দিশেহারা (৭২)
সানা_শেখ
সোহাকে ওটিতে নেওয়ার জন্য রেডি করা হচ্ছে। শ্রবণ ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে জড়ানো গলায় থেমে থেমে বলল,
“ডাক্তার, আমি কিচ্ছু জানি না, আপনারা আমার স্ত্রী-সন্তানকে যেভাবেই হোক বাঁচিয়ে দিবেন।”
“আমরা সাধ্য মতো চেষ্টা করব, বাকিটা আল্লাহর হাতে। মা এবং শিশু দুজনের অবস্থাই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।”
ডাক্তারের কথা শুনে শ্রবণ দিশেহারা হয়ে উঠল আরো। উত্তেজিত হয়ে বলল,
“আমি কিচ্ছু জানি না, আমার বউ-বাচ্চার কিছু হলে আপনাদের হসপিটাল আর আস্ত থাকবে না।”
শামীম রেজা চৌধুরী ছেলেকে ধরে শান্ত করার চেষ্টা করে বললেন,
“কিছু হবে না ওদের, তুমি শান্ত হও, আল্লাহকে ডাকো।”
“আল্লাহ কেন সবসময় আমার সঙ্গে এমন করে?”
“এর পর থেকে সব ভালো হবে ইনশাআল্লাহ, তুমি শান্ত হও।”
শ্রবণের চোখের সামনে সোহাকে ওটিতে নিয়ে যাওয়া হলো। শ্রবণ কান্নায় ভেঙে পড়ল আবার। আশপাশের লোকজন শ্রবণের দিকে তাকিয়ে আছে। ছেলে মানুষ হয়ে কীভাবে কাদঁছে! পুরুষ মানুষ কী এভাবে কাঁদে? কাঁদতে পারে?
শামীম রেজা চৌধুরী ছেলের মুখের দিকে তাকালেন, ছেলের কান্না দেখে উনার চোখেও পানি জমেছে আবার। শ্রবণ কাঁদতে কাঁদতে ওটির দরজার দিকে তাকিয়ে আছে। বিয়ের পর থেকে এত দীর্ঘ সময়ের দুরত্ব দুজনের মধ্যে কখনো আসেনি গত সময়গুলোর আগে। ইচ্ছে করছে ছুটে সোহার কাছে চলে যেতে। একদিকে স্ত্রী, অন্যদিকে অনাগত সন্তান, দুজনের জীবনই যেন এখন ঝুলে আছে একটা সূক্ষ্ম সুতোয়।
শামীম রেজা চৌধুরী ছেলের ডান হাত ধরে বললেন,
“শ্রবণ, তোমার হাত ব্যান্ডেজ করতে হবে।”
বাবার কথা শুনে শ্রবণ নিজের হাতের দিকে তাকাল। এখন আর র’ক্ত ঝরছে না হাত থেকে, ব্যথা করছে শুধু। তবে এই ব্যথা বুকের ব্যথার কাছে কিছুই না। এর মধ্যে চৌধুরী বাড়ি থেকে চারজন এসে পৌঁছালেন দুজনের কাছে। অনিমা চৌধুরীর কান্না শুনে শ্রবণ তার দিকে একবার তাকিয়ে ওটির দরজার দিকে তাকাল।
শামীম রেজা চৌধুরী বাবা আর ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে একজন নার্সকে ডাকলেন শ্রবণের হাত ব্যান্ডেজ করে দেওয়ার জন্য। শ্রবণ ব্যান্ডেজ বাঁধতে রাজি না হলেও শামীম রেজা চৌধুরী জোর করে চেয়ারে বসালেন তাকে। নার্স ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়ে চলে গেলেন, বলে গেলেন ডাক্তারকে বলে ঔষুধ নেওয়ার জন্য।
শ্রবণ বসা থেকে উঠে ওটির দরজার সামনে এসে দাঁড়াল, তাকিয়ে রইল ভেতরের দিকে তবে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। সামাদ চৌধুরী নাতির পাশে এসে দাঁড়ালেন। নাতির কাঁধের উপর হাত রেখে বললেন,
