নতুন প্রেমের গান
পর্ব_০৩
নুজাইফা_নূন
“ হাউ ডেয়ার ইউ? তোমার সাহস হয় কী করে সুপ্রভার গায়ে হাত তোলার?”
“সুপ্রভা এ বাড়ির বউ।বাড়ির বউ অন্যায় করলে , তাকে শাসন করার রাইট আছে আমার। কিন্তু আমি তোমাকে আমার হাত ধরার রাইট দিই নি।হু আর ইউ টু হোল্ড মাই হ্যান্ড?”
নোরার ঝাঁঝাল কণ্ঠ কানে যেতেই চমকে উঠল সৌরভ।ভয়ের একটা শীতল স্রোত মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে গেল তার।যে হাতটা সে অজান্তেই শক্ত করে ধরে রেখেছিল,তা হঠাৎই ঢিলে হয়ে আসে। সে তৎক্ষণাৎ চোখ নামিয়ে নেয়। অপরাধীর মতো নোরার হাত ছেড়ে দেয়।”
নোরা চোখ মুখ কুঁচকে বিরক্ত গলায় বলল –
“ ছিঃ! হাতটাই নোংরা করে দিয়েছে আমার। যেমন ব্রেইনলেস বোন, ঠিক তেমনই তার ব্রেইনলেস ভাই।”
সৌরভের বুকটা কেঁপে উঠল।নোংরা শব্দটা তার বুকে চাবুকের ন্যায় আঘাত করলো। কিন্তু সৌরভ সেটা সবার সামনে প্রকাশ করলো না। বরং কণ্ঠে তেজ নিয়ে বলল–
“ আমারই সামনে আমার বোনের গায়ে হাত তুলছেন, তাকে অপমান করছেন।না জানি আমার অবর্তমানে বোনের উপর কতোটা অত্যাচার নির্যাতন হয়।সুপ্রভা মুখ বুজে আপনাদের অত্যাচার সহ্য করলেও , আমি সহ্য করব না। আমি এক্ষুনি, এই মুহূর্তে আমার বোনকে এই বাড়ি থেকে নিয়ে যাবো।”
নোরা ঠোঁট বেঁকিয়ে বলে– “বাড়িতে নিয়ে গিয়ে বোনকে খাওয়াবে কী? নিজেই তো মাঠে কামলা খেটে খাও।বোনকেও কী মাঠে কামলা খাটতে পা…” সম্পূর্ণ কথাটা শেষ করতে পারে না নোরা।তার আগেই সপাটে চড় পড়ে তার গালে।নোরা গালে হাত দিয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে ঈশিতা চৌধুরীর দিকে তাকায়।ভেজা গলায় বলে–
“ সবার সামনে তুমি আমার গালে থাপ্পড় দিলে মম? তুমি এটা করতে পারলে?তোমার একটুও হাত কাঁপল না? নিজের মেয়ের অপমানের কথা ভাবলে না তুমি?”
ঈশিতা চৌধুরী কর্কশ কন্ঠে বলেন – “ থাপ্পড় দিয়েছি বেশ করেছি।এটাই ডিজার্ভ করো তুমি। ভুল টা আমারই।আমি ছোট থেকে তোমাকে শাসন করি নি।আদর দিয়ে দিয়ে তোমাকে এমন তৈরি করেছি যে , তুমি মানুষকে মানুষ বলে মনে করো না।সৌরভ সুভার ভাই। এ বাড়ির গেস্ট। গেস্টের সাথে কেমন বিহেভ করছো তুমি?”
নোরা দাঁতে দাঁত চেপে বলে– “ গেস্ট মাই ফুট।”
রাগ ক্ষোভ অপমানে হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে আসে সৌরভের।নোরা একজন সৌরভের দিকে তাকিয়ে ত্বরিত দৃষ্টি নামিয়ে নেয়। বিড়বিড় করে বলে–
“কালা টাকি একটা।দেখলেই গায়ে জ্বালা ধরে আমার।”
নোরার তিক্ত কথাগুলো ঠিকই কর্ণগোচর হয় সৌরভের। সুপ্রভার কথা চিন্তা করে সে সব অপমান গিলে নেয়।ঈশিতা চৌধুরীর সামনে দাঁড়িয়ে হাত জোড় করে বলে–
“নোমান ভাইয়ার মৃ’ত্যুর পরেই আমি সুপ্রভাকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। আপনারা বোনকে যেতে দেন নি। প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বোনকে আগলে রাখার। আজ আমার জন্মদিন।বোনকে না জানিয়ে এসেছিলাম তাকে সারপ্রাইজ দিবো বলে। কিন্তু এখানে এসে আমি নিজেই সারপ্রাইড।আমাকে ক্ষমা করবেন মাওই মা। আমি ভাই হয়ে নিজের বোনকে শ্বশুর বাড়িতে নির্যাতিত হতে দেখতে পারি না।আমি বোনকে নিজের সাথে নিয়ে যেতে চাই। আপনি প্লিজ অনুমতি দিন।”
ঈশিতা চৌধুরী কাতর গলায় বললেন –
“ তুমি ভুল ভাবছো সৌরভ। সুভা আমার কাছে অনেক যত্নে, অনেক ভালোবাসায় রয়েছে। আমি , তোমার আঙ্কেল দুজনকেই সুভাকে অনেক ভালোবাসি।সুভা মোটেও এ বাড়িতে নির্যাতিত হচ্ছে না।”
“নোরা ম্যাডাম বোনের গায়ে হাত তুলছে, বোনকে যা নয় তাই বলছে । এরপরও বলবেন বোন নির্যাতিত হচ্ছে না?”
“ মেয়েটাকে আমি মানুষ করতে পারি নি বাবা।
এটা আমার ব্যর্থতা।তবে নোরা সুভার গায়ে হাত তুলতে পারতো না। তুমি না এলে আমি না হয় তোমার আঙ্কেল ঠিকই ওকে আটকে দিতাম।এরপরও যদি তোমার মনে হয় সুভা এখানে সুরক্ষিত নয় , তুমি ওকে নিয়ে যেতে পারো বাবা।”
অনেকদিন পর ভাইকে দেখে সুপ্রভার খুব কান্না পাচ্ছিলো। কিন্তু সে নিজের দূর্বলতা কারো সামনে প্রকাশ করতে চায় নি।তাই সে আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিলো। কিন্তু ঈশিতা চৌধুরীর কথা শুনে সে আর স্থির থাকতে পারে না। ছুটে আসে ভাইয়ের কাছে।ভাইকে জড়িয়ে ধরে ভাঙ্গা গলায় বলে—
“ আমার ঘৃণার থেকে ভালোবাসার মানুষ অনেক বেশি।বাবা , মা আমাকে সত্যিই অনেক ভালোবেসেন। আমি এখানে ভালো আছি , সুখে আছি।নোরা আর কতোদিনই বা এ বাড়িতে থাকবে।আজ বিয়ে দিলে কাল থেকেই এ বাড়ির মেহমান হয়ে যাবে।তুমি আমাকে নিয়ে টেনশন করে নিজের কালো চুল সাদা করে ফেলো না।তোমার এখনো বিয়ে করা বাকি। তুমি নিশ্চিন্তে বাড়ি ফিরে যাও।আমি এখানেই থাকবো।”
সৌরভ কিছু বলার আগে নোরা পেছন থেকে ক্রুদ্ধ স্বরে বলে উঠে– “ অ্যাই নিয়ে যাও তো তোমার বোনকে।হাড় জুড়োক সবার।”
মোহনা শেখ স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। নোরাকে পুত্রবধূ করার যে স্বপ্ন তিনি বুকের গভীরে লালন করেছিলেন, মুহূর্তেই তা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল।বাড়ির বউয়ের এতো তেজ, ঔদ্ধত্য বেমানান। তিনি বরাবরই চেয়েছেন সুপ্রভার মতো এমন মিষ্টি, শান্তশিষ্ট মেয়েকে তার ছেলের বউ হিসেবে দেখতে।সুপ্রভাকে তারও মনে ধরেছে।কী মিষ্টি চেহারা। শুধু তাকিয়েই থাকতে ইচ্ছে করছে।
সুপ্রভার মধ্যে সিয়াদাত শাহারিয়ার বউ হওয়ার সমস্ত গুন বিদ্যমান রয়েছে। তবুও একটা বিধবা মেয়েকে তিনি ছেলের বউ করবেন না। কিছুতেই না। তিনি সিয়াদাতকে তাড়া দিয়ে বলেন –
“ এদের ফ্যামিলি ড্রামা দেখার কোনো সময় বা ইচ্ছা কোনটাই আমার নেই।তুমি প্লিজ বাড়ি চলো বেটা।আমার ভুল হয়েছে।মস্ত বড় ভুল হয়েছে তোমাকে ব্ল্যাকমেইল করে এখানে নিয়ে আসা।আমি আমার সব কথা উইথড্র করে নিচ্ছি। তুমি প্লিজ চলো এখান থেকে।”
সিয়াদাত বাঁকা হেসে বলে– “ তুমি যতো সহজে তোমার বলা কথা উইথড্র করে নিতে পারছো, ততো সহজে আমি আমার দেওয়া মন উইথড্র করতে পারবো না আম্মু।সো সরি।”
মোহনা শেখ একটু নরম হয়ে বলেন – “ একটু বোঝার চেষ্টা করো বেটা।ঈশিতা চৌধুরী যেখানে সুপ্রভার ভাইয়ের হাতেই সুপ্রভাকে তুলে দিতে নারাজ, সেখানে তোমার হাতে সুপ্রভাকে তুলে দিবে? আর সবচেয়ে বড় কথা সুপ্রভা তোমাকে বিয়ে করতে রাজি হবে?”
“ রাজি না হওয়ায় কোনো কারণ নেই আম্মু। আমি একজন প্রফেসর। দেখতে হ্যান্ডসাম, ড্যাশিং, কেয়ারিং।আর কী চায় বলো? এরপরও যদি সুপ্রভা রাজি না হয় ….”
সিয়াদাতের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে মোহনা শেখ
হড়বড় করে বললেন – “ যদি রাজি না হয় তবে?”
সিয়াদাত কিছু না বলে সোফায় বসে থাকা সৌরভের পানে চায়। সৌরভ অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বসে রয়েছে।নোরা, ঈশিতা চৌধুরী, রওনক চৌধুরী কাউকে দেখা যাচ্ছে না।সিয়াদাত নিঃশব্দে সৌরভের পাশে গিয়ে বসে। কুটিল হেসে বলে–
“ হাই সম্বন্ধী।”
সৌরভ কপালে চোখ তুলে অবাক গলায় বলে – “ সম্বন্ধী?”
“ বউয়ের বড় ভাইকে তো সম্বন্ধী বলা হয় তাই না?”
সৌরভ পুনরায় অবাক হয়– “ বউ কে?”
সিয়াদাত অকপটে বলে – “ তোমার বোন, আমার বউ।”
সুপ্রভা চা করার জন্য সবে কিচেনের দিকে পা বাড়িয়েছে তখনই সিয়াদাতের বলা বউ শব্দটা তার কানে যায়।সে ত্বরিত সিয়াদাতের দিকে তেড়ে আসে। কঠিন গলায় বলে–
“ সেই তখন থেকে আপনি যা নয় , তাই বলে যাচ্ছেন। আমাকে আপনার পছন্দ , আমাকে বিয়ে করবেন, হ্যান ত্যান।আপনি কি একবারও জানতে চেয়েছেন আমি কি চাই?”
“ সিয়াদাত শাহারিয়ার কারো চাওয়া না চাওয়ার ধার ধারে না। সে যেটা চায়, সেটা নিজেই করে নিতে জানে ।বলেই সিয়াদাত বাম চোখ টিপ দেয়।ঠোঁট কামড়ে বলে,
“ তুমি চাও বা না চাও, আমি তো তোমাকেই বিয়ে করব লাল চমচম ।”
চলবে ??
[ সবাই বেশি বেশি কমেন্ট করবেন। ১০০০ কমেন্ট হলে বোনাস পর্ব দেওয়া হবে]
Share On:
TAGS: নতুন প্রেমের গান, নুজাইফা নূন
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নতুন প্রেমের গান গল্পের লিংক
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ৪
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ১
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ২