Golpo romantic golpo নবরূপা

নবরূপা পর্ব ১৭


নবরূপা

পর্ব_১৭

কলমেঅনামিকাতাহসিন_রোজা

সকাল সকাল ইরফান কলেজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যাওয়ার পর নীহারিকা যত দ্রুত সম্ভব ঘর গোছাতে শুরু করলো। ভোরবেলাতেই বিছানার চাদর ধুয়েছে সে। এবারে মেঝে পরিষ্কার করে সে দ্রুত ইয়াশার ঘরে গেলো। বেচারি পড়তে বসেছিল। নীহারিকারও ইচ্ছে ছিল না তাকে বিরক্ত করার। কিন্তু এখন কথা বলাটা বেশি প্রয়োজনীয় বিধায় সে ইয়াশার ঘরে ঢুকে দরজা আটকে দিল। ইয়াশা চমকে গেলো শব্দে, নীহারিকা কে দেখে হেসে টেনে টেনে বলল,
—” এ কি কান্ড! ইরফান স্যারের স্বয়ং স্ত্রী আমার ঘরে যে। কিছু হয়েছে ম্যডাম? কিছু লাগবে?”

নীহারিকা ভ্রু কুঁচকে হাসলো। বলল,
—” উনার সাথে আবারো ঝগড়া করেছো? “

ইয়াশা সাথে সাথে মুখ ভেঙচালো। অর্থাৎ করেছে। সকাল সকাল ইরফানের কাছে ধমক খেয়েছে সে। তাও আবার খাবার না খাওয়ার কারনে। আর এমন ঝগড়া হলে ইয়াশা ইরফানের পাশাপাশি নীহারিকা কেও পঁচাতে শুরু করে। খুবই আজব অবস্থা। নীহারিকা এবারে ইয়াশার টেবিলের কাছে চেয়ার নিয়ে বসলো। বলল,
—” ইয়াশা, আমার একটা সাহায্য দরকার। “

ইয়াশা আবারো অন্যদিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকিয়ে বলল,
—” ওমা তাই? দেখেছো অবস্থা! একজন ইডিয়ট, ননসেন্স বলে বকাঝকা করে কলেজে চলে যায়, পরে আবার তারই বউ এসে সাহায্য চায়। হুহ! করবনা সাহায্য!”

নীহারিকা আরেকটু এগিয়ে এসে ফোঁস করে শ্বাস ছাড়লো। নিচু কন্ঠে বলল,
—” আমি গুরুত্বপূর্ণ একটা কারনে এসেছি। প্লিজ ইয়াশা বি সিরিয়াস।”

কিছুক্ষণ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে সাথে সাথে সিরিয়াস হলো ইয়াশা। ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—” কী হয়েছে?”

নীহারিকা এবারে জিজ্ঞেস করল খুব সতর্কতার সহিত,
—” আমাকে একটু বলো, তাহিয়া মারা গিয়েছে কীভাবে?”

ইয়াশা চোখ পিটপিট করে তাকালো। অবাক হয়ে বলল,
—” বাড়ির সবাই চেষ্টা করছে তোমার জীবন থেকে এই নাম মুছে ফেলতে। আর তুমি বারবার ওই একই নাম নিজেই টেনে আনছো ভাবি? তুমি তো মারাত্মক। নইলে কে নিজের স্বামীর প্রথম স্ত্রীর স্মৃতিচারণ করে বারবার?’

নীহারিকা ফিক করে হাসলো। ঠোঁট কাঁমড়ে বলল,
—” সে তো আর আমার সতীন না। প্রাণটাই তো নেই বেচারির। ওমন বাচ্চামো করব কেনো? সে মারা না গেলে আমি এখানে আজ থাকতাম বুঝি? তোমার ভাইয়ের ঠ্যাকা পড়েছে দ্বিতীয় বিয়ে করার? তার চরিত্র তো ফুলের মত পবিত্র!”

ইয়াশাও নীহারিকার কথা শুনে হো হো করে হেসে দিলো। কথাটা তো সত্যিই। নীহারিকার এমন উচ্চ মন মানসিকতা দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারলো না ইয়াশা। একটু ভেবে বলল,
—” তুমি তাহলে কী জানতে চাইছো? তাহিয়া মারা গেলো কীভাবে?”

নীহারিকা মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল। ইয়াশা এবারে বলল,
—” তাহিয়া ভাবির গাড়ি চালানোর ভীষণ শখ ছিল। মনে করো, ছোট থেকেই পাগল ছিল ড্রাইভিং শেখার জন্য। কিন্তু নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে ছিল তো। কখনো গাড়ি ছুঁতেই পারেনি। এ বাড়িতে আসার পর ভাইয়ার গাড়িতে ঘোরাফেরা করতো। অনেকবার জেদও করেছিল ড্রাইভ করার জন্য। ভাইয়া শেখাবে কথা দিয়েছিল। এমনকি প্রতি শুক্রবার বড় মাঠে গিয়ে শেখাতেও শুরু হলো। কয়েক মাস বেশ ভালোই চলল। ভাবিও অনেকটা শিখে গিয়েছিল গাড়ি চালানো। তো একদিন, ইনায়াকে আমার কাছে রেখে ভাইয়া আর ভাবি রাত একটার সময় গেলো লং ড্রাইভে।”

এ পর্যায়ে থেমে গেলো ইয়াশা। কিছুক্ষণ চুপ থেকে ঘাড় উঁচিয়ে বলল
—” ওদিকে তারপর কী হয়েছে জানি না। কিন্তু ভোর পাঁচটার সময় ভাইয়া এলোমেলো অবস্থায় বাসায় ফিরে আসে। একদম বিধ্বস্ত অবস্থা। মা-বাবা তো দেখে একদম ভয়ে কাহিল। তারপর যখন জিজ্ঞেস করা হলো, তাহিয়া কোথায়? ভাইয়া এমনভাবে তাকিয়েছিল যেন তাহিয়া নামে কাওকে চেনেই না। মিনিট দশেক পর ভাইয়া বলে ওঠে, ও এক্সিডেন্ট করেছে। আমরা তো হতবাক, হসপিটালে যেতে যেতেই খবর পাই মারা গেছে সে। পরে ভাইয়া নিজেই বলে যে, তাহিয়া জেদ করে গাড়ি চালিয়েছে মহাসড়কে আর ভুল করে কন্ট্রোল হারিয়ে ব্রিজের কিনারে ধাক্কা খেয়ে এক্সিডেন্ট করেছে। তাহিয়ার বডি ব্রিজের কিনারে থাকলেও গাড়িটা একদম নদীর মাঝে গিয়ে পড়েছিল। বাপরে! ভাবলেই এখনো আমার শরীর শিউরে ওঠে জানো?”

ঘরটা কয়েক সেকেন্ড নিস্তব্ধ হয়ে রইল। নীহারিকার মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেছে ধীরে ধীরে। সে টেবিলের কোণায় আঙুল বুলাতে বুলাতে খুব স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করল,
—” উনি মানে ইরফান… কিছু হয়েছিল তার?”

ইয়াশা ঠোঁট চেপে মাথা নেড়ে বলল,
—” হ্যাঁ, হয়েছিল তো। শরীরে কাটা-ছেঁড়া ছিল, মাথায় ব্যান্ডেজ। কয়েকদিন হাসপাতালে ছিল। কিন্তু অবস্থা এত খারাপ ছিল না। অদ্ভুত না?”

নীহারিকার চোখের মণি যেন একচুল সরলো। ভ্রু কুঁচকে তাকালো,
—” অদ্ভুত কেনো?”

—” কারণ ভাবির বডি ব্রিজের ধারেই পাওয়া যায়। গাড়ি পড়ে নদীতে। যদি এত ভয়ানক এক্সিডেন্ট হয়, তাহলে ভাইয়া এত দূরে গিয়ে কীভাবে বেঁচে গেল? ভাইয়াও তো গাড়িতে ছিল। আর গাড়িটা এতদূর গেল কীভাবে? পুলিশ কেস হয়েছিল জানো, তাহিয়া ভাবির পরিবার যতটুকু পারে ততটুকু চেষ্টা করেছিল ভাইয়াকে ফাঁসানোর।”

নীহারিকা চমকে উঠলো,
—” উনাকে ফাঁসাবে কেনো? ওনারা জানে না ইরফান কেমন?”

ইয়াশা মুখ কুঁচকে বলল,
—” জানে তো ভাবি৷ ওরা ভাইয়াকে খুব ভালোবাসতো। কিন্তু না জানি কে কী বলেছে। কানে বিষ ঢেলেছে। হুট করেই ওরা অকারনে ব্লেম করতে শুরু করে যে ভাইয়া নাকি ইচ্ছে করে দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে। কি অদ্ভুত জঘন্য চিন্তাধারা! পুলিশ কেসেও তারা এগোতে চেয়েছিল, কিন্তু জানোই তো, প্রমাণ কিছু পাওয়া যায়নি। যাবেই বা কেনো? হুদাই আমার ভাইকে ফাঁসানোর চিন্তা করেছিল।”

নীহারিকার বুকের ভেতরটা হালকা ধক করে উঠল। সে নীরব থেকে ধীরে জিজ্ঞেস করল,
—” ইরফান তখন কেমন ছিল? মানে মানসিকভাবে?”

