দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা) সিজন ২ পর্ব ১
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ১
লিখিকা_রিক্তা ইসলাম মায়া
০১
একটা পনেরো বছর বয়সের অবুঝ মেয়েকে যদি একা একটা রাজ মহলে পাঠানো হয় একজন ষাট বছর বয়সে প্যারালাইজড মহিলাকে দেখা শুনার জন্য তাহলে কথাটা শুনতে একটু অন্য রকম লাগে তাই না? প্রথমত মাথায় চিন্তা আসে এতো ছোট বাচ্চা মেয়েটি কি পারবে বয়স্ক মহিলাটির তদারকি করতে? দ্বিতীয়ত যাদের বিশাল রাজ প্রসাদ পাহাড়া দিতেই শত বডিগার্ড লাগে সবসময় তাহলে তারা কেন বিদেশি ডক্টরের পরামর্শ না নিয়ে সাধারণ একটি বাচ্চা মেয়েকে রাখছে বয়স্ক মহিলাকে দেখাশুনা জন্য? তাও সেই মেয়েটি যার দিন দুনিয়া বলতে কিছু বুঝে না? তৃতীয়ত যেখানে অবুঝ বাচ্চা মেয়েটির পরিবারই আর্থিক দিক থেকে সচল। তাহলে তারাই কেন বাহ তাদের অতি আদুরের মেয়েটিকে এইভাবে কাজের মেয়ে হিসাবে অন্যে ঘরে রাখতে চাইছে? এতো কেন উত্তর হয়তো এই মূহুর্তে কেউ দিতে পারবে না। আর না দিতে পারবে এই অবুঝ মেয়েটি বাবা-মা শফিকুল ইসলাম ও তার স্ত্রী রেহেনা ইসলাম। উত্তরটা হয়তো এই মূহুর্তে জানা নেই তাদের দুজনেরই। তাই তীব্র অস্থিরতা ও ভয় সংযম করে খান বাড়ির ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে আছে নিজের মেয়ে হাতটি শক্ত করে চেপে ধরে অপরাধ হীনতায় শফিকুল ইসলাম ও রেহেনা ইসলাম। একমাত্র আদুরের মেয়েকে কোনো ভাবেই রেখে যেতে মন বা নীতি মানতে চাইছে না কিন্তু তারপরও মেয়েকে রেখে যেতে হবে। এতে উনার ইচ্ছা থাকুক বা না থাকুক তাতে কিছু যায় আসে না পরিস্থিতির। কারণ তিনি মন ও নীতি কাছে অপরাধী হয়ে থাকলেও ধর্মের কাছে বাঁধা। শফিকুল ইসলাম কথা গুলো ভেবে চোখ তুলে তাকাই সামনের দিকে। শফিকুল ইসলামে ঠিক সামনের সোফায় একজন বয়স্ক লোক বসে আছে। ঠিক তার পাশে একজন প্যারালাইজড মহিলা উইল চেয়ারে বসে আছে। কারও মুখে কোনো রুপ কথা নেই। এই মূহুর্তে খান বাড়ির ড্রয়িংরুমে পিনপিনে নিরবতা বিরাজ করছে চারপাশে কোনো রকম বডিগার্ড বা সার্ভন্ডে নেই শুধু একজন সার্ভেন্ড মহিলা পাশে দাঁড়িয়ে আছে অবুঝ মেয়েটির জন্য। আরাফ খানের কর্ড়া আদেশ এই মূহুর্তে কেউ বাড়ির ভিতরে থাকতে পারবে না পরবর্তী আদেশ না পাওয়া পযন্ত । খান বাড়ির মালিক আরাফ খান ও উনার স্ত্রী হেনা খান অনেকটা গুরুত্ব সহকারে বসে আছে শফিকুল ইসলাম পরিবারের সামনে।
হেনা খান কাতর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে অবুঝ মেয়েটির দিকে আর যেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে মেয়েটিকে। হেনা খানের চোখ দুটো চকচক করছে অশ্রু জলে যেকোনো সময় যেন বাঁধ ভাঙ্গা কান্না লুটিয়ে পড়তে পারে। অবুঝ মেয়েটি বারবার নড়েচড়ে উঠছে আর আড়চোখে একবার খান বাড়িটি তো অন্যবার প্যারালাইজড মহিলা হেনা খানকে দেখছে। বাবা-মার হাত ধরে বসে থাকলেও চোখে মুখে কৌতূহলতাও চঞ্চলতা আষ্টেপৃষ্টে জরিয়ে আছে মেয়েটি। বয়স্ক মহিলাটি হালকা ঘাড় বাঁকা করে সবার অগোচরে নিজের চোখের জল মুছে নিয়ে পাশের সার্ভেন্ডকে ইশারা করে বলে মেয়েটিকে এখান থেকে নিয়ে যেতে ও কিছু খাবার দিতে। সার্ভেন্ড ইশারা মতো কাজ করে। মেয়েকে নিয়ে যেতেই দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে শফিকুল ইসলাম। হঠাৎ করে শফিকুল ইসলাম নীরবতা ভেঙ্গে সামনে তাকিয়ে বাবার বয়সে লোকটি মানে আরাফ খানকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠে…..
–” আমি জানি না কোনো বাবার তার মেয়ে সাথে এমনটা করে কিনা? কিন্তু আমি করছি নিজের অবুঝ মেয়েটা সাথে৷ আমি নিজে বাবা হয়ে আজ অপরাধী হয়ে গেলাম নিজের মেয়ে কাছে সারাজীবনের জন্য। পরিস্থিতি আজ আমাকে বাঁধ্য করেছে। বাবা হয়ে নিজের মেয়েকে অন্ধকার জীবনে ফেলে দিয়ে যাচ্ছি। আজ এক বাবা বড্ড অসহায়। তাই আপনাদের কাছে রেখে যেতে হচ্ছে নয়তো নিজের মেয়েকে এই অন্ধকার জীবনে কখনোই ফেলে যেতাম না। মরে যেতাম কিন্তু নিজের মেয়ের জীবনটা এইভাবে ধংশ হতে দিতাম না কখনোই মিস্টার খান।
শফিকুল ইসলামের এমন কথায় মূহুর্তে পরিস্থিতি বেগ ঘটে। সামনে বসে থাকা বয়স্ক পুরুষ আরাফ খানের চেহারায় অনুতপ্ত চাপ স্পষ্ট ভেসে উঠে। সেই সাথে অসহায় বোধও।আরাফ খান তাই আবেগাপ্লুত হয়ে অসহায় প্রকাশ করে বললো….
.
–” মিস্টার খান কেন বলছো শফিক? আমি তোমার আরাফ চাচা! তোমার বাবার বন্ধু। সব সত্যিটা তো তুমিও জানো তাই না? তাহলে এসব কেন বলছো?
–” সত্যিটা জানি বলে তো ভয়টা বেশি আমার। আর বাবার বন্ধু বলেই তো আজ আমাকে ধর্মের বেড়া জালে খুব সহজেই ফাঁসিয়ে দিলেন আপনারা। আজ আমি চুপ করে আছি ঠিকই কিন্তু যেদিন আমার অবুঝ মেয়েটি বুঝতে শেখবে! আর আমার সামনে দাড়িয়ে প্রশ্ন করতে জানবে! সেদিন আমি আর এই ধর্ম নীতি মানবো না। সেদিন শুধু আমি বাবা হয়ে মেয়ের কথায় শুনবো আর বুঝবো। সেই দিনই আমার মেয়ের আপনাদের সাথে শেষ দিন হবে। আর এই খান বাড়িতে শেষ মূহুর্ত।
শফিকের এমন কথায় মূহুর্তে শীতল হয়ে যায় আরাফ খান ও তার স্ত্রী হেনা খান। শফিকের কথার পিষ্টে কি জবাব দিবে সেটা এই মূহুর্তে বুঝতে না পারলেও হেনা খানের কাছে বরাবরই শফিকুলের উত্তর ছিল তাই তিনি দ্রুত কন্ঠে বললো..
–” শফিক তুমি কি আমাদের বিশ্বাস করতে পারছো না। আমরা আছি তো মায়ার পাশে এবং সবসময় ছায়ার মতো থাকবোও ওয়াদা দিলাম। মায়ার শুধু একা তোমার মেয়ে নয়। মায়ার সাথে আমাদের ও একটা সম্পর্ক আছে। সেটা তুমি নিশ্চিয় ভুলে যাও নি শফিক।
হেনা খানের কথায় মূহুর্তে নিচের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্য হাঁসে শফিকুল ইসলাম। কথা গুলো বরাবরই উনার কাছে অর্থহীন। তাই বনিতা ছাড়ায় বলে উঠে…
–” রক্তের সম্পর্কে কাছে বাকি সব সম্পর্কই বৃথা হয়ে যায় বরাবরই মিসেস খান। সেটা আপনি ও জানেন! সেটা আমিও জানি। আপনি আপনার রক্তের জন্য আজ আমাকে এক অপরাধী বাবা বানালেন মেয়ের কাছে। কাল যখন আপনার রক্ত আপনারই সামনে দাঁড়াবে আমার মেয়েকে মারতে তখন পারবেন তো আমার মেয়েকে বাঁচাতে আপনাদের রক্তের হাত থেকে?
শফিকুল ইসলাম এমন কথায় সাথে সাথে মূহুর্তেই ভয়ে চমকে উঠে আরাফ খান ও হেনা খান। কথা গুলো শুনতেই হেনা খানের চোখ টইটম্বুর হয় মূহুর্তেই। আরাফ খানের সাথে সাথে হেনা খান ও শীতল হয়ে যায়। শফিকুল ইসলামের এমন প্রশ্নে যেন মূহুর্তেই ভিতর থেকে নাড়িয়ে তুলে তাদের দুজনকেই। শফিকুল ইসলামের কথা গুলো সবটাই সত্য। যখন মায়ার সত্যিটা প্রকাশ পাবে তখন নিজের রক্তের হাত থেকে কিভাবে বাঁচাবে মায়াকে তা এই মূহুর্তে জানা নেই হেনা খান ও আরাফ খানের। শুধু এতটা জানে সব পরিস্থিতি মধ্যে হলেও মায়াকে তাদের চাই-ই চাই। দরকার হলে প্রত্যেকের বিরুদ্ধে চলে যাবে তাঁরা! শক্ত হাতে পাশে থাকবে মায়ার। তারপরও মায়াকে চাই এই খান বাড়িতে। আরাফ খান শান্ত চোখে তাকায় হেনা খানের দিকে। সেদিকে এক পলক দেখে নিয়ে শফিকুল ইসলামকে আশ্বাস্ত দিয়ে বললো…
–” এমন কিছুই হবে না শফিক। আমরা মায়ার পাশে আছি অভিবক হয়ে ছায়ার মতো। মায়া তোমার মেয়ে হলেও সে এখন খান পরিবারের একমাত্র বউ!
আরাফ খানের কথায় সন্তুষ্ট হয়নি শফিকুল ইসলামের মন তিনি উদ্ধিগ্ন হয়ে অশান্ত মনে আবারও বললো..
–” বউ নামক সত্যিটা যখন সবার সামনে আসবে তখন এর ছেয়েও বেশি খারাপ কিছু হতে পারে মিস্টার খান। আমিতো সামান্যটা বলছি তখন হয়তো পরিস্থিতি আপনার আমার হাতে বাহিরে হতে পারে। তখন কি করবেন? আমার মেয়েকে বাঁচাতে পারবেন তোহ?
আরাফ খান শফিকুলের কথার মানে বুঝতে পেরে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে শক্ত কন্ঠে বললো…
–” অবশ্যই পারবো! আমরা আটকাবো পরিস্থিতিটাকে। সামনে নিব খান পরিবারের বউকে?
শফিকুল ইসলাম আগের নেয় স্বাভাবিক কন্ঠে অশান্ত মনে নিয়ে প্রশ্ন করে বললো…
–” পারবেন তো আটকাতে?
–” বিশ্বাস নেই আমাদের ওপর শফিক তোমার?(অসহায় ফেস করে)
–” এটা আমার প্রশ্নের উত্তর নয় মিস্টার খান।(পুনরায় প্রশ্ন করে)
শফিকুলের পরপর প্রশ্নের মানে বুঝতে পারছে হেনা খান। তাই তিনি নিজেকে স্থির করে শক্ত মনে পাশ থেকে নিজের চোখের জল মুছে নিয়ে শতস্ফুতার সাথে শফিকুল ইসলামের কথার জবাব দিতে শক্ত কন্ঠে বলে উঠে….
–“ভবিষ্যতের পরিস্থিতি আমাদের কোথায় নিয়ে দাঁড় করে তা আমি জানি না শফিক । তবে এতটা বলতে পারি আমাদের রক্তকে মায়ার কোনো রকম ক্ষতি করতে দিব না আমরা। তারপরও যদি পরিস্থিতি আমায় বাঁধ করে! তাহলে কথা দিচ্ছি প্রথম গুলিটা আগে আমার বুক ভেদ করবে তারপর দ্বিতীয় গুলিটা মায়াকে ভেদ করবে। ওয়াদা করছি আমার শেষ নিশ্বাস থাকা পযন্ত আমি তোমার মেয়ে মানে মায়ার হেফাজত করবো ইনশাআল্লাহ।
হেনা খানের এমন কথা মূহুর্তেই স্তব্ধ হয়ে যায় শফিক ও রেহেনা। স্বামীর পাশে নীরবে বসে মেয়ে জন্য চোখে অশ্রুজল ফেলা মা এবার চোখ তুলে তাকাই। হেনা খানের প্রতিটা কথায় তিনি ভিষণ চমকায়। প্রতিটা বাক্যে রেহানাও স্তব্ধতা বিরাজমান। শফিকুল ইসলামের অশান্ত মন মূহুর্তেই স্থির হয়ে যায়। কারণ শফিকুল ইসলাম জানে খান পরিবারে সদস্যরা তাদের কথায় কতটা দৃঢ়তা রয়েছে। তাঁরা জীবন গেলেও নিজেদের বচন ভাঙ্গবে না। শফিকুল ইসলামের নমনীয়তার সঙ্গে ঝুকে বসেন। বাবা হিসাবে মেয়েকে নিয়ে তিনি বেশ চিন্তত ভবিষ্যত পরিস্থিতিটা ভেবে। তবে কিছুটা আশ্বস্ত হয় হেনা খানের কথায় এই ভেবে যে যাহ কিছুই হোক না কেন? সকল পরিস্থিতিতে তারা দুজনই মায়ার পাশে পাশে থাকবে সাপোর্টার হয়ে। কথা গুলো ভেবেই তিনি নিরবে একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়ান। নিজের আদুরে মেয়েকে আল্লাহ হাতে শপে দিয়েছে। এবার যাহ হওয়ার বাকিটা সময়ে ঠিক করবে। তিনি হেনা খানের কথায় বিশ্বাস্ত হয়ে নিজ বাক্য আর লম্বা না করে হঠাৎই স্ত্রীকে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে কাঠকাঠ গলায় বলে উঠে……
–” সম্পর্কে নষ্ট হয়ে গেলেও এখনো একটা ছেঁড়া সুতার বাঁধন নামক একটা সম্পর্ক আছে আপনাদের সাথে আমাদের। সেই সাথে কিছুটা বিশ্বাস ও আছে। সেই বিশ্বাস নিয়েই মেয়েকে রেখে গেলাম অন্ধকার জগতে আপনাদের হাতে। নিজের মেয়ের সামনে দাড়াতে পারবো না বলে, মেয়েকে না বলেই চলে যাচ্ছে এখান থেকে। আপনার দেখে রাখবেন আশা করি। যদিও আমার অবুঝ মেয়েটি কোনো অপরাধ করে তো ওকে কোনো শাস্তি না দিয়ে ক্ষমা করে দেওয়ার চেষ্টা করবেন প্লিজ । অপরাধী বাবা হয়ে এর থেকে বেশি কিছু বলার নেই আমার।
আরাফ খান সাথে সাথে সোফা ছেড়ে ওঠে দাঁড়িয়ে। ব্যস্ত বংগিতে এগিয়ে আসতেই হাত বাড়িয়ে থামায় শফিকুল ইসলাম। আরাফ খানকে কিছু বলতে না দিয়ে সাথে সাথে হাত জোড়া সামনে ধরে ক্ষমা চেয়ে বলে উঠে….
–” যেদিন ছেঁড়া সুতার বাঁধন ঠিক হয়ে যাবে সেদিন নিজের দাবির নিয়ে এই বাড়ি অন্ন বা পানি পান করবো তার আগে নয় মিস্টার ও মিসেস খান ৷ এখন আমাদের বিদায় দেয় আমরা আসি।
কথা বলে আর এক মূহুর্তে না দাঁড়িয়ে মেয়ের অগোচরেই স্ত্রী রেহানার হাত ধরে খান বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যায়। রেহানা বেগম মেয়ের কষ্টে বারবার ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে কেঁদে উঠছে আর পিছন ফিরে মেয়েকে একটা নজর দেখার চেষ্টা করছে কিন্তু তারপরও স্বামীর ভয়ে কিছু বলতে পারছে না। শুধু নীরবে কান্না করতে করতে স্বামীর সাথে যেতে থাকে।
.
শফিকুল ইসলাম চলে যেতেই সেদিকে তাকিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে আরাফ খান। চেপে রাখা কান্নাটা মুহূর্তেই বাঁধ ভাঙ্গে হেনা খানের। স্ত্রী কান্না শব্দ শুনে দ্রুত এগিয়ে আসে আরাফ খান। স্ত্রী সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে হেনা খানের হাত দুটো নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে শক্ত করে চেপে ধরতেই হেনা খান ফুপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠে…..
–” তুমি দেখলে তো আমাদের শফিক আমাদের সাথে ঠিক করে কথাটা পযন্ত বলেনি। ওহ তো সত্যিটা জানে।তাহলে ওহ কেন আমাদের সাথে এমন করছে তুমিই বলো?
আরাফ খান নিজেকে শক্ত করে হেনা খানকে শান্ত করার জন্য শান্তনা স্বরূপ বলে উঠে….
–” কারণ শফিক নিজের সন্তানকে বিপদের মুখে রেখে যাচ্ছে তাই এমনটা করছে। বাবা হিসেবে শফিক নিজের জায়গায় ঠিক আছে হেনা। আমাদের ও শফিককে কষ্টটা বুঝতে হবে।
আরাফ খানের কথায় মূহুর্তে হেনা খান কাঁদতে কাঁদতে আবারও পাল্টা জবাবে বললো….
–” আর আমাদের কি কষ্ট নেই? আমরাও কি পরিস্থিতি স্বীকার নয় আরাফ? আমিতো সবকিছু হারিয়ে বসে আছি আরাফ! এখন আমার বেঁচে থাকা একমাত্র ভরসাই তো মায়া। সেটা কবে বুঝবে শফিক?
হেনা খানের কথায় আরাফ খান আগের নেয় বললো…
–” হেনা একটু সময় দাও শফিককে দেখবে ওহ ঠিকই বুঝবে আমাদের কষ্টটা? সবটা সামলাতে সময়ের প্রয়োজন হেনা! তাই নিজেকে শান্ত রাখাটাও খুব জরুরি আমাদের।
হেনা খান স্বামীর হাত দুটো ধরে সেখানটায় নিজের কপাল ঠেকিয়ে অঝোরের কেঁদে বলে উঠলেন।
–“এমনটা হওয়া কি খুব জরুরি ছিল আরাফ আমাদের সাথে? এতটা ধ্বংসাত্বক কেন হলো আমাদের? কেন সময়টা আমাদের এতটা পরীক্ষা ফেলছেন? জীবনটা কেন চলতে গিয়েও থেমে যাচ্ছে বারবার? সবটাই কি সময়ের দায়? নাকি আমরাও সমান দোষী আরাফ?
কথা গুলো বলে থামেন তিনি। দুজনের বাক্যই চিল নিবার্হিকা। একে অপরকে শান্তনা দেওয়ার প্রলয়। আরাফ খান নিশ্চুপ বংগি থাকতেও হেনা খান ছিল অস্থিরতা মনস্তাপ। ঠিক সেখানটায় আগমন ঘটে কারও এক জোড়া ছোট পায়ের। ভিতু ও চঞ্চল দৃষ্টিতে চারপাশে চোখ বুলাই। চোখ আওড়িয়ে কাউকে খুঁজে বা পেয়ে হতাশতায় এগিয়ে যায় ধীর পায়ে আরাফ খান ও হেনা খান সামনে। ভীতু চোখে দুজনকে দেখে নিয়ে আস্তে করে বলে উঠে….
–” আম্মু যাব আমি! আম্মু -আব্বু কোথায় আমার?
মায়ার এমন প্রশ্নে মূহুর্তে চমকে উঠে আরাফ খান ও হেনা খান। দ্রুত নিজেদের সামলে চোখে জল মুছে ঠিক হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে মায়ার সামনে। হেনা খান জোর পূবক মুখে হাসি হাসি ভাব ফুটাই মুখে। দু’হাত বাড়িয়ে ডাকে মায়াকে কাছে আসতে। বাঁধ্য মেয়ের মতো গুটি পায়ে প্রথম ডাকেই সামনে দাঁড়ায় হেনা খানের। হেনা খানের কাছে আসতে খানিকটা ইতস্তত বোধ করলেও নমনীয়তা প্রকাশ করে নিজের মধ্যে মায়া। মায়ার কাছে যেতেই হেনা খান দু’হাতে জরিয়ে ধরে মায়াকে। মন ভরে মায়াকে আদুর করে আহ্লাদী সুরে বলে উঠে….
–” বাহ! তুই তো দেখতে একদমই তোর দাদীর মতো বাড়াবাড়ি সুন্দরী হয়েছিস। ডাগর ডাগর চোখ, তোর লম্বা চুল, তোর হাসি সবকিছুই তোর দাদীর মতোই জানিস সেটা তুই?
এই মূহুর্তে মায়া হেনাকে ঠিকঠাক ভাবে চিন্তে না পারলেও একেবারে আবার অপরিচিত ঠিক তাও নয়। শফিকুল বলেছিল হেনা খান ও আরাফ খানের কথা মায়াকে। সাথে এখানে আসার আগে সবকিছু বুঝিয়েই এনেছিল মায়াকে। ছোট মাথায় কতটুকু বুঝেছে কি জানি? কিন্তু তার রেশ টেনেই মায়া এই মূহুর্তে নম্রতা প্রকাশ করছে হেনা খানের সামনে। তাই সেই সুবাদে হালকা পরিচিত মহিলার কথা গুলো শুনেও বেশ একটা চমকাচ্ছে না মায়া। শুধু গোল গোল চোখে হেনা খানকে দেখছে। মায়াকে কিছু বলতে না দেখে আবারও হেনা খান হাসি হাসি ভাবে বলে উঠে…
–” কি কথা হবে না আমার সাথে বুঝি? শুন! আমি তো তোর দাদী হয় বুঝলি। জানিস তো দাদীদের সাথে রাগ করতে বাড়ন যে সেটা? বেশি বেশি কথা বলতে হবে তোকে। মনে যেটা থাকবে সেটা সবসময় মুখের বলিতে আওড়াতে হবে তোর বুঝলি? চুপচাপ তো মোটেও থাকা যাবে না।
হেনা খানের কথায় গুলো বেশ একটা বোধগম্য হয়নি মায়ার। কান অবধি পৌঁছালেও মায়ার সেটা মনোযোগী হয়নি। বরং মনোযোগ ছিল হেনাখানকে খুঁটিয়ে দেখার। তাই বিস্মিত গলায় বললো..
–” দাদী হন আপনি আমার?
সায় জানিয়ে বললো…
–” হুমমম! আর আপনি নয় তুমি করে বলবি তুই কেমন? ঐ যে উনাকে দাদাজান বলে ডাকবি। উনি তোর দাদাজান হয়(আরাফ খানকে দেখিয়ে)
মায়া নাড়িয়ে সম্মতি জানায় মায়। বাঁধ্য মেয়ের নেয়
মায়াকে সায় জানাতে দেখে মূহুর্তে হালকা হাঁসেন আরাফ খান ও হেনা খান। বহু কষ্টের পর এই হাসিটা যেন মূহুর্তেই বুকের ভিতর শীতল হওয়া বয়ে যায় তাদের দুজনেরই। তাই হেনা খান হাসি মুখে মায়ার এক গালে হাত রেখে আবারও বলে উঠে…..
–” ক্ষুদা পেয়েছে? আমার সোনামা কি কিছু খাবে এখন? চকলেট আসক্রিম হুম?
হেনা খান এতেটা আদুর ও ভালোবাসায় দেখে মায়া কিছুই বুঝতে পারছে না যে হচ্ছেটা কি? ছোট মাথায় বিষয় গুলো আওড়াতে না পারলেও এতটা বুঝতে পারছে যে সামনে বসা থাকা সদ্য নতুন দাদা-দাদি নামক মানুষ দুটো ভিষণ ভালো। সাংঘাতিক বাড়াবাড়ি রকমের ভালো। নয়তো কেউ কাজে মেয়েকে চকলেট আসক্রিম খেতে দিবে সেই বিষয় অক্ষত। মেয়েকে মিথ্যা বলার কারণ শফিকুল ইসলাম মায়াকে শক্ত রাখতে চাই সকল পরিস্থিতিতে। বাবা কথার বিপরীত কিছু হতে দেখে মাথায় তাল পাকায় মায়া। খানিকটা কনফিউজড হয়ে পাল্টা প্রশ্ন করে বলে উঠে….
–” তোমরা কি কাজের মেয়েকে চকলেট আসক্রিম দাও খেতে দাদী?
মায়া কথায় কিঞ্চিত কপাল কুঁচকে আসে হেনা খানের। গাঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন…
–” কেন খেতে দিব না আমার সোনামাকে? তোকে কে বললো যে তুই এই বাড়ির কাজের মেয়ে হস সেটা?
অবুঝ কন্ঠে বললো…..
–” আব্বু! আমার আব্বু বলেছে আজ থেকে আমাকে এই বাড়িতে থেকে তোমার দেখাশোনা করতে হবে। সাথে তোমাকে ম্যাডাম আর তোমার বর স্যার বলতে বলতে হবে। তোমরা আমাকে যা খেতে দিবে তাই খেতে বলেছে আব্বু। কোনো রুপ রাগারাগি করতে নিষিদ্ধ করেছে। তোমাদের কাছে থেকে কোনো কিছু খেতে চাওয়ার আবদার করতে নিষিদ্ধ করেছে। আব্বু বলেছে আমায় আব্বুকে ফোন করে জানাতে আমার কোনো কিছুর প্রয়োজনে আব্বুকে বলতে। তিনি এনে দিবেন আমায়। কিন্তু তোমাদের কাছে আমি আবদার করলে নাকি আমার চাকরি থাকবে না।
মায়ার এসব কথায় মূহুর্তে হেনা খান মায়াকে জরিয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে ওঠে। হেনা খানের সাথে সাথে আরাফ খানও মায়া ও হেনা খানকে হাটু গেড়ে ওপর থেকে জরিয়ে ধরে নীরবে চোখে জল ফেলে। মায়ার বাবা শফিকুল ইসলাম যে মায়াকে মিথ্যা বলে এখানে থাকতে রাজি করিয়েছে সেটা বুঝতে বাকি নেই কারও।অবুঝ মেয়েকে রাজি করানোর জন্য বলেছে মায়াকে এখানে চাকরি করলেই তারা খেতে পারবে নয়তো না খেয়ে থাকতে হবে। আর মায়া বাবার মার মিথ্যা কথায় বিশ্বাস করে এখানে আসতে রাজি হয়ে যায়। কিন্তু মায়ার চঞ্চলতা যেন ওদেকে না জালায় তাই বাকি সব কথা গুলো বানিয়ে বলেছে। হেনা খান নিজেকে স্থির করার চেষ্টা করে মায়াকে সামনে দাঁড় করিয়ে আদেশ স্বরুপ বলে উঠে….
–” কে? কি তোকে বলেছে সেটা ভুলে যাহ মায়া। আমি সেটা বলছি সেটাই তুই আজ থেকে মানবি। আর এই বাড়িটা তোর। তাই তুই এই বাড়ির কাজের মেয়ে নয় বরং তুই এই বাড়ির বউ। আমার একমাত্র নাতির একমাত্র বউ তুই বুঝলি।
মায়া বিস্ময়ে ছোট ছোট চোখ করে বলে উঠে…
–” বউ?
–” হুমমম বউ। আমার রিদের পুতুল বউ!
পাশ থেকে আরাফ খান মায়াকে টেনে নিজের দিকে ঘুরিয়ে হাসি মুখে বলে উঠে….
–” কি লেডি? কেমন লাগলো আমাদের বুড়ো- বুড়িকে হুমম? কোনো সমস্যা হবে নাতো আমাদের সাথে থাকতে।
মায়া বিস্ময়ে মাথা নাড়ায় যার অর্থ কোনো সমস্যা হবে না। মায়াকে সায় জানাতে দেখে মূহুর্তে এক গাল হাঁসে আরাফ খান ও হেনা খান। হাত বাড়িয়ে মায়ার নাক টেনে আরাফ খান বলেন।
–” কালই বুড়িকে এখানের একটা স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিব। এবার হাতে ধরে পড়াশোনাটাতেও মন দিতে হবে আপনার।
স্বামীর কথায় হেনা খান সায় জানালেও মূহুর্তে বাঁধ্য সাজলো মায়া নাক মুখ ছিটকে নাহুচ সুরে বলে উঠে…
–” আমি পারবো না আর পড়তে। আমার পড়তে ভালো লাগে না একটুও। আমি অনেক পড়েছি জে এস সি পার্স করে নাইনয়ে উঠে বিগত চারটা মাস পড়েছি ঐ স্কুলে। এখন আবার এখানে এসেও পড়া লাগবে আমার? আর কত পড়বো আমি?
আদুরে সহিত হেসে হেনা খান বুঝিয়ে বলে উঠে…. .
–” তা বললে তো হবে না সোনামা। পড়তে তোহ তোকে হবেই। আমি পড়াবে তোকে। সাথে তোর দাদাজান ও আছে। এখন বল! আমাদের কথা কি আমার সোনামা আমান্য করবে পড়াশোনা করতে না চেয়ে হুমম?
–” নাহ! (গাল ফুলিয়ে)
রাত দুটো কাটা ঠিকঠিক করছে। আরাফ খান নিজের রুমে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। সারারাত ভর ভেবেছিল পরিস্থিতি কথা মায়ার কথা। সকালে তিনি নিজের স্ত্রীও মায়ার পরিবারকে বুঝালেও কিন্তু নিজের মনকে কোনো ভাবেই বুঝাতে পারছে না। একদিকে নিজের দেওয়া ওয়াদা তোহ অন্যদিকে নিজের স্ত্রী সেই সাথে অবুঝ মায়া, সাথে খান পরিবারের বাকি সদস্যরা। কিভাবে সামাল দিবেন তিনি সবটা? হেনা খান নিজের রক্ত সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত না থাকলেও আরাফ খান ঠিকই রন্ধ্রে রন্ধ্রে জানা আছে। মায়ার সত্যিটা কতদিন সবার থেকে আড়াল করে রাখতে পারবে তা জানা নেই কিন্তু যেদিন সত্যিটা প্রকাশ পাবে সেদিন হয়তো ধংশস্তুপ নেমে আসবে এই খান বাড়িতে। স্ত্রী ও মায়া দুজনকেই না হারাতে হয় উনার। এই ভয়ে সারারাত জাগ্রত অবস্থায় কাটিয়ে দেয় আরাফ খান।
চলবে……..
Share On:
TAGS: দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ২, রিক্তা ইসলাম মায়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১০
-
রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা গল্পের লিংক
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২৮ প্রথমাংশ
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ২
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২৩
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১২
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৮
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৪
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৭