“দাদু ভাই, ভেঙে পোড়ো না, কিছু হবে না ইনশাআল্লাহ। তোমার স্ত্রী-সন্তানকে আল্লাহ তায়ালা নিশ্চই তোমার কাছে ফিরিয়ে দিবেন সুস্থ অবস্থায়।”
শ্রবণ কোনো কথা বলতে পারল না শুধু একবার তাকাল দাদার মুখের দিকে। চোখের পানি মুছে পুনরায় দেখার চেষ্টা করল ভেতরে। তার জান-রা কখন বের হবে ভেতর থেকে? দুজন যেন সুস্থ অবস্থায় ফিরে আসে তার কাছে।
প্রায় ত্রিশ মিনিট পর বাবুকে কোলে নিয়ে ওটির দরজা খুলল একজন নার্স। শ্রবণের বুকের ভেতর আগের চেয়েও জোরে জোরে শব্দ করতে লাগল, হাত-পা আরো বেশি কাঁপতে লাগল। তাকাল নিজের সন্তানের মুখের দিকে। বাচ্চাটার চোখ বন্ধ। নার্স বললেন,
“একটু সরে দাঁড়ান, আমাকে বের হতে দিন।”
শ্রবণ সরে দাঁড়াতে পারল না, ঠায় দাঁড়িয়ে রইল আগের মতোই। সামাদ চৌধুরী নাতির হাত ধরে টেনে নিয়ে পিছিয়ে এলেন। নার্স শ্রবণের সামনে এসে দাঁড়ালেন। বললেন,
“বাচ্চাকে কয়েক মিনিটের জন্য কোলে নিতে পারবেন, তাকে আইসিইউতে রাখতে হবে।”
শ্রবণ নার্সের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আ… আমার ছেলে বাঁচবে তো?”
নার্স শ্রবণকে প্যানিক করতে দেখে দ্রুত বললেন,
“হ্যাঁ হ্যাঁ, বাঁচবে। আপনি এমন প্যানিক না করে শান্ত হোন, এত উত্তেজিত হয়ে পড়েন কেন?”
“আ… আমার সোহা, আমার সোহা কেমন আছে?”
“অপারেশন চলছে।”
“কেমন আছে?”
“বাবুকে নিন নয়তো আইসিইউতে নিয়ে যাচ্ছি।”
শ্রবণ ব্যস্ত হয়ে হাত পাতল সামনে। নার্স বাবুকে তুলে দিলেন তার বাবার কোলে। শ্রবণ নিজের ছেলের কপালে চুমু খেয়ে বুকে চেপে ধরে হু হু করে কেঁদে উঠল। বাচ্চটাও নড়েচড়ে কেঁদে উঠল এতক্ষণে। বাড়ির সবাই শ্রবণকে ঘিরে দাঁড়িয়েছে। কয়েক মিনিট পরেই শ্রবণের কাছ থেকে বাবুকে নিয়ে আইসিইউ-এর দিকে এগিয়ে গেলেন নার্স। শ্রবণ ওটির দরজার দিকে তাকিয়ে চোখ মুছতে মুছতে নার্সের সঙ্গে সঙ্গে হাঁটতে লাগল আইসিইউ-এর দিকে।
*********
পেরিয়ে গেছে পুরো একটা দিন। আজ সোহার অবস্থা কিছুটা স্থিতিশীল। কথা বলতে পারছে, ফজরের আগে জ্ঞান ফিরেছে তার। বাবুর অবস্থা এখনো কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ, সোহা দুদিন না খেয়ে থাকায় বাচ্চাটা দুর্বল হয়ে পড়েছে, নিচে পড়ে যাওয়ায় আঘাতও পেয়েছে অনেক। জন্মের পর তো ঠিকভাবে শ্বাসও নিচ্ছিল না, নড়াচড়া করছিল না।
পুলিশ এসেছে সোহার সঙ্গে কথা বলতে। তাকে আইসিইউ থেকে কেবিনে শিফট করা হয়েছে এখন। দুজন পুলিশ অফিসার, শ্রবণ আর শামীম রেজা চৌধুরী কেবিনের ভেতরে রইলেন, বাকিরা বেরিয়ে গেলেন বাইরে।
একজন অফিসার সোহার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“তোমাকে কীভাবে কিডন্যাপ করা হয়েছিল?”
সোহা নিজের শিয়রে দাঁড়িয়ে থাকা শ্রবণের মুখের দিকে তাকাল। শ্রবণ ইশারা করল বলার জন্য। সোহা অফিসারের দিকে তাকাল। উনারা সবকিছু শোনার পরও সোহার কাছ থেকে শুনতে চাইছেন আবার। সোহা ক্ষীণ স্বরে খুলে বলল তাকে কীভাবে কিডন্যাপ করা হয়েছিল। অফিসার আবার বললেন,
“আপনার সঙ্গে খারাপ কিছু করেছে?”
“না। শুধু আটকে রেখেছিল, আর একদিন দুটো চড় মে’রেছিল। পানি ছাড়া আর কিছু খেতে দেয়নি। ভীষণ ভয় দেখাত, আর গতকাল ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিল।”
“কীভাবে আপনাদের খোঁজ পেয়েছিল বা আপনাকেই কেন কিডন্যাপ করল এই বিষয়ে কোনোকিছু বলেছে?”
“আমার হাজব্যান্ড মানে শ্রবণ চৌধুরী আমার জন্য কয়েকবার জুয়েলারি কিনেছিল সেটা তাদের দলের মধ্যে কেউ একজন দেখেছিল। তারপর থেকেই তারা আমার হাজব্যান্ডের উপর নজর রাখত, আস্তে আস্তে খোঁজ খবর নেয় আমাদের বিষয়ে তারপর প্ল্যান করে কিডন্যাপ করে টাকার জন্য।”
অফিসার নিজের পাশে থাকা অফিসারের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“ওরাও এই কথাই বলেছে।”
“হুম।”
একজন অফিসার শ্রবণের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“আপনাকে আমাদের সঙ্গে থানায় আসতে হবে। ছু’রির আঘাতে একজনের খুব খারাপ অবস্থা, বাঁচাবে কী ম’রবে ঠিক নেই। উপর থেকে ফেলে দেওয়ায় একজনের মাথা ফেটে কোমায় চলে গেছে।”
শ্রবণ কিছু বলার আগেই শামীম রেজা চৌধুরী বললেন,
“শ্রবণ যা করেছে সব রাগের মাথায় করেছে আর নিজের স্ত্রী-সন্তানকে বাঁচানোর জন্য করেছে।”
“আমরা বুঝতে পারছি সেসব বিষয়, কিন্তু দেশে তো আইন বলেও কিছু একটা আছে।”
“শ্রবণের মানসিক অবস্থার ঠিক নেই, ছোটো বেলা থেকেই বিভিন্ন ট্রমায় ভুগছে। সোহা কিডন্যাপ হওয়ার পর ওর অসুস্থতা আরো বেড়ে গিয়েছিল, যা করেছে নিজের ভারসাম্য হারিয়ে করেছে। আপনারা গত রাতে তো দেখেছিলেন শ্রবণের অবস্থা। আপনারা আমার মুখের কথা বিশ্বাস না করলে আমি শ্রবণের ডাক্তার আর ওর রিপোর্টগুলোও আপনাদের দেখাতে রাজি আছি। ওরা যে এখনো বেঁচে আছে এটাই আশ্চর্যের।”
শ্রবণ বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তাকে আবার পাগল বানিয়ে দিচ্ছে!
চলবে……..
৭১ নাম্বার পর্ব লেখার পরই ভীষণভাবে রাইটিং ব্লকে আটকে গেছি, কিছুতেই লিখে উঠতে পারছি না। গত দুদিন ধরে এত টুকুই লিখতে পেরেছি। আশা করছি নেক্সট পর্ব বড়োওওও করে লিখতে পারব।
Share On:
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দিশেহারা পর্ব ৪৫
-
দিশেহারা পর্ব ৮
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ৩
-
দিশেহারা পর্ব ৬৮
-
দিশেহারা পর্ব ৭১
-
দিশেহারা পর্ব ৫৭
-
দিশেহারা পর্ব ২৭
-
দিশেহারা পর্ব ৫৪
-
দিশেহারা পর্ব ২৫
-
দিশেহারা পর্ব ৬৪