Golpo romantic golpo দেওয়ানা আমার ভালোবাসা দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ২

দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ১৫


দেওয়ানা(আমার ভালোবাসা)সিজন_২

লেখিকাঃ_রিক্তা ইসলাম মায়া

১৫
পাঁচ মিনিটের রাস্তা টানা বিশ মিনিট নিয়ে ড্রাইভ করছে আয়ন। দৃষ্টি বারবার ঘুমাচ্ছে পাশে বসে থাকা রমনী দিকে। মায়া জড়সড় হয়ে চুপ করে বসে আছে আয়নের পাশে সিটে। ঠিকঠাক গাড়ি চলতে না দেখে বার কয়েক আঁড়চোখে তাকিয়েছে আয়নের দিকে। কিন্তু তারপরও জোর গলায় বলতে পারছে না গাড়িটা দ্রুত চালাতে। মায়ার আঁড়চোখে তাকানোতে বার কয়েক চোখাচোখি হয়েছে দুজনের। এতে আয়ন মৃদু হাসলেও মায়া অপরাধী ন্যায় মতো বসে ছিল। আয়ন ফুরফুরে মেজাজে ধীর গতিতে ড্রাইভ করছে। আপাতত মায়ার সাথে আরও কিছুটা সময় কাটাতে চাই। তাই কোনো কিছুতে তাড়া নেই আয়নের। কিছুটা সময় মায়া সাথে একান্ত ভাবে কাটাতে চাই সে। রিদকে বিগত কয়েক মাস খুঁজতে খুঁজতে সে ক্লান্ত। পরিবারের সবার চোখের পানি সামলাতে সামলাতে বড্ড অশান্ত। তাই নিজের বিষিয়ে যাওয়া মনটা মায়াতে প্রশান্তি খোঁজতে চাই। মায়ার সাথে কিছু সময় সুখের বিলাপ করতে চাই। সুখময় সময়টা করতে চাই প্রশস্ত। তখন মায়ার কথা অনুযায়ী রিদকে বাগানের বাংলোতে খুঁজে না পেয়ে আয়ন মায়াকে নিয়ে চলে আসে। উদ্দেশ্য অনুযায়ী মায়াকে স্কুলে ড্রপ করে নিজের হসপিটালের যাবে সে। প্রথমে মায়া আয়নের সাথে আসতে না চাইলেও হেনা খানের আর্দেশে আসতে বাধ্য হয় সে। আয়ন সাথে আছে বলে মালাকেও পাঠায়নি হেনা খান ইচ্ছাকৃত ভাবে। দুজনকে সময় দিচ্ছে একে অপরের সাথে সম্পর্কটা সহজ করতে। মায়ার ভয় কাটাতে। আয়ন ঘাড় ঘুরিয়ে আবারও তাকায় মায়ার দিকে। গাড়িতে চুপচাপ বসে আছে মায়া। মায়াকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে নিরবতা ভেঙ্গে আয়ন বলে উঠে….

—” পরীক্ষার প্রিপারেশন কেমন হচ্ছে তোমার???

মায়া চুপচাপ বসে থেকে আস্তে করে বললো….

–” ভালো।

স্টিয়ারিং এ হাত ঘুরাতে ঘুরাতে বললো…

—” গুড! তোমার পরীক্ষার কত দিন বাকি আছে জানি??

মিহি কন্ঠে বললো…

–” সাতাইশ দিন।

—” ওহ! তোহ স্কুল থেকে বিদায় হচ্ছো কবে শুনি??

–” আট তারিখে বিদায় অনুষ্ঠান হবে আমাদের।

স্টিয়ারিং হাত রেখে পাশে তাকায় আয়ন। একটা ভ্রুঁ উঁচু করে পুনরায় প্রশ্ন করে বললো….

–” ওহ! তারমানের আর তিন বাকি আছে তোমার বিদায়ের?

–” হুমম।

মায়ার কথায় খুশিতে চকচক করে উঠে আয়নের চোখ মুখ। মায়া স্কুলের গুন্ডি পার হয়ে যাবে। স্কুল থেকে ঠিকঠাক বিদায় নিতে পারলেই আয়নের অপেক্ষা কিছুটা কমে আসবে। মায়া এবার স্কুল পার হয়ে কলেজে পা রাখবে। অনেকটায় বড় হয়ে যাবে। কেউ ছোট ছোট বলে সম্মোধন করবে না আর। আয়নের অপেক্ষাটাও অনেক কমে যাবে। তারপর ঠিকঠাক কলেজটা পাশ করতে পারলেই হলো। দুহাত বেঁধে নিয়ে বিয়ের পিরিতের বসাবে সে। অনেকটা হলো এদিক সেদিক ঘুরা এবার বিয়ে করার পালা বলেই টুপ করে বিয়েটা করে নিবে সে মায়াকে। আহ! তখন মেয়েটা পুরোটায় তার নামে রেজিস্টার থাকবে। তাঁর দলিল করা বউ। কথাটা ভাবতেই ঠোঁট প্রাসারিত করে হাসে আয়ন। আজকাল সারাটা সময়ই এই মেয়েটার চিন্তায় চিন্তায় পার হয়। মেয়েটা যে কখন বুঝবে তার বেগতিক মনে অবস্থাটা আল্লাহ জানে। আয়ন ধীরে হাতে ড্রাইভ করতে করতে তাকায় মায়ার দিকে। প্রাণবন্তর হয়ে আর্দেশ স্বরুপ বলে উঠে…

–” শুনো মেয়ে! এবার কিন্তু ঠিকঠাক স্কুল থেকে বিদায় নিবা বুঝলা? স্কুল থেকে বিদায় নিতে নিতে মনে মনে এই শপথ করবা, তোমাকে বড় হতে হবে। তোমাকে প্রচুর বড় হতে হবে। স্কুল পেরিয়ে কলেজ শেষ করতে হবে। আর কলেজ পেরিয়ে সোজা বিয়ে আসরে। তার মধ্যে তোমাকে প্রচুর বড় হতে হবে। কেউ যাতে ছোট বলতে না পারে ততটা বড় হতে হবে তোমায়। বুঝেছ?

আয়নের হুটহাট খাপছাড়া কথায় মূহুর্তে বোকা চোখে তাকায় মায়া। আয়নের কথা গুলো যে বোধগম্য হলো না তাহ মায়ার বোকা দৃষ্টিতে স্পষ্ট। এই মূহুর্তে কি বলবে আয়নকে সেটাই অস্পষ্ট মায়ার মাথায়। মায়াকে নিজের দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকাতে দেখে তৃপ্তিতা নিয়ে আবারও বললো আয়ন….

—” এইতো গুড গার্ল। এইভাবেই ড্যাবড্যাব করে তাকাবা বুঝলা। তোমার তাকানোতে আমার শান্তি। তাই বেশি না সকাল বিকাল দুপুর তিন বেলা নিয়ম করে তাকালেই হবে। আমার আপাতত এতটুকুতেই চলবে। আমি আবার ধৈর্যশীল মানুষ। অল্পতেই চলবে। তবে সেটা সাময়িক সময়ের জন্য। তারপর আমার আরও অনেক কিছু চাই। আমার সেই চাওয়া গুলো আমি পরে দেখে নিব। আপাতত তুমি নিয়ম করে তিনটা বেলা তাকাও সেটাই অনেক।

কথা গুলো বলতে বলতে গাড়ি থামে মায়ার স্কুল গেইটের সামনে। মায়ার নড়চড় নেই। আয়নের কথায় অবাক হয়ে হা করে তাকিয়ে আছে সেদিকে। আয়নকে বিগত দিনে চিনার পর থেকে কখনো এমন খাপছাড়া আচরণ করতে দেখেনি মায়া। আজই প্রথম। আয়ন যে এতটা প্রাণবন্ত জানা নেই মায়ার। কখনো এতটা সময় দেয়নি আয়নকে সে নিজের সাথে। কথা বলেনি কখনো। দুই একটার কথার বেশি। আয়ন মায়াকে নিজের দিকে তাকাতে দেখে ড্রাইভিং স্টিয়ারিং মাথা ঠেকায়। এক দৃষ্টিতে মায়ার দিকে তাকিয়ে থেকে হুট করে আবেগিয় মনে ভাব খানিকটা প্রকাশ করে আহত সুরে বলে উঠলো…..

—” বুঝলে মায়াবর্তী! ডাক্তার হয়েও নিজের রোগের চিকিৎসা করতে পারছি না আমি। তুমিময় রোগী হচ্ছি দিন বা দিন। আহ! আমি ব্যর্থ ডাক্তার। ব্যর্থ আমার এতো এতো ডিগ্রী। সব গেলো জলে তলে। ডাক্তার হয়ে রোগীর চিকিৎসা করতে গিয়ে নিজেই রোগী উপাধি টানছে বহুমানে। আহা! আমার কি তুমিময় অধঃপতন! এতে কি লজ্জা! কি লজ্জা!

মায়া এবার বহুমানে চোখ বড় বড় করে তাকায় সেদিকে। আয়নের একের পর এক কথায় মায়ার উত্তর বসাতে ইচ্ছা করছে। আয়ন থেকে জানতে ইচ্ছা করছে কি হয়েছে আপনার ডাক্তার সাহেব? কিন্তু মায়া সেটা করবে না। কোনো ভাবেই কোনো ছেলের সাথে কথা বলবে না। কারণ মায়ার খারাপ রিদ ভাইয়াটা এবার ফিরে এসেছে দেশে। কাল আয়নের সাথে ঘুরতে গিয়েছে বলেই আজ রাতে মায়াকে স্বপ্ন অনেক শাসিয়েছে রিদ। নিষেধ করেছে কোনো ছেলের পাশ ঘেঁষতে। তাই মায়াও আর কথা বলবে না কোনো ছেলের সাথে। চুপ করে থাকবে সে। দরকার পড়লে মুখে এঁটে তালা মারবে সে। তারপরও কারও সাথে কথা নয়। রিদ ভাইয়ার অবাধ্য নয়। মায়া ঘাড় ঘুরিয়ে সামনে তাকায়। অপরাধী মতো হাত চালিয়ে গাড়ির দরজা খুলে বের হয়। আয়ন মায়াকে হুট করে বের হতে দেখে দ্রুততার সঙ্গে সেও বাহির হয় গাড়ি থেকে। মায়ার পথ আটকিয়ে দাঁড়াতেই নিচু কন্ঠে বললো মায়া।

—” আমি যাব।

—” যেলে যাবা! একটু সুন্দর করে যাও। একটু ভাব বিনিময় করে যাও রোগীর সাথে। এতক্ষণ ড্রাইভার হলাম। একটা ধন্যবাদ তোহ দিয়ে যাও।

—” না দিব না ধন্যবাদ।

—” কেন! কেন!শুনি? এই অধমের উপর এত অত্যাচার অবিচার কেন?

নাক মুখ কুঁচকে বললো..

—” বলবো না আমি। যান তো আপনি। আপনি আমার স্কুলে দেরি করিয়েছেন। পাঁচ মিনিটের রাস্তা মিনিট নিয়েছেন। এমন রোগী ড্রাইভারকে আমি কখনোই ধন্যবাদ দিব না।

ঠোঁট কামড়িয়ে হাসে আয়ন। হালকা ঝুঁকে আহত হওয়ার চেষ্টা করে বললো…

–” উফ! এতো রাগ? রোগীর উপর এতটা অত্যাচার? সয্য হবে রোগীর? যদি রোগী এই রাগের চাপায় পরে হার্ট অ্যাটাক করে তোহ? আহ! আমি তোহ শেষ! এখনই বুকে ব্যথা শুরু হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে হার্টের ব্যথায় হার্ট অ্যাটাক করবো আমি। আহ!

বুকের বাম পাশটা চেপে ধরে আয়ন নাটকীয় ভাবে। মায়া নড়েচড়ে দাঁড়ায়। নরম হয়ে আসে। করুন হয় দুটো চোখ। সামান্য রাগ দেখানোতে যে কারও হার্ট অ্যাটাক হয় সেটা বোধগম্য ছিল না মায়ার। মায়া অপরাধী দৃষ্টি বিলায়। কি বলা উচিত সেটাও ঠিকঠাক বোধগম্য হচ্ছে না। বোকা চোখে খানিকটা আয়নের দিকে তাকিয়ে থেকে ভাবে কি চিকিৎসা দেওয়া উচিত এই ডাক্তার সাহেবের। চিন্তারত অবস্থায় কিছু মনে পরতেই হুট করে মুখে বুলিতে আওড়িয়ে বললো মায়া…

—“ডাক্তার সাহেব! তিন বেলা প্যারাসিটামল খাবেন। ভালো হয়ে যাবেন। রোগী থেকে সোজা সুস্থ ডাক্তারের উপাধিতে ভূষিত হবেন আপনি।

–” আহ! কি দারুণ চিকিৎসা আমার।
পেট খারাপের ঔষধ সোজা ট্রানসফার হয়ে হার্টের জন্য। উফ! আমার এতো এতো ডাক্তারের ডিগ্রী সব গেলো জলে। সবকিছুই ব্যর্থ আমার তোমার কাছে। তোমার এই চিকিৎসায় গণহারে মানুষ ভালো হয়ে যাবে। হসপিটালের প্রয়োজনই পরবে না আর। ডাক্তাররা সবাই রসাতলে যাবে। তাহ! ম্যাডাম আর কিছু খেতে হবে আমাকে প্যারাসিটামলের আগে বা পরে হুমম?

আয়নের কথায় মায়া খানিকটা চিন্তিত বংগিতে কপাল কুঁচকায়। সে আপাতত প্যারাসিটামলের নামটা ছাড়া অন্য কোনো ঔষধের নাম জানা নেই। প্যারাসিটামল সাথেই বা আর কি খেয়ে হয় তার ধারণা ও নেই। শুধু জানে তাঁর পেট খারাপের সময় হেনা খান দুটো ট্যাবলেট খাইয়েছিল। একটা ছোট একটা বড়। বড়টার নাম প্যারাসিটামল হলেও ছোটটার নাম মনে নেই। মায়া কিছুতেই মনে করতে পারছে না। বাসায় গিয়ে হেনা খানের কাছে জিজ্ঞেসা করবে ততক্ষণে যদি ডাক্তার সাহেবের আরও বেশি বুকে ব্যথা হয় তোহ? তাই মায়ার নাম না জানা ঔষধের চিন্তায় চট করে বলে উঠলো…

—” একটা ছোট ঔষধের সাথে একটা বড় ঔষধ খাবেন ডাক্তার সাহেব কেমন। তাহলেই হবে। বুকের ব্যথাও চট করে ভালো হয়ে যাবে। দেখিয়েন আপনি।

মায়ার কথায় গা কাঁপিয়ে শব্দ করে হেঁসে উঠে আয়ন। দুহাতে মায়ার গাল টেনে বলে উঠে….

—” উফ! আমার ডাক্তারনী রে। সারা বছর ছোট বড় ট্যাবলেট, প্যারাসিটামল খেতেও রাজি আছি। তারপরও এই রোগীর এই ডাক্তারনী-ই চাই। ডাক্তারনী ও তার চিকিৎসা দুটোই মনে ধরেছে ব্যাপক।

আয়নের হুটহাট গাল টেনে দেওয়ায়।
মায়া চমকে উঠে ভয়াৎ দৃষ্টিতে তাকায় আয়নের মুখপানে। আয়ন হুট করে মায়ার ভয়ে কারণটা বুঝতে পেরে হাত গুটিয়ে নেয়। মায়া ভয়াৎ দৃষ্টিতে আশেপাশে তাকায় মূহুর্তেই। রিদকে খুঁজা চেষ্টা করে। মুখের হাসিটা বিলীন হয়ে কপাল কুঁচকে মায়ার ভয়াৎ দৃষ্টি পযবেক্ষণ করে আয়ন। মায়া কাকে খুঁজছে সেটা বোধগম্য হচ্ছে না। মায়াকে স্বাভাবিক করার জন্য প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে বলে উঠে….

–” তোমার স্কুল ছুটি কয়টায়?

মায়া ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় আয়নের দিকে। রিদের ভয়ে আয়নের সাথে নিজের কথা আর টানতে চাচ্ছে না। তাই এক বাক্যে বলে উঠে…

—” জানি না।

আয়ন মায়া বদলিত ভয়াৎ দৃষ্টি দেখে কপাল কুঁচকে তাকায় সেদিকে। মেয়েটা অল্পতেই ভয়ে সিঁটিয়ে যায়। বিষয়টা মোটেও আয়নের পছন্দ হচ্ছে না। অকারণে এতটা ভয় কিসের। আয়ন জোড়াজুড়ি করতে চাই না মায়ার সাথে তাই মায়াকে সময় দিচ্ছে। কিন্তু মায়া যে হারে আয়নকে হুটহাট ভয় পাচ্ছে এতে করে আয়ন মায়াকে ভয় নয় বরং উঠিয়ে নিয়ে বিয়ে করে বসবে ভয় ভাঙ্গানোর জন্য। মায়ার ভয়াৎ দৃষ্টি আয়নকে কষ্ট দেয় সেটা কিভাবে বুঝাবে এই মেয়েটাকে। সে কি অদৌ কখনো বুঝতে তাঁর কষ্ট। আয়ন সহজ হয়। হুটহাট দৌড় লাগায় মায়া। আয়নকে পাশ কাটিয়ে দৌড়ে চলে যেতেই পিছনে থেকে মায়ার একটা হাত চেপে ধরে আয়ন। মায়া চমকে উঠে দ্রুত পিছন ঘুরে তাকায়। নিজের হাতটা ছাড়ানোর চেষ্টা না করে বরং আশেপাশে তাকাচ্ছে রিদ আছে কিনা সেটা দেখতে। আয়ন সন্দেহ দৃষ্টিতে তাকায়। বুঝতে পারে মায়ার ভয়ের কারণ। মায়া আয়নকে নয় বরং বিশেষ কাউকে ভয় পাচ্ছে। যার কারণে আয়নের সাথে সহজ হতে পারছে না মায়া। কিন্তু সে কে? কাকেই বা এতটা ভয় পাচ্ছে মেয়েটা? মায়াকে তো সার্বক্ষণিক চোখে চোখে রাখছে আয়ন। কোনো ছেলেকে আশেপাশে ঘেঁষতে দেয়না সে। তাহলে? অবশ্য মায়ার আশেপাশে কোনো ছেলেকে আজ পযন্ত ঘেঁষতে দেখেও নি আয়ন। সবসময় মায়া কেমন একটা অদৃশ্য সিকিউরিটির বেড়া জ্বালে থাকে। আয়নের ভাষ্যমতে আরাফ খান দিয়ে রেখেছে সেই সিকিউরিটি মায়ার জন্য। আয়ন কথা বলেছিল আরাফ খানের সাথে তিনি বলেছেন মায়ার সিকিউরিটি নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। তিনি আছেন। তারপরও আয়ন মায়াকে চোখে চোখে রাখে সবসময়। কিন্তু সবার এই সবকিছু পরেও কি কোনো কিছু আছে যেটা মায়াকে ভয় দিচ্ছে সময়ে সময়ে। কোনো কিছু কি তাদের চোখের আড়ালে রয়ে গেছে? যেটা চোখে পড়ছে না কারুর। মেয়েটা কাকে এতটা ভয় পাচ্ছে? কে সে? আয়ন সন্দেহ পূর্ণতা নিয়ে ভরাট গলায় বললো…

—” কি সমস্যা? কাকে খুঁজছো তুমি??

মায়া নিরব। আয়ন পুনরায় একিই প্রশ্ন করে বললো…

–” কি হল বলো? কাকে খুঁজছ তুমি?? আমার কাছে আসাতে তুমি কি কাউকে নিয়ে ভয় পাচ্ছো মায়ু?

মায়া এবারও নিরব। আয়ন সেদিকে কপাল কুঁচকে তাকিয়ে থাকে। মায়া নিজের হাতটা ছাড়ানোর চেষ্টা করে ধীর কন্ঠে বললো…

—” আমি স্কুল যাব। ছাড়ুন আমাকে।

আয়ন কিছু একটা ভেবে হাতটা ছেড়ে দেয়। মায়া বিনা বাক্য বয়ে দ্রুত সেখান থেকে প্রাস্হান করতে ন্যায় কিন্তু তার আগেই আবারও মায়ার হাত চেপে ধরে আয়ন। মায়া আতংকে উঠে সাথে সাথে পিছনে ফিরে আবারও তাকায়। আয়ন আহত দৃষ্টিতে তাকায় মায়ার আতংকিত মুখপানে। স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে বললো….

—” ছুটির পর আমি তোমাকে নিতে আসবো। কোথাও যাবে না। আমার অপেক্ষা করবে কেমন।

—” যাব না আমি আপনার সাথে যান তো আপনি। ছাড়ুন হাত।

কথাটা বলেই মায়া আয়নে হাতটা ছাড়িয়ে প্রাণপন্য দৌড় লাগায় স্কুল গেইট ধরে। আয়ন পিছন থেকে আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মায়ার যাওয়ার দিকে। হুটহাট মায়ার রুপ পরিবর্তনে বিষয়টি আয়নের উপর জোরালো ভাবে প্রভাব ফেলছে। এই বিষয়টি কবে বুঝবে এই মেয়েটা? আয়ন দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে। গাড়ি নিয়ে প্রস্হান করে সেখান থেকে।



বৃষ্টিস্নানিত দিন। সারাদিন ঝুম বৃষ্টি হয়ে আকাশটা এখন পরিষ্কার। সূর্যটা কালো মেঘে ঢাকা। প্রকৃতি যেন বৃষ্টি স্নানিত গোসল করে সিক্ত ভেজা হয়ে আছে গাছ গাছালী। রাস্তা ঘাঁট সারাদিন ব্যাপি বৃষ্টির পানিতে তইতই করছে। কাঁদা কাঁদা হয়ে আছে রাস্তা বিহীন খালি জায়গায় গুলো। ঘোলাটে দিন। আবারও ঝুম বৃষ্টি হওয়ার পূব আভাস। সময়টা তিনটার কৌটায়। স্কুল ছুটি হয়েছে বেশ কিছুক্ষণ আগে। মেঘলা দিনে আয়ন নিজের ব্যস্ততা মাঝেও হসপিটাল থেকে দুই ঘন্টার ছুটির কাটিয়ে এসেছে মায়াকে বাসায় ড্রপ করতে। যথারীতি দ্রুত গাড়ি চালিয়ে মায়াকে নিয়ে খান বাড়ির গেইট ধরে ঢুকে। পুরো রাস্তায় আয়ন নিজ থেকে চুপ ছিল। মায়াও কোনো কথা বলেনি। আয়ন গাড়ি নিয়ে খান বাড়ির গেইট পার হয়। মায়াকে মধ্যে রাস্তায় নামায়। কারণ সে ফিরে যাবে। তাই এখানেই গাড়ির পার্ক করতে হবে কোথাও। সামনে কাঁদামাটিতে টইটম্বুর হয়ে আছে বৃষ্টির জন্য। গাড়ি ঘুরাতে সমস্যা হবে বিদায় মায়াকে বলে, এখান থেকে নেমে বাসার ভিতরে যেতে, সে গাড়ি পার্কিং করে আসছে দুই মিনিটের ভিতর। আয়নের কথা অনুযায়ী মায়া বাঁধ্য মেয়ের ন্যায় মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়। কাঁধে ব্যাগ চাপিয়ে গাড়ি থেকে নেমে সামনে হাঁটা ধরে। বাড়ির সামনে বাগানের রাস্তাটা পার হয়ে খান বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করতে হবে। আয়ন সময়টা দেখে নেয়। তার হাতে আরও এক ঘন্টা বিশ মিনিট সময় আছে। একেবারে লাঞ্চ করে তারপর ফিরবে হসপিটালে। আয়ন দ্রুত গাড়ি ঘুরায়। পাকিং এর উদ্দেশ্য। ভেজা রাস্তায় মায়া দুহাতে নিজের সেলোয়ারের দুপাশ আঁকড়ে ধরে উঁচু করে সাবধানে পা ফেলছে কাঁধে ব্যাগ চাপিয়ে। দৃষ্টি ও মনোযোগ সবই রাস্তার পথ চলার উপর। মনোযোগের মধ্য দিয়ে হঠাৎই পিছনে থেকে বিকট শব্দ কানে আসতেই ভয়ে লাফিয়ে উঠে মায়া। দ্রুততা সঙ্গে পিছনে তাকাতেই চোখে পড়লো ব্রাউন কালারের ব্যাম্বু শক্তপোক্ত কুকুটিকে। ঘ্যাঁউ ঘ্যাঁউ শব্দ করে দৌড়ে আসছে মায়ার দিকে। মূহুর্তে মায়া চোখ উল্টায়। খান বাড়িতে বিশাল কুকুরের আমদানি কখন হলো? খান বাড়িতে তোহ কখনো কুকুর টাইপ কিছু দেখেনি সে। তাহলে কার এই মোটাতাজা অসভ্য কুকুরটি। মায়া ভয়ে উত্তেজিত হয়ে কাঁধের ব্যাগটি ফেলে চিৎকার করে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে প্রাণপণ্য দৌড় লাগায় সামনে। আপাতত জানটা বাঁচাতে চাই কুকুরের হামলা থেকে। বাকিটা পরে দেখা যাবে এই অসভ্য কুকুরটি কার কি লাগে। মায়ার পিছন পিছন কুকুরটিও দৌড়াচ্ছে। অলিম্পিক দৌড় প্রতিযোগীতায় কে কার থেকে কতটা এগিয়ে যেতে পারে, সেই প্রতিযোগীতা নিয়ে এই মূহুর্তে মহা ব্যস্ত মায়া ও কুকুরটি মধ্যে। দুজনই প্রাণপণ্য দৌড়াচ্ছে। কেউ ধরতে! তো কেউ নিজের প্রাণ বাঁচাতে।

সেই রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে হালকা সামনের দিকে ঝুঁকে বোতল থেকে পানি ঢেলে নিজের চোখে মুখে ছিটাচ্ছে রিদ। বিশেষ একটা কাজের জন্য কাল মধ্য রাতে বাংলাদেশে আসতে হয়েছে তাঁকে। এক ঘন্টা রেস্ট নিয়ে কাল রাতেই বের হতে হয়েছিল রিদকে। নিজের কাজটি সম্পন্ন করে মিনিট পাঁচেক হলো নিজের বাড়িতে ফিরেছে সে। এখানো নিজের পরিবারের কারও সাথে কথা বা দেখা হয়নি তাঁর। আপাতত চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে হালকা ফ্রেশ হয়ে ভিতরে যাবে। গায়ে কালো পোষাক জড়ানো। কালো প্যান্টের সাথে কালো শার্ট ইন করা। শার্টের হাতা দুটো টেনে গুটানো কুইন অবধি। বাম হাতের কুইনের নিচে আঁড়াআঁড়ি ভাবে টেনে কাটাছেঁড়া দাগ। অনেকটা সময় আগে কাটায়, সেখানটায় রক্ত শুকিয়ে কালো হয়ে গেছে। কিন্তু রিদের সেদিকে ভ্রঁক্ষেপ নেই। সে নিজের কাজে মগ্ন। হঠাৎ করে মেয়েলি চিৎকার কানে ভেসে আসে। রিদ থামে। বোতলটা চেপে ধরে কপাল কুঁচকে পিছন ঘুরে তাকায়। দৃষ্টি মেলে ঠিকঠাক সামনে দেখার আগেই রিদের চওড়া প্রশস্ত বুকে হামলে পড়ে কেউ। আকস্মিক ঘটনায় রিদ নিজের ব্যালেন্স হারিয়ে গিয়ে পড়ে পিছনের প্যাক কাঁদায়। সাথে সাথে মায়াও পড়ে রিদের বুকের উপর। কিন্তু এতে ঘটে যায় এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা। মায়া কপাল গিয়ে ঠেকে রিদের ঠোঁটের উপর। অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে হওয়া চুম্বনটির জন্য কেউ প্রস্তুত ছিল না। বিষন্নয়ে রিদ বিষয়টি বুঝে উঠার আগেই, মায়া আবারও দ্রুততা সঙ্গে উঠতে চাই রিদের বুকের উপর থেকে। কিন্তু এবারও কপাল সহায় হলো না মায়ার। পিছনে দাড়িয়ে থাকা কুকুরটির ঘ্যাঁউ ঘ্যাঁউ করে উঠে মায়াকে তাঁড়ায়। মূহুর্তেই আবারও কাঁদায় পা স্লীপ করে সাথে সাথে মুখ থুবড়ে পড়ে রিদের বুকের। এবার মায়া কপাল নয় বরং গাল ঠেকে রিদের ঠোঁটে। বিষয়টি দুই সেকেন্ড দীর্ঘ হতেই মায়া দ্রুততার সঙ্গে কুকুরে ভয়ে মুখ লুকায় রিদের গলায়। রিদের শার্টের কলার দু’হাতে আঁকড়ে ধরে। কিন্তু পিছন থেকে কুকুরটি শব্দ তুলে ঘ্যাঁউ ঘ্যাঁউ করেই যাচ্ছে। এতক্ষণ বিষন্নতায় বিষয়টি বোধগম্য না হলেও রিদ এখন বুঝতে পারছে কি হচ্ছে তার সাথে। কেন বা মেয়েটি তার বুকে আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু মেয়েটির বোকামির জন্য বাজে পরিস্থিতি স্বীকার হতে হয়েছে তাঁকে। অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে ফ্রিতে চুমু খাওয়ার কাহিনিও ইতিমধ্যে ঘটে গেছে তাঁর সাথে। রিদের বিরক্তি বাড়ে। মেয়েটি সাপের মতো পেঁচিয়ে আছে তার বুকের উপর। রিদ মাথাটা উঁচু করে কুকুরটিকে ধমক স্বরে বললো…

—” ডোন্ট শাউট। জাস্ট গো।

রিদের ধমকে লেজ গুটিয়ে চুপচাপ বসে পড়ে কুকুরটি। রিদ সেদিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকাতেই মূহুর্তে দৌড়ে চলে যায় নিজ গন্তব্যের উদ্দেশে কুকুরটি। রিদ কাঁদায় হাত ডুবিয়ে উঠে বসতে চাই মায়াকে নিয়ে। কিন্তু মায়ার নড়চড় নেই। রিদের বিরক্তি সাথে সাথে রাগ বাড়ে। মায়া বাহু টেনে পাশে বসায় রিদ। কাঁদা মাখা শরীর নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে সেদিকে চোখ বুলাই। গাঁ ঘিন ঘিন করে উঠে কাঁদা। গায়ে শার্ট ঝাড়তে ঝাড়তে বেখেয়ালি চোখ পড়ে সামনে। দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে গিয়ে ও থমকে যায় সেদিকে। মূহুর্তেই কপাল কুঁচকে আসে রিদের। কুঁচকানো দৃষ্টি স্থির হয় মায়ার দিকে। কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে মায়াকে চেনার চেষ্টা করে। মেয়েটিকে তাঁর চেনা পরিচিত মনে হচ্ছে। দম নিয়ে কিছুটা সময় মায়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। মায়াকে চিন্তে পেরে যেন মূহুর্তে চমকে উঠে রিদ। সাথে সাথে চোখ আওড়ায় মায়ার পরিবর্তীত শরীরের দিকে। মায়া ছোট নেই। মায়ার বাড়ান্ত শরীরের ঘটন জানান দিচ্ছে সে কুমারী মেয়েতে রুপান্তরিত হয়েছে মাত্র। সাদা স্কুল ড্রেসটিতে কাঁদা মাটিতে টইটম্বুর হয়ে আছে। চোখ দুটো স্থির রিদের মুখ পানে। সব ভুলে হা হয়ে তাকিয়ে আছে রিদের দিকে। হয়তো রিদের পরিবর্তনটাও মায়ার মন নাড়িয়েছে। তাই নিজের ভয়টা এক মূহুর্তে জন্য ভুলে হা করে তাকিয়ে আছে সেদিকে। রিদ আগের মতোই লম্বা থাকলেও এখন খানিকটা প্রশস্ত হয়েছে। অনেকটা মোটাও হয়েছে। রিদের চওড়া বুক যেন আরও চওড়া হয়েছে এই পনে দুই বছরের। চোখে মুখে গম্ভীরতা ভাবটা যেন এবার স্পষ্ট ফুটের উঠেছে তার। ফর্সা ত্বক যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে গেছে। চোখে মুখে সৌন্দর্য যেন তুমুলহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। রিদ কপাল কুঁচকে মায়াকে নিজের দিকে হা করে তাকাতে দেখে মূহুর্তেই নিজের গায়ের শার্ট ঝেড়ে বলে উঠে…

—” এখনো স্বভাব চেঞ্জ হয় নাই। সেই আগের মতোই রয়ে গেলে। ছেলে দেখলে ডলাডলি, ঘেঁষাঘেঁষি করতে মন চাই তোমার। শরীরের ধাঁচ এখনো কমে নাই। কমার কথাও না। শরীর পরিবর্তন হচ্ছে। শরীরের জ্বালা মিঠানোর জন্য কাউকে না কাউকে তোহ প্রয়োজন হবে তোমার তাই না। নষ্টামীর জন্য অবশেষে আর কাউকে খুঁজে পেলে না বুঝি?

রিদের কথার মানে বুঝতে পেরে মূহুর্তেই ফুপিয়ে কেঁদে উঠে মায়া। মাথা নিচু করে রিদের সামনে অপরাধী ন্যায় দাঁড়িয়ে পড়ে। কোনো কিছুই ইচ্ছাকৃত ভাবে হয়নি তারপরও রিদ মায়াকে নষ্টা মেয়ের উপাধি দিচ্ছে। মায়া কখনো চাই না রিদের সামনে পড়তে। কিন্তু তারপরও ভাগ্য সহায় না হওয়ায় অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে একে অপরের মুখোমুখি হতে হয় তাদের। মায়া কেঁদে উঠে আপাতত রিদের থেকে নিজেকে বাঁচাতে চাই। চলে যেতে চাই রিদের চোখের সামনে থেকে। কিন্তু সে নিরুপায়। রিদের সামনে থেকে একা যেতেও ভয় পাচ্ছে সে। যদি রিদ রাগের বশে আঘাত করে তো? মায়া কান্না মধ্যে দিয়ে আয়ন দৌড় আসে সেদিকে। রিদকে চোখের সামনে দেখতে পেয়ে খুশিতে মূহুর্তেই ঝাপটে ধরে আয়ন। এবার কাঁদায় খানিকটা মাখোঁ মাখোঁ হয় আয়ন নিজেও। কিন্তু তখনো রিদের রাগান্বিত দৃষ্টি মায়াতে স্থির করা ছিল। আয়ন রিদকে ঝাপটে ধরা অবস্থায় খুশিতে বলে উঠে….

–” কোথায় ছিলি তুই? জানিস কতটা টেনশনে ছিলাম তোকে নিয়ে সবাই? নানুমা তোর নিখোঁজ হওয়াতে সুস্থ হয়ে পড়েছে। কোথায় ছিলি এতটা মাস তুই? এতটা মাসের মধ্যে কি একটা কল করার প্রয়োজন মনে হলো না তোর?

কথা গুলো বলেই রিদকে ছাড়ে আয়ন। সোজা হয়ে দাড়িয়ে রিদের কাঁধে একহাত রেখে৷ আবারও বললো….

—” তোর ফিরে আসার খবরটা শুনলে নিশ্চিত নানুমা পাগল হয়ে যাবে খুশিতে। দাঁড়া আমি ডেকে দিচ্ছি নানুমাকে।

কথাটা বলেই আয়ন দাঁড়িয়ে থেকে গাল ছেড়ে পরপর কয়েকবার ডাক লাগায় হেনা খানের উদ্দেশ্য। ঘাড় ঘুরিয়ে আবারও রিদের দিকে তাকায়। রিদকে চোখ আওড়িয়ে পযবেক্ষণ করতেই চোখ পড়লো রিদের নাজেহাল অবস্থাটা। সাথে সাথে চমকে উঠলো আয়ন…

—” কিরে তোর এই অবস্থা কেন? কাঁদায় মাখো মাখো হয়ে আছিস যে? পড়ে টড়ে গেছিস নাকি কোথায়?

রিদ নিজের দৃষ্টি সরিয়ে আয়নের উপর স্থির করে। আয়নের সুন্দর মুখ খানার নিজের দৃষ্টি বুলিয়ে নেয়। আয়নের কথার উত্তরে বলে উঠলো….

–” হ্যাঁ গেছি পড়ে! কিছু প্রতিবন্ধী জন্য রাস্তাঘাটেও অনিরাপদ নিষ্কাশন।

দুষ্টমীর ছলে বলে উঠলো….

—” আহ! যাহ বলছিস। রিদ খানও বুঝি নিজের ব্যালেন্স হারায় কখনো কখনো? শুনে শান্তি লাগলো। তাহ কিভাবে পড়লি শুনি। তোর প্রতিবন্ধীটাকে তো একটা ধন্যবাদ দেওয়া ফরজ হয়ে গেছে আমার ভাই তো….

কথা গুলো বলতে বলতে থেমে যায় আয়ন। পাশে কাঁদা শরীর নিয়ে মায়াকে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে কাঁদতে দেখে বুকের ভিতরটা মূহুর্তে মুঁচড় দিয়ে উঠে আয়নের। রিদকে ছেড়ে সাথে সাথে মায়ার হাত টেনে ধরে। উত্তেজিত গলায় সাথে সাথে বলে উঠে…

—” কি হয়েছে মায়ু? কান্না করছো কেন তুমি? পড়ে গিয়েছিলে তুমিও? ব্যথা পেয়েছ কোথায়? দেখাও দেখি আমাকে?

রিদ কপাল কুঁচকে সেদিকে তাকিয়ে থাকে। দুজনের ভাব বুঝার চেষ্টা করে। আয়নের প্রশ্ন করার মধ্যে দিয়ে ততক্ষণে হেনা খান উপস্থিত হয় সেখানে। রিদকে দেখে কোনো কিছুর চিন্তা না করেই খুশিতে কান্নায় ঝাপটে ধরে রিদকে। রিদ বেঁচে আছে। সশরীরে হেনা খানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সবটাই যেন হেনা খানকে গুলিয়ে দেয় নিজের মাঝে। রিদ টায় জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। চোখে মুখে গম্ভীর ভাব। আয়ন আর কোনো প্রশ্ন করতে পারেনি মায়াকে হঠাৎ হেনা খানের আগমনে জন্য। মায়ার একটা হাত চেপে ধরে পাশে দাঁড়িয়ে পরে আয়ন। মায়া নিবাক হয়ে চোখে তুলে তাকাই সেদিকে। সাথে সাথে চোখাচোখি হয় রিদের সামনে। রিদ কপাল কুঁচকে তাকিয়ে থাকে মায়ার দিকে। মায়া রিদের ভয়ে সাথে সাথে আয়নের আঁকড়ে ধরে রাখা হাতটা নিজের অন্যহাতে চেপে ধরে। রিদের চোখের সামনে থেকে সরে গিয়ে আয়নের পিছনে গিয়ে লুকায় মূহুর্তেই। আয়ন চমকে উঠে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে দিকে তাকায়। মায়াকে নিজের কাছে আশ্রয় নিতে দেখে মূহুর্তে প্রশান্তির ঢেউ বয়ে যায় আয়নের বুকে। এই প্রথম মায়া নিজ থেকে আয়নের হাতটা চেপে ধরেছে। মায়ার প্রথম ছুঁয়া। আয়ন মায়ার ভয়ে কারণটা বুঝে শক্ত হতে চেপে ধরে রাখে মায়ার হাতটি। যার অর্থ, মায়ু ভয় পেয় না আমি আছি তোহ তোমার কাছে।

রিদ কপাল কুঁচকে দুজনের হাতের দিকে এক পলক দৃষ্টি বুলাই। স্বাভাবিক বংগিতে নিজের দৃষ্টি সরিয়ে স্থির করে হেনা খানের উপর। তিনি কান্নারত অবস্থায় রিদের বুকে ল্যাপ্টে আছে। রিদ বিরক্তির দীর্ঘ নিশ্বাস টেনে নিজের স্বাভাবিক করে বলে উঠলো…

—” দাদী ক্ষিদা লেগেছে খাবার দাও আগে। হাতে সময় কম। সন্ধ্যায় ফিরতে হবে আমাকে।

রিদের কথা চমকে উঠে হেনা খান। রিদ আসতে না আসতে আবারও ফিরে যাবে কথাটা শুনে মূহুর্তেই কান্নার বেগ বারে হেনা খানের। আয়ন হতবাক হয়ে সঙ্গে সঙ্গে বললো…

—” তোর মাথা ঠিক আছে রিদ? প্রায় দুই বছর পর আসলি বাংলাদেশে। নিজের বাড়িতে। অন্তত দুইটা দিন থেকে যাহ পরিবারের সবাই কথা চিন্তা করে। তাহ না করে তুই দুই ঘন্টায় ফিরে যেতে চাস? পরিবার কি এতটা মূল্যহীন তোর কাছে?? কোনো দাম নেই কারও।

রিদ বিরক্তি চোখ তুলে তাকায় আয়নের দিকে। এই ইমোশনাল কথাবার্তা মোটেও তার পাল্লায় পড়ে না। ইমোশনাল হওয়া মানেই টোটালি ওয়েস্ট অফ টাইম। এছাড়া অন্য কিছু নয়। ততক্ষণে হেনা খানও কান্না জড়িত গলায় রিদের উপর অধিকার হাঁটিয়ে বললো….

—” তুই কোথাও যেতে পারবি না। আমি যেতে দিব না তোকে। কখনো না। এবার থেকে তুই তোর সব কাজ বাংলাদেশের থেকে করবি। আমাদের সাথে এই বাড়িতে থেকেই করবি। আমার সাথে থাকতে হবে তোকে। দুইদিন নয়। সবসময় থাকতে হবে তোকে আমার সাথে।

হেনা খানের কথায় রিদের বিশেষ একটা ভাবান্তর হলো না। বরং নিজের তেজি ভাবটা বজায় রেখে কাট কাট গলায় বললো।

—” দাদী প্রথমমত আমার ক্ষিদা পেয়েছে। কাল রাত থেকে না খেয়ে আছি। তাই আগে খাবো। তারপর লাস্ট দুই ঘন্টা তোমাদের সাথে কাটাবো। ছয়টায় আমার ফ্লাইট। আমাকে ঠিকঠাক যেতে দিলে সাপ্তাহে একবার হলেও কল করে নিজের অবস্থান জানাবো। কিন্তু যদি আমাকে থাকার জোড়াজুড়ি করো তাহলে গত দুই বছর কোনো যোগাযোগ করবো না তোমাদের সাথে। তার সাথে টানা পাঁচ বছর বাংলাদেশ আসবো না। বাংলাদেশে আমার অসয্য লাগে দাদী। তাই বাড়িতে থাকা অসম্ভব। এবার তুমি ঠিক কর। তুমি কি করবে? চয়েস ইজ ইউর দাদী। আমাকে খাইয়ে ঠিকঠাক বিদায় দিবে নাকি জোড়াজুড়ি করে আমার সাথে নিজেদের যোগাযোগটা বিচ্ছিন্ন করবে? কোনটা?

হেনা খান মূহুর্তেই থমকে যান। রিদ ঘ্যাড়ত্যাড়া মানুষ। নিজের কথাতে আটকে থাকবে। কারও কষ্ট কখনোই চোখে পড়ে না তাঁর। হেনা খানের বুক ভার হয় চাপা কষ্টে। মুখ ফুটে রিদকে কিছু বলতেও পারছে না। হিতের বিপরীতে হবে বলে। তাই তিনি নীরবে চোখের পানি বিসর্জন দিচ্ছেন রিদের দিকে তাকিয়ে থেকে। পাশ থেকে আয়ন রিদের এমন খাপছাড়া কথায় রাগান্বিত কন্ঠে বললো….

—” রিদ তোর সমস্যা কি হ্যাঁ? কি হয় অসুস্থ মানুষটার সাথে দুটা দিন কাটাতে তোর? এতটা বেপরোয়া কেন তুই? দুইটা দিন সময় হয়না তোর কারও জন্য। কাউকে হারানোর ভয়ে কি বুক কাঁপে না তোর??

আয়নের কথায় চাপা রাগ নিয়ে তিরতির মেজাজে বললো রিদ…..

—” না কাঁপে না বুক। দুনিয়ায় কোনো কিছু হারানোর ভয়ে নেই আমার। মানুষ নিজের প্রয়োজন বেঁধে একে অপরের সাথে জড়িয়ে সেটা হারানোর জন্য নিজের ভয়কে সৃষ্টি করে। আমার নিজেকে ছাড়া কাউকে প্রয়োজন নেই বলেই আমি বেপরোয়া মনে মানুষ। আর কিছু?

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply