাথে তার চোখে পড়লো বিছানায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা তার কালো ডায়েরি টার দিকে। রীতিমত হৃদপিণ্ড লাফিয়ে উঠলো তার। সবকিছু ছুঁড়ে ফেলে দ্রুত এগিয়ে এলো ইরফান। পাগলের মত ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখতে থাকলো কালো ডায়েরি টার এলোমেলো ছেঁড়া পাতা। এখানকার সব জিনিসগুলো কোথায়? এখানে তো অনেক কিছুই ছিল। সব কোথায়? কে নিল? নীহারিকা?

ইরফানের হাত মুঠো হয়ে এলো। সে নিজের আলমারির দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হলো। একদম জঘন্য ভাবে ঘেঁটে দেখা হয়েছে তার আলমারি। অনেক খুঁজেই ডায়েরি টা বের করা হয়েছে। ইরফানের কপাল থেকে ঘাম বেরোতে শুরু করলে সে কাঁপা হাতে ডায়েরির শেষ পাতায় যায়, যেখানে লেখা-” তামান্না কে শেষ করতে হবে।”৷ শুকনো ঢোক গিলল ইরফান।নীহারিকা এসবে কেনো হাত দিয়েছে? কেনো এসব দেখেছে? কে দিয়েছে তাকে এই অধিকার? এই সাহস কে দিয়েছে তাকে। প্রচন্ড রাগ হতে থাকে ইরফানের। এই মুহুর্তে নীহারিকা সামনে থাকলে যে সে কতটা বড় অশান্তির স্বীকার হতো সে নিজেও জানে না।

ইরফান পরনের শার্টটা আর খুললো না। ডায়েরি টা আবারো ছুঁড়ে দিয়ে দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নামতে থাকলো। এতদম সর্বোচ্চ গতিতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লো সে। এলোমেলো অবস্থায় চলে গেলো কোথায় যেন। ইয়াশা সোফাতেই বসে ছিল। ইরফানকে বেরিয়ে পড়তে দেখেছে সে। হুট করে এমন অবস্থা দেখে সে ঠোঁট কাঁমড়ে কিছু একটা ভাবলো। দ্রুত ফোন হাতে নিয়ে কানের কাছে নিলো,
—” ভাইয়া তো সত্যি সত্যি বেরিয়ে গেলো ভাবি।”

★★

নীহারিকা বেশ কিছুক্ষণ যাবৎ বসে রয়েছে ইটের তৈরী ঘেরার কাছে। হাতপা রীতিমতো ঘেমে যাচ্ছে তার। গলা শুকিয়ে গেছে। মাথায় অদ্ভুত সব চিন্তা ভাবনা আসছে। এই মুহুর্তে কোনো কিছুই নিশ্চিত করে আন্দাজ করাও মুশকিল যেন। বেশ কিছুক্ষণ পর বোরখা পড়া একটি ভদ্র মহিলা এসে দাঁড়ালেন নীহারিকার সামনে। গুমোট কন্ঠে বললেন
—” হুজুর ডাকছে আপনাকে।”

নীহারিকা সতর্ক হলো। দ্রুত মাথায় ওড়না পেঁচিয়ে হাতের ব্যাগটা নিয়ে হেঁটে যেতে থাকলো মাটির বাড়িটার ভেতরে। টিনের দরজাটা খোলার সাথে সাথে কেমন অদ্ভুত এক ধরনের গন্ধ নাকে ভেসে এল তার। ওড়নার প্রান্ত দিয়ে নাক চেপে নীহারিকা তবুও এগিয়ে গেলো। সারি সারি করে অনেক গুলো ঘর তৈরী করা থাকলেও নীহারিকা গিয়ে ঢুকলো সবচেয়ে বড় ঘরটাতে।

ঘরটার ভেতরে ঢুকতেই নীহারিকার পায়ের শব্দ যেন নিজেই নিজের কাছে অপরাধী হয়ে উঠলো। টিনের দরজাটা পেছন থেকে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল। ভেতরে আলো কম। জানালা নেই বললেই চলে। এক কোণে ছোট্ট কাঁচের ফাঁক দিয়ে সরু আলো ঢুকছে, তাও ধুলোমাখা। বাতাস ভারী- ধূপ, পুরনো কাঠ, আর কেমন যেন তেতো ভেষজের গন্ধ মিশে আছে।
ঘরের মাঝখানে মোটা তক্তপোশ পাতা। তার উপর গাঢ় সবুজ কাপড় বিছানো। সামনে পিতলের বড় বাটি, তাতে পানি। পানির উপর ভাসছে কিছু অচেনা পাতা। পাশে ছোট ছোট কাঁচের শিশি—কোনোটায় কালচে তরল, কোনোটায় লালচে। একদিকে ঝুলছে শুকনো লেবু, লাল সুতা, কাগজে মোড়ানো তাবিজের মতো কিছু।

দেয়ালে আরবি আয়াত ফ্রেমে বাঁধানো, আবার তার পাশেই কালি দিয়ে আঁকা অদ্ভুত কিছু চিহ্ন। মাটিতে গোল করে চুনের দাগ টানা, তার ভেতরে রাখা পুরনো তসবি। ঘরের এক প্রান্তে বসে আছেন একজন বৃদ্ধ। সাদা দাড়ি বুকে নেমে এসেছে। কপালে কালচে দাগ। চোখ দুটো অস্বাভাবিক স্থির, যেন কারও দিকে তাকিয়েও ভেতরটা দেখে ফেলতে পারেন।

নীহারিকার শরীর কাঁপতে শুরু করলো। একা এসেছে খুব সাহস নিয়েই। সে সবচেয়ে বেশি অবাক হলো যখন সাদা পাঞ্জাবি পরিহিত বৃদ্ধ লোকটি চোখ বন্ধ রেখেই মাথা না তুলেই বললেন,
—” আসো!”

নীহারিকার বুক ধড়ফড় করছে। তবু সে এগিয়ে গেল।
ইনায়া তার কোলে ঘুমিয়ে আছে, অস্বাভাবিক শান্ত।
বৃদ্ধ এবার চোখ তুললেন। দৃষ্টিটা নীহারিকার উপর থেমে রইলো কয়েক সেকেন্ড। তারপর খুব ধীরে ইনায়ার দিকে গেল।
—” বাচ্চাটাকে এনেছো?”
গলা ভারী, কিন্তু জোরে নয়। বরং চাপা। নীহারিকা গিলল শুকনো ঢোক।
—”জি।”

নীহারিকার মেরুদণ্ড বেয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল।বৃদ্ধ হালকা হাসলেন। দাঁত দেখা গেল না, শুধু ঠোঁট নড়লো। ঘরের বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে উঠলো। নীহারিকা কাঁপা কণ্ঠে বলল
—” আপনার সাথে কলে কথা হয়েছিল। আমার বান্ধবী জ্যোতি…

বৃদ্ধ হাত তুলে থামালেন।
—” জানি।”

তিনি সামনে রাখা পিতলের বাটিটা নিজের দিকে টেনে নিলেন। তসবি হাতে নিয়ে চোখ বন্ধ করলেন। ঠোঁট নড়ছে, কিন্তু শব্দ খুব ক্ষীণ। ঘরের কোণে রাখা কাঁচের বাতিটা হঠাৎ কেঁপে উঠলো। নীহারিকার বুকের ভেতর কাঁপন ধরলো। সে শক্ত করে ইনায়াকে জড়িয়ে ধরলো। কিছুক্ষণ পর বৃদ্ধ চোখ খুললেন।
—” তোমার স্বামীকে শুধু দুর্ঘটনা ছুঁয়ে যায়নি।”
নীহারিকার শ্বাস আটকে গেল।
—”তার ছায়ার সঙ্গে আরেক ছায়া জড়িয়ে আছে। বহুদিনের। অসমাপ্ত কিছু। রাগ, প্রতিশোধ, অপরাধবোধ—সব মিশে আছে।”

নীহারিকা ফিসফিস করে বলল,
—”আমার ধারনা তবে…

বৃদ্ধ এবার সরাসরি তাকালেন তার দিকে।
—” সঠিক।”
ঘরের বাতাস ঠান্ডা হয়ে উঠছে যেন।
—”কালো জাদু?”
খুব আস্তে জিজ্ঞেস করল নীহারিকা। বৃদ্ধ সরাসরি উত্তর দিলেন না।
—” মানুষ যখন কারও ক্ষতি চায়, তখন দোয়া করে না। অন্য রাস্তা নেয়। তোমার স্বামীর নামে কাজ হয়েছে।”
নীহারিকার মাথার ভেতর ঝনঝন শব্দ হলো। জিজ্ঞেস করল,
—” এখন উপায়?”
বৃদ্ধ ধীরে ইনায়ার দিকে তাকালেন।
—” বাচ্চাটা বেশি ঘুমাচ্ছে, তাই না?”
নীহারিকার বুক ধক করে উঠলো।
—” জি!”
—”শরীরের অসুখ না এটা। শক্তি দুর্বল হচ্ছে। ঘরের ভেতরে কিছু আছে, যা বাচ্চাদের আগে টানে।”

ঘরটা হঠাৎ খুব ছোট মনে হলো নীহারিকার কাছে।
সে কাঁপা গলায় বলল,
—” কী করব এখন?”

বৃদ্ধ সামনে রাখা কাগজে কিছু লিখলেন। তারপর কালো সুতো দিয়ে ভাঁজ করে বাঁধলেন।
—” এটা বালিশের নিচে রাখবে। আর ঘরে যে কালো জিনিস লুকানো আছে, ওগুলো সরাতে হবে। আমি যদি খুব একটা ভুল না করি, তবে তোমাদের তোষকের নিচে, ঘরের দরজার কাছে এবং ওয়াশরুমে কিছু না কিছু অবশ্যই পাবে।”

নীহারিকা চোখ বন্ধ করলো এক মুহূর্তের জন্য। তার ভেতরে ভয় আছে। কিন্তু তার চেয়েও বড় কিছু আছে—দৃঢ়তা।সে খুব ধীরে বলল,
—” ঠিক আছে।”

চলবে…

আগামী দুদিন গল্প আসবেনা জনগণ। আমি অসুস্থ হয়ে পড়েছি। লিখতে পারছি না। তাই আগামী দিন একটা নতুন গল্প আপলোড করব, যা আগে থেকেই লেখা রয়েছে।✨

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply