Golpo romantic golpo নবরূপা

নবরূপা পর্ব ১১


নবরূপা

পর্ব_১১ ( বাসর রাত স্পেশাল পর্ব)

কলমেঅনামিকাতাহসিন_রোজা

গোলাপ আর বেলী ফুল দিয়ে পুরো বাসর ঘরটা সাজানো হয়েছে। সুগন্ধে ম ম করছে চারিদিকে। ইরফানের বিশাল বিছানার ঠিক মাঝখানে নীহারিকা কে বসিয়ে দিয়ে ইয়াশা আর জ্যোতি বেরিয়ে গিয়েছে অনেকক্ষণ আগেই। আর, নীহারিকা হাঁটুতে হাত মুড়িয়ে রেখে চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ইরফানের পুরো ঘরটা দেখছে। প্রথমবার দেখলো সে! এখন থেকে এই ঘরটাতেই থাকতে হবে বলে চিনে নিলো প্রত্যেক কোণ। আশেপাশে তাকাতেই বেড সাইড টেবিলে থাকা ছোট্ট ফটোফ্রেমে ইরফান আর ইনায়ার একটা সুন্দর ছবি দেখলো নীহারিকা। মুচকি হেসে সেটা হাতে তুলে নিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে দেখলো সে। ইনায়া বাবার দিকে তাকিয়ে হাসছে ছবিটাতে, কি মিষ্টি লাগছে দেখতে! নীহারিকা কিছুক্ষণ উপভোগ করে ছোট্ট করে শ্বাস ফেলল, এরপর নিজের ঘোমটা টেনে নিল আবারো। নতুন করে সাজানো হয়েছে তাকে। ভারি শাড়ি খুলে রেখে জ্যোতির আনা বেবি পিংক কালারের একটা হালকা কাঁচের শাড়ি পড়ানো হয়েছে তাকে, ভারি মেকআপ তুলে লাইট মেকআপও করানো হয়েছে। ইয়াশা জানিয়েছে ইরফান বেশি মেকআপ পছন্দ করে না, তাই তারা নীহারিকা কে হালকা করেই সাজিয়ে দিয়েছে। এর মধ্যে ইরফানের হুকুমে নীহারিকা কে রাতের খাবার টাও খাইয়ে দিয়েছে ইয়াশা।

ইরফান সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে কফি খাচ্ছিল। এটা খেয়েই ঘরে যাবে বলে ভেবে রেখেছিল সে। এর মধ্যেই কোথ থেকে যেন আয়েশা বেগম তড়িঘড়ি করে এসে ইরফান কে টেনে নিয়ে আড়ালে গেলেন। ইরফান মুখের কফিটুকু গিলে ভ্রু কুঁচকে তাকালো,
—” কী হয়েছে মা?”

আয়েশা বেগম ঠোঁট ভিজিয়ে ইতস্তত করে বললেন,
—” বউমার সাথে ভালো ব্যবহার করবি। সব কিছু মিলেমিশে ঠিক করে নিবি। আর,
একটু থামলেন ভদ্রমহিলা, বললেন,
—” অন্তত ওর কাছ থেকে কোনো কিছু লুকাস না৷মনে রাখবি, ও-ই এখন তোর সন্তানের মা।”

ভ্রু কুঁচকে তাকালো ইরফান,
—” ঠিক আছে। কিন্তু, আমি কেনো ওর সাথে খারাপ ব্যবহার করব?”

—” তবুও বলে রাখলাম।”
বলেই আয়েশা বেগম প্রস্থান নিলেন। যাওয়ার সময় কফির কাপটাও নিয়ে গেলেন। ইরফান কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো মায়ের যাওয়ার দিকে। কানে ওই কথাটা বাজতে লাগলো,— অন্তত ওর কাছ থেকে কোনো কিছু লুকাস না।” দীর্ঘশ্বাস ফেলল ইরফান। পা চালালো নিজের ঘরের দিকে। একটু আগেই সে ইয়াশার ঘরে থাকা ঘুমন্ত ইনায়াকে আদর করে দিয়ে এসেছে। তাই কোনো কাজ নেই আপাতত। এখন বাসর ঘরে ঢোকাই যায়।

বলা বাহুল্য, টাকা নেয়ার কাজটা অনেক আগেই সেড়ে ফেলেছে জ্যোতি আর ইয়াশা। এরপর হুসাইন, নাহিদ ও নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করেও নিয়েছে অল্প সময়ে। তাই এখন ইরফানের বাসর ঘরের দরজা আটকানোর জন্য কেও নেই। খুব সহজেই নিজের ঘরের সামনে গিয়ে নক করলো ইরফান। কি আশ্চর্য! নিজের ঘরে ঢুকতেই এখন নক করছে ইরফান কবির!

দরজা নক করার শব্দে আবারো নিজেকে গুছিয়ে নিল নীহারিকা। ইরফান অপেক্ষা করলো না আর, ও জানে নীহারিকা মোটেই সাড়া দিয়ে বলবেনা- আসুন। মূলত নিজের আগমনের বার্তা টাই দেয়া ইরফানের মূল উদ্দেশ্য ছিল। দেরি না করে ইরফান এবারে আস্তে ধীরে ঢুকে পড়লো ঘরের ভেতর! নরম আবছা আলোয় নিজের ঘরটা নতুন মনে হলো তার কাছে। অবশ্য নতুনই তো। এরপর নিজের বিছানার দিকে তাকিয়ে নীহারিকা কে দেখে চোখে একরাশ মায়া নিয়ে এলো। নাহ, হয়তো এই দৃশ্য নতুন না তার কাছে। প্রথম স্ত্রী তাহিয়াও একসময় এভাবে বাসর ঘরে তার জন্য অপেক্ষা করেছিল। কিন্তু অনুভূতি তো এখন একদম নতুন! অন্যরকম!

ধীরে সুস্থে এগিয়ে গেলো ইরফান। এর মধ্যে চুড়ি আর শাড়ির চুমকির ঝুমঝুম করে শব্দ তুলে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে নিল নীহারিকা। বড় ঘোমটাটা আরো একটু টেনে নিলো। ইরফান এবারে একদম সামনে এসে থামতেই গলা খাঁকারি দিলো। নীহারিকা ঝটপট করে নিচে ঝুঁকে ইরফানের পা ছুঁয়ে সালাম করে নিলো, মুখেও সালাম দিলো। ইরফান হুট করে পা ছোঁয়াতে চমকেছে, সালাম শুনে তার উত্তর দিল ভদ্রতার সহিত। এরপর দুহাত পেছনে বেঁধে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। নীহারিকাও চুপচাপ রইলো। অদ্ভুত অনুভূতি, অদ্ভুত পরিবেশ! কেওই কারো সাথে কথা বলতে পারছে না, কথা বলা শুরু করবে কীভাবে সেটাও বুঝতে পারছে না। অস্বস্তি ঘিরে ধরছে দুজনকে।

বেশ খানিকটা সময় পার হওয়ার পর ইরফান বুঝলো তাকেই আগ বাড়িয়ে কথা বলতে হবে। নইলে নীহারিকা হয়তো পারলে সারারাতই এভাবে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে সক্ষম। তাই আবারো গলা খাঁকারি দিলো ইরফান। শব্দটা খুব স্বাভাবিক ছিল, তবু নীহারিকার বুকের ভেতর কেমন করে উঠলো। সে মাথা তুললো না। আঙুলের ডগাগুলো শাড়ির আঁচলে জড়িয়ে একটু শক্ত করে ধরলো।

ইরফান খানিকটা থেমে থেকে শান্ত গলায় ধীরে বলল,
—” এভাবে দাঁড়িয়ে থেকো না। বসো।”

নীহারিকা ধীরে মাথা তুলে তাকালো। ঘোমটার আড়াল থেকেও বোঝা যাচ্ছে—চোখদুটো টানটান, অচেনা এক সংকোচে ভরা। সে কিছু বলল না, শুধু ক্ষণিক থমকে থেকে খুব সাবধানে অনুগত ভঙ্গিতে আবারো বিছানার ধারে এসে বসল। ঠিক মাঝখানে না, আবার একদম প্রান্তেও না। যেন হিসেব করে নেওয়া দূরত্ব। দুই হাত কোলের ওপর জড়ো করে রাখল। ইরফান সেটা খেয়াল করলো। কিছু বললো না। সে নিজেও বিছানার এক পাশে বসে পড়লো। দু’জনের মাঝে এখনো বেশ খানিকটা ফাঁক।

কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর ইরফান খুব ধীরে, কিন্তু স্পষ্ট কণ্ঠে বলল,
—” ঘোমটা কি সারারাত এভাবে রাখবে?’

নীহারিকা দুদিকে মাথা নাড়ালো। ইরফান এবারে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে দুরত্ব রেখেই শুধু হাত দুটো বাড়িয়ে বেশ যত্নেই ঘোমটা উঁচু করে তুলল। এরপর নামিয়ে দিলো পুরো ঘোমটা। নীহারিকা মাথা নিচু করলো আরো। ইরফান আবারো সামনের দিকে তাকিয়ে বুক ভরে শ্বাস নিলো। আড়চোখে তাকিয়ে দেখলো নিজের সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীকে। ভীষণ কৌশলে বলল,
—” বিয়ের পর কি মেয়েরা বেশি সুন্দর হয়ে যায়? নাকি কবুল বলার পর থেকেই চেহারায় সোনালী আভা ছড়াতে শুরু করে?”

নীহারিকা ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসিটা লুকোলো। লজ্জায় হাসিও পাচ্ছে। ইশ! অদ্ভুত অনুভূতি তো! নীহারিকা ভেবেছিল তার এমন কোনো অনুভূতি হবে না। অথচ জ্যোতির কথা তো হাড়েহাড়ে মিলে যাচ্ছে। নীহারিকাকে লজ্জায় মাথা নিচু করে মুচকি হাসতে দেখে ইরফানও হাসলো। বলল,
—” তোমায় তো কিছু বলিনি নীহা। তুমি কেনো হাসছো?”

নীহারিকা এবারে চোখ তুলে তাকালো, বলল,
—” আমায় কিছু বলেন নি?”
—” না তো।”
—” ওও। আমি ভেবেছিলাম হয়তো আমার প্রশংসা করলেন।”
ঠোঁট কাঁমড়ে হাসলো ইরফান,
—” তোমার কেনো মনে হলো আমি তোমার প্রশংসা করছি? আমি তো অন্য কারো কথা বলছিলাম।”

—” কার কথা বলছিলেন?”

ইরফান তাকালো নীহারিকার দিকে। কি আশ্চর্য! মেয়েটা কি ঈর্ষা করছে? এখনই? চোখেমুখে এত কৌতুহল? ঠোঁট কাঁমড়ে আড়ালে হাসলো ইরফান। বলল,
—” সেটা তো তোমাকে বলা যাবে না। সিক্রেট! পরে বলব।”

নীহারিকা আর কিছু বলল না। মাথা নেড়ে বোঝার ভঙ্গি করলো, এরপর মাথা নিচু করলো। ইরফান আবারো তাকালো আড়চোখে। ধীর কন্ঠে ডাকলো,
—” শোনো..!”

নীহারিকা চোখ তুলে তাকালো। ইরফানও তাকিয়ে থাকায় দৃষ্টি মিলল একে অন্যতে। আটকালো চোখের চাহনি। ইরফান সেভাবেই তাকিয়ে থেকে বলল,
—” একটা সিক্রেট বলি তোমায়, আজ বিয়ে করেছি বুঝলে। বউকে দেখলাম মাত্র। ভীষণ সুন্দর লাগছে তাকে। তবে, চুল ছেড়ে দিলে আরো সুন্দর লাগতো।”

নীহারিকা হাসি আটকাতে পারলো না। মাথা নিচু করে হেসে ফেলল। লাজুক হাসিটা মারাত্মক জাদুকরী লাগলো ইরফানের কাছে। নিজেই সে হাত বাড়িয়ে নীহারিকার খোপা খুলে দিলো। এ পর্যায়ে চমকে গেলো নীহারিকা। হুট করেই ইরফানকে অত্যন্ত কাছে অনুভব করতে পেরে স্তব্ধ হয়ে রইলো। এতক্ষণে যতটা কম্ফোর্ট হয়ে গিয়েছিল, ইরফানের পারফিউমের মিষ্টি নেশালো ঘ্রানটা নাকে লাগতেই শুকনো ঢোক গিলল নীহারিকা। হাত দিয়ে চোখে পড়া চুলগুলো সরাতে গেলে ইরফান তার আগেই নিজেই সরিয়ে দেয় আলতো করে।

—” তুমি ভয় পাচ্ছো?”
নীহারিকার চমকে উঠলো। মাথা নাড়ালো দুবার। না, আবার হ্যাঁ—দুটোই একসাথে। ইরফান হালকা হাসলো। সেই হাসিতে দম্ভ নেই, জয়ের ছাপ নেই, শুধু বোঝাপড়া রয়েছে।

—” স্বাভাবিক। আজ তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের রাত। ভয় না পেলে বরং সমস্যা হতো। তবে, আমি চাই না, এই ঘরে ঢুকে প্রথম অনুভূতিটা তোমার জন্য ভারী হোক।”

নীহারিকা মাথা নিচু করে নিলো আরো। ইরফান মাথা ঝুঁকিয়ে নিচু কন্ঠে জিজ্ঞেস করে বলল,
—” আমি তোমার অনুমতি ছাড়া এক কদমও এগোতে চাই না। আজকের রাতটা আমার কাছে কোনো নিয়ম পালন করার নয়। এটা একটা শুরু। আর শুরুটা সুন্দর হওয়া দরকার। তুমি ভয় পাচ্ছো কেনো নীহা?”

নীহারিকা হাতের আঙুলগুলো জড়িয়ে ধরলো।
—” আমি নিখুঁত নই। অনেক ভয়, অনেক জট আছে আমার।”

—” আমারও আছে।”
ইরফান খুব স্বাভাবিকভাবে বলল।

নীহারিকা ধীরে ধীরে মাথা তুললো পুরোপুরি। প্রথমবার সরাসরি ইরফানের দিকে স্বাভাবিক দৃষ্টিতর তাকালো। জিজ্ঞেস করলো সরল ভাবে,
—” একটা কথা জিজ্ঞেস করব? যদি কিছু মনে না করেন।”

ইরফান হালকা করে হাসলো।
—” বলো।”

আমতা আমতা করে নীহারিকা বলল,
—” এটা তো আপনার প্রথম বিয়ে নয়। মানে, এমন বিয়ের অনুষ্ঠান তো আগেও হয়েছে একবার। তবুও সবাইকে দেখে কেনো আজ মনে হচ্ছে এরা যেন আপনার কোনো বিয়েই আগে দেখেনি। আমাকে নিয়ে এত মাতামাতি, এত আনন্দ…কেন? এমনকি আপনার কাজিনরা, বেস্ট ফ্রেন্ড সবাই একদম স্বাভাবিক! এমনভাবে আনন্দ করলো যেন এটা আপনার প্রথম বিয়ে! মনে হলো, বাড়িরই প্রথম বিয়ে এটা। এমনটা কেনো?”

প্রশ্নটা শেষ হতেই সে আবার দৃষ্টি নামিয়ে নিল। যেন উত্তরটা শোনার সাহসও জোগাড় করতে হচ্ছে। ইরফান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। এই নীরবতাটা ভারী না, বরং ভেবে নেওয়ার। তারপর খুব ধীরে, গভীর এক স্বরে বলল,
—” কারণ ওরা আগেও বিয়ে দেখেছে ঠিকই, কিন্তু আমাকে দেখেনি।”

নীহারিকা অবাক হয়ে তাকালো।
—’ মানে?”

ইরফান দীর্ঘশ্বাস ফেলল,
—” একটু সময় দাও নীহা। সব জানতে পারবে তুমি। শুধু তুমিই পারবে। তোমাকে তো জানতেই হবে। একটুখানি সময় দাও। তবে এটা ভেবো না যে তোমায় মিথ্যে বলেছি। এটা আসলেই আমার দ্বিতীয় বিয়ে। এটা সত্যি। তবে এটাও সত্যি, আজকের বিয়েটা স্বাভাবিক বিয়ে ছিল, সত্যি সত্যি একটা পূর্ণাঙ্গ বিয়ে-ই ছিল। আর এমন একটা বিয়ে প্রথমবারই হলো এই বাড়িতে।”

নীহারিকা অপলক তাকিয়ে রইলো। বোঝার চেষ্টা করলো কথাগুলোর মানে। কিন্তু কিছু বুঝতে না পেরে ঠোঁট কাঁমড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ইরফান হালকা হেসে যোগ করল,
—” আর তোমাকে নিয়ে মাতামাতির কারণটা আরও সোজা। তোমাকে সবাই ভালোবাসে, তুমি এ বাড়ির বউ।”

নীহারিকা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর খুব আস্তে বলল,
—” ঠিক আছে বুঝেছি। আপনি কিছু মনে করবেন না। আমি এমনিতেই জিজ্ঞেস করলাম।”

ইরফান মাথা নাড়িয়ে বলল,
—” সমস্যা নেই। আমায় জিজ্ঞেস করার অধিকার রয়েছে তোমার, আর জবাবদিহিতা করার দায়িত্ব আমার।”

ঘরটার বাতাসটা একটু হালকা হয়ে গেল। বাইরে আতশবাজির শব্দ ভেসে আসছে, কিন্তু ভেতরে—শুধু দুজন মানুষের নিঃশ্বাসের ছন্দ, আর ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা এক নতুন বিশ্বাস। ইরফান এবারে নীহারিকার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—” আর কোনো প্রশ্ন করবে এখন? করলে করতে পারো!”

নীহারিকা মাথা নেড়ে নিশ্চিত করলো আপাতত কোনো প্রশ্ন নেই। ইরফান এবারে একটু থেমে হাত বাড়াল। খুব কাছাকাছি নয়, আবার খুব দূরেও না।
—” তাহলে, চাইলে এখন একটু কাছে এসে বসতে পারো। শুধু কথা বলবো। নইলে আজকের মতো আলাদা থাকলেও আমার কোনো আপত্তি নেই।”

নীহারিকা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর খুব ধীরে, খুব সচেতন ভাবে হাত এগিয়ে দিয়ে এক ধাপ এগিয়ে এসে বিছানার অন্য প্রান্তে বসল। এই সামান্য দূরত্বটুকুই যেন অনেক বড় একটা সিদ্ধান্ত। ইরফান গভীর শ্বাস নিল। চোখে প্রশান্তির ছাপ। হাত বাড়িয়ে নিজের মুঠোয় নীহারিকার হাত ধরলো ইরফান। কিছুক্ষণ স্ত্রীর হাতের চুড়িগুলো ছুঁয়ে দিলো আঙুল দিয়ে। এরপর ফট করে নীহারিকার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—” ফ্রেন্ড হবে নীহা?”

—” হুমম?”
বুঝতে না পেরে প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে তাকালো নীহারিকা। ইরফান এবারে ডান হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
—” আমার ফ্রেন্ড হবে?”

অবাক হলো মেয়েটা। চোখ ছোট করে বলল,
—” ফ্রেন্ড?”

—” হুম ফ্রেন্ড।”
ইরফানের গলায় একরাশ স্বাভাবিকতা, কিন্তু কথার ভেতর ছিল গভীর হিসেব। নীহারিকা কিছু বলতে পারল না। শুধু তাকিয়ে রইল। ইরফান হাতটা এখনো সামনে বাড়িয়েই রেখে বলল,
—” স্বামী হওয়া মানে দায়িত্ব, আশ্রয়, নিরাপত্তা—এই সব বড় বড় শব্দ। কিন্তু এসবের আগে একটা জিনিস না থাকলে সবই ভারী হয়ে যায়।”

নীহারিকা ধীরে ধীরে জিজ্ঞেস করল,
—”কোন জিনিস?”

—” বন্ধুত্ব।”
ইরফান হালকা হাসল।
—” যেখানে ভয় থাকলে বলা যায়, দুর্বল হলে লুকোতে হয় না। যেখানে রাগ হলেও কথা বন্ধ হয় না, আর নীরবতাও অস্বস্তিকর লাগে না। আমি চাই আমাদের সম্পর্কটা যেন ঠিক ততটাই কম্ফোর্টেবল হয়ে যায়।”
সে নীহারিকার চুড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে আঙুলের ছোঁয়া দিলো আবার,
—” আমি চাই না তুমি আমার সামনে সবসময় শক্ত হয়ে থাকো। আমি চাই, তুমি ক্লান্ত হলে সেটা বলো। ভুল করলে ভয় না পাও। আর আমি যেন শুধু তোমার স্বামী না হই—তোমার নিরাপদ আশ্রয় আর সবচেয়ে কাছের মানুষটাও হই।”

নীহারিকার বুকটা হঠাৎ করে হালকা হয়ে এলো।
—” কিন্তু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তো…”

ইরফান কথা কাটল না, শুধু মৃদু স্বরে বলল,
—” স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক গভীর হয় তখনই, যখন তার নিচে বন্ধুত্বটা শক্ত থাকে। নইলে সম্পর্কটা দায়িত্বে টিকে থাকে, ভালোবাসায় না।”
একটু থেমে সে যোগ করল,
—” আমি আরেকটা দায়িত্ব নিতে চাই না, নীহা। আমি একটা সম্পর্ক গড়তে চাই। ধীরে, বোঝাপড়ার মধ্যে দিয়ে। ইনায়া আমার সন্তান, আমার দায়িত্ব। আর এই দায়িত্বের ভাগিদারী আজ থেকে তুমিও, তাই আর যাই হোক না কেনো, আমি তোমার আর আমার মাঝে কোনো দুরত্ব রাখতে চাই না। সামান্যটুকুও না। বউ হিসেবে আমার উপর রাগ দেখাতে পারবে তুমি, কিন্তু বন্ধু হিসেবে অদৃশ্য বাঁধনে অদৃশ্য এক জাদুকরী টানে তুমি সবসময় থাকবে আমার কাছে। আর এসব কোনো এখন বলছি, কেনো বন্ধু হতে চাইছি তা সময় আসলেই বুঝবে তুমি!”

তারপর ইরফান আবার হাতটা এগিয়ে দিয়ে, প্রায় শিশুসুলভ এক আন্তরিকতায় বলল,
—” তাই বলছি, আমার ফ্রেন্ড হবে?”

নীহারিকা তাকিয়ে রইল সেই বাড়ানো হাতটার দিকে। এই হাতটায় কোনো তাড়া নেই, কোনো দাবি নেই—শুধু জায়গা করে দেওয়ার আহ্বান। আর একটুও ভাবলো না সে। মুচকি হেসে ধীরে ধীরে সে নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিল। খুব আস্তে বলল সে,
—” হুম হবো।”
ইরফান মুচকি হেসে এবারে বাহু জড়িয়ে কাছে টেনে নিলো নীহারিকা কে।

চলবে….

“শ্রাবণ ধারার রূপকথা’ অর্ডার করেছেন! আর কিন্তু বেশি সময় নেই। প্রি অর্ডার শেষের পথে👀✨

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply