নতুনপ্রেমেরগান (১৭)
সিয়াদাত শাহারিয়ার কেবিনের মাঝখানে রাখা কালো লেদারের চেয়ারটায় বসে রয়েছে।পিঠটা চেয়ারের সাথে ঠেস দিয়ে, দুহাত টেবিলের ওপর রাখা।বাইরে থেকে তাকে দেখতে যতোটা স্থির মনে হচ্ছে তার ভেতরটা ঠিক ততটাই অস্থির।সামনে খোলা ফাইল , ল্যাপটপের স্ক্রিনে আলো জ্বলছে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে। কিন্তু তার দৃষ্টি সেদিকে নেই।তার দৃষ্টি বারবার চলে যাচ্ছে দরজার দিকে। সে বিরক্ত হয়ে ঘড়ির দিকে তাকায়। মনে মনে বলে–
“সুপ্রভা আসবে তো?”
পরক্ষণেই তার ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে ওঠে। নিজেকে নিজেই কটাক্ষ করে বলে –
“ ভাই তুই কবে থেকে কারো জন্য এভাবে অপেক্ষা করতে শিখলি?যেই প্রফেসরের জন্য হাজারো মেয়ে পাগল সেই প্রফেসর কি না একটা বিধবা মেয়ের জন্য নিজের নিতি, নৈতিকতা , ব্যক্তিত্ব সব জলাঞ্জলি দিয়ে দিল? শেম অন ইউ ভাই। শেম অন ইউ।”
বকাবকি শেষ হলে সিয়াদাত সবে ফোনটা হাতে নিয়েছে ঠিক তখনই দরজার বাইরে হালকা পায়ের শব্দ ভেসে আসে।সিয়াদাতের বুকের ভেতরটা আচানক ধক করে ওঠে।আঙুলগুলো অজান্তেই টেবিলের ওপর ছন্দহীনভাবে টোকা দিতে শুরু করে।পায়ের শব্দটা দরজার সামনে এসে থেমে যায়।
সিয়াদাতের হনু শক্ত হয়ে আসে।চোখদুটো তীক্ষ্ণ হয়ে দরজার দিকে স্থির হয়।সে রাশভারী কণ্ঠে বলে—“কাম ইন।”
দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে যায়।সিয়াদাতের বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তের জন্য থেমে যায়।চোখের মণি সামান্য বিস্তৃত হয়।অপেক্ষার সমস্ত ভার এসে জমা হয় সেই এক ফাঁকে।
কিন্তু দরজার ফাঁকটা পুরো খুলতেই তার চোখের সেই ক্ষণিকের আলোটা নিভে যায়।তার সামনে সুপ্রভা নয় বরং একজন অফিস স্টাফ দাঁড়িয়ে রয়েছে।সে হাতের ফাইল বুকে চেপে, একটু ইতস্তত ভঙ্গিতে বলে–“স্যার!এই ফাইলটা সাইন করতে বলে…!”
কথাটা শেষ করার আগেই সিয়াদাতের চিবুক শক্ত হয়ে ওঠে।সে ধীরে ধীরে চেয়ারের পিঠে হেলান দেয় । গম্ভীর গলায় বলে– “রাখুন।”
স্টাফটা এগিয়ে এসে কাঁপা হাতে ফাইলটা টেবিলের উপর রেখে দাঁড়িয়ে থাকে।সিয়াদাতের অনুমতি পাওয়া মাত্রই সে অতি দ্রুততার বেরিয়ে আসে।
স্টাফটা বেরিয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই কেবিনটা আবার আগের মতো নিস্তব্ধ হয়ে যায়। সিয়াদাত কিছুক্ষণ ফাইলটার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর হঠাৎই বিরক্ত হয়ে ফাইলটা বন্ধ করে দেয়। কলমটা আঙুলের ফাঁকে ঘুরাতে ঘুরাতে মন্দ্র স্বরে বলে—“ডিসগাস্টিং, জাস্ট ডিসগাস্টিং।”
নিজের ওপর প্রচণ্ড বিরক্ত হয় সে। সহসা উঠে দাঁড়ায় সে। লম্বা পায়ে হেঁটে যায় জানালার কাছে। কাঁচের ওপাশে শহরটা ব্যস্ত,সবকিছু চলছে নিজের গতিতে।সিয়াদাত দুই হাত পকেটে ঢুকিয়ে নিচু স্বরে বলে— “ তুমি না এসে ভালোই করেছো সুপ্রভা।আজ তুমি এলে আমি আরো দূর্বল হয়ে যেতাম।তোমার জন্য আমার ব্যক্তিত্ব বিসর্জন দিতেও কুন্ঠিত বোধ করি নি। কিন্তু তুমি আমার চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলে। দেখিয়ে দিলে তোমার অবস্থানটা। কী আছে তোমার? আমি কী দেখে তোমাকে পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলাম? আরে ভাই তোমার কোনো যোগ্যতাই নেই শেখ সিয়াদাত শাহারিয়ার পার্টনার হওয়ার।আমি তোমার থেকে অনেক বেটার মেয়ে ডিজার্ভ করি।”
সিয়াদাত একটু থেমে আবারও বলে– “ আজ থেকে তুমি মুক্ত সুপ্রভা।এতদিন তুমি যে সিয়াদাতকে চিনতে,সে ছিল তোমার জন্য বানানো একটা মানুষ।এবার তুমি আসল মানুষটাকে চিনবে, সুপ্রভা।যে সিয়াদাত কারো জন্য থামে না,কারো জন্য বদলায় না,কারো জন্য ভাঙে না।আর যে সিয়াদাত একবার ছেড়ে দিলে,ভুলেও পেছনে ফিরে তাকায় না।
ভিডিওটা দেখেই সুপ্রভার চোখ বড় হয়ে যায়।
স্ক্রিনে ভেসে উঠছে একটা ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার দৃশ্য। চারদিকে মানুষজন ভিড় করে আছে।কেউ কেউ চিৎকার করছে, কেউ দৌড়ে এদিক থেকে ওদিকে যাচ্ছে। র’ক্তে ভিজে আছে রাস্তার এক পাশ।
ভিডিওর নিচে লেখা—“ঢাকা-ময়মনসিংহ হাইওয়েতে ভয়াবহ দুর্ঘটনা, গুরুতর আহত এক যুবক!”
সুপ্রভার বুক ধক করে ওঠে।কেন জানি হঠাৎ অজানা এক আশঙ্কা তাকে গ্রাস করে।সে কাঁপা হাতে ভিডিওটা প্লে করে।ক্যামেরা ধীরে ধীরে জুম করে আহত ছেলেটার মুখের দিকে তাকাতেই সুপ্রভার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে।তার ঠোঁট ফুঁড়ে অস্ফুট স্বরে বেরিয়ে আসে – “ না, না।
এটা হতে পারে না। কিছুতেই না।”
সুপ্রভার চোখের সামনে তার ভাইয়ের হাস্যোজ্জ্বল চেহারাটা ভেসে ওঠে।একটা ভাঙা চিৎকার বেরিয়ে আসে তার বুক চিরে – “ ভাইয়া।”
সুপ্রভার চিৎকার শুনে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে সিমি। উদ্বিগ্ন স্বরে বলে– “ এই প্রভা! কী হয়েছে তোর? এভাবে চিৎকার করলি …?”
কথা শেষ করার আগেই সুপ্রভার অবস্থা দেখে সে থমকে যায়। বিচলিত হয়ে জিজ্ঞেস করে –
“কী হয়েছে তোর? তুই এভাবে কাঁপছিস কেন?”
সুপ্রভা কাঁপা হাতে ফোনটা তুলে সিমির দিকে এগিয়ে দেয়।কাঁদতে কাঁদতে বলে—
“সিমি, ওটা… ওটা আমার ভাইয়া…! আমার ভাইয়ের অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে।সবাই বলছে আমার ভাইয়া না কি বাঁচবে না।”
সিমি ভিডিওটা দেখে প্রথমে বিশ্বাস করতে পারে না।সে আবার ভালো করে তাকায়, সৌরভের মুখটা স্পষ্ট হতেই সিমির মুখটাও ফ্যাকাসে হয়ে যায়।সে গালে হাত দিয়ে কাঁপা গলায় বলে–
“ইন্নালিল্লাহ…! এটা তো সত্যিই।”
সুপ্রভা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। ধপ করে সোফায় বসে পড়ে।তার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়তে থাকে। সে অশ্রুসিক্ত গলায় বলে–
“ আমার দৃঢ় বিশ্বাস ভাইয়া আমার খোঁজেই আসছিল।ভাইয়ার কিছু হয়ে গেলে আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না সিমি।এই অপরাধবোধ নিয়ে আমি বাঁচতে পারব না না সিমি।আমি ম’রে যাব।”
সিমি দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে বলে—“প্রভা, বোন আমার।প্লিজ কান্না বন্ধ কর! এখন কান্না করার সময় নয়।আমাদের ঢাকা যেতে হবে। ভাইয়াকে ঢাকা মেডিকেলে এডমিট করা হয়েছে!”
সুপ্রভার মাথা কাজ করছে না।সে শুধু একটাই কথা বলতে থাকে—“আমার ভাইয়া,আমার ভাইয়া।ভাইয়ার কিছু হয়ে গেলে আমি বাঁচব না।”
সিমি এক মিনিটও বিলম্ব করে না।সে দ্রুত সবকিছু গুছিয়ে নেয়।সুপ্রভাকে সোফা থেকে উঠিয়ে তাড়া দিয়ে বলে–
“এভাবে বসে থাকলে চলবে না প্রভা। উঠ! এখনই বের হতে হবে।”
সুপ্রভা যেন নিজের ভেতরেই হারিয়ে গেছে। চোখদুটো ফুলে লাল, ঠোঁট কাঁপছে, দম নিতে কষ্ট হচ্ছে। তবুও সিমির হাত ধরে কোনোমতে উঠে দাঁড়ায় সে। পা দুটো যেন নিজের ওজনই বইতে পারছে না।
“আমার ভাইয়া” শুধু এই একটা শব্দই বারবার ভেঙে ভেঙে বেরিয়ে আসে তার বুক থেকে।
বাইরে তখন রাত নামতে শুরু করেছে। শহরের আলো-আঁধারির ভেতর দিয়ে দ্রুতগামী গাড়ি ছুটে চলেছে। গাড়ির ভেতর সুপ্রভা জানালার দিকে হেলান দিয়ে বসে আছে, চোখ দিয়ে এখনো অঝোরে পানি পড়ছে। সিমি বারবার তার হাত চেপে ধরে শান্ত করার চেষ্টা করছে।তার আশ্বাস দিচ্ছে–
“প্রভা, আল্লাহ ভরসা রাখ। কিছুই হবে না ইনশাআল্লাহ।
কিন্তু সুপ্রভার কানে কোনো কথাই প্রবেশ করে না। তার চোখের সামনে শুধু সৌরভের নিথর শরীরটা ভাসছে।
গাড়ি এসে থামে ঢাকা মেডিকেলের সামনে। সুপ্রভা গাড়ি থামতেই প্রায় দৌড়ে নেমে পড়ে।
“ভাইয়া কোথায়? আমার ভাইয়া কোথায়?”চিৎকার করে সে সামনে এগোয়।
রিসেপশনের দিকে ছুটে গিয়ে কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করে—“একটা অ্যাক্সিডেন্ট পেশেন্ট ঢাকা-ময়মনসিংহ হাইওয়ে থেকে আনা হয়েছে। সে কোথায় এখন? ”
নার্স কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে, তারপর ধীর গলায় বলে—“ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু কন্ডিশন ক্রিটিক্যাল।”
এই শব্দটা শুনে সুপ্রভার পা দুটো এক মুহূর্তে থেমে যায়।ক্রিটিক্যাল শব্দটা সে অস্ফুট স্বরে পুনরাবৃত্তি করে।
পরক্ষণেই সে দৌড়ে ইমার্জেন্সির দিকে ছুটে যায়। সিমি পেছন থেকে ডাকতে থাকে—“প্রভা! সাবধানে! পড়ে যাবি তুই”
সুপ্রভা থামে না। অকষ্মাৎ তার মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠে। চোখের সামনে সবটা ব্লার হয়ে উঠে।সুপ্রভা সেন্সলেস হয়ে ফ্লোরে পড়ে যাবে বুঝতে পেরেই সিমি দৌড়ে আসে সুপ্রভাকে ধরার জন্য। কিন্তু সিমি দৌড়ে এসে ধরার আগেই একটা পুরুষালি শক্ত হাত এসে সুপ্রভার কোমর আঁকড়ে ধরে।”
[ কে ধরলো সুপ্রভাকে? সিয়াদাত না কি অন্যকেউ?
অনেক দিন পর গল্প দেওয়া হয়েছে।এই পর্বটা সবার ফিডে যাবে না। যারা পর্বটা পড়বেন, একটা হলেও কমেন্ট করার অনুরোধ রইল]
চলবে ইনশাআল্লাহ।।
® Nuzaifa Noon
Share On:
TAGS: নতুন প্রেমের গান, নুজাইফা নূন
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ১০
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ৬
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ১১
-
সুপ্রভা পর্ব ৩
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ১৫
-
নতুন প্রেমের গান গল্পের লিংক
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ৩
-
সুপ্রভা পর্ব ৪
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ১৪
-
সুপ্রভা পর্ব ১