ইয়াশা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বলল,
—” ওই সময়টার কথা আর বোলো না। একদম অন্য মানুষ হয়ে গিয়েছিল। কয়েকদিন কারও সাথে কথা বলেনি। ইনায়াকেও কোলে নেয়নি। এমনকি একসময়…তাহিয়ার নাম শুনলেও অদ্ভুতভাবে চুপ হয়ে যেত। যেন কিছু মনে করতে পারে না। আবার কখনো মাঝরাতে ঘুম ভেঙে চিৎকার করত। আমরা তো ভেবেছিলাম ভাইয়া বোধহয় শোকে পাগল হয়ে যাবে। এই জন্যই তো যত দ্রুত সম্ভব বিয়ে করাতে চেয়েছে সবাই!”

নীহারিকার চোখের সামনে ভেসে উঠল গত রাতের দাগগুলো। তার বুকের ফ্যাকাশে চিহ্ন। আর সেই অনিশ্চিত উত্তর- মনে নেই পুরোটা। সে খুব শান্ত গলায় বলল,
—” কোনোদিন আর… কেউ সন্দেহ করেনি?”
ইয়াশা থমকে গেল।
—” কিসের সন্দেহ?”

নীহারিকা সরাসরি তাকাল না। বরং জানালার দিকে চোখ রেখে বলল
—”যে এটা শুধু দুর্ঘটনা ছিল?”

ইয়াশা ভ্রু কুঁচকালো। বলল,
—” ভাবি, তুমি কি বলতে চাইছো…?”

দ্রুত হাসলো নীহারিকা,
—” না না, আমি কিছু বলছি না। শুধু জানতে চাইছিলাম।”

ইয়াশা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর নিচু গলায় বলল,
—” একটা কথা আছে, তবে এসব বাড়িতে বলা হয় না এখন। আমার মনে আছে।”

নীহারিকার দৃষ্টি এবার তীক্ষ্ণ হলো।
—” কী কথা?”

ইয়াশা চেয়ারটায় একটু সামনে ঝুঁকে এলো। বলল,
—”ভাইয়া নাকি প্রথমে বলেছিল, সে ড্রাইভ করছিল। পরে স্টেটমেন্ট বদলায়। বলে, ভাবি জেদ করে স্টিয়ারিং নেয়। তখন সবাই ভেবেছিল, শকে গুলিয়ে ফেলেছে। কিন্তু…কে জানে।”

নীহারিকার শ্বাস থেমে গেল এক মুহূর্তের জন্য। ইয়াশা যোগ করল,
—” আরেকটা ব্যাপার, ভাইয়ার হাতে তখন কাচ ঢুকে ছিল, কিন্তু স্টিয়ারিংয়ের দিকের কাচ ভাঙা ছিল না ততটা। পুলিশ বলেছিল সম্ভবত দরজা খুলে ছিটকে পড়েছিল সে।”

ছিটকে পড়েছিল? নীহারিকার মাথায় যেন শব্দগুলো প্রতিধ্বনিত হলো। সে খুব ধীরে উঠে দাঁড়ালো। ইয়াশা অবাক হয়ে বলল,
—” ঠিক আছো ভাবি?”

নীহারিকা ঠোঁটে হালকা হাসি আনলো।
—” হুম। হুম। ঠিকই আছি।”
কিন্তু তার চোখে এখন অন্য কিছু। গত রাতের দৃশ্যগুলো ফিরে আসছে মনে। ইরফানের বুকের দাগ। তার অস্পষ্ট স্মৃতি। কিছু স্মৃতি থাকাই ভালো না, সে দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে থেমে গেল।

—” ইয়াশা, সেই ব্রিজটা কোথায়?”

ইয়াশা কেঁপে উঠল একটু। অবাক হয়ে মজা করে বলল,
—”তুমি কেন জানতে চাইছো?’

নীহারিকা এবার সোজা তাকালো তার দিকে।
—” বলা তো যায় না, ইতিহাসের যদি পুনরাবৃত্তি হয়।’

ইয়াশা কিছু বলল না। দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলো নীহারিকা। করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তার মুখের শান্ত অভিব্যক্তি বদলে গেল। সে ফিসফিস করে বলল,
—” মহাবিপদ…!” গত রাতের নিজের কথাটা মনে পড়লো তার। আর হঠাৎই একটা প্রশ্ন বুকের ভেতর গেঁথে গেল—সত্যিই কি শুধু দুর্ঘটনা ছিল? নাকি—কেউ কিছু মনে করতে চাইছে না? কেনো বারবার নীহারিকার মনে হচ্ছে যে ইরফানের ভুলের কারনেই তাহিয়া মারা গেছে। শুধু কি ভুল? নাকি সদিচ্ছে?

চলবে…

🫶 ছোট করে দিলাম। মাত্রই লিখেছি তো। কেমন হয়েছে জানাবেন। এখন থেকে রোমান্স কম থাকবে। মিস্ট্রি সল্ভিং থাকবে বেশি।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply