দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৪৯
দেওয়ানা(আমার ভালোবাসা)সিজন_২
লেখিকাঃ_রিক্তা ইসলাম মায়া
(কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ)
৪৯
খান বাড়িতে বিশেষ মেহমানদের আগমন ঘটেছে। সকাল হতেই বস্ত্যতা পার করছে হেনা খান। ঝমঝমে পরিবেশে আরাফ খানও সবার সাথে উপস্থিত ড্রয়িংরুমে। রিদ চলে গেল সেই সকালেই। বাসায় নেই। ব্যান্ডেজ হাতে মায়া সিঁড়ি কোণায় দাঁড়িয়ে অপরিচিত মানুষদের গোল গোল চোখে পযবেক্ষণ করছে। আপাতত সে এই মানুষদের কাউকে চিনতে পারছে না। তবে আরাফ খানের কথা বলার ভাব ভঙ্গিতে যতটুকু বুঝলো তারা হলো রিদের নানা বাড়ির মানুষ। কিন্তু প্রত্যাকের চেহারা বিদেশিনী ভাব। দেখেই বুঝা যাচ্ছে তারা কেউ বাংলাদেশি নয়। মায়ার চোখে দৃষ্টি জোড়ালো হলো সোফায় বসে থাকা অতাত্ত্বিক সুন্দরী মেয়েটিকে দিকে। খুবই নিখুঁত সুন্দরী যাকে বলে। গায়ে কালো প্যান্টের সাথে ভিতরে সাদা সফট গেঞ্জি পড়া। তার উপরে কালো লেডিস্ কোট জড়ানো। কমড়ে চিকন কালো বেল্ট বাঁধা। গোল্ডেন কালার চুলগুলো কারলি করা। পায়ে প্যান্সিল হিল তো হাতে ব্যান্ডের ঘড়ি। সবমিলিয়ে অসাধারণ ভাব ভঙ্গি তার। সহজেই যে-কারও নজর কারতে সক্ষম। সুন্দরী মেয়েটির পাশে আরও একটি সুন্দর ছেলে বসে আছে সেদিকে চোখ গেলনা আপাতত মায়ার। মায়ার বর্তমান চোখ শুধু এই অসাধারণ সুন্দর মেয়েটিকেই দেখলো একমনে। আরাফ খান মায়াকে সিঁড়ি কোণায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ডেকে নিলেন নিজের কাছে। নিজের পাশে বসিয়ে অন্তত আদুরে সহিত পরিচয় করাতে লাগলো সবার সাথে।
—” ওর নামই রিক্তা ইসলাম মায়া। খান বাড়ির সবচেয়ে ছোট সদস্য। আমাদের একমাত্র সোনামা। তোমাদের কাছে ওহ কথায় বলছিলাম এতক্ষণ।
আরাফ খানের কথায় সবার দৃষ্টি কেন্দ্র বিন্দু হলো মায়া। প্রত্যাকের মুখ হাসি মাখা হলেও ছেলেটি দৃষ্টি ছিল খুবই অপতৎপরতা। আরাফ খানের কথায় খানিকটা হাসি মুখে কথা বললো মোরশেদ আব্দুল্লাহ। রিদের বড় মামা।
—” পিটি গার্ল! কোন ক্লাসের পড়ো তুমি?
বিদেশিনী হয়ে শুদ্ধ বাংলা বলাতে খানিকটা আবাক হলো মায়া। তাই থমথমে মুখে আরাফ খানের দিকে ঘাড় উঁচিয়ে তাকাতেই চোখে ইশারায় আশ্বস্ত করলো তিনি। মায়া খানিকটা নির্ভয় হয়ে মিহি কন্ঠে বললো..
—” জ্বিই! ইন্টার ফাস্ট ইয়ার।
—” তাহলে তো তুমি অনেক ছোট গার্ল। পিচ্চি মেয়ে। তবে আমাকে তুমি আঙ্কেল বলে ডাকতে পারো। আমি তোমার রিদ ভাইয়ার বড় মামা হয়। আমরা সুইজারল্যান্ড থেকে এসেছি। ঐখানেই আমাদের বর্তমান বসবাস। আর এমনিতে আমাদের জম্মস্থান তুর্কিতে। মানে তোমার রিদ ভাইয়ার নানা বাড়ি তুর্কিতে। তুমি হয়তো জানো না। তবে আমাদের বাংলাদেশে যাতায়াত প্রায় ত্রিশ বছরের উপরে হবে তাই আমরা সবাই বাংলা খুব ভালো বলতে পারি। বাংলাদেশ আমাদের নিজস্ব বাড়িও আছে। যায় হোক! আর এই যে উনাকে দেখছো? আমার স্ত্রী আয়েশা আব্দুল্লাহ। আর এই ছেলেমেয়ে দুটোকে দেখছো যে? আমার জমজ সন্তান। ওরা জমজ ভাই-বোন। মেয়েটির নাম মেহু আব্দুল্লাহ। ছেলেটির নাম ফাহাদ আব্দুল্লাহ। একিই বয়স দু’জনের। তুমি ওদের ভাইয়া-আপু বলে ডাকতে পারো কেমন?
মায়া মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়। তবে কথায় কথায় রিদকে মায়ার ভাইয়া বলে দাবি কথাটা তখনো বুঝলো না মায়া। সন্দেহ ও করলো না তেমন। তবে মায়ার খারাপ লাগলো। রিদ যে মায়ার ভাইয়া নয় স্বামী হয় সেটা কি তারা জানে না? প্রশ্ন থাকলো মায়ার ছোট মাথায়। তারপরও মুখে কিছু বললো না কাউকে। শুধু বেশ করে গোল গোল চোখে পযবেক্ষণ করলো গম্ভীর মুখের সুন্দরী মেয়েটিকে। তুর্কির মেয়ে বলেই হয়তো চেহারায় এতোটা ধাচ রয়েছে মেয়েটির। ত্বক অনেকটাই মসৃণ সুন্দর। ঠোঁটে হাসিটাও মন মাতানো। মায়া বেশ করে তাকিয়ে রইলো মেয়েটির দিকে তবে ছেলেটি বার কয়েক ঘুরে তাকালো মায়ার দিকে। মায়াকে বেশ মনে ধরেছে তার। সেটা তার চোখের ভাষায় স্পষ্ট। মায়ার ভাবনার মাঝেই হঠাৎ করে উঠে দাঁড়ালো মেয়েটি। নিজের বামহাতের ঘড়িটি দেখে নিয়ে সবার উদ্দেশ্য বললো…
—” আম গেটিং লেট! যেতে হবে আমার। তোমরা কথা বলো আমি গেলাম। কিছুক্ষণ পর আমার মিটিং আছে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির হয়ে রিদের সাথে। তাছাড়া রিদের সাথেও আমার এখনো দেখা হয়নি। তাই আমি সোজা রিদের অফিসে চলে যাচ্ছি। রাতে বাসায় দেখা হবে সবার সাথে আসি।
মেহু মুখে রিদ নামটা শুনতেই চমকে উঠলো মায়া। বুক কেঁপে উঠে শিহরিত করলো চিনচিন তপ্ত ব্যথায় মায়াকে। রিদের সাথে কোনো মেয়ের ওঠাবসা থাকতে পারে সেটা জানা ছিলনা মায়ার। মায়ার কাছে অসম্ভব কিছু শুনালো যখন মেহুর মুখে রিদ নামটি শুনলো। মেহু চলে যেতে নিলেই দ্রুততার পিছন ডাকলো হেনা খান। তিনি ব্যস্ত ভঙ্গিতে বললো…
—” মেহু তুমি আমাদের সাথে দুপুরের লাঞ্চ করবে না?
—” নো গ্র্যান্ডমা! আমি রিদের সাথেই দুপুরে লাঞ্চ করে নিব। আসি!
মায়ার দুরদুর বুকের ব্যথার আরও বাড়িয়ে দিয়ে চলে গেল মেহু আব্দুল্লাহ। মায়া বুকের কম্পন তিনগুণ করতে আপেক্ষিক মুখ খুললো আয়েশা আব্দুল্লাহ। তিনি অন্তত কৌশলে বলে উঠলো…
—” আমাদের এবার বাংলাদেশে আসার মূল কারণটা তো আপনারা ইতিমধ্যে জেনেছেন। মেয়েকে এবার বিয়ে দিতে চাইছি। সে রাজি হয়েছে বিয়ে করবে বলে। তাছাড়া আমাদের ছেলেমেয়ে দু-জনই রিলেশনে আছে প্রায় কয়েক বছর ধরে। এখন মনে হয় রিদের সাথে কথা বলে বিষয়টি এগিয়ে নিয়ে যাওয়া দরকার আমাদের। আমরা মেহু সাথে রিদের বি…
ব্যস্ত ভঙ্গিতে আয়েশা আব্দুল্লাহকে থামিয়ে দেয় আরাফ খান। অন্তত ভয়ার্ত চোখে মায়াকে এক পলক দেখে নিয়ে বললো….
—” আমরা এই বিষয়ে পড়ে কথা বলি আয়েশা। সবে তো কাল আসলে বাংলাদেশে। তাই আজ থাক। রিদের সাথে নাহয় পড়ে কথা বলে নিও তোমরা এই বিষয়ে।
হেনা খান নিজের স্বামীর দিকে তাকিয়ে শুকনো ঢুক গিলল। পরিস্থিতি সামলাতে পেরে তিনি ভয়ার্ত চোখ বুলালো মায়ার দিকে। মায়ার দৃষ্টিতে বেশ কৌতূহল। সে আসলে বুঝতে পারছে না মেয়েটির বিয়ের সাথে রিদের কি সম্পর্ক হতে পারে? তাছাড়া কার সাথে কার রিলেশন চলছে তাও ধরতে পারলো না? তবে আয়েশা আব্দুল্লাহকে হঠাৎ করে থামিয়ে দেওয়াটা মোটেও পছন্দ হয়নি মায়ার। সে জানতে চাই বাকি কথা গুলো। কিন্তু আপসোস জানা হলো না। কারণ ততক্ষণে আরাফ খানের কথা মেনে নিয়ে আয়েশা আব্দুল্লাহ এবং চুপ করে গেলেন। হেনা খান ভয়াৎ ভঙ্গিতেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো গোপনে। তিনি বছর তিনেক আগে শুনেছিল রিদের সাথে নাকি মেহুর ভালোবাসার সম্পর্ক রয়েছে। রিদ নাকি মেহুকে বিয়ে করবে এমনটা কথাও দিয়েছিল। এখন সত্যি মিথ্যা জানা নেই তাদের কারওই। তবে তিনি বেশ কয়েকবার দেখেছেন রিদকে মেহুর সাথে কথা বলতে। বেশ সাচ্ছন্দ্য ভাবে কথা বলেছিল একে অপরের সাথে। বাকিটা জানে না তিনি। মেহু উনার পছন্দ নয় এমনটা না। পছন্দই। তবে মায়ার সাথে রিদের ছোটবেলায় হওয়া ছিল বিদায় তিনি রিদের পাশে মায়াকে ছাড়া অন্য কারওকে চাইনি। এখন রিদ মায়াকে মানতে শুরু করেছে। এমনতো অবস্থায় রিদের জীবনে মেহুর হঠাৎ আগমনটা বিপদ সংকেত ছাড়া অন্য কিছু নয়। তাছাড়া রিদ মায়ার বিয়েটাও তারা মেহুর পরিবারের কাছে চেপে গেছেন এখনো প্রকাশ করেনি। আগে রিদের সাথে কথা বলবে তারপর নাহয় বলা যাবে এই বিষয়ে। রিদ বাড়িতে ফিরলে একবার কথা বলে নিতে হবে। নয়তো বিষয়টি মায়ার জীবনের প্রভাব ফেলতে পারে।
~~
সন্ধ্যা আকাশ। সময় ৭ঃ১৫। খোলা আকাশের তখনো তাঁরার দেখা মেলেনি। চাঁদটা নেই। অনেকটা অন্ধকারময় আকাশ। ঠিক যেন আয়নের তিক্তময় জীবনটার মতোই অন্ধকার। আয়ন কফি হাতে নিজের রুমের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। একহাত তাউজারের পকেটে গজিয়ে তাকিয়ে আছে ঢাকার যান্ত্রিক শহরে দিকে। গুলশান দুই নাম্বার সেক্টরে তার ফ্ল্যাট। আবাসিক এলাকা। কোনো রকম উচ্চশৃঙ্খলাতা নেই। বেশ শান্ত। তবে আয়ন শান্ত নয় এই শীতলময় পরিবেশেটাতেও। বেশ অশান্ত। বিগত আড়াই মাস ধরেই সে অশান্ত। মায়াকে হারিয়ে অশান্ত। মায়া তার প্রথম ভালোবাসার সাথে সাথে প্রথম অনূভুতি। যাকে ঘিরে ছিল অজস্র স্বপ্ন। ছোট বড় অনেক স্বপ্নই দেখতো মায়াকে নিয়ে ভালোবাসাময় সংসার সাজানোর। দীর্ঘ দুই বছর স্বপ্ন গুলো দেখলো কিন্তু পূরণ হলো না। মায়া তার হলো না। বরং হঠাৎ একদিন জানা গেল সে যাকে ভালোবাসে সে তার নয়। বরং অন্য কারও হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। তাঁকে ভালোবাসে না। আয়ন সেদিন দম ফাটা কষ্ট পেয়েছিল। নিশ্বাস আঁটকে ছিল যখন দেখেছিল মায়ার চোখে রিদের জন্য অসীম ভালোবাসা ও ছটফট। আয়ন পরাজিত সৈনিকের মতো তখনই হার মেনে নেয়। যুদ্ধ ছেড়ে দিয়ে রণক্ষেত্রে থেকে চলে আসে। আয়নের গোটা একমাস লেগেছিল কষ্টময় জীবন থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে। সবার থেকে আলাদা থাকা শুরু করলো। খান বাড়িতে যাতায়াত ও যোগাযোগ বন্ধ করলো। কাজের চাপ বাড়ালো। সর্বক্ষণ ব্যস্ততা কাটানোর চেষ্টা করলো মায়াকে ভুলে থাকার জন্য। কিন্তু পারলো কই। প্রথম ভালোবাসার মানুষকে অত সহজে ভুলা যায়? সেকি পারছে ভুলতে? কই পারছে নাতো। সে আজও নিবিড় ভাবে ভালোবাসে মায়াকে কিন্তু পাথক্য একটাই। এখন আর মায়াকে নিয়ে দু-চোখ ভর্তি স্বপ্ন সাজায় না আয়ন। দূরে থেকে শুধু মায়ার জন্য ভালো থাকার কামনা করে। ব্যাস এতটুকু! আয়ন মায়াকে ভুলার চেষ্টা করছে না যে এমনটা না। প্রতিনিয়তই চেষ্টা করে যাচ্ছে। আর তার এই চেষ্টার শেষ ধাপই ছিল জুইয়ের সাথে নিজের সম্পর্কটা স্বাভাবিক করা। আয়ন ধারণা হয়তো জুইয়ের মাধ্যমে আয়ন মায়ার অনূভুতি থেকে বের হতে পারবে। এক নারীর সংস্পর্শে আসলে অন্য নারীকে ভুলা সক্ষম হবে। তাছাড়া জুই মায়ার বোন। মায়ার কিছু দিক জুইয়ের মধ্যে রয়েছে সেটা আয়নকে আরও টানে জুইয়ের প্রতি। জুইকে নিয়ে ভাবায়।
আয়ন স্থির দৃষ্টিতে কথা গুলো ভেবে আবারও শান্ত ভাবে চুমুক বসায় কফির মগে। কয়েক সেকেন্ড থেমে থেকে পুনরায় ভাবতে বসে সে।
সেদিন আয়ন রিদের সাথে দেখা করতে গিয়েছিল খান বাড়িতে বিশেষ কিছু কারণ বশত। রিদের সাথে আয়নের বেশ কথা হয়েছিল স্বাভাবিক ভাবেই। যদিও প্রফেশনার কথাবার্তা বেশিই হয়েছিল দুজনের মাঝে। তবে পার্সোনাল কথাবার্তাও বেশ টুকটাক হয়েছিল দুজনের মধ্যে। আয়ন বয়সের সাথে সাথে অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ একজন মানুষ। তাই সেদিন রাতে রিদের অল্প কথায় এতটা স্পষ্ট ছিল সে মায়াকে ভালোবাসে। শুধু ভালোবাসে বললে ভুল হবে, অনেকটা পাগল দেওয়ানার মতো ভালোবাসে মায়াকে। হয়তো আয়নের চিন্তা ভাবনার বাহিরে রিদ মায়াকে ভালোবাসে। রিদের ভালোবাসার পরিমাণটা আয়ন আন্দাজ করতে পারি কতটা হবে। কিন্তু বুঝতে পেরেছিল মায়াকে ছাড়া রিদের নিশ্বাসটাও হয়তো অচল হয়ে পড়বে। রিদ নিজের দূর্বলতা প্রকাশ করতে চাইনা বলেই উপর দিয়ে শক্ত গম্ভীর হয়ে চলাফেরা করে। নয়তো সেও মায়ার বোকামিতে মরেছিল অনেক আগেই। মায়া চঞ্চলতা, বোকামিতায় রিদকে টানে মায়ার প্রতি। যেমনটা আয়নকে টানতো। মায়া রিদকে জ্বালায় বলেই রিদ মায়াতে পাগল। রিদের উগ্র, মাফিয়া জীবনের ক্ষমতা ক্ষমতা খেলতে খেলতে স্বাভাবিক জীবনটা প্রতিও বিরক্ত ছিল সে। আর মায়ার ছিল রিদের স্বাভাবিক জীবনের আর্কষণের কারণ। শান্তির কারণ।
রিদের যে বেশ ভালো লাগে মায়া তার আশেপাশে ঘুরঘুর করলে, পাগলামো করলে, সেটা রিদের শান্ত থাকাটাতেই স্পষ্ট বুঝায়। রিদ সহজ কাউকে সহ্য করতে পারে না নিজের আশেপাশে। কাজ ছাড়া একটা কথার বেশি দুটো কথা বললে রেগে যায়। সেখানে মায়ার অসীম পাগলামোতেও রিদ শান্ত থাকে। নড়ে না। চুপচাপ বসে থাকে। মায়াকে প্রশ্রয় দেয়। কারণ রিদের উগ্র অশান্ত জীবনের মায়া এক পলাশ বৃষ্টি ন্যায় রিদকে ভিজিয়ে শান্ত করে দেয়। মায়ার বোকামীতা রিদের এন্টারটেইনমেন্টের কারণ। রিদ উপভোগ করে মায়ার কান্ড। তাই ভালোবাসে প্রশ্রয় দেয় মায়াকে। যেমনটা আয়ন দিতে চেয়েছিল। কিন্তু ভাগ্য তার সহায় ভালো না। তবে সেদিন রিদ তাঁকে সরাসরি জুইয়ের দিকে ইশারা করেছিল। জুইকে মেনে নিতে। একটা সুযোগ জুইকে দিতে। আয়ন সেদিন কিছু বলেনি। তবে আয়ন গত দুইদিন অনেক ভেবেছিল জুইকে নিয়ে। পরিশেষে আয়ন সিদ্ধান্ত নিল সে জুইকে একটা সুযোগ দিবে। যদি জুইয়ের উপর আয়নের বিন্দুমাত্রও ভালো লাগা কাজ করে তাহলে সে জুইকে আর ডিভোর্স দিবে না। সংসার করবে। আর এই জন্য মূলত আয়ন জুইকে নিজের ফ্ল্যাটে নিয়ে এসেছিল একে অপরকে চেনাজানা জন্য। জুইয়ের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্কে জড়ানোর জন্য তখন ঐভাবে কথা গুলো বলেছিল আয়ন। হয়তো এমন করে একদিন জুইকেও নিজের জীবনে জড়াতে পারবে এই আশায়। তবে আয়নের যদি জুইয়ের প্রতি কখনোই ভালো লাগা সৃষ্টি নাহয়? তাহলে সে জুইকে নিজের বে-রস জীবনের সাথে আর জড়াবে না। ডিভোর্স দিয়ে মুক্তি করে দিবে জুইকে। এবং ততদিন দ্বিতীয় বিয়ে করবে না যতদিন না তার নতুন কাউকে ভালো লাগছে। এখন দেখা যাক ভাগ্য তাকে কোথায় নিয়ে দাঁড় করায়। কথা গুলো ভেবেই আয়ন বুক ভারির দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে শব্দ করে। আশপাশটা এক পলক শান্ত চোখ বুলিয়ে কফি মগটি বারান্দায় কাউচের উপর রেখে বামহাতে ঘড়িটি দেখে নিল। সময় অল্প! তাকে হসপিটালের যেতে হবে আটটার মধ্যে। আয়ন তপ্ত নিশ্বাস ফেলে আবারও নিজেকে শান্ত করলো। রুমের ঢুকে সময় নিয়ে রেডি হলে। ফোন আর গাড়ির চাবি পকেটে ঢুকিয়ে,এপ্রোন হাতে নিল। ফ্ল্যাটের চাবি অন্য হাতে নিয়ে ড্রয়িংরুম দিয়ে বের হয়ে যেতেই চোখে পড়লো জুঁইয়ের গুছিয়ে দেওয়া টিফিন বক্সটি। আয়ন দাঁড়ালো। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে টিফিন বক্সটি হাতে নিল। জুঁইে বিকাল করে পাঠিয়ে দিয়েছিল আয়ন ডাইভার দিয়ে। ঘন্টা দুই খানিকটা হবে হয়তো জুঁই চলে গেছে হসপিটালের। আয়ন হসপিটালের গেলে হয়তো পুনরায় দেখা হতে পারে তাদের। আয়ন দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললো। তার কপালে কি আছে আল্লাহ জানে! ভালোবাসা নামক শব্দটি দ্বিতীয়বার তার জীবনের আসবে কিনা তাও সন্দেহ।
~~
দিনটা বৃহস্পতিবার! সময়টা ৫ঃ৪৫। বিষন্ন ভগ্নহৃদয়ে গালে হাত ঠেকিয়ে দু-পা ভাঁজ করে ড্রয়িংরুমের সোফার উপর একা বসে আছে মায়া। গায়ে মুসলিম তাতের সুতায় বুনন 18 কাউন্টের পাতলা ফিনফিনে গোলাপি জামদানী শাড়ি জড়ানো। চুল গুলো সব একপাশে এনে চড়িয়ে ফেলে রেখেছে কোল থেকে সোফার উপর পযন্ত। কানে সাদা পাথরের মধ্যে ডায়মন্ডের টপ পড়া। গলায় রিদের দেওয়া বাসর রাতে ডায়মন্ডের লকেটটি ঝুলছে। নাকে চকচক করছে ছোট ডায়মন্ডের নাকফুলটি। আর দুহাত ভর্তি গোলাপি কাচের রেশমি চুড়ি। রিদের কাল ব্যান্ডেজ করে দেওয়া হাতটিতে একটু বেশিই চুড়ি পড়লো মায়া। যাতে ব্যান্ডেজটি দেখা না যায়। সবকিছুর মধ্যে মায়া মুখেও হালকা পাতলা সাজগোছ রয়েছে। যেমন ঠোঁটে গাঢ় লাল লিপস্টিক, চোখে মোটা করে আইলেনার দেওয়া। হলুদ চামড়া হওয়ায় মায়াকে চমৎকার আবেদনময়ী লাগছে। আদুরে পুতুল ন্যায় মায়া। কিন্তু তারপরও মায়ার মুখ এই মূহুর্তে ঘন কালো মেঘে ঢাকা। নিজের উরুর উপর কুইন রেখে গালে হাত ঠেকিয়ে উদাস মনে ভাবছে গভীর ভাবে। আজ মায়ার চিন্তার শেষ নেই। সে গভীর চিন্তত ও শোকাহত। কারণ মায়া ইতিমধ্যে জেনে গেছে ফিহা সাথে তার আরিফ ভাইয়ের সম্পর্কটা মেনে নিচ্ছে না মেহেরবান। আজ দুপুর করে যখন মায়া হসপিটালের গিয়েছিল তখন আরিফ তাকে আর জুঁইকে এক সঙ্গে করে একটা রেস্টুরেন্টে গিয়েছিল দুপুরে খাবার খাওয়ানোর জন্য। কিন্তু সেখানে কাকতালীয় ভাবে ফিহা সাথে দেখা হয়ে যায় তাদের। তাদের পাশের টেবিলেই মেহেরবানের ঠিক করা পাত্রের সাথে দেখা করতে এসেছিল সে। তাদের মধ্যে কথাও হচ্ছিল পূবে থেকে। কিন্তু হঠাৎ করে আরিফকে দেখতে পেরে ফিহা নিজের উত্তেজনা আরিফকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে বসে সবাই সামনে। পাত্রও সেখানেই ছিল। ফিহা জানায় মেহেরবান তাকে জোরপূর্বক বিয়ে দিতে চাচ্ছে। ইতিমধ্যে রেস্টুরেন্টে পরিবেশও শীতিলত হয়ে যায়। এবং উপস্থিত সবাই তামাশা দেখতে লাগলো। কিন্তু আরিফ ফিহাকে মায়ের পছন্দে বিয়ে করে নিতে বলে খুবই শান্ত ভঙ্গিতে ফিহা থেকে নিজেকে জোরপূর্বক ছাড়িয়ে রেস্টুরেন্টে থেকে বের হয়ে যায় সঙ্গে সঙ্গে। মায়া আগের থেকেই নিজের ভাইয়ের প্রেম ঘটিত বিষয়টি জানলেও জুই জেনেছিল তখনই। জানতে পেরে যেন স্তব্ধ নিবাক ভঙ্গিতে কতক্ষণ ফিহার দিকে তাকিয়ে ছিল। মায়া ফিহাকে সান্ত্বনা দিবে তার আগেই ফিহাও দৌড়ে বের হয়ে যায় রেস্টুরেন্টে থেকে। পরে আর খবর নেওয়া হলো না ফিহার সম্পর্কে মায়ার। এখন মায়ার বিষন্নতা দ্বিতীয় কারণটা তার গুণধর স্বামীকে নিয়ে। কাল সকালে মায়াকে ব্যথা দিয়ে সেই যে গেল আর ফিরে আসলো না বাড়িতে। গোটা একটা দিন চলে গেল রিদের দেখা পেল না মায়া। অবশ্যই মায়া রাগ করেছে তাই রিদের সামনে এমনিতেও যেত না সে। তবে লুকিয়ে চুকিয়ে তো একটু আকটু দেখে নিত মায়ার উনাকে। কিন্তু তাও হলো না। তারপর আবার কাল শফিকুল ইসলামকে হসপিটাল থেকে ডিসচার্জ করে দিবে। এবং ব্রাক্ষণবাড়িয়াতে চলে যাবে মায়ার পরিবার। কিন্তু মায়া যেতে পারবে না। মায়ার সামনে পরীক্ষা আছে। হেনা খান সাফ সাফ মায়াকে নিষেধ করে দিয়েছে পুনরায় ব্রাক্ষণবাড়িয়াতে যাওয়া নিয়ে। সামনে পরীক্ষা রেখে কোথাও যাওয়া হবে না মায়ার। আর সেই জন্য মায়া উদাস মনে বসে আছে একা একা। দৃষ্টি তার ফ্লোরে উপরই স্থির। আজ জীবনের প্রথম মায়া শাড়ি পড়েছে। আগের কখনো কোনো অনুষ্ঠানে শাড়ি পড়েনি মায়া। অন্যন্যা জামা-কাপড় পড়েই অনুষ্ঠান পার করেছে সে। তবে আজ হেনা খান অনেকটা জোরপূর্বকই মায়াকে শাড়ি পড়িয়ে সাজুগুজু করিয়ে দিয়েছেন। কারণ কিছুক্ষণ পর হেনা খান মায়াকে নিয়ে নিজের বাপের বাড়ি যাবেন বলে মায়াকে শাড়ি পড়িয়েছেন তিনি। নিজের বাবার বাড়ির মানুষজন দেখবে খান বাড়ির বউকে তাই। আর মায়া খান বাড়ির বউ। তাই মায়ার মধ্যে বউ বউ ফিল আসার জন্যই মূলত হেনা খান মায়াকে শাড়ি পড়িয়ে দিয়েছেন। মায়ার জন্য শাড়ি আগেই কিনে রেখেছিল হেনা খান। শুধু মায়া ছোট বলে কখনো পড়ানো হয়নি। মায়া জীবনের প্রথম শাড়ি পড়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে নামতে দুই তিন বার ইতিমধ্যে হুঁচট খেয়ে ফেলেছে। তাই শাড়ি খোলে যাওয়ার ভয়ে চুপচাপ ড্রয়িংরুমে একা বসে আছে। আর বারবার ঘাড় ঘুরিয়ে কিচেন রুমের দিকে তাকাচ্ছে কখন আসবে হেনা খান এই নিয়ে। কারণ হেনা খান নিজের ভাইয়ের জন্য নিজের হাতে কিছু রান্না করছেন। যেটা শেষ হলেই মায়াকে নিয়ে বেড়িয়ে যাবেন তিনি। অবশ্য আরাফ খানও যাবে তাদের সাথে। হেনা খান ইতিমধ্যে কল করে বলেছে আরাফ খানকে বাড়িতে চলে আসতে। এবং আজকে রাতের ডিনার উনারা সবাই মিলে হেনা খানের বাপের বাড়িতেই করবেন। আরাফ জানিয়েছে উনি কিছুক্ষণের মধ্যে চলে আসবে। এখান অবধি সবই ঠিকঠাক। কিন্তু উদাস মায়ার উদাসীন কিছুতেই কামছে না, বাড়ছে ছাড়া। মায়া নিয়ে টেনশন করেই যাচ্ছে আর থেকে থেকে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলছে গালে হাত ঠেকিয়ে।
মায়ার বিষন্নতা মাঝেই রিদ গম্ভীর মৃদু স্বরে ফোনে কথা বলতে বলতে প্রবেশ করলো ড্রয়িংরুমের মেইন দরজা ধরে। উদাস মায়াকে তখনো তার চোখে পড়েনি তার। মনোযোগ সবটা ফোনের কথা বলাতেই ছিল। কিন্তু বিপত্তি ঘটে আরও কয়েক কদম হেঁটে সামনে এগিয়ে। বেখেয়ালি চোখ গেল মায়ার দিকে। থমকালো জায়গায়। ব্যালেন্স হারিয়ে ফোন ধরতে ধরতে পড়লো ফ্লোরে। ঠাস করে শব্দ হওয়ায় মায়া উদাস চোখ তুলে তাকায় সামনে। রিদকে হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখেও নড়চড় হলো মায়ার। বরং স্বাভাবিক ন্যায় রিদকে এক পলক দেখে নিয়ে আবারও আগের মতো করে উদাস মনে বসে রইলো। আর থেকে থেকে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলতে লাগলো। সে এই মূহুর্তে ভিষণ টেনশনে আছে তাই কারও দিকে তাকানোর সময় নেই মায়ার। তাছাড়া মায়ার তো তার স্বামীর সাথে রাগ করেছে। রিদকে দেখবে না! রিদের সাথে কথা বলবে না বলে, কথা শুনিয়ে এসেছিল কাল। এখন যদি মায়া তার স্বামীর দিকে তাকায় তাহলে মায়ার রাগ থাকবে? চলে যানে না? তাছাড়া রিদ মায়াকে ছেঁচড়া বলবে না? মায়া তো ছেঁচড়া না! ব্যাস স্বামীকে দেখতে তার ভালো লাগে, এই জন্য মায়া একটু ঘুরঘুর করে আরকি। তবে এখন মায়া রিদের দিকে তাকাবে না। কোনো ভাবেই তাকাবে না। রাগটাও মাটি করবে না। মায়ার দৃঢ় মনোবল শক্ত করলো রিদকে দেখবে না বলে। কিন্তু রিদ? সেতো ততক্ষণে দেওয়ানা হয়ে বসে আছে বউয়ের ঝলসানো রুপে। রিদের দৃষ্টি বদলালো মায়ার প্রতি। স্বাভাবিক দৃষ্টি থেকে অস্বাভাবিক ন্যায় গভীর দৃষ্টি পড়লো মায়ার উপর। দীর্ঘ আটাশ বছরের ধৈর্য ভাঙ্গলো। প্রেমময় অনূভুতি প্রকাশ পেল বুকে। মায়াকে নিয়ে চিন্তা ভাবনার পরিবর্তন ঘটলো। রিদের গাঢ় অভিমানটাও সরে গেল মায়ার উপর। শুধু ভালোবাসাময় অনূভুতি চোখে প্রকাশ পেল। স্থির থেকে অস্থির ন্যায় হলো। চোখে মুখে মুগ্ধতা ছেয়ে গেল। আজ জীবনের প্রথম মায়াকে শাড়ি পড়তে দেখলো রিদ। আর সেটাই যেন রিদের কাল হলো। ছটফট করলো মনপাড়ায়। রিদ জায়গায় থেকে নড়লো না। বরং তীব্র বুক ধড়ফড়ের সাথে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো মায়ার দিকে। মায়া খানিকটা বাদে আবারও বিষন্নতার মাথা উচিয়ে তাকায় রিদের দিকে। সাথে সাথে চোখ মিলল রিদের শান্ত দৃষ্টির সাথে। মায়া হালকা কপাল কুঁচকে আবারও আগের ন্যায় বসলো উদাস মনে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর আবারও একিই ভাবে মাথা উঁচিয়ে দেখলো রিদকে জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকাতে। এবার মায়া নড়েচড়ে সোজা হয়ে বসে। রিদের দৃষ্টি স্বাভাবিক লাগলো না মায়ার কাছে। অস্বাভাবিক কিছু আছে রিদের এই শান্ত দৃষ্টির মাঝে। মায়া সোজা হয়ে বসে হাসফাস করলো অনেকটা। আড়চোখে রিদের দিকে তাকালো। রিদ তখনো শান্ত দৃষ্টিতে মায়ার দিকে তাকিয়ে আছে। ইতস্তত মায়া কিছু সময় থ মেরে বসে রইলো। এই বুঝি রিদ চলে যাবে এটা ভেবে। কিন্তু রিদ গেল না বরং স্থির ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকলো। মায়া এবার তীব্র অস্থিরতায় কাজ করলো ভিতরে। ইতস্ততায় উঠে দাঁড়ায়। উদ্দেশ্য রিদের সামনে থেকে সে-ই চলে যাবে। কাল এই লোকটাকে মায়া বলেছিল মায়ার দিকে না তাকাতে। অথচ আজ পলকই ফেলছে না মায়াকে দেখা থেকে। নিজের কথা নিজেই ভুলে গেছে এই লোক। মায়া অস্থিরতায় রিদের সামনে থেকে চলে যেতে নিলেই, মায়ার হুট করে মনে পড়ে সেতো শাড়ি পড়ে হাটতে পারে না ঠিকঠাক। তাই এখন যদি হাঁটতে গিয়ে হুঁচট খেয়ে পড়ে যায় তাহলে মায়ার ইজ্জত আর থাকবে রিদের সামনে? নষ্ট হয়ে যাবে না? মায়া নিজের ইজ্জতের কথা ভেবে পুনরায় গুটি মেরে বসে পড়ে সোফার উপর। চুল গুলো সব এবার সোফা ছাড়িয়ে ফ্লোরে ঠেকলো। মায়া হাত দিয়ে টেনে চুল গুলো সব কোলের উপর নিতে নিতে আবারও আড়চোখে রিদের দিকে তাকালো। এবং সাথে সাথে চোখাচোখি হলো রিদের গভীর দৃষ্টির সাথে। রিদের এমন শান্ত দৃষ্টির মানে যেন এবার মায়াও হুট করেই বুঝলো। আর বুঝতে পেরেই যেন কাল হলো মায়ার জন্য। তুমুল লজ্জায় মায়া সিঁটিয়ে গিয়ে শাড়ির আঁচল শক্ত করে চেপে ধরে এদিক সেদিক তাকালো। রিদের দৃষ্টি হতে নিজের দৃষ্টি লুকানো চেষ্টা করলো। কিন্তু পারলো না। মায়া আবারও আড়চোখে রিদের দিকে তাকাতে গিয়ে চোখাচোখি হয়ে যায় রিদের সাথে। এবার মায়া তুমুল লজ্জায় সঙ্গে সঙ্গে আঁচড়ে পড়লো সোফার উপর। মুখ লুকালো সোফার বালিশের কুশনের ভিতর। মায়া বসা অবস্থায় হেলিয়ে পড়ে নাক মুখ চেপে ধরলো সোফার বালিশের কুশনের ভিতর। রিদ মায়াকে লজ্জা পেতে দেখে মূহুর্তেই হেঁসে উঠে। অনেকটা শব্দ করেই হেঁসে উঠে। এতে যেন মায়া আরও লজ্জা পেল। লজ্জা আড়ষ্ট হয়ে দুহাতে বালিশের কুশন চেপে ধরে নাক মুখ শক্ত করে পড়ে রইলো। উফ! তার লজ্জা লাগছে ভিষণ! রিদের শব্দ করা হাসিতে কিচেন রুম থেকে ছুটে আসে হেনা খান। রিদকে প্রাণবন্তর হাসতে দেখে খুবই বিস্মিত হয় তিনি। সাথে অন্তত খুশিও হন রিদকে হাসতে দেখে। লাস্ট রিদকে কবে এইভাবে হাসতে দেখেছে মনে নেই উনার। হয়তো রিদের বাবা-মা বেঁচে থাকার সময়। তিনি অন্তত খুশি মনে আদুরের সহিত ডেকে উঠে বলে উঠে…
—” রিদ! সোনাবাবা আমার। তুই হাসছিস? আজ কত বছর পর তোকে হাসতে দেখলাম! আমার মনটা ভরে গেল তোর হাসিতে।
হেনা খানের কথায় হাসি থামে রিদের। খানিকটা গম্ভীর হয়। হেনা খানের দিকে তাকাতে তাকাতে আবারও চোখ আওড়িয়ে তাকায় মায়া দিকে। হেনা খান রিদকে গম্ভীর হতে দেখে পুনরায় অধৈর্য গলায় বলে…
—” হাসি থামালি কেন? ভালোই তো লাগছিল সোনাবাবা। মাঝেমধ্যে এইভাবে একটুআধটু হাসলেও তো হয়। আমাদের মনটা জড়িয়ে যায় তোর হাসি মুখ দেখলে।
মায়ার দিকে তাকাতে তাকাতে রিদের লিপিপ্ত উত্তর..
—” আজ হাসির কারণ পেয়েছি তাই হাসলাম। এরকম কারণ পেলে, রোজ হাসব মনেহয় দাদী।
তিনি রিদের হাসির কারণ জানতে না পারলেও। রিদ হাসবে কথাটায় অন্তত খুশি হলেন। রিদকে দোয়া দিয়ে বলেন….
—” আল্লাহ তোকে খুশি করুন। এমন হাসির কারণ সারাজীবন দিক!
রিদ তৎক্ষনাৎ কিছু বললো না হেনা খানকে। বরং স্বাভাবিক ন্যায় ধুপ করে গিয়ে বসলো মায়ার পাশে। দু’জনের উরুরই একে অপরের সাথে সংস্পর্শে থাকলো। রিদ ইচ্ছে করে মায়ার সাথে চেপে বসে হেনা খানের উদ্দেশ্য বলে…
—” মনেহয় তোমার দোয়া আল্লাহ কবুল করেছে দাদী।
হেনা খান অন্তত খুশি হয়ে এগিয়ে আসলো রিদের দিকে। তিনি রিদকে কিছু বলবে তার আগেই চোখ গেল মায়ার উপর। মায়াকে সোফার উপর উপুড় হয়ে আছড়ে পড়ে থাকতে দেখে কপাল কুঁচকায় তিনি। হেনা খান ভাবেন মায়া বুঝি বসে থাকা অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়েছে। তাই তিনি মায়ার দিকে ঝুকে মায়ার বাহুতে মৃদু ধাক্কা দিতে দিতে বলে…
—” এই মায়া উঠ! এই অসময়ে ঘুমালি কেন? তোকে না বলছি আমরা এখন বেড়াবো? তাহলে ঘুমিয়ে পড়লি কেন? উঠ বলছি!
হেনা খানের অনবরত ধাক্কা কাজ হলো না। মায়া শক্ত হয়েই পড়ে রইলো সোফার উপর বালিশের কুশনে নাক মুখ চেপে ধরে। লজ্জায় নড়ছে না পযন্ত। রিদ এবার ঠোঁট কামড়িয়ে হাসলো। বউ তার লজ্জা পাচ্ছে তাঁকে। রিদ মায়াকে দ্বিগুণ লজ্জায় ফেলতে আরও চেপে বসে মায়ার শরীর ঘেঁষে। রিদের শরীরের স্পর্শ পেয়ে মায়া মূহুর্তে কেঁপে উঠে। মায়ার কম্পন রিদের সাথে সাথে হেনা খানও বুঝলো। তবে ধরতে পারলো না মায়া কেন কাপছে। তিনি ভাবলেন মায়া হয়তো ঘুমে ঘোরে বাজে স্বপ্ন দেখে ভয়ে কাপছে তাই তিনি পুনরায় ব্যস্ত ভঙ্গিতে মায়কে ডাক লাগালো…
—” মায়া উঠ! কাপছিস কেন? তুই কি বাজে স্বপ্ন দেখছিস নাকি এইবেলায়? উঠ না তাড়াতাড়ি….
মায়ার হেলদোল না হলো না। সেই ভাবেই পড়ে রইলো লজ্জায়। রিদ হেনা খানকে মধ্যে থামিয়ে দিয়ে বলে…
—” দাদী আমার কফি লাগবে। কফি দাও।
রিদের কথায় হেনা খান থামে। মায়াকে আর না ডেকে চলে যায় কিচেনের রিদের জন্য কফি বানাতে। হেনা যেতেই প্রশ্বস্ত হয় রিদ। গা এলিয়ে সোফায় আরাম করে বসে তাকায় মায়ার উম্মুক্ত মসৃণ কমড়ের দিকে। মায়া বসে থেকে উপুড় হয়ে শুয়াই শাড়ির আঁচলটাও সামনের দিকে ঝুকে পড়ে আছে ফ্লোরে। যার ফলে অসাবধানতার কারণে মায়ার কমড় ও পেটের উপরের পাশটা উম্মুক্ত হয়ে আছে। রিদ নিজের শীতল হাতের উল্টো পিঠে মায়ার মসৃণ কমড় আলতো ছুঁয়ে দিতেই, মায়ার সমস্ত সত্তা নাড়িয়ে শরীর কেঁপে উঠে মূহুর্তেই। মায়া কেঁপে উঠতেই রিদ সঙ্গে সঙ্গে মায়ার বাহু টেনে নিজের কোলের উপরে বসায়। মায়া লজ্জায় সিঁটিয়ে গিয়ে তখনো চোখ মুখ খিঁচে বন্ধ করে পড়ে রইলো রিদের বুকের উপর। রিদ মায়াকে টেনে নিজের কোলের উপর বসিয়ে মায়ার মাথাটা নিজের বুকের উপর রাখলো। একহাতে মায়ার কমড় চেপে ধরে অন্যহাতে মায়ার এলোমেলো চুল গুলো কানের পিছনে গুছিয়ে দিতে দিতে নেশাক্ত কন্ঠে মৃদু স্বরে মায়াকে ডাকলো..
—” বউ!
মায়া উত্তর করলো না। লজ্জায় একিই ভাবে পড়ে রইলো রিদের বুকে চোখ বন্ধ করে। রিদ পুনরায় ডাকলো..
—” অ বউ!
—” হুমম।
—” শাড়ি পড়েছ?
—” হুমম।
রিদ মায়ার মাথায় ছোট করে চুমু খেলো। মায়া কেঁপে উঠতেই সেই সুযোগে পালাতে চাইলো। আকস্মিক ভাবে রিদের থেকে পালাতে গিয়েও আটকা পড়লো রিদের দু’হাতে বাঁধনে। রিদ নিজের দুহাতে তৎক্ষনাৎ মায়ার কমড় চেপে ধরে পুনরায় কোলের উপর বসায় জোরপূর্বক। এবং দুহাতে পিছন থেকে মায়ার কমড় জড়িয়ে ধরে মায়ার চুলের মাঝে নিজের মুখ ডুবালো। মায়া কেঁপে কেঁপে উঠে বড়বড় নিশ্বাস নিতে নিতে খামচি দিয়ে ধরলো রিদের হাত। নিশ্বাসের ঘনত্ব বাড়লো দু’জনেরই। রিদ মায়ার চুলের ভাজে মুখ ডুবিয়ে রাখা অবস্থায় কৌতিক করলো মায়ার সাথে। খানিকটা দুষ্ট স্বরে টেনে বলে উঠে…
—” ছিঃ ম্যাডাম! আপনি আমাকে নেগেটিভ ফিল দিচ্ছেন। এখনই এতো বড় বড় নিশ্বাস নিলে কি হবে? আমি কিছু করছি? আমি নিষ্পাপ না?
রিদের কথায় মায়া স্বর্ণাভে ফিরলো। লজ্জা আড়ষ্ট হলো আর বেশি। আজ মায়ার লজ্জিত হওয়ার দিন। লজ্জায় লজ্জায় মরে যাওয়ার দিন। উফ! এতো মরণ সয্য হবে মায়া? মায়া আবারও রিদ থেকে নিজেকে ছাড়াতে চাইলো কিন্তু রিদের জন্য পারলো না। রিদ শক্ত করে ধরে নিজের মাঝে। মায়া কাঁপা কাঁপা স্বরে বলে…
—” ছাড়ুন আমাকে!
—” না।
—“আমার ভয় করছে আপনাকে।
—” করুক!
—” আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে!
—” আসুক!
—” কেমন কেমন জানি লাগছে আমার।
—” তাহলে সিস্টেম ঠিক আছে আপনার।
কথাটা বলেই রিদ আরও ঘনিষ্ঠ হতে চাইলো মায়ার সাথে কিন্তু ততক্ষণে আরাফ খানও ড্রয়িংরুমে ব্যস্ত পায়ে প্রবেশ করে ফেলে। রিদ মায়াকে হালকা পাতলা একে অপরের সাথে জড়িয়ে থাকতে দেখলো। কারণ পুরোটা দেখার আগেই রিদ মায়াকে ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। কিন্তু আরাফ খানও ততক্ষণে বুঝে গেছে বিষয়টি। তাই তিনি তীক্ষ্ণ কন্ঠে জোড়ালো প্রশ্ন করলো রিদকে..
—” কি ব্যাপার মিয়া বিবি একসাথে? তুই এখানে কি করছিস রিদ? বাসায় আসলি কবে?
রিদ রয়েসয়ে গম্ভীর মুখে বললো..
—” মাত্র আসলাম।
রিদের কথায় তিনি এগিয়ে গিয়ে বসলেন সোফায়। আলতো হেসে মায়াকে ডেকে নিজের পাশে বসালেন। মায়ার মাথায় আদুরে একহাত বুলাতে বুলাতে তিনি রিদকে উদ্দেশ্য করে বলে…
—” তো এখানে কি চাই তোর? রুমে যাহ! দাঁড়িয়ে আছিস কেন? তোর না মেয়েদের মধ্যে এলার্জি আছে তাহলে আমার সোনামাকে কোলে নিস কিভাবে? শরীর চুকলায় না তোর হুমম??
রিদ কপাল কুঁচকে তাকায় আরাফ খানের দিকে। অসময়ে রসিকতা মোটেও পছন্দ হলো না রিদের। তার সবেমাত্র জাগ্রত হওয়া ফিলিংটা দিয়ে বউকে কাবু করতে চেয়েছিল। অনেকটা সফলও হয়েছিল কিন্তু হঠাৎ করে আরাফ খানের এন্ট্রিটা রিদের উঠতি রাগের কারণ হলো। রিদ উত্তর করলো না আরাফ খানের কথায়। বরং মায়ার লজ্জায় সিঁটিয়ে যাওয়া নত মস্তিষ্কের দিকে এক পলক তাকিয়ে উপরে দিকে যেতে যেতে আরাফ খানের উদ্দেশ্য বলে উঠে…
—” তোমার টাইমিং সেন্স বড্ড খারাপ দাদাভাই। আই জাস্ট হেড ইট!
গলা টেনে দুষ্ট হেসে বলে উঠে আরাফ খান…
—” উফ! আই জাস্ট লাভ ইট! তুই কি বুঝবি বুড়ো বয়সে কারও পাকা ধানে মই দিতে কেমন লাগে? আহ! কি শান্তি! কি শান্তি!
রিদ নাক মুখ কুঁচকে বিরক্তি সহিত চলে যেতে নেয় । কিন্তু ততক্ষণে আবারও পিছন থেকে কফি হাতে ডাকলো হেনা খান…
—” রিদ তোর কফি!
ত্যাড়া জবাবে বললো…
—” লাগবে না।
পাশ থেকে আরাফ খান প্রায় সাথে সাথেই উচ্চ স্বরে বলে উঠে…
—” আরে হেনা ওর কফিটা আমাকে দাও! ওর লাগবে না। ওহ আজ এমনিতেই সন্তুষ্ট। তাই ওর হয়ে আজ আমি খাব। দাও! দাও
রিদ অনেকটা শব্দ করেই ধুপধাপ পা ফেলে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছে। আর ঘাড় ঘুরিয়ে নিজের আদুরে বউয়ের দিকে তাকাচ্ছে বারবার। মায়াও কি মনে করে আস্তে করে মাথা উঁচিয়ে পিছন ফিরে সিঁড়ি দিকে তাকায় রিদকে দেখার জন্য। সঙ্গে সঙ্গে চোখ মিলল দুজনের। মায়া ভয়ে লজ্জা সাথে সাথে দৃষ্টি সরিয়ে নিলেও, রিদ একিই ভাবে তাকিয়ে থেকে যেতে লাগলো উপরে দিকে। আজ সে এই বউকে ছাড়বে না। কোনো ভাবেই ছেড়ে দিবেনা রিদ। খেয়ে ফেলবে না আজ এই বউকে সে একদম? আজ সেও দেখবে কে বাঁচা তার এই বউকে তার হাত থেকে? তাকে যখন এই বেয়াদব বউয়ের কাছে ধরা দিতে বাধ্যই করেছে। তখন সেও কাঁচা খেয়ে খেয়ে ফেলবে এই বউকে। এবার সে বেপরোয়া হবে। সবকিছু ঊর্ধ্বে গিয়ে সেও দেখতে চাই তার বউ কতটা সয্য করতে পারে। আর সে কতটা দেওয়ানা হতে পারে।
(পার্টটা কাল লেখা হয়েছিল সম্পূর্ণটা। কিন্তু আজ রি-চেক করে দিলাম। ভেবেছিলাম আর একটুও বড় করবো। কিন্তু রোমান্টিক পার্ট একসাথে না দিলে পড়ে মজা পাবেন না বলে এতটুকুতেই রাখলাম। ধন্যবাদ সবাইকে!)
.
চলিত….
Share On:
TAGS: দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ২, রিক্তা ইসলাম মায়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২৭
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৯
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৪১
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১০
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৩৭
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২৪
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ২০
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ২৪
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